বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : কাল রবিবার আছে

কাঁধের বিশাল বোঁচকাটা দোকানের সামনে নামিয়ে রাখল সন্ধ্যা। দোকানে সারি দিয়ে রাখা লাল কমলা বোতলগুলোর ওপরে লোভ জন্মাচ্ছিল। কিন্তু কিনতে হলে আবার আট-দশটা টাকা। এক বোতল জল রাখা থাকে ওর বিগশপারের মধ্যে। ওটাও এতক্ষনে গরম হয়ে উঠেছে। বোতল বের করে ওটারই খানিক ভেতরে পাঠায় সন্ধ্যা। বিক্রিবাটা একেবারে ভালো যাচ্ছে না কিছুদিন ধরে। রোজ রোজ লোকে কত আর নাইটি হাউসকোট কিনবে? ব্রেসিয়ার-প্যান্টি-বাবাসুট এসবও সে রাখছে। তবে আবাসনের বৌদিরা নাক সিঁটকায়,

না সন্ধ্যা, ভাল কোয়ালিটির জিনিস রাখো তো নেব।


সন্ধ্যা নিজেও জানে তার এইসব মাল সরেস নয় তেমন। তবু মুখের ওপরে শুনতে খারাপ লাগে। গতমাসেই এক বৌদি খ্যাঁচখ্যাঁচ করল, ব্রাগুলো আর এনো না তো সন্ধ্যা। নোতুন জিনিস, পরতে গেছি, পিঠের দিক থেকে ছিঁড়ে-টিড়ে একশা।

সবটাই সন্ধ্যাকে চুপ করে হজম করতে হল। বলতে তো আর পারেনি,

নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখেছ বৌদি? অন্তর্বাসের বিক্রি না থাকলেও এই বৌদিদের কাছে তার নাইটী হাউসকোটের খুব কদর। পাকা রঙ, দেখতে ভালো, দামও কম। পছন্দ বুঝে বেছে জিনিস রাখে সে। দাদাদের জন্য রুমাল মোজাও আনছে আজকাল। সেগুলোও যে এদিকে খুব বিক্রি হয় তা নয়। সেদিন একটা পুঁচকে মেয়ে বলল,

ঈস এসব বিচ্ছিরি রুমাল আমার বাপী নেবেই না।

মনে হচ্ছিল গালের ওপরে লাগায় এক চড়। কিন্তু কিছুই করতে পারলনা। তাই মুখ বুঁজে থাকতে হল। বৌদিটা আবার হেসে হেসে বলল, আসলে ওর বাপীকে সাদা রুমাল ছাড়া কিছু নিতে দেখে না তো!


কিছু বাড়িতে অবশ্য তার সব জিনিসেরই কদর খুব। এই বউদিরা ইনস্টলমেন্টে কেনে। তাকে আদর করে বসায়, গল্প করে। চা বা মুড়ি-চানাচুর-টুরও চলে কখনো। অনেক সময় নিয়ে জিনিস বাছাবাছি করে। ছেলের জন্যে বাবাসুটটা নেয়, পুজোর আগে মেয়ের জন্যে গোলাপীরঙ চটকদার ফ্রক বা গেঞ্জির রঙ-বেরঙ ব্লাউজ। অনেক জিনিসই ওদের পছন্দ হয়ে যায়। বউদি হয়ত অপ্রস্তুত হেসে বলে,

ওমাসের মাঝামাঝি এসো সন্ধ্যা, এখন হাত একদম খালি।

সন্ধ্যা এই সময়গুলোতে দরাজ হাসে, ঝুঁকে পড়ে ভারী বোঝাটা ওঠায় কাঁধে। বলে,

আসি বউদি, ওমাসে আসব – ন’দশ তারিখ নাগাদ।

বউদি বুঝি ইতস্তত মুখে বলে,

রোববারে এসোনা যেন। দাদা বাড়ি থাকবে – বুঝতেই পারছ!

সন্ধ্যা বেশ আত্মপ্রসাদ নিয়ে পথে নামে। একটু শঙ্কাও থাকে। টাকা পেতে বেশি দেরি হলে কম্পানি আবার জবাবদিহি চায়। তবু এদের কাছে সে আসে। এরা তারই মতো, কিছুটা, অনেকটাই।

একদিন এরকমই দুপুরে পঁচিশ-ছাব্বিশের কালো দাঁত-উঁচু বউদি বলেছিল তাকে,

আমাকেও তোমার মতো একটা কাজ জোগাড় করে দাওনা... এত টানাটানি!

তারপর থেকে সন্ধ্যা আর ভুলেও সেবাড়িতে পা রাখেনা। এমনিতেই এলাইনে এত ভীড় এখন, নতুন খদ্দের জোটানো মুশকিল। তারপরে শপিংমল, বছরের যখন-তখন সেল আর ডিসকাউন্ট!



কদিন ধরে প্রচন্ড তাপপ্রবাহ চলছে। এখন কোণের দিকে এতটুকু মেঘ জমেছে। ওতে বৃষ্টি হয়না, গুমোট বাড়ে। আজকাল বোধ হয় কালবৈশাখিও হয়না। ধুলো উড়িয়ে পাতা ঝরিয়ে চড়চড় করে বৃষ্টি। আঃ! ঠান্ডা, আরাম, শান্তি। বদল হয়ে যাচ্ছে সব কিছুরই। সন্ধ্যা হাতের মুঠোয় রাখা ছোট তোয়ালে দিয়ে ঘাম মোছে। ব্যাগটা কী ভারি! চটিও নোতুন। পা কাটছে। আগেরটা অনেক আরামের ছিল। কিন্তু আর পরা যাচ্ছিল না। আজ কোমর টনটন করছে সন্ধ্যার। পিরিয়ডসের সময়টায় কিছুদিন ধরে এই অসুবিধেটা তার হচ্ছে। বয়সও ছত্রিশ পার হয়ে গেছে পুজোর আগে। রোদ বাঁচাতে আঁচল চাপাল মাথায়। ছাতা একটা ব্যাগে রাখে সব সময়। জোরে বৃষ্টি না এলে বের করা নেই। বছরদুই আগে একটা ছাতা হারিয়েছিল অটোতে। আর একটাও মোটামুটি দেখে কিনতে লাগল পঁচাত্তরটা টাকা।

আজ কার মুখ দেখে ঘুম ভেঙেছিল মনে নেই সন্ধ্যার। ‘আবাসিকা’র খ্যাঁকখ্যাঁকে দরওয়ানজি খইনি-খাওয়া দাঁতের পাটি মেলে হাসল। সন্ধ্যা ভয়ে ভয়ে নমস্কার বলে তিনতলার সিঁড়িতে পা বাড়াল। আজকের দিনটা বোধহয় ভালো। এক বউদি কিস্তির অনেকটা বাকি টাকা দিয়ে দিয়েছে। হাঁটুতে একটা ব্যথামত হচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙে উঠতেও একটু কষ্টই হচ্ছে আজ। সকালবেলায় ব্যাগে অনেকগুলো নোতুন বাটিক প্রিন্টের নাইটি, হাউসকোট ভরেছে। সবগুলো এসপ্তাহে বিক্রি করতে পারলে ভালো কমিশন হত। কিন্তু ইদানিং ব্যবসার অবস্থা দেখে ভরসা করতে পারছে না। আজ লাল-কালোয় ছাপা যামিনী প্রিন্ট নোতুন শাড়িখানা পরেছে সন্ধ্যা। কারও পছন্দ হলে একটা উৎসাহ আসে। শাড়িও সে তাহলে আনা শুরু করতে পারবে।

নিজের জন্য বাড়ির পাশেই ‘আধুনিক তাঁত বস্ত্রালয়’-এ একটা তাঁতছাপা দেখে রেখেছে সন্ধ্যা। সাদার ওপরে হলুদ-সবুজ মেলানো প্রিন্ট। হাতে একটু পয়সা জমলেই প্রথম ইনস্টলমেন্টটা দিয়ে দেবে। নয়ত কে জানে, নগদ পেয়ে গেলে তার বলে রাখা সত্বেও বিক্রি করে দিতে পারে। যা বদমাশ!


দোতলায় কৃষ্ণাবউদির ঘরে ঢোকার আগে মুখটাকে হাসি-হাসি করে নিল সন্ধ্যা। এই লাল শাড়িটায় তাকে মোটামুটি ভালোই দেখায়। তার রঙ খুব ফর্সা ছিল। তবে আজকাল শুকনো কাগজ-কাগজ। গালের ওপরে মেচেতার দাগ। তেল দিয়ে একটু পেতে চুল আঁচড়ায় সে। কোন্‌ সকালে ছোটো একটু লাল-টিপ দিয়েছিল কপালে, এক-পরত শস্তা লিপস্টিকও। সবই আছে, খালি রোদে শুকিয়েছে সতেজ ভাবটা। তার জায়গায় অসহায় বিষণ্ণতা। সন্ধ্যার শরীরের চড়াই-উতরাই একেবারেই কম। দোকানে যেদিন শাড়ি পছন্দ করছিল, বিকাশ বদমাশটা বলে কিনা,

এত বড়ো শাড়িটা কোথায় জড়াবে গো? তার চেয়ে মিস-ইণ্ডিয়া বনে যাও না! কোথায় লাগবে আইশওরিয়া আর পিয়াংকা চোপড়া।

আর পাঁচজন কাস্টমারের সামনে তার লজ্জাই করছিল। রাগে গা জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল, কষে দুই থাপ্পড় কষায় ছেলেটাকে।

বিকাশদের তাঁত-বস্ত্রালয় এ অঞ্চলে বেশ পুরনো দোকান। ইদানিং যত্রতত্র শপিং কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। সবাই আধুনিক হওয়ার সাধনা করছে। আবাসনের মানুষদের তাই বিকাশের দোকানের মতো দোকানের সাদামাটা জিনিসে মন ওঠেনা।

চিটচিটে ইঙ্গিত থাকলেও বিকশের ঠাট্টাগুলোয় একটু বুঝি আন্তরিকতা থাকে। কষাটে-মিষ্টি। সত্যিই তো, ভীষণ রোগা সে। রোগা না রুগ্ন, কে আর মাপে? তিরিশ-সাইজের ব্লাউজেরও ধার একটু মুড়ে পরতে হয় তাকে। ভাগ্যিস, একখানা বড়ো আয়না কেনার পয়সা তার জমেনা কখনো। বাজে খরচা। যতবার আয়না কেনার কথা ভেবেছে, ততবার খরচের চিন্তা ছাড়া একটা কুটকুটে অস্বস্তি হয়েছে। ছোটো চোখ, গালভাঙা, কান অবধি হাসি – ওতে কেউ আকৃষ্ট হয়না। এমনিই কি আর বয়স বেড়ে বেড়ে গেল?

কৃষ্ণাবউদির ফ্ল্যাটের ভেতরটা ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডামেশিন চলে। জানালা-দরজাতে ভারী পর্দা। বউদিকে দেখতে বেশ ফিটফাট, আঁটসাট। বয়স ধরা যায়না। এই বউদি খুব ভালো করে কথা বলে তার সঙ্গে। পছন্দ না হলে বলে,

আজ আর কিছু নিচ্ছিনা, কেমন?

বউদি একদিন তার পদবী জানতে চেয়েছিল। মিত্র – শুনে বলল,

ও-মা, জানো আমিও বিয়ের আগে মিত্র ছিলাম।

সন্ধ্যা ভেবেছিল, কত ঢঙ, কত যেন আপন। আ-হা, আজ অনেক জিনিস কিনল বউদি। দুটো হাতকাটা নাইটি, একটা টু-পিস নাইটস্যুট। হিসাব মেলাল সন্ধ্যা। সব মিলিয়ে সাতশো কুড়ি। কুড়ি টাকা ছাড় দিল সে। মালিকের বলাই আছে, পাঁচশোর ওপরে হলে, জিনিস বুঝে ছাড় দেওয়া যাবে। ইনস্টলমেন্ট হলে অবশ্য হবেনা।

হাতে-কাঁধে দুটো ব্যাগ তুলে নিয়ে বাইরে পা রাখতেই নিখুঁতভাবে দরজা বন্ধ হয়ে গেল তার পেছনে। আসি বউদি – বলার জন্যে পেছন ফিরে দেখে সুদৃশ্য নেমপ্লেটে জি-বসু, কে-বসু, এস-বসু। মুখটা সামান্য বেঁকাল সন্ধ্যা। তারপর ধীর পায়ে তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে বেল বাজাল। এই দক্ষিণী মহিলা কখনো তার কোনো জিনিস কেনেনা। আজ কে জানে কেন, একটা ম্যাক্সি নিল, একটা হাউসকোটও। সন্ধ্যার বুকের মধ্যে গুড়গুড় আওয়াজ হচ্ছিল। বোধহয় এমাসেই বিকাশের দোকান থেকে পছন্দের শাড়িটা নেওয়া যাবে।


বড় খিদে পাচ্ছে তার। খেয়ে নিয়ে আবার চলা শুরু করবে। আগে আগে টিফিনবাক্সে রুটি তরকারি বানিয়ে আনত। সকালে একমুঠো ভাত খেয়ে বেরোনো। খিদে তো পেয়েই যায়। অবেলায় যখন রুটি তরকারি নিয়ে খেতে বসত, ততক্ষণে ওটুকু পচে ভেপসে উঠেছে। অধিকাংশ দিনই রাস্তায় ফেলে দিতে হত। আজকাল তাই পথেই কোনো দোকানে কিছু খেয়ে নেয়। সঙ্গে গরম চা। খেয়ে উঠে হাতের ঘড়িটা দেখল। একটা চল্লিশ। এখনও ঘন্টা দু-তিন ঘোরা যাবে। দু-একটা নোতুন বাড়িতে যাবে আজ। কলিংবেল বাজাবে। যদি কেউ একটু খোলে দরজা, মিষ্টি করে বলবে ,

সুতির ছাপা নাইটি আছে, হাউসকোট। দেখাব বউদি?

পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছাতে পারলে ভালো হয়। সওয়া ঘন্টার ট্রেন জার্নি। ভীড় হয়ে গেলে বড় কষ্ট হয়।

দোকান থেকে একগ্লাস জল চেয়ে নিয়ে খেল সন্ধ্যা। মুখে মাথায় ছেটাল। আশেপাশে সুলভ নেই একটাও। রাস্তায় তো আর বসে পড়া যায়না। জরুরি হলে তাও কতবার করতে হয়েছে। আজ অবশ্য তেমন বোধ এখনো হচ্ছে না। কিন্তু কোমরের টনটনানি কমছে না। বাড়ি ফিরে ছোট্ট ঠান্ডা ড্যাম্প ঘরটায় শরীর আলগা করতে মন চাইছে। কিন্তু তা হলেই দিনটা বরবাদ। দুএকটা কুকুর তারই মত এদিক ওদিক ঘুরছে অসহায়ভাবে। সন্ধ্যা পায়ের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে। একটা ফ্ল্যাটবাড়ির পার্কিং প্লেসে এসে দাঁড়ায়। দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ক্লান্তিতে চোখ বোঁজে। চারপাশে নেশার মত ঝিমঝিমে দুপুর রক্তরস সব শুষে নিচ্ছে। কত অকারণে চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে আসে ক’ফোঁটা বৃষ্টি। এমন করে কত দিন আর?


ঘন্টাদেড়েক আগে বাড়ি এসে পৌঁছেছে। এসেই দেখে লোডশেডিং। গরম পড়তেই খুব শুরু হয়ে গেছে। ঘরে দুটো সরু সরু মোমবাতি আছে। কেরোসিনেও তলানি। এই সপ্তাহের রেশনে তেল দেয়নি। ওটুকু ঢেলে দিয়ে স্টোভ জ্বালায় সে। চালে ডালে বসিয়ে দেয়। আনাজের ঝুড়ি ঝেড়েঝুড়ে ঝিঙে-ঢেঁড়স-কুমড়ো ভাতে দিয়ে দেয়। একটু সরষের তেল আছে শিশিতে। গা ধুয়ে এসে একটা ধূপ জ্বালিয়েছিল। তার গন্ধটা আছে। একটা ক্যালেন্ডার আছে দুর্গার ছবিওয়ালা। ডানদিকের ছোট্ট জানালাটা খুলে দেয়। হাওয়া নেই, তবু গুমসুম ভাবটা যেন কমে। উঠোনের টিউবওয়েলে পাম্প করার শব্দ আসছে। ওঘরের মঞ্জুবউদি বোধ হয় জল নিচ্ছে অন্ধকারে। এই ছ’ঘরের ভাড়াটের স্নানের ঘরদুটো এই সময়ে খালিই থাকে। এরপর কাজ-কারবার থেকে ফিরবে সব। গা ধোবে খালি গায়ে গামছা লুঙ্গি জড়িয়ে। গলার আওয়াজ পাওয়া যাবে। আজ ভাত নামাতে না নামাতেই এই অঞ্চলে লাইট এসে পড়ল। এতটা সুবিচার রোজ আশা করা যায়না। সুইচ টিপে পুরোন সিলিং ফ্যানটা চালালো সন্ধ্যা। কিছুদিন আগে ভাড়া নিয়েছে ওটা। ঘরের এককোনে একটা শস্তার টেবিল। তার ওপরে তুলে দিল ভারি ব্যাগদুটো। খুব ইঁদুরের উৎপাত তাদের এই ফাটা মেঝে, টালির চালার ঘরগুলোতে।

দরজা খুলে এক বালতি জল নিতে বেড়িয়ে আসে সন্ধ্যা। আকাশটা লাল থমথমে। গাছেদের মাথায় মেঘ ঘন হয়ে আছে। হাল্কা ঝোড়ো হাওয়া মাঝে মাঝে দুলিয়ে দিচ্ছে মাথাগুলো। তাদের উঠোনের মাঝখানে একটা আমগাছ। ফলটল ধরেনা। কবে কে পুঁতেছিল কে জানে, তবে ওটা কাটার কথা বলে না কেউই। এমনিতেও তাদের এই মফঃস্বলের দিকে অনেক গাছ। ঝাঁ চকচকে শহরটার মত অত মর্ডান নয় তারা। অত রসহীনও নয়। উল্টোদিকে মঞ্জুবউদির বাড়িতে আলো জ্বলছে। সে গিয়ে দাঁড়ালে মঞ্জুবউদি বলবে,

আয় না, বোস। চা খেয়ে যা।

সে যায়না। কান সজাগ করে দু’মিনিট দাঁড়ায়। কেউ এসেছে মনে হচ্ছে। মঞ্জুবউদির ভাই বীরেনের গলা। বীরেন আর বউ। বীরেনের সংগে তার একটা সম্পর্ক ছিল। সে অনেক দিনের কথা। আজ আর মনেও পড়েনা। একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে। বালতিটা ওঠাতেই কোমরের ব্যথাটা জানান দিল। আলো-আঁধারিতে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। হাত ধুতে। বীরেন বলল,

কি, কেমন আছিস?

সে বলল,

চলছে আর কী!

বালতি ভরে ঘরে চলে এল। ছোটো আয়নায় চোখ পড়ল। খুব কি খারাপ দেখতে সে? এই ছত্রিশেও তিরিশের মত দেখায় তাকে। অবশ্য শরীর বলে কিছু নেই তার। বীরেনের বৌ কালো, মাংসল। হেরে গেছে সন্ধ্যা।


অনেকক্ষণ একভাবে শুয়ে রইল সে। ভাত ঠান্ডা হয়ে এলেও একেবারে জল হয়ে যায়নি। খেতে বসে দেওয়ালের মা-তারা-স্টোর্স ক্যালেন্ডারে চোখ পড়ল। আজ সাত তারিখ? বাবার মৃত্যুদিন! দেখতে দেখতে দশ বছর হয়ে গেল। তার স্বল্প মাইনের কেরানি বাবা বেঁচে থাকলেও কি তাকে এমন স্বপ্নহীন ছাইরঙা পথে ঘুরতে হত? একা একা? মাধ্যমিক পাশ করার পরপরই তো সেরিব্রাল এ্যাটাকে প্যারালিসিস হল বাবার। সে ভাবেই বেঁচে ছিল ছ’বছর। এঁদো পুকুরে পচতে থাকা আধডোবা বাঁশখড়ের কাঠামোর মত। তাদের ছ’জনের সংসারারটা টাল খেতে খেতে ধ্বসে যাচ্ছিল। ছোটো ভাইবোনদুটো ছাড়া তারা দু’জন এলোমেলো কাজের ধান্দায় ঘুরে মরছিল। শুধু বেঁচে থাকার জন্যে। উঃ, মুহূর্তে আবার লোডশেডিং। হাতের এঁটো শুকিয়ে উঠেছে। উঠতেই হবে হাত ধুতে। দরজায় চাপা খটখট আর মঞ্জুবউদির গলা,

সন্ধ্যা, দরজাটা খোল একবার। তোর একটা চিঠি আছে।

বাড়ির চিঠি - ইনল্যান্ডে। ছ’দিন আগে পোস্ট করা। দাদা লিখেছে। সব খবরাখবর দেওয়ার পর লিখেছে, স্বপ্নার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আটুই পাকা দেখা। পাঁচহাজার টাকা নগদ চেয়েছে। আর ঘড়ি-আংটি-সাইকেল। কনের হাতে-কানে গলায়। চিঠির শেষে মা লিখেছে,

তুই একবার আয়। এলে সব বলব। বুঝতেই তো পারিস সব ব্যাপারে কতটা ভরসা করে থাকি তোর উপরে। সাবধানে থাকিস মা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সে ভাবল ভালই তো। ভালো। স্বপ্নাকে বেশ দেখতে, অন্তত তার চেয়ে অনেক সুন্দর। অনেক ছোটো এই বোনটাকে তো ভালোই বাসে সে। অন্তত এতদিন তো তাই-ই জানত। হঠাত ঝাপসা হয়ে উঠল চোখ। খোলা চিঠিটা অকারণে ভিজতে লাগল। তাড়াতাড়ি ভাঁজ করে রেখে দিল সে। বুকের ভেতরে খুশিগাছটা খোঁজার চেষ্টা করল অনেকক্ষন। কে জানে কবে রোদের ঝাঁঝে জলটল না পেয়ে মরে গেছে সেটা। তারপর মনে হল, কালই তো আট। রবিবার আছে। একটা ছুটির দিনের মতন কাটাবে। ভোরবেলার ঠান্ডা আলো মেখে ট্রেনে করে চলে যাবে মৌরিগ্রাম। সেখান থেকে বাস ধরে দুইল্যা। ওখানেই একটু ভেতরের দিকে তাদের বাড়ি। বাবার শুরু করা ভিতে তার পয়সায় গড়ে ওঠা আধখেঁচড়া দুটো ঘর। একটুকরো জমিতে বাগান, ছোট্ট কুঁয়ো। বাবার কথা মনে হল। অনেক বছর দেখেনি।


এতক্ষণ বাইরে এলোমেলো বাতাস চলছিল। এখন থেমেছে। বড়বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। গাছগুলো প্রাণভরে পান করছে, মাটি শুষছে জলের ফোঁটা। ভেজা মাটির চেনা গন্ধ ঢুকছিল তার ঘরে। চোখ বুঁজে ভাবছিল সে, আজ বেশ বিক্রি হয়েছে। টাকাও আছে হাতে। কাল ভোরে উঠে যাবার আগে বিকাশকে বলে যদি সেই তাঁতছাপাটা... সাদা জমিতে হলুদ-সবুজ প্রিন্ট। দাম পাঁচশো-পঁচিশ। নাঃ, স্বপ্নার জন্যে ওটা ভালো হবেনা। তবে অন্য একটা। সাদা জমিতে লাল-কালো-সবুজ-কমলা ঘন ঘন প্রিন্ট। যেটা প্রথমেই তার চোখ টেনেছিল। পছন্দ হবে তো স্বপ্নার? পাকা-দেখা বলে কথা। সব কিছু ঠিকঠাক চাই, তবে তো! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।


২টি মন্তব্য:

  1. ভেতোরের খুশী গাছেরা যখন আর খুশী ছড়ায় না বাতাসে, তখন তা বাইরেই খুঁজতে হয়

    উত্তরমুছুন