বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

শিপা সুলতানা'র ছুটির লেখা : নিমাই দাঁড়ারে...

হবিগঞ্জ বা সুনামগঞ্জ থেকে আসতেন দেবীর গড়ার কারিগর; কারিগর বলতে যাচ্ছে কে! আমরা ডাকতাম দাদা! বয়স্ক কালো অভাবী হেংলা বুড়োকে দেখলে মনে হত পানি নেমে যাওয়া তিতিক্ষিরে হিজলের গাছ। মেজাজও ছিল মাশাল্লাহ! তাই সামনে দাদা ডাকলেও বাকি সময় বুড়া ঠাকুর। দু-তিনদিন চলে যেত তার শুয়ে বসেই, আমরা ভয়ে ভয়ে দূর থেকে তাকিয়ে দেখতাম যোগাড়-যন্ত্র কিছু হচ্ছে কিনা, দেখা গেলেই যেন চাঁদ উঠলো আকাশে। তার সহকারী থাকত লোকাল কোনো সল্টু টাইপ তরুণ, তার কাছ থেকেই প্রাথমিক খবরাদি পেতাম আমরা। সেই তরুণও তার তিরিক্ষি মেজাজের কারণ ছিল- মায়ের কাজ, পুত পবিত্র হয়ে আসবে, চানটান করে কাজে লাগবি, তা না, খালি এদিক সেদিক।


ধীরে ধীরে মাটি আসে, খড়ের স্তুপ চোখে পড়ে, বাঁশের শলা, কাঠের ঢেলা ওসবও, কিন্তু পাষাণ অন্তর মাষ্টারদের, এখনো দুই সপ্তাহ বাকি স্কুল ছুটির, এই কদিন বাসা টু স্কুল সোজাসুজি না-গিয়ে ঠাকুরবাড়ি হয়ে ঘুরিয়ে যাওয়া আসা হবে, যেতে আসতে দু দন্ড বসে দেখা কাজ কতদূর আগালা। মঞ্চ তৈরী হলো, কাঠের গায়ে খড় লাগলো, এবার কাদা; কাদার তাল ধীরে ধীরে ফুটে উঠবে, পা থেকে শুরু, কোমর পেট বাহু বুক, আমাদের মা খালাদের মত স্তন, চিকন গলা, মুখ, নাক চোখ মাথা, তারপর দুতিনদিন বিরতি, কাদা শুকিয়ে উঠলে রংয়ের কাজ শুরু হবে, তার আগে লক্ষ্মী-স্বরসতি, কার্তিক, গনেশ, অসুর; অসুর বেটার চেহারাখানা যথেষ্ট বদখত হওয়া চাই। এর ভেতর ঝগড়াও লাগে! স্কুলছুটির সারাদিন ঠাকুরবাড়ি থাকা, লুকাচুরি, ফুলগুটি খেলা আর দেবী গড়ার কাজ দেখা; এর ভেতর কারো মার্বেল বা গুটি চুরি হয়ে গেছে, মুহুর্তে সেটা ঝগড়ায় পরিনত হয়; কারো ভগবান ইয়া মোটা তো কারো আল্লাহ দুহাতের বেড়ে জায়গা হয়না; তাহলে ভগবান সুপারি গাছের মত লম্বা, আমার তখন এর চেয়ে বেশি উচ্চতার ধারনা ছিলনা তাই আল্লাহ তাল গাছের মত লম্বা! ততক্ষণে বুড়ো চেতে গেছে- ‘ভাগ ভাগ কইলাম, কথার ছুটে কাজে মন বসেনা, আর আল্লাহ বড় না ভগমান বড়, ওরে আমার বিদ্যানের গুষ্টি...

আমাদের অহংকারের কারণ ছিলো যেখানেই ঠাকুর বসাও না কেনো আমাদের ঠাকুরবাড়ি আসতে হবে, কারণ মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের পৈত্রিক বাড়ি এটি। আমাদের ভাবই ছিলো আলাদা, প্রতিদিন দূর দুরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসছে, গড় হয়ে প্রণাম করছে মায়ের পায়ে, হু হু করে কাঁদছে কেউ কেউ, আমাদের দলকে কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা অবশ্য। হেই হুই বলে মাঝে মাঝে ফরমাস খাটাচ্ছে, মুখের উপর যে তর্ক করব এমন বয়সও নেই, তাই দূরে দূরে থাকি, একদা যে অতলান্ত কোয়ার ভেতর ঝমঝম করে সোনা রুপার থাল পড়ত, গয়নাগাটি, মানসের মুদ্রা পড়ত, তার মুখ পার্মানেন্ট বাঁধাই করে দেয়া হয়েছিলো, আমরা আট দশজন ঝক্ষের মত বসে থাকতাম তার উপরে; শহরের মেয়েদের ভাবই আলাদা, তারা ছেলে-বন্ধুদের বাইকের পেছনে চড়ে, ঝকঝকে টয়োটার দরজা খোলে এমন ভাবে নামত যেন তার বন্ধু না ধরলে এই পাড়াগায়ের ধুলা লেগে যেত তার শাড়িতে, এমন ভাবে হাত ধরত, এমন ভাবে হেসে হেসে বন্ধুর গা ছুঁয়ে দিত যেন উড়ে উড়ে প্রজাপতিটি বসলো হাতের তালুয়। আমাদের দিদি টাইপ কেউ ঠোঁটে মোচড় দিত তখন- ‘টাউনর ফুড়িন ছিনাল অইন’! আমাদের দিদিরাও কম ছিলনা, টেলিভিশনে দেখে দেখে হুবহু নাটকের মেয়েদের মত ডিজাইনের ড্রেস পরে, তেমনি কায়দা করে শাড়ি পরে ছেলেদের মাথা ঘুরাতা। আমরাও তাদের বাহকের কাজটা করে দিয়ে ভবিষৎ পরিষ্কার রাখতাম। সন্ধ্যার পর যেহেতু বাইরে থাকা যেতনা, অপেক্ষা করতাম গভীর রাতের, কোলাহল থেমে গেলে হাজির হত বিধান'দা রা, যত রাত গভীর হত, মাইকের আওয়াজ মিহি হয়ে আসতো, তাদের যেন কী সব কান্না উছলে উঠত বুক জোড়ে- ‘বনমালী গো তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’...

বিজয়া দশমীর ভোর থেকে কারো মুখে তাকানো যায়না, আমরাও মন ভেঙ্গে ভেঙ্গে চুপচাপ চলাফেরা করি, মেয়েরা নাইয়র থেকে যাবার সময় যে মুখ করে গাড়িতে উঠে, তেমনি করে প্রসাদে আনাজ ঢালে, তেমনি করে পাতা ধোয়, গপ করে, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত গভীর হয়, আমরা ছাদে বসে থাকি, ভাদেস্বরের ঠাকুর এলো, ঐতো রনকেলির, ঐতো সাহাদের বাড়ির, তারপর চৌধরিদের, একে একে সব পৌছে গেলে ঠাকুরবাড়ি; ঠাকুর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিসর্জন শুরু, তখন যে উলুধ্বনি তখন যে বিলাপ, পৃথিবীর কোনো বর্ণমালা দিয়ে তার ব্যাখা হয়না। পরদিন ভোরের ঠাকুরবাড়ির বর্ণনা আমি মাঝে মাঝে ঘুমের ভেতর দেখি, তার ব্যাখা পরজাগতিক...

দেশে যাই, অনেক স্বজনদের দেখা হয়না, কিন্তু একদিন হলেও ঠাকুরবাড়ি যাই, রাজবাড়ি থেকে পার্লামেন্ট-এর যে তফাত, ঠাকুরবাড়িও এখন তাই, তবু যাই, খুঁজে খুঁজে পুরাতন তুলসী বেদী পাই, চুপচাপ বসে থাকি, শত বছরের ঝামা পাথরের সিঁড়িতে সিমেন্টের প্রলেপ, পুরাতন মানুষদের পাইনা কিন্তু বুড়ো অজগর মুখখানা বের করে আনে পুবের বন থেকে, ‘যাহ বেটা’ বলেই পেয়ে যাই চম্পা'দি কে, গরিব ও নিম্নবংশীয় পরিমল'দাকে, বিয়ের অপরাধে যার বাবা মা বাড়িঘর ফেলে ওপারে চলে গেছিলেন, আমাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন- ‘শিপা, ও শিপাগো, ও বইন আমার’! আমিও পুরনো কৃষ্ণচুড়ার শিকড়ে বসে দু হাঁটুর ফাঁকে মুখ লুকিয়ে দুদন্ড কেঁদে নেই...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন