বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

হাসান আওরঙ্গজেব-এর গল্প : কুকুর, পাউরুটি ও জামরুল গাছের গল্প

ক্ষুধার জ্বালা এতোটা জঘন্যরকমের নিদারুণ হতে পারে তা চৌত্রিশ ঘন্টা আগেও আমি বুঝতে পারিনি। গতকাল সকাল যখন সাতটা, পাউরুটিতে চামচ দিয়ে জেলি মাখতে-মাখতে আমি ভাবছিলাম সময়টা বুঝি পুনরায় ঘনিয়ে এল। এবার আমাকে আবার বেরুতেই হবে। কায়ক্লেশে কয়টা দিন কাটিয়ে আসবো নিরুদ্দেশ কোথাও। জগত সংসারের পরিচিত কারো সঙ্গে কোন সংযোগ থাকবেনা।
মোবাইল ফোন রিংটোন কিছুই থাকবেনা। জীবনটাকে অর্থহীন ও নিরানন্দ করে তুলবার মত যা কিছু অবশিষ্ট তার কিছুই থাকবেনা। গর্দভের মত জীবনটাকে টেনে বয়ে বেড়ানো আমার কাছে অসহনীয় ঠেকছিলো দিনদিন। পলায়নপরতা বিষয়টা অনেকের কাছে একধরনের কাপুরোষোচিত ধারনা হলেও আমি ব্যাপারটাকে কিছুটা পাত্তা দিয়েছি এজন্যে যে, আমি এটা বিশ্বাস করে এসেছি, ক্রমশ বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠা এই পৃথিবীতে লড়াই করে বাঁচাটাই একটা ভীষণ অর্থহীন কাজ। বহুদিন আগের এমনই একটা স্মৃতি আমার মনে পড়লো যখন আমি শেষবারের মত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাই। একটা দীর্ঘ নিরুদ্দেশ যাত্রার পর একদিন ভোরবেলা অচেনা এক সমুদ্রের তীরে এসে পৌঁছেছিলাম। সেটা ছিল এক গ্রাম্য সমুদ্র সৈকত। সারারাত সমুদ্রে কাটানোর পর জেলেদের মাছ ধরা নৌকাগুলো সৈকতে এসে নোঙর করেছে। মানুষের কর্মচাঞ্চল্য পৃথিবীটাকে ধীরে-ধীরে জাগিয়ে তুলছিলো। জীবনে প্রথম বারের মত সেদিন সমুদ্রে সূর্যোদয় দেখেছিলাম আর ভীষন আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিলাম। মাকে খুব মনে পড়ল। বোনটাকে মনে পড়লো। সূর্যোদয়ের পটভুমিতে সমুদ্রের ওপর শুয়ে থাকা ভোরের আকাশে মায়ের মুখচ্ছবিটা ভেসে উঠল, বোনের ছলছল চোখ দুটো ভেসে উঠল, আর আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলাম।
সেবার আমার নিরুদ্দেশ যাত্রা শেষ হয়েছিল নিতান্তই একটা জাগতিক ভাবাবেগের বশে।
সকালবেলার নাস্তাটা আমি ধীরে সুস্থে কিছুটা সময় নিয়ে সারলাম। তারপর প্রস্তুত হলাম। অফিসের ব্যাগে একটা লুঙ্গি, তোয়ালে আর ব্রাশ-টুথপেস্টের সাথে খবরের কাগজে মুড়ে কিছু পাউরুটিও ঢোকালাম। দরজার কাছে এসে প্রাত্যহিক অভ্যেস মত মানিব্যাগটা খুলে দেখলাম নিরুদ্দেশ যাপনের মত যথেষ্ট টাকা রয়েছে কিনা যা আমার একটি নিরুদ্বেগ ও ভাবনাহীন পলায়নপরতার জোগানদার হবে। মানিব্যাগ খুলে আমি যারপরনাই হতাশ হলাম যখন দেখলাম যে সেখানে একশো টাকার পুরনো দুটো নোট আর কিছু খুচরো কয়েন জবুথবু হয়ে শুয়ে আমার পরিকল্পনাকে উপহাস করছে। টাকা পেতে হলে স্টিলের পুরোনো আলমিরাটা খুলতে হবে, আর সেটা এইমুহূর্তে কিছুতেই করতে চাইছিনা পাছে আমার স্ত্রীর ঘুম ভেঙ্গে যায়! গতরাতের তুচ্ছ দাম্পত্য আহাম্মকিটাকে আমি সাময়িক নিরুদ্দেশের একটা অতি সহজ মওকা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। আলমিরা খোলার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে আর আমার পলায়নপর চেহারাটার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির তাকিয়ে আবার চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বে। সেটা আমি চাইনা।
আমি নিঃশব্দে বিছানার কাছে গেলাম। তার ঘুমন্ত অথচ স্নিগ্ধ মুখচ্ছবির দিকে তাকালাম। আমার মনটা একেবারে প্রশান্ত হয়ে গেল; মনে হল, ঘুমন্ত নারীর চেহারায় একটা চিরায়ত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে আর ঘুমন্ত মানুষের কোন পাপ কিংবা অপরাধ থাকতে পারেনা। ভোরের শান্ত পরিবেশে একটা স্বর্গীয় স্নিগ্ধতা ফুটে ওঠেছে তার মুখের প্রেক্ষাপটে। মনে একটা প্রশ্ন জেগে উঠলো, নিদ্রিত অবস্থায় যেসব মানুষেরা মৃত্যুবরণ করে তারা কি পাপহীন? নিষ্কলঙ্ক? সৌভাগ্যবান? কিংবা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য?
সন্তদের মত ঈশ্বর, মৃত্যু ও পাপ সম্পর্কে একটা পবিত্র ও গভীর ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমি শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে প্রধান দরজা খুলতে গেলাম। শব্দ পেয়ে আমার পালিত কুকুরটি বেরিয়ে এল। অন্যান্য দিন এই সময়ে আমার স্ত্রী এগিয়ে এসে দরজার হাতলটি ধরে এক পায়ে ভর করে শরীরটাকে ধণুকের মত বাঁকা করে মুখে একটা গভীর রহস্যময় হাসি এঁকে তাঁর ঠোঁট দুটো বাড়িয়ে দিত আমার ঠোঁটের জবাবের প্রতীক্ষায়। আমি আলতো করে দ্রুত আমার ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে ‘সময় নেই’ কিংবা ‘ভাল থেকো’ বলে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে পড়তাম। ‘সাবধানে যেয়ো’ বলে সে হাত নাড়তো। পিছু-পিছু কুকুরটি দৌড়ে আসত। গ্যারেজ থেকে মোটর বাইকটি বের করা পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ত আর আমাকে দেখত। তারপর স্টার্ট করে যখন ছুটতাম, কুকুরটিও পিছু পিছু দৌড়ে গলির মুখে মালেকের দোকান পর্যন্ত এসে থামত। আমি লুকিং গ্লাসে দেখতাম সে সামনের পা দুটোতে ভর করে মাটিতে লেজটাকে বিছিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পেছনে যদি রিকশা কিংবা অন্য কোন গাড়ি না থাকে তাহলে কোন কোন দিন আমি তার লেজ গুটিয়ে পশ্চাদ্ধাবন করাটাও লুকিং গ্লাসে দেখতে পেতাম। আর প্রতিদিনই কুকুরটির ফিরে যাওয়া পর্যন্ত নিঝুম সামনের ব্যালকনিতে এসে কুকুরটির প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত।
বেশ বিহ্বল ভাবে কুকুরটি আমার চারপাশে ঘুরতে লাগলো। মুখ উঁচু করে বারবার আমাকে যেন কিছু বলতে চাইছে। সামনের পা দুটো দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে আর নাক দিয়ে ঘন ঘন আমার শরীরের গন্ধ শুঁকে যাচ্ছে। বিরামহীন উদ্যমের সাথে সকাল বেলা অফিসে যাবার সময় অপ্রতিরোধ্য ছোট্ট শিশুরা বাবার সঙ্গে বাইরে বেরুনোর জন্য যেমনটি করে থাকে।
আমি কুকুরটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম। গালে চুমু খেলাম। শাদা পশমে ঢাকা তার অণ্ডকোষে আলতো করে কচলে দিয়ে বলতে চাইলাম, “সোনা আমার, ভাল থেকো, দুষ্টুমি করেনা পাগলু!” সে আমার কোন কথাই শুনতে চাইলনা। দরজার ফাক দিয়ে দ্রুত বেগে বেরিয়ে পড়ল। তাকে দরজার বাহিরে রেখে বেরিয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই আমার নেই যেহেতু নিঝুম এখনও ঘুমিয়ে আছে। তাছাড়া কুকুরটিকে জোর করে ঘরে ঢোকাতে গেলে একটা ধস্তাধস্তি কাণ্ড ঘটে যাবে আর তাতে নিঝুমের ঘুম ভেঙ্গে যাবে নিশ্চয়ই।
অগত্যা সিঁড়ি ভাংতে থাকলাম। মনে মনে পবিত্র ভাবনাটির চাদরে নিঝুমকে ঢেকে দিলাম। কুকুরটি এক দৌড়ে আমার আগেই বেরিয়ে পড়েছে। আমি গ্যারেজ থেকে বাইকটি বের করে প্রতিদিনের মত জল ওঠানোর সুইচটা বন্ধ করে ফেরার সময় দোতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম। “নিঝুম ছাড়া দরজাটা আর কেইবা খুলতে পারে?” আমি ভাবলাম, “সে কি ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছে যে গতরাত্রিটি একটা অপ্রতিরোধ্য ঝড়ের স্মারক হিসেবে যে স্মৃতিচিহ্নটুকু রেখে গিয়েছে তা এখন আমাদের দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত হতে চলেছে?” হ্যাঁ, সেই সব ব্যক্তিগত ঝড়ের অংশবিশেষ, যা শুধু কোনকিছুকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে আপনার দৃষ্টি সীমানার অনেক দূরে।
যাইহোক, এটা ভেবে আমার ভাল লাগলো যে, কুকুরটি তাহলে এবার ঘরে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু আচমকা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার ঘটল সচরাচর যা ঘটেনি। কুকুরটি দৌড়ে দোতলার দিকে গেল আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সজোরে দরজাটা লাগানোর শব্দ শুনতে পেলাম।
মুহূর্তটিকে আমি পালানোর একটা মোক্ষম সুযোগ মনে করে বাইকটি স্টার্ট করলাম।
মালেকের দোকান পেরিয়ে রাস্তার ডানে সরকারী হাসপাতাল। তারপর রামলালের দীঘি। দীঘি পেরিয়ে আমি যখন বাবা হজরত লোটা শাহের মাজার অতিক্রম করছি তখন লুকিং গ্লাসে যা দেখলাম তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। কি করে বিশ্বাস করব বলুন? যখন আপনি দেখবেন আপনার প্রিয় পোষা কুকুরটি সকালের ব্যস্ত সড়ক ধরে সিংহের মত শাদা ও হালকা সোনালি রঙের কেশর দুলিয়ে ক্ষিপ্র বেগে, হাওয়ায় ভেশে ভেশে, পুচ্ছটাকে নাচিয়ে দৌড়ে আসছে আপনার বাইকের পিছু পিছু! নিঝুমের প্রতি খুব রাগ হল। নিশ্চইয়ই কুকুরটা দোতলায় পৌঁছানোর আগেই সে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনটা করা তার ভীন অন্যায়। আমি সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না। গতরাতের দুঃস্বপ্নের অবশিষ্ট স্মৃতিটুকু আমার আপাত শান্ত মাথাটার ভেতরে একটা তীব্র উত্তেজনাকর অনুরণন তুলল। বাইকটি না থামিয়েই গতি কিছুটা মন্থর করলাম। কুকুরটি দৌড়ে একেবারে কাছে চলে এল। সিনেমার একটা অতি নাটকীয় দৃশ্যের মত, একটা দীর্ঘ ক্ষিপ্র লাফ দিয়ে সুনিপুণ দক্ষতায় সে আমার বাইকের পেছনে উঠে বসল আর সামনের দুই পা দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করল।
তারপর... চৌত্রিশটি ঘন্টা কেটে গেল। আমি, কুকুরটি আর আমার বাইকটি- চলেছি পথের সকল অনিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করে। যথেষ্ট পরিমানে খাবার এবং অর্থের জোগান না থাকায় আমাদেরকে কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হল। সূর্যটা জগতের অন্য প্রান্তে তখনো হারিয়ে যায়নি। সন্ধ্যার পটভুমিতে জগতটা যেন দোজখের অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মাথটা ভন ভন করছে আর শূণ্য এবং ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কুকুরটির জন্য খুব খারাপ লাগল। গতরাতের পর থেকে সে এখনো বলতে গেলে তেমন কিছুই খায়নি। তার ক্ষুৎপিপাসার তীব্র স্পন্দন বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগে আমি কিছুটা হলেও টের পাচ্ছিলাম।
খুব অল্পকথায় আমার কুকুরটির চরিত্র বর্ণনা করা যায়না। তবুও আপনাদের বলে রাখি, আমার কুকুরটির নাম মন্টু। আজ থেকে চার বছর আগের কথা। আমার একমাত্র সন্তানটি জন্মগ্রহনের দুইদিন আগে তাঁর মায়ের পেটে মারা যাওয়ার কিছুদিন পর আমি যখন তাকে গলায় একটি সোনালি রঙের টিনের মালা লাগিয়ে ঘরে নিয়ে আসি, তখন তার বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। সেই থেকে এই পর্যন্ত সে আমার প্রতি প্রভু হিসেবে যথেষ্ট সমীহ ও শর্তহীন আনুগত্য দেখিয়েছে। তার চরিত্রের অন্যতম কিছু বৈশিষ্ট হচ্ছে সে খুবই চৌকস, প্রভুভক্ত, ভীশন রকমের শান্ত এবং ভয়ানক ভাবে নির্দয়। তবে আমাদের দুজনের সম্পর্কটাকে প্রভু আর ভৃত্যের সম্পর্কে বন্দি করে ফেললে তাঁর প্রতি অবিচার এবং কিছুটা ভুল মুল্যায়ন করা হয়। হ্যাঁ, এটা বলতেই হবে যে, একটা অন্যরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আমাদের দুজনের মধ্যে। তাঁর শৈশব থেকেই সে চেয়েছে আমি যেন তাঁর প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হই। তাকে আমি আরো বেশি সময় দিই। তাকে ঘরে রেখে বের হয়ে কোথাও যাওয়া, সেটা অফিসে হোক বা অন্য কোথাও- আমার জন্য ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। জরুরি প্রয়োজনে যখন বাজারে যেতাম কিংবা ছুটির দিনগুলোতে ধারে কাছে কোথাও যেতাম, তখন অবশ্যই তাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে নিয়ে যেতে হতো। এভাবেই সে বাইকের পেছনে চড়ে বসাটা রপ্ত করেছে। “আহা বেচারা!” আমি ক্লাচ থেকে বাম হাতটি সরিয়ে পেছনের দিকে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। “নিশ্চয়ই আমরা কিছু ভাল খাবার পেয়ে যাব সোনামন্টু। তখন নাহয় দুজনে পেট ভরে খেয়ে নেব, কেমন!” আমার কথাতে মন্টু সান্ত্বনা পেল কিনা বুঝতে পারলাম না। সকালে আমার ব্যাগে সাকুল্যে দুই টুকরো পাউরুটি আর সামান্য কিছু মাখন ছিল। এই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের দিনে দুই টুকরো গরিবানা খাবারের ওপর আমি অন্য কারো অংশিদারত্ব মেনে নিতে চাইছিলাম না। মন্টুর ক্ষুধার্ত দুই চোখ আমাকে আরো বেশি মানবিক করে তুলতে পারত। মন্টুকে পাউরুটির ভাগ দিতে আমাকে প্ররোচিত করতে পারত তাই আমি তার চোখের দিকে তাকাইনি। আমি যখন পাউরুটিতে কামড় দিচ্ছিলাম তখন মন্টুর লেজ নাড়ানোর গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিল। আমি হলফ করে বলতে পারি, বিশ্বাস করুন, আমি মন্টুর চোখের দিকে তাকাইনি। আমি মন্টুর লেজ নাড়ানো দেখছিলাম আর দ্রুত পাউরুটিতে কামড় দিচ্ছিলাম। আহা বেচারা! বেচারার জন্য আমার খুব মায়া হল। নিজেকে অপরাধী মনে হল। মনে হল যেন ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে নিজের ক্ষুধার্ত সন্তানকে খেতে না দিয়ে স্বার্থপরের মত নিজে খাচ্ছি। কি করব বলুন। ক্ষুধার জ্বালা যে এতোটা ভয়ানক হতে পারে! আমাদের পয়গম্বর ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে পেটে নাকি পাথর বেধে রাখতেন। ছেলেবেলা থেকেই ক্ষুধা লাগলে আমার এই কথাটি মনে পড়ত আর মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেত, পয়গম্বর কি আসলে পেটে পাথর বেধে রাখতেন নাকি পাথর খেতেন? পাথর কি পেটে বেধে রাখা যায়? আর বেধে রাখলেইবা কিভাবে ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে? বিষয়টা আমার বালক মনে নানারকম ধাঁধা ও নেতিবাচক প্রশ্নের জন্ম দিত। মনের ভেতর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে একদিন প্রশ্নটা মাকে করেছিলাম। মা প্রশ্নটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল আর আমার দিকে অবজ্ঞা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল “তওবা তওবা, আস্তাগফিরুল্লা! পয়গম্বরকে নিয়ে সন্দেহ করলে তুমি কাফির হয়ে যাবা বাবা!” আমি বললাম “আমি কাফির হতে চাই না মা”। মা বললেন “আল্লার কাছে ক্ষমা চাও, তওবা করো। তিনি গফুরুর রহিম। পরম ক্ষমাশীল”। ছেলেবেলায় মাতামহের মুখ থেকে শোনা কুকুর ও মনিবের গল্পটিও আমার মনে পড়ে গেল আর আমি যারপরনাই লজ্জিত হলাম। আমি এটা ভেবে অবাক হলাম যে ইতিহাসের পরম্পরায় মনিব আর কুকুরের গল্পগুলো চিরকাল আনুগত্য আর ভীষণ রকমের প্রতারনায় ভরা! কী অদ্ভুত নিয়তি! সেবার এক মুসাফির তার পোষা কুকুরটি সাথে নিয়ে সফরে বেরিয়েছেন। একদিন সকালবেলা দূর দেশের এক অচেনা নগরের কোন এক সরাইখানার পাশে মুসাফির তার কুকুরটি নিয়ে বসে কাঁদছিল। মুসাফিরকে কাঁদতে দেখে জনৈক কৌতুহলি পথচারী এসে জানতে চাইলেন “ক্ষমা করবেন হে পরদেশি মুসাফির। আপনার কান্নার হেতু জানতে পারলে যদি কোন উপকার করতে পারতাম।“ মুসাফিরের কান্না আরো উচ্চকিত হল। কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানালেন “আর বলবেন না ভ্রাতঃ, আজ তিনদিন হল আমার কুকুরটি কিছু খেতে পায়নি। সে দুঃখে আমি মর্মাহত”। মুসাফিরের প্রতি আগন্তুকের হৃদয় করুণায় স্ফীত হল। তিনি ভাবলেন, আহারে, একটি সামান্য কুকুরের প্রতি মানুষের কত ভালোবাসা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, “অপরাধ মার্জনা করবেন হে ভিনদেশি নাগরিক। জানতে পারি কি আপনার ওই কালো থলেটির ভেতর কি রয়েছে?” মুসাফিরকে বেশ হতাশ মনে হল। তিনি করুন কন্ঠে বললেন “যবের আটার তিনটি রুটি আর যৎসামান্য খেজুর”। আগন্তুক এতক্ষন মুসাফিরের সামনে হাটুর ওপর ভর দিয়ে বসেছিলেন। এবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন। উদাস ও বিষন্ন দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকালেন। তারপর চলে যেতে উদ্যত হলেন। দুই কদম আগ বাড়িয়ে কি মনে করে আবার ফিরে এসে মুসাফিরকে বললেন “আবারো ক্ষমা প্রার্থনা করছি হে বিদেশি অতিথি, থলের ভেতরের একটি রুটি কুকুরটিকে খেতে দিলেইতো হয়। মাসুম কুকুরটি ক্ষুধার জ্বালা থেকে মুক্তি পাবে নিশ্চয়”। জবাবে মুসাফিরটি যা বললেন তার জন্য আগন্তুক মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। “রুটি খেতে দিলেতো রুটি শেষ হয়ে যাবে জনাব। কিন্তু আমার চোখের অশ্রুতো কোনদিন শেষ হবেনা”! বলেই মুসাফিরটি বিলাপ করতে লাগলেন।
সন্ধ্যা নেমে এলো। আমরা বহুদুরের সবুজ বৃক্ষ ও ছায়াঘেরা এক গ্রাম্য জনপদে চলে এসেছি। রাস্তার দু’ধারে ঘরমুখো মানুষগুলো কৌতূহল নিয়ে এই অদ্ভুত মোটর আরোহীদের দিকে তাকাচ্ছে। আমি ভাবছি যে করে হোক খেতে হবে। মন্টুকে খাওয়াতে হবে। ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে মন্টু বিদ্রোহ করতে পারে। সেটা হবে আমার জন্য দুঃখজনক ও পীড়াদায়ক ঘটনা। তাছাড়া রাত কাটানোর জন্য থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার বিশ্বাস গ্রামের লোকেরা শহরের মানুষের তুলনায় বেশি মানবিক ও দয়ালু হয়ে থাকে। আমি ছোট একটি গ্রাম্য বাজারের মত মোড়ে বাইকটি থামিয়ে মন্টুকে নিয়ে নেমে পড়লাম। কৌতূহলী লোকগুলো আমাকে ও কুকুরটিকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। তাদের এই শান্ত গ্রাম্য জনপদে হয়তো এমন অদ্ভুত আগন্তুক তারা ইতোপূর্বে দেখেনি যিনি একাধারে একজন শহুরে মানুষ, মোটর বাইকের আরোহী এবং অদ্ভুত পুচ্ছবিশিস্ট শাদা রঙের কুকুরের প্রভু। ধীরে ধীরে আমাকে ঘিরে একটা জটলা তৈরি হল। তারা আমাকে অনেক প্রশ্ন করল। আমার নাম, ঠিকানা, কোত্থেকে, কি করি এসব। লাল-শাদা রঙের আরবি রুমালে মাথা আবৃত মৌলানা টাইপের একজন জানতে চাইলেন আমি খ্রিস্টান কিনা এবং কেনইবা মোটর সাইকেলে করে কুকুর নিয়ে ঘুরে বেড়াই। তিনি আরও বললেন, “শরিয়তে কুকুর বিষয়টাকে নাজায়েজ করা হয়েছে”। আতরের গন্ধ ভেশে আসছিল লোকটার শরীর থেকে। “আলেমগন কুকুরকে শয়তানের প্রতীক ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেননা”। তিনি বলতে লাগলেন। “এটা একটা অপবিত্র প্রানী যার সংস্পর্শে এলে যেকোনো মানুষ অপবিত্র হয়ে যায়। এসব প্রানী থেকে আমাদের সকলের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত”। বেশ শান্ত ও নির্ণিমেষ কন্ঠে তিনি কথাগুলো বলছিলেন আর মাঝে মাঝে জটলা পাকানো গ্রামবাসীদের মুখের দিকে তাকিয়ে উদাসিনভাবে মেহেদি রাঙানো দাড়িতে হাত বুলোচ্ছিলেন। এতে করে লোকটার চেহারায় জগত সম্পর্কে একটা সত্যিকারের নিরাসক্ত ভাব ফুটে উঠলো যাতে করে তাকে বিশ্বাসীদের একজন প্রকৃত প্রতিনিধির মত মনে হল। আমি খুব ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত ছিলাম। তবু প্রয়োজন মত নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছিলাম আর তাতে তাদের কৌতূহল আদৌ প্রশমিত হল কিনা এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারলামনা। আচমকা একটা তরুন বয়সী ছোকরা এসে দ্রুত জটলাটির ওপর প্রভাব বিস্তার করল এবং আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে জটলাটি ভেঙ্গেও দিল। ছোকরাটি জানতে চাইল আমার সাহায্যের প্রয়োজন কিনা।
“হ্যাঁ, আমি একটু পানি খেতে চাই”। কুকুরটির দিকে তাকিয়ে বললাম, “তাছাড়া, আমরা খুব ক্ষুধার্ত এবং রাতে আমাদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই”। ছোকরাটি আমাদেরকে একটি দোকানের সামনের বেঞ্চিতে নিয়ে বসালেন। ছোট্ট একটি ছেলেকে টিউবঅয়েল থেকে জগ দিয়ে ঠাণ্ডা জল আনতে নির্দেশ দিলেন। বনরুটি আর কলা এনে আমার হাতে দিয়ে দোকানিকে চা দিতে বললেন। ছোকরাটির বদান্যতায় আমি মুগ্ধ হলাম। তাকে মনে হল তরুণ বয়সের যীশুর মত। না না, আমার আবার মনে হল, ছোকরাটি বুঝি তরুণ বয়সের নবি মুহম্মদ। যিনি সারাদিন মরুভুমিতে মেষ চড়িয়ে সন্ধ্যায় বাজারে এসেছেন একটু হাওয়া খেতে। মনে মনে আমি তরুণটির নাম দিলাম যীশুমুহম্মদ। আমি আর মন্টু চায়ের পেয়ালায় বনরুটি চুবিয়ে চুবিয়ে খেলাম। পেট ভরে ঠান্ডা জল খেলাম। শান্তি! শান্তি!
সেরাতে আমরা তরুন যীশুমুহম্মদের বাড়িতে আতিথ্য পেলাম। রাতটি ছিল অদ্ভুত সুন্দর চন্দ্রালোকে ভরা এক গ্রীষ্মকালীন রাত। কুয়ো থেকে বালতি দিয়ে ঠান্ডা জল তুলে আমি আর মন্টু স্নান করলাম। শরীর মন এক অপার্থিব স্নিগ্ধ শীতলতায় ভরে গেল। আমার কাছে এই প্রথম দীর্ঘ ক্লান্তিকর ও অর্থহীন অভিমানি এক নিরুদ্দেশ যাত্রাকে অর্থবহ মনে হল। জগত-সংসার-সমাজ-বন্ধন এসবকে তুচ্ছ মনে হল। সংসার বিষয়টাকে মনে হল বিশাল সমুদ্রের মাঝে ভাসমান একটা ছোট্ট সাম্পান নৌকার মত। একটু ঝড় এলেই আমরা ছিটকে যেতে পারি এদিক-ওদিক আর হারিয়ে ফেলতে পারি একে অন্যের হদিশ। নিঝুমকে মনে পড়ল। এটা ভেবে সান্ত্বনা খুঁজলাম যে সেওতো এই মহাপৃথিবীর আর দশটি সাধারন নারীর মতই একজন। তাছাড়া আমি আমার জীবনের সুন্দর কিংবা বেদনাঘন বা ক্লান্তিকর কোন স্মৃতি এখন মনে করতে চাইনা।
খুব সহজেই যীশুমুহম্মদের ছোট্র ও দরিদ্র পরিবারটি আমাদেরকে আপন করে নিল। কৈ মাছের ঝোল দিয়ে আমরা রাতের খাবার খেলাম। খাওয়া শেষে শুকনো সুপারি আর হাকিমপুরি জর্দা দিয়ে পান চিবুলাম। তারপর বাড়ির উঠোনে বিছানো শীতলপাটির ওপর শুয়ে আমরা গড়াগড়ি খেলাম। গাছের ডালপালা শাখা প্রশাখার ফাক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে আমাদের ওপর। মন্টুকে বেশ সুখি-সুখি লাগছিল। আমার পাশে চিত হয়ে শুয়ে পা’গুলোকে শূণ্যের দিকে উঁচিয়ে বিছানায় পিঠ ঘষতে লাগলো। আমি তার ঘাড়ে, গলায়, চিবুকে, পেটে ও অণ্ডকোষে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম মানুষের জীবন কত দ্রুত পরিবর্তনশীল! গতরাতের সঙ্গে আজকের রাতটি কত বেমানান। গতরাতে আমরা এক হিন্দু পুরুহিতের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম যিনি ছিলেন একইসঙ্গে লাজুক স্বভাবের দরিদ্র এবং হৃদয়বান মানুষ আর যার স্ত্রীটি ছিল ঘ্যানঘ্যানে রকমের বিরক্তিকর এবং অতিথিবিমুখ। রাতের খাবার হিসেবে আমাকে দেওয়া হয়েছিল সামান্য কিছু প্রসাদ যা সাধারনত মন্দিরে আগত ভক্তদেরকে বিতরণ করা হয়। মন্টুকে দেওয়া হয়েছিল কিছু এঁটো খাবার এবং খাবারের উচ্ছিস্টাংশ। মন্টু অবশ্য সেটা একবার নাক দিয়ে শুঁকে দ্বিতীয়বার ছুঁয়েও দেখেনি। আমি তাতে খানিকটা কষ্ট পেয়েছিলাম কিন্তু এটা ভেবে সান্ত্বনা খুজলাম যে, একটি সম্পূর্ণ অচেনা পরিবারে গোটা এক রাতের জন্য আশ্রয় পাওয়াটা মোটেও চাট্টিখানি বিষয় নয়।
যীশুমুহম্মদ জলচৌকি পেতে আমাদের পাশে বসলেন। যীশুমুহম্মদের মা হাতে একটি পানের বাটা আর একটি হাতপাখা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন। পাশে কেরোসিনের হারিকেন হাতে তার দশ বারো বছর বয়সী ছোট বোন। আমার কুকুরটি ঘিরে যার অপার কৌতূহল। এই প্রথম যীশুমুহম্মদের মাকে আমি দেখলাম। একজন সাধারন গড়পরতা গ্রাম্য মহিলা। মুখে বয়সের ছাপ। ক্ষয়ে যাওয়া ও রোদে পোড়া মানুষের মত মুখচ্ছবি। বেশ কায়দা করে শাড়ি এবং ঘোমটা পড়েছেন। সমীহ জাগানোর মত মহিলার চেহারা।
আমি উঠে বসলাম। তিনি বললেন, “আমাদের বাড়িতে কখনো আপনার মত অতিথি এর আগে আসেন নাই। তাই কিভাবে অতিথির সেবা করতে হয় তা আমরা জানিনা বাবা। ভুল ভ্রান্তি হলে মাফ করবেন”। মহিলার কথায় আমি যারপরনাই লজ্জিত হলাম। বললাম, “আপনাদের বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়ার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত এবং লজ্জিত। তাছাড়া আপনাদের উপকারের কোন তুলনা হয়না”।
তিনি একটা জলচৌকি টেনে বসলেন। মহিলাকে খুবই আন্তরিক ও হৃদয়বান বলে মনে হল।
কথা বলতে বলতে একসময় তিন সদস্যের এই পরিবারের গৃহকর্তা অর্থাৎ যীশুমুহম্মদের বাবার কথা আমার ভাবনায় এলো। বাড়ির গৃহকর্তা সম্পর্কে একটা স্বাভাবিক কৌতূহল জাগল মনে। তাই জানতে চাইলাম, “আপনার বাবাকে দেখছি না যে? তিনি কি বাড়িতে নেই?”
যীশুমুহম্মদ আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিরুত্তর রইলেন এবং অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দ্রুত তাঁর চেহারায় একটা বিষাদের ছায়া নেমে এল।
“তিনি কি কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন? অথবা চাকুরী করেন বিদেশের কোনো দেশে”?
পুনরায় জানতে চাইলাম আমি। হারিকেনের মৃদুমন্দ আলো তার ডানপাশের গন্ডদেশ ও চিবুকে প্রতিফলিত হল। আমি চকিতে পাঠোদ্ধার করতে চাইলাম তার গন্ডদেশ ও চিবুকের ভাষা। তার মা ও বোনের দিকে তাকালাম। অপরিমেয় এক ভাষাহীনতা নীরবতার ছাপচিত্র এঁকে দিয়েছে তাদের চোখেমুখে। আমি এই নীরবতার অর্থ বুঝতে না পেরে চুপচাপ রইলাম। পরিবেশটা কেমন ভারি হয়ে এল আর নীরবতাটা প্রকট হল। আমি অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরালাম। আমাদের পাশেই ছিল একটা পুকুর। সেখানে অনন্ত নক্ষত্রমন্ডলের মত জোনাকি পোকাগুলো অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছিল। দক্ষিন থেকে উড়ে আসা একরাশ মেঘ চাঁদটাকে ছেয়ে ফেলল আর মুহূর্তে আকাশটা কালো হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা বিলাপ আমার ফুরফুরে অভ্যন্তরটাকে ক্রমশ নিস্তেজ করে ফেলতে লাগল। একটা আধিভৌতিক গ্রামীণ পটভূমিতে আমরা চারজন মানুষ আর একটি কুকুর। গ্রামের অন্যান্য বাড়িগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী একটি বাড়ি। নির্জন। নিস্তব্ধ।
আমার মনে হল, আমি হয়তো একটা যথাযথ প্রশ্ন করতে পারিনি, যা এই নীরবতার জন্য দায়ী। একটি সম্পূর্ণ অচেনা গ্রাম্য পরিবারের কাছে একজন নাগরিক বেশভূষা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছি। কিন্তু বাড়ির গৃহকর্তা সম্পর্কিত প্রশ্নটি হয়তো এই পরিবারের জন্য অপ্রত্যাশিত। আমার অস্বস্তি হতে লাগলো।
যীশুমুহম্মদ এই গুমোট নীরবতা ভাঙলেন।
“আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেনিতে পড়ি। একদিন ভোর বেলা...” এটুকু বলে তিনি থামলেন। তারপর একটু দম নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, “বাবা কাউকে কিছু না বলে আমাদেরকে ঘুমের মধ্যে রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান”।
এবার আমি তার নীরবতার তাৎপর্যটুকু অনুধাবন করতে পারলাম। সারাজীবন আমি এটা বিশ্বাস করেছি যে, প্রত্যেকটি দুঃখময় নীরবতার পেছনে প্রকৃতি রচনা করে রাখে একেকটি বিক্ষুব্ধ বেদনার মূর্ছনা সঙ্গীত। আমি সেই সঙ্গীত মূর্ছনার উপক্রমনিকাটুকু শুনতে চলেছি মাত্র।
“তখনো ভোরের আলো ফোটেনি ভাই”। যীশুমুহম্মদ বলতে লাগলেন। “গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন বাবাকে গ্রাম থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছিলেন। তারপর থেকে বাবার আর কোন খোঁজ নেই। দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর চলে যায় বাবা আর আসেন না!”
যীশুমুহম্মদের কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে ওঠে। সেই কম্পনে বেজে ওঠে এক সুকরুন বেহালার বিষণ্ণ সুর।
“মাঝে মাঝে ঈদগা মাঠের পাশের বড় বটগাছটির মগডালে উঠে দূরের রাস্তার পানে তাকিয়ে থাকতাম বাবার আশায়। কত দিন কত দুপুর এভাবে কেটে গেছে...!” যীশুমুহম্মদ চোখের জল মুছতে থাকেন।
তিনি কি এখনো ফিরে আসেননি? আমি বললাম।
“এভাবে এক এক করে কেটে যায় নয়টি বছর। বাবাকে ছাড়া আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায় নয়টি বছর। আমার মায়ের জীবন থেকে হারিয়ে যায় নয়টি বছর। আমার বোনের জীবন থেকে হারিয়ে যায় নয়টি বছর”।
আমি বললাম, নয় বছর পর তিনি ফিরে এলেন?
“হ্যাঁ, একদিন সকালবেলা বাবা বাড়িতে ফিরে এলেন। বাবার প্রত্যাবর্তনের খবরটা ছিল আমার জন্য অবিশ্বাস্য রকমের আর গ্রামের মানুষের জন্য খুবই চমকজাগানো। আমাদের ঘরে সেদিন গ্রামের সব মানুষ এসে উপচে পড়তে লাগল। ঘরের মাঝের কড়িকাঠের বেড়াটা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হল। আমি ভিড়ের এক কোনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাবার আকস্মিক প্রত্যাবর্তনে হতবিহবল হয়ে পড়েছিলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে বাবা সত্যি ফিরে এসেছেন। বাবা গ্রামের উঠতি বয়সের তরুণ-কিশোর ছেলেমেয়েদের অনেককেই চিনতে পারছিলেন না”। এক অদ্ভুত ঘোরলাগা স্বপ্নগ্রস্ত কন্ঠে কথাগুলো বলে চললেন যীশুমুহম্মদ। কথা বলার এক দুর্দমনীয় উদ্যম যেন পেয়ে বসেছে তাঁকে।
“রুলামিন কাকার ছেলে সোহেলকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা?
সোহেল বলল, আমারে ভুইল্যা গেছেন জ্যাডা! আমি না আমনের চাচাত ভাই রুহুল আমিনের ছেলে সোহেল!
বাবা বললেন, ও তুমি রুলামিনের ছেলে! কত বড় হয়ে গ্যাছো! আমি চিনব ক্যামনে!
তারপর জিসান কে বললেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা?
তারপর এমদাদকে বললেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা?
তারপর কালামকে বললেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা?
তারপর এবাদুলকে বললেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা?
তারা সবাই এক এক করে তাদের পরিচয় দিল। বাবাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফিরে আসার আনন্দ বাবার চোখেমুখে দেখতে পেলাম। তিনি খুব তাড়াহুড়ো করছিলেন”।
এটুকু পর্যন্ত যীশুমুহম্মদের চোখে মুখে ও কন্ঠস্বরে উদ্যম ও প্রত্যয়ের যে গভীর ব্যঞ্জনা পরিলক্ষিত হল তা ধীরে-ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলো। “তারপর......” যীশুমুহম্মদ থামলেন। একটা গভীর বিষাদের ছায়া নেমে এল তার কণ্ঠস্বরে আর তা খানিকটা নিম্নগামী হল। তার মা ও ছোট বোনের দিকে তাকালেন। ছোট বোনের চেহারা আপাত বিষণ্ণ হলেও তার চোখে কোন অশ্রু ছিলনা। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই তার শৈশবের সুন্দর দিনগুলো পিতার হারিয়ে যাওয়া আর তারপর পিতাকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ততোটা নিরুদ্বেগ ছিলনা। আহা, কি সুন্দর মেয়েটি! একহাতে হারিকেনটি ধরে এখনো বসে আছে আর আমার কুকুরটির দিকে তাকিয়ে আছে। যীশুমুহম্মদ তার মায়ের মুখের দিকে তাকানোর আগেই তিনি অন্য দিকে মুখটা সরিয়ে নিলেন। “তারপর তিনি আমার কাছে এলেন”। যীশুমুহম্মদ বলতে লাগলেন। “আমাকে একদম চিনতে পারেন নি। বললেন, তুমি যেন কার ছেলে বাবা”?
“জানেন, আমি সেই মুহূর্তটির কথা” যীশুমুহম্মদের কন্ঠ ভিজে যেতে লাগলো “কোনোদিন ভুলবনা”। বাবা আমাকে আবারো বললেন “তুমি যেন কার ছেলে বাবা? তোমার বাবার কি নাম?” আমি তখন ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হতবিহবল হয়ে পড়েছিলাম যে বাবাকে কি বলবো সেটাই ভুলে গিয়েছি। আমার এটাও মনে আছে, বাবার প্রশ্নটা বারবার শুনে আমার খুব রাগ হচ্ছিলো। আমি ভাবলাম, আমি কি এটা বলবো যে, দীর্ঘ নয়টি বছর সন্তান সন্ততি আর স্ত্রীকে ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়ে নিরুদ্দেশ থেকে যে লোকটি ফিরে এসেছে আমি তার ছেলে? এক ভীষণ অভিমান আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আচমকা কে যেন চিৎকার করে বলল “কাকা, এটা আপনার ছেলে ইব্রাহীম। আপনি তাকে চিনতে পারছেন না?”
“মাথাটা ঘুরিয়ে বাবা একবার লোকটার দিকে তাকালেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু পারলেননা। বাবা মুহূর্ত খানিক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। উন্মাদের মত একটা চিৎকার করে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার মনে হল বাবা বুঝি সত্যি পাগল হয়ে গেছেন। নয় বছর আগের বাবার যত স্মৃতি ছিল সব মুহূর্তের মধ্যে এক এক করে মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগলো। বাবার শরীরের সেই গন্ধটি আমি পেলাম যে গন্ধটি নয় বছর আগে আমি হারিয়েছি। বাবার বুকের ওপর শুয়ে যে গন্ধটি আমি নাক দিয়ে শুঁকতাম!”
“এখনো মনে হলে ভাবি, সেদিন আমি কত বোকা ছিলাম”! আচমকা যীশুমুহম্মদের মা বলে উঠলেন। “সেদিন আমি আ্মাদের বড় লাল রাতামোরগটি রান্না করেছিলাম। খাবারের ঘরে মাদুর পেতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা খেতে বসেছি। তিনিও বসেছেন। আমি কতোটা বোকা ছিলাম সেদিন! আমি কতোটা বোকা ছিলাম!” তিনি স্বগতোক্তি করলেন। “মনে হলো এইতো দুদিন আগে তিনি কোথাও গিয়েছিলেন আবার যথাসময়ে ফিরেও এসেছেন! ভাল মাংসগুলো ওনার বাসনে তুলে দিতে আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। রানের মাংস দুটো সবসময়ের মত ইব্রাহীম আর মরিয়মের পাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমার মানিকেরা মাংসের টুকরো মুখে দেয়নি। বাবার পাতে মাংস তুলে দিতে দিতে ছেলেটা আমাকে ধমক দিয়ে বলল- কতদিন পর বাবা এসেছে তুমি দেখোনি? খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন। খাবার নিয়ে তিনি কোনো অনুযোগ করতেন না। এটা বড় লজ্জার বিষয় ছিল। তিনি কি ভেবেছিলেন সেদিন আমি জানি না”।
দুর্দশাগ্রস্ত এক পলায়নপর পথচারীকে যে পরিবারটি সন্ধ্যার পূর্বে নিতান্তই মানবিক কারনে আশ্রয় দিয়েছিল নিশ্চয়ই তাদের সেই অচেনা পথচারীর হৃদয়ের খবর নেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলনা। এটা সত্য যে, এই পৃথিবীতে কত ঘটনাইতো নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে মহাকালের কোনো না কোনো অন্তরসুত্রের পরম্পরা রক্ষা করে চলে। যদিও ইব্রাহীমের পিতার দীর্ঘ নিরুদ্দেশের সাথে আমার মত একজন নাগরিক মানুষের আপাত গা’ঢাকা দেয়ার তেমন কোন সামঞ্জস্য নেই কিংবা এটা সেরকম কোনো তাৎপর্য বহন করে না। তবুও, একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ এক অপাংক্তেয় বেদনার সঙ্গে মিলেমিশে আমাকে বিমুঢ় করে দিল। কত সহজে, কত অবলীলায়, একজন সম্পূর্ণ অচেনা আগন্তুকের কাছে একটি পরিবার বর্ণনা করে চলেছে- পুত্র তার পিতার, স্ত্রী তার স্বামীর দীর্ঘ নিরুদ্দেশ ও প্রত্যাবর্তনের বেদনাক্লিষ্ট গাঁথা! আর নিয়তি এমনি এক নিদারুণ খামখেয়ালি পূর্ণ ছেলেমানুষের মত, যে কিনা আমাকেই নির্বাচন করলো, যে আমি আজ দুদিন হতে চলল স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত পরিমন্ডল থেকে কোনরুপ পূর্ব ঘোষণা ও অবহিতকরণ ছাড়াই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এগিয়ে চলেছি এক উদ্যেশ্যহীন ভবিতব্যের দিকে। হায়!
কুকুরটা ততক্ষনে ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্লান্তিহীন নিবিড় এক প্রশান্তির ঘুম। দক্ষিন থেকে উড়ে আসা মেঘগুলো চলে গেছে উত্তরের কোনো গ্রামে। চাঁদটা যেন অন্ধকারের ভেতর একটা মহাজাগতিক আলোকোজ্জ্বল আয়নার মধ্যে  ভেসে বেড়াচ্ছে। চাঁদটার দিকে তাকাতেই মনে হল আমি যেন এক দীর্ঘ আত্মগ্লানির পর নিজেকে ফিরে পেতে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই এবার এই বেদনাঘন প্রত্যাবর্তনের গল্পের যবনিকাপাত হবে আর নতুন করে শুরু হবে দীর্ঘ নয় বছর পর একটি পরিবারের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
জলচৌকি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হারিকেনটা হাতে নিয়ে তরুন ইব্রাহীম আমার হাত ধরে বললেন, “চলুন ভাই, আমার সাথে চলুন, জানিনা কোথায় আপনার বাড়ি। কোন উদ্দেশ্যে আপনি আজ ঘরছেড়ে পথে এসেছেন। আমরা তাঁর কিছুই জানিনা। আমার সাথে চলুন। আপনাকে আজ সব খুলে বলবো। সব”।
আমি ইব্রাহীমকে অনুসরন করলাম। ইব্রাহীমের বোন আর মা উঠে ঘরের দিকে চলল। আমরা চললাম পুকুরপাড়ের বাগান ও ঝোপঝাড় ঘেরা পথ ধরে বড় রাস্তার দিকে। “বাবার সব স্বপ্ন ছিল এই বাড়িটাকে ঘিরে। এই বাড়ির সবগুলো গাছ বাবার হাতে লাগানো। বিকেলবেলা কোন কাজ না থাকলে বাবা এই পুকুরপাড়ে বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। বাবার খবরের কাগজ পড়ার খুব শখ ছিল। কিন্তু এই গ্রামদেশে খবরের কাগজ কি আর সব সময় মেলে? বাজার থেকে পুরনো কাগজ কেজি দরে কিনে আনতেন”। পুকুরঘাটের মত পুরোনো পরিত্যক্ত একটা জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যীশুমুহম্মদ বললেন, “তারপর এখানে বসে বসে পড়তেন। এইযে বাতাবি লেবুর গাছগুলো দেখছেন, এগুলো সব বাবা লাগিয়েছেন। এইযে পেয়ারা গাছগুলো দেখছেন, এগুলো বাবা রথের মেলা থেকে কিনে এনেছিলেন। সারাদিন তিনি গাছ নিয়ে পড়ে থাকতেন। গাছ লাগাতেন। গাছের চারায় পানি দিতেন। গাছের যত্ন করতেন। গাছ ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। বলতেন, গাছ হল আমাদের মা। খোদার সত্যিকারের বান্দারা মাকে তাঁর হক থেকে বঞ্চিত করেন না”। বলতে বলতে ইব্রাহীম পুকুরের শেষ প্রান্তে এসে থামলেন। চারিদিকে গাছপালা আর ঘন ঝোপঝারে ঘেরা জায়গাটা একটু বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন। হারিকেনটা উঁচিয়ে ধরে ওপরের দিকে মাথার কাছাকাছি নেমে আসা একটা গাছের ডাল ধরে সে আবার বলতে লাগলো, “এইযে এই গাছটা দেখতে পাচ্ছেন এটা হল জামরুল গাছ। যে বছর আমার দাদি মারা যান, সে বছরের কথা। বৃদ্ধ বয়সে নানা রকমের রোগশোকে ভুগে মারা যান তিনি। মারা যাওয়ার আগে শেষবারের মত জামরুল ফল খেতে চেয়েছিলেন। বাবা দাদির জন্য জামরুল ফল কিনে এনেছিলেন। কিন্তু দাদি তাঁর অন্তিম মুহূর্তের ফল মুখে দেওয়ার আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। সেই ফল আর বাবা কাউকে খেতে দেননি। দাদির অন্তিম ইচ্ছার স্মারক হিসেবে তিনি জামরুল ফলের বীজগুলো এখানে লাগিয়েছিলেন। সেই বীজ থেকে এই গাছটা হয়েছে”। বলতে বলতে ইব্রাহীম আমার হাতে হারিকেনটা ধরিয়ে দিয়ে জামরুল গাছটায় উঠতে লাগলেন। আমাদের মাথার ওপর একটা দীর্ঘ শাখার যে ডালটা নেমে এসেছে তাঁর ওপর উঠে বসে আমার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন- “হারিকেনটা আমার হাতে দিয়ে আপনিও উঠে আসুন ভাই”। ভূতগ্রস্ত মানুষের মত আমি শুধু ইব্রাহীমকে অনুসরন করে যাচ্ছিলাম আর তার নির্দেশনার অপেক্ষা করছিলাম। হাতটা উঁচু করে হারিকেনটা তাঁর হাতে দিয়ে আমিও বেয়ে বেয়ে গাছে উঠে পড়লাম। “রশিটা এখানে বেধেছিলেন তিনি”। আমরা ডালটির যেখানে বসে আছি সেখান থেকে আরেকটি ছোট উপডাল উপরের দিকে উঠে গেছে। ডালটির গোড়ায় হাত রেখে ইব্রাহীম বলল, “দেখুন, রশির দাগটা এখনো রয়ে গেছে”। আমি ডালের দাগটার দিকে তাকালাম। “বাবা ফিরে আসার তিন মাস পর একদিন ভোরবেলা দেখি এই ডালটাতে বাবার নিথর দেহটা ঝুলে আছে”।
তখন রাত শেষ প্রহরে নেমে এসেছে। পাশের একটা পুরোনো আমলকী গাছ থেকে কয়েকটা পাখি ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে  চলে গেল দুরে। দীর্ঘ সময় ধরে আমি খুটিয়ে খুটিয়ে ডালটাকে হাত দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকলাম। গভীর অভিনিবেশের সাথে আমি দেখতে থাকলাম। ডালে রশি দিয়ে বাঁধার কারনে সৃষ্ট দাগটা আমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। এমন ভাবে দেখতে লাগলাম যেন গাছটা ব্যথা না পায়। এমন ভাবে দেখতে থাকলাম যেন সেখানে লেখা রয়েছে ইব্রাহীমের পিতার পুরোটা জীবন। আমার সুবিধামত ইব্রাহীম হারিকেনটা ধরে রাখল যাতে আমি ঠিকমত দেখতে পাই আর ঠিকমত পড়তে পারি তার সমগ্রটা। আমি ইব্রাহীমের পিতার জীবনটা পড়ে যেতে থাকি আর একটার পর একটা পাতা ওল্টাতে থাকি।
পড়তে পড়তে আচমকা একটা পৃষ্ঠায় এসে আমি থমকে যাই। আমি আবিষ্কার করি, ইব্রাহীমের পিতার জীবনটাই ছিল আমার জীবন কিংবা আমার জীবনটাই ছিল ইব্রাহীমের পিতার জীবন।
তারপর আমি আবারো পড়তে থাকি আর ওল্টাতে থাকি- পাতাগুলো। ইব্রাহীমের পিতার জীবনের পাতাগুলো।
......................................................





লেখক পরিচিতি
হাসান আওরঙ্গজেব 
হাসান আওরঙ্গজেব মূলত কবি। তার কবিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। কিছুটা বোহেমিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় আপাতত ইতি টানেন, চলে যান জাহাজের নাবিক হতে। কিছুদিন সমুদ্রে কাটিয়ে মাটিতে ফিরে আসেন। মাটি তাকে আর ছাড়ে না, কবিতা তাকে টানে। বর্তমানে চাকরিসূত্রে সিলেটে বাস করছেন। জন্ম চাঁদপুর জেলার কচুয়া গ্রামে, ১৯৮৬ সালে।     

৩টি মন্তব্য:

  1. পড়তে পড়তে মনে হল ইব্রাহিমের পিতার জীবন কিংবা ইব্রাহিমের জীবন -- দু টাই আমার।

    উত্তরমুছুন
  2. পড়তে পড়তে মনে হল ইব্রাহিমের পিতার জীবন কিংবা যীশুমুহম্মদের জীবন -- দু টাই আমার।

    উত্তরমুছুন