বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

পিয়াস মজিদের গল্প : বেঁচে থাকা সরণি

উড়ছে, পুড়ছে, ডুবছে, জ্বলছে, নিভছে। চারপাশে। এই নিখিল নিমজ্জন আর প্রজ্বলনের পর্বে আমিতো কেউ নই। একটি ঘুমের শেষে শুধু আরো একটি, কয়েকটি, অজস্র ঘুমের অপেক্ষা।

পাঠক, টিভির সিরিয়াল-মেগাসিরিয়ালে তো আপনারা বিজ্ঞাপন দেখেন বিনা প্রতিবাদে। তাই অনুরোধ, গল্পটার ফাঁকে একটা কবিতা শুনুন-


দূরে মুথাঘাস, পাথরচেতনা।
বাতাসে বাতাসে শাহানা বাজপেঈ
তোমার খোলা হাওয়া...
একদিন ওয়ান ইলেভেন।
আরেকদিন
চাকমা বান্ধবীর গোপন বিষাদ।
সকালে কালো কফি
সারারাত জৈবিক ভূগোল
জাগরণে বিভাবরী
পায়ে ভূমিহীনতা
স্বপ্নে পুষ্পকরথ।

না, চাঁছাছোলা হওয়া যেন তার স্বভাবে নেই। রক্তে -মাংসে লেপ্টে আছে পেলব স্নিগ্ধতা। গল্প তো সে লিখতে পারে না। তবু চিন্তা করেছে কখনো যদি কোন গল্প তার হাত দিয়ে আসে তবে রশীদ করীমের সেই লাইনের মতই হবে তার সূচনা ‘আমি লোকটা আসলে একটা খচ্চর’। জীবনযাপন করবে বিশুদ্ধ খচ্চরের কিন্তু গল্প লিখতে গেলেও চলে আসবে নষ্টালজিক কবিতা; বাঙালি মধ্যবিত্তকেই মানায় এমন হিপোক্রোসি।

এই নিশীথের রক্তাবশেষ। একে শুষে নিতে পারি একমাত্র আমি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, দামিনীর হতশ্রী, ধাতব বাতাস মিলেমিশে যে পরিস্থিতি তাকে আমার শতসহস্র পা-ছোঁয়া কুর্নিশ। জানি সুনামির পর আছে সিডর, সিডরের পর নারগিস। তার পর আবার সুনামি, সিডর; সিডর-সুনামি; নারগিস-সিডর...। এইভাবে উড়ে যাবে অনন্তের পাখি। তবু রাহাত খান লিখবেন না আর আগের মতো করে। মাহমুদুল হক হবেন স্তব্ধ। সুযোগে আমার ন্যায় অক্ষমরা শুরু করবে গল্প।

আমার বোন রূপা। ছোটবেলায় বলতো- ‘দ্যাখ। বড়লোকি রোগে মরে যাওয়ার একটা আনন্দ আছে।’ হ্যাঁ, তাই বুঝি ভাবতে ভালো লাগছে যে আমি সিজোফ্রেনিয়ার রোগী। ডাঙ্গায় হাঁপিয়ে উঠেছি এবার জলের গভীর যাব, মাছের মহলে। না কেমন কাব্য কাব্য লাগছে।

পোয়েটিসিজম গল্পের প্রধান শত্র“।

কোন সম্পাদকই এই ধরনের গল্প ছাপতে উৎসাহী নন। সাবধান। শীতের মধ্যে, শীতকালীন সব খাদ্য পুষ্প এবং অসুখের সঙ্গে থেকেও আমি শুনি বর্ষা। শুনি মল্লার। একটু একটু করে পাগল হয়ে যাই। ডাকছে--রাঁচি, হেমায়েতপুর।

হিমা, পাগলামি আর স্বাভাবিকতার মাঝে কি সত্যি কোনো ভেদ আছে! ফুকো বলেন, ‘নাই।’ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্ররা বলেন ‘পাগলা বিদ্রোহ চাই’। আমরা চাই, আমরা চাই না। অকাল-বৃষ্টিতে হঠাৎ ভেসে যায় সব।

আবার সঙ্কট। গল্পহীনতা। মৃত বকুলের ফোঁপানি। কিন্তু মাথায় হাজার-লক্ষ গল্প। বিপন্ন রক্তাক্ত সামন্ত অবশেষে দূর হচ্ছে। এখন তবে পুঁজি গঠনপর্ব। পাতি হলেও বুর্জোয়ারা জাগছে। এইবার গল্পটার সঙ্গে শুরু তাদের দ্বন্দ্ব। নির্বাচনী তফসিল, কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি, দুর্নীতির বন্যা, কাফকার কয়েদ কলোনি, শান্তিনিকেতনের স্মৃতি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আসন্ন বিসিএস প্রমুখ নানান বিষয় থাকলেও গল্পটা যাচ্ছে অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের দিকে।

গল্পটা আপাতত শেষ হতে পারে তবে মাঠে মাঠে তার অনন্ত কঙ্কাল...


রিম ঝিম রিম
এবার বর্ষাটা কেমন যেন! হুটহাট বৃষ্টি এসে চলেও যায় হুটহাট। কোন কুহক নেই, দীর্ঘ মেঘ করে আসা নেই; ফলে কালো মেঘের বিদ্যুতের তালে তালে মন কেমন করা অনুভবও নেই। অথচ আশৈশব আমি ভালোবেসেছি বৃষ্টির চেয়ে বৃষ্টিপূর্ব প্রাকৃতিক প্রস্তুতিকে। বৃষ্টি এলেই তো সব রহস্য চুরমার হয়ে গেল আর রহস্য চুকে গেলে কী মূল্য উজ্জয়িনীর, কালিদাসের, মেঘদূতের? প্রেম যেমন জীবনে আমার। প্রেম এসে যাচ্ছে এই অনুভবটাই আনন্দের কিন্তু এসে গেলেই তো শেষ হয়ে গেল। তাই এ জীবনে প্রেমের কুঁড়িগুলো পরিচর্যা করে ফুলে রূপান্তর করা হলো না। কিন্তু তাতে কি ? প্রেমঘন অনুভব নিয়ে মন্দ তো নেই আমি। রফিক আজাদ বলে রেখেছেন বর্ষণে-আনন্দে মানুষের কাছে যেতে। আচ্ছা, জনতায় কি বর্ষাময়ূরী পেখম মেলে?

হ্যাঁ, আজকাল অবশ্য মিলতেও পারে। যেই হারে আইসিডিডিআরবিতে পানিবাহিত রোগীর ভিড় হয় তা দেখে তৃষা সেদিন ভুল বলেনি যে বর্ষা এখন একটা জলজনিত শহুরে সমস্যায় পর্যবসিত। তবে আমি লোকটা মোটের উপর যেহেতু নিজস্ব নির্জনতাকে অলংকারে মুড়ে রাখতে অভ্যস্ত সেহেতু নিজের প্রাণমহলের বারান্দায় বসে বর্ষাযাপন করতে চাই। কিন্তু একটা গল্প লেখার জন্য বর্ষা আমাকে আলাদা করে সময় দেয় না। কারণ অনেক সামাজিক সম্পৃক্ততায় সময়ক্ষেপ হয় বর্ষার। ঊষর ফসলি জমিকে আর্দ্র করে তোলা আমার মত মধ্যাহ্নের অলস গায়ককে দু’ফোঁটা ভিজিয়ে দিয়ে যাওয়ার চেয়ে ঢের দরকারি তার কাছে। ঠিক এই জায়গাটিতে আপত্তি আমার। বর্ষা কি প্রয়োজনের তন্তুতে বাঁধা থাকবে চিরকাল নাকি মন থেকে ধানক্ষেতে একই ধারায় বেজে যাবে! এই প্রশ্নের উত্তর যে দেবে সে অবশ্যই আমি নই। কারণ আমার সব রুখাসুখা প্রশ্ন-উত্তর তো ভেসে গেছে অঝোর শ্রাবণে। কেঁদেও পাবে না তারে বর্ষার অজস্র জলধারে। বৃষ্টির সন্ত্রাস আমাকে দিয়ে গেছে সোনালি নিঃস্বতা। এখন জীবনের খরা-উপদ্রুত উপকূলে বসে ভাবছি এই জুলাইয়ে হ্যামলেট কী বলেছিল ওফেলিয়াকে। হা হা, আজ রাতে কাব্য এল মোর মনে; জুলাই মাস / তেরছা বৃষ্টি / মেঘের হামলায় ত্যক্ত আকাশ / কোথায় পাব আমার স্নানের সাবান?

হুম; তৃষা বলেছিল সেই বৃষ্টিব্যস্ত দুপুরের পর- বর্ষা এলে সাবানগুলো কেমন পানিতে থিক থিক করে, ঘেন্না হয় আমার। তৃষার ঘেন্না কার প্রতি ছিল আসলে ? সাবানটা তো অজুহাত মাত্র। বর্ষায় ইতিউতি জমে ওঠা শ্যাওলাপ্রতিম পাপের প্রতিই যে ইঙ্গিতটা তা বুঝতে বেগ পেতে হয়না আমাকে কারণ এই পাপে যোগ আছে আমার। আসলে পাপের পদ্মপুরাণ খুলে বসা ব্যতীত আমার কোন বর্ষাকতব্য ছিল না কি এবার ! তবে বলি শাওন রাতের সেইসব অভিসার একলা ছিল না। ছিল না মানে কি একলা আবার অভিসার জমে নাকি কি। একজন গাবে খুলিয়া গলা আরেকজন মনে মনে তবেই না রিমঝিম রজনী বিকশিত হবে পূর্ণ শ্রাবণকলায়। দেখে যাও বিভাবরী তার; দু’টা উঁচা উঁচা পাহাড়।

বর্ষা চলে গেল। তৃষার ফেসবুক- টুইটার সব বন্ধ। সংযোগবিরহিত আমি বসে বসে ভাবি তৃষা কি তবে ছিল বর্ষাবাহিত ফুলমাত্র? না না, ফুলের তো মৃত্যু হলেও শুকনো পাপড়ি থাকে স্মৃতি হয়ে। তৃষা তবে কাদাপানির ভিড়ে বেঁচে যাওয়া একটা নিঝুম মল্লার। বর্ষা চলে গেলেও বাকি বছরটার নির্জন রাত্রিদিন যে ভরে তোলে অপার নিঃসতার বিধুর ধ্বনিতে।

শীত-গ্রীষ্ম-বসন্ত ভুলে বৃষ্টির নামতা গুনি;
রিম ঝিম রিম। তুমি শুনছো তো ?


ঝরাপাতা জয়ন্তি

শুধু সমুদ্রে যাবার লোনা অভিলাষ ছেলেটার। অদ্ভুত রকমের যৌনতা¯পৃষ্ট সে, নারীর বদলে তার জলযোনি দেখার সাধ। উপকূলে যখন শতে-হাজারে মানুষ মরছে তখন সে সন্তর্পণে ঢুকে পড়ে সমুদ্রহাওয়ায়। আগের রাতে সাথে ছিলেন আঁরি বারবুস। তাঁর নরকে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে মনে পড়তে লাগল হিমার কথা। ফুল এনে দিলে যে বলত ‘তুমি একটা মাছের ব্যাপারী’। কুচ্ছিত! আচ্ছা নিকিরি বললেও তো পারত, মেয়েটা কেমন রুক্ষ ধাতের ছিল। ছেলেটার যে রুক্ষতার বড্ড অভাব। এজন্যেই হিমার সাথে তার হল না। হবার না, কারণ হিমা তো রৌদ্রকান্তা। ভুল করে নাম হয়েছে হিমা। আজকের এই সমুদ্র অভিলাষের পেছনে আছে হিমার প্রতি মধুর জিঘাংসা। হিমার প্রতি, নিজের প্রতি, জল ও অগ্নির প্রতি, সার্সন রোডের ধুলো-বালি ও দীর্ঘশ্বাসের প্রতি। সার্সন রোডেই কী দেখা হয়েছিল হিমার সাথে? মনে নেই, তবে এটুকু ভোলা যায়নি যে একসাথে সার্সন রোড থেকেই হাঁটতে শুরু করেছিলাম কমনওয়েলথ যুদ্ধসমাধির দিকে। আচ্ছা মাথায় কি তখন ছিল সন্দীপনের কথাবার্তাগুলো? কোথায় যে বলেছিলেন তার অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসে কবরস্থানে প্রেম দেখানোর কারণ সমস্ত মৃত্যুকে উজিয়ে এই প্রেমই সত্য। কি জানি! তবে সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল একটা এপিটাফ দেখে। নিহত এক সৈনিকের স্ত্রী লিখেছে

‘শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো; পুনরায় দেখা হবার আগ পর্যন্ত’। না, জনম জনমের নিদ্রা-কেচ্ছায় আমার রুচি নেই। তাই ঘুমাবনা, সমুদ্রে যাব। আকিরা কুরোসাওয়ার ড্রিমস দেখব। ছবির ভেতর ঢুকে যাবে দর্শক। শিল্পীর নিজ হাতে আঁকা চরিত্রারা যখন জীবন পাবে তখন তারাই ভ্যানগগকে ‘পাগল’ বলে হাসাহাসি করতে থাকবে। আচ্ছা, এখন মানুষের মুখ থেকে প্রলাপ বেরুয় না কেন? শুধু নীতিকথা, উপদেশ, পরামর্শ, শুভকামনার মচ্ছব। ঘেন্না ধরে গেছে। হিমা, দাও আমার কণ্ঠে শতকের শ্রেষ্ঠ প্রলাপ। তানসেন তো সুর দিয়ে বৃষ্টি নামিয়ে ফেলতেন। আমি অন্তত তোমার ধু ধু মাঠে বইয়ে দেবে সবুজ ঘূর্ণি।


সমুদ্র দিয়ে শুধু হয়েছিল, কোথা থেকে চলে গেছি কোথায়। এমন প্রক্ষিপ্ত, নিরর্থ! অবশ্য কোন বিষয়েরই কি প্রকৃত বিচারে অর্থ আছে, শৃঙ্খলা আছে?

নভেম্বর শেষের দিকে। ঘনিয়ে আসছে ডিসেম্বর। জানালার পাশে বিচিত্র গাছগাছালি, পাতা শুকোচ্ছে, ঝরে পড়ছে। ঝরা পাতাদের কাকলিতে পাখিরা চুপচাপ। অজস্র গর্জন ও নৈঃশব্দ্য, কুয়াশায় ছেয়ে যাবে আমার এতটুকু ঘর। আমি তখন হিমাকে মনে করব। অনন্ত নৈরাজ্য আর সজ্জার ভেতর থেকে তুলে আনব জীবনানন্দেরও অব্যবহৃত সব শব্দ, ফ্রিদা কাহলোর অচেনা যত রঙ, নূরজাহানের অ-গীত তাবত গান। হিমার জন্য তখন খারাপ লাগবেনা। তবে আবারও সেই পিপাসার শুরু হবে; গোটা এক সমুদ্রপানে যার নিবারণ। জানি সমুদ্রে শুয়ে আছে ক্ষতিকর ক্ষার। তবু যাব সমুদ্রেই কারণ এও তো জানি এ মৃত্তিকা, এ নীলিমার সব গূঢ় প্রশ্নের মীমাংসা সেই সমুদ্রেই।

শুধু লাল লাল নীল নীল জল
জলই তো আমার শ্রেষ্ঠ উত্তর।

***

ডায়েরিতে পাতা ফুরিয়ে আসছে। বিলাভেড আমাকে ছেড়ে গেছে। গমনপথে সোনার ধুলো লেগে আছে।

পাখি উড়ে গেলে তার পালক পড়ে থাকে আর পাতা ঝরে গেলে শূন্যবৃক্ষ হাহাকারে আমি নামক একজনকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন