শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

গল্পপড়ার গল্প : গল্পের অন্ধকার

তাপস গুপ্ত

ফিরেছি বেশ ক’দিন হলো। পথে প্রবাসে থাকতেই ‘প্রিয় বই আলোচনা’র ছক মাথায় আঁটছি। বিষয়, বাক্য, শব্দ মকশো করছি। বইয়ের তাক, আলমারিগুলোর সামনে ঘোরাঘুরি করছি। আলোচনা টালোচনা বড়ো একটা আসেনা। অনভ্যাসের লেখা, আবেগে কথা দিয়ে ফেলেছি, লিখতে হবে। এতোকাল গোলামিতে এতো মগ্ন ছিলাম, যে ক’টি বই পড়েছি। বইরাশির সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, তার চে’ অপার গুণীবই দূরপাঠ্য রয়ে গেছে। কোলকাতা কলেজ স্ট্রীটে বইপাড়ার ছবি ভেসে উঠলো। বইয়ের পরে বই, অনন্ত বইয়ের সারি। এ নাকি একটা পাড়া। এ রকম গ্রাম, শহর, দেশ, মহাদেশ আছে। অচিন প্রিয় বইয়ের অনন্ত দূরে দাঁড়ালাম। অথৈ পারাবার। কিছুই পড়িনি। ভাবছি, আর কষ্ট হচ্ছে।


প্রিয় বই, প্রিয় লেখক নির্বাচন খুব জলবৎ তরলং নয়। কাকে ছেড়ে কাকে রাখি! এমন চুল চিরে ভাবিনি কখনো। মহত্ব, প্রবীণত্বে আপামরের গভীরে যে সমস্ত বই মহৎ আলোচনায় ঋদ্ধ, তাঁদের প্রণাম।

পাশ কাটিয়ে, প্রিয় বই এক আধটা বেছে ফেলার তাগিদে, ঝাড়াঝুড়ি মোছামুছির ভনিতা করছিলাম। নিজের সাথেই নিজের তঞ্চকতা। হাতে ধরা ডাঁই ফসকে বিমল কর, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, পপাত টেবিলতলে। প্রিয় ভাষিনীর কাজে বেড় পড়ার ভয়ে, পড়ে যাওয়া বই ক’টা সম্বল নিয়ে টেবিলে বসে পড়লাম।

না তলিয়ে কথা দিয়েছি। মুখ রাখতে অন্তত হাবিজাবি কিছু একটু লিখতে হয়। লেখার নামে ন ব ঠ। হাজার প্রশ্ন মুড়োতে জট পাকাচ্ছে। এমন সব অসহায় করা প্রশ্ন, মাথা কুটলেও যার উত্তর জানা নেই। বিশ্বাস করুন, পিপাসার মত সত্যি। নিস্ফলা রাত ঘনাচ্ছে। টেবিলে বসেবসেই স্বপ্নময়ের ‘অষ্টচরণ ষোল হাঁটু’র ফাঁদে পড়ে গেছি। বেরোতে চাইছি, হাঁচড়াচ্ছি পাঁচড়াচ্ছি, অসহায়, জড়িয়ে যাচ্ছি জালে। ভয়ে বিমল করের ‘সোপান’এ হাঁফ ছাড়তে গেলাম, উঠতে উঠতে আধমরা ক্লান্ত। হাত পা ছড়িয়ে রেহাই চাইলাম তো, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ট্যাংকি সাফ’ এসে ডেকে নিয়ে গেলো, এখানে অন্ধকার একা নয়। দূর্গন্ধ দোসর। রেহায়ের বদলে হাঁসফাঁস অবস্থা। মনে মনে জপ করছি, ছেড়ে দাও দাদা, কেঁদে বাঁচি! ট্যাংকির ফাঁকে ফাঁপ সরার জায়গা নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এ পোড়া কপালে ঘুমের বরাত নেই! ভাবলাম ‘ট্যাংকি সাফে’একটু মজা হবে, টেনশান ফ্রী হবো। হাসতে গিয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট। কষ্টের হাত থেকে রেহাই নেই। ঘুম দূর অস্ত! জনম দুখি কপাল পোড়া আমি একজনা। কষ্ট বিষাদের কী দীর্ঘ খেলা!

শেষ পর্যন্ত লিখেই ফেললাম, দাদা, রেহায় দিন। এ বিষাদের লেখা আমার কম্ম নয়। অক্ষমতারও সীমা থাকা উচিত। দয়া করে ভুল বুঝবেন না। আপনার পত্রিকায় লেখা আমার স্বপ্নের আকাঙ্খা। গর্বের বিষয়। অন্যকিছু আঁকিবুঁকির চেষ্টা করবো, পণ্ডিতি এবং পোকা বাছা আমার দিয়ে হবে না। ভালো থাকবেন।

ইতি – তখনো লিখিনি, ভাবছি, এটা কী উচিত হচ্ছে? বরং চেপে যায়। ফের যদি প্রসঙ্গ আসে, মাপ টাপ চেয়ে তখন যা হোক এ পাশ, ও পাশ, ধপাস কিছু একটা করা যাবে। সাধ করে ‘হ্যা হ্যা, পারিনা’ জানিয়ে নিজের গালে চড় খাওয়া ক্যারিস্মার দরকার কী? তা ছাড়া আজেবাজে লিখে একজন সময়-অভাবি সম্পাদক/ প্রকাশককে ব্যতিব্যস্ত করাটাও ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে না।

ফ্যান ঘুরছে। তাকে, বইয়ের মাথায় একটা টিকটিকি ওৎ পেতেছেন। সামনে একটা মথ। ওর পাখা মনে হচ্ছে ভারী। এলোমেলো, টালমাটাল। ওড়ার চেষ্টা করছে না। উলটো দিকের তাকে দেওয়াল কোনে অন্ধকার। এক মাকড়সা জাল বিছিয়েছে। সেও মথের অপেক্ষায়। টিকটিকিটা আর জায়গা পায়নি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় চড়ে বসেছে। বইটি মিত্র ও ঘোষ (পাবলিশার্স ) এর ‘সেরা মানিক’। টিকটিকি মানে আমার মোটা মাথায় ঢুকলো সরিসৃপ। ‘সেরা মানিক’ বইটিতে ‘সরিসৃপ’ গল্পের আগের গল্প ‘প্রাগৈতিহাসিক’। অন্ধকারের জন্ম বৃত্তান্ত ওইখানে খোদাই করা আছে।


কোথাও পড়েছিলাম, সম্ভবত বাইবেলে, ঈশ্বর বলিলেন, আলো হোক। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড আলোকিত হইলো।

পূত পুস্তকখানি যতদূর পড়িয়াছিলাম, ‘অন্ধকার দূর হোক’ এই বাক্যটি কোত্থাও পাই নাই। তাই বোধ হয় পৃথিবীব্যাপী অন্ধকার রহিয়া গেলো।

অতঃপর দুখু ও পাঁচীর ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্প। ‘যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিলো এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংস আবেষ্ঠনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবে না।’

ভিখু ও পাঁচী ভিক্ষে করে। খিদে এবং প্রেমকে বশ করতে ওরা ভিখিরি বসিরকে খুন করেছে,। পাঁচীর পায়ে পচা ঘা। পালাতে অক্ষম। সে ভিখুর পিঠে চেপেছে। দু’দিকে ধান ক্ষেত। আবছা চাঁদের আলো। ওরা পালাচ্ছে। সেই সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্ধকারের বৃত্তান্ত আমাদের জানালেন। ওদের পেটে সেই অন্ধকার খিদের, বেঁচে থাকার অন্ধকার। প্রেম দখলের অন্ধকার। ওদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে।

টালমাটাল মথ এগুচ্ছে। টাল খেয়ে কাত হলো জালে। ফাঁদের কিনারে। ওৎ পেতে ছিলো মাকড়সা। ‘অষ্টচরণ ষোল হাঁটু / মাছ ধরিতে যায় লাটু / শুকনো ভূমে পেতে জাল / মাছ ধরে সে চিরকাল।’

সূর্যনারায়ণ নামে এক লাটুকে পেলাম স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘অষ্ট চরণ ষোল হাঁটু’ বইয়ের প্রথম গল্পে। গল্পের নামও ‘অষ্টচরণ ষোল হাঁটু’। ‘সূর্যনারায়ণ আঙুলের টুসকি মারতেই একজন মুনিষ হারমনিয়াম নিয়ে এলো। তারপর মুখের চর্বিত পানের ছিবড়ে ঠোঁটের কাছে এনে মুনিষটাকে কি একটা ইশারা করল। মুনিষটা অবলীলায় ঠোঁটের সামনে হাত পেতে দিলো। সূর্যনারায়ণ পানের ছিবড়ে ওর হাতে ফেললো। হারমনিয়াম বেজে উঠলো। ’

গান শুনছি। দুর্গোৎসব চলছে। ‘অভিরাম.. হাড়িকাঠের সামনে বসল। তরবারি খাপ থেকে টেনে নিয়েই নিজের বুকে পোঁচ দিতে লাগল। রক্তে মাখামাখি হল মহানন্দ সিংহের তরবারি।

(২)

জয়, মহানন্দ সিংহকি...’

-অভিরামরা কতপুরুষ ধরে এভাবে রক্ত দিয়ে আসছে?

-তা হবে ধরো ২৪/২৫ পুরুষ।

গল্প কখনও কাব্য ব্যঞ্জনায় কথা বলে। সমাজের গভীরতর গভীরে প্রবেশ করে। এই সেই মাংস আবেষ্ঠনীর মধ্যে অন্ধকার মাখা ‘রক্ত’, বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্খায় ছুটে চলেছে।

২৪/২৫ পুরুষের উত্তরাধিকার অভিরামের ছেলে ‘শ্রী পবনকুমার বাগদি’ মাকড়সার জাল ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে শহরে। সে ডাক্তার সেনগুপ্তর জার্সিগোরু সেবা করে। ভীষণ কাজের ছেলে। সেনগুপ্তর অভিমানী মুরগিকে ফিরিয়ে আনতে তাঁরই হসপিটালে ফ্রী বেডে পা হড়কে শুয়ে আছে। ‘বাঁ দিকটা প্যারালিসিস হয়ে যাচ্ছে।’

ভিখু কি অভিরামের পূর্বপুরুষ! অভিরামের পূর্বপুরুষ কি একটু বেশি নিশ্চয়তা, বেশি নিরাপত্তার আশায়, ‘খাবো, না খাবো / বোগল বাজাবো / কান বেচবো না...’ বনজ স্বাধীনতা বিক্রি করেছিলো মহানন্দ সিংহের তরবারির পায়ে?

‘-তা ওরা একটু কম বাঁচে।’

পবনকুমার নিশ্চয়তার সাথে একটু বেশি বাঁচতে চেয়েছিলো। সভ্যতা-উন্নতির যাবতীয় ফল ধারণ করে শহর। মাকড়সার জালের উন্নতিও ধারণ করে। মাকড়সার জাল বিস্তৃত এবং উন্নত হতে হতে শিল্পকলা সুষমা মণ্ডিত হয়ে পবনের আগেই শহরে পৌঁছে গেছে। রসে বশে তাকে আসুন, বসুন আহ্বান করে। উচ্চারণের আড়ালে খাটুন, যতটা পারেন ফ্রী খাটুন বলার জন্যে, লাটুর ভূমি এখন আর শুকনো নয়। শিল্পকলা সুষমা মণ্ডিত রস সিক্ত।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া পবনকুমার এ খবর জানতো না। হসপিটালের বেডে শুয়ে (রবীন্দ্রনাথের ফটিক) এক বাঁও মেলে না, দু’বাঁও মেলেনার অন্ধকারে সে মিলিয়ে গেলো। বেশিদিন বাঁচা তার রক্তে নেই। ডাক্তার বাবুদের কাছে তার কোনো শিকড় ছিলো না। নিরাময় ছিলো না। শুধু মাত্র ফলের সন্ধান ছিলো। মায়ের কাছে কোনো খবর পৌঁছালো না, ছেলে মারা গেলো।

নাকি শহরে এসে ভিখু পাঁচুর বাবা হয়েছিলো! তো পাঁচু পেটের সেই অন্ধকার দূরীকরণে চার পাঁচ দিন অন্তর শরীরের রক্ত বেচে খায়। বংশানুক্রমে ভরণ, পোষণ, প্রেম চলমান রাখে। ‘অষ্টচরণ ষোল হাঁটু’ গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্পের নায়ক,পাঁচু। গল্পের নাম ‘রক্ত’।

গাঁয়ে মুনিষ, পানের ছিবড়ে হাত পেতে নেওয়ার পর, খেয়েছিলো এবং রক্তে মিশিয়েছিলো কিনা লেখক বলেননি। কিন্তু শহরে ‘পাঁচু রোজ দু’গুলি ছাগল-নাদি জল দিয়ে গিলে খায়।’ এটা বলেছেন। ‘বিমলাক্ষেপী বলেছিলো –এতে নাকি পেট ভাল থাকে।’ পেট ভালো রাখা শহরে একটা দস্তুর। ‘ছাগলকাটা রক্ত ড্রেনের মুখটায় জমে থাকে। চারছয় খাবলা একটা মালসায় তুলে রাখে’ পাঁচু। ‘মাংসের ছাট্‌মাট্‌ যা আছে জড়ো করে মালসায়’। জলিল (কাগজটাগজ কুড়াই) শেদ্ধ করে দিয়ে যায়। পাঁচু খায়।

জবা লুকিয়ে ভালবেসে প্লাস্টিকের প্যাকেটে একদিন খেতে দিয়েছিলো পাঁচুকে। যার কেউ নেই সে একা খেতে বসে ‘গেরস্থ ভদ্রলোকের মত জলের ছিটে দেয়। এবার (কাল্পনিক গৃহিনীকে) বলে – কই গো, দিয়ে গেলে না? তারপর (নিজেই) ভাত ঢালে। একপাশে শাকভাজা, আলুসেদ্ধ আর একপাশে মাছ। বসার খবর কাগজে লিরিল সাবানের বিজ্ঞাপনের দুফালা করা পাতিলেবুর ছবিটা ছিঁড়ে নিয়ে পাতের কোণায় রাখে। গেরস্থরা ভাতপাতে লেবু খায়।’

তা ওরা শহরেও একটু কম বাঁচে। বিক্রি করার সময় রক্ত টানার দূষিত সিরিঞ্জ থেকে ‘পাঁচুর জণ্ডিস হয়েছে।’ ‘ওর রক্তের আর কোনো দাম নেই। তবে ও শেষ।’ রক্ত বেচে ও কতো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। নিজেও বেঁচেছে। মৃত্যুমুখী অকাল বৃদ্ধা প্রেমিকা জবা, রক্ত শূন্য। ওকে বাঁচাতে রক্ত দরকার। পাঁচুর রক্ত নষ্ট হয়ে গেছে। আর কোনো রক্ত জবার অপেক্ষায় নেই। অকাল বৃদ্ধ মৃত্যুমুখী পাঁচুর হাত চেপে প্রার্থণার আর্তনাদে সে কঁকিয়ে ওঠে ‘বাঁচা, আমাকে বাঁচা’

প্রার্থণার উত্তরে ‘পাঁচু চোখ বুঁজে থাকে। দাঁতে চাপে দাঁত, চোয়াল কঠিন হয়।’

সংস্কৃতির শহরে অন্ধকারের রং কেবল ভদ্র হয়েছে। ‘পাঁচুর ছোটবেলার মরা মায়ের থান কাপড়ের মত’। রং বদলায় ঢং বদলায় শুধু, দিন বদলায় না।।...

আর পড়তে পারিনি। নিজের অজান্তে বইখানা বন্ধ করে ফেলেছি, ভয়ে। আলতো করে। যেনো ওদের আর ব্যথা না লাগে।

কুলদা রায় দাদা, আমি রোজ ভাতপাতে লেবু খাই। এমন বিপদে পড়েছি, খেতে বসে কচলাই না, আলতো টিপি, তবু তিতো রস গড়িয়ে ভাত ডাল তরকারি বিস্বাদ, কেমন তিতো হয়ে যায়।

সব জান্তা গামছাওলা আমি, মধ্যবিত্ত। দু’বেলা ভিখিরিকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাওয়া পরার সংস্থান হয়েছে। এই হা-ভেতেদের পাল্লায় পড়ে কেনো বেঁচে থাকাটা বিস্বাদ করি! হাড়ে হাড়ে জানি, ওই দুখু, অভিরাম, পবন, পাঁচুদের হাত পা ফসকে, ছিটকে গলিয়ে পড়া লটারির টিকিট আমরা। আমরা মানে বাবা, মা, দিদি, পুষ্প, আমি, হেমদা। নিজেদেরকে ফর্সা পোশাক আশাক পরিয়ে দুখু, পবন, পাঁচুদের রক্তকে ঢেকেঢুকে রাখি। মান সম্মানের দোহায়। ভাবি সাহেব সুবো, স্যর ট্যর বনে গেছি। একটু আধটু ভ্রমণ বিলাসী হয়েছি। উচ্চাভিলাসী হয়েছি। টাঙায় চড়ে চলেছি ‘টাওয়ার অফ গুড হোপ’ জয় করতে।

সাহজাহান বাদশার আমল। নাম না জানা স্থপতি কাম রাজা, রাণীকে তৃপ্তি দেওয়ার জন্য মিনারটি তৈরি করেছিলেন। রাজা নিজে হাতে গাঁথেন, মিনার উঁচু হয় আর রাণীকে জিজ্ঞেস করেন, এই উচ্চতায় তিনি কি খুশি? রাণী বলেন -না।

রাজা গাঁথেন, রাণী ওঠেন। উঁচুতে ওঠার তৃপ্তি পূর্ণ হয় না। গাঁথতে গাঁথতে রাজা বৃদ্ধ, অক্ষম হয়ে পড়েন, অতৃপ্ত রাণী বিগতা যৌবনা। উচ্চতা, আকাঙ্খা, তৃপ্তি নির্মানের আকাশ গলির ধাঁধাতে তাঁরা বিলীন হয়ে যান। আর ফেরেন না।

টাওয়ার অফ গুড হোপে উঠছি আমি, বাবা মা দিদি পুষ্প হেমদা, আমরা সবাই। স্বীকার করি, আর না করি, আমাদের আগে এই মিনারে উঠেছেন, ভিখু, অবিনাশ, পবনকুমার; আমরা তার উত্তরসূরি, আমি আধুনিকতম। শেষ পর্যন্ত একা। উঠেই চলেছি। নীচে হতাশ অবসন্ন পূর্বসূরিগণ। পিরামিড শীর্ষের বাসিন্দা হওয়ার লোভ তাঁদের টেনেছিলো, আমাকেও টানছে। অন্ধকার নামছে। পথ খুঁজছি। ‘উন্মত্তের মতন, ভিক্ষুকের মতন, শিশুর মিনতির মতন এবং বৃদ্ধের ভগবত প্রার্থণার মতন আমার পথটুকু আমি খুঁজে ফিরলাম’ ‘আর কিছু দেখা গেল না, আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।’

(৩)

বিমল কর বিরচিত ‘সোপান’গল্পটি এইভাবে সমাপ্ত।

বিমল করের উপলব্ধির ধারাবাহিকতা সভ্যতার অন্ধকারকেই উজ্জ্বল করে। এক অন্ধকার থেকে আর এক অন্ধকারে এগিয়ে চলেছি। অন্ধকারের হাত থেকে রেহাই নেই। অন্ধকারের বয়স বাড়ছে। আকার, প্রকার, চরিত্র, খোল নলচে সব বদলাচ্ছে। ‘অন্ধকার’ শব্দটি যেনো বাইরের খোলশ, ঠুঁটোজগন্নাথ। বদলায় না। আমাদের চিনতে অসুবিধে হচ্ছে। হাঁসফাঁস করছি। হাঁসফাঁসের চরিত্রও বদলাচ্ছে। কখনও পালাচ্ছি, কখনও সন্মুখ সমরে পড়ি বীরচূড়ামনি..। আসল কথা, পথ খুঁজছি। অন্ধকারে চাপ ধরে আছে। একটু নড়ানো দরকার। রাত বাড়ছে। হাঁফ ছাড়া দরকার।

শীর্ষেন্দু মজা করে লেখেন। হাসির শব্দ, বাক্য, ঘটনার ঘনঘটা তাঁর হাতে খেলা করে। ‘ট্যাংকি সাফ’ ভেবেছিলাম এটি অন্ধকার সাফ করা মজাদার গল্প। হাঁফ ছাড়ার লেগে আমিওতো অন্ধকার গার্দা সাফ করতে চাইছি। হাসতে হাসতে যদি কামডা হইয়া যায়!

আরে, তুই রক্ত বেচা কপাল পোড়া, ভুলে যাস কেনে ? অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে... সংসারের সমস্ত বর্জ, নোংরা, অন্ধকার জমা হয় পায়খানার সেফটি ট্যাংকে। সংসারের নীচে চাপা থাকে। ট্যাংক ভরে গেছে। সাফ করছে মাগন। সংসার চলছে। ট্যাংকি সাফ হচ্ছে। গন্ধ ছড়াচ্ছে। সংসারের নোংরা ভেঙে ভেঙে বের করছে মাগন। বেরিয়ে আসছে স্বার্থ, হিংসা, অনাচার, নপুংসকতা, মিথ্যাচার, বহুত খুব। প্রত্যেকে প্রত্যেকের চরিত্রে দূর্গন্ধ পাচ্ছে। নিজেরটুকু পাচ্ছে না। মাগন অন্ধকার দূর্গন্ধময় ট্যাংকি সাফ করছে আর ঘোষণা করে চলেছে ‘বহুত গার্দা বাবা, বহুত গন্ধা, সব গার্দা সাফ থোড়াই হবে বাবা। গার্দা কুছ জরুর থেকে যাবে মালিক। সব গার্দা কখনও সাফা হয় না।’

একটু একটু অন্ধকার চিনছি। আরোহন চিনছি, নোংরা, দূর্গন্ধময় সংসারেই বাস করছি। কোথায় আর যাবো দাদা, গায়ে গু মাখলে বাঁচন কি ছাড়ে? বাঁইচা আছি। পোলাপান লইয়া বাঁইচা থাকবেন। ইতি- ।।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন