সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫

তমাল রায়'এর গল্প : নদীর গল্প

আমাদের তেমন কিছু ছিল না একটা সাদা মাটা ফেলে রাখা জীবন ছাড়া,যা সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকা এক পাটি জুতোর মতই। ঢেউ আসে ভাসি,ঢেউ চলে যায় পড়ে থাকি রুদ্ধতায় বালি আর নুন মেখে। বাতাসে নুন ছিল খুব। অশ্রুতেও তাই থাকে। বড় হতে দেওয়ার মতও কিছু ছিল না,বয়স ছাড়া। সেফটিপিন,ছেঁড়া চটি মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানোও। ব্যস। লম্বা হতে পারলাম কই। বামন দুনিয়ায় আমিও বামন এক। কেবল বয়সটা বেড়ে গেল অজ্ঞাতেই। পড়ে থাকা বুনো ফুলের মত,জানেই না তারও সৌরভ আছে।

পাশ দিয়ে দ্রুততায় বয়ে চলেছে ভাবগম্ভীর মহাকাল। আমরা নিতান্ত বালক সুলভ চঞ্চলতায় তাকে তুড়ি মেরে রসিকতা করে কাটিয়ে দিতাম তাচ্ছিল্যে অবজ্ঞায়। সেটাতো প্রতিষ্ঠান কে অস্বীকার করার সময়,মহাকালও তো কি ভীষণ এক সর্বগ্রাসী প্রতিষ্ঠান। তবুও সে ভীষণ তাও পিঁড়ি পেতে বলেছিল -বস। কাঁসার গ্লাসে জল দিই খাও। কলাপাতায় ভাত দিই খাও। রোসো একটু। এত কিসের ব্যস্ততা। চঞ্চল,বাচাল। শুনিনি, তাকে গুরুত্ব না দিয়ে দেখছিলাম পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়া। কি সারিবদ্ধ। কি প্রবল যৌথতা। আমরা কেন এমন হইনা। আসন্ন বিপদের আঁচ করে প্রথম পিঁপড়ে থমকালো। পালালো না একা। বাকিদের জানান দিলো। রুট ম্যাপ চেঞ্জ হল। আবার চলেছে।

এ তো মুগ্ধতা। দেখবো না? তুমি মহাকাল বলে বাপু আলাদা গুরুত্ব দিতে পারবো না। সে তুমি যতই রাগ কর। চললাম রেড আর্মির পিছু পিছু। মহাকাল ডাকছে পেছন থেকে – ‘আর্য ভাত পড়ে,জল।ফেলে যেও না’। সৈনিক তো আদতে,সাহস থাকুক বুকে। সকলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক সেনা জীবন,এডভেঞ্চারের শখ। তাই পেছন ফিরিনি,পথ চলতে পেছন ফিরতে নেই,কে যেন বলেছিল? কে?

ব্যস, লালে লাল হোক দুনিয়া। মহাকাল তোমায় বাঁধবো এসো স্বপ্নের লাল রঙে। এসো ছুঁয়ে দেখো পারি কিনা?

সে যত বড়ই হোক তারও থাকে প্রতিশোধ স্পৃহা। নিউটনের তৃতীয় সূত্র। মহাকাল,সে আহবান করলো যুদ্ধ ক্ষেত্রে। নিজেকে বললাম - ভয় কিরে পাগল। সর্বহারার শৃঙখল ছাড়া কিছুই নেই। দরিয়ায় ভাসলাম। অত বড় জলের দুনিয়া। একটা ছোটো মোচার মত পানসি নিয়ে কত দূর তুমি যাবে আর্য? কে বলছিল? মা? মাতো সে কবেই নেই। নেই?

ঝড় উঠলো প্রবল। নৌকো টলমল। ‘একদিন পেট্রোল দিয়ে নিভিয়ে দেব আগুণ’ মাথায় আগুণপাখীর ওড়াউড়ি। ভাসছি,দুলছি,স্বপ্ন দেখছি। আর ভাবছি পাখীরা আছে,পিঁপড়েরাও। ঠিক এগিয়ে যাবো। সংকল্প যদি স্থির হয় ,লক্ষ্য নির্দিষ্ট যাওয়ার পথ যেমন ই সঙ্কুল হোক,পৌঁছবেই। নিশ্চিত। ডুবোজাহাজ হও।সমুদ্রের গভীরে যাও। দেখো আলো আছে কিছু। যার দেখার সে দেখে।

শ্যাওলা কে গায়ে মাখলাম আদিমতায়।বব্ধুতো সেও।সে শেখালো পিচ্ছিলতা। শেখালো কিভাবে দুধ ও জল কে আলাদা করতে হয়। এগোচ্ছি। একটু একটু করে। এতো কোনো ডিঙি নৌকোর গল্প নয়। এ জীবন। যে কখনো ডিঙি নৌকা। ‘ডিঙা ভাসাও সাগরে সাথীরে ডিঙা ভাসাও সাগরে,রাঙা হইল পুবের আকাশ ঘুমায়ো না আর জাগোরে’

ফুলের বনে ফুল হয়ে,পাঁচিলে কাঠ বেড়ালি হয়ে এগোচ্ছে জীবন। ছোট ছোট হার্ডলস টপকাই,আর যুদ্ধ জয়ের জন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করি। গোল হয়ে বসি প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় আমিকে নিয়ে। দাউ দাউ আগুণ-উৎসব নয় প্রতিজ্ঞা। এগোতে হবে। অনেক দূর। পথে গ্রীস্ম গিয়ে শীত এলো। কুয়াশা মোড়া শীতের আলিস্যি কাটিয়ে বেড়োলাম। মাঝে ‘হাই’ করল পালং শাক,বন্ধু আমার। নলেন গুড়, পাটালি,জয় নগরের মোয়া দিল,শুভেচ্ছা...

কিছুটা জলজ ছিল সে জীবন,কিছুটা স্থলপদ্মের মত কাছাকাছি যৌথতায়। আড়াল রাখনি তাই আকাশও। দেখো তুমি যখন খুব শক্ত মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে লড়বে।সাথে থাকবে জল,মাটি, আকাশ।

সেটা ছিল অবিশুদ্ধ সময়। জল যে জল ছিল খুব তা বলা যায় না কিছু অনির্দিষ্টতা, কিছু ডাঙা ছিল তাতে। কিছু জল মিশেছিল ডাঙাতেও। আকাশ অংশত মেঘলা কিছু জল ও ডাঙা নিয়ে। আকাশেই স্থল পদ্মর মত যৌথতায়,যদিচ সে যৌথতা ছিল আপেক্ষিক। রবির গান ভেসে আসে কবির লড়াই আর কিছু গল্প-গাছা,আগাছা,জীবন আদতে যেমন। আর ছিল এক ধ্রুবতারা। না হলে দিক নির্দেশ করবে এ অন্ধকারে? মাতাল হওয়া ভালো ততটা যতটা সয়। নদী গুলো ভেঙে যাচ্ছে আরো ছোট নদীতে,সম্পর্ক চোরা গলিতে,মানুষ ছোট হচ্ছে ক্রমশ উচ্চতায় মালিন্যে,দীনতায়। আমি তেমন কেউ নই যে আটকাবো এ ভাঙন। রুদ্ধ রাখি নিজেরে। একা তো। এভাবেই এসে পৌঁছলাল ডুলুঙের কাছে। এ ঘাট সে ঘাট,শ্মশানঘাট কবর পেরিয়ে আসা। বাবা আর মা ততদিনে ছাই হয়ে শূন্যে।

আমি শ্মশানে ফুল গাছ পুঁতি, ড্রয়িং রুমে কৃষ্ণচূড়া, তবু নদীর কাছে দায়বদ্ধতা ছিলই। যেমন থাকে,নদী ব্যক্তিগত। ওখানেই দেখা সেতুর সাথে। যার দু দিকে দুটো বিন্দু। রেখা সরল হোক বা বক্র তা আদতে বিন্দুরই সমষ্টি। প্রাচীন কাছিমের মত সে শুয়ে থাকে একা,সে কবে থেকেই। দিনের আলোয় তাকে বিস্ময়ে দেখি। রাত ঘনালে চাঁদ উঠলে আমরাও তো সেই ম্যাজিকাল ফ্যান্টাসির শরিক, এ দুনিয়া তো আসলে এক ম্যাজিক রিয়ালিটি। তাই সেতুতে ওঠার স্বপ্ন দেখি প্রবল। যাকে খুঁজেছি দীর্ঘতম চরাচর জুড়ে সে আর আসেনা। ভবিতব্য। বিন্দু ছুঁয়ে বসে থাকে বাবা,ওদিকে আমার না হয়ে ওঠা আত্মজ। পূর্ব থেকে পর এই উত্তর ঔরসিকতায় ধারাপাত বয়ে যায় ডুলুং হয়ে। জ্যোৎস্নায় সে বড় মায়াবী। সাধ ছিল তাকে স্পর্শ করার,মানুষ আদতে আদিমতা থেকে আর কিছু পাক না পাক লোভ পেয়েছিল। ভুলু স্যার বলেছিলেন লোভী হওনা। সব পাবে। মুহুর্তের ভুল। তাতেই তো ব্রম্ভান্ডের সৃষ্টি। মুগ্ধতার,প্রেমের, ব্ল্যাক হোলেরও।

মা উল বুনতেন ছাদে। পাশে আদি অকৃত্তিম ফণী মণসা। বছরে একবার যে পূজোও পেতো ভাদ্র সংক্রান্তিতে। খেলতাম উলের বল নিয়ে। জড়িয়ে যেত মণসা গাছে,জড়াতাম আমি,মা, উলের কাঁটা আর আমের শুকুতে দেওয়া আচার। সেই সব নিয়ে আব্বুলিশ বাবা,যে না ঘর না ঘাটকা, তৈরী হয়েছিল সংসার আমাদের,যা নাকি বন্ধন আদতে! আমিও বন্ধনে। তবে রাঙা ঠাকুর বলতেন বন্ধন আসলে মায়া। আমিও মায়ার বন্ধনে,ইঁট কাঠ পাথর ডুলুং এর। রাধানাথ এভারেস্ট মাপতে গিয়ে গুয়ে গোবরে হয়ে এভারেস্ট এর প্রেমে পড়ল। আমি ডুলুং এর। তাকে বলা হয়নি সে কথা। সব কি বলতে হয় বোঝা যায়। ও বোধ হয় বুঝতো কিছু। নইলে আমি আসলে ও কেঁপে উঠতো কেন? আমি সেই কাঁপতে থাকা ডুলুঙে নিজের রূপ দেখে ভিড়মি খাবার যোগাড়। এত কুৎসিত কি করে। তবে ওই যে লোভ আদিম রিপু। টেনে নিয়ে গেল আমায় এক আদিগন্ত জ্যোৎস্না রাতে,দূরে রেল গাড়ি যায় কেঁপে কেঁপে। ট্রি ট্রি পাখিরা কেন জানি কেন কেঁদে ওঠে সকরুণ বেণুতে। তারপর নিস্তব্ধতা। সঙ্গম বা পারঙ্গমতার পূর্বে এমন নৈশব্দ আসে।

চার-তিন- দুই-এক। ব্যস। খেলা আপাত শেষ। ডুলুং কে লং শটে দেখ। ফ্রিজড। নেমেছিলাম গভীরে। তাই বুঝছিলাম হৃৎস্পন্দন আছে। নাড়ি চলছে তখনো। আর জল বইছে অনেক নীচে। তড়িদাহত হবার মতই ছিটকে উঠে এসেছিলাম। প্রথম শক টা নিতে পারলে সব সয়ে যায় পরে। পারি নি যদিও যোদ্ধা। কর্ণ তো রথের চাকা পাছে ডুবে যায় ভয় লাগে যে বড়!

ট্রেন যায় পাশ দিয়ে কর্কশতায়।জীবনও এই আসন্নতায় কেমন কর্কশ কুজ্ঝটিকা। সেতুতে উঠতে গেলে সেতু দুলে ওঠে। ওদিকে স্নেহশীল পিতা উদাস চোখে হাসে,শিউরে উঠি কিছু বলতে চায়? আমায়? তেমন তো কিছু বলেননি কখনো। নিজের ঋদ্ধতা ভেবেছেন। প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে গেলে যা লাগে। বিন্দুতে নির্দিষ্ট হয়ে তিনি ধরে থাকেন সেতুর এক দিক। অন্য দিকে না হওয়া আত্মজ ডাকে। যাই দৌড়ে। কই সে? খুঁজে পাইনা। কোথায় গেল। লুকোচুরি খেলে এই প্রবলতম বিপদের দিনে। ভয় নেই কোনো!

সেতু দীর্ঘ নয় ছোট সে খুবই। নীচে ফ্রিজড ডুলুং। ওপাশের বিন্দুতে ভবিতব্য এপাশে অতীত। ঘৃণা লাগে নিজের ওপর। নেমে আসি। কে যেন ফিসফিসিয়ে – ‘পালিয়ে যাও?’ কোথায় পালাবো? কার কাছে? ডুবিয়ে দিয়ে এসেছি রণ তরী। হয় জেত না হয় মর। আহ মৃত্যু। চুম্বন দাও। জেগে উঠি আর এক সম্ভাবনার ভোরে।

তখন রাত প্রায় শেষ। আলো ফুটবে একটু পর। দেখি রাত পাখী যত খুঁটে খাচ্ছিল পোকা কৃমি কীট,তারা উড়ছে প্রাবল্যে। তবে কি মহাকাল জেগে উঠলো আবার? এবার আর জল দেবে না,ভাত না,প্রতিপক্ষ? চোখ বুজি। দেখি ডুলুং উঠছে ভেসে,খুব ধীর গতিতে। তীর ছেড়ে আর একটু উঁচু। আর একটু। আকাশ কমলা হচ্ছে। সে উঠছে ,মাটি থেকে প্রায় দশ ফুট ওপরে ভাসছে। এত আলো আসছে কোথা থেকে,তবে কি বিপর্যয় আসন্ন? আসন্ন আত্মজ তুমি কোথায়,বেশী দূর যেওনা বিপদ বুঝিবা কড়া নাড়ে,বাবা তুমি কই,স্থির হয়ে বস। আমি বিপ্লবী সত্ত্বার অধিকারী হলেও তো মানুষ। চে বিচলিত হয় নি? দীনেশ বাদল মাস্টার দা? ডুলুং ডানা মেলে আর একটু ওপরে,পাখী গুলো ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। আর ডুলুং যেখানে সেতু তার সাথে মিশে যাচ্ছে।

এখন মাথার ওপর ডুলুং নামের সেতু এক। ওপাশে বৃদ্ধ পিতা,এপাশে আসন্ন আত্মজ আর আমি সঞ্জয়,দুনিয়ার প্রথম ধারাভাষ্যকারের মত বলে চলেছি সে আশ্চর্য নির্মাণ কাহিনী।

আলো ফুটছে। একটু একটু করে। একে ভোর বলে। মা উনুনে আঁচ দিচ্ছেন।একটু পর ডাক্তার বাবা বেরোবেন রুগী দেখতে। পেটের রুগী। তাই মা ভাত রাঁধছেন এই সকালেই। বাবা আর আমার বাবা নন ডুলুঙের বাবা। আসন্ন আত্মজও এ হেন কর্ণের নয়,ডুলুঙের। আমি দূরে নৈর্ব্যক্তিক। দর্শক। এর পর সে উষায় কি হয়েছিল আর জানিনে। জ্ঞান হয়ে দেখেছিলেম আমি সেতুর ওপর পা হাত কুঁকড়ে শুয়ে। হে প্রেম হে নৈশব্দ হে নদী তুমি কি অবশেষে আশ্রয় দিলে এই রণক্লান্ত কে?

ডুলুং আমার স্ত্রী নয়,বৃদ্ধ চিকিৎসক বাপ আর সন্তান নিয়ে সে হয়ত কোথাও সিঙ্গল মাদার হয়ে লড়ে যাচ্ছে তার লড়াই। আমি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি আজও। শীত আসলে বসন্ত আসতে আর কতই বা দেরী থাকে। আগামী বসন্তে বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে যাবো ডুলুঙের কাছেই। জীবন,আদতে সেও তো এক বিপ্লব।



দাদার ডায়ারিটা আজ পুরনো ধূলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেরিয়ে এলো,আমি পড়ছিলাম এক নিশ্বাসে। দাদা নেই। রাষ্ট্রের গুলি দাদা কে পেছন থেকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। দাদা বিয়ে করে উঠতে পারেনি। আমি ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আজ ডুলুঙের খোঁজে। যদি পাই,শুনবো সে এক নদীর গল্প। প্রত্যেকেরই থাকে এক নিজস্ব নদী। যা ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে বহমান অফুরান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন