বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

সেজান মাহমুদ'এর দুটি গল্প : হারাম ও টাইপ রাইটার

হারাম

এক. বেগুনি খোয়াবে নীল আগুন
’রাইত কতো অইলো?’ ঘুম ঘুম ভাবখান নেশার মতোন নাইগ্যা আছে মাথার মইধ্যে। সেই ভাবখান কাইটতে না কাইটতে পেরথমেই রাইত বাড়ার কতা ক্যান মনে আইসে? রাইত বাড়ার লাগান কিসের সংগতি? নাকি আর একডো দিনের জন্য পরানের গহীনে এই রাইত বাইড়া যাওয়ার চিন্তা? এতো সওয়াল ক্যান মাথায় আইসে? আত্নার মইদ্দে না জানা কোন তড়াইশা ভাবের জন্য রাইতের আন্ধার মগজের পরতে পরতে সওয়ালগুলান জুইড়া দিতাছে
হাত বাড়ায়া গ্যাদাগেদি দুইডোর গতর ছুইয়া দেহি, অঘোরে ঘুমাইত্যাছে ওরা।
মেলাদিন বাদে প্যাট পুইরা খায়া কেমন শান্তির ঘুম ঘুমাইত্যাছে। নিজেও কহন ঘুমায়া পড়ছিলাম ঠাহর পাই নাই। চাইরদিক কেমন শুনশান, নিঝুম নাগে। অন্যদিন তো এমন নাগে না। চাইরপাশে মেলা রহমের আওয়াজ থাহে। ঝিঁ ঝিঁ পোহা, পক্ষির ডানা ঝাÌটানি, হাওয়ায় গাছের পাতায় পাতায় ঘসা খায়া কত বেচিত্র আওয়াজ তৈরি হয়। ঘুম পাইতেই দেয় না। নাকি গতরে পুষ্টির ছোয়া লাইগছে জন্যে অবছেন্ন মনডা, পেরেশান এন্ত্রিয় আওয়াজগুলানরে অবহেলা করতাছে? এই কতাগুলাও ভালো কইরা গুছায়া ভাবতে কষ্ট অয় আমার। বেবাক দিনের ভাবনা চিন্তা জুইড়া থাহে খালি কি খামু, কি খাওয়ামু গ্যাদাগেদি দুইডোরে। এই বেলা, ওই বেলা। 

আল্লার দুনিয়ায় কি খাওয়া পরা ছাড়া আর কিছুই নাই? এই সোয়ালের জবাব শ্যাষ অওয়ার আগেই য্যান হুনতে পাইলেন খোদাতাল্লা। দূত পাঠাইলেন আমার কাছে। এডো কি জিবরাইল না আজরাইল? কার কি কাম দুনিয়ায় ঠাওর করার চেষ্টা কইরা পারি না। হাল ছাইড়া দেই। পরক্ষণেই মনে অয় আজরাইল মানে অইলো জান কবজ, মৃত্যুর দূত। বুকটা তড়াশে দাফাইতে থাহে আর আমি হীম চক্ষে তাকায়া থাহি। কেমন আগুণের ফুলকির মতোন জ্বলজ্বইল্যা কিছু একডো এম্মিহে চায়া আছে, চক্ষু দুইডোও কয়লা পোড়া আগুনের মতোন চাপা চাপা জ্বলত্যাছে আর নিভত্যাছে। আমি পেরাণপণে চেঁচায়া কিছু একটা কইতে চায়াও পারি না। মনে অয় গলা দিয়া কোন স্বর বাইর ওবো না। চিল্লায়া ওঠার চেষ্টা কইরতে কইরতে দম ফুরায়া যাওয়ার ঠিক আগ দিয়া নিমিষে কোন থেইক্যা য্যান হাওয়ার দাপট আর ঝাÌটা আইলো, বেকট শব্দে আগুনের কুন্ডুলী ফাইটা হাওয়ায় মিলায়া গেল। 

’দরজা খোলেন, দরজা খোলেন’
এতো জোরে জোরে দরজায় দাক্কা দিতাছে ক্যা? কেডো এতো রাইতে দরজা দাক্কায়? নাকি রাইত বেশি অয় নাই। ভ্যাবাচেকা ভাব কাটায়া ওঠার চেষ্টা করি আর এইডো যে ভয়ের খোয়াব কোন আজরাইল না, একথা ভাইবা মনের ভিতরে স্বোয়াস্তি পাই।
’কেডো?’ কোনমতে জিগ্যাস করি।
’দরজা খোলেন, দরকার আছে, মুফতি সাব আমাগোরে পাঠাইছে’।

আমার সিনার মদ্দে ধুকধুকানি শুরু অয়। একে তো খোয়াবের ঘোরটা এহনও কাটে নাই, তার ওপর ইতির বাপ বাড়িত নাই। এই রাতবিরাতে মুফতি সাব কোন দরকারে ডাহে? গ্যাদাগেদি দুইডো এহনও ঘুমায়া আছে। গতরের কাপড়ডো ঠিকঠাক কইরা নেয়ার চেষ্টা করি। ফিনফিনা পাতলা তাতের শাড়িডো যে মেলা দিনের পুরানা তা টের পাই। না ধুইতে ধুইতে ময়লায় ভারি ভারি নাগে। বেলাউসটারও অবস্থা ত্যানাত্যানা। ছিড়া গেছে মেলা জায়গায়। ছোডডো এহনও মাঝে মধ্যেই খিদার চোটে খামচায়া বুকের দুধ বাইর কইরতে চায়। বেলাউসটার সামনের দিক উদলা হয়া থাহে। বুকডাও ঝুইলা গ্যাছে তাই আর সামাল দেয়া যায় না। কয়াক দিন আগে মাস কাবারি কামলা খাটতে যাওয়ার সময় ইতির বাপ কইছিল এইবার মাস শ্যাষে আসার সময় রান্ধুনী বাড়ির হাট থেইকা একখান রেডিমেড বেলাউস কিনা আনবে। মাস শেষ অইতে এহনও মেলা দেরি। এইসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে বুকের কাপড় ঠিক কইরতে কইরতে নিজের সিনার মদ্দে ধুকধুকানি আবার টের পাই। এই পেরথম ঘুম ভাঙ্গার পর খেয়াল কইরলাম যে বাইরে হাওয়ার দাপট গাছের পাতায় কেমন জানি ফিসফিসানি আওয়াজ তুলছে। দরজা খুলি ভয়ে ভয়ে। ঘরে দরজা কইতে তো একখন্ড পাটশোলার বেড়া।
’কী হইছে?’
আন্ধারের মদ্দে বেহেকরে ভালো কইরা না চিনলেও কেরমে কেরমে চোক্ষে আন্ধার সয়া আইসে। এরি মধ্যে আবার একজনের আতে টিমটিমা হারিকেন। তিনজনের দলে সামনে খাড়া দক্ষিণ পাড়ার ওমর আলি। সে মুফতি সাবের মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে। ওমর আলিই উওর দেয়,
’কি হইছে গিয়া হুইনো। এশার নামাজের পর মসজিদের সামনে সালিশ বইছে। চল।’

সালিশের কতা হুইনা আত পা অবশ হয়া আসে। কিসের সালিশ? ইতির বাপের কতা আবারো মনে অয়। লোকটা দুললা খাটো, গুকনা মতো মানুষ, তারপরও তো সোয়ামী। সে থাকলে অনেক সাহস পাইতাম মনে। অনেক কষ্টে তড়াশ ভাবখান কাটায়া, সিনার মধ্যে সাহস জুগায়া কইলাম,
’গ্যাদাগেদি দুইডা ঘুমাইত্যাছে, আমি না গেলে অয় না?’
’না গেলে অয় না? সবাই বইসা আছে, পোলাপানগুলাও নিয়া চল, ওদেরও তো দরকার।’

কতা শেষ হওনের আগেই ওমর আলি গা ঠেইলা ঘরে ঢুইকা পরে। অনেকখান য্যান ইচ্ছা কইরাই গতরে ঘ্যাস্টা মারে ওমর আলি।
’এই উঠ, উঠ’। পেরায় বগলদাবা কইরা ছোট গেদিরে নিয়া রওনা হয় সে। গ্যাদারেও ঠ্যালে-
’নু যাই।’

গ্যাদাগেদি দুইডা কাঁচাঘুমের ঘোর ভাঙ্গার আগেই ভ্যাবাচ্যাহা খায়া কাইন্দা ওঠে। ওমর আলির বগলে ছটফট করে ছোট গেদিডা। আর কোন কথা কওয়ার নাই, কইলেও হুনবো না ওমর আলি, মনে কইরা গ্যাদার হাত ধইরা টানতে টানতে সমানে হাটতে থাহি আমি; ঘরের দুয়ার পিছনে হাট কইরা খোলা পইরা রইলো। আগে যায় বুড়ানি পাছে যাও ছাও, মাও মাও দুধ দিয়া যাও-এর মতোন ওমর আলি ছোট গেদিরে কোলে নিয়া হাটে আর তার পিছনে পিছনে গ্যাদার আত ধইরা আমি। হারিকেন নিয়া পিছনে আরেকজন। গেরামের আন্ধার পথে, ঝোপঝাড়ের ভুতুরে ছ্যামায় পিছনের হ্যারিকেনের আলোটারে খোয়াবে দেখা আজরাইলের আগুনের ফুলকির মতোন ঠাহর অয়, মনে অয় গায়েবি জগতের কোন আত্না ধাওয়ায়া কইরা ধরতে আসতাছে। আমি না চাইলেও জোরে জোরে পা চলতে থাহে!


দুই. ঝাঁঝালো মাংস, পোড়া বিশ্বাস

বেবাকদিন বেলা উঠলেই একই চিন্তা, একখান চিন্তাই মাথাচারা দিয়া ওঠে- কি খামু, কি খাওয়ামু গ্যাদাগেদি দুইডোরে? যঠর, হায়রে যঠর! চিনচিনা ব্যথা, মোচর, কত কিসিমের ভাষায় যে জানান দেয়, খাওয়া দ্যাও, জ্বালানি দ্যাও যঠরে। হেজন্যই তো ভাবি, আল্লার দুনিয়ায় খাওয়া ছাড়া কি আর কোন কিছু নাই? এতো মানুষ দুনিয়ায় তারা তো কত কি করতাছে! কত আনন্দ, কত হাসি ঠাট্টা!! সরকার বাড়িতে গেলে মনে হয় কী ফুর্তির মোচ্ছব, কী আমোদের পার্বন । সরকার চাচী মাঝেমদ্দে এইডা ওইডা দিয়া সায্য কইরতেন; কহনও গ্যাদাগেদির আতে, আমার নিজের আতেও দিতেন। হায়, তিনিও আর নাই এই দুনিয়ায়। সরকার বাড়ির বৌ ঝিয়েরা শহরে থাহে, এইহানে আসেও না, চায়াও দ্যাহে না।

ঘরের কোনার ছোট্ট বাঁশের মাচার ওপরে হাড়ি পাতিল রাহা। জানি কিছছু নাই, তাও ক্যান জানি হাড়ি পাতিল হাতরাইতে থাহি। আল্লার দুনিয়ায় কত কিসিমের দৈব দৈবাত ঘটে। আমার ঘরে কি একটু ঘটবো না? কোথথাও কি একডু চাইল বা ডাইল হাড়িপাতিলের তলায় পইরা থাকবো না? বিগত একটা মাস এইভাবেই তো চলতাছিল। ইতির বাপ কামলা খাইটা যা আনে, তাতে তো মোটামুটি চইলাই যাইতো। এহন খরার সময় দিন জোয়ারি কামলা দিয়া কিছু পাওয়ায় যায় না। বেবাকেই কয়, ’কয়দিন সবুর করো, একটু ম্যাঘ-বাদল অইলেই হাল চাষ কইরতে অইবো’। ইতির বাপ কিছুই কইতে পারে নাই, পারে না কইতে যে প্যাট তো আর কয়দিন দেরি করে না! শ্যাষমেষ মাস কাবারি কামলা খাটতে সোহাগপুর গেরামে চইলা গেলো ইতির বাপ। হেইদিকে উপজেলা অফিস, তাঁতীদের বসবাস। গৃহস্থরা তাঁতীদের জোলা কয়া গালি দিলেও, ওদের আতে ট্যাহা-পয়সা আছে। ইতির বাপ কইছিলো গিয়া প্রেরথেম সপ্তাহ কাম কইরা চাইল, ডাইল কিনা পাঠাইবো কারু আতে। মনে অয় কোন মানুষজন পাওয়া যায় নাই এহনও। ফেরত আইলে হেই পুরান কথা ’চালায়া নিও’। ক্যামনে আর চালানো যায়? গ্যাদাডো তারস্বরে চেঁচাইত্যাছে। এই দুললা গেদিডো বুহের দুধ চুইষতে চুইষতে কিছু না পায়া চুপ কইরা নিথর পইরা আছে। গ্যাদারে যে ধমক দিয়া থামামু হেই বলও আহে না, ইচ্ছাও আহে না। ক্যামনে থামাই? যঠরের যন্ত্রণা বাদে আর কি কিছু বোঝে ওইটুকুন বাচ্চা মানুষ?

তবে প্যাটের এই ক্ষিদার জ্বালা আর বাঁচামরার টানাহ্যাঁচড়া নতুন না আমার কাছে। জন্ম নিছিলাম গরীব বাপমায়ের সাতজন গ্যাদাগেদির এহেবারে প্যাটমোছা হয়া। অনাহুতের মতোন বোঝার উপ্রে শাকের আঁটির মতোন শেষ সন্তান বইলা বাপমাও নামও রাখছিল ’ফেলানি’। মনে অয় মায়ায় পইরা শ্যাষম্যাস ফালায়া দিবার পারে নাই বাপ-মাও। কিন্তু সাত ভাইবোনের অভাবী সংসারে সবই দেইখ্যা আইছি- ক্ষিদা কারে কয়, মারামারি কারে কয়, অবহেলা কারে কয়। এগুলান তাই আর নতুন না। এজন্যেই নিজের প্যাটের সন্তানগোরে একই কষ্ট পাওয়া দেখতে মনডা মাইনবার চায় না। গ্যাদাগেদি দুইডোরে নিয়া বাড়ি থনে বের হয়া আসলাম। দেহি এপাড়া ওপাড়া কইরা যদি কিছু পাওয়া যায়!
গ্রামের হালট দিয়া দক্ষিণ পাড়ার সিথান বরাবর আসতে আসতে দেহি কহন বেলা মাথার ওপর দিয়ে পার হয়া গেছে। অবসন্ন আত-পায়ে গেদিডোরে কোলে নিয়া হাইটতে কষ্ট অইতাছে। গ্যাদাডা আর কিছুই কইতাছে না। কাইনতে কাইনতে মনে অয় কান্দনের শক্তিও আর নাই। গেরামের দক্ষিন দিহে বিরাট বারো ফসলি মাঠ, হেরপরে নদী।

মাঠগুলান অহন শুকনা, খড়খড়া, ফাটা ফাটা। নদীর কিনার দিয়া একটু সবুজ রঙ চক্ষের সীমানায় ক্যামুন জানি আরাম আইনা দেয়। হেইদিকে তাকায়া আরামটুক পাইতে পাইতেই দেহি হেইদিক থনে ধুমা উঠত্যাছে। হেইদিক আগায়া যাইতে থাহি, ক্যান যে যাই তাও জানি না। এ য্যান কুনুহানে যাওয়ার জন্যই যাওয়া। ধুমা ক্যান উঠতাছে? আন্দাবারি করা আর ধুমা ওঠারে এক কাতারে বিচার কইরা মনে অয় এই দিহেই যাই। নদীর চাতালে উইঠা আসতেই হঠাৎ বিরাট বাথানের দিক নজর পড়ে। বছরের এই ভাগে বাথানের মানুষগুলান দল বাইন্ধা শূয়ারগুলান নিয়া গেরামে গেরামে ঘুইরা বেড়ায় ঘাস, ঘচু-কেচুর খোঁজে। একেকটা বাথানে কয়েক’শ শূয়ার । ছোট, বড় নানান কিসিমের। মাঝেমদ্দেই চইলতে চইলতে কোন গেরামে ঘাঁটি কইরা রাইত পার কইরা দেয় তারা। হেইরহম একখান বড় বাথান ঘাঁটি কইরছে নদীর কিনারে। খাওয়ার চিন্তা ভুলতেই কিনা না জানি না হেইদিক আগায়া গেলাম। ঘোঁত ঘোঁত শব্দ কইরতে কইরতে শূয়ারগূলান মাটি খুইড়া খাওয়া খুঁজতাছে। একপাশে হাঁইসাল বানায়া আান্দাবাড়ার ব্যবস্থা কইরছে বাথানের লোকগুলান। ধুমা উঠতাছিল হেই হাঁইসালে পোড়ানো ঘরকুটা থেইকা। গেরামের ছাওয়ালপাল গুলান দূরে খাড়ায়া তামসা দেখতাছে। কেডো জানি আবার কয়া উঠলো,
’শূয়ার মাইরছে একডো, হেইডা রাইনত্যাছে’
পাশে থেইকা আরেকজন কয়,
’এগুলার নাম মুহে আনিস না, পাপ অইবো’।

আমার কি মনে অয় জানি না, আরো খানিক আগায়া যাই। ধুতি মালকোছা কইরা পইরা নিয়া আন্দাবাড়ায় নাইগা গ্যাছে একজন। মাটি খুইঁড়া বানাইছে দুইডো হাঁইসাল। একডোত ভাত ফুইটতাছে, আরাকডোতে গোস্তের সালুন। মসল্লার সুবাসে চাইরদিক মৌ মৌ করতাছে। যে মানুষডা আন্দাবাড়া কইরতাছে তার চোহে মুহে কি যে তিরিপ্তি! সাঝ বিহালের রোইদে, আগুনের আঁচে ঘাম জইমা গ্যাছে মানুষডার মুহে। তাও কি তিরিপ্তির আভা ছড়ায়া গাছের শুকনা ডাল ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা দিতাছে সে হাঁইসালের মদ্দে। হে তো ভালো কইরাই জানে ক্ষণেক পরেই তার সামনে পাইবো গরম গরম ভাত আর গোস্তের সালুন। ভাত আর গোস্তের কতা ভাবতে ভাবতেই খালিপ্যাটের মদ্দে য্যান মোচর দিয়ে উঠলো। বাথানের মানুষডা সালুনের হাড়ি হাঁইসাল থেইক্যা নামায়াই হাঁক ছাড়ে,’হে জায়সিং’। বাকি কথাগুলান কানের মদ্দে ঢুকলেও ভালো কইরা বুঝতে পারি না আমি। আরাক মানুষডো আগায়া আসে। ঝোলা থেইকা খাওয়ার থালি আতে নিয়া গরম ভাতের পাতিলডোর ঢাকনা খোলে। নিজেগোর থালিতে গরম ভাত ঢালতেই কেমন নেশা ধরানো গন্ধ ছড়ায় চারিদিকে। আমার তহন খেয়াল অয় গ্যাদাডো হেই গরম ভাতের দিক অপলক চায়া আছে, আর কোন খিতাবি করত্যাছে না। চোখ দুইখান ম্যাঘ বাদল শ্যাষের ধানি জমিনের মতোন ভেজা ভেজা। হেরপর ফুপায়া কাঁইন্দা ওঠে গ্যাদাডা।

’এই ছোড়া, তুমহার ভূক আছে? বেটি ইদিক আয়’।
বাথানের মানুষ দুইজনের মদ্দে বেশি বুড়া মতোন মানুষখান যে আন্নাবাড়া করতাছিল তার শরীলে মনে অয় বেশি মায়াদয়া। আমার দিক আর গ্যাদাগেদির দিক তাকায়ে তার মনে অয় মনডা বেশি তরল অয়-
’তুরা তো কালা খাসি খাবে না, কি হোবে রে খেলে? আয়।’
বলে লোকটা আরেকখান থালিত ভাত বাইড়া দেয়, তারপর গোস্তের সালুন।
’বড় তেল ছিলো রে কালা খাসির’।

আমি আর কিছু ভাবনার মদ্দে আনতে পারি না। গ্যাদাডো চক্ষের পলক না ফেইল্যা চায়া আছে হেই খাওয়ার থালির দিক আর ফোঁপায়া কাইন্দা উঠছে। এদিহে নিজের প্যাটের মদ্দেও মোচরডা আবার মাথা চাড়া দিয়া ওঠে। গ্যাদাডো এবার আমার দিক চায়া আছে। এইটুকুন দুললা মানুষ অইলেও ঠাহর কইরতে পারে কিছু একখান ব্যাপার আছে এজন্য মা খাইবার দিবার চায় না। কলাপাতায় বাদলাদিনের পানির মতোন টপ টপ কইরা চক্ষের পানি গড়ায়া পড়তাছে ওর গাল বায়া। আমি চোখ সরায়া নিলাম গ্যাদার চোখ থেইকা, মনডা যাতে দূর্বল না অয়। শূয়ারগূলান ঘোঁত ঘোঁত কইরা মাটি খুঁইরা খাওয়া খুজত্যাছে। আমার মাথার মদ্দে ঝিম ঝিম কইরতে থাহে। মনে অয় শূয়ারগুলান আমার নিজের মাথা খুঁইড়া খুজতাছে কিছু- কীরহম য্যান আইলাঝাইলা মনে অয় মাথার মদ্দে। হেরপর আর কিচ্ছুই ভাবনায় আইসে না। গ্যাদাডোর আত ধইরা টান মাইরা আগায়া যাই বাথানের মানুষডোর কাছে। ভাতের থালাখান আত বাড়ায়া নিয়া নিলাম। মাটিতে বইসা পড়ি গ্যাদাগেদিরে নিয়া। গরম ভাত, লাল টকটকা গোস্তের ঝাঁঝ নাহে মুখে আইসা থাক্কা খায়। গরম গরম গোস্তের সালুন আর ভাত মাখায়া আগে নিজের মুহে পুইরা দেহি কোন রহমের ঘেন্নার উদ্রেক অয় না, হের বদলে কীরহমের স্বোয়াদে মুখ ভইরা ওঠে। এইবার আমি একমুঠা ভাত আর গোস্তের টুকরো গ্যাদার মুহে পুইরা দেই। কোলের কাছে চুপচাপ, নিস্তেজ হয়া পইরা থাহা গেদিডোর মুহেও কয়েক লোকমা ভাত দেই। গ্যাদাডা ক্যামন গোগ্রাসে শ্যাষ করে ভাতের লোকমা। আমি আরও দিতে থাহি আর নিজেও ভালো কইরা খাই। কিছুক্ষুন খাওয়ার তাড়নায় দিকবিদিক হুশ পাই না। হুশ ফেরে প্যাটের মদ্দে খাওয়া পইরা একডোখান বালো লাগায়। তহন টের পাই গেরামের ছাওয়ালপাল গুলার ওদিক থেইকা ক্যামন গুঞ্জন আসতাছে । আমার আর হেইদিকে ভুরুক্ষেপ কইরতে ইচ্ছা করে না। কোন কিছুই কানের মদ্দে ঢোহে না আর। খালি খাওয়া শেষ হইতে হইতে ঠাহর অয় বাথানের বুড়া মতোন মানুষডা আঙ্গোরের দিক অপলক চায়া আছে। খালি তার কথাডাই কানে আইসে আমার,
’খুউব ভূক ছিল রে বেটি? হামারো তুহার মতো বেটি আছে, বহুত দুর’।


তিন. জ্বলন্ত পাথথর ও ঘেন্নার দহন

মসজিদের সামনে বিরাট জটলা। ওমর আলির পাছে পাছে আইসতে আইসতে এক্ষণে বুইঝতে পারি মুফতি সাব ক্যান এই রাইতের বেলা তলব কইরা পাঠাইছেন। জটলার নিকট যাইতেই দূর থেইক্যা হোনা চাপা কানাঘুষা হাওকাওয়ের আকার নিলো। কেউ একজন হ্যাজাক বাতি জ্বালায়ে আনছে। হেই বাতির আলোয় বেবাকের মুখ দেহা না গেলেও আদলগুলান বুঝা যায় কারা কারা আইছে। একখান আরাম কেদারায় বইসা আছেন মুফতি সাব। এই রাতের বেলাতেও তার পরনে বাহারি প্যান্ট শার্ট। মুফতি সাব সব সময় কন, ’আমি সবার মতো এলেল্লা মুনসি না, আমি পড়ালেখা কইরা মুফতি হইছি। এলেল্লা মুনশিগোর পোশাক আশাক আমি পরি না। ’

আমার সিনার মদ্দে ধুকপুক কইরা ওঠে। কতো মানুষজন জমা অইছে! মানুষজনেরও তো কাম নাই, কাউরে ঠ্যাঙ্গানি দিবার পারলে য্যান নাইচ্যা ওঠে। কোন রকম ভণিতা ছাড়াই মুনসি সাব শুরু কইরলেন,
’সবাই থামেন। রাত অনেক হইছে। বেশি কথার সময় নাই। ইতির মাও তোমারে কেন ডাকা হইছে জানো?
আমি মাথা নিচু কইরা চুপ কইরা থাহি।

’চুপ থাকলে তো অইবো না। তুমি আইজকা বাথানে গিয়া মুচি গো সঙ্গে ভাত খাইছো তাও আবার শূকুরের মাংস দিয়া। তুমি নিজেও খাইছো, পোলাপানগোরেও খাওয়াইছো। মহা পাপ করছো তুমি। মুসলমানের কাজ করো নাই। অহন কও এগুলা করছো কি না?’
আমার মুখ দিয়া কতা ফোটে না। চুপ কইরা থাহি। কী বা উত্তর দিমু?
’আমাদের ধৈর্যহারা কইরো না, উওর দাও’।
’জ্বী খাইছি’। মুখ থেইক্যা খালি এই দুইডা কতা বের অয় আর তাইতেই গুঞ্জন ওঠে আবার। মুফতি সাব হাত তুইলা থামায়া দেন বেবাক রে।
’কেন খাইছো? কোরান পাকে আছে জান বাঁচানো ফরজ, জান বাঁচাইতে খায়া থাকলে জায়েজ আছে। জান বাঁচাইতে খাইছো?’
হেই আগের মতোই আমার মুখ দিয়া কতা ফোটে না। মুফতি সাব অধৈর্যের স্বরে আবার কন,
’কী, জান বাঁচাইতে খাইছো?’
’হ্যা’। আমার চোত মাসের শুকায়া-যাওয়া জমিনের মতো খড়খড়া গলা দিয়া এই একখান কতাই বাইর অয়।
’কেমন মিথ্যা কথা বলে! জান বাঁচানোর হইলে আগে আমাগোরে কাছে আইতা, নবী করিম (সঃ) একরম কত ঘটনা নসিয়ৎ করছেন, হারাম না খায়া বাঁচনের চেষ্টা করছো আগে? কী, কথা কও না ক্যা?’
আমি মাথা নিচু কইরা চুপ থাকি। ইতির বাপের কতা মনে অয়। হে থাকলে তাও সাহস পাইতাম। মুফতি সাব অর্ধৈয্য হয়া পরেন। সালিশের ভিড়ের মদ্দে থেইক্যা কেডো জানি ফোরন কাইটা কয়- ’মাইরের ওপর অষুধ নাই’।
একতা হুইনা আমার মুখ খোলে, ক্যামনে জানি সাহস পাই--
’আপনের কাছ থেইক্যাই তো হুনছি নিজে খাওয়ার সময় শরিকের কেউ না খায়া আছে কিনা খোঁজ নিতে কইছেন আঙ্গর নবীকরিম, কেউ তো খোঁজ নেয় না’।
’ভালোই তো কথার পিঠে কথা শিখছো ইতির মাও। কেউ খোজ নেয় নাই বইলা তো তুমি হারাম খাইবার পারো না। নিজেও পাপ করছো, নিজের পোলা মাইয়াকেও করাইছো। ওরা নাবালক, ওদের পাপও তোমার ঘারে। তোমার মান ইজ্জত, ধর্ম কর্মের ভয় নাই?’ হারাম খাইছো তুমি।’
’খিদা প্যাটে গ্যাদাডো মইরতে নিছিলো, কি করমু হারাম না খায়া? কত মানূষই তো হারাম রোজগারের ভাত মাংস খায়, দ্যাশডোই তো হারামের ট্যাহায় চলে, তাগোর তো বিচার অয় না!’
’আবার মিথ্যা কথা কও! একদিন উপাস থাকলে কেউ মরে না। তাছাড়া কার বিচার অইবো না অইবো হেগুলা তোমার দেখতে হবে না। তুমি তওবা করবা সবার সামনে আর বাঁশের কঞ্চির সাত ঘা, ছেলে-মেয়ে দুইটার জন্য সাত দুগুনে দৌদ্দ, মোট একুশ ঘা খাইবা। কারো কিছু কওয়ার আছে?’
মফিজ মুনসী সায় দেয়,
’মুফতি সাব হক বিচার হইছে, অপরাধের তুলনায় একটু কমই হইলো, কি আর করা।’
’নেও ইতির মা, আমার সঙ্গে সঙ্গে তওবা পড়ো, তওবা তওবা ওয়াস্তাকফিরুল্লা রাব্বি মিনকুল্লে...’
আমার মনের মদ্দেও ক্যামুন গুনার ভয় কাজ করে, আমি মুফতি সাবের লাগান বিড় বিড় কইরা কইতে থাকি, তওবা তওবা ওয়াস্তাকফিরুল্লা.....।
তওবা শ্যাষ হইলে মুফতি সাব ওমর আলিরে ডাহেন ,
’বাঁশের কঞ্চি আনো, মেয়েলোক কে বেআব্রু করার দরকার নাই। কাপড়ের উপর দিয়াই পিঠে একুশ ঘা লাগাও।’
ওমর আলি বাঁশের কঞ্চি নিয়া আসে। আমি ঠায় দাঁড়ায়া থাহি। প্রথম ঘা পড়তেই চিকন ধারালো ব্যথা শিড়দারা বায়া নামে। আমার মুখ দিয়া আহ কইরা আওয়াজ বাইড় অয়। গ্যাদাডো তড়াশে কাইন্দা ওঠে। ওমর আলি গুইন্যা গুইন্যা মারতে থাহে আমার পিঠে। পাতলা ত্যানা ত্যানা কাপড়ের ওপর দিয়া কঞ্চির বাড়ি চামড়ায় দাগ দিয়া ঢুইকা যায়। কয়াকবার বিষব্যথার পর আমি আর কিছু টের পাই না। মনে অয় অবশ পিঠ, শিরদাঁড়া। গেদিডো কোলে থেইক্যা খইস্যা পড়ে, মাটিতে গড়াগড়ি যায়, তোলার শক্তিও পাই না। ওমর আলি কুড়ি গোনার হাতে হাতে মুফতি সাব থামতে কন।
’খারা, এই একটা ঘা ওই ছেলের হাতে মার, ছেলে নাবালক হইলেও একেবারে ছোট না। ওরও শিক্ষাটা মনে থাকা দরকার।’
একথায় আমি চেঁচায়া উঠি,
’না! পাপ যা অইছে, আমার অইছে। আমার গ্যাদার গায়ে আত দিবেন না।’
আমার গলায় কি আছিলো জানি না; ওমর আলি থতমত খায়া মুফতি সাবের দিক চায়া থাকে। মুফতি সাব মাথা নাইড়া ইশারা করেন। ওমর আলি কয়,
’ এই ছ্যাড়া, আত পাত’।

কাঁইনতে কাঁইনতেই তড়াশে আত পাতে গ্যাদাডো আমার আর ওমর আলি বাঁশের কঞ্চি দিয়া মারে। ওই দুললা এতোটুকুন গ্যাদাডোর চোহের পানি আর হ্যাজাক বাতির আলোয় আমার কি জানি অয়। আবার চক্ষের সামনে শূয়ারগুলার ঘোঁত ঘোঁত কইরা মাটি খোঁড়া দেখতে পাই। মাথার মদ্দে আইলাঝাইলা নাগে। মনে অয় শূয়ারগুলান ঘোঁত ঘোঁত কইরা আমার নিজের মাথার মদ্দে আতিপাতি কইরা কিছু খুঁজতাছে। আমার আর কোন তাল জ্ঞান থাহে না। পাগলের মতোন মুফতির পাশে বইসা থাকা মুফতির ছোট ছাওয়ালডোর ওপর ঝাপায়া পড়ি। চড় কষাই তার গালে, আর কইতে থাহি, ’দ্যাহেন ক্যামুন নাগে, নিজের গ্যাদারে মারলে ক্যামুন নাগে।’
নিমেষের মদ্দেই ঘইটা যায় এইসব। মুফতি লাফায়া ওঠে চেয়ার থেইকা।
’হারামজাদি, এতো বড় সাহস। আমার ছেলের গায়ে হাত দিছোস, হারামখাকি।’
বলেই দৌড়ায়া আসে আর আমার চুলের মুঠি ধইরা টান মারে।
’ওমর আলি, কেচি আন। হারামখাকিরে আইজ নাইরা কইরা মাথায় ঘোল ঢালমু’

ওমর আলি করিৎ কর্মার মতোন কোথা থেইকা য্যান কেচি নিয়া আসে। মুফতি নিজ আতে আমার চুল ধইরা গুছি কইরা কাটতে শুরু করে। চাইরদিক থেইক্যা কানাঘুষা ছাড়া আর কিছু হোনা যায় না। মুফতির বিরুদ্ধেও কেউ কিছু কওয়ার সাহস করে না। য্যান বিচারের বাইরে মুফতির গ্যাদারে মাইরা আমার আরও বেশি অন্যায় অইছে। আমি আলুথালু বেশে পাগলের মতোন কানতে থাহি। মাথার মদ্দে আবারো শুয়ারগুলার ঘোঁত ঘোঁত কইরা খোঁড়ার আওয়াজ হুইনতে পাই। কাইটা-ফেলা চুলগুলা মুখে আইসা নাগে। কিন্তুক আমার দুনিয়ায় আর কিছুই থাহে না, এত্তো আওয়াজের মদ্দে খালি কানে ভাইসা আসে গ্যাদা আর গেদিডোর তারস্বরের চিৎকার!

আশেপাশে কোন মানুষজন দেখতে পাই না আমি। খালি মনে অয় মাঘি মাসের ঘন কুয়াশায় ঢাইকা আছে ধূ ধূ চরাচর। সামনে অতি উচু আসনে কেউ বিচারকের ভঙ্গিতে বইসা আছেন। তার চেহারা খান দেহা যায় না। আমাক দাড় করায়া দিছে একখান গরম পাথরের ওপরে। একি হাশরের মাঠ? বিচার হইতাছে আমার? বিচারক গমগমে গলায় কি কি খাইছি তারই সোয়াল করেন।

পায়ের তলায় গরম পাথরের ছ্যাকা নাগে। তাইলে কি মক্তবে হোনা হেই হাশরের মাঠের বিচারের দিন এইডা? যারা পাপিষ্ঠ, নেক বান্দা না গরম পাথরের উত্তাপে তাগোর মাথার মগজ গইল্যা বাইর হয়া যাইবো? আমি পেরাণপণে কওয়ার চেষ্টা করি, ’আমি ভাত গোস্ত খাইছি, আর কিছু না’। কিন্তু পারি না কিছু কইতে। পায়ের নিচ থেইক্যা উত্তাপ আরো বাড়তে থাহে। আমি কেরমে কেরমে বুঝইতে পারি আর কোন উপায় নাই। মাথার মদ্দে আবারো শূয়ারগুলার ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ হুনতে পাই, খুঁইড়া যায় শূয়ারের পাল। বমি বমি ভাব আইসে। আর তহনই মনে অয় এই তো বাঁচার উপায়! আমি পেরাণপণে শরীরের ভেতর থেইক্যা সব উগরায়া বাইর কইরা নিয়া আসার চেষ্টা করি। যঠরের সমস্ত ঘেন্না দলাপাকা বমি হয়া বের হয়া আসে। মাথা নিচু কইরা লাল জ্বলন্ত পাথরটারে তাক করি। অফুরন্ত বমির জোয়ারে গনগনে পাথরের আগুন নিভা আসতে থাহে। আমি দুইহাত আসমানের দিক ভাসায়া চিন্তা করি, আমি বাঁইচা আছি। আর গলা ফাটায়া চিৎকার কইরা কইতে থাহি-

’আমি যে হারাম খাইছি তা উগরাইতাছি না, বেবাকের দিক ঘিন্না উগরাইতাছি, ঘিন্না’,
হেরপর আর কিছু মনে নাই। গড়ায়া পড়ি নেওর ভেজা মাটির কোলে।

টাইপরাইটার
চিলেকোঠার এই ঘরটা থেকে সকালবেলার সূর্যের আলো দেখতে হলে দশটা নাগাদ ঘুমাতে হয়; এমনিতেই ঢাকা শহরের সকাল মানেই ঘন কুয়াশা বা ধোঁয়ার আবরণে ঢাকা আকাশ, অনেকটা ভাবলেশহীন চোখের নির্বিকার ঘোলাটে পর্দার মতো। তার ওপরে এলোমেলো বাড়িঘর উঠে এই চিলেকোঠার পুর্ব-দখিনমুখী সীমানার চেহারা একেবারে বদলে দিয়েছে, ঠিক যেন মেধাহীন অংকনশিল্পীর আনাড়ি হাতের তুলির পোচে নোংরা করা আকাশের ক্যানভাস। তবু বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভ্যাপসা গরমে শরীরের লোমকুপে জমে-থাকা ঘামের গতরে হাট-করে-খুলে-থাকা-দরজা-দিয়ে-আসা সকালের বাতাসের আরামটা পেতে পেতে মনে হয় ভোরের সূর্যের আলোটা চোখে এসে লাগুক, ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে যাক আজ। কিন্তু তা আর হয় না। তাই বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়, আর উঠেই চোখে পড়ে মাথার কাছে ভাঙ্গাচোরা টেবিলটার ওপরে টাইপরাইটার টা রাখা; ছোট, সুন্দর, সুদৃশ্য দামি একটা টাইপরাইটার।

মাত্র ক’দিন আগে ডলি আপা তার ছয় মাসের অফিসিয়াল ট্যুর শেষ করে লন্ডন থেকে ফিরে আসার সময় রেমিংটন ব্রান্ডের এই টাইপরাইটার টা নিয়ে এসেছেন। বড়সড় পরিবারের এতো মানুষ থাকতে তাকেই কেনো টাইপরাইটারটা দিলেন ডলি আপা, একথার কুলকিনারা খুজতে গিয়ে তুষার প্রথমে গভীরভাবে অপমানিত বোধ করে। সে বেকার। বাবার বাড়িতে চিলেকোঠায় অলস দিনযাপন করছে বলেই কি ডলি আপার মনে হলো- নে অন্তত টাইপটা শিখে নে, নিদেন পক্ষে অফিসের কেরানির চাকরিটা পাবি? নিজের আত্নসম্মানের বেলুনে টুস করে একটা আলপিনের ঘা লাগে। কিন্তু বেলুনটা ফেটে যাবার আগেই ডলি আপার মোবাইল ফোন আসেঃ
’কি রে টাইপরাইটার টা পছন্দ হয়েছে তোর? এটা কিন্তু আমার ফেভারিট একটা জিনিস।’
’ফেভারিট জিনিসটা আমাকে দিলেন কেন ডলি আপা?’
’আরে গাধা, তুই ও আমার ফেভারিট তাই।’
’কিন্তু লন্ডন গিয়ে বাংলা টাইপরাইটার কিনলেন কীভাবে?’
’আরে গাধা বাংলা জন্যেই তো কিনেছিলাম, একটা এন্টিকের দোকান থেকে।’

ডলি আপার ’আরে গাধা’ সম্বোধনের বাতিক আছে। আর তিনি তা করেন শুধু প্রিয় মানুষদের সঙ্গে। তুষারের অস্বস্তিটা কেটে যায়। নিচে নেমে তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে আবার চিলেকোঠায় উঠে আসে সে। বিছানার একপাশে বসে টেবিলটা টেনে কাছে আনে। তারপর অনভ্যস্ত হাতে টাইপ রাইটারটার অক্ষরগুলোর গায়ে হাত রাখে। একটা আঙ্গুল দিয়ে টিপে টিপে লিখতে শুরু করে। খট খটাং শব্দে কার্বন রোলে বাড়ি খাচ্ছে প্রতিটি কীস্ট্রোক। তুষার বেশ মজা পেয়ে যায়। এবার পুরনো কাগজপত্র থেকে একটা ধবধবে শাদা কাগজ এনে ভরে সেই টাইপরাইটারের ভেতরে। ধরলেই বোঝা যায় এই টাইপরাইটার টা গলির মোড়ের দোকানে দেখা টাইপরাইটারগুলোর মতো না। এটার খট খটাং শব্দটাও বেশ মোলায়েম, সৌখিন। তুষার আনাড়ী হাতে ধীরে ধীরে লিখতে থাকে, আমি তোমাকে ভালবাসি।

আজকে টাইপরাইটার জন্য সকালের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেলো। এখন বাজে সাড়ে এগাড়োটা। প্রতিদিন ঠিক এগারোটার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির কাছাকাছি গলিতে কয়েকটা মোচর খেয়ে একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে থামে তুষার। এই বাড়িটাতে একটা নাচের স্কুল খুলেছেন দেশের নামকরা একজন নৃত্যশিল্পী। একদম সকালের গ্রুপে নাচ শিখতে আসে ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে মেয়েরা। আর ঠিক এগারোটা শুরু হয় একটু বড়দের নাচ শেখা, ভরত নাট্যম। এই দলে নাচ শিখতে আসে একটি মেয়ে; তুষার তার নাম দিয়েছে ময়ূরী। মানুষ এতো সুন্দর হয় কী করে? ময়ূরীর দিকে তাকালে মনে হয় এই ঢাকা শহরে ট্র্যাফিক জ্যাম, ধোয়া, হট্টগোল, নোংরা ড্রেন, পথের ধারের স্তুপাকার আবর্জনা, মানুষের শঠতা, জোচ্চুরি, সব কিছু কেমন বিলিন হয়ে গেছে। ময়ূরী যখন নাচতে থাকে তখন আশেপাশের সবাইকে বলতে ইচ্ছে করে, কিছু মনে কোরো না, তোমরা নাচ ছেড়ে হারমোনিয়াম ধরো। তাতে হয়তো কিছু একটা হবে। ময়ূরী ঠিক ময়ূরীর মতো গ্রীবাভঙ্গিমায় নাচে। তুষার অন্তত কুড়িবার এই বাড়ির সামনে দিয়ে যায় আর আসে। ঠিক দাঁড়ায় না জানালার সামনে। কিন্তু জানালা দিয়ে যতক্ষণ দেখা যায় দেখতে থাকে সে। এখন থেকে তার প্রতিদিনের রুটিনে আরেকটা নতুন রুটিন যোগ হলো। ঘরে ফিরে টাইপরাইটার নিয়ে বসা।

টাইপরাইটারের অক্ষরগুলো যেন একেকটা খোসা ছাড়ানো চিনা বাদাম; হাত দিয়ে আলতো করে ধরতে ভালো লাগে। তারপর মুখে পুড়ে ওম শান্িতর মতো খটাং করে টিপে দিলেই শাদা কাগজে জেগে ওঠে অক্ষর। তুষারের হাতে যেন বিদ্যুৎ গতি এসে যায় খুব দ্রুত। আঙ্গুল ছড়িয়ে অক্ষরগুলোর ওপরে বসালেই যেন সূক্ষ্ন মিহি তারের গ্রন্থি বেয়ে উঠে আসে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। প্রতিদিন অপ্রকৃতস্থের মতো টাইপ করতে থাকে তুষার।

আজকে সকালবেলা সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙ্গাতে খুব অবাক হয়ে চোখ খুললো তুষার। শরীরের কোথায় যেন একটা ক্লান্ত, অবসন্ন ভাব। তবে কি ভালো ঘুম হয় নি? ভাবতে ভাবতে মাথার পাশে রাখা টাইপরাইটার দিকে চোখ যায়। পাশে অনেক কাগজের স্তুপ হয়ে গেছে। আরেক পাশে আজকের দৈনিক কাগজ। প্রতিদিন বাবা কাগজ পড়া শেষ করলে নিচে থেকে রহিম মিয়া নিউজপেপারটা ওপরে দিয়ে যায়। অথবা নাস্তার সময় সে নিজেই নিয়ে আসে। আজকে দেরিতে উঠেছে ঘুম থেকে তাই কাগজটা দিয়ে গেছে রহিম মিয়া। তুষার বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাগজটা হাতে নেয়। অলসভাবে পড়তে শুরু করে। সেই পুরনো ভাষায় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ শিরোনাম, ’দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে’, ’হরতাল, অরোধের মাধ্যমে সরকারকে দাঁতভাঙ্গা জবাবের হুমকি দিয়েছে বিরোধী দল’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তুষার চোখ বুলাতে বুলাতে মাঝের পাতায় চলে আসে। হঠাৎ একটা ছোট্ট ছবি আর সংবাদে চোখ আটকে যায়-মালিবাগে দূর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে তরুনী নিহত। বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটার মতো হূদস্পন্দন নিয়ে খবরটা পড়তে থাকে তুষার। মালিবাগের মাটির মসজিদের পাশের গলিতে দশম শ্রেনীর ছাত্রী পারভীন আক্তারকে রাতের অন্ধকারে এক দূর্বৃত্ত ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। রাতের অন্ধকারে ঘরে ঢুকে প্রথমে তাকে ক্লোরোফরম দিয়ে অজ্ঞান করা হয়। তারপর একেবারে দক্ষহাতে বুকের বাঁ পাশে একটি মাত্র ছুরির চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছুরির ফলা হূৎপিন্ড ভেদ করে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে পারভীন আক্তারের। গোয়েন্দা পুলিশ ময়নাতদন্ত শেষে ধারণা করছে কেউ একজন আগে থেকেই পারভীন আক্তারের গতিবিধি লক্ষ্য করে তাকে অনুসরণ করে এবং সুযোগ বুঝে পেশাদার দক্ষ খুনীর মতো হত্যা করেছে। এখন পর্যন্ত এই খুনের কোন কারণ বা উদ্দেশ্য জানা যায় নি। তুষার মনে মনে ভাবে মানুষই পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী যারা পরিকল্পণা করে ঠান্ডা মাথায় একজন আরেকজনকে হত্যা করতে পারে। অন্য কোন প্রাণীর এই ক্ষমতা নেই। কিন্তু সমস্ত ভাবনা ছাপিয়ে তার চোখে ভাসছে পারভীন আক্তারের ছবিটা। দেখতে হুবহু নাচের স্কুলের সেই মেয়েটির মতো। যার নাম দিয়েছে সে ময়ূরী!

তুষার তড়িৎ গতিতে বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে আসে। নাস্তা করার কথাও ভুলে যায় সে। গলির মোড়গুলো পার হয়ে চলে আসে সেই একতলা বাড়িটার সামনে যেখানে নাচের স্কুল। উদগ্রীব হয়ে খুঁজতে থাকে সেই মেয়েটির মুখ। এখনও কি শুরু হয় নি বড়দের নাচের ক্লাস? না কি সে-ই পত্রিকার পাতায় দেখা পারভীন আক্তার? তুষার উদভ্রান্েতর মতো এক মুখ থেকে অন্য মুখে চোখ ঘুরিয়ে নিতে থাকে। এক সময় সে সব কিছু ভুলে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বুকের ভেতরে হাতুড়ির শব্দ, যেন নিজের হূৎপিন্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। তারপর চোখে পড়ে ময়ূরীকে। মাথা নিচু করে এক অপরূপ নাচের ভঙ্গিমায় ধীরে ধীরে মুখ তোলে ময়ূরী। তুষার জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়ায়, হাফ ছেড়ে গ্রীলের গায়ে মাথা এলিয়ে দেয়। ময়ূরী বেঁচে আছে।

পরবর্তী ছয় মাসে ঢাকা শহরে একের পর এক ছয়জন তরুনী খুন হলো। প্রত্যেকটা ঘটনা একেবারে একরকম। কেউ একজন প্রথমে অনুসরণ করে, গতিবিধি লক্ষ্য করে তারপর সুযোগ বুঝে ছুরি চালিয়ে হত্যা করেছে। প্রত্যেকবার একটি মাত্র ছুরির আঘাত, বুকের বাঁ পাশে, স্তনের নিচে একেবারে হূৎপিন্ড ভেদ করে চলে গেছে ছুরি। ছুরি চালানোর আগে ক্লোরোফরম দিয়ে অজ্ঞান করে নেয়া হয় ভিক্টিমকে। গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা এটা কোন সাইকোপ্যাথিক সিরিয়াল কিলারের কাজ। পত্রপত্রিকায় নানান রকমের গল্প ছাপা হতে থাকে এই সিরিয়াল কিলার কে নিয়ে। ভয়, আশঙ্কা, আর নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে সাধারণ জনগণ বাস করছে বিশেষ করে যাদের বাড়িতে তরুনী কন্যা আছে তারা। নানা রকমের জল্পনা কল্পণা, চায়ের টেবিলে, আড্ডাখানায়, সবখানে। সুযোগ বুঝে মেধাহীন দুয়েকজন নাট্যকার টেলিভিশনে বেশ নাটকও ফেঁদে বসেছে এই ঘটনার প্রতি মানুষের মনোযোগ লক্ষ্য করে। আর কেউ লক্ষ্য করুক আর নাই করুক, তূষারে কিন্তু লক্ষ্য করেছে একটা বিষয়- এই ছয়জন ভিক্টিমের সবাই দেখতে প্রায় একই রকম; সবাই দেখতে ঠিক ময়ূরীর মতো!

সন্ধ্যারাত থেকে একটানা মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এতো বৃষ্টি যে মনে হয় আকাশ ভেঙ্গে পড়বে। তুষার বিছানার পাশে বসে টাইপরাইটার গায়ে হাত রাখে। আলতো করে অক্ষরগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। আবার মনে হয় ঠিক যেন খোসা ছাড়ানো চিনা বাদামের মতো; একেকটা অক্ষর যেন সাস্থ্যবতী সূর্যমুখী ফুলের ঝকঝকে চকচকে বীচি। তুষার অক্ষরগুলোর গায়ে হাত রেখে বিদ্যুৎ তরঙ্গ অনুভব করে। মনে হয় আঙ্গুলের স্নায়ুজাল বেয়ে সেই তরঙ্গ ছড়িয়ে যায় সারা শরীরে, অণুতে পরমাণুতে। তুষার হঠাৎ লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নিচে নামে। তারপর পাগলের মতো হাতড়ে খুঁজতে থাকে কিছু খাটের নিচে। একটা কালো রঙের কাপড়ের ব্যাগ টেনে বের করে আনে। ছোট সাইজের এই ব্যাগটার গায়ে চেইন লাগানো। সাঁই করে খুলে ফেলে সেটা। ভেতরে হাতড়ে দেখতে থাকে কি আছে সেই ব্যাগে; একটা ব্যাটারি ভরা টর্চ লাইট , কালো কাপড়, একটা রুমাল, চামড়ার খাপে ভরা একটা চকচকে ছুরি, সেটা দ্রুত বের করে আবার ভরে ফেলে সে, একটা শিশি যার গায়ে লেখা ক্লোরোফরম!



লেখক পরিচিতি
সেজান মাহমুদ

জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার সমেশপুর গ্রামে। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস (১৯৯২) পাশ করার পর আমেরিকার বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যলয় থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ফেলোশিপ (১৯৯৬), এমপিএইচ (১৯৯৭) এবং বার্মিংহাম থেকে পিএইচডি (২০০১) করেন।

সাহিত্যে তার বিচরণ বহুবিধ ক্ষেত্রে। তিনি লেখক, গীতিকার ও কলামিস্ট হিসেবেও খ্যাতিমান। লেখক হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তিনি প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেন। তার লেখা ষষ্ঠ শ্রেণির জাতীয় পাঠ্যবইতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের পাশাপাশি (১৯৯৬)। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস ‘মনের ঘুড়ি লাটাই’ অবলম্বনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।

বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেতারের গীতিকার হিসেবে লিখেছেন ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’সহ অনেক জনপ্রিয় গান। সম্প্রতি ডোমদের জীবন নিয়ে পরিচালনা করেছেন তথ্যচিত্র ‘লাশকাটা ঘর’ (২০১৩) যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
অগ্নিবালক (নিরিক্ষাধর্মী উপন্যাস), অপারেশন জ্যাকপট (মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডোদের অকথিত সত্য ঘটনার বিবরণ), মুক্তিযুদ্ধের কিশোর রচনা সমগ্র-১, বিজ্ঞান নির্ভর এডভেঞ্চার সমগ্র-১, পথ হারানোর পথ (কলাম সমগ্র-১), আয়ুষ্কাল ও ত্রিমিলার প্রেম (কল্প-বিজ্ঞান উপন্যাস), লীথী (কল্প-বিজ্ঞান উপন্যাস), হারাম ও অন্যান্য গল্প (গল্পগ্রন্থ), প্রোজেক্ট ভূতং আধুনিকং (কিশোর গল্পগ্রন্থ), হাবিজাবি (ছড়া গ্রন্থ), বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ অভিযাত্রী, ‘ছড়ায় ছড়ায় সায়েন্স ফিকশন’ সহ ২৫ টা গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।

পুরস্কার:
বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পুরস্কার (১৯৮৮), হুজ হু ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (২০০৯), আমেরিকান পাবলিক হেলথ এসোসিয়েশন আরলি ক্যারিয়ার এওয়ার্ড (২০০৬), আওয়ার প্রাইড এওয়ার্ড (২০০৫), এলাবামা পাওয়ার ফাউন্ডেশন আউটস্ট্যান্ডিং এচিভমেন্ট এওয়ার্ড (২০০০)।

বর্তমানে ফ্লোরিডা এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক এবং ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব মেডিসিন এর ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মরত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন