বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

পিয়াস মজিদ : ২০১৫ সালে পড়া গল্পের সালতামামি

পিয়াস মজিদ  মূলত কবি। প্রবন্ধ লিখেন। বেরিয়েছে গল্পের বইও। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায়। পড়ালেখা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মরত আছেন বাংলা একাডেমিতে।

প্রকাশিত গ্রন্থ, কবিতা: নাচপ্রতিমার লাশ ( ২০০৯), মারবেল ফলের মওসুম (২০১১), গোধূলিগুচ্ছ (২০১৩); প্রবন্ধ: করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১২), কবিতাজীবনী (২০১৪), গল্প: ক্ষত আত্মার বিজ্ঞপ্তি (২০১০)।
এছাড়া সম্পাদনাও করেছেন কয়েকটি বই। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন ‘এইচ এস বি সি কালি ও কলম পুরস্কার ২০১২’। piasmajid@yahoo.com
গল্পপাঠ : ১
২০১৫ তে কত সংখ্যক গল্প পড়েছেন?

পিয়াস মজিদ : ১
সুনির্দিষ্ট সংখ্যা মনে নেই, তবে শ’খানেক গল্প তো হবেই। 


গল্পপাঠ :২ 
কোন কোন মাধ্যম থেকে গল্পগুলো পড়েছেন?

পিয়াস মজিদ : ২ 
 গল্পের বই, সংকলন একটা বড় মাধ্যম গল্প পড়ার। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী, সাহিত্য ম্যাগাজিন, ওয়েবজিন বা ফেসবুক পোস্ট-- এসব মাধ্যমেও পড়েছি অনেক গল্প।


গল্পপাঠ : ৩
কোন কোন গল্পকারের গল্প পড়েছেন?

পিয়াস মজিদ : ৩ 
 গার্সিয়া মার্কেস, কাফকা, মো ইয়ান, কাশ্মিরি ছোটগল্প, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান আজিজুল হক, রশীদ হায়দার, সন্দীপন সট্টোপাধ্যায়, রবিশংকর বল, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, হর্ষ দত্ত, কুনাল বসু, কবি উৎপলকুমার বসু, যশোধরা রায়চৌধুরী, শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, নাসরীন জাহান, মাসুদা ভাট্টি, অদিতি ফাল্গুনী, আহমাদ মোস্তফা কামাল, শাহদুজ্জামানসহ দেশ-বিদেশের অনেক নতুন ও পুরনো গল্প পড়া হলো এ বছর। 


গল্পপাঠ : ৪
এরমধ্যে ভাললাগার গল্পগুলোর কয়েকটি নাম করুন। গল্পগুলো ভাল হয়ে উঠেছে কি কারণে সে গুলো উল্লেখ করুন।

পিয়াস মজিদ : ৪ 
 ভালো লাগা গল্পের মধ্যে আছে হর্ষ দত্তের একটি গল্প শূন্যরূপা। পূজা সংখ্যা দেশ-এ পড়লাম। প্রতিমা নির্মাণকলার সঙ্গে যুক্ত এক যুবকের জীবনযুদ্ধ আর তারই সমান্তরালে যৌন ফ্যান্টাসি দারুণভাবে ফুটে ওঠেছে গল্পটিতে।

রশীদ হায়দারের একটি গল্প পর্বত ভালো লাগলো। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাজনৈতিক ডামাডোলের বাইরে গিয়ে লেখা মানবিকতার উদ্ভাসনময় অনন্য গল্প। সাইবেরিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে শীতের পাখি হিমালয়ের চেয়েও বড় পর্বতে ধাক্কা খায়; যে পর্বতের নাম-- শেখ মুজিবুর রহমান। টুঙ্গিপাড়ার উদার আকাশে তাদের স্বাগত জানান পর্বতসম মানুষটি।

অদিতি ফাল্গুনীর গল্প আমলকি গাছ, তার আস্তিকতা অথবা রক্তপ্রবাহ পড়েও ভালো লেগেছে খুব। সাম্প্রতিক খুনি হাওয়ার মৌসুমকে অদ্ভুত ব্যঞ্জনায় গল্প করে তুলেছেন তিনি।

মাসুদা ভাট্টির প্রাগৈতিহাসিক ২০১৫ গল্পটি গল্পকারের কণ্ঠে এক আড্ডায় শুনলাম সেদিন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের প্যারালালে এখনকার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ উদ্ভাসিত হয়েছে এই গল্পে, যা ভালো লাগার মতো।

স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর একটি প্রেমের গল্প পড়া হয়েছে আমাদের পাড়ার স্পাইডারম্যান শিরোনামে। খর্ব সময়বাস্তবে অধরা প্রেমকে স্পাইডারম্যান হয়ে খুঁজতে থাকার কথা নিপুণ গল্পে বয়ান করেছেন তিনি।

আহমেদ খান হীরক নামে তরুণতর এক গল্পকারের গল্প ভালো লাগলো। সিলগালা মহল্লার বেলকনিরা শীর্ষক গল্পে অনেকদিন পরে মহল্লার দেখা পেলাম, যে মহল্লা ছাড়া কোন সদর তৈরি হয় না। 


গল্পপাঠ : ৫
সেরা গল্পটি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ বলুন।

পিয়াস মজিদ : ৫ 
 বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের প্রথম দিকের একটি গল্প ফিরে ফিরে পড়ি আমি। নাম মেঘনা। এই সেদিন আবারও পড়লাম। আবারও প্রিয় তালিকা দখল করে নিল গল্পটি। দুজন নিম্নবর্গিয় মানুষ, যাদের জীবনে কোন রং নেই, প্রেম নেই, স্বাচ্ছন্দ্য নেই এমন রুঠাসুঠা বিবর্ণ দুই মানুষ নৌকায় করে মেঘনা পাড়ি দিতে থাকে। নৌকায় ভাত রান্নার ব্যবস্থা নেই। মুড়ি খেয়ে দিন কাটছে। অপেক্ষায় আছে তারা-- নৌকা কূলে ভিড়ার আর ভাত খাওয়ার। এর মাঝেই হঠাৎ বস্তাবন্দি একটা কিছু নৌকার সঙ্গে ধাক্কা খেলে সেটা খুলে তারা আবিষ্কার করে অজ্ঞান নারীদেহ। প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল তাকে নৌকায় উঠানো নিয়ে কারণ যেখানে তাদের নিজের জীবনই দুঃখ ও দারিদ্র্যে ভরা সেখানে আর একজন বিপদগ্রস্থ নারীকে নিয়ে নৌকাযাত্রা সঙ্গত মনে হয়নি প্রথমে। কিন্তু পরে মানবিকতার আহ্বানে তারা তাকে নৌকায় তুলল, সেবাশুশ্র“ষা করল। সে নারীর বিশ্রাম নেয়ার মুহূর্তভাগেই ঐ দু’জন পুরুষ অজ্ঞাতে পরস্পর পরস্পরের শত্র“ হয়ে উঠলো; আগন্তুক নারীকে ঘিরে। দু’জনই নিজের করে চায় তাকে। যখন নারীটির জ্ঞান ফিরলো তখন তারা দু’জনে তার অধিকার পেতে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হলো। রক্তাক্ত উভয়ের চিৎকার আর হঠাৎ মাঝিহীন নৌকার দুলুনির মাঝে পড়ে জ্ঞান-ফেরা নারীটি হঠাৎ অঝোর ধারায় বমি করতে লাগলো। লড়াই থামিয়ে তারা জিজ্ঞাসা করে জানলো মেয়েটি মরণঘাতী কোনো রোগে আক্রান্ত তাই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা জীবিত তাকে জোরপূর্বক বস্তাবন্দী করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। ভাসতে ভাসতেই সে তাদের নৌকায় এসে ভিড়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার মেয়েটিকে ঘিরে একটু আগে বিভক্ত দু’জন পুরুষ এই কথা শুনে মুহূর্তেই এক হয়ে গিয়ে আবার তাকে জোরপূর্বক বস্তাবন্দী করে নদীতে ভাসিয়ে দ্রুত নৌকা চালিয়ে চলে গেলো। গল্পকারের ভাষায় ‘মেয়েটিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তারা দু’জন জীবনের দিকে পালাতে লাগলো।’

এই শেষ লাইনটির জন্য গল্পটি ফিরে ফিরে অধিকার করে থাকে আমাকে। স্বার্থের প্রয়োজনে অসহায় নারীকে মাঝনদীতে ভাসিয়ে দিয়ে যে জীবনে প্রত্যাবর্তিত হল যে দু’জন এলেবেলে পুরুষ-- তাদের নিজের জীবন তো মৃত্যুর চেয়ে খুব একটা উন্নত কিছু নয়। তাই এই জীবনের দিকে পালাতে থাকা ছাড়া তাদের আর কোন গন্তব্য থাকে না। 



গল্পপাঠ : ৬
আপনি কি মনে করেন এই গল্পগুলো বাংলাদেশের চিরায়ত গল্পগুলোর সমতূল্য বা তাদেরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে?

পিয়াস মজিদ : ৬ 
 সমকালীন গল্পই তো এক সময় চিরায়ত হবে। সাময়িক প্রসঙ্গকে ছাপিয়ে গল্পে নিহিত অন্তর্বস্তুর গুণে বহুকাল মনে রাখার মতো গল্পই চিরায়তের মর্যাদা পাবে বলে আমি মনে করি।

অতিক্রমের বিষয়টি বলা কঠিন। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় লেখা এক একটি গল্পের প্রত্যেকটি যেহেতু তার নিজের মতো তাই অতিক্রমের বিষয়টিও আপেক্ষিক। 


গল্পপাঠ :৭
বিদেশী গল্পের সাথে এর মানকে কিভাবে তুলনা করবেন?

পিয়াস মজিদ : ৭ 
 পটভূমির একটি পার্থক্য তো দেশি ও বিদেশি গল্পের মধ্যে অনিবার্যভাবে আছে। সেটি বাদ দিলে গল্পের করণকাঠামো, ভাষাবয়ান, বিষয়ের বৈচিত্র্য ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বলতে পারি বাংলা ছোটগল্প মোটেও মরে যায়নি, বিচিত্র দিকে বাঁক নিয়েছে মাত্র। বিশ্ব-গল্পসাহিত্যের বিচারে মানোত্তীর্ণও বটে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন