বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

সুমন পাত্রের গল্প : বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়ার গল্প

আমি এমএসসি ছেড়ে দিচ্ছি,এই কথাটা বাবাকে বলা খুব মুসকিল। লেখাপড়ায় যেহেতু ভাল,বাবা চেয়েছিল একটা স্ট্যন্ড করা ছেলে। বাবা জানে এটা একটা পাগলামি, মানুষের মাঝে মাঝে এরকম হয়। বাবা জানে মানুষের এই অস্থিরতা কেটে যায়,এসব অল্প কয়েকদিনের। তবু আমি সব ছেড়ে হাত পা ধুয়ে ফেলতে চাই। এই পৃথিবী দিনদিন ধ্বংস হচ্ছে। বাবা বুঝবেন না আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের বেঁচে যাওয়ার উপায় নাই।


আমি এমএসসি ছেড়ে দিচ্ছি। জীবনের কদর্যতা দিনদিন বাড়ছে। সামনে দেখতে পাচ্ছি অসহ্য দুনিয়া। মানুষ কি সভ্য হতে পারবে কোনদিন! দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পাখিরা। সাপেদের হত্য আসলে নিছক প্রতিশোধ।আমরা জানি এই পৃথিবী একটি উৎকৃষ্ট কবরখানা।আমাদের অধিকাংশ মারা যাব খুব সুন্দর উপায়ে। যেহেতু মৃত্যুর গল্পে ভারী হয় বুক,তাই মৃত্যুর গল্পের থেকে নিজেকে দূরে রাখব সারাদিন। তবু শেষ বিকালে আমি বুঝতে পারব মৃত্যু আসন্ন। বাবা এসব বোঝে না। বাবা এসব বোঝে না কারণ বাবার লেখাপড়া ছিল কম। চাকরি পাওয়ার জন্য বাবাকে লড়তে হয়নি আমাদের মতো। পুলিশ চাকরি পাওয়া ছিল অত্যন্ত সহজ।ফলে বাবা চাকরিটা পেয়ে যায়। এবং বহুদিন পর বাবাকে কোন কারণ ছাড়াই বসিয়ে দেওয়া হয়। কারণ হয়তো একটা ছিল আমাদের জানা নাই। বসিয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের সংসারটাও বসে যায়। তবে যেহেতু কিছু টাকা সরকার তখনো দিত,দিতে বাধ্য ছিল,সংসারটা চলছিল গোরুর গাড়ির মত। এরপর আমরা লেখাপড়া করি এবং যতই লেখাপড়া করি বুঝতে পারি আমরা যতই পড়ি না কেন চাকরি পাবো না। এই অবস্থায় মনে হয় একটা বাড়তি ডিগ্রি আমাদের কতটা অক্সিজেন দেবে। আমি এম এস সি ছেড়ে দিই। ছেড়ে দিলাম এবং বাড়ি ফিরে এলাম। সাত বছর পর বাড়ি ফিরে আসা। এই সাত বছরে আমি তিনটি আলাদা শহরে কাটাই এবং আমি শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হই।সাত বছরে পৃথিবী পাল্টে যায়। সাত বছরে গ্রামগুলি পাল্টে যায়,গ্রামের মানুষেরা পাল্টে যায়। সেই পাল্টে যাওয়া গ্রামে আমি আসি।

এমএসসি করতে না পারাটা কিংবা না করাটা আসলে লজ্জার,এইটা আমি পরে বুঝতে পারি। আমার দিকে নয়,আমার ফিরে আসার দিকে লোকে এমন ভাবে তাকাতো যে আমি প্রথমে লজ্জা পাই, পরে এই লজ্জা ভয়ে রুপান্তরিত হয়,পরে এই ভয় থেকে আমি অবসাদ গ্রস্থ হয়ে পড়ি।বিপ্লব তার প্রথম সন্তানদের খেয়ে ফেলে,এই আপ্তবাক্যটি আমাদের জানা ছির এবং আমরা সভয়ে দেখি যে আমাদের চৌত্রিশ বছরের প্রিয় দেওলিয়া সরকারের কাছ থেকে পরিবর্তনকামী জনগণ ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং সেই ক্ষমতা জনগণ উপহার দেয় অন্য একটি প্রিয় সরকারের হাতে। যদি এই পরিবর্তনকে বিপ্লব বলা যায় এবং ধরা যায় বিপ্লব প্রথম সন্তানদের উপর কখনই সুবিচার করে না তাহলে আমাদের ধ্বংস করা হবে এবং সেই ধ্বংসস্তুপের উপর গড়ে উঠবে সভ্যতা এবং আমাদের কেউ মনে রাখবে না। এসব খুব স্বাভাবিক ভাবে হবে,কেউ বুঝতেও পারবে না কীভাবে হত্যা করা হয়েছে একটি প্রজন্মকে। পৃথিবী একটি উৎকৃষ্ট কবরখানা। মানুষের দাফনের পর এক উৎকৃষ্ট দুনিয়ায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে এই প্ররোচনায় আমরা ধার্মিক হয়ে জীবন কাটাই এবং ধার্মিক হয়ে মরে যাই।

জীবনের বহুল ঘটনা এর মধ্যেই ঘটে যায়। ক্রমশ ভিখিরির মতো এক একটি ঘটনা আসে,আমরা তাদের ফিরাতে পারি না এবং এইসব ঘটনা আমাদের এলোমেলো করে দেয়। প্রথমে আমার গ্রামে ফিরে আসা। এটি একটি অঘটন এবং দ্বিতীয় এঘটন এই যে এর মধ্যেই আমাদের দিদি একদিন আত্মহত্যা করে। এটি একটি ভয়াল ঘটনা এবং সেই রাতে তাকে খুঁজে না পেয়ে আমরা অস্থির হয়ে উঠি তার মৃতদেহ খুঁজে পেতে এবং সেই রাতেরই ভোররাতে তাকে তুলে আনা হয়। যেহেতু মৃত্যু সম্পর্কে সঠিক পথ তার জানা ছিল না এবং যেহেতু মানুষ একবার মরে তার জানা ছিল না কতটা ফলিডল তাকে হত্যা করতে পারে। ফলত সেই ঝড়বৃষ্টির রাতের পরও তাকে দুদিন বেঁচে থাকতে হয় এবং তাঁর মৃতদেহ আর দুদিন পর লাশঘর থেকে ফিরে আসে। এই স্বয়ংকৃত মৃত্যু একদিন হবে আমাদের জানা ছিল,কিন্তু মাবাবা এর আঁচ পায়নি কোনদিন। মাবাবারা আসলে অন্ধ ও বধির হয়। ফলে মাবাবার দুঃখ আমাকে ব্যথিত করে ,আমার এবং আমাদের অবসাদ বৃদ্ধি করে।আমাদের একবছের শোক যদিও শেষ হয় কিন্তু আমরা এও বুঝতে পারি শোক আসলে জীবিত মানুষের মতো। তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস জীবিত মানুষের মতন সারাক্ষণ টের পাওয়া যায়।

আমার যেহেতু এরপর কিছু করার ছিলনা আমি কি করব ঠিক করতে পারিনা। আমরা এখনো তিনজন বেঁচে এবং মাবাবা, আমি ঠিক করি পালাবো। এই দেশে এখন গ্রামগুলি নরক ও রাজনীতির আঁতুরঘর বলে আমার ধারণা হয় এবং আমি এই কদিনেই হিসাব কষি যে পালাবো। এই পাল্টে যাওয়া গ্রামগুলির মানুষ ক্ষমতায় ঢুকে পড়ে,এই ছাড়া উপায় নাই,ক্ষমতায় ঢুকে পড়ে চুরি চামারি হাতটানে অভ্যস্থ হয় কারণ পরিবর্তিত সরকার এভাবেই গ্রামগুলিকে বেঁচে থাকার রাস্তা দেখায় এবং এটা রপ্ত করে।পরিবর্তিত সরকারকে যেহেতু সরকার ও পার্টি চালাতে হয় যৌথভাবে,সেই অর্থের প্রয়োজন তারা মেটায় একটি অনর্থ দ্বারা। একবছরের হৈচৈ যেহেতু মানুষকে ক্লান্ত করে এবং দুতিনজনের জেলহাজতের পর ভুলে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই বেঁচে থাকার সবাই এইসব ভুলে যায়। আরো দুতিন বছর পর মানুষ আরো ভুলে যায় এইসব যেহেতু উৎসব ও মেলা আমাদের ভরিয়ে রাখে। মাটি উৎসব আমাদের ভুলে যাওয়া মাটির কথা বলে,মাটি ছাড়া আমরা বাঁচব না এই কথাই বলে,ফুল উৎসব ফুলের কথা বলে,আম উৎসব আমের কথা বলে এবং এইসব মেলা কমিটি আমআদমির কথা বলে। ফলত আমরা ভুলি না যে আমাদের বেঁচে থাকার আয়োজন সরকার ভাল রকমে করচ্ছে।

আমি এমএসসি ছেড়ে দিচ্ছি এটা বাবাকে বলা মুসকিল ছিল কারণ আমি ছিলাম বাবার ধারণায় মেধাবী ও নাছোড়। কিন্তু আমি বাইরে বেরিয়ে বুঝতে পারি এই মেধা হাজার ছেলের আছে এবং তারা অনেকেই কেউ কিছু করতে পারবে না কোনদিন কারণ সাফল্য লটারি ছাড়া কিছু নয় এবং আমি বুঝতে পারি সাফল্যর পিছনে দৌড়ানো ভয়ংকর স্বার্থপরতা ছাড়া কিছু নয় যেহেতু দুএকজন সফল হবে। ফলে আমি নিশ্চেষ্ট হই এবং গ্রামে ফিরে আসি। গ্রামগুলি নরকে পরিণত হওয়ায় এই দোজখের থেকে পালাবো ঠিক করি ও আমার দিদি আত্মহনন করলে আমাকে গ্রামেই থাকতে হয়। মা ভেবেছিল দিদি যেহেতু মাস্টারানি হবে তাকে রান্নাবান্না বা জীবনযাপন শেখানোর দরকার নাই। বাবা ভেবেছিল দিদি যেহেতু মাস্টারানি হবে এবং ওকে যেহেতু সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে ওর বিয়ে দেওয়ার দরকার নাই। দিদি হয়তো চাকরি পেতো কিন্তু দেশে প্রভুত শিল্প সম্ভাবনা এই সময় আবিষ্কৃত হয় যেহেতু তেলেভাজা ও মুড়িভাজা এইসব শিল্পই মানুষকে সাবলম্বী করতে পারে এবং বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং ফলস্বরুপ চাকরি ও শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন বাতিল হয়। দিদি হয়তো চাকরি পেতো কিন্তু সে ছিল নিঃসঙ্গ যেহেতু তার বয়সি মানুষেরা বিয়ে করে সংসারী এতএব সে ছিল একা এবং সে ভেবেছিল চাকরি কিংবা বিয়ে তার কিছু একটা হবে তার মধ্যে তখনো এই আশাবাদ ছিল।এসবই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং মাবাবা ভেবেছিল যেহেতু চাকরি পাবে এতএব এককাড়ি খরচ করে বিয়ে দেওয়ার দরকার নাই আর দিদি ভেবেছিল এই দুইটার মধ্যে কিছু একটা হবে কিন্তু সেই ঝড়বৃষ্টির রাতের আগে পর্যন্ত এসবের কিছুই না হওয়ায় দিদি পরিমাণের চেয়ে কম ফলিডল খায় এবং এই ভুলের জন্য তাকে তারপরও দুদিন বেঁচে থাকতে হয় এবং তারপরও বাবামাকে বেঁচে থাকতে হয় কেননা আমরা তিনজন তখনো বেঁচে।

এর মধ্যেই অথবা এর পরেই আমি জীবনের কদর্যতার মধ্যে,গ্রামের কদর্যতার মধ্যে,দেশের কদর্যতার মধ্যে পড়ে যাই এবং আমি ঠিক করি পালাবো।আমার অসুস্খতার কথা রটে যায় এবং আমি ঠিক করি পালাবো।আমার অসুস্খতার কথা রটে গেলে আমাকে ডাক্তার দেখাতেই হয় এবং ডাক্তার যেহেতু কিছুই পায় না আমাকে আবার ডাক্তার দেখাতে হয় এবং আমি বুঝতে পারি অসুস্থ।কিন্তু যেহেতু তেমন কোন রোগ পাওয়া যায় না আমাকে বাড়িতেই থাকতে হয়। আমি যেহেতু জানি কিছু একটা গন্ডগোল আছে আমি বারবার ডাক্তার কাছে যাই। ডাক্তার কিছু না পেলে আমি ভাবি এমএসসি ছাড়াটাই একটা রোগ এবং সেটা ক্যান্সারে রুপান্তরিত হলেও হতে পারে।যেহেতু আমি নিশ্চিত হতে পারি না, আমার মনে মৃত্যুভয় বাসা করে এবং আমি ঠিক করি পালাবো। যেহেতু পালানো ছাড়া উপায় নাই,আমি মৃত্যুভয় থেকে পালানোর রাস্তা খুঁজি,আমি গ্রাম থেকে পালানোর রাস্তা খুঁজি এবং যেহেতু জানা ছিল মরন একবার হয় আমি বুঝতে পারি ফলিডলের পরিমাণ ঠিক করা একটি অসাধ্য কাজ এবং আত্মহত্যাও একটি অসাধ্য কাজ কেননা ফলিডল খেয়ে দুইদিন বেঁচে থাকা একটি অসাধ্য কাজ,আমি ঠিক করি পালাবো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন