মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

তমাল রায়-এর গল্প : চন্দ্র-অভিযান

(১)

আজ ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১২। সকাল থেকে পটাশপুর গ্রাম মেতেছিল উৎসবে। উৎসব মানে ভূরিভোজ। পুরো গ্রাম উজাড় হয়ে নীলুদের বাড়ির সামনের মাঠে। নিরামিষ খাওয়া দরকার। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান তো। টালির চালের বাড়ির সামনে চাতালে তিনজন পুরোহিত। একজন গীতা পাঠ, একজন চন্ডীপাঠ আর বাকিজনের ঠোঁটে শ্রাদ্ধের মন্ত্র। একটা ছোট টুলের ওপর রাখা ফুল আর মালায় ঢাকা একটা ছবি। ছবিটা যতদূর দেখা যায় মনে হয় একটা খবরের কাগজের টুকরো। সাদা-কালোর একটা অস্পষ্ট ছবি। ছবির মানুষটির গায়ে একটা কিম্ভুত-কিমাকার পোশাক। অনেকটা মহাকাশে যাওয়া মানুষদের মতো।
থরেথরে প্রিয় সব খাবার নিবেদন করা ছবির সামনে। একটু দূরে যিনি হাতজোড় করে বসে মন্ত্র পড়ছেন তিনি মঙ্গলা। মন্ত্র যত না বেরোচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি বেরোচ্ছে হাওয়া। কারণ মঙ্গলার দাঁত নেই একটাও। দাঁত থাকার কথাও নয়। কারণ দাঁতেদেরও বয়স হয়। জন্ম-মৃত্যু থাকে। কারণ মঙ্গলার বয়স পঁচাশি। মঙ্গলা হাজরা, বয়স পঁচাশি, কেয়ার অব স্বামী ঁহারাধন হাজরা। পটাশপুর, জেলা- উত্তর ২৪ পরগনা। সকালের অনুষ্ঠান শেষ হতে সন্ধে। এখন চাতালে ছবির সামনে একটা প্রদীপ জ্বলছে। আর ক্লান্ত শরীরটাকে নিয়ে একটা বাঁশে পিঠ রেখে একা মঙ্গলা। আকাশের দিকে চেয়ে... চাঁদের প্রতীক্ষায়।

আজ থেকে ঠিক এগারো দিন আগে বিদ্যুৎ এসেছে এই পটাশপুর গ্রামে। মঙ্গলার ছোট ভাসুরপো কমল যারা উঠোনের ওদিকটায় থাকে ওরা কারেন্ট নিয়েছে। আর নিয়েছে একটা টি.ভি। কমল এসে বলে গিয়েছিল- কত আর দাওয়ায় একঘেয়ে বসে থাকবে। এসো টি.ভি দেখে যাও। দায়-বিপদে কমলই দেখে। ফলে খুড়িমা গেছিল ওদের ঘরে। ‘মা’ না কি-যেন একটা সিরিয়াল হচ্ছিল। এসব দেখলে বুড়িমার মনটা দ্রব হয়ে যায়। চোখে জল আসে। তো দশ মিনিট যাবার পর দেখে কাপড় কাচা সাবানের বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করলো... তারপর আরো তিনটে দেখানোর পর যখন টি.ভি-র বাঁদিকে লেখা- ফিরে আসছি ১ মি. ১৯ সেকেন্ড পর, ঠিক তখনই সেটা শুরু হলো- একটা হাফ প্যান্ট পরা ছোট ছেলে। হাতে একটা খালি কাচের বোতল নিয়ে দৌড় লাগাল। সেপিয়া টোনের ওই দৃশ্যে চেলেটি একটা উঁচু জায়গায় উঠল। ঠিক মাথার কাছে একটা গোল চাঁদ। পূর্ণিমার চাঁদ। ঢাকনা খুলে চাঁদটা কে বোতলের মধ্যে ঢোকাল। ঢাকনা পরাল। আর তারপর আবার দৌড়াল... হাতের বোতলে চাঁদও দৌড়োচ্ছে...

খুড়িমা দু’বার চোখ কচলাল। এত নিশ্চিত নীলু। চাঁদের প্রতি এত মোহ! কিন্তু দৌড়ল কোথায় নীলু... মঙ্গলা উঠে পড়ল। কমল বলল- খুড়িমা বোসো। খুড়িমা উত্তর না করে হাঁটতে লাগল ঘরের দিকে। চাঁদ ধরেছে বুড়িকে, হাঁটতে লাগল নিজের দাওয়ার দিকে...

আজ, ৪ঠা সেপ্টেম্বরের রাত। দাওয়ায় বসে মঙ্গলা চাঁদের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বকছে, সেদিনও...


(২)

আয় চাঁদ আয়... নীলুর কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা... এমন চন্দ্রাহত পরিবার বড়ো একটা হয় না। এই যেমন ধর নীলু। সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে নীলুও তো চাঁদ- এ আক্রান্ত ছিল। নইলে মা-র কোলে মাথা রেখে নীলুই অমন জুল-জুল করে চাঁদের দিকে তাকাবে কেন! কেন মাকে বলত- মা একদিন দেখো চাঁদের মাটিতে পৌঁছে তোমার সাথে কথা বলব। মুখে হাট চাপা দিয়ে দিত মঙ্গলা- চুপ্‌ করবি। যত অলুক্ষুনে কথা। চাঁদের না একটা কেমন নেশা ছিল। নইলে পটাশপুরের মতো সীমান্ত নিকটবর্তী একটা লঝ্‌ঝড়ে গ্রাম, চাঁদের আলো পড়লেই কেমন মায়াবী হয়ে যেত। রূপকথার রাজ্য। ওই যে গোপাল ধোবী ঘাট- যেখানে কাপড় কাচত ধোপারা সেখানে বেহুলা কলার ভেলা চাপিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়াত... জিজ্ঞেস করত ‘স্বর্গটা কোন দিকে গো?’ নীলু দেখিয়ে দিয়েছিল ওইদিকে। কারণ নীলু ওই সঞ্জীবনী দেশের কথা যে জানত। বেহুলা লখীন্দরকে নিয়ে ভেসে গেল। নীলু তাদের টা-টা করল। তারপর নদী যেখানে চওড়া সেই মোহনার বালিতে লিখে রাখত- “লিখে রেখো চাঁদ, তোমার মাটিতে আমি পা রাখবই।” চাঁদের বুড়ি হাতছানি দিত। চরকা কাটত বসে বসে। আর পেঁজা তুলোগুলো উড়ে উড়ে পড়ত পৃথিবীর বুকে। আর সেই পেঁজা তুলোয় গা ভেজাতে ভেজাতে নেশা পেয়ে বসত মা আর ছেলেকে।

তবে ইদানীংকালে মঙ্গলা চাঁদকে গালি দিত খুব। এই জ্যোৎস্না, ছেনালিপনা আর কত দেখবেই-বা। প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় তার যে শরীর ঝাপসা। এতগুলো বছর, তা চল্লিশেরও বেশি হবে। এই এতগুলো বছরে জঙ্গল ভেঙ্গে জনপদ। হাঁটি-হাঁটির শিশুরও তো মেরুদণ্ড বেঁকে যায়। মঙ্গলার চোখে ছানি, খাবার জোটে আবার জোটে না... আর এই নেড়ি কুকুরগুলোও হয়েছে তেমন- থেকে থেকেই চিৎকার... শুকনো পাতার ওপর কি কারও পায়ের শব্দ! কান খাড়া করে মঙ্গলা...

খুড়ি মা শুতে যাবে না... কমলের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেও কেমন নেশায় আচ্ছন্ন থাকে মঙ্গলা। শরীরটাকে তার তুলতে ইচ্ছে করে না... নেশাচ্ছন্নের মতোই বসে থাকে... চাঁদ তখন হাঁটতে হাঁটতে পশ্চিম আকাশে...

নীলু মানে এক ঝলক তাজা বাতাস, নীলু মানে পদ্মপুকুরের নিস্তরঙ্গ জলে ঢেউ-ঢেউ, সরষে খেতে প্রজাপতির ওড়াওড়ি... গর্বে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত মঙ্গলা আর হারাধনের। কষ্ট করা সার্থক যদি সন্তান এরকম হয়। কি ভালো রেজাল্ট করল নীলু স্কুল ফাইনাল-এ। হারাধনের বোনাই কৃষ্ণপদ ওকে নিয়ে গেল কোলকাতায়। কৃষ্ণ সরকারি অফিসারদের ফাইল এ-ঘর থেকে ও-ঘর করত। হারাধন ভরসা করে পাঠিয়ে দিল। ক’দিন পর ছেলে জানাল সে মেসে থাকবে। টিউশন করে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচা তুলবে। হারাধন না বলতে গেলেও, মঙ্গলা থামিয়েছিল, বলেছিল বুঝতে দাও। আমাদের যে পয়সা নেই, সেটা বোঝা ভাল। তাতে দায়িত্ব বাড়ে। গুরুত্ব তো বাড়েই। নিলে ক্লাবে ঢুকেছে, নাটক করছে, আবার ইউনিয়ন না কি... পারছে তো ওইটুকু ছেলে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিত আনন্দের- মঙ্গলা আর হারাধন। পটাশপুরের মায়েরা তাদের ছেলে-পুলেদের দেখিয়ে বলত- পারিস যদি নীলুর মতো হ দেখি। নীলুর মা মঙ্গলা তখন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করত। আর চাঁদের সাথে খেলত- আটুল, বাটুল, শ্যামলা সাটুল... ও চাঁদ, চাঁদ আমার ছেলেটাকে দেখো। চাঁদও মুচকি হাসত সে কতকালের বন্ধু তার, মঙ্গলা। তার কথা তো রাখতেই হবে।

ছেলেটা চাঁদকে বোতলে পুরে দৌড় মারল। আর মঙ্গলাও পারলে পেছন পেছন দৌড়য়। নীলু যাস্‌ না... নীলু। একটু আগে লোকজন সব খেয়ে-দেয়ে চলে গেছে। এখন একা একা মঙ্গলা... চাঁদের আলোয় ফুটফুট করছে পটাশপুর।


(৩)

সেই সাতষট্টি সালের পটাশপুর ছিল আর পাঁচটা গ্রামের মতোই সুজলা-সুফলা-খরা-বন্যা-ম্যালেরিয়া-টাইফয়েড-কলেরা... রাজনীতির ওলট-পালট... বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জ্জী তখন গদি সামলাবেন না রাজ্য ভেবেই কুপোকাত। পটাশপুরে তখন আনাগোনা শুরু করেছে কোলকাতার লোকজনেরা। ওরা আসছিল। গরিব লোকেদের কথা শুনছিল। বড় কাঁসার বাটিতে ভাগ করে খেত মুড়ি-চপ-কাঁচালঙ্কা। নীলুর বন্ধু, কেউ দাদা। কলকাতায় তখনও খুব গোলমাল শুরু হয়নি। পটাশপুর তো শান্ত অনেকটা নীলুর মতো। আট মাসের অজয় মুখুজ্জ্যেকে সরিয়ে রেখে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় প্রফুল্ল ঘোষ। সে প্রায় আটষট্টির ফেব্রুয়ারি হবে নীলুরা গান শেখাচ্ছে, নাটক করছে পটাশপুর আর আশেপাশের গ্রামে। আবার ক্লাস করছে, ক্লাস নিচ্ছে... হারাধন, মঙ্গলার খুব আনন্দ। আনন্দ গ্রামের বাকি মানুষদেরও। তবু তো কিছু হচ্ছে। এই মাঘী পূর্ণিমায় জাগ্রত কালীপুজো আর বোশেখ মাসে যাত্রা ছাড়া আর কিছুই তো ঘটে না। জমিদার বাড়িতে কাজের লোক বীনাপাণি যখন গলায় দড়ি দিল তখনও কিছু একটা ঘটে ছিল। একটা সরগরম ভাব। বাংলা দুলছে নড়বড় নড়বড় করে... প্রফুল্ল ঘোষ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ল, এবার রাষ্ট্রপতি শাসন... পটাশপুর তো কলকাতা থেকে অনেক দূর তবু... পুলিশের নড়াচড়া বাড়ল... অভিভাবকহীন সন্তান এর যেমন হয় (অভিভাবকহীন?)। নীলু বাড়িতে জানাল জরুরি কাজে উত্তর বঙ্গে যেতে হবে। হারাধন জলপাইগুড়ির কথা শুনেছিল, কিন্তু ওইটুকুই। পটাশপুরের ভূগোলের বাইরে আর তার বেরোনো হলো কই! একবার বেরিয়ে ছিল, সে কথা পরে হবে। সে যাই হোক মঙ্গলা জিজ্ঞেস করল, ‘তুই পারবি, একা?’ নীলু হেসে বলল, একা কোথায় ‘আমরা’ যাব। নীলু ততদিনে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়েছে।

সেদিনও মা আর ছেলে চুপটি করে শুয়ে রাতের আকাশ দেখছিল। আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে মাকে বলছিল এক চন্দ্রালোকিত মায়াবী দুনিয়ার গপ্পো। পটাশপুর চাঁদের আলোয় যতটা সুন্দর তার চেয়েও সুন্দর এক দুনিয়া! যেখানে ধনী, গরিব সবাই সমান। সকলেই খেতে পায়। কারও কোন কষ্ট নেই। মঙ্গলা কেমন ঘোরের মধ্যে গল্প শুনছিল... হঠাৎ কারা যেন ফিশফিশ করে ডাকল আর মাকে প্রণাম করে নীলু চলল নিরুদ্দেশ। - ‘ও নীলু কোথায় যাচ্ছিস বলে যা...’ হারাধন হাত দিয়ে মুখ চাপা দিল- শুয়ে পড়বে চলো। হারাধনকে অবশ্য শাস্তি দিল মঙ্গলা। অতোবড় শরীরের হারাধনকে ছুঁড়ে ফেলে দৌড়লো পুটুশ ঝোপের দিকে... কোথায় নীলু- সে তো ভ্যানিশ। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক দৌড়াল। আছাড়ি-বিছাড়ি খেল তারপর অসহায়ের মতো শুল হারাধনের পাশে। হারাধন নিজের শরীরের নীচে মঙ্গলাকে রেখে সে রাতে পুরুষ হয়ে উঠল অনেকদিন পর। চাঁদ তখন ফিকে, জ্যোৎস্নাও। খুড়িমা শোবে না? কমল শুতে যাবার আগে হাঁক মারল। হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা তখন চাঁদ ভরা বোতলটা নিয়ে দৌড়চ্ছে। মঙ্গলা ডাকল একবার এদিকে আয় না আমার বুকের ধন তোকে আদর করি...

মাঠের এঁটো কাঁটাগুলোতে মুখ দিচ্ছে কুকুরগুলো।

নীলু চলে গেল। কিন্তু ছাড় পেল না হারাধন। রুলের গুঁতো, বন্দুকের বাট... বাড়িতে পুলিশ আসা। রাষ্ট্র-বিরোধিতার অভিযোগে পুলিশ লক-আপ-এ ক’দিন কাটিয়ে এল হারাধন। পটাশপুরের লোকজন কোলকাতা কি তাই জানে না, তো রাষ্ট্র! তা খায় না মাথায় দেয়! ঊনসত্তর সালের সেই ভূগোলে আমারিকার রাষ্ট্রপতি তখন নিক্সন। আর ভারতের ভি ভি গিরি। ভারত তো তখন রাশিয়ার বন্ধু দেশ। কিন্তু পটাশপুর আমেরিকার বন্ধু। কারণ আমেরিকা যে চাঁদের বন্ধু। আর রাশিয়া মহাকাশের। আর চাঁদ তো আমেরিকার হবে ভেবে তিড়িং-বিড়িং করে লাফাচ্ছে। জাকির হুসেন মারা গেলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলো। প্রার্থী ভিভি গিরি আর নীলম সঞ্জীব রেড্ডি। দু’জনেই অন্ধ্রের লোক। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সঞ্জীব রেড্ডি মাত্র পনের হাজার ভোটে হারল। আর হারাধন তো তার প্রায় সাত মাস আগে থেকে নীলুর খোঁজ খবরের চেষ্টা করছে... গ্রামীণ চাষি সম্প্রদায়ের একজন লোকের পক্ষে কী ওভাবে খুঁজে পাওয়া সম্ভব তার স্বপ্নসন্ধানী সন্তানকে? খবর এলো নীলুকে মালদা স্টেশানে দেখা গেছে, হারাধন দৌড়োল। কে যেন বলল কোচবিহারের রাজবাড়িতে নীলু মালির কাজ নিয়েছে। হারাধন গেল। গেল মানে যেতে বাধ্য হলো মঙ্গলার গুঁতোয়... শেষে ঘুরতে ঘুরতে জলপাইগুড়ির করলার বোরুলী খেয়ে রওনা দিল বহরমপুর। নবাবি কবরখানায় মাজার-এ ফুল চড়িয়ে যখন কৃষ্ণনগরের দিকে রওনা দেবে কে যেন বলল- কৃষ্ণনগর কিন্তু উত্তর নয়, দক্ষিণবঙ্গ। হারাধন আশা ছেড়ে ফিরল পটাশপুর। ইতিমধ্যে নীলুর চিঠি এসেছে খান তিনেক। “চিন্তা কোরো না, আমি ভালো আছি, তোমরা ভাল থেক। প্রণাম তোমাদের- ” মঙ্গলার চোখে তখন পিচুটি, নাকে সর্দি, ভুল বকছে অনর্গল... কে যেন খবর দিল কোলকাতায় পুলিশের গুলিতে মারা পড়েছে নীলু। নীলুও গুলি চালিয়েছিল। বিশ্বাস হয়নি হারাধনের। মঙ্গলাকে সে কথা জানায়ওনি। যা বিশ্বাসযোগ্য নয় তা জানিয়ে কী লাভ। তারিখটা ছিল একুশে জুলাই, ১৯৬৯। পরদিন-এর খবরের কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে একটাই খবর- কলম্বিয়া ছিল মাদার সিপটার নাম। তা থেকে বেরোল ঈগল। আর সেই ঈগলের সিঁড়ি বেয়ে মাটিতে পা রাখলেন যিনি তিনি নীল আর্মস্ট্রং। চাঁদের মাটিতে প্রথম পা... আর উদ্ধৃতি বেরিয়ে এল মুখ থেকে- ‘That’s one step for man, one giant leap for mankind’ মানব সভ্যতা যে কি সেটা সে সময়ে কেবল বুঝত ওই দুটো দেশ আমেরিকা আর রাশিয়া। নিক্সন সাহেব গ্যালারি শো করে হাততলি কুড়োলেন... আর ২৩শে জুলাই মঙ্গলার কাছে কে যেন কাগজটা পৌঁছে দিয়ে বলল- অ্যাই দ্যাখো গো তোমার নীলু চাঁদে পৌঁছেছে। ছোঁ মেরে কাগজটা ছিনিয়ে নিল মঙ্গলা। তারপর দৌড় লাগাল পুটুশ ঝোপের দিকে। যেখান দিয়ে নীলু শেষবার অন্তর্হিত হয়। খানিক দৌড়-ঝাঁপ। খানিক আছাড়ি-বিছাড়ি আর খবরের কাগজের ওই অদ্ভুত পোশাকের মানুষটাকে নালে-ঝোলে চুমোয় চুমোয় ভরে দিল মঙ্গলা। হারাধন লোকটাকে অ্যাইসান তাড়া করল যে সে পুকুরে ডুব মেরে ওপার থেকে মার ছুট। অস্ট্রেলিয়া তখন ক্রিকেট খেলছে শিলং-এ, চ্যারিটি ম্যাচ। চাহে কহি মুঝে জংলী কহে। মঙ্গলার চোখের জল শুষে নিচ্ছে পটাশপুরের মাটি। হাফ-প্যান্ট পরা ছেলেটা চাঁদটাকে বোতলে ভরে ছুটছে... নীলু তো চাঁদে পা রাখবেই বলে ছিল, নীলু তো চাঁদ ধরতেই চেয়েছিল... ‘নীলু, ও বাবা নীলু- একবার আয়।’ নারকেল নাড়ু দেব। হাঁসের ডিম রান্না করে দেব।

এখন রাত বাড়ছে আর চাঁদের আলোয় শাল পাতার থালা, প্লাস্টিকের গ্লাসগুলোকে মনে হচ্ছে ছড়ানো-ছিটানো ফুল। মঙ্গলার চোখে ঘুম নেই। একটু পরে বেরুতে হবে তো।

বাংলার মসনদে আবার হাজির অজয় মুখার্জ্জী। সত্তরের মার্চ থেকে আবার রাস্ট্রপতির শাসন। কোলকাতার, উত্তর চব্বিশ পরগণার বরানগর, আলমবাজার, সোদপুর, পানিহাটি- গন্ডগোল ছড়াচ্ছে... বাড়ি বাড়ি পুলিশ যায়। পটাশপুরও কি বাদ যাবে? হারাধনকে পুলিশ আবার জেলে ভরল। চারু, কানু, অসীম কত নাম তখন বাংলার বাতাসে; এরা কিন্তু কেউ মুখ্যমন্ত্রী নয়। নীলুও নয়। তবুও নীলুর নামে জয়ধ্বনি দেয় পটাশপুরের ছেলেরা। মঙ্গলা হাসে খবরের কাগজটাকে বুকে জড়িয়ে। দিন যায়, রাত যায়। দুপুর যায়, মাস যায়, বছর যায় নীলুর চিঠি আর আসে না। কে- এক প্রবল প্রতাপশালী সিদ্ধার্থ রায় না কে, যে নেহরুর মেয়ের বন্ধু তার অঙ্গুলীহেলনে সব টাইট। ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা বাংলায় গুটিবসন্ত দেখা দিল প্রবল... জেল-ফেরত হারাধন গুটিবসন্তের তাড়নায় ওপরে চলল। মঙ্গলা একা, নিক্সনও একা, ইন্দিরা গান্ধিও...

মঙ্গলা বসে থাকে সন্ধের অপেক্ষায় কখন চাঁদ উঠবে। আর নীলুর সাথে কথা হবে। চাঁদ তো চাঁদ নয় চাঁদ হল চাঁদপানা নীলু... নীলু বলেছে মাকে নিয়ে চাঁদে যাবে... তাই প্রতীক্ষায় মঙ্গলা। বছর যায় বছর আসে। চুল পাকে, দাঁত পড়ে। মঙ্গলার প্রতীক্ষা চলতে থাকে এক-এক করে। চল্লিশ পেরোল। অবশেষে এই তেতাল্লিশে যখন কান শব্দ তত আর শোনে না, ঘ্রাণ শক্তি ক্ষীণ, চোখে ছানি... অশক্ত, অশীতিপর মঙ্গলাকে কি জানি করুণা না কি নিছক ঠাট্টার চলে কে যেন এসে দেখাল ২৩ শে আগস্ট, ২০১২-র খবরের কাগজ। সে যখন আসছিল মঙ্গলা বেড়ালের পায়ের শব্দ ভেবে হুস-হুস করে তাড়াতে গেছিল। বেড়াল হয়তো তাতে চলে যেত। কিন্তু মানুষ তো- তাই সরল না। এল, কাগজটা দেখাল। ‘অ্যাই দ্যাখো নীলুর মা তোমার ছেলে মারা গেছে গতকাল।’ নীল আর্মস্ট্রং-এর বিশাল ছবি সারা কাগজ জুড়ে। অদ্ভুত শান্তভাবে কাগজটা নিল মঙ্গলা। কোনও আছাড়ি-বিছাড়ি নয়, ছুটোছুটি নয়। অল্প হেসে ভাসুরপো কমলকে ডাকল। কমল, ঘটা করে শ্রাদ্ধ করতে হবে। তারিখটা দেখতো বাবা...

কমল উত্তর দিল- ৪ঠা সেপ্টেম্বর।

আজ এই ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১২ তে সারাদিন পরিশ্রমের পর এখনও মঙ্গলা বসে। এবার রওনা হতে হবে। ঠিক রাত এগারটাতে। যখন নীলু রওনা হয়েছিল।

কুকুরগুলোও ঝিমোচ্ছে। পুটুশ গাছের ঝোপটার দিকে যে উঁচু মতো জায়গাটা, ওইখানেই তো হাফপ্যান্ট পরা নীলু উঠল... সাথে অনেক কষ্টে মঙ্গলাও। বোতল খুলে চাঁদটাকে বের করল নীলু। মঙ্গলাও হাত বাড়াল। হ্যাঁ, ঠিক আছে- এবার চাঁদটাকে আকাশে ঝুলিয়ে দে। এবার গরীব-বড়োলোক সব সমানের এক রাজ্য শুরু হল। কী সুন্দর এ রাজ্য! ‘চলো বেহুলা, বল এবার স্বর্গের ঠিকানা...’


-আমার কিন্তু ভেলা নেই। লখীন্দরও নেই, কেবল এই হাফ প্যান্ট পরা ছেলেটা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন