মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

শিপা সুলতানা-র গল্প : পত্রসখা

নিদারুণ নিঃশব্দতায় ঘুম ভাঙ্গলো বীণার। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে রাত।

তাহলে ঘরের বাকিরা কোথায়? আর রাতই-বা দিন হয়ে যাচ্ছে কেনো! আচ্ছা এতক্ষণ মেঘ ছিল আকাশে, ঝড় শুরু হয়েছে দেখো কেমন দানবের মতো! বীণা লেপের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে ফের ঘুমানোর চেষ্টা করে। চেষ্টা আর কী, মাথার উপর আছাড়িবিছাড়ি খাচ্ছে লিচু গাছটি, সারা বছর শুনশান থাকে, যেই চৈত্রমাসে বোল আসতে থাকে, মাথা বিগড়াতে শুরু করে তার, ফল আসতে না আসতে গাছটি হয়ে ওঠে রাক্ষসী ভৈরবী! সব আক্রোশ যেনো টিনের চালে।


ঝড় শুরু হলে ইউসুফের মা ঘন ঘন ফিট হবে, বাচ্চাদের নিয়ে জিকিরে বসবেন দাদিজি, আতাই লম্বা রামদা নিয়ে ঘরের এমাথা ওমাথা করতে থাকবে, আর দাদাজি হুকার নলে লম্বা টান দিতে দিতে বলতে থাকবেন ‘চুদাউরির ভাই গাছ, কাইল যুদি তুমারে না-কাটছি আমি বাপর বেটা নায়। গাছটি যেন তার গালি শুনতে পায়, ফল ভর্তি ডালপালা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে চালের উপর, ইয়াল্লা বলে কেঁপে উঠেন দাদাজি, হুকার মাথা থেকে টিকির আগুন ছিটকে পড়ে তার পাঞ্জাবিতে। তারপর সেই গাছের ডাঁসা লিচু খেয়ে খোদার লীলা নিয়ে বিস্তর উদাহরণ প্রদান করবেন, আল্লার কি কুদরত, গাছর ডালো শরবত; এভাবেই শতবর্ষ ঠিকে আছে গাছটি!

বীণা উঠে বারান্দায় আসে, পাহাড়ি গ্রাম, ঝড় একবার যদি ঢুকে পড়ে তবে মুগল হেরেমের চোরাগলিতে পড়লো, বের হবার আর উপায় নাই, রাগে ক্ষোভে এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়ে আছড়ে পড়বে, ক্লান্ত হয়ে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারো রেহাই নেই, গ্রামের প্রত্যেকের চেহারায ছাপ ফেলেই তবে মুক্তি, বীণা দাদাজির হাতলওয়ালা চেয়ারখানায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকে, তখনি মনে পড়ে পাশের বাড়ির মিনু ফুফুর গায়ে হলুদে গিয়ে আটকা পড়েছে সবাই, মিনু ফুফু নিজেই এসেছিল কাল তাকে দেখতে! সবাই দেখতে এসে হা হু করে, ডাক্তার গুণিনের লিষ্টি দীর্ঘ করে, শুধু সমবয়সী মিনু ফুফু বলল ভালা অইজা, অর্থাত ভালো হয়ে যাওয়াটা বীণার হাতেই!

বাড়ির নিচেই ঠাস করে বাজ পড়লো, কিন্তু ঐ যে পাহাড়ি গ্রাম, কে যেন কার গলা চেপে ধরেছে শক্ত করে, সমস্ত বাড়ি জোড়ে গোঙানির শব্দ, বাজ পড়ার সাথে সাথে শুরু হলো বৃষ্টি, যেন আকাশ দুভাগ হয়ে গেছে তাদের বাড়ির উপর, রাতে এমন বৃষ্টি হলে কেনো যেনো মরে যাই মরে যাই মনে হয় বীণার, এখন কেমন পাগল পাগল লাগলো, বীণা দেখে উঠানের পানি প্রচ- তোড়ে বাল্লায় গিয়ে পড়ছে, গোলাপী পানির ভেতর আম জামের ছেঁড়া পাতাদের মনে হচ্ছে শিং মাগুর কৈ মাছ, খলবল করে নেমে যাচ্ছে পানির সাথে।

দাদাজির চেয়ারে বসে মনে হয় আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, চোখ খুলে দেখে ধোয়া মেঝের মতো উঠানে পানির লেশমাত্র নাই, কিছু আম জাম আর এক জোঠা পিঠাখরা পড়ে আছে সাদা বালুর উপর, কিছু কচি লেবু গেঁথে আছে এখানে ওখানে।

নিউমোনিয়া হলে কি খালি গরম গরম লাগে! বীণা বারান্দা ছেড়ে সিঁড়ির মাথায় গিয়ে দাঁড়ায়, বৃষ্টির পর পাতা থেকে চুইয়ে পড়া পানির মতো অসহ্য আর কিছু হয়না, সিঁড়ির আশেপাশে উঁচু কোনো গাছ নাই, তবু অসহ্য লাগছে বীণার সে বাড়ি থেকে নামতে থাকে।

বৃষ্টির পানি খেয়ে খেয়ে সুচের মতো ধারালো হয়ে আছে ঝামা পাথরের সিঁড়ি, পায়ের তলা থেকে মনে হলো রক্ত বার হচ্ছে, খালি পায়ে নেমে আসছে, অল্পই কেটেছে, তবু চোখে পানি চলে আসে তার, পাহাড়ের মাথায় বাড়ি বানানোর কি দরকার ছিলো, সারাজীবন সিঁড়ি থেকে পড়ে তার হাতপায়ের অবস্থা নাই, মুখ ভরে একটা গালি চলে আসছিল, গিলে ফেললো বীণা।

দ্রত নামছিলো বলেই কীনা মাথা ঘুরে ওঠে, এক সপ্তাহ আগে নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে বাধিয়ে ফিরে সে, তার ধারণা এটাই শেষ ফেরা তার, আর হোস্টেলে যাচ্ছেনা সে, হোস্টেল মানে শহর, শহর মানে সেই মুখ, আরো অসংখ্য কাতর মুখ, সারাদিন সেইসব মুখ খুঁজে খুঁজে হোস্টেলে ফিরে শাওয়ারের নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত সে, কতদিন এভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমের ভেতর কাঁদতো, সেই কান্না চলে গেছে শাওয়ারের জলে, এভাবেই নিউমুনিয়া!

কেউ কি কোথাও বিলাপ করছে? কে কোথায় বিলাপ করছে? স্বাভাবিক কান্না নয়, মনে হচ্ছে জনম জনম জমিয়ে রাখা বেদনা উতলে উঠেছে কারো বুক জোড়ে, ও ঠাকুর বাড়ি কীর্তন জোড়েছে বলাইদারা। এক লহমায় দাঁড়িয়ে পড়ে বীণা, আর আগালেই ঠাকুরবাড়ি, তাহলে আজ রোববার, বলাইদারা রোববারে নরক গুলজার করে ঠাকুর বাড়ির উঠানে বসে বনমালী গো তুমি পর জনমে হইও রাধা। ঢোল বাজানোয় এই অঞ্চলে বিখ্যাত সবুর মাস্টার, বীণার চিরকুমার ছোটো চাচা, রোববারে গুষ্টির কেউ মারা গেলেও তাকে পাওয়া যায় ঠাকুরবাড়ি। আজকাল বিয়ে শাদি শিন্নি শওকাত ও রোববার বাদ দিয়ে ফেলা হয় গুষ্টিতে। আমি মরিয়া হইমু শ্রীনন্দের নন্দন, তুমারে বানাবো রাধা, বীণার ইচ্ছা করে উড়না ছিঁড়ে কানে তালা দেয়।

ঠাকুরবাড়ির পথ এড়িয়ে বগলার বন্দ বরাবর হাটতে থাকে সে, নামে বগলার বন্দ, মাঠ জোড়ে ধু ধু বালি, একগাছা ঘাস পর্যন্ত নাই, খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে বলে পাহাড় টিলা থেকে পানি নেমে আসছে, কোথাও কোনো পাহাড়ে নতুন ফাটল ধরেছে, পানির রং আজ নীলচে গোলাপী! মাঠের পরেই এক ছুবা লুকটি বন, বনের মাথায় একটি শিশু দাড়াস বসে তরতর করে কাঁপছে, বুঝাই যায় পানির তোড়ে দলহারা। বনের পর আবার এক চিলতে মাঠ, মাঠের পর এই ছড়াটি। এক লাফে এপার ওপার করা যায় তবু কে যেন একজোড়া সুপারি গাছ ফেলে রেখেছে, গাছের আগা মাথা বনের ভেতর ঢুকানো বলে ভিন গায়ের কেউ কেউ অজগরের পাল্লায় পড়েছে বলে মাঝেমাঝে গাউ মাথায় তুলে, আর নিয়াতি পাহাড়ের মাজারে যাওয়া ছাড়া বনের এই পথটি মাড়ায়ই বা কে!

কী খুঁজেন?

মানুষটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, বীণা দেখে বাম হাতে ধরা এক গোছা পাতা, আর ডানহাত লম্বা করে ঝুপের মাথা থেকে কি যেন ধরার চেষ্টা করছে মানুষটি, মাথা মোড়ানো একঘেয়ে সারিসারি চা বন ছাড়া কিছুই নাই, অথচ ভদ্রলোক কি যেন পেতে মরিয়া। আমাকে বলেন, আমি আপনার থেকে ভালো পজিসনে আছি, বলেন কী দেবো?

ওই পাতাটি দিন।

চা পাতা?

ওই বেগুনি পাতাটি।

এতক্ষণে বীণা খেয়াল করে ভদ্রলোকের হাতে ধরা পাতাগুলো রঙ্গিন, আর ঝুপের মাথায় সত্যি সত্যি লম্বা একটি পাতা, খুব বেগুনি, সে ঝুপের মাথার দিকে একটি ঢিবিতে দাঁড়ানো ছিলো, পাতাটি তুলতে গিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে বনের ভেতর, হাত মুখতো ছড়েই, কামিজের ভেতরেও রক্ত জমতে থাকে, রাগে মাথার ভেতর ঝনঝন করে ওঠে, সেই কেবল উঁচু জায়গা থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে! পড়ে গেলেও পাতাটি ধরেই পড়েছিলো সে।

নিন আপনার পাতা।

ভদ্রলোক পাতাটি নিলেন না, তার বদলে ক্রিমের একটি টিউব বাড়িয়ে ধরলেন,

নিন, আমার রাখতে হয় সাথে।

আপনি কি বনে বনেই ঘুরেন নাকি?

কিছুই শোনা হয়না, হোস্টেলে ফেরার সময় হয়ে গেছে বলে বান্ধবীরা কোথা থেকে যে উড়ে এসে পড়ে এক সাথে।

বীণা যখন ছড়ার উপর পা ঝুলিয়ে বসেছিলো, তখন পানি ছিলো হাঁটু সমান। স্রোত এমন ভাবে যাচ্ছিলো, যেন বরের গেট ধরতে হবে, যাচ্ছে আর কি, খানিক যেতে না যেতেই নাই হয়ে যাচ্ছে বালির ভেতর, পানি থেকে রং ও আলগা হয়ে যাচ্ছে, হাটুর পানি পায়ের পাতায় গিয়ে ঠেকছে, একটু পর তলার বালিগড়া পর্যন্ত দেখা যাবে, কেনো সব পানি সরে যাচ্ছে, বীণার একলা একলা লাগছে হটাৎ।


এই পাতাটি হচ্ছে ডেফলের, আচ্ছা আপনি বলছিলেন আপনাদের বাড়ি ডেফলগাছ আছে?

আছেতো, সব ডেফলের পাতাইতো অন্ধকার অন্ধকার, আপনি হলুদ পেলেন কই? আপনি কি তেঁতুল পাতাও আলাদা করতে পারেন? মজা করে বললেও সিরিয়াস মুখ করে তাকিয়ে থাকে বীণা।

পারি, লক্ষ লক্ষ পাতার ভেতর ঠিকই দুয়েকটা আলাদা পাতা পেয়ে যাই, আপনাকে চিনিয়ে দেবো, খুব সহজ।

ঢাকা শহরতো নয়, একদিন সিনেমা দেখবে বলে তড়িগড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিলো তারা, তখনি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বায়োালজির প্রকাশ স্যারের সাথে কথা বলতে দেখলো মানুষটিকে, তারপর দুজন দুখানা গাড়িতে করে যার যার পথে চলে গেল, পরদিনই স্যারের পেট থেকে বার করলো ভদ্রলোক তাদের শহরের ডিসি, স্যারের নাকি বাল্যবন্ধু।

রিক্সা নিয়ে একদিন ঠিকই অফিসে পৌছে যায় বীণা, উনিও যেন জানতেন বীণা যেকোনো দিন যাবেই তার অফিসে, অফিস নয় যেন বনের ভেতর কাঠুরের কুঠির! টেবিলের কোনায় পাতা, ড্রয়ারের ভেতর পাতা, আলমিরাতে দরকারী ফাইলের ফাঁকে ফাঁকে পাতা,

আপনি ঘরে রাখেন না কেনো অফিসার, এত সখের জিনিস?

আমার ওয়াইফ পছন্দ করেন না, ছেলেদের এলার্জি হয়।

ওয়াইফ! ছেলে! বীণার ঠান্ডা লাগে খুব, শ্রাবণ মাস, গরমে ভদ্র হয়েই বসা দায়, কিন্তু তার শীত লাগে, ভয়াবহ শীত, যেন ঘুমের মাঝে কামিজের ভেতর ঢুকে পায়ের দিকে নেমে যাচ্ছে একটি সুতানালি সাপ।

আপনার রুমে কি এসি? বন্ধ করা যাবে?

নাতো! কারেন্টইতো নাই!

তবু বীণা যায়, খয়েরি জলপাই পাতা, ডেফলের হলুদ পাতা দেখে দেখে চোখ ভারী হয়ে আসে, ঘুম ঘুম লাগে। এই পাতাটা জারুলের, পাতার পর পাতা...কী লজ্জা! পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে অথচ একনাগাড়ে দশটি গাছের নামই মনে হয় বলতে পারবেনা সে! এটা হিজলের, হিজলের এই পাতাটি পেয়েছি হাকালুকির হাওরে, সবগুলা রংই আছে এই পাতায়। বীণার মনে হলো পাতাদের ইস্কুলে বোকার মত কান ধরে বসে আছে সে, তার ইচ্ছা করছিল বলে কেনো এত পাতা কুড়ান, কি হয় এতে? সে বলল এসি নাই? ফ্যান ছাড়া যাবে?

পাতা পাতা পাতা! তার জানলার বাইরেই একঝাড় লেবু গাছ, বারমাসী গাছে দুচারটা লেবু থাকবেই, আর কই থেকে যে এত চড়–ই আর টুনটুনি আসে অভিসারে! বীণা দেখলো ঝাড়ের ভেতর খয়েরি একটি পাতা। সত্যি সত্যি খয়েরি একটি পাতা, তার রুমমেট জুনিয়র মেয়েটিও নিশ্চিত করলো ওটা একটি খয়েরি পাতা।


এই নিন, আপনার জন্য প্রীতি উপহার...

মানুষটি পাতার গুচ্ছটি অনেক্ষণ ধরে রাখে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে তারপর আলমিরা খুলে যথারীতি ফাইলের ফাঁকে রেখে দেয় আপনাকে ধন্যবাদ।

পাতাদের নাম জিঙ্গেস করতে যাবেন না প্লিজ, আমি গাছেদেও তেমন নামটাম জানিনা।

না, জিগ্যেস করবনা, হা হা হা...

আপনি দেখি হাসতেও জানেন অফিসার? হাসি কিন্তু সুন্দর আছে বললাম।

আপনি আমাকে অফিসার বলেন কেনো? আমার একটা নাম আছেনা?

মানুষটির বয়স কত? পয়ত্রিস? চল্লিশ? পয়তাল্লিস? বেশিও হতে পারে তবে বুঝার উপায় নাই, দেখে এই পৃথিবীর আবার না পৃথিবীর মানুষও মনে হয়, অন্যদিকে তাকিয়েই কথা বলেন বেশি, আর তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বীণার মনে হয় ভিনগ্রহের কোনো মহাযানে চড়ে বসেছে সে, একঘেয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার আর কোনো ইচ্ছাই তার নাই...

আপনি কি জানেন আপনার চেহারা ঋত্ত্বিক রোশানের মত?

উনি কে?

আছে আমার এক কাজিন, নতুন কোনো পাতা পাইছেন?

সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে ড্রয়ার থেকে একটি পাতা বের কওে টেবিল ঘুরে বীণার পাশে আসেন মানুষটি, প্রায় একহাত লম্বা একটি পাতা, আমপাতার মত কিন্তু খানিক চ্যাপ্টা, আগিরজালের পাতার মত, হতেও পারে আগিরজালের পাতা, ঘন সোনালী পাতার শিরাটি নীলছে গোলাপী। ঝুঁকে কথা বলছেন বলে নিঃশ্বাস এসে লাগছে বীণার মুখে, তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, পানি হবে? না থাক, আমার মনে হয় জ্বর আসছে, বলেই বেরিয়ে পড়ে বীণা, পানির সত্যি তেষ্টা পেয়েছিল কিন্তু এখানে আর এক মূহুর্ত নয়।

সেই মাসেও বাড়িতে আসে না বীণা, মাস্টার চাচা বস্তা ভরে বাড়ির ফল দিয়ে যান, বস্তা দরজার বাইরেই রেখে দেয় বীণা, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাতা কুড়ায়, আগে রিক্সা নিতো, এখন হেঁটে হেঁটে গাছ দেখে, সত্যি সত্যি গাছভর্তি পাতাদের ভীড়ে আলাদা কিছু পাতা আছেই, সেই পাতাটি পেয়ে গেলেই গাছের আর সব পাতা মুহুর্তেই উধাও! বেশ মজাতো! শহর ঘেরা চা বাগানে, কিন্তু দলবেঁধে না গেলে বাগানে যাওয়াও সম্ভব না, তবে শহরের ভেতরও গাছপালার কমতি নেই, মানিক পীরের মাজারে উঠা গেলে একটা কাজের কাজ হত, বৃদ্ধ দারোয়ান ধরতে পেরে বলে ‘বাড়িত যাও গো মাই, এটা গুরুস্থান'! হোস্টেলকিপার ডাক্তার ডেকে আনছিলো, সেও বলে ‘বাড়িতে ঘুরে আসুন, আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি, এসে এক্সাম দিলেই হবে।


এই নিন অফিসার, প্রীতি উপহার।

এক গোছা পাতা টেবিলের উপর রাখে বীণা।

মানুষটির সামনে থেকে দুজন অফিসার উঠে গেলে টেবিলের উপর এক গোছা পাতা রাখে বীণা, সেদিন মানুষটি পাতাগুলো চেয়েও দেখেনা, বীণার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেক্ষণ তারপর টেবিল ঘুরে বীণার পাশে এসে দাঁড়ায়, প্রচন্ড কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ফিরে আসে বীণার, আপনার ফ্যান?

মানুষটি ফ্যান বন্ধ করে ফের আগের জায়গায় এসে দাঁড়ায়, বীণা উল্ঠা দিকে গুনতে থাকে নিরান্নব্বই হাজার নয়শ নিরান্নব্বই...

আমি আর পাতা জমাচ্ছিনা বীণা...

কেনো? আপনি না বললেন সারাজীবন পাতা কুড়ানো সখ আপনার?

মাঝে মাঝে সখ বিসর্জন দিতে হয়, প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলতে হয়, ইচ্ছা করে হারাতে হয়...

আমাদের গ্রাম ভর্তি পাহাড়, পাহাড় ভর্তি গাছ, আপনার জন্য অনেক পাতা কুড়িয়ে আনবো, আমি এখন দেখলেই চিনি কোন পাতাটি আপনি।

কোন পাতাটি আপনি বলার সময় তার গলা ধরে আসে।

আমি জানি, কিন্তু আমি আর পাতা জমাচ্ছিনা, বীণা। আপনি কিছুদিন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসুন...

বীণা আর পাতা কুড়ায় না, শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পাতাভর্তি বট গাছ, অথচ গাছে পাতা একটাই, তেঁতুল গাছ থেকে একটি পাতা আলাদা করা আর কোনো বিষয়ই না, সেই পাতার দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে কোনো ক্লান্তি লাগেনা তার, পাতাদের আবার বুলিও আছে, সে যখন তাকিয়ে থাকে, তারাও তখন মুচকি মুচকি হাসতে থাকে ।

বাড়িতে না ফিরে উপায়ও ছিলনা, প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলছিল, রিক্সা নিলেও হোস্টেলের ঠিকানা মনে পড়তে চায়না, হোস্টেল থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ ভার্সিটি, সেটা পাঁচ/ছ ঘন্টায় শেষ হয়না, কোনো কোনো পাতাদের আবার বিদায় দিতে হয়, মানুষের মত হাহাকার নিয়ে বিদায নেয় না তারা, সবার এক কথা ‘আবার দেখা হবে বীণা। একজন আবার রসিকরাজা পর জনমে তুমি পাতা হয়ো, আমি হইবো বীণা। মাঝে মাঝে একজনের খবর নিয়ে দূর দূর আর একজনের কাছে যেতে হয়, গোপন সংবাদের বহর দেখে বীণার হাসি আর থামে না, হাটতে হাটতে পা ফেটে গেছে, জুতো ছিঁড়ে গেছে, বাড়ি না ফিরে উপায়ও ছিলনা!

সেই ছোটো বেলা থেকে ছড়াটি একই রকম দেখছে তারা, কিছু টিলা আর নিয়াতি পাহাড় থেকে নমে আসা নাবতলার পানিই যার ভরসা, যতক্ষণ বৃষ্টি ততক্ষণ হাঁটু পানি, নাহলে বালি থেকে খুঁটে খুঁটে দুদশটা ডানকিনে আর বালিগড়া ধরতে পারবে যে কেউ। গ্রামের আরো আরো কতো ছড়া, তবু এই ছড়াতেই আসতো তারা, বুতুমগুলা দেখতে ভোদাই হলে কি হবে, দুনিয়ার বজ্জাত! কতো কায়দা করতো তারা ধরার জন্য কিন্তু মুহুর্তে নাই হয়ে যেত বালির ভেতর, তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে পানি গোলাপী করে ফেলত, হটাত কেউ একজন বলতো বনের ভেতর শাদা ঘোড়া দেখা যাচ্ছে। সবাই জানত শাদা ঘোড়া মানে পরীর পালকি, তারমানে বনে ভেতর পরী নেমেছে, বন ভর্তি বনফুলে! পরীস্থানের পরীদের দুনিয়ার ফুলেরও দরকার হয় কখনো কখনো! তখন একলা আর পছনদ হলে মানুষও তুলে নিয়ে যায় তারা, বীণা হাসতে গিয়ে কেঁদে ফেলে, টপটপ করে চোখের পানি ছড়ার পানিতে পড়তে থাকে। কান্না আসে চোখের ভেতর থেকে, তার কান্না কি পেটে থাকে! প্রথমে নাভির ভেতর পেছিয়ে ধরে, সেখান থেকে বুক, গলার ভেতর তীব্র জ্বলুনি, তারপর চোখ হয়ে গড়িয়ে পড়ে পানিতে, পানিতে মিশে কই থেকে কই চলে যাচ্ছে কান্না! এই ভালো, কেউ হটাৎ এলে মনে করবে ঝুঁকে বসে পানির তোড় দেখছে সে।

বী ণা...

বীণার রাগ হয়, এখনো সে শিশু নাকি যে বাড়িতে না পেলে ধরে নিতে হবে সে হারিয়ে গেছে! বাড়ি ফিরে দেখেছে সে বাড়ি নেই, জ্বর গায়ে কই যাবে, শুরু হয়ে গেছে ডাকাডাকি। তার রাগই হয়।

বী ণা...

এবার দুজন ডাকছে, সে কি এই গ্রামে বেড়াতে আসা কোনো শহুরে খুকি? অসহ্য করে ফেলল ঘরের মানুষেরা, এবার শুনো চার পাঁচজন ডাকছে! বীণা মুখ ঘুরিয়ে তাকায়, কাউকে দেখা যাচ্ছেনা, তারমানে বাড়ির উপর থেকে ডাকাডাকি চলছে, ছড়া এবং বাড়ির মাঝখানে উঁচু একসারি টিলা, তাই বাড়ির মাথা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু কেউ যখন বাড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে কাউকে ডাকে, পুত্রহারা মায়ের বিলাপের মত সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে আসে ডাকটি, যাকে ডাকা হয় সে ঠিকই শুনে, কিন্তু ডাকটা বাড়ি থেকেও আসছে না, এতক্ষণে বুঝা গেলো ডাকগুলা আশেপাশের টিলা আর দূরের নিয়াতি পাহাড় থেকেই আসছে। বীণা শক্ত হয়ে বসে থাকে, সে যাবেনা, কেউ যখন পাতা জমাবে না আর, বীণারও আর খাতির নেই কারো সাথে!

এখন আর দুদশজন নয়, শত শত, শহরের যারা বলছিলো আবার দেখা হবে, যে বলছিলো পর জনমে বীণা হবে সে আর বীণা হবে পাতা, তাদের ব্যাকুল কন্ঠ সবচেয়ে বেশি, বীণার ভেতরটা হাহাকার কওে ওঠে, পাগলের মত উঠে দাঁড়ায় সে, অনেক্ষণ পানিতে ভেজানো পা অসাড় হয়ে ছিলো, হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছড়ার পানিতে, আবার উঠে দাঁড়ায়, বনের ভেতর যাবে না পাহাড়ের ভেতর! পাহাড়ের ভেতর না বনের! মেঘলা মেঘলা আলোয় বীণা দেখে বনের মাথায় মাথায় চেনা চেনা মুখগুলো আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে, একসাথে কথা বলছে সবাই, হাসি হাসি মুখগুলো দেখতে দেখতে বনের ভেতর ঢুকে পড়ে বীণা...

৩টি মন্তব্য: