মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়'এর গল্প : কাঁচা লংকা , ভাঙা সাইকেল

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

এক

সাত নয় বিরানব্বই- এর সকালে ঘুম ভাঙতেই হরিদয়াল তার ভাঙা ফুটো আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল । নিজেকে দেখল , যেমন সে দেখে প্রতিদিন । চেনা আয়না , একই অবয়ব । আজ খুঁজে পেল অন্য প্রতিবিম্ব ।একঝলক হাসতেই ফোকলা দাঁতের গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল দু এক ফোঁটা থুতু । কোঠরে ঢুকে যাওয়া চোখ জোড়ার মধ্যে সে নিজেকে আবিস্কার করল গল্পের নায়ক হিসেবে । আর ঠিক তখনই শুরু হয়ে গেল ওর গল্পটা । কিছুদিন পর দায়িত্ব এসে পড়ল আমার ঘাড়ে – নেবারন , হামদের জীবন কি বেফালতু ?


বললাম – কেন ?

- ই ধুপসিপুড়া জীবন গবুরলেপা কপাল ইসব লিয়ে কি কনহ কহনি হয়না ?

- অনেক হয়েছে । আরও অনেক হবে হরি ।

- তার মইধ্যে আমি কুথায় ? হামদের লিয়ে জম্পেস একট কহনি লেইখ্যে দে মাইরি ।

হরিদয়াল মাহাত । পড়ত আমাদের সাথেই ।বন্ধুত্ব সেরকম ছিলনা । জানা হয়নি ওর ভেতরের যন্ত্রণা অথবা রক্তপাত। ভালোবাসা এসেছিল কি না ।শূন্যতা দিয়ে স্বপ্নচিত্র আঁকার নির্ভুল ঠিকানা তাকে তোলপাড় করেছে কখনও ? এসব প্রশ্নও উঠে আসেনি কোনোদিন ।ফলে অনেক কিছুই অজানা অচেনা আমার কাছে ।ওকে নিয়ে কি আর লিখব ? আজকালের গল্পের চেনা ছক মানে – প্রেম ট্রেম , একটু রহস্যকাহিনি ,হত্যা, খুন একাকীত্ব এবং ১৫% সেক্স ।হরিদয়ালকে নিয়ে গল্প লিখতে গেলে তো এসব কিছুই আসবেনা । একেবারে নীরস কাটখোট্টা লোক । বিয়ে থাও করেনি । আধুনিক গল্পের ছকে ওকে নিয়ে যাওয়া যাবেনা ।ও একটি মোস্ট রাবিশ । হারামজাদা জীবনটাকে গল্পের ফর্মুলায় বানাতে পর্যন্ত পারেনি ।

মাননীয় পাঠক ও পাঠিকা , আপনারা একটু থামুন ।হরিদয়াল সম্পর্কে যে শর্ট নোট আমি জানি তার কিছুটা তুলে ধরার দরকার আছে –

তার বাড়ি মনতোড়িয়া গ্রামে ।(আমার বাড়ি থেকে ৪/৫ কিমি দূরে , মাঝখান দিয়ে ডাংরা নদী চলে গেছে তির তির করে )। বয়স তিরিশের কাছাকাছি । চেহারায় পঞ্চাশের দাগ ।ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া কটা চুলের আগাছায় ভর্তি মাথা ,পাঁজরা খাঁড়া ।চিমসানো নিরামিষ শরীর , কোঠরে ঢুকে পড়া চোখের চরাচরে পিঁচুটির শোভা । সারামুখে মেচেতার দাগ । রঙ ভুশুণ্ডি কাকের চেয়ে ঈষৎ উন্নত । কোমরে নীলচে লুঙ্গি ময়লার স্তুপে ঘামে গন্ধময় ।( হয়ত এইসব কারনেই বিয়ে থা না করার প্রতিজ্ঞায় অটল ) গাঁয়ের মানুষের কাছে ড্যাঙ্গা হরি নামে আদৃত । এই হরিদয়ালের গল্প শোনার ধৈর্য আমার পাঠক পাঠিকার নেই । তবুও লিখতে হবে , সহপাঠী বন্ধুর আবদার অবহেলায় ফেলে দেওয়া অসম্ভব আমার পক্ষে ।

আমরা যখন খুব ছোট ,তখন আমাদের চেয়ে ৪/৫ বছরের বড় একটি ছেলে এসে ভর্তি হয়েছিল ক্লাস ফাইভে। রোগাটে গড়ন , মুখে সালখির চিহ্ন , মলিন জামা । সে- ই হরিদয়াল । ওর এমন বেশ ভুষা দেখেও কোনোরকম মায়া , মমতা বা অস্থিরতা তৈরি হয়নি আমার মধ্যে । যা জেগেছিল তা ভয় । চোর গুন্ডা বদমাশ লোকের চেহারা সম্বন্ধে আমার চিন্তায় যে পরিমণ্ডল রচিত হয়েছিল তাতে হরিকে ঐ জাতীয় কিছু বলে মনে হয়েছিল অনেকদিন ।পরে ঘটনার প্রতিঘাতে তা মুছে যায় ।সেইসব ঘটনার ২।৩ টি আজও মনে রয়ে গেছে -

এক.. ক্লাসরুমে একদিন সবাই মিলে মেরেছিলাম হরিকে । তার অপরাধ – সে একজনের বই চুরি করেছিল। বেধড়ক মার খেয়েও সে কাঁদে নি । চোখে রো পড়েনি । গলার স্বরে মিশেছিল আর্দ্রতা – বইট আমিই লিয়েছি ...কিনবার মতন পৈসা নাই ঘরে । তরা আমাকে মার , মার‍্যে শেষ কইরে দ্যা কিন্তুক আমার পিরানট (জামা) ছিঁড়ে দিস না ... আর কিনতে লাইরব ।স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সারা ক্লাসঘর । প্রান নিঙড়ানো এই রূঢ় বাস্তবতা আমি প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম। বুঝেছিলাম – সত্যকে অনুভব করতে হলে মানবিক হৃদয় লাগে ।

দুই.. বাঙলার স্যার অসিতবাবু রচনা লিখতে দিয়েছিলেন একদিন । তোমার জীবনের লক্ষ্য । আমরা খাতা ভর্তি করে লিখে চলেছি কত কিছু । ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বাসনায় ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে খাতার পাতা । চার পাতা পাঁচ পাতা লেখার পর তাকাই হরির দিকে ।ওর খাতায় কোন কালির দাগ নেই । নির্মল । জিজ্ঞেস করি – কিছু লিখিস নি কেন ?

- কি লেইখব ?

- যা হোক কিছু , স্কুল মাস্টার , অফিসার বা ডাক্তার ।

হো হো করে হেসে ওঠে সে - কিছুই তো লাইরব হইত্যে । হামদের জীবনে কনহ দিশা নাই । ই খাতাটর পারাই সাদা সুইন্য ।

আজ বুঝতে পারি আমরা সবাই মিথ্যে লিখে হাততালি পেতে চেয়েছিলাম । যার সাথে জীবনের কোন সংযোগ নেই এমন সব সাজানো মিথ্যে। হরি সত্য লিখেছিল জলন্ত সত্য ।



তিন.. হরি স্যারদের কাছে খুব মার খেত । স্কুলে না আসার জন্য । অনেক অনেক দিন শুনেছি ওর বাড়িতে রান্নার হাঁড়ি চড়ত না । প্রায় ই ঘটত এমন । যেদিন ওর খাওয়া দাওয়া জুটত না সেদিন পকেটে দশটা পয়সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত স্কুলের রাস্তায় । সেই পয়সা দিয়ে বিড়ি কিনত । স্কুলের সামনে যে বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে তার তলে বসে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ভুলে যেত খিদের যন্ত্রণা ।

এরপর একদিন ওর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল । ব্যস এই পর্যন্ত – আমি আমার বুক ছুঁয়ে বলছি এর বেশি বাড়তি কোন কিছুই আমার জানা নেই । প্রিয় পাঠক ও পাঠিকা , আপনারাই বলুন এই দু একটা পয়েন্ট দিয়ে কি গল্প বানানো যায় ?

এই অবধি হেঁটে এসেছিল হরিদয়ালের কহনি ।আর লেখা হয়ে ওঠেনি ।হরি বারবার তাগাদা দিয়েছে । আমি ওকে বোঝাতে পারিনি যে এরকম চরিত্র নিয়ে গল্প লেখা যায় না , গেলেও বাজারি কাগজগুলো তা ছাপে না ।শুধু বলেছি- নিশ্চয়ই লিখবো , কাহিনী সাজাতে সময় তো লাগবেই । আরও কিছুদিন... । তারপর বেমালুম ভুলে গেছি সব। কাগজে ওর সম্বন্ধে যেসব তথ্য ছিল অবিকল তেমন ই থেকে গেছে । যোগ হয়নি নতুন কোনো শব্দ ।



দুই

‘’আদা চাই কাঁচা লঙ্কা পিঁয়াজ র-সু-উ-উ-ন ” ভাঙা সাইকেলের বিচ্ছিরি আওয়াজের সাথে অতীব কর্কশ গলার স্বর মিশে নতুন মাত্রা যোগ করল পরিমণ্ডলে । আমি তখন বিছানায় । চীৎকার কানে যেতে হাত দিয়ে বন্ধ করলাম কান দুটো । কিন্তু বেশিক্ষণ নয় । উঠতেই হল শেষ তক ।জানলার কপাটে হাত রাখলাম । হাতের নিবেদিত স্পর্শে খুলে গেল জানালা। তাকালাম । ভুত দেখার মত দেখলাম হরিদয়াল দাঁড়িয়ে । আর ঠিক তখনই যন্ত্রচালিতের মত লিখে ফেললাম শব্দ দুটো – কাঁচা লংকা , ভাঙা সাইকেল ।

এরপর প্রতিদিনই ওর সাথে দেখা হয় । রাস্তায় ঘাটে হাটে । ভাঙা সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঝুড়ি ভর্তি সবজি , আদা , কাঁচা লংকা ,পিঁয়াজ রসুন নিয়ে সে রাস্তা সন্ধান করে । ওর কণ্ঠস্বরে ঢুকে পড়ে বিজ্ঞাপন । কেউ দু এক টাকার কেনে । “তোর সবজির কোয়ালিটি খারাপ বলে “ ফিরিয়ে দেয় কেউ কেউ ।হরির তাপউত্তাপ নেই এতে ।ওর জীবনের বৃত্তে কর্কশ শব্দের তরঙ্গে প্রবাহিত হয় কাঁচা লংকা । ভেঙে যাওয়া সাইকেলের ধাতব ঠুং ঠাং শব্দে জীবনের উষ্ণতা বাড়ে ।

বিজনেস শুরু হয়েছে তিনদিন হল । হরি খুব খুশি । একটা বীরুৎ অবলম্বন ওর জীবন আঁকড়ে ধরে । বেঁচে থাকার গোলার্ধে সংযোজিত হয় নতুন মাত্রা । স্বেদজাত আর্তির ভেতর মাথা তোলে অস্তিত্বের লবন ।

আজ রাস্তায় পা ফেলতেই হরিদয়ালের মুখোমুখি । পুরানো সাইকেল দেয়ালে ঠেসিয়ে হরি হিজিবিজি আঁকছিল মাটিতে । আমি দাঁড়ালাম । হরি তাকাল । ওর চোখে বিদ্যুতের ঝিলিক । হাসতে হাসতে বলল – শ্যাষ তক্ক বুদ্ধি ভাউর কইর‍্যে বিজনিস শুরু কইরলম নেবারন , বাইচতে গেলে কানা লকের লাঠি টাই ভরসা ।

- ঠিক , অবলম্বন ছাড়া কেউ ই বাঁচতে পারেনা । ওকে জীবনযুদ্ধে উত্তপ্ত করার জন্য এই কথাগুলো বলাই সহজ ও যথেষ্ট । হরি খুশি হল ।বলল- একদিন হামদের ঘরে যাইয়ে বামুনের পায়ের ধুলা দিয়্যে আসবি ।

আমি অনেক্ষন ধরে ওকে দেখলাম । দেখলাম এক বিস্তৃত মরুভূমি আর মরুভূমির মাঝে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য অকল্পনীয় কাঁচা লঙ্কার গাছ ।যাদের পায়ের তলা দিয়ে বয়ে চলেছে ক্ষীণ স্রোতের অথচ স্বচ্ছ ধারার সব নদীরা । স্বাভাবিক ও শব্দহীন ভাবে বয়ে চলেছে তারা । বয়ে চলেছে এক বিপন্ন পরিবারের অন্ন রেখার খোঁজে ।


তিন

হরিদয়ালের সামাজিক অবস্থানের জীবন্ত চিত্রনাট্যের মত লাগছিল বাড়িটাকে । বাড়ি শব্দটি বলা কি ঠিক হল ? কুঁড়েঘর বলাই সঙ্গত ।ঘরের চাল উড়ে গেছে । এদিক ওদিক দুচার আঁটি পুয়াল গোঁজা । মাটির দেয়ালে মাঝে মাঝে ফাটলের চিহ্ন । গোবরের প্রলেপ স্বত্বেও উলঙ্গ ।

বাড়ির মধ্যে ঢুকতে সংকোচ হচ্ছিল ।হরি আপ্যায়ন করল - আয় আয় উঠনট তে দাড়াই কি গপ্প করা যায় , ভিতর দিগে সিম্যা , বইস ।

বসলাম । চা ও এল ঠিক সময়ে । র –চা ।একটা থালায় মুড়ি । খেতে খেতে দেখছিলাম হরিদয়ালকে । ঠিক হরিদয়ালকেও নয় , ওর বাড়ি ঘরদোর , চারপাশ, আলো আঁধার ।গল্পের চরিত্রের মাঝে আশ্রয় কিভাবে তার ভুমিকা নেবে সেই ছবিটাকে স্কেচ করতে হবে এখন ।

সম্বল বলতে বাপের আমলের ভাঙা সাইকেল ।সিট নেই পরিবর্তে বস্তা ছেঁড়া গুঁজে দেওয়া ।তেলচিটে রঙ ময়লা ধরেছে এদিক ওদিক । সাইকেলটা বাদ দিয়ে কিছু লজঝড়ে আসবাব ।ভাবছিলাম এইসব সাতপাঁচ । হরিদয়ালের মাকে দেখলাম তখনই । প্রনাম করতে গেলাম । বাধা দিয়ে বলল – থাক বাপ থাক , বামুনের পেন্নাম লিলে পাপ হয় ।হরির বাবা তখন বিছানায় শুয়ে । পেল্লাদ মাহাত । কী দাপট ছিল লোকটার ,তাগড়া গতর । একেবারে পেটানো শরীর । গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরত লাঠি হাতে । রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ানোর সময় হাতে থাকত ছোট সাইজের টাঙ্গি । সবাই চিনত এক কথায় । দিন মজুরের কাজ করত । পাকা বাড়ি তৈরির মশলা বানাত ।আরও অনেক কাজ ।তখন সুখ ছিল বাড়িতে । পেল্লাদ মাহাতকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল আমার । মানুষ বোধহয় এখানে একেবারে অসহায় । গনগনে দুপুর তো জানেনা মনমরা বিকেলের কথা ।

পেল্লাদের ছিল হাঁড়িয়ার নেশা । প্রায়ই ফিরত দেরি করে টলতে টলতে । তারপরই ধরল রোগটা । কি রোগ ওরা জানেনা । শুধু স্বপ্ন দেখে এখনও তাকে বাঁচানো যায় যদি দুবেলা দুমুঠো পেট ভরতি ভাল খাবার দেওয়া যায় । মানুষের শরীরে মরণের গন্ধ বাস শুরু হলে সে খাবার খোঁজে, খাবার। আর খাবারের অনুসন্ধান পর্বের মধ্যে সে নিজেকে ধ্বংস করে ক্রমাগত , পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারে । ফলে তার জীবন বিস্তারের মধ্যে কোন শব্দ থাকেনা। এ এক অর্থহীন অলৌকিক আত্মরতির খেলা । প্রতিরোধ নেই । হরিদয়ালের ঘুন ধরা ভাঙাচোরা চিড়ে চ্যাপটা জীবন বিস্তারের মধ্যে কোনও সবল প্রতিরোধ নেই । হরিদয়ালের মা বিলাসী মাহাত যে জীবন বলতে বুঝেছিল ভাত আর ভাতার । সেও থমকে গিয়েছিল । তবু জীবনের বাকি অর্ধেক অংশ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল । নিভে যাবে জেনেও আলো যেভাবে দপ করে জ্বলে ওঠে, ঠিক সেরকম ক্ষয়ে ক্ষয়েও আশাটা জিইয়ে রাখে বুকে । আর হরি বেচারা হরি ভাঙা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তার রাস্তায় । ওর মা খুক খুক করে কাশতে কাশতে বলে – ঝট অ কইর‍্যে ফিরিস বাপ । তবু ফিরতে দেরি হয় হরির ।অনেক দূর যেতে হয় ওকে । অ নে ক দূ র । আগরাবাইদ কেতনকিরি করঞ্জবেড়িয়া, কালিদহ – চারপাশের গাঁ গঞ্জ ।মঙ্গলবার যেদিন ইন্দ্রবিল স্টেশনে হাট বসে বেশ ভালই বিক্রি হয় সেদিন । বুক আনন্দে উথাল পাথাল । গান গায় – “ অ মাধবী তুমি বড় লকের মেয়ে । আমি যে সবজিওলা, তুমি কি আমার হবে ? ” মনের আনন্দে মায়ের হাতে তুলে দেয় পঞ্চাশ টাকার নোট । মায়ের চোখে খুশির ঝিলিক । হাটবার বাদ দিয়ে অন্যান্য দিনগুলিতে তাকে যেতে হয় দূর দূরান্তে । মাথার উপর গনগনে সূর্য ।বুকে হাজার যন্ত্রনার কিলবিলানি ডাংরার জলে ভেসে যায় । হরি চেঁচিয়ে বলতে থাকে – আদা চাই , কাঁচা ল অং কা , পি--- আ--- জ , র সু উউউউউউন । স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর থেকে বিকৃত হয়ে যায় শব্দ । কাঁচা লংকা আদা শব্দ দুটোর মধ্যে দুটো ছবি ভেসে ওঠে আমার চোখে । এক অসহায় বাবা আর এক অসহায় মায়ের ছবি । মনে হয় জীবন ও রক্তের ক্রমাগত বিনিময় চলছে শব্দের সঙ্গে। অনুবর্তিত বোধের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে শব্দ । গল্পের চরিত্রগুলি শব্দে শব্দে ঢেকে নিচ্ছে শরীর ।

“ আর হ দুটি মুড় হি দিই বাপ- হরির মায়ের যত্ন ও আন্তরিকতা আমার চিন্তায় ছেদ টানল ।

-না, আর খাইত্যে লাইরব্য

- লাজ শরম কিসের ? ইটও ঘর বটে ন

আমি তাকালাম হরির মায়ের দিকে । অভিমান ছায়া ফেলল তার মুখে ।আন্তরিকতায় আরও দুমুঠো মুড়ি দিতে চাইল । আমি ফিরিয়ে দিলাম । কেন ফিরিয়ে দিলাম এই জিজ্ঞাসা জনিত অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল আমার গল্পের এক চরিত্র। আমি দেখলাম ।


চার

অবশেষে একদিন বন্ধ হয়ে যায় হরিদয়ালের ব্যাবসা । পুঁজির অভাব বা অন্য কি কারনে তার বিজনেস বন্ধ হয়েছিল আজ আর ঠিক মনে নেই । এরপর সে ইটভাটায় কাজ পায় । একজন প্রান্তিক ব্যাবসাদারের শ্রমিকে রূপান্তর এই বিপন্নতার মধ্যেই গল্পের পরিসমাপ্তি । ক্রমমুক্তি বা সমাজবিপ্লবী কোনও ভাবনাও জড়িয়ে ধরেনি কাহিনির বিন্যাস । তারপর গল্পটিকে ছুঁড়ে দিই এক বাজারী কাগজের ঠিকানায় ।কোনো উত্তর আসেনি । চার পাঁচ মাস পর একদিন কি মনে হল সম্পাদকের সাথে দেখা করলাম । বিভিন্ন শব্দের অনুষঙ্গে গল্পের প্রসঙ্গ টেনে আনলাম ।

- কোন গল্প ? তির্যক চোখ থেকে প্রশ্নটা এল ।

- সেই হরিদয়ালের গল্প ।

তিনি হাসলেন । অদ্ভুত বিস্ময়াতীত হাসি ।

- হরিদয়াল ফরিদয়ালের গল্প আমরা ছাপিনা বলে তড়িৎ গতিতে ড্রয়ার থেকে বের করে আনলেন খামটা । পারলে বেশ জম্পেস এক রসালো গল্প লিখুন ।

- লেখাটা পছন্দ হয়নি তাহলে? খাম গুছিয়ে নিতে নিতে বললাম ।

- পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার নয়। এ ধরণের লেখা ছাপলে পত্রিকার বাজার কমে যাবে ।

- আসি ।

- একমিনিট । এসব গল্প দেবার জন্য আসবেন না । প্রেমের গল্প আই মিন রসালো প্রেমের গল্প লিখতে পারলে আসবেন ।পাঠক রুচি নিয়েই তো আমাদের কারবার ।

সেরকম গল্প এখনও লিখে উঠতে পারিনি । কলম থেকে উঠে আসে রক্ত বমি করা মানুষ । হেপো রোগী । এদের জীবনে তো রসালো প্রেমের গল্প নেই। শরীরের ঝুলে পড়া মাংসের মধ্যে পাঠককে আকৃষ্ট করার লাবন্য নেই ।এদের গল্প ছাপলে তো পত্রিকার রিডারশীপ কমবেই ।

আমি এখন ভবঘুরে । এ গ্রাম থেকে ও গ্রাম ঘুরে বেড়াই । গল্পের চরিত্র খুঁজি । মফঃস্বল থেকে ভাঙা টাইপে ছাপা গল্পের কাগজ বের করি । তাতেই এসব লিখি ।কেউ পড়েনা । জানি কেউ পড়বেনা । তবু লিখি । কেন লিখি তাও জানিনা । ভাঙা সাহিত্যের গাড়িতে চাপিয়ে কাঁচা লংকার মত ফেরি করে বেড়াই এইসব কাগজ । ময়লার স্তুপ জমে বাড়িতে ।অসুস্থ বাবা ও মায়ের ওষুধের পয়সা থেকে গল্পের কাগজ তৈরি হয় । কেমন যেন উন্মাদের মত মনে হয় । ।আয়নার সামনে এসে নিজেকে দেখতে বড় চমৎকার লাগে । বুঝতে পারি এই প্রতিবিম্বে চেনা লোকের গন্ধ মিশে আছে । কার ? আকস্মিক প্রশ্নে জেগে ওঠে স্নায়ু ।শব্দের গভীরে হেঁটে যায় মন , দ্রুত ও অবিন্যস্ত ভাবে । ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে আয়না । স্থিতিশীলতা থেকে আবির্ভূত হয় নিঃশ্বাস । রাতের অন্ধকারে একটি শব্দ আমাকে খুঁজে বেড়ায়। একটি শব্দ – কাঁচা লংকা ।

প্রিয় পাঠক ও পাঠিকা , হরিদয়ালের গল্প শেষ হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই ।ওটা আর ছাপা হবে না ।পাণ্ডুলিপির পাতা ছিঁড়ে গেছে । তার পরিবর্তে পাবেন নেবারন মুখুজ্জেকে ।গল্পের নাম অপরিবর্তিত । কিছুই বদলয়ায় নি । ঘটনা পালটে যায়নি । বদলে গেছে কিছু শব্দ আর অক্ষরের সজ্জা । এই গল্পে যদি কোথাও হরিদয়াল বলে কোনও শব্দ থাকে কেটে ফেলুন । প্লিজ মুছে দিন । তার জায়গায় নিয়ে আসুন নেবারন মুখুজ্জেকে । এ গল্প নেবারনের গল্প । আর একান্ত অনুরোধ – গল্পটি পড়ুন একদম প্রথম থেকে ।


লেখক পরিচিতি
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
জন্ম সাল – ১৯৭২
জন্মস্থান – পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামে ।
বর্তমান আবাস স্থল – আদ্রা, পুরুলিয়া।
পেশা – রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী ।

কোন কোন শাখায় লেখেন – কবিতা, গল্প, অণুগল্প , উপন্যাস,প্রবন্ধ এবং শিশুসাহিত্য।

কোন কোন পত্রিকায় লেখেন – নন্দন , কবি সম্মেলন , কবিতা পাক্ষিক , কবিতা ক্যাম্পাস , একুশ শতক , বাক , আপনজন , কবিতা কলকাতা , কফিহাউস , দুর্বাশা , জিগীষা , আলোর ফুলকি , রঙবেরঙ , ছোটদের কথা , পুর্বাশা এখন ( প ব এবং নরওয়ে থেকে একযোগে প্রকাশিত ) , দ্য বেঙ্গলি টাইমস ( টরেন্টো , নরওয়ে ) ঢাকা রিভিউ সহ দুপার বাঙলা ও বহির্বাংলার অগণিত কাগজে , ওয়েবে ।

প্রকাশিত গ্রন্থতালিকা –

১ সুসংবাদ কিনতে যাব ( প্রতিভাস, ২০১৩)
২ প্রান্তিক জানালা ও অন্যান্য গল্প (পাঠক ,২০১৫)
৩ আঁধারে অঘ্রাণ ( অক্সিজেন , ২০১৫) ,
৪ রাঙা মাথায় চিরুনি (সঞ্চিতা ২০১৫ ) ,
৫ হাইফেন বসানো বারান্দা (পাঠক ,২০১৬)
৬ বিভ্রম রঙের মেঘ ( কবিতাডিহি , ২০১৬ )

শীঘ্রই প্রকাশিত হবে
আক্রান্ত বৃষ্টিদিন ( উপন্যাস)
কাগজ ক্লোরোফিল ও অন্যান্য ( গদ্য)

পুরস্কার –
অণুপত্রী সাহিত্য পুরস্কার (২০১২)
পুর্বাশা এখন পুরস্কার (২০১৪)
কফিহাউস পুরস্কার (২০১৫ )

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন