মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

সৈকত আরেফিন-এর গল্প : কী ফুল ঝরিল

যুবকদের শহরে যাওয়া যাক। শান্ত, মনোটোনাস শহরটিতে খুব শীত আসে। জবুথবু শহরে, সন্ধ্যায় গলায় মাফলার জড়িয়ে যুবকেরা বাইরে বেরোয়। ঘরের উষ্ণতা ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনজন যুবক একে একে এসে দাঁড়ায় কাজলা মোড়ে কয়েসের টি-স্টলের সামনে। এখান থেকে তারা সাহেববাজার যাবে। জিরো পয়েন্ট নেমে যুবকেরা মালোপাড়ায় চলে যেতে পারে আবার বড় মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে পদ্মার পাড়ে রিভার ভিউ রেস্তরাঁয় গিয়ে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে শীত উপভোগ করলেও কারো কিছু বলার নেই। এ শহরে কেউ কাউকে কিছু বলে না।

সাহেববাজার যেতে যুবকদের বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সরণি পার হতে হয়। অটোবাইকের চালক যখন বাজার, বর্ণালি, লক্ষ্মীপুর বলে যাত্রী খোঁজে যুবকেরা দেখে বিলবোর্ডে সুন্দরী মডেলের মুখ কুয়াশায় ভিজে গেছে। শীতের শহরে স্বল্পবসনা মডেলের কুয়াশার শিশিরে আর্দ্র নরম শরীর তাদের বরং উত্তাপ দেয়। কয়েসের টি-স্টলেও তারা কখনো উত্তাপ পেতে পারে। কিন্তু কয়েসের বানানো চা, চা-সমেত আড্ডা তাদের ভেতরে জমানো বরফ উষ্ণতায় উড়িয়ে দিতে পারে না। কাচের কাপে চুমুক দিয়ে কয়েসকে ডেকে যুবকেরা বলে-পানি কি রোদে গরম করা না কি কয়েস? চাদরে ঢাকা শরীর থেকে মুখ বের করে কয়েস হাসে। কয়েসের হাসিতে শীতে কাতর শহরের মালিন্য একটুও কমে না। মলিন এই শহরের প্রতি যুবকদিগের ভালবাসাও হয়তো কমে না। একদিন অনেকদিন আগে--বন্যার বছরে; সে বছর বন্যায় দেশটাই যেন একটা নদী হয়ে গেছিল--তখন হেমন্তের ধানখেতের মতো দিগন্তে অবতরণশীল আকাশের পাশে শুয়ে থাকা নদী পদ্মার শহরে অভিষেক হয়েছিল তাদের। দূর দূর গ্রাম থেকে, মফঃস্বল শহর থেকে তারা এসেছিল। কেউ বাসে এসেছিল, কেউ বা ট্রেনে। হয়তো সেদিনই, বাসস্ট্যান্ডে বা রেলস্টেশনে কেউ স্বাগত না জানালেও ঠিক হয়ে গিয়েছিল এই শহরে যুবকেরা অনেকদিন থেকে যাবে। শহরে অবস্থিতির দীর্ঘতা বিষয়ে সচেতনভাবে তারা ভেবেছিল কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে তিনজনের প্রত্যেকে মনে করতে পারে--ক্যাম্পাসের প্যারিস রোডই তাদের প্রথম রোমান্টিক করেছিল। তাদের এও মনে আছে ঊর্ধ্বমুখী গগনশিরিষের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে গাছের পাতার ফাঁক গলে ঝকঝকে রোদ এসে শরীর ছুঁয়ে দিলে ত্বকের গোপন কোষে নিভৃতে ঘুমোনো গভীর অসুখে আক্রান্ত হয়েছিল তারা। প্যারিস রোডে কোরাস গানে গলা মেলানো সেইসব দিনে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যাকবেঞ্চে দাঁড়ায় যে মেয়েটি, কল্লোল ছাত্রনিকেতনের তিনজন গ্রাম্য তরুণ প্রথমত মেয়েটির গলার স্বরে, দ্বিতীয়ত তার বলার ভঙ্গিতে বিস্ময়ে অভিভূত হয়। তখন শ্রেণিকক্ষে সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটিতে কেবল বালকোত্তীর্ণ তরুণেরা ত্বকের নিচে লুকিয়ে থাকা গভীর অসুখ টের পায়। কী একটা প্রশ্নে সবাই অপারগ হলে নিতান্ত অনিচ্ছায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট নাগরিক উচ্চারণে প্রশ্নের উত্তর সে এমনভাবে দেয়--যেন এ আর এমন কী প্রশ্ন! চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় আর টইটুম্বুর আনন্দ নিয়ে সেই প্রথম তিনজন তরুণ একসঙ্গে একজন তরুণীর দিকে নির্লজ্জ তাকায়--তারা দেখে অনিন্দ্য সুন্দর একটি মেয়ে, চেহারা জুড়ে দ্বিধাহীন সরলতা--সটান দাঁড়িয়ে আছে, তখনও তরুণেরা তার নাম জানে না।

ছেলেগুলো প্রথম সুন্দর দেখার সম্মোহনে বিচলিত হয়। কী করবে ভেবে পায় না। মেয়েটির ক্লাস করার সঙ্গে তাদের ক্লাস করা নির্ভর করে। যেদিন সে ক্লাসে আসে না, ছেলেগুলো পেছন দরজা বেরিয়ে গিয়ে লিটনের স্টলে গিয়ে সিগারেট খায়। সেইসব দিনে হয়তো তরুণেরা অপেক্ষার আকাক্সক্ষা নিয়ে হেঁটে বেড়ায় প্যারিস রোডে, শহীদ মিনার পার্কে। কিংবা চারুকলার পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি ভদ্রা হয়ে স্টেশনে পৌঁছে গেছে--স্তব্ধ বিকেলে নির্জন সেই রেলরাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনটে বোকা ছেলে দার্শনিক হয়ে ভাবে--তাদের বিপরীতে ঐ মেয়েটি--যার নাম এখন তারা জানে; অকপট, আকর্ষণীয় মেয়েটি যেন মাটির বুকে শুয়ে থাকা রেলরাস্তার অপর প্রান্ত--কোনদিনই কেউ কারো নাগাল পাবে না।

কিন্তু দূর থেকে তাকালে সমান্তরাল রেলরাস্তাও একবিন্দুতে কোথাও না কোথাও মিলে। প্রেমের দেবতাও হয়তো দূর থেকে লক্ষ্য করছিল তিনজন তরুণের গোপন আত্মসমর্পণ। তাদের বুকের একতারায় বেজে যাওয়া করুণ রাগিনী শুনে সদাশয় দেব মহোদয়ের দয়া হয়। একদিন শহীদুল্লাহ কলাভবনের চারতলায় ক্লাস শেষে আঞ্জু নামের স্বাস্থ্যবতী মেয়েটি তরুণদের পথ আগলায়--জানো, আজ আমার জন্মদিন। তোমরা কি আমার সঙ্গে ক্যাফেটারিয়ায় যাবে? এবারের জন্মদিনটা আমি বন্ধুদের সঙ্গে সেলিব্রেট করতে চাই। যাবে তোমরা? জন্মদিন না থাকা এমনকি সার্টিফিকেটের জন্মদিনও ভুলে যাওয়া তরুণেরা এই আহ্বানে কী বলবে বুঝতে পারে না। সম্মোহিতের মতো আঞ্জুর পেছন পেছন হাঁটে। কলাভবন থেকে ক্যাফেটারিয়ার দিকে যেতে যেতে আঞ্জু বলে--কই তোমরা তো আমাকে শুভেচ্ছা জানালে না! আমাকে উইশ কর, উইশ কর। লজ্জিত হয়ে তিনজন তরুণ একসাথে সুর করে বলে--হ্যাপি বার্থডে টু ইউ আঞ্জু। আঞ্জু উচ্ছ্বাসে ভেসে যায়, হাসে, কলকল করে কথা বলে। ওর আনন্দিত হওয়া দেখে তরুণেরা বিস্মিত হয়ে ভাবে--জন্মদিন ব্যাপারটা তাহলে এত আনন্দের! ক্যাফেটারিয়ায় আরও বিস্ময় তাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। আঞ্জুর জন্মদিনের অক্টোবরে ক্যাফেটারিয়ার কেবিনঘরে ঢুকে গভীর অসুখে আক্রান্ত তিনজন সরল তরুণ একসঙ্গে হোঁচট খায় আর বুকের বাঁ পাশে ব্যথার মতো বাস করা এতদিনে জানা নামটি মুখ দিয়ে অনুচ্চ স্বরে বেরিয়ে যায়--প্রিয়লেখা!

মার্চের দিনগুলো এমন ফুরফুরে--বাতাসে দূরবর্তী নদীর গন্ধ লেগে থাকে। দূরে, যেন শৈশবের পাশে বসে কেউ বাঁশি বাজায়; সেই অমিয় সুরের সামান্য আভাস ভেসে আসে বাতাসে। তার কিছুটা শোনা যায়, কিছুটা শোনা যায় না। গাছের সবুজ পাতারা ঝরতে শুরু করে। পুরো ক্যাম্পাসটি একটা পাতার গালিচা হয়ে যায়। কিন্তু নিষ্পত্র বৃক্ষের নিচে তরুণেরা কোথাও ছায়া খুঁজে পায় না--রোদ অবলীলায় সর্বত্র ঢুকে পড়ে। এভাবে তাদের ছায়াময় ক্যাম্পাসে রোদের নির্লজ্জ অনুপ্রবেশ সত্ত্বেও প্রিয়লেখার সঙ্গে পরিচয়ের পরবর্তী মার্চ মাসটি তিনজন তরুণকে উন্মাতাল করে দেয়। তখন, সেই নাতিশীতোষ্ণ বসন্তকালে একদিন প্রিয়লেখা তরুণদের আড্ডার মাঝখানে এসে বলে--এই যে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, একটা সিগ্রেট দে তো--টানি। হয়তো অবাক হতেও ভুলে যায় তারা; তিনজনই ভাবে--আমরা তো সিগারেট খাই না, নিতান্ত বিড়িটিড়িই যা ভরসা--সিগারেট খেতে পারলেও বিড়ি কি আর ও খেতে পারবে! সেদিন প্রিয়লেখা তাদের গা ঘেঁষে বসে কমদামি বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে হাসে। আর তিন সরল প্রেমিক এত কাছাকাছি বসে সেই প্রথম বিড়ির উৎকট গন্ধ ছাপিয়ে প্রিয়লেখার গায়ের মাতাল গন্ধে শিহরিত হয়। কিন্তু শিহরণের সেই শুরু। প্রিয়লেখা হয়তো কিছু না বুঝেই একের পর এক তাদের শিহরিত করে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে তরুণদের সঙ্গেই কাটায়। শহীদ মিনারে, পার্কে, টিএসসিসি মাঠে, ইবলিসে প্রিয়লেখার সঙ্গে তিনটি ছেলেকে দেখা যায়--এমনকি ক্লাসেও এক বেঞ্চে ওরা তিনজন থেকে চারজন হয়ে ওঠে।

এত বড় মতিহার, একসময় সেটাকেও খুব ছোট মনে হয়--ক্যাম্পাসের তেমন কোন জায়গা অবশিষ্ট রইল না যেখানে তারা যায় না। প্রিয়লেখাকে নিয়ে ঘুরবে বলে তিনজন একটা সাইকেল কিনে ফেলে। তিনজনের সঙ্গেই প্রিয়লেখাকে একবার করে সাইকেলের পেছনে চড়তে হয়। প্রিয়লেখা তিনজনের কাউকে না করে না। যখন যার পেছনে চড়ে, তখন অহেতু তার কোমড় জড়িয়ে ধরে। তাতে তরুণদের সাইকেল চালনায় সমস্যা হয় কি না তা কেবল তারাই বলতে পারবে। তবে সাইকেলটিকে একসময় আর দেখা যায় না। প্রিয়লেখা সাইকেলের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলে--সাইকেল নষ্ট হয়ে গেছে। প্রিয়লেখা মুচকি হাসে। ওর হাসিতে তরুণেরা বিভ্রান্ত হয়, বিপর্যস্ত বোধ করে। তখন--তোদের সাইকেলে চড়তে চড়তে আমার পাছা ভারী হয়ে গেছে--বলে প্রিয়লেখা সাইকেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার মিথ্যেটি থেকে তরুণদের বাঁচিয়ে দেয়। আবার তারা হাঁটে। হেঁটে হেঁটে এখানে ওখানে যায়--ক্যাম্পাস মুখস্থ করে। খুঁজে খুঁজে জায়গা বের করে। রোকেয়া হলের পেছনে বিজন বন। এদিকটায় লোকজন আসে না। প্রকাশ্যে শেয়াল ঘুরে বেড়ায়। তরুণেরা একদিন প্রিয়লেখাকে নিয়ে বা হয়তো প্রিয়লেখাই তরুণদের নিয়ে এই বনে ঢুকে যায়। একটি মেয়েকে নিয়ে তিনটে ছেলের নির্জন বনে ঢুকে যাওয়ার এই দৃশ্যটি হয়তো কেউ দেখতে পায় না। দেখতে পেলে সে নিশ্চয়ই আতঙ্কিত হয়ে লোকজন নিয়ে তাড়া করত। ওরা চারজন বনে ঢুকে--পাহাড়ের কেউ যখন সমতলে এসে সব সমান সব সমান বলে আনন্দে উল্লসিত হয় তেমন বিস্ময়ে চারটি ছেলেমেয়ে বনের মধ্যে চিৎকার করে--সব সবুজ, সব সবুজ! ঘুরতে ঘুরতে এই বনে তরুণেরা শৈশবে হারিয়ে যাওয়া বেথুল খুঁজে পায়। প্রিয়লেখা বেতের এই গোলাকার বা একটু লম্বাটে, ছোট কষযুক্ত টকমিষ্টি এই ফলটি কখনো দেখে নি--জীবনানন্দের ‘তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে’ পড়ে কখনো ভাবে নি এভাবে ঘুরতে এসে কোনদিন ঠিক বেতের ফলের দেখা পেয়ে যাবে। হাতের মধ্যে এক থোকা বেথুল পেয়ে সে তখন বিস্ময় ও আনন্দে উদ্বেল! বেতবনে ঢুকে বেথুল তুলতে গিয়ে তরুণদের হাত ছড়ে যায়, রক্তপাতও হয় একটু। প্রিয়লেখার খুশির হাসির কাছে ছেলেদের এ সামান্য রক্ত-বিসর্জন কিছুই না। প্রিয়লেখা বোঝে তরুণেরা ওর জন্য এরচেয়ে বেশিকিছু অবলীলায় করবে। রোকেয়া হলের পেছনে ঘন জঙ্গলের পটভূমিকায়, তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে--গাছের পাতার ফাঁক গলে আলো এসে পড়ছে প্রিয়লেখার মুখে--কী সুন্দরই না লাগছে ওকে। প্রিয়লেখা হাতের আঙুল তুলে তিনজনকে ডাকে। থোকা থেকে একটা বেথুলের খোসা ছাড়িয়ে মুখে দিতে দিতে বলে--নে আজ তোরা আমায় চুমু খা। দেখি সবচেয়ে কে ভাল পারিস চুমু খেতে।

সেই অপার্থিব বিকেলে নির্জন বনে তরুণেরা নতুন একটা পৃথিবী আবিষ্কার করে। নতুন পৃথিবীতে প্রিয়লেখা নতুন শিহরণে তিনটি ছেলেকে স্তব্ধ করে দেয়।


এরপর কিছুদিন ছেলেগুলো দৃশ্যপট থেকে হাওয়া হয়ে যায়। তাদের কোন খোঁজখবর ক্লাসের কেউই বলতে পারে না। হয়তো প্রিয়লেখা বলতে পারত--কিন্তু তারও কোন খোঁজ নেই। এ নিয়ে ক্লাসমেটদের কারো মাথাব্যথা না থাকলেও দুএকজন হয়তো খেয়াল করে একে অপরকে জিজ্ঞেস করে--ওই তিনজন কই গেছে রে? ওই যে তিনটে ছেলে সবসময় একসঙ্গে ঘোরে, কই গেছে ওরা? তবে এই জিজ্ঞাসা আরও ছড়িয়ে পড়ার আগেই তরুণেরা ক্লাসে ফিরে আসে। কিন্তু এতদিন কোথায় ছিল, আসে নি কেন, অসুখ করেছিল কি না জাতীয় প্রশ্নের তারা কোন জবাব দেয় না বা দিতে চায় না--উদাসভাবে তাকিয়ে থাকে, কাজের অজুহাতে অন্যদিকে চলে যায়। তবু শিহরণের স্তব্ধতা সম্ভবত নিঃশেষিত হয় না। ক্রমাগত আকাক্সক্ষার বারুদ জমা হয়। বোকাটে তিন তরুণ গোপনে আরও পুরুষ হয়ে ওঠে। কামনার আগুনে পুড়ে যায় তাদের যাবতীয় সারল্য। ভুলে যায়। নিজেদের নাম পর্যন্ত মনে করতে পারে না। কল্লোল ছাত্রনিকেতনের দোতলার একটা ঘরে শুয়ে মহাসড়কে ছুটন্ত গাড়ি দেখে--মানুষ দেখে। হুড খোলা রিকশায় তরুণীরা হাসতে হাসতে চলে যায়। বৃষ্টি আসে। জানালা খোলা পেয়ে বৃষ্টি তাদের ভেজায়। বৃষ্টির পরশে কখন তারা ঘুমিয়ে যায়, বোঝে না। উঠে দেখে বিকেল--চারপাশে বিকেলের আলো। মহাসড়কে ছুটন্ত গাড়ি, মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা, রিকশার বেলের টুংটাং, আনন্দে উচ্ছ্বল তরুণীরা দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। ততক্ষণে তরুণেরা ভুলে যায় সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হয়েছিল।

যুবকদের শহরে বৃষ্টি খুব একটা হয় না--কালেভদ্রে দুএক পশলা যা হয় তাতে ধুলোও মরে না। ধুলোর শহরে প্রচ- বিক্রমে গরম আসে--যেমন করে শীতে শীত। সূর্য অনেকখানি নিচে নেমে এসে তাপ দেয়। যুবকেরা ঘামে। ধুলো ঘামে পর্যুদস্ত হয়ে ঘরে ফিরে বাথরুমে যায়। শাওয়ার ছেড়ে ভিজতে ভিজতে হয়তো ভাবে--শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা! দিনশেষে, সন্ধ্যায় তারা বেরোয়--যেমনটা প্রত্যহ করে। সেই কাজলার মোড়ে, কয়েসের টি-স্টলের সামনে একে একে এসে তিনজন যুবক অটোবাইকের অপেক্ষা করে। বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সরণি পার হয়ে তারা কোনদিন হয়তো সাহেববাজার যায়; পদ্মার পাড়ে রিভার ভিউ রেস্তরাঁয় বসে কফি বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খায়, মালোপাড়ায় আবু হাশেমের আস্তানায় গিয়ে চাই কি কেরু এন্ড কোং-ও দুএক পেগ মেরে দিতে পারে। তারপর ফেরার পথে কিঞ্চিৎ মাতলামি যদি কেউ করেও ফেলে কারো কিছু বলার নেই। এ শহরে কেউ কাউকে কিছু বলে না।

কোন কোনদিন তারা কাজলা ছেড়ে যায় না। কয়েসের টি-স্টলে বসে রোদে গরম করার মতো ঈষদুষ্ণ পানি দিয়ে বানানো চা খায়, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর ভরিয়ে ফেলে। কয়েসের টি-স্টলের দেয়ালে ভুল বানানে লেখা--‘ইখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষেদ’। যুবকেরা রাজনৈতিক আলাপ করে না। যেখানে যখনই তারা কথা বলে, তারা পুরনো দিনে ফিরে যায়। আলাপে আলাপে তারা মনে করতে পারে প্রিয়লেখা যেদিন তিনজনকে চুমুর প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়ে তাদের অনাঘ্রাত কামনাকে উসকে দিয়েছিল--শেষে এই প্রতিযোগিতার ফলাফল তারা জানতে পারে না। ছেলেরা প্রত্যেকে অন্তর্গত আনন্দ অনুভব করে হয়তো ভাবে সেই চ্যাম্পিয়ন--কিন্তু বিচারক কোন কথা না বলে মুচকি হাসে। প্রিয়লেখার হাসিতে তিনজনই বিভ্রান্ত হয়। কল্লোল ছাত্রনিকেতনে ফিরে তিন রুমমেট সবাই নিজেকে প্রিয়লেখার একমাত্র প্রেমিক ও সেদিনের চুমুতে চ্যাম্পিয়ন দাবি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রক্তাক্ত সংঘর্ষ শেষে তারা তিনজন গলা জড়াজড়ি করে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে তারা বলে--আমরা একসঙ্গে প্রিয়লেখাকে ভালবাসব। আক্রান্ত জায়গাগুলো ফুলে গেলে রাতে তিনজন একসঙ্গে বিনোদপুর বাজারের মানিক ফার্মেসি থেকে মলম আর ট্যাবলেট কিনে আনে। কিন্তু কেটে যাওয়া জায়গাগুলো সব সহজে শুকোয় না। তিনজন বন্ধু রুমে শুয়ে সুমনের গান শোনে--প্রথমত আমি তোমাকে চাই...। তখন ক্যাম্পাসে, ক্লাসে তাদের অনুপস্থিতির পরিস্থিতিতে ক্লাসমেটদের কেউ কেউ খেয়াল করে একে অপরকে জিজ্ঞেস করে--ওই তিনজন কই গেছে রে? ওই যে তিনটে ছেলে সবসময় একসঙ্গে ঘোরে, কই গেছে ওরা? কয়েসের টি-স্টলে গরমে ঘামতে ঘামতে যুবকেরা নিজেদের মারামারির কথা মনে করে হাসে। কেটে যাওয়া জায়গাগুলো একে অপরকে দেখায়--এইখানে কেটে গেছিল আমার। শালা যা মারছিলি আমাকে। সারা গা ব্যথা হয়ে গেছিল। এভাবে রাত বাড়তে থাকলে যখন আবহাওয়া একটু ঠা-া হয়ে আসে তখনও যুবকেরা ভেবে পায় না--প্রিয়লেখা মূলত কী চেয়েছিল? তারা মনে করতে পারে, এরপরে একদিন ভদ্রা পার্কের পুকুরঘাটে বসে প্রিয়লেখা বলেছিল--তোরা খুব ভাল। কিন্তু তোরা একা একা যেন অসম্পূর্ণ। যখন আলাদা আলাদাভাবে তোদের ভাবি, কাছে পাই তখনও আমার ভাল লাগে। কিন্তু সম্পূর্ণ যেন পাই না। যখন তোদের একত্রে ভাবি, একসঙ্গে কাছে আসিস তখন মনে হয় পুরোটা পাই। তোদের কাউকে আমি হারাতে চাই না, কাউকে না। এখন আমি কী করি বল তো! তাদের নিয়ে প্রিয়লেখার সেই সংকট মনে করে যুবকেরা উপলব্ধি করে--প্রিয়লেখা ছিল অদ্ভুত!

তিনটে গ্রামীণ ছেলেকে নিয়ে এই সংকটে সে পড়বে, হয়তো প্রিয়লেখাও কখনো ভাবে নি। পোড় খাওয়া মেয়েটির সঙ্গে তরুণদের সম্পর্কের টানাপোড়েন তাকে জীবনের নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে সে বুঝতে পারে ঐ তিনটে ছেলে তার কতখানি জুড়ে আছে। সেই রৌদ্রতপ্ত গ্রীষ্মকালে মায়ের সঙ্গে টেলিভিশনে কোন এক পুরনো দিনের সিনেমা দেখতে দেখতে প্রথমবার তার মনে হয় সে প্রেমে পড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনজনের প্রেমে পড়ার এই কথা সে মাকেও বলতে পারে না। সে বোঝে, বিষয়টা তার হৃদয়ের কাছে যতটা প্রত্যাশিত, বাস্তবতার কাছে তার চেয়ে বেশি অগ্রহণযোগ্য। সব বুঝেও হয়তো প্রিয়লেখা নিজের মনকে প্রবোধ দিতে পারে না। তরুণদের ছাড়া একেকটা দিন তার কাছে দীর্ঘ বছরের অপেক্ষারূপে আসে।

কয়েসের টি-স্টলে বসে যুবকেরা স্মৃতিচারণ করে। গ্রীষ্মের সেই ছুটিতে তখনও ক্যাম্পাস খোলে নাই--এই অবকাশে তরুণেরা কল্লোল ছাত্রনিকেতনে দোতলার ঘরে শুয়ে গান শোনে, সামনের মাঠে ক্রিকেট খেলে। কিন্তু গান শুনতে শুনতে বা ব্যাট দিয়ে বলটাকে মেরে দৌড়ানোর সময়ও তাদের মনে হয় প্রিয়লেখা ক্যাম্পাসে নেই। কতদিন প্রিয়লেখাকে দেখি না! যুবকদের এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে প্রিয়লেখার অনুপস্থিতির বেদনা বয়ে বেড়ানোর সেই ছুটির এক দুপুরে হঠাৎ-ই অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। তখন দেশে মোবাইল ফোন কেবল এসেছে। দোকানে গিয়ে পল্লি ফোনে কথা বলা যায়। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন খুব দেখা যায় না। তিনজন তরুণের হাতে তখনই একটা ফোন কোনপ্রকারে এসে যায়। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোনে যে লোকটি কথা বলেছিল সে ছিল পুলিশ। কোন পুলিশের সঙ্গে ওই প্রথমবার তরুণদের ফোনে কথা বলা।

কয়েসের টি-স্টলের ঈষদুষ্ণ চা আরও ঠা-া হয়--কথা বলতে বলতে যুবকদের গলা ধরে আসে। সেদিনই ক্যাম্পাসে ফিরতে চেয়েছিল প্রিয়লেখা--মায়ের সঙ্গে বসে টেলিভিশনে পুরনো দিনের সিনেমা দেখতে দেখতে যেদিন বুঝতে পারে সে প্রেমে পড়েছে। তিনটি চিঠি লিখে ছোট ভাইকে দিয়েছিল পোস্ট করার জন্য। তার কদিন পর ছুটি শেষ হবার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে মাকে বলেছিল--যাই। কিন্তু ফেরার বাসটি রাস্তা দেখেশুনে, অপরাপর বাস, ট্রাক, মানুষজন এড়িয়ে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতগামী আরেকটি ট্রাক ঢুকে যায় বাসটির বুকের ভেতর। পুলিশ ঐদিন ফোনে বলেছিল--মেয়েটি আহত; তার ব্যাগের ভেতর এই নম্বরটি পাওয়া গেছে, আমরা আপাতত মেয়েটিকে স্থানীয় হাসপাতালে ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। আপনারা দ্রুত এসে ব্যবস্থা নিন--না হলে তাকে বাঁচানো কঠিন হবে। যুবকেরা এখনও ভেবে দুঃখে কেঁপে ওঠে সেই ফোনকলটি তাদের জন্য কী দুঃসংবাদই না নিয়ে এসেছিল! পত্র-পত্রিকায় কত এ্যাকসিডেন্টের খবর তারা পড়ে, টেলিভিশনে দেখে--কোনদিন সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার পড়ে নাই। খুব সাধারণ ছেলে তিনটি জীবনে প্রথমবার নতুন অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। হাসপাতাল, ওষুধ, অপারেশন, মৃত্যুর গন্ধে ছেলেগুলো বোঝে জীবন ফুলশয্যা নয়। তারা অনুভব করে জীবন এক বহতা নদী--টাইম এন্ড টাইড ওয়েইট ফর নান। স্থানীয় হাসপাতাল থেকে প্রিয়লেখাকে ট্রান্সফার করা হয় ঢাকার একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু প্রিয়লেখা আর চোখ মেলে দেখে না--প্রিয়জনেরা কী আকুল প্রতীক্ষায় তার দিকে চেয়ে আছে। তিনদিন পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ডাক্তার বলে--একেবারে সিনেমায় যেমনটা দেখা যায়, ভাবলেশহীন গলায় ডাক্তার ঐ ইংরেজি শব্দটি বলে যার বাংলা অর্থ দুঃখিত।

যুবকদের শহরে ফেরা যাক। যুবকেরা জানতো না এই শহরে তারা এত দীর্ঘদিন থেকে যাবে। এখানে প্রথম তারা প্রিয়লেখার দেখা পেয়েছিল। তারা ছিল কুঁড়ি, অস্ফুট ফুল--দিনের পর দিন জল ঢেলে যে শহরে কুঁড়িতে পুষ্পবিকাশ করেছিল মেয়েটি সেই শহর ছেড়ে তরুণেরা চাইলেও যেতে পারে না। হয়তো জীবন চলে জীবনের নিয়মেই। তারা বিয়ে করে সংসার করে, চাকরি করে, আড্ডা দেয়। তবু যখন যেখানে থাকে এই তিনজন ছেলেমানুষের বুকের একটা জায়গা আলাদা করা থাকে। সেখানে আর কারো প্রবেশাধিকার নেই। যেমন করে প্রিয়লেখা তাদেরকে চেয়েছিল বাস্তবের পৃথিবীতে তেমনটা হয় নি। তবে নিজেদের গভীর মনে ডুব দিয়ে যুবকেরা দেখতে পায়--যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই প্রিয়লেখা তাদের সঙ্গে আছে। তাদের মনে পড়ে ডাক্তারের মুখের যে সত্যটি শুনে হাসপাতালের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে হু হু করে কেঁদে যুবকেরা শহরে ফিরেছিল, যুবকেরা তখন তরুণ--কল্লোল ছাত্র নিকেতনের দোতলার ঘরে ঢুকে তিনজনই আলাদা আলাদা চিঠি পেয়েছিল। চিঠি আলাদা ছিল। কিন্তু চিঠির ভাষা ছিল একই। গোটা গোটা অনবদ্য অক্ষরে প্রিয়লেখা লিখেছিল--‘তোর কাছে আসছি। আমি তোদের দ্রৌপদী হব।’


লেখক পরিচিতি
সৈকত আরেফিন

জন্ম : ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৮০, পাবনা।
পেশায় সাহিত্যের শিক্ষক।
গল্পকার।
কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। একটি গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। নাম---পাতা ও পতত্রি।

1 টি মন্তব্য: