মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

বিমল করের গল্প - আমরা তিন প্রেমিক ও ভূবন

নদীর চরায় শিবানীর চিতা জ্বলছিল।

আমরা তিন বিগতযৌবন বন্ধু শিমুলগাছের তলায় বসেছিলাম। ফাল্গুনের শেষ, উলটো টান ধরে গিয়েছিল দুপুরে। রোদ পাখা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে, নদীর বাঁকের মাথায় আকাশে সূর্য হেলে পড়ছিল।

ভুবন গরুর গাড়ির উপর বসে, গাড়িটা অর্জুন গাছের ছায়ায় দাঁড় করানো, গরু দুটো গাছগাছালির ফাঁকে শুয়েছিল। শিবানীর মুখাগ্নি শেষ করে ভুবন খানিকক্ষণ চিতার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, রোদ আর আগুনের ঝলসানি গায়ে মাখেনি, তারপর গাড়িতে গিয়ে বসেছে । হাঁটুর ওপর মাথা রেখে মুখ আড়াল করে সে বসেছিল, কদাচিৎ মুখ তুলছিল, তুলে শিবানীর চিতা দেখছিল।

চিতার কাছাকাছি, নদীর ভাঙা পাড়ের আড়ালে চার-পাঁচটি ছেলেছোকরা আর নিত্যানন্দ । তারা মাথায় গামছা বেঁধে, ভিজে তোয়ালে মুখে ঘাড়ে বুকে বুলিয়ে শবদাহের তদারকি করছিল। পুরুতমশাই আর ছোটকিলাল অনেকটা তফাতে, মাটির কয়েকটি সরা ও কলসি সামনে নিয়ে গাছের ছায়াতেও ছাতা খুলে বসে আছে ।

আমরা মাঝদুপুরে এসেছি । তখন চতুর্দিকে ধু ধু করছিল। গরম বাতাস গায়ে মুখে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। এতক্ষণে যেন সব ক্রমশ জুড়িয়ে আসার মতন ভাব হয়েছে। বালিভরা নদীর তাপ মরে আসছিল, শীর্ণ জলের ধারাটি শিবানীর চিতার পাশ দিয়ে বয়ে যেতে যেতে কদাচিৎ বাতাসে কিছু শীতলতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

আমরা তিন বিগতযৌবন বন্ধু শিমুলতলায় বসে শিবানীর সৎকার প্রত্যক্ষ করছিলাম ।

সিগারেটের টুকরোটা দুরে ছুড়ে দিয়ে অনাদি বলল, 'শেষ হতে হতে বিকেল পড়ে যাবে।’ বলে সে শিবানীর চিতার দিকে তাকিয়ে থাকল।

কমলেন্দু পা ছড়িয়ে আধ-শোয়া হয়ে বসে ছিল, সে আস্তে আস্তে মাটিতে শুয়ে পড়ল, আকাশমুখো হয়ে বোধ হয় শিমুলের ফল দেখবে।

আমি আর-একবার ভুবনের দিকে তাকালাম । ভুবন কুঁজো হয়ে বসে, হাঁটুর ওপর মাথা, দু হাতে মুখ আড়াল করা। অনেকক্ষণ সে ওই একইভাবে বসে আছে । তার পক্ষে এটা স্বাভাবিক : শিবানী ওর স্ত্রী । তবু আমার মনে হলো, ভুবনের এতটা শোকাভিভুত ভাব ভালো দেখাচ্ছে না । সে জোর করে তার শোকের মাত্রার গভীরতা দেখাতে চাইছে। এতটা শোক পাবার কারণ তার নেই। তবু এই শোক কেন ? সেকি আমাকে ঈর্ষান্বিত করতে চায় ? কিংবা আমাদের তিনজনকেই ?

কথাটা আমার এখন বলা উচিত নয় বুঝতে পেরেও যেন ভুবনের শোকে খুঁত ধরতে বললাম, ‘শিবানীর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে মাসখানেক আগে । ভুবনের ওপর কি জন্যে যেন রেগে ছিল । ওর শরীর স্বাস্থ্যের কথায় দুঃখ করছিল...’

আমার কথায় অনাদি মুখ ফিরিয়ে দূরে ভুবনের দিকে তাকাল। কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে শেষে অন্যমনস্কভাবে বলল, “আমরা বোধহয় না এলেই ভালো করতাম।”

আমরা চুপচাপ অনাদির কথাটা ভাবছিলাম। সবুজ একটা বুনো পাখি চিকির-চিক করে ডাকতে ডাকতে চোখের পলকে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল । কমলেন্দু সব জেনেশুনে বুঝে হঠাৎ বলল, ‘কেন ? আমরা না এলে কি ভালো হত ?

অনাদি ধীরস্থির প্রকৃতির, আস্তে আস্তে নীচু গলায় সে কথা বলে। সামান্য অপেক্ষা করে সে বলল, 'ভুবন হয়তো অস্বস্তি বোধ করছে। ঠিক এ সময়ে সে বোধহয় আমাদের বাদ দিয়েই তার স্ত্রীকে ভাবতে চেয়েছিল।’ ‘

ভাবুক ; কে তাকে বারণ করেছে— খানিকটা অবহেলা, খানিকটা উপহাসের গলায় আমি বললাম ।

অনাদি আমার দিকে তাকাল । 'আমরা ওর চোখের সামনে বসে থাকলে ভুবনের পক্ষে আমাদের বাদ দিয়ে শিবানীকে ভাবা মুশকিল।’

কমলেন্দু শুয়ে শুয়ে বলল, 'বেশ তো, তা হলে সাত-সকালে লোক দিয়ে আমাদের বাড়িতে শিবানীর মারা যাবার খবর পাঠানো কেন ! না পাঠালেই পারত।’

--কিংবা বলে দিলেই পারত আমরা যেন না আসি, আমি বললাম ।

“খবর না দিলে খারাপ দেখাত, বোধহয় ভদ্রতা করে...’ 'আমরাও ভদ্রতা রক্ষা করছি। শিবানী আমাদের বন্ধুর স্ত্রী, তার সৎকারে না আসাই কি ভালো দেখাত ? কমলেন্দু বলল ।

বন্ধুর স্ত্রী শুধু কেন, শিবানী আমাদের...কি বলব.বান্ধবী, যাই বলো...সেও তো আমাদের কিছু একটা ছিল । সে মারা গেছে, আমরা শ্মশানে আসব না? আমি বললাম ।

অনাদি আর কথা বাড়াল না। পকেট হাতড়ে আবার সিগারেট বের করল । আমাদের দিল । নিত্যানন্দ চিতার কাছে গিয়ে খোঁচাখুচি করতে কাঠ ফেটে শব্দ হলো । সে চেঁচিয়ে কি যেন বলল, তার সহচর দুটি ছেলে তার কাছে গেল । ভুবন মুখ তুলে চিতার দিকে তাকিয়ে আছে। চিতার ওপর কয়েকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যেন আতসবাজির মতন বাতাসে উড়ে ফেটে গেল, সামান্য ছাই উড়ল ।

একটি ছেলে কয়েকটি কাঠের টুকরো ফেলল চিতায় ।

ভুবন চিতার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উদাসভাবে নদী আকাশ আর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর এক সময় আমাদের দিকে মুখ ফেরাল। আমাদের মধ্যে দূরত্ব সত্ত্বেও আমার সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো। ভুবন মুখ ফিরিয়ে নিল; নিয়ে হাটুর ওপর কনুই রেখে গালে হাত দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল। ওর এই ভঙ্গি আমার ভালো লাগছিল না। মনে হলো, আমাদের যেন সে আর দেখতে পারছে না ; বা দেখেও দেখতে চাইছে না—উপেক্ষা করছে।

বাড়াবাড়ি দেখলে আমার রাগ হয়, ভুবনের এতটা বাড়াবাড়ি দেখে আমার কেমন রাগ আর বিরক্তি হচ্ছিল। আতিশয্য কেন ? আমরা কি জানি না শিবানীর সঙ্গে ভুবনের সম্পর্ক কি ছিল ? তবে ? তবু ভুবন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন আমরা কিছু জানি না, যেন শিবানী তার সর্বস্ব ছিল,শিবানীর মৃত্যুতে তার বিশ্বভুবন অন্ধকার হয়ে গেছে !

দুঃখের মধ্যেও আমার হাসি পাচ্ছিল । ভুবনের বোকামির শেষ নেই। তুমি যে কাকে এত শোক দেখাচ্ছ ভুবন, তবু যদি শিবানীর ভালোবাসা পেতে ! শিবানী তোমায় ভালোবাসে নি, যদিও শেষ পর্যন্ত তোমায় বিয়ে করেছিল । তুমি স্বামী হয়েছিলে বলে যা পাবার পেয়ে গেছ, তা ভেব না। বরং শিবানীর ভালোবাসা বলতে যা, তা আমি পেয়েছিলাম।

ফাল্গুনের দমকা বাতাস এলো দক্ষিণ থেকে নদীর তপ্ত বালির ওপর দিয়ে ঘূর্ণি তুলে ঘোলাটে বাতাস নাচতে নাচতে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। ভুবন আবার হাটুর মধ্যে মাথা গুজে হাত আড়াল করে বসল। যেন সে কাঁদছে। গুনের এত আতিশয্য আর আমার সহ্য হচ্ছিল না। অনাদি আর কমলেন্দুকে বললাম, আমরা একটু আড়ালে গিয়ে বসি না হয়—’ বলে উপহাসের গলায় মন্তব্য করলাম, ভুবনের আমাদের হয়তো সহ্য হচ্ছে না, অনাদি যা বলল ।” কমলেন্দু শিমুল ফল দেখছিল, নাকি আকাশ, কে জানে। সে বলল, ‘তাতে যদি ভুবন শান্তি পায় আমার আপত্তি নেই।...আমার বরং শিবানীর চিতার কাছে বসে ওদিকে তাকিয়ে থাকতে খুব খারাপ লাগছে।’ তাই বুঝি শুয়ে আছ, আকাশ দেখছ ?

কমলেন্দু কথার জবাব দিল না। অনাদি এবার বলল, আমারও কেমন অস্বস্তি লাগছে। একটা আড়ালে দুরে গিয়ে বসাই ভালো। তাছাড়া এবার এদিকে রোদ ঘুরে গেছে, বসে থাকা যাবে না। আমরা আরো অনেকক্ষণ বসে থেকে শিমুলতলা ছেড়ে উঠে পড়লাম। তারপর তিন বন্ধু শিবানীর চিতা এবং ভূবনের দৃষ্টি থেকে সরে অন্য দিকে চলে যেতে খানিকটা দুরে এসে আমরা বসলাম। এখানে ঘন ঝোপঝাড় আর ছায়া, মাথার ওপর নিমগাছ, সামনে কুলঝোপের ওপর দিয়ে নদী দেখা যায়। মাঝেমাঝে পাখির ডাক ছাড়া আর কিছু কানে যাচ্ছে না। নদীর বালি ছাড়া অন্য কিছু চোখেও পড়ছে না। এখানে যে যার মতন আরাম করে বসলাম, বসে নিশ্চিন্ত হলাম ।

কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে ছোটোখাটো দু-চারটি কথার বিনিময় হলো ; শিবানী এভাবে, আচমকা একটা অসুখে মারা যাওয়ায় আমরা দুঃখিত। শেষে আমরা একে একে কেমন নীরব হয়ে গেলাম। নদীর দিকে অপরাহ্নের স্তিমিত ভাব নামছিল। আমরা তিনজনেই কখনো নদী, কখনো শুন্যতা, কখনো গাছপালা, কখনো পায়ের তলায় ঘাস-মাটি দেখছিলাম। এবং পরিপূর্ণ নীরব হয়ে গিয়েছিলাম ।

অনেকক্ষণ এইভাবে বসে থাকার পর হঠাৎ কমলেন্দু কেমন করে যেন নিঃশ্বাস ফেলল। দীর্ঘনিঃশ্বাস নয়, তার চেয়েও যেন গভীরতাপূর্ণ কিছু ; তার নিশ্বাসের শব্দে আমরা ওর দিকে সচকিত হয়ে তাকালাম ।

কমলেন্দু সুপুরুষ। তার মুখ এখনো দু মুহুর্ত তাকিয়ে দেখার মতন । লম্বা ধরনের কাটাকাটা মুখ, রঙ ফরসা, নাক এবং চোখ বেশ তীক্ষ্ণ । তার ফরসা সুন্দর মুখে আমরা কোথায় যেন এক বেদনা দেখতে পেলাম ।

অনাদি বলল, “কি হলো ?

কমলেন্দু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকল কয়েক মূহুর্ত, তারপর আমাদের দিকে তাকাল । শেষে বলল, 'না, কিছু নয়।...কই, দেখি একটা সিগারেট...’

পকেট থেকে আমার সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে ওকে দিলাম। নিজে একটা সিগারেট নিয়ে ও আমাদের দু’জনকে দুটো সিগারেট ধরিয়ে অনেকটা ধোঁয়া গলায় নিল । তারপর আমাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এ দিকটায় পালিয়ে এসে ভালোই হয়েছে। সামহাউ, আমার শিবানীর চিতার সামনে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না ...হতে পারে, তখন আমি বোকা ছিলম,বয়স কম ছিল ; তবু এ কথা তো ঠিক, শিবানী আমাকে ভালোবেসেছিল। ...আমার চেয়ে বেশী সে আর কাউকে কখনো ভালোবাসে নি।’

- আমরা তিন বিগতযৌবন বন্ধু পরম্পরের কথা জানতাম এবং ভুবন, আমাদের চতুর্থ বন্ধুও সব জানত। কমলেন্দুর সঙ্গে শিবানীর মেলামেশা ভালোবাসার কথা আমার অজানা নয় ; কিন্তু এই মূহুর্তে সে যে দাবীটুকু জানাল তাতে আমার আপত্তি হলো না। সবচেয়ে বেশী ভালোবাসার কথা উঠলে শিবানীর কাছে আমার চেয়ে আর কেউ বেশী পেয়েছে এ আমি বিশ্বাস করি না । একেবারে সরাসরি না হলেও, কমলেন্দুকে শোনাবার জন্যে, ঠাট্টার একটা গলা করে বললাম, আমার তো মনে হয়, ওটা আমিই এক সময়ে পেয়েছি।”

ধীরস্থির শান্তশিষ্ট মানুষ হলেও অনাদি এখন হঠাৎ কেমন অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হলো । ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে বলল, এ-সব তোমাদের মনের ধারণা, কল্পনা। আমার সঙ্গে শিবানীর ঘনিষ্ঠতা এমন সময়ে হয়েছে যখন আমরা দুজনে কেউই বাচ্চা ছিলাম না । সিরিয়াসলি যদি কাউকে সে ভালোবেসে থাকে, আমি সে দাবী সবচেয়ে বেশী করতে পারি।’

অনাদির কথায় আমি বা কমলেন্দু, আমরা কেউই খুশী হলাম না। আমাদের কথায় অনাদিও হয় নি। তিনজনে আজ আমরা যে দাবী করছি সে দাবী ছেড়ে দেওয়া কেন যেন আমাদের সাধ্যাতীত বলে আমার মনে হলো । আমাদের তিনজনেরই বয়েস হয়েছে, চল্লিশের এপারে চলে এসেছি । আমাদের তিনজনেরই স্ত্রী আছে, সন্তান আছে । আজ শিবানীর সঙ্গে আমাদের প্রেম নিয়ে অকারণ গল্প করার বা মনোমালিন্য সৃষ্টি করার কোনো অর্থ ছিল না। তবু, আমরা তিনজনেই এমন এক দাবী জানাচ্ছিলাম যেন সেই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের কোনো বিশেষ সুখ ও অহংকার প্রকাশ করা যায় না।

কমলেন্দু ঘন ঘন কয়েকটা টান দিল সিগারেটে, সে অনাদির দিকে এবং আমার দিকে বার বার তাকাল, তারপর সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিয়ে বলল, “আমার সঙ্গে শিবানীর ওপর-ওপর মেলামেশা তোমরা দেখেছ ; আমি তোমাদের সে-সব গল্পও বলতাম ; চিঠিপত্রও দেখিয়েছি ; কিন্তু ভেতরে আমাদের কি হয়েছিল তোমরা কি করে জানবে?'

‘ভেতরে ভেতরে যা হয়েছে তাও তো পরে তুই বলেছিস, আমি বললাম না ।

'না আমি সব বলি নি । কিছু না-বলা আছে, সামথিং সিক্রেট.'

'সে-রকম গোপনীয়তা আমারও আছে, কমল ।” অনাদি বলল ।

আমারও গোপনীয়তা ছিল । আমরা তিন বাল্যবন্ধু পরস্পরের কাছে জীবনের কোনো কিছুই বড় একটা অগোচর রাখতাম না। শিবানীর বেলায়ও কিছু রাখিনি রাখতে চাই নি, তবু শেষ পযন্ত নিশ্চয় কিছু রেখেছিলাম,নয়তো আজ এ-কথা উঠত না । শিবানীর সঙ্গে মেলামেশার সময়ও আমরা কেউ কারুর প্রতি ঈর্ষান্বিত হই নি। কেন না—কমলেন্দু শিবানীর সঙ্গে কৈশোরে ও প্রথম যৌবনে মেলামেশা করেছিল, করে শিবানীর কাছ থেকে দুরে সরে গিয়েছিল। শিবানীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা একেবারে যৌবনবেলার ; আমার সঙ্গে শিবানীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর অনাদির সঙ্গে শিবানীর সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল । শিবানীও আমাদের বাল্যকালের বান্ধবী । তার সঙ্গে আমাদের যা যা হয়েছে তা পরস্পরকে আমরা জানিয়েছি। স্বভাবতই কোনো ইতর ঈর্ষা আমাদের থাকার কথা নয়, তবু যদি কোনো ঈর্ষা থেকে থাকে বা হয়ে থাকে তা তেমন কিছু নয়। নয়তো আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য ঘটত এবং আমাদের এই বন্ধুত্ব বজায় থাকত না। এতকাল যা হয় নি তা হওয়া সম্ভব নয়, উচিতও নয়। শিবানীকে নিয়ে কোনো বিরোধ আমাদের মধ্যে হয় নি ; সে জীবিত থাকতে যা হলো না, আজ যখন সে আমাদের মধ্যে আর নেই—তখন তা হবার কোনো সঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।

আমার কি রকম যেন মনে হলো । কমলেন্দুর দিকে তাকালাম, তারপর অনাদির দিকে । আমার মনে হলো, ওরা নিজেদের গোপনীয়তাকে তাদের প্রতি শিবানীর চরম ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে মনে করছে । আমি নিজেও প্রায় সেইরকম মনে করছিলাম। যদিও আমার আরো কিছু মনে হচ্ছিল ।

কেমন এক অস্বস্তি এবং কাতরতাবশে আমি বললাম, একটা কথা বলব ?

ওরা আমাকে দেখল ।

'আমাদের সব কথাই সকলের জানা। ধীরে ধীরে আমি বললাম, আমরা কিছুই লুকোচুরি রাখিনি ; তবু আমাদের তিনজনেরই কিছু গোপনতা আছে । আজ সেটা বলে ফেলা কি ভালো নয় ?

কমলেন্দু অপলকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। অনাদি চোখের চশমাটা ঠিক করে নিল । আমার মনে হলো ওরা অনিচ্ছুক নয় ।

কমলেন্দু বলল, বেশ । তাই হোক। কথাটা আজ বলে ফেলাই ভালো।”

অনাদি বলল, “আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু শিবানীর চিতা এখন জ্বলছে, আমরা শ্মশানে। এই সময় সে-সব কথা বলা কি ভালো দেখাবে !’

"খারাপই বা কি ? আমি বললাম, 'আমার বরং মনে হচ্ছে বলে ফেললেই স্বস্তি পাব ।’

অনাদি আস্তে মাথা নাড়ল । সে সম্মত । কমলেন্দুর দিকে আমি তাকালাম । সেই বলুক প্রথমে । শিবানীর জীবনে সেই প্রথম প্রেমিক ।

'সব কথা বলার কোনো দরকার নেই কমল, আমরা জানি । আমরা যা জানি না তুমি শুধু সেইটুকুই বলো।’

কমলেন্দু আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, তাই বলব।’


কমলেন্দু বলল : 'তোমাদের নিশ্চয় মনে নেই, আমি একবার মাস দেড়েক কি দুয়েকের জন্যে মোতিহারিতে ছোটকাকার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এলাম যখন, তখন বর্ষার শুরু, আমাদের ম্যাট্টিকের রেজাল্ট আউট হয়ে গেছে। বাবা পাটনায় মেসোমশাইকে আমার কলেজে ঢোকার সব ব্যবস্থা করতে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন। পরীক্ষায় আমার রেজালট কি হয়েছিল তোমরা তা জানো । কলেজে পড়তে যাবার আনন্দে তখন খুব মশগুল হয়ে আছি, বাড়িতে চব্বিশঘণ্টা আদরের ঘটা চলছে । শিবানীর সঙ্গে আমার তখন গলায়-গলায় । মোতিহারিতে সে আমায় চিঠি লিখত। তার মা-বাবার কথা তোমরা জান, পয়সাকড়ি থাকার জন্যে, আর তার বাবা মনোজকাকা বেভিন-স্কীমে বিলেত ঘুরে আসার পর আরো একটু সাহেবী হয়ে গিয়েছিলেন। শিবানীকে শাড়ি ধরাতে ওঁরা দেরী করেছিলেন । আমি যখন মোতিহারিতে তখন শিবানী শাড়ি ধরেছে। চিঠিতে আমায় লিখেছিল। ফিরে এসে দেখলাম, ছিপছিপে শিবানীকে শাড়ি পরে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে—বেশ বড় হয়ে গেছে—বেশ বড়। কই, আর একটা সিগারেট দাও তো...।”

অনাদি কমলেন্দুকে সিগারেট দিল । সিগারেট ধরিয়ে কমলেন্দু কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকল সামান্য, তারপর বলল :

'একদিন বিকেলবেলা নাগাদ সাংঘাতিক বৃষ্টি নেমেছিল । যেমন ঝড়,তেমনি বৃষ্টি। এক একটা বাজ পড়ছিল—যেন মনে হচ্ছিল ঘরবাড়ি গাছপালায় আগুন ধরিয়ে ছাই কবে দেবে। আর তেমনি আকাশ, পাকা জামের মতন কালো।...দেখতে দেখতে যেন সন্ধ্যে। দোতলায় আমার ঘরে আমি দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে। একটা জানলা, যেটা দিয়ে ছাট আসছিল না জলের, খুলে রেখেছিলাম । উলটো দিকে শিবানীদের বাড়ি । শিবানীর মা—লতিকা-কাকিমার শোবার ঘরের গায়ে শিবানীর ঘর । আমার ঘর থেকে শিবানীর ঘর দেখা যায়...কিন্তু খানিকটা দূর। আমরা আমাদের ঘবে বসে বসে জানলায় দাঁড়িয়ে হাত-টাত নেড়ে হাসি-তামাশা করছিলাম। কখনো কখনো ঝড়বৃষ্টির মধ্যে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কিছু বলছিলাম, শব্দ বড় একটা পৌছচ্ছিল না।

‘আমি অনেকক্ষণ ধরে শিবানীকে ডাকছিলাম । ইয়ার্কি করেই । তাকে ইশারা করে বলছিলাম শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে চলে আসতে। শিবানী আমায় বুড়ো আঙুল দিয়ে কাঁচকলা দেখাচ্ছিল । এইরকম করতে কবতে একেবারে সন্ধ্যে হয়ে এলো । পেয়ারা গাছের ডালের পাশ দিয়ে শিবানীর ঘবের অনেকটাই চোখে পড়ে আমার । সে আমায় দেখিয়ে দেখিয়ে জানলায় বসে চুল বেঁধেছে, একটা শাড়িও আলনা থেকে এনে দেখিয়েছে, দূর থেকে রঙটা বুঝতে পারি নি।--সন্ধ্যের মুখে সব যখন অন্ধকার, আমি নীচে থেকে বাতি আনতে যাব, দরজায় দমদম শব্দ । খুলে দেখি শিবানী, হাতে বাতি । সে ওই বৃষ্টির মধ্যে এ বাড়ি চলে এসেছে, নীচে থেকে আসার সময় মা তার হাতে বাতি দিয়ে দিয়েছে। শিবানী এইটুকু আসতেই খানিকটা ভিজে গিয়েছিল ; হাত পা মাথা শাড়ির আচল বেশ ভিজেছে । লন্ঠনটা আমাব হাতে দিয়ে শিবানী তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিল। জলের ছাট আসছিল । আমি আলনায় ঝুলানো আমার একটা জামা এনে ওর ভিজে হাত মাথা ঘাড় মুছিয়ে দিতে লাগলাম। ওর মাথার চুল অনেকটা ভিজে গিয়েছিল বলে শিবানী তার লম্বা বিনুনি খুলে ফেলছিল। ওকে আমি আমার পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে ভিজে পা দুটি মুছিয়ে দিতে গেলাম, ইয়ার্কি করেই। ও পা দুলোতে লাগল, হাসতে লাগল। শিবানী ততক্ষণে মাথার চুল খুলে ঘাড়ে পিঠে ছড়িয়ে দিয়েছে । তারপর আমরা লন্ঠনের আলোয় বসে গল্প করতে লাগলাম।

শিবানীর গানের মাস্টার ছিল, সে যে এক সময়ে মোটামুটি ভালো গাইত তা তোমরাও জানো । শিবানীকে একটা গান গাইতে বললাম। শিবানী যে গানটা গাইল তা আমার এখনো মনে আছে, আমি অনেকবার সে গান শুনেছি, কিন্তু সেদিনের মতন কখনো আর নয়। ঝড়বৃষ্টি, বাইরের দুর্যোগ আর অন্ধকারের মধ্যে আমার ঘরে বসে মিটমিটে লন্ঠনের আলোয় সে গাইল : ‘উতল ধারা বাদল ঝরে...’ ওই গানেরই একটা জায়গায় ছিল, ‘ওগো বধু, দিনের শেষে এলে তুমি কেমন বেশে, আঁচল দিয়ে শুকাব জল, মুছাব পা আকুল কেশে...’ বার বার শিবানী ওই চরণ দুটি গাইছিল, আর আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু করে হাসছিল। অর্থটা আমি বুঝতে পারছিলাম।...গান শেষ হলে আমরা গল্প করতে লাগলাম। এ-গল্প সে-গল্প । শেষে আমরা ছেলেমানুষের মতন হাতের রেখা, কপালের রেখা, ভাগ্য, ভবিষ্যৎ এইসব কথা নিয়ে মেতে উঠলাম। একে অন্যজনকে সৌভাগ্যের চিহ্ন দেখাতে ব্যস্ত। হঠাৎ শিবানী বলল, তার বুকে নীল শিরার একটা ক্লশ আছে। আমি বললাম, তা হলে সে মস্ত পূণ্যবতী ৷ বলে আমি হাসছিলাম। এরকম যে হয় না, হতে পারে না, তা আমি জানতাম। আমার হাসি দেখে শিবানী বুঝতে পারল আমি তাকে অবিশ্বাস করছি। সে বলল, ‘হাসছ কেন ? বিশ্বাস হচ্ছে না? আমি মাথা নাড়লাম, ‘তুমি কি যীশু ?...শিবানীর অভিমানে লাগল। বলল, ‘আহা, যীশু না হলে বুঝি কিছু থাকতে পারে না ? আমি তাকে আরো রাগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘যার কোথাও পাপ নেই তার থাকতে পারে... মানুষের নয়। যীশুর মতন তুমি মরতে পারবে ?...শিবানী কি ভাবল জানি না, হঠাৎ যে সে তার বুকের জামার ওপরের বোতাম খুলে—জামা অনেকটা সরিয়ে আমায় বলল -আলো এনে দেখ । ...আমি দেখলাম। কি দেখলাম । কি দেখলাম তা তোমাদের কাছে বলে লাভ নেই। ...বুঝেতেই পারছ । তবে শিবানীর বুকে শিরা ছিল, নীলচে রঙের। সেটা কুশ কি না আমি দেখি নি। আমি অন্য জিনিস দেখছিলাম।...আজ আমাব স্বীকার করতে দোষ নেই, সেই বয়সে শিবানীর সেই ইনোসেন্স ছিল। আমার হাতে সেটা মরে গেল ।”

কমলেন্দু নীরব হলো । তাকে খুব অন্যমনস্ক ও অপরাধীর মতন দেখাচ্ছিল। নদীর চরের ওপারে রোদ সরে যাচ্ছে, তাপ অনেকটা কমে এসেছে, কোথাও একটা কাক ডাকছিল, গাছের পাতায় বাতাসের সরসর শব্দ হচ্ছিল । কেমন যেন একটা নি:ঝুম ভাব।

আমরা তিন বন্ধুই নিঃশ্বাস ফেললাম। কমলেন্দু রুমালে মুখ মুছে নিল । 


অনাদি আমার দিকে তাকাল । ‘শিশির, তোমার যা বলার..."

আমর বলার পালা কমলেন্দুর পর। শিবানীর জীবনে আমি দ্বিতীয় প্রেমিক, তার যৌবনের প্রেমিক। আমারও তখন যৌবন। আমাদের তখনকার ঘনিষ্ঠতার কথা কমলেন্দুদের অজানা নয়। ওরা যা জানে না, ওদের কাছ থেকে যা আমি গোপন রেখেছিলাম, এবার তা বলার জন্যে আমি তৈরী হলাম। কুলঝোপের মাথা ডিঙিয়ে অপরাহ্নের রোদ এবং নদী দেখতে দেখতে আমি গলা পরিস্কার করে নিয়ে বললাম, ‘আমি খুব সংক্ষেপে সারতে চাই । '

শুনি...’ কমলেন্দু বলল ।

'বলছি" । তোমাদের কাছে কোনো ভুমিকার দরকার নেই। তবে তোমাদের জানা দরকার যে, তিন-চার বছর শিবানীর সঙ্গে আমার খুব মাখামাখি ছিল, এটা তার শেষের দিকের ঘটনা— আমি ধীরে ধীরে বললাম। ‘শিবানীর বাবা তখন মারা গেছেন, লতিকা কাকিমারা তাঁদের নতুন বাড়িতে থাকেন। আমি আমার ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্রেনটিসশিপ শেষ করে পাওয়ার হাউসের চার্জে রয়েছি। শিবানীর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তখন এমন অবস্থায় যে, তোমরাও ভাবতে, আমি তাকে বিয়ে করব । লতিকা কাকিমাও ভাবতেন। শিবানীরও তাতে সন্দেহ ছিল না। সন্ধ্যেবেলা ওদের বাড়ি গিয়ে আমাকে তখন বাইরে বারান্দায় অপেক্ষা করতে হত না, সোজা ড্রয়িংরুমের পরদা সরিয়ে বাঁদিকের দরজা দিয়ে শিবানীর শোয়ার ঘরে চলে যেতে পারতাম । গল্পগুজব, গানবাজনা, খাওয়াদাওয়া সেরে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন রাত হয়ে গেছে। শিবানী আমায় ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যেত। আর প্রায় রোজই ফেরার সময়, ফটকের করবীঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে আমায় চুমু খেত।-- শিবানীকে যে দেখতে খুব সুন্দর ছিল, তা আমার কখনো মনে হয়নি। তার গায়ের রঙ, চোখ মুখের ছাঁদ আমার পছন্দ ছিল না। কিন্তু তার শরীর আমার ভীষণ পছন্দ ছিল, তাদের বাড়ির আবহাওয়ায় যে স্বাধীনতা, সপ্রতিভ ভাব, খোলামেলা আচরণ ছিল, তাও আমার খুব পছন্দ ছিল । নতুন ধরনের রুচি, পরিচ্ছন্নতা, বেশবাসের সৌন্দর্য.এ-সবের জন্যে, আর শিবানীর তখনকার শরীরের জন্যে তাকে ভালো লাগত। শিবানীর সেই যৌবন বয়সে তোমরা জানো, মনে হত তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন ফেটে পড়ছে।...একদিন, সেটা শীতকাল, লতিকা কাকিমা তাঁদের মহিলা সমিতির মিটিঙে গিয়েছিলেন । বাড়িতে চাকর আর ঝি ছিল । ঝিটার ঠাণ্ডা লেগে অসুখ করেছে, সে শুয়ে আছে। শিবানীর শোবার ঘরে বসে আমরা গল্প করছিলাম। জানুয়ারি মাস, প্রচণ্ড শীত। ঘরের জানলা-টানলা সবই বন্ধ ছিল ।.সাধারণ একটা কথা নিয়ে আমরা দু’জনেই হাসছিলাম, হাসতে হাসতে শিবানী বিছানায় গিয়ে লুটিয়ে পড়ল। সে এমনভাবে লুটিয়ে পড়েছিল যে তার একটা হাত মাথার ওপর দিয়ে বালিশে পড়েছে, অন্য হাতটা তার কোমরের কাছে বিছানায় অলসভাবে পড়ে আছে, তার মুখ সিলিংয়ের দিকে, মাথার ওপর হাত থাকার জন্যে তার বুকের একটা পাশ আরো স্ফীত হয়ে উঠেছে। শিবানীর কোমরের তলা থেকে পা পর্যন্ত বিছানা থেকে মাটিতে ধনুকের মতন বেঁকে—কিংবা বলা ভালো—ঢেউয়ের মতন ভেঙে পড়েছে। বিছানার ওপর সুজনিটা ছিল কালচে-লাল, তাতে গোলাপের মতন নকশা ; শিবানীর পরনের শাড়িটা ছিল সিল্কের, তার রঙ ছিল সাদাটে । ওর ভাঙা শরীরের বা আছড়ে পড়া শরীরের দিকে তাকিয়ে আমার আত্মসংযম নষ্ট হয়ে গেল। ঘরের বাতি নিবিয়ে দিয়ে আমি যখন তার গায়ের পাশে, সে আমায় যেন কেমন করে ফিসফিস গলায় গরম নিঃশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, আমি কবে তার মাকে কথাটা বলব ।...আমি তখন যে-কোনো রকম ধাপা দিতে রাজী। বললাম, কালই বলব, কাল পরশুর মধ্যে। শিবানী যেন অন্ধকারের মধ্যে সুখে আনন্দে উত্তাপে সর্বাঙ্গে গলে যেতে শুরু করল ।...সে কতবার করে বলল, সে আমায় ভালোবাসে । আমি কতবার করে বললাম, আমি তাকে ভালোবাসি ।... তারপর ঘরের বাতি জ্বালা হয়ে গেলে আমি শিবানীর ময়লা রঙ, ছোট কপাল, মোটা নাক, সামনের বড় বড় দাঁত, পুরু পুরু ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে মুখ নীচু করে পালিয়ে এলাম। ...তারপর থেকেই আমি পালিয়েছি...”

আমি থেমে গেলাম। আমার গলার কাছে একটা সাঁসের ডেলা যেন জমে গিয়েছে। চোখ ফেঁটে যাচ্ছিল । কী যে অনুশোচনা আজ, কেমন করে বলব !



নদীর ওপারে বনের মাথায় রোদ চলে গেছে। ছায়া পড়ে গেছে নদীর চর জুড়ে। ফাল্গুনের বাতাস দিচ্ছিল। ঝাঁক বেঁধে পাখিরা উড়ে আসতে শুরু করেছে। সমস্ত জায়গাটা অপরাহ্নের বিষন্নতায় ক্রমশই মলিন হয়ে আসছে।

আমাদের তিন বন্ধুর নিবাস পড়ল । আমি সিগারেটের প্যাকেট বের করলাম। মুখ মুছলাম কোঁচায়। তিনজনে সিগারেট ধরিয়ে নিলাম। এবার অনাদির পালা। শিবানীর জীবনে তৃতীয় প্রেমিক। অনাদির দিকে তাকালাম আমরা।
 

অনাদি প্রায় আধখানা সিগারেট শেষ করল, কোনো কথা বলল না । শেষে মাটির দিকে তাকিয়ে তার কথা শুরু করল :

‘শিবানীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা যখন হয়েছে তখন আমরা কেউই বাচ্চা নেই । আমার বয়স তেত্রিশ পেরিয়ে গিয়েছিল, শিবানী প্রায় তিরিশ । লতিকা মাসিমা তখন আর ঠিক বেঁচে থাকার মতন অবস্থায় নেই। সেই আরথারাইটিসের অসুখে পডল, শয্যাশায়ী। আমি ব্যাংকে অ্যাকাউণ্টেণ্ট হয়েছি, নতুন...তোমরা ভাই জানো, মহেশ্বরী যখন কনট্রাকটারী ব্যবসায় নামল তখন আমি তার পেছনে ছিলাম, তার সঙ্গে আমার ভেতরে ভেতরে কথা ছিল, তার লাভের একটা পাসেণ্টেজ আমায় দেবে, আমি ব্যাংকে তার সবরকম সুবিধে করে দেবো। প্রথম প্রথম মহেশ্বরীর কাছ থেকে বেমক্কা দুচারশো পেতাম । ব্যাংকে আমি তার সুবিধে-টুবিধের মাত্রাও বাড়তে লাগলাম। মামা ম্যানেজার যদিও নিজের মামা নয়। মামাকে আমি নানাভাবে ইনফ্লুয়েন্স করতাম। কিন্তু মহেশ্বরী শেষে আমায় ডুবিয়ে দিল । বিশ্রী এক অবস্থায় পড়লাম। ব্যাপারটা এমন ঘোরালো হয়ে দাঁড়াল যে, আমার পক্ষে কোথাও আর আইনের ফাঁক থাকল না। শিবানীর সঙ্গে আমার তখন মেলামেশা । সত্যি কথা বলতে কি আমার তখন এমন কাউকে দরকার, যে আমায় অর্থ সাহায্য করতে পারে। অন্তত একটা জামিন থাকলেও আমার পক্ষে একটা সুবিধে হয় । শিবানীদের নিজের বাড়িঘর, জমি, লতিকা মাসিমার—আমি তাঁকে মাসিমা বলতাম —কিছু টাকা এবং অলংকার ছিল নিজেকে বাঁচাবার জন্যে শিবানীদের শরণাপন্ন হবার কথা ভাবছিলাম। লতিকা মাসিমা মারা গেলে সমস্ত সম্পত্তিই শিবানীর হবে । তাছাড়া, লতিকা মাসিমা বেঁচে থাকতেও যদি শিবানীর সঙ্গে আমার তেমন একটা সম্পর্ক দেখতে পান, তিনি আমায় বিপদ থেকে পরিত্রাণ করতে পারেন। বেশি বলে লাভ নেই, আমি শিবানীর সঙ্গে যে-ধরনের সম্পর্ক পাতালাম—তাতে মনে হবে আমরা যেন স্বামী-স্ত্রী । আমি শিবানীর অঙ্গ স্পর্শ করি নি—মানে সেভাবে নয়, আমার তাতে আগ্রহ ছিল না। অথচ আমি শিবানীদের বাড়িতে সারাদিনও থেকেছি। তাদের বাড়িতে থেকেছি, খেয়েছি, বিছানায় শুয়েছি, লতিকা মাসিমার জন্যে ডাক্তার ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করেছি, শিবানীর ও তাদের সংসারের তদারকি করেছি।...আমার ওপর লতিকা মাসিমার সুনজর পড়ল, শিবানী প্রথম প্রথম আমায় কি ভাবত জানি না, পরে সে আমার ওপর নির্ভর ও বিশ্বাস করতে লাগল। তখন চাকরিতে আমার গণ্ডগোল বেঁধে গেছে,মামার জোরে তখনো জেলে যাইনি, কিন্তু মহেশ্বরীকে মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছে । শরীর খারাপের অজুহাতে আমি ছুটি নিয়েছি, পুজোর মুখে। আমার বাড়ি বলতে এক মা, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় তুলেই দিয়েছিলাম। ছুটি নিয়ে শিবানীদের বাড়িতে পড়ে আছি। দুশ্চিন্তায় খাওয়া নেই, ঘুম নেই, চোখ-মুখ শুকিয়ে হলদে হয়ে গেছে। এমন সময় একদিন বিকেল থেকে লতিকামাসির খুব বাড়াবাড়ি অবস্থা হলো। ডাক্তার ডেকে আনলাম, ঔষধ পত্র চলতে লাগল নতুন করে।সেদিন সন্ধের পর লতিকা মাসির অবস্থা যখন একটা ভালো হলো, আমি বাইরে—শিবানীদের বাড়ির বাগানে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, অন্ধকারে। এমন সময় কখন শিবানী পাশে এসে দাঁড়াল। দু’ চারটে কথার পর সে বলল, আমি আর কতদিন এভাবে দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা নিয়ে বসে থাকব ?...আমি তখন জামিন এবং টাকার কথা বললাম। শিবানী কিছুনা ভেবেই বলল, লতিকা মাসির কাছে সে সব বলবে। “আমরা দু’জনেই তখন একটা শিউলি গাছের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, অনেক দিন পরে হঠাৎ আমার নাকে শিউলি ফুলের গন্ধ লাগল। আমি শিবানীর হাত টেনে নিয়ে কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলেছিলাম । আমার সেই কান্না কুকুরের মতন । শিবানী আমায় সান্ত্বনা দিল। পরে বলল, এই ঘরবাড়ি টাকা–এসব মা আমার ভবিষ্যৎ ভেবে রেখেছে। যার কাছে আমার আশ্রয় জুটবে, এ-সবই তার । তুমি তো এ-সবই তোমার নিজের ভাবতে পার।'...আমি সে-রাত্রে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম।--লতিকা মাসিমা আমার তরফে জামিন দাঁড়ালেন, কিছু টাকাও আমায় তিনি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মহেশ্বরী মামলায় এমন এক অবস্থায় পড়ল যে তাকে সরিয়ে রাখা টাকা বের করে দিতে হলো । আমার গণ্ডগোলটাও মিটে গেল। লতিকা মাসি অবশ্য আরো মাস কয়েক বেঁচে ছিলেন। কিন্তু শিবানী ভবিষ্যতের জন্যে আমার ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিল ; সে-ভার আমি নিই নি, তাকে আশ্রয়ও দিই নি । শিবানীকে ঠিক বিয়ে করার মতন মেয়ে আমার কোনোদিনই মনে হয় নি।...’

অনাদি চুপ করল ।

আমরা চুপচাপ। নিঃসাড় যেন। একটা সাদা ধবধবে বক নদীর ওপর দিয়ে গোধুলির আলোর সীমানা পেরিয়ে কোথায় যেন চলে গেল ।

কমলেন্দু বলল, লতিকা কাকিমার টাকাটা তুমি ফেরত দাও নি ? ‘পরে মাসিমা মারা যাবার পর শিবানীকে কিছুটা দিতে গিয়েছিলাম, ও নেয় নি।’


আর কোনো কথা হলো না। আমরা তিন বিগতযৌবন বন্ধু, শিবানীর তিন প্রেমিকপুরুষ নীরবে বসে থাকলাম, কেউ কারো দিকে তাকালাম না। বসে বসে কখন যেন দেখলাম, আকাশ বন নদী জুড়ে আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া। আমাদের চারপাশে সেই সীসের মতন ছায়া ক্রমশই জমতে লাগল। আমাদের নাম ধরে চিতার কাছ থেকে ওরা তখন ডাকছে ।

দাহ শেষ । চিতা ধয়ে দেওয়া হচ্ছে । ছেলেগুলোর জল ঢালা ফুরোলো। এবার আমরা। নদী থেকে মাটির কলসিতে জল ভরে এনে কমলেন্দু শিবানীর ভিজে চিতায় জল ঢেলে দিল । তারপর আমি । কমলেন্দুর হাত থেকে কলসি নিয়ে নদী থেকে জল ভরে আনলাম। এনে শিবানীর চিতায়, তার নিশ্চিহ্ন শরীরের ছাইয়ের রাশিতে জল ঢাললাম। তারপর অনাদি জল দিল । শেষে ভুবন ।

কলসিটা ভেঙে দিয়ে ভুবন ফিরল। আমরা কেউ তার পিছু ফিরে তাকাব না।

আমরা এগিয়ে চলেছি। ওরা পুরুতমশাই তার ছেলেরা আমাদের আগে আগে, গরুর গাড়িটা চলছে, চাকার করণ শব্দ, আমরা চার বন্ধু পাশাপাশি । ভুবনকে আমাদের পাশেপাশে হেঁটে যেতে দেখে আমাদের অস্বস্তি হচ্ছিল । ও বড় ক্লান্ত, অবসন্ন। মনে হলো যেন ঠিক মতন পা ফেলতে পারছে না । আমরা তাকে গরুর গাড়ির ওপর বসিয়ে দিলাম জোর করে। সে আমাদের দিকে মুখ করে গরুর গাড়িতে বসে থাকল, উদাস দৃষ্টিতে । এমন সময় চাঁদ উঠে গেল। শুক্লপক্ষ, আজ বুঝি ত্রয়োদশী । নদী পিছনে, দুপাশের জঙ্গল গুটানো পাখার মতন দু পাশে নেমে গেছে সামনে উচু-নীচু কাঁচা রাস্তা। জ্যোৎস্না ধরেছে বনে, ঝিল্লিরব ঘন হয়ে এলো, ফাল্গুনের বাতাস বইছে, গরুর গাড়ির চিকন করুণ শব্দ ছাড়া আর শব্দ নেই, আর আমাদের পায়ের শব্দ । মাথার ওপর চাঁদ।

যেতে যেতে কমলেন্দু হঠাৎ বলল ভারী গলায়, শিবানীর চিতায় জল ঢালার সময় কেমন যেন কান্না এসে গিয়েছিল । আহা, বেচারী। ভাই, আমি আজ তার কাছে, তার চিতায় জল দেবার সময়, মনে মনে ক্ষমা চেয়েছি।”

অনাদি যে কাঁদছিল আমরা খেয়াল করি নি। সে ছেলেমানুষের মতন মুখে কান্না ও লালা জড়িয়ে বলল, ‘আমিও...’

চাঁদের আলোয় আমরা তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তিন প্রেমিক চলেছি। আমাদের সামনে ভুবন । পিছনে শ্মশান, শিবানীর ধুয়ে যাওয়া চিতা ।


যেতে যেতে সামনে ভুবনের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, আমরা তিনজনে— তিন প্রেমিক শিবানীর নিষ্পাপতা, কৌমার্য, নির্ভরতা তো হরণ করে নিয়েছিলাম। নিয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু তারপরও আর কি অবশিষ্ট ছিল শিবানীর, যা ভুবন পেয়েছে ! কি পেয়েছে ভুবন যার জন্যে তার এত ব্যথা ? চাঁদের আলোয় ভুবনকে কেমন যেন দেখাচ্ছিল । তার চার পাশে নিবিড় ও নীলাভ, স্তব্ধ, মগ্ন যে চরাচর তা ক্রমশই যেন ব্যাপ্ত ও বিস্তৃত হয়ে এক আলৌকিক বিষন্ন ভুবন সৃষ্টি করেছিল। এ যেন আমাদের ভুবন নয়। অথচ আমাদেরই ভুবন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন