রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

রশীদ হায়দারের গল্প-আমি, জুলেখা ও মা

যখন আপনাদের এ কাহিনী বলছি, তখন আমি পূর্ব পাকিস্তান সড়ক পরিবহন সংস্থার একটি বাস ষ্ট্যান্ডে দাড়িয়ে। রাত হয়েছে। প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। রাতের শহর পুরোপুরি জীবন্ত ।

আমাকে আপনারা কেউ কখনো সন্দেহ করেছেন? আমি জানি করেন নি। করতে পারেন না। করার পেছনে কোন কারণ নেই। আমিও তেমন কোন আচরণ করিনি যার জন্যে আপনারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আমার চারপাশে সমবেত হতে পারেন। আমি, দিব্বি ভাল মানুষ, পৃথিবীর সমস্ত ভাল মানুষগুলো যেমন হয়। যারা ভাল মানুষ সাজে, তাদের চেয়েও, আমি ভাল মানুষ।

আমি এই বাস ষ্ট্যান্ডে রোজ আসিনে। সম্ভবত এটাও আমাকে সন্দেহ না করার কারণ। যারা সব সময়ই কারণ খুঁজে বেড়ায়, তাদের হিসেবেও আমি এত নগণ্য যে পৃথিবীতে আর অস্তিত্ব আছে কিনা সে সম্পর্কে তাদের সন্দেহ রয়েছে। হঠাৎ, যেদিন আমাকে আমি কিছুতেই সামলাতে পারি নে, সেদিন, ঠিক দু আনা কিংবা তিন আনা পয়সা খরচ করে, অথবা পায় হেঁটে, সোজা চলে আসি এই বাস ষ্ট্যাণ্ডে। বাস থেকে নেমে আমার গন্তব্যস্থলই হয় এইটে। এটা ছেড়ে আমি বেশিদূর যেতে পারি নে। যখন পারি, তখন সোজা বাসায় চলে আসি। এসে, আমার পরাজিত আমিকে খেয়াল খুশিমত চাবুক মারি ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না আমার বুদ্ধিবৃত্তি হৃদয়বৃত্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

আমি একজন ভাল মানুষ, যাকে বলে পারফেক্ট জেন্টলম্যান। বাস থেকে নামি । একটু দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসি ষ্ট্যান্ডে। যারা নামার সময় আমাকে লক্ষ্য করে, তারা ঐ গাড়িতেই উঠে চলে যায় বলে, দ্বিতীয়বার লক্ষ করে না। যারা থাকে তারা, আমি জানি, আমার দিকে তাকায়, দেখে না। আমি অন্যান্যদের মতই বাসের জন্যে অপেক্ষা করার ভান করি। বাস দেরি করে আসার জন্যে মাঝে মাঝে কৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ করি। আবার কখনো কখনো অপেক্ষমান যাত্রীদের অসহিষ্ণু উক্তিতে কপট সমর্থন জানাই। আমি দূরে লক্ষ করি বাস আসছে কি না। রাতের অন্ধকারে ৰাসের মাথার আলো দেখে ও শব্দ শুনেই বোঝা যায় তার আগমনী। আমি ঠিক তক্ষুনি সৰায় অলক্ষ্যেই কেটে পড়ি। দোকানে গিয়ে সিগারেট কিনি। কিংবা রাস্তা কার ।

আমি বাসের জন্যে অপেক্ষা করলেও আমার দৃষ্টি প্রায় সব সময়ই নিবন্ধ থাকে এই বাস ষ্ট্যান্ড-সংলগ্ন বাড়িটাতে। একটা সাদা একতলা বাড়ি। খুব সুন্দর। আমেরিকান কায়দায় বানানো। বাড়ির সম্মুখে ফুল বাগান আছে। প্রাচীর দিয়ে সম্পূর্ণ বাড়িটা ঘেরা। সামনের দিকে লোহার বড় একটা গেট। বাড়ির সামনে দিয়েই বড় চওড়া রাস্তা। রাস্তাটা এসেছে সম্ভ্রান্ত পাড়া থেকে, গিয়েছে আরো বেশি সম্ভ্রান্ত পড়ায়। এই বাড়িটাই আসলে আমার লক্ষ্যস্থল। আমি তাকিয়ে থাকি আনমনে। বাস আসছে না, তাকাচ্ছি এদিক ওদিক। যেন সময় কাটাচ্ছি।

আজকে আমি যখন এসে নামলাম বাস থেকে, তখন রাত সাড়ে আটটা মত বাজে। আকাশে মেঘ নেই। তারাগুলো জ্বল জ্বল করছে। একফালি চাঁদও রয়েছে আকাশের পশ্চিমাংশে। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। ঘামে সারা শরীর ভিজে চুপসে গেছে। একটুও বাতাস নেই। আমি বাস থেকে নেমে প্রথমে মাথার ঝিম ছাড়িয়ে নিলাম। মিনিট দুয়েক পার হয়ে যাওয়ার পর, আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম রাস্তার অপর পাশের দোকানটায়। একটা সিগারেট কিনে আবার ফিরে এসে, ষ্ট্যাণ্ডে দাড়িয়ে বাড়িটার দিকে লক্ষ করতে লাগলাম।

প্রাচীরের সাথেই লাগানো যে ঘরটা সেটা, মাঝেরটা ও তার পাশের ঘরে সাদা আলো জুলছে। বাসায় কোন সাড়া-শব্দ নেই। হঠাৎ প্রাচীরের পাশের ঘরে একটি পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল :

ভোর হল

দোর খোল—সাথে সাথে একটি বাচ্চা মেয়েলি কণ্ঠে চিৎকার করে উচ্চারণ করল

: ভোর হল

দোর খোল ।

আমি বুঝতে পারলাম, ইপু পড়ছে। প্রাইভেট টিউটর এসেছেন পড়াতে। রাত্রে ইনি বাংলা পড়ান। সকালে একজন এসে ইংরেজি পড়িয়ে যান এবং বিকেলে একজন অন্যান্য বিষয় পড়ান। ইপু কিণ্ডারগার্টেনে পড়ে। আশ্চর্য, এই ছেলেটির কণ্ঠস্বর ঠিক মেয়েলি। খালি কণ্ঠ ভাল করে লক্ষ করলে যদিও টের পাওয়া যায়, কিন্তু টেলিফোনে একদম বোঝা যায় না। আমি একদিন পাবলিক টেলিফোন থেকে এই বাসায় ফোন করেছিলাম। ইপু ধরেছিল। আমি মোটেই বুঝতে না পেরে, লেখা ভেবে রীতিমত সূর্যমুখী বলে সম্বোধন করতে, বেচারা থতমত খেয়ে রং নাম্বার বলে খটাং করে টেলিফোন রেখে দিয়েছিল। আমার বিশটি পয়সা নষ্ট হওয়ার জন্যে ভীষণ দুঃখ হয়েছিল। ঐ পয়সা বিশটি থাকলে, ভর দুপুরে বাসায় হেঁটে না গিয়ে বাসে যেতে পারতাম। আর ওর সঙ্গে কথা বলতে পারলে, মনের আনন্দে হেঁটে, চাইকি পৃথিবীও এক পাক দিয়ে আসা যেত। ইপুর সঙ্গে তখনো আমার পরিচয় হয় নি। যখন হয়েছিল, তখন সেই বিশ পয়সার শোকে আমি ও সূর্যমুখী প্রাণ খুলে হেসেছিলাম।

ইপু এখন পড়ছে। আমার ছোট ভাই মাজেদও হয়ত এখন পড়ছে। কিংবা পড়তে পড়তে মাদুরের ওপরে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। অথবা ওরই সমবয়সী রাজা রতনদের সাথে মারামারি করছে। রাত সাড়ে নয়টা দশটায় মা রান্নাঘরের ধোঁয়া কালির মাঝ থেকে বেরিয়ে এসে রোজই ছোট ভাই বোনগুলোকে ঘুম থেকে টেনে তুলে খাওয়ান। ইপু ঠিক নয়টা পর্যন্ত পড়বে। তারপরে ওর মা কিংবা বড় আপা এসে কোলে করে নিয়ে যাবে খাওয়ার ঘরে। খাওয়ার ঘরে চাকর তখন সব প্রস্তুত করে রাখে।

ইপু প্রভাতী কবিতাটি চিৎকার করে পুরোটাই বলে গেল। ইচ্ছে করছিল, ছুটে গিয়ে ওকে কোলে করে মাজেদের মত আদর করি। দু'পা এগিয়েও গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল, আমি যে ঐ বাসার সাথে সব সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানি, গেলেই চিনবে। ইপু হয়ত আনন্দে চিৎকার করে উঠবে। কিন্তু ওর বড়গুলো? আসবে। হয়ত কিছুই বলবে না। সম্ভবত কেবল চোখের নীরব প্রশ্নে আমাকে ঘায়েল করে ফেলবে। কিংবা, অজস্র প্রশ্নে আমাকে অক্ষত রাখবে না।

বারান্দা দিয়ে পাজামা ফ্রক পরা একটি মেয়ে আস্তে আস্তে এ ঘর থেকে ওঘরে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, রেখা। জুলেখার ছোট বোন। কলেজে পড়ে। ভীষণ দুষ্ট। ওর হাতেও টেলিফোন পড়েছে মাঝে মাঝে। পড়লে আর রক্ষে নেই। প্রথমে কৃত্রিম রাগ ও শাসন করবে। তারপরে দুচারটে মিথ্যে বলে ঘাবড়ে দেবে। অবশেষে জুলেখাকে ডাকবে। প্রথম প্রথম ভীষণ ভয় হত। ঘাবড়ে যেতাম। মিথ্যেটাকেই সত্যি বলে গ্রহণ করতাম। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, রেখার আসলে রসিকতা। কিন্তু আমি যার জন্যে এসেছি তার তো দেখা পাইনে। আমি যে মাঝে মাঝে সূর্যমুখীকে দেখার জন্যে আসি তা কি আমার বিধাতা জানে না? একশোবার জানে। একশোবার নয়। হাজার বার, লাখবার, কোটিবার জানে। অথচ সেই ষোলই ফেব্রুয়ারির পর থেকে, আমার সঙ্গে একটিবার দেখা হওয়ার সুযোগ দিলে না তুমি বিধাতা। রেখাও রসিকতা করে, তুমিও রসিকতা কর। তুমি সত্যি সর্বশক্তিমান রসিক। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, তুমি বাহাদুর দেখাও। যাই বল তুমি, তোমার রসিকতাগুলো এখন নিরস হয়ে আসছে। এক কাজ করলে ভাল হয়, তোমার এখন ছুটি নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের হাতে ছেড়ে দাও পৃথিবীটাকে। দিয়েই দেখো শক্তি। দান করে সেই ক্ষমতা, যা দিয়ে আমাদের ভাগ্যকে আমরা গড়ে নিতে পারি। আমি কেবল দাড়াতে চেয়েছিলাম। নিজের দুই পায়ে ভর করে দাড়িয়ে সুন্দর পৃথিবীকে প্রাণ তরে দেখে নিতে চেয়েছিলাম। আমি ভালবাসতে চেয়েছি। বিশ্বাস না করলে কি করব। তবুও বলছি,

আমি সুন্দরকে সুন্দরতম করে পেতে চেয়েছি। আর সেই অপরাধেই কি তুমি বিধাতা আমার পৃথিবীতে অন্ধকার করে দিয়েছো সূর্যমুখী আমাকে অস্বীকার করেছে। ওর সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে। অনেক কারণ আছে। নাইবা শুনলেন সে সব কারণ । ওরা অনেক ওপরে। আমরা নিচে

একতলা বাড়িতে থাকলেও লোহার গেট পার হয়ে ঢুকতে হয়। আমি কি পাগল হয়ে গেছি যে কারণ বলছি বলছি তো বলব না।

আমি এতক্ষণ লক্ষই করি নি, প্রাচীরের ওপর দিয়ে রজনীগন্ধা ফুলের শীষ উঠেছে। বডড প্রিয় ফুল আমার। জুলেখাকে আমি বলেছিলাম,

তোমার নাম রাখছি সূর্যমুখী, অথচ তুমি ভালবাস রজনীগন্ধা ফুল। এর উত্তরে ও আমার ধরা গলায় বলেছিল,

দেখা ও মাধুরীতো এক জিনিস নয়। সূর্যমুখী দেখে চোখ ভরে ঠিকই, কিন্তু রজনীগন্ধায় যে মন ভরে তা বোঝ না। তুমি আমাকে দেখে খুশি হও, আর পরিবর্তে তোমার মনে গন্ধ ছড়িয়ে দিই আমি।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম তখন। কেবল একটু হেসেছিলাম। ও তখন পায় পায় এগিয়ে গিয়ে একটা রজনীগন্ধা ফুল তুলে এনে আমায় বলল,

আমার উপহার। সাজিয়ে রেখ ।

আমি রেখেছিলাম। খুব যত্ন করে। যদিও দামি ফুলদানিতে সাজাতে পারি নি, তবুও রেখেছিলাম, এবং একটি চুমুও খেয়েছিলাম।

ইপুর পড়া হয়ে গেছে। মাস্টার সাহেব বাইরে এলেন। জুলেখার ছোটভাই খালিদ মাস্টারকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। খালিদ আমাকে খুব ভাল করে চেনে। এই এক্ষুণি ধরা পড়ে যাবো, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি পেছন ফিরে দাঁড়ালাম। মাত্র কয়েক হাত দূরে, খালিদ মাস্টারকে সালামুআলাইকুম জানাল। এখন যদি আমায় দেখতে পায়, তাহলে একটু হাসবে। বাসায় গিয়ে নিশ্চয়ই বলে দেবে যে জাহেদ ষ্ট্যান্ডে দাড়িয়ে আছে। তখন সবাই অদৃশ্য হয়ে আমাকে করুনা ও বিদ্রুপ করবে। ভাগ্যিস, আগে থেকে খালিদের আসা টের পেয়েছিলাম। খালিদ চলে গেল। যাওয়ার সময় বারান্দার আলোটা নিভিয়ে দিয়ে গেল।

অনেকক্ষণ এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলাম বলে বাসের জন্যে আবার ঘুরে দাঁড়ালাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম। সত্যি একটা বাস আসছে। তাহলেত এখনই আমাকে কেটে পড়তে হয়। কেটে পড়লাম। সোজা হনহন করে রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটছি, আর পেছন ফিরে চাইছি। বাসটা কখন এই স্টপেজে এসে থামে এবং রওনা দেয়। সাকোটা পার হতে না হতেই বাস এসে গেল। লোক নামাল। তুলল। আবার আমাকে পেছনে রেখে চলে গেল । ফিরে এলাম আমি। ভাবছি চলে যাব। এমনি প্রায়ই ইপুর কণ্ঠ শুনি, রেখাকে দেখি, খালিদ বারান্দায় এসে পায়চারি করে যায়, অথচ জুলেখাকে একটি বারের জন্যেও দেখতে পাইনে। আমার পরাজিত আমিকে, দেখতে না পাওয়ার সম্ভাবনায় চলে যেতে বলেও সহজে যাওয়াতে পারি নি।ভাবছি আর পাঁচ মিনিট পর হেঁটেই চলে যাব।


জুলেখাদের বাড়ির অপর পাশ থেকে একটা রাস্তা উঠে এসে বড় রাস্তার সাথে

মিশেছে । সেটা দিয়ে একটা জীপ আসতে দেখলাম। জীপের হেড লাইট পড়েছে ঠিক বারান্দার ওপর। দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেছে বারান্দাটা।

আপনারা আমাকে যে সন্দেহ করেন নি, তার কারণ, আমি কোন সন্দেহজনক আচরণই করিনি। আমি, এই দেখুন, সম্পূর্ণ ভাল মানুষ। স্বাভাবিক, সহজ সরল অবস্থায় তাকিয়ে রয়েছি বারান্দার দিকে। বারান্দায়, আপনিও দেখুন, লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা যে মেয়েটি, সে জুলেখা। পায়চারি করছিল বারান্দায়। হঠাৎ চোখে-মুখে আলো পড়ায় থমকে দাড়িয়েছে, দুতিন সেকেন্ডের জন্যে। আমি স্পষ্ট করে দেখলাম, ওর খোঁপায় একটা সাদা ফুল গোঁজা রয়েছে। ঠিক ওটা রজনীগন্ধা হবে। সুন্দর করে পেঁচিয়ে শাড়িটা পরেছে। পরিপাটি করে চুলগুলো আঁচড়িয়েছে। আমি কোন ভুলই করছিনে। সত্যি ও সূর্যমুখী। আমি যদি এখন চিৎকার করে ডাক দিই, ও হয়ত ফিরে তাকাবে। চিনবে আমাকে । বুঝতে পারবে আমার কণ্ঠস্বর। কিন্তু দাড়াবে না। দ্রুত চলে যাবে। অপরদিকে রাস্তার লোকগুলো আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করবে। সদুত্তর পাবে না। আর, অবশেষে আচ্ছা করে মার লাগবে। আমি মোটেই অপ্রকৃতিস্থ হই নি। আমি দেখছি, জুলেখা আস্তে আস্তে ঘরের ভেতর চলে গেল। আমি ছুটে যেতে চাইলাম ওর কাছে। কিন্তু তক্ষুণি মনে পড়ল, ঐ লোহার গেট। ছুটেই যাই আর ধীরে সুস্থেই যাই, আমাকে ওটা পার হতে হবে। আমি পার হব ঠিকই। কিন্তু ওরা যে আবার আমাকে গেটের বাইরে রেখে যাবে!

বিশ্বাস করুন, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছিনে। সূর্যমুখী চলে যাওয়ার পর মুহুর্তেই, আমার অনুভূতির অনুসরণ করে ঐ দরোজা দিয়েই যে বেরিয়ে এল, সে সূর্যমুখী নয়। তার অনেক বয়স। বার্ধক্যেএসে পৌঁছেছে। মাথায় তার রজনীগন্ধা ফুল নেই। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে। মুখে বহু অভিজ্ঞতার ছাপ। আমার মা। আমার মা, যার গর্ভে আমার জন্ম হয়েছে। আমার জননী, যে আমাকে বড় করে তুলেছে, কথা বলতে শিখিয়েছে, হাটতে শিখিয়েছে, জীবন সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছে। যার কাছে আমি পেয়েছি অপত্য স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালবাসা। তবুও তুমি মা প্ৰেমময়ী। তুমি কয়েকদিন আগে আমার উপর মুখ করেছিলে। আমি রাগ করেছিলাম। ভাতও খাই নি। আর তার জন্যে তুমিও রাতে কেঁদে কেঁদে না খেয়েই ঘুমিয়েছিলে। আজ যদি এই বুড়ো ছেলে তোমার কোলে ওঠে লাফিয়ে, তুমি বলবে—যা দুই। ঠিক নামিয়ে দেবে কোল থেকে। কিন্তু বলবে—‘পাগলা। অথচ জানো মা, এখন যদি তুমি আমায় বুকে করে রাখো, তবে আমি ঠিক হারিয়ে যাবাে। এই দেখোই না। আমি তোমার অস্তিত্বে ও সত্ত্বায় বিলীন হয়ে যাচ্ছি। আমার এই দেহের দৈর্ঘ্য প্রস্থ যেন আস্তে আস্তে সংকুচিত হয়ে আসছে। আমি ক্রমশই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসছি। একসময় আমি বাতাসে মিলিয়ে গেলাম। আমি এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছি। আমি রাতের আকাশের সূর্যের সাথে খেলা করছি। কাল আমার আত্নপ্রকাশ ঘটবে। তুমি দেখে নিও মা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন