রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

সামরান হুদা'র বই নিয়ে আলাপ : অন্তঃপুর নামের পিঞ্জিরা

স্বাতী রায়
অন্তঃপুর নামের পিঞ্জিরাতে বসে নারী দোল খায় – দানাপানির বদলে রঙ্-এ, সুর-এ ভরে তোলে দিক। খাঁচার পাখি হয়ে কেউ সুখে থাকে, কেউ বা দুখে। সামরাণ হুদা অবশ্য এই সব সুখদুঃখের কচকচির ভিতরে জান নি – সোজা সরল চোখে যা ধরা পরেছে তাই তিনি পরাতে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন।


দুটি বই – প্রথমটি অতঃপর অন্তপুরে, প্রকাশকাল ২০১৪, দ্বিতীয় টি পুবালি পিঞ্জিরা ২০১৬ র বইমেলায় প্রকাশিত। দুটি বইতেই কথাকারের ভুমিকা মুলতঃ নির্বিকার narrator র – ঠিক ভুলের তত্ব-কথায় না জড়িয়ে তিনি শুধু যা দেখেছেন, তা তূলে ধরেছেন। এই নিরাসক্তিও খুব সহজ কথা নয়। বিশেশত সেই জীবন নিয়ে, যে জীবন প্রতি মুহূর্তে তাঁকে গড়ে তুলেছে, তাঁকে ভালবেসেছে আবার তাঁকে চোখ পাকিয়ে ধমক দিয়েছে। তবু তিনি পেরেছেন এই সব ক্ষণকালীন ভাল-মন্দের উপরে উঠে, শুধু জীবনের রঙ-গন্ধটুকু শুষে নিতে এবং আমাদের চোখের সামনে থরে-বিথরে তাকে সাজিয়ে দিতে।

অসামান্য এই চিত্রণ। কাকে ছেড়ে কাকে বলি! যেমন ধরা যাক অতঃপর অন্তপুরের পিয়ুরসালার বিবরণ – একটি ভুনিখিচুরি জাতীয় খাদ্য বলেই মনে হয়েছে বিবরণ পড়ে – কিন্তু এমনই তার বর্ণনা যে পড়ার পড়েই মনে হয় এখনই বাজারে যাই, শিমের দানা কিনে আনি – এক্ষুনি এ রান্না না খেলে মন পুরো ভরবে না। তবে রান্নার অসামান্য বিবরণ যেমন প্রায় নাকে তার গন্ধ এনে দেয়, আরও মনোরম লাগে এই প্রসঙ্গে জলি-বশ্যাল ধানের আখ্যান -ঢেঁকি দেওয়ার গল্প, লঙ্কা চাষের গল্প আর শিমদানার কথা। পড়তে পড়তে মনে হয় সাম্প্রতিক কালের know your food, grow your food মুভমেন্টের কথা – খাদ্যের সঙ্গে এই নিত্যকার সম্পর্কের কথাই তো তারাও বারে বারে বলছেন । আমাদের শহুরে জীবনে, খাদ্য যেখানে নিয়ন্ত্রিত হয় supermarket এ পন্যের সহজলভ্যতায় এবং রেফ্রিজেরাটেরের ধারনক্ষমতার উপর, সেখানে বসে অবশ্য পিয়ুরসালা রান্না করা গেলেও সে রান্নার স্বাদ দারগিঝির পিয়ুরসালার ধারে কাছেও যাবে কিনা সন্দেহ! এবং এখানেই সামরাণের মরমী মনের পরিচয় – জমিদার বাড়ির বা চেয়ারম্যানের নাতনি হয়েও তার লেখায় দারগিঝির কথাও দরদের সঙ্গে, সসম্ব্রমে ফুটে উঠেছে।

অতঃপর অন্তপুরেরর থেকে আমার আর একটি বড়ো পাওয়া, এর রোজা রাখার গল্প, জাকাত দেওয়ার কথা, ঈদ এর বর্ণনা – কলকাতা শহরের নিরবিচ্ছিন্ন হিন্দু পাড়ায় ছোট থেকে বুড়ো হয়ে যে জীবন আমার প্রায় অচেনা! এও এক মজার ব্যাপার – আমরা ২৫শে ডিসেম্বর মানতে ও মানাতে যতটা উন্মুখ, তার কণা মাত্র ঔৎসুক্যও যদি আমাদের ঘরের পাশের মুসলমান বা জৈন বা পার্শি দের নিয়ে থাকত! সে যা হোক! সামরাণ কথার টানে বুনেছেন এক ধর্মপ্রাণ গ্রামীণ সংসারের গল্প – যেখানে ক্ষেতের ফসল, বাড়ির গাছের ফল আর পুকুরের মাছ হল প্রাচুর্যের উৎস – আর নিয়ম মেনেই প্রাচুর্যের সঙ্গে আসে অল্প-বিস্তর ক্ষমতা আর সমাজের মাথা হয়ে ওঠার অধিকার। কিন্তু এ গল্প এক পুরনো জমানার যখন লোকে জানত অধিকারের সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ববোধ! তারই প্রতিফলন সামরাণের দাদার কথায়, যখন তিনি বিভিন্ন অসুবিধা সত্ত্বেও জাকাতের দান হিসাবে গরীব মানুষদের কাপড়ই দিয়ে যেতে চান – অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক টাকা বিনিময়ে রাজী হন না – তাহলে যে অভাবের সংসারে টাকা যাবে তলিয়ে, বেচারিদের বৎসরান্তের কাপড়টুকুও জুটবে না!

তবে একমুঠো মৌরীর মাঝে মিছরিদানা হল সামরাণের মেজকাকার বিয়ের গল্প – তার পানচিনির বিবরণ, ঘর সাজানর, গায়ে-হলুদের গল্প সবই বড্ড চেনা – কিন্তু লেখার গুণে তা রঙ্গিন হয়ে ওঠে! মনে হয় আমিও যেন সদ্য ওই দাওয়াত খেয়েই ফিরলাম। এতোটাই কাছের থেকে লেখা। তবে চুপিচুপি একটা কথা বলে রাখি, এখানেই মেয়েদের দেখার চোখ আলাদা হয়ে যায়। দশ বার বছরের ছেলেদের বিয়ে বাড়ী থেকে ফিরে এসে প্রশ্ন করে দেখেছি, শুধু হুল্লোড় করা আর পরিবেশনের ফাঁকে চুরি করে খাওয়ার বাইরে আর কিছুই তাদের চোখে ধরে নি। কিন্তু একটি উৎসবের অনুসঙ্গে একটি বাড়ী এবং তার মানুষ জন কেমন নতুন রকম হয়ে যান, কেমন করে অন্য একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের বুনন শুরু হয়, সে দেখার দিব্যশক্তি বোধ হয় শুধু বালিকাদেরই থাকে।

পুবালি পিঞ্জিরার গল্পের সুর এক হলেও চলন একটু ভিন্ন – গ্রামের থেকে এ গল্প এসে পড়েছে শহরের পথে। বাংলাদেশের মফস্বল শহর, তখন তার গ্রামীন পিতামহকে ভুলে ওঠে নি – তাই বোধহয় বাড়ীতে গরু রাখাও সহজ স্বাভাবিক হয় – এবং সেই গরু তার বাছুর এবং রাখাল সমেত হয়ে ওঠে বাড়ীর অংশ। এ গল্প যদিও বা অচেনা লাগে, রিনির কথা বা টুটুর কথা বোধহয় সব মেয়েবেলাতেই থাকে – শুধু এমন করে বলতে পারে ক জন! তবে পুবালি পিঞ্জিরা পড়তে বসে একটু দুঃখ হচ্ছিল যে সামরাণ তার নিজের কথা আর একটু বেশি বলতে পারতেন – অন্যদের কথা বলতে বলতে তিনি নিজেই চাপা পড়ে গেছেন।

দুটি বই-ই খুব যত্ন করে ছাপা – আর বেশ কিছু সুন্দর ছবি এদের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। আর এক অসামান্য সম্পদ এর লোকগীতিকার ব্যবহার – হয়ত বা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রদের কাছে এগুলি ততটা অপরিচিত নয়, কিন্তু আমার অসংস্কৃত চোখে এই সংগ্রহ অসামান্য ঠেকেছে। একটা উদাহরণ দিই – জাড়ের দিনে গুয়া খাও / ঘুরা চিতাই দুটা দ্যাও / প্যাট কামড়াইলে খাইয়া লিও / চাইল ভাজা ঝাঁই – জানুয়ারীর সন্ধেতে বসে এই বই পড়তে গিয়ে আমার মনটা হু হু করে উঠল মায়ের হাতের চিতই পিঠের জন্যে। এবং হয়ত এখানেই এর সীমাবদ্ধতা। একটু বুঝিয়ে বলি। যদিও আমার জন্ম কলকাতা শহরে, মুল ধরে টান মারলে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ। তাই যে সব ছবি এই বই তে আঁকা হয়েছে সেগুলি আমার কাছে অল্প-বিস্তর পরিচিত। সত্তরের দশকের কলকাতাতেও আমাদের বাড়ীতেও এই একই ধারা বইত – তাই এই বই আমার কাছে নিজের কাছে ফিরে যাওয়া – comfort zone. কিন্তু পড়তে পড়তে কিছু কিছু শব্দ আটকেছে আমার অনভ্যস্ত চোখে – দু চার বার বাবা-মাকে টেলিফোন করে জেনে নিতে হয়ে ছে আমার অনুমান সঠিক কিনা। আসলে সর্বদা চলমান ভাষা তার চলন বদলে বদলে কলকাতা শহরে এখন যে রূপ নিয়েছেন, সেটি এই বইএর ভাষার থেকে খানিক খানিক আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের যে প্রজন্মের চোখ মেলা Harry Potter র দুনিয়ায়, পিঠে পুলির বদলে যারা mousse, cheesecake কেই বেশি পছন্দের বলে জানে, Pablo Kohelo , Amitava Ghosh যাদের হৃদ মাঝারে থাকেন, সেই প্রজন্ম এই রঙের ধারায় অবগাহন করতে পারবে না হয়ত ভাষার দুরূহতার জন্যেই – ক্ষতিটা তাদেরই অবশ্য। তবু বড়ো দুঃখ হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন