রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

জয়শ্রী সরকার'এর গল্প | জাহানারা রাঁধুনি

লাশ দেখা যায় .....লাশ......

লাশ!

হ্যাঁ। মেয়ে মানুষের লাশ!

কই কই দেখি

ঐ যে, ছায়া ব্লাউজ পরা।


ও আল্লাহ! কার এমন সর্বনাশ হইলো!

সবই ভগবানের ইচ্ছা

মনে হয়, কেউ মাইরা ভাসাইয়া দিছে ...

ভাটায় ভাসাইয়া নিছে বোধহয়..

কি জানী, সমুদ্রে আইসা তো মাথা ঠিক থাকে না! কি করে না করে!

ইস্ প্রানটা গেলো আরকি


ঝাঁক ঝাঁক চোখ আটকে আছে। বালিতে ঘাপটি মেরে পরে আছে একটি মানুষ। মেয়ে মানুষ। পরনের শাড়িটি বোধহয় ভেসে গেছে। বালিতে মেখে গেছে সারা শরীর। বালি আর জলের শ্যাওলায় ছায়া ব্লাউজের রং বোঝা যায় না। জোয়ার ভাসিয়ে এনেছে। ভাটায় ফেলে গেছে। মাঝি জেলে সব কাজ ফেলে ঝুঁকে আছে লাশের দিকে। চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ।


তা এই সন্ধ্যাকালে এমন ঘটনা!

জোয়ার ভাটা কি আর দিন রাত মানবে ভাই?

কোন দূরে থানা! পুলিশ তো আসবে না কাকা

পুলিশ আসবে? দিনের বেলায়ই সময় পায়না আবার তিন সন্ধ্যায়!

পুলিশের ঠেকা না? সন্ধ্যা রাতে আইসা লাশ টানন? থাক। যে টানে এসেছে সেই টানেই চলে যাবে।

আহা হা। কি কপাল! আপন জন শেষ দেখাও দেখতে পাবে না হয়তো।

ভয় করে গো ভাই। কবে যে এই রাক্ষস প্রাণে থাবা বসায়। বউ বাচ্চা জানতেও পারবে না।

সব তার ইশারা ভাই। বাকী সব উছিলা মাত্র!


ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। আজকাল সন্ধ্যা রাতেই ঝিমুনি এসে যায়। হট্টগোলে ঝিমুনি কেটে গেল। তাকালাম। বুঝলাম লাশ এসেছে। মানুষগুলো পারেও! আরে লাশই তো! তা এ দেখে এত চেঁচামেচিরই বা কি আছে। জীবিত মানুষ ভেসে এসেছে এমন তো কস্মিন কালেও হয়নি। চলার পথে কত মানুষ দেখলাম। চোখের সামনে জলের সাথে খেলতে খেলতে ভেসে গেল। কত মানুষ নিজে থেকে ভেসে গেল। কত মানুষকে মেরে ভাসিয়ে দিল। তারা ভাসতে ভাসতে, পঁচতে পঁচতে, গলতে গলতে কোথা থেকে কোথা চলে গেল। এই আমার ঠোঁট ঘেষে কত লাশ ভেসে গেছে। কত লাশ আমার নাকের কাছে এসে আটকে গেছে। লাশ পঁচা জল আমার ঠোঁট বেয়ে পেটের ভীতর চলে গেছে। গলিত লাশের গন্ধ নিয়েই আমাকে বাঁচতে হয়েছে। নাড়ি ভুড়ি ফুলে ফেঁপে একাকার। ঘড়ঘড় বমি উড়ে গেছে বাতাসের সাথে। বমি করতে করতে বুকের পাঁজর গুড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা। কত লাশ মাড়িয়ে গেছি! কত লাশের পাশে বসে কাটিয়ে দিয়েছি রাতের পর রাত! তাই এসব লাশ টাশে আজকাল আর দুঃখ পাইনা। অবাকও হইনা। তবু একবার লাশটি দেখতে ইচ্ছে করে। মেয়ে মানুষের লাশ শুনলে একবারের জন্য হলেও দেখতে ইচ্ছে করে। মনে হয় কি জানী সেই হবে হয়তো! কিন্তু সন্ধ্যা এখন। এ আলোতে সব অন্ধকার। শুধু ঢেউ ছাড়া বাকী সব অন্ধকার। দরিয়াজুড়া সে ঢেউ দেখে দেখেই আমি ভোরের জন্যে অপেক্ষা করি।

খেপা ঘোড়ার মত সাঁই সাঁই করে ছুটে আসছে ঢেউ। এখনি আছড়ে পড়বে বুকে। মুঠো মুঠো নুড়ি-বালি নিয়ে দিবে ছুট। আবার আসবে। আবার যাবে। ওর এই ছুটাছুটি দেখলে ধুকপুক করে বুক। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও মন চলে যায় দূরে। অদূরে এখন থোকা থোকা বাতি। মনে হয় দূরের কোন গ্রাম। মাঠের ওপাড়ে অচেনা কোন গ্রাম। অথচ হাজার মাইলের মধ্যে গাঁয়ের চিহ্ন মাত্র নেই। ঐ বাতি সমুদ্রের বাতি। ভাসমান সাম্পানের বাতি। বছরের পর বছর, যুগের পরে যুগ রাতভর ওরা জ্বলছে। জ্বলে জ্বলে জেল্লাহীন, ময়লা-তেলে চিটচিটে, কাঁচের বাক্সে বন্দী। আমি ঐ বাতি’দের জীবন জানী। সাম্পানের জীবন জানী। ঢেউয়েরও জীবন জানী। জোয়ার জানী, ভাটা জানী। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যদয় জানী। জীবন জানী। মরন জানী। মেয়ে মানুষ কিভাবে লাশ হয়ে যায় তার অনেক গল্প জানী।

এইটুকু বয়স থেকে এ দরিয়ায় আমার ঘর। ঐ দেখুন, ঐ দিকে যে ঢেউ খিলখিলিয়ে গড়িয়ে গেল তারা ভাঁজে আমার এক্কা দোক্কা গোল্লাছুট। জোয়ারে কাবাডি। ভাটায় কানামাছি। ঢেউয়ে শৈশব আমার, ঢেউয়ে যৌবন। ঢেউয়ে ঢেউয়েই শ্যাওলা জমেছে আজ। এ দরিয়ার মাছেরা আমায় চেনে। আকাশে উড়ে যাওয়া পাখীরা আমায় চেনে। লতা চিনে, পাতা চিনে, মাঝি-জেলে সবাই চিনে। কি জানী হয়তো লাশগুলোও চিনে কিন্তু জানি না!

আমি হীরেন বাবুর সাম্পান। মহেশখালির নামী দামী জন তিনি। বাবুর ডজন খানেক সাম্পান। সাম্পানে দিন খাটে আরো শ’খানেক জন। কি শীত, কি বর্ষা বাবুর ব্যবসার খামতি নেই। সাম্পানের সাগর যাত্রার ক্ষনে বাবু ঘাটে, ফিরবার ক্ষনেও বাবু ঘাটে। বাবুর ধূতির কোচায় টাকা ঝনঝন করে। নিদারুন সময়ে বাবু ভগবান। দারুনে দানব। কি হুঙ্কার! হবেই তো, এমন মানুষ দ্বীপে আর কজন? বাবুর গর্বে আমার গদগদ অবস্থা। তিনি শুনতে পাক আর না পাক, দেখুক আর না দেখুক, তাকে দেখলেই আমি জোড়হাত কপালে ঠেকাতাম। কক্সবাজার ছয় নম্বর ঘাট থেকে শুরু করে এ ঘাট ও ঘাট সবঘাটে হীরেন বড়দার জয় জয়কার। যেমন পাকা ব্যবসায়ী তেমনি সৌখিন। সকল ঝুট-ঝামেলা উপেক্ষা করে শীতকালে একবার সাগর বিলাসে যেতেন। বলতেন, হাত ভরে তো কিছুই নিয়ে যেতে পারবো নারে, চোখ ভরে নিয়ে যাই। একটাই তো জীবন।

তখন নবীন সকাল। গা থেকে সুন্দরী কাঠের বাসনা বেরুয়। ৬.১০ মিটার লম্বা, ১.৫৫ মিটার প্রস্থ আমি নজর কাড়ার মত। সাগর বিলাসে বাবু তখন আমাকেই সঙ্গে নিতেন। সে উপলক্ষে আমায় রং টং করে সাজানো হত। কোণায় কানায় জমে থাকা ঝোল পরিস্কার করা হত। আমার বুকের উপর পাতা হতো ফুল তোলা চাঁদরের বিছানা। বাবু সেখানে শুইয়ে বসে সময় কাটাতেন। শিথানে আকাশ, পৈতানে সাগর । রাশি রাশি ফেনামাখা ঢেউ। সে ঢেউ কেটে কেটে বাবুকে নিয়ে আমি বাকখালী নদী পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতাম। আমার মনে তখন তা থৈ থৈ অবস্থা। মনে হতো কি সুন্দরই না পৃথিবী। আমার কাছে পৃথিবী মানেই ছিল এই একটি মাত্র সাগর আর সাগর ঘেরা জনপদ। বাংলাদেশ আর বঙ্গোপসাগর এর বাইরে তখন আমার কিছুই জানা নেই। তাই পৃথিবী দেখার আনন্দে আমি ডগমগ থাকতাম। সারাবছর মাছধরার ফাঁকের এই সময় টি ছিল তাই ভ্রমন। তখন অনেক কিছুই হত যা সারাবছর হতো না।

যেমন, সারা বছর কাঁচা পাকা মাছ রান্না হত। গন্ধে আমার গা গুলাতো। কিন্তু সেই সময় মাংসের গন্ধে ম ম করতো চারদিক। আহ্ সে কি গন্ধ! মেয়ে মানুষের রান্নার গন্ধ। সারা বছর তো জেলেরাই রান্না করতো। শুধু তখনই বাবু’র সুবাদে আসতো রাঁধুনী । জাহানারা রাঁধুনী। আমার জীবদ্দশায় জাহানারা রাধুনীকে আমি অনেকবারই দেখেছি। কি তার হাতের যশ। খাওয়া শেষে তিনি আমার মুখের উপর বসে থালা-বাসন-হাড়ি পাতিল মাজা ধোওয়া করতো। ধোয়া জল যখন আমার ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে যেত। চেটে পুঁটে তার স্বাদ নিতাম। মনে মনে বলতাম, জাহানারা তুমি বরদা’কে দেখ, জেলেদের দেখ, মাঝিদের দেখ আমায় কেবল তোমার দেখতে ইচ্ছে করে না! থালা পেতে দু’টুকরো মাংস তো আমায়ও দিতে পার! যদিও জাহানার রাধুনী কোনদিন সেকথা শুনতে পায়নি! শুনতে পাওয়ার কথাও নয়।

জাহানারা রাঁধুনী দেখতে মিচমিচে কালো। দাঁতগুলো যেন ঝিনুকের মালা। চোখ দুটো অর্ধচন্দ্রাকার; চওড়া করে সুরমা আঁকা, পরনে জংলী ছাপার শাড়ি। হাতে মোটা মোটা প্লাস্টিকের চুড়ি। নাকের বোটায় মুক্তা বসানো রুপোর ফুল। এক ঘেয়ে দরিয়ায় ঐ জাহানারা যেন রক্তজবা। ঘোর অবসাদে চোখ তাতানো। উৎসবমুখর। সে এলে সাম্পানে সারাদিন খোটর খাটুর শব্দ হয়। জিরার সাথে গরমশল্লার গন্ধ বেরোয়। রসুনের সাথে আদা। মাঝিদের চোখ জ্বলজ্বল করে। বরদা গুনগুন সুর ধরে। শুধু জাহানারা রাঁধুনী একরকম। মুখে কোন কথা নেই। সারাক্ষন ঘোমটা টানা। চুলায় আগুন জ্বালে। রান্না করে। সূর্য অস্তকালে কুপির চিমনি ঘষে মেজে বাতি ধরায়।

সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষন। বড়দা আমার হাঁটুর কাছে দাঁড়িয়ে। পাতার বিড়ি ফুঁকছেন। পোঁড়া বিড়ি ছাই করে উড়িয়ে দিচ্ছেন বাতাসে। বিরবির করে বলছেন-

‘যে ঢেউ যায়, সে ঢেউ আর আসে না। যে দিন যায়, সে দিনও আসে না। ঢেউ হইলো জীবন, জীবনই ঢেউ। তার প্যাঁচে পাক খায় হাজারো ঘটনা। কোনটার সাথে কোনটা মিলে না। জাহানারার সাথে মিনারা মিলে না, মিনারার সাথে শ্যামলা মিলে না। ঘরের বউয়ের সাথে কেউই মিলে না। আবার সকলের সাথে সকলেই মিলে। খানিকটা ভাতের মত। না খাইলে চলে না। বেশি খাইলেও মরে না।’

এমন সময় জাহানারা রাঁধুরী এসে দাঁড়ায়।

বড়দা ভীতরে আসেন। ভাত খাবেন।

মাঝিদের খাওয়া হল?

জাহানারা মাথা নেড়ে ছাউনির ভিতরে চলে যায়। বড়দা নড়ে না। বিড়ি ফুঁকে যায়। অন্ধকারে কুন্ডলী পাকানো ধূঁয়া ঘুড়িয়ে উড়িয়ে ছাড়ে।

মাংসের বাটি থেকে ধূঁয়া উড়ে যায়। হীরেন বাবু বাটি থেকে ঝোল ঢেলে নেয় পাতে। জাহানারা রাঁধুনী একটু দূরে চুপ করে বসে থাকে। মিচমিচে কালো জাহানারা। অন্ধকারে ঠিকমতো দেখাও যায় না। তবু সে বসে থাকে।

খাওয়ার পর বাবু গান শোনেন। গানের বেশির ভাগ শব্দই আ আ আ জাতীয়। ফাঁকে ফাকে কিছু শব্দ বলে তবে তা হিন্দি। পিয়া ও পেয়ার শব্দটি ছাড়া আমি বিশেষ কিছু বুঝি না। তবে কথা যাই থাক সুরটি বড় মনকাড়া। ঘোর লাগানো। শুধু টানে। যতই ছুটতে চাই তত বেশি করে টানে। শুধু আমায় নয়, যে জাহানারা সমগ্রদিন ঘোমটা টেনে কাজ করে যায়। প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলে না। সেও বিছানা ছেড়ে বাবুর বিছানার দিকে যেতে থাকে। জাহানারাকে দেখে বাবু নড়ে না। চোখ বন্ধ করে যেমনটি ছিল তেমনটি থাকে। আ আ গান শুনে। জাহানারা বাবুর্চি বাবুর পাশে গিয়ে বসে। চিমনি সরিয়ে বাতির আঁচ কমিয়ে দেয়। আলো আঁধারের ছায়ায় আমি দেখতে পাই, জাহানারা’র মাথার ঘোমটাখানা সরে গেছে। সারাদিন শেষে জাহানারা এই মাত্রই বালিশে মাথা রেখেছে। বাবু সেই মাথায় বিলি কাটছে আর বলছে;

ঘরের চাল ঠিক হয়েছে জাহানারা?

হে বরদা।

শুনলাম মেয়ে নাকি ফিরে এসেছে?

হে। খেদায়া দিছে।

হু। পাত্র দেখ। টাকা লাগলে আমি তো আছিই।

আপনে আছেন বলেই তো আছি। আপনার ঋণ তো শোধ করার না

ঋণ শোধ করতে চাও?

সেই কপাল কি আমার!

জাহানারা, একটা ছেলে দিবা আমারে?

কি?

হ্যা, ঋণ শোধের কথা বললা তো তাই বললাম!

মুসলমানের পেটের ছেলে দিয়ে কি করবেন বড়’দা?

পেটে কি হিন্দু মুসলমান লেখা থাকে?

পেটে থাকেনা কিন্তু পেটটা যে জাহানারার! এই পেটে ছেলে হলে না তুলতে পারবেন জাতে, না পাতে।


জাহানারার এই কথার পর বাবু কথা বাড়ায় না। রাত বয়ে যায়। বেজে চলা সুরটি ঝিমুতে ঝিমুতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

শেষ রাতে জাহানারা বাইরে আসে। চুপচুপ পায়ে চলে যায় নিজের বিছানায়।

জাহানারা রাঁধুনী আর হীরেন বাবুর অভিসারের কথা আমি ছাড়া জানে আরো একজন। তৈবর মাঝি। রক্ত মাংসের হলেও তৈবর আমারই মত ভাবলেশহীন। একটা কাঠের মূর্তির মত একদিকে চেয়ে থাকে। যেদিকে চেয়ে থাকলে আমি ঠিকঠাক চলতে পারি। তৈবর বাবুর খাস লোক। তৈবর জাহানারার বাড়ি একই গাঁয়ে। কিন্তু জাহানারার সাথেও তাকে আমি কোনদিন কথা বলতে দেখিনি। আমার আগে জাহানারা ভ্রমনে আসতো কিনা আমি জানীনা। তৈবর মাঝি কোনদিন জাহানারার সাথে কথা বলেছিল কিনা তাও জানীনা। শুধু জানী তৈবুর বাবুর খাস মাঝি। তৈবর আর জাহানারা একই গ্রামের। জাহানারাও বাবুর খাস রাঁধুনী। মজার বিষয় হচ্ছে, তৈবর আমি আর জাহানারা ছাড়া বাকী কেউ একবারের বেশি বাবুর সাথে ভ্রমনে যেতে পারেনি। ফলে জাহানারা প্রথম না দ্বিতীয়, জাহানারা পরিচিত না অপরিচিত কারোরই খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া জাহানারা মহেশখালী ঘাট থেকেও উঠতো না। সে সেখানকার মানুষও নয়। ছোট্ট নৌকায় করে কেউ একজন তাকে দিয়ে যেত। বাবুর খাওয়া দাওয়ার যেন কষ্ট না হয়। কষ্ট বাবুর হতোও না। জাহানারার মত কেও থাকলে কারো কোনদিন কষ্ট হতে পারে না।

এমনি করে ভ্রমনে জাহানারা আসে। সেই জাহানারা। জাহানারা রাঁধুনি। সে এলে জিরার সাথে গরমশল্লার গন্ধ বেরুয়। সারারাত বাবু গান শোনে।

১৪১৫ বঙ্গাব্দ। শীতের শেষ। ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। ঝিরিঝিরি তিরিতিরি উথাল পাতাল- কি দরিয়া, কি বাবু, কি আমি- একবছর পর দেখা হবে জাহানারা বাবুর্চির সাথে। বাবুর সাথে জাহানারা বছরের অন্যসময় দেখা হয়েছে কিনা কে জানে কিন্তু আমার সাথে তার সেই একটি সময়েই দেখা হত। আমি অপেক্ষা করি। নির্ধারিত স্থানে যাবার অপেক্ষা। যেখানে জাহানার রাধুঁনী এসে ভিড়বে।

কাঠের বড় নৌকা এসে ভিড়লো। একি! লাল পাড়ের হলদে শাড়ি পরা একটি মেয়ে। গায়ের রং মিচমিচে কালো নয়। চোখে সুরমা আঁকাও নয়। আমার বুকে দাঁড়িয়েই সে বাবুকে প্রণাম জানালো।

সেলাম বড়দা। আমার নাম আলাপী। আম্মার শরীর ভালো না।

মেয়েটির নাম আলাপী। জাহানারা বাবুর্চির মেয়ে। জাহানার আসতে না পারায় মেয়েকে পাঠিয়েছে। বাবুর কষ্ট হবে সেই ভেবেই এমন। আমি বুঝতে পারলাম যে মেয়েটি স্বামীর ঘর থেকে চলে এসেছিল সে-ই আলাপী। গেছে বছর এই আলাপীর কথাই জাহানারা রাঁধুনী বলছিল। আলাপীর বয়স বিশ কি বাইশ হবে। মাথায় ঘোমটার “ঘ” ও নেই। পান খাওয়ায় সারাক্ষন ঠোঁট দুখানা লাল হয়ে থাকে। যেদিক যায় থপথপ শব্দ করে। কোণায় কানায় বসে গুনগুন করে। আলাপীর রান্না জাহানারা’র চেয়ে কিছু বেশি ভালো। বাসন ধোয়ার সময় আমি চেখে দেখেছি। কিন্তু, তবু আমার জাহানারার জন্যেই মন কেমন করে! তার হাতেই রান্না খেতেই ইচ্ছে করে! তাকে একবার দেখার জন্যে মন কেমন করে!

রাত জাগার জন্যে ছন্দ চাই। আকাশ ভরা তারা চাই। চোখ তাতানো জবা ফুল চাই। কিছু না পেয়ে আমি ঘুমিয়ে যাই। বাবু এসে আমার বুকের উপর দাঁড়ায়। পোঁড়া পাতার গন্ধে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাবু বিড়ি ফুঁকছেন। এটা বাবুর অভ্যাস। বাবু বিরবির করে কি বলছেন। এটাও বাবুর অভ্যাস।

‘জোয়ার ভাটাই জীবন। জোয়ারে উপচে পড়বে। ভাটায় খামতি হবে। কিছুই চিরস্থায়ী না। সুখ না, দুঃখ না। মিনারা, শ্যামলা, জাহানার কেউ না। আসা যাওয়াই নিয়তি। নিয়তিরে মেনে নাও হীরেন। কারো জন্যে কিছু থামে না। এই যে তারাটা জ্বলছে, কাল একই তারা জ্বলবে কিনা তুমি জানো না? সব তারাই এক হীরেন......সবাই আকাশেই উঠে......মেনে নাও হীরেন....মেনে নাও।’

ভাত দিছি বড়দা।

তুমি যাও, আমি আসছি।

বাবু খেতে বসলে আলাপী সরে যায়। বাবু খেয়ে উঠে বসে।

দিন পাঁচেক পর। শেষ শীতের বাড়াবাড়ি চলছে। কুয়াশার ঢেকে আছে চারদিক। রাত যেন বিকেল থেকেই নেমেছে। চারদিক ঝিমঝাম। তৈবর রোবটের মত নাক বরাবর তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে বরফ জমে ও বরফ মানুষ হয়ে গেছে।

এমন নিথর ভ্রমন কার ভালো লাগে? আমি থেকে থেকে ঝিমুতে থাকি। ঝিমুতে ঝিমুতে আলাপীর ফিসফিসানি কথা শুনতে পাই।

আমাকে একটা স্বর্নের নাক ফুল দিবেন?

দিব।

একটা সুন্দর শাড়িও দিবেন।

হু। একটা ছেলে দিবি? সব দেবো।

ও আল্লাহ! আমার স্বামী নাই।

তাতে কি?

কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে পেট হইলো কেমনে?

তোরে আমি দূরে ঘর বানিয়ে দেব।

ও আল্লাহ! আপনে মুসলমান হবেন বড়দা?


বাবু কোন কথা বলে না। আলাপী খিলখিল করে হেসে উঠে। বাবু ওর মুখ চেপে ধরে। আলাপী থেমে যায়। এরপর হাসতে হাসতে বালিশে লুটিয়ে পরে। এই বালিশে জাহানারা রাঁধুনী গত বছর মাথা রেখেছিল। এবছর আলাপী। আলাপী জাহানারা রাঁধুনীর মেয়ে।

সেদিন সারারাত ঘুমুতে পারিনি। মনে হয়েছে, একবারের জন্য যদি কথা বলতে পারতাম। একবারের জন্যে যদি বলতে পারতাম-এ ঘোর অন্যায় বাবু! এ পাপ! একবারের জন্যে যদি আলাপী’কে বলতে পারতাম- মায়ের বালিশে ঘুমাস হারামজাদী! কিন্তু হায়! মানুষের ভাষা কাঠের জন্যে নয়। আমি কথা বলতে পারি না! বোবা! এটা যেনেও আমার জিহ্বা কথা বলার জন্যে ছটফট করতে থাকে! আমি দেখি ....তৈবর আমার মতই বোবা হয়ে বসে। ইচ্ছে করে তৈবুরকে বলি- তুমি মানুষ না মূর্তি? কথা জানো, তুমি চুপ কেন ? জাহানারা তুমি না একই গাঁয়ে থাকো! তুমি সব জানো। কিছু তো বল! কিন্তু কিছুই বলতে পারি না! আমার মুখে মানুষের ভাষা নেই! মানুষের ভাষা কাঠের থাকতে নেই।

ভোর রাতে বালিশ ছেড়ে বেড়িয়ে আসে আলাপী।

দাঁড়া আলাপী।

আমি আঁতকে উঠি। একি? তৈবুর মাঝি কথা বলছে! বল তৈবর, বল। আমার হয়ে দুটো কথা তুমি ওকে বল।

মিথ্যা বললি তুই? তোর আম্মা অসুস্থ?

হ বললাম। তাতে আপনের কি?

আমার কি!

হ হ আপনের কি?

কিছুনা! আমার কিছুনা! লাশ পাওয়া গেল না ?

রাক্ষুসের পেটে গেলে কি পাওয়া যায় কাউরে?


এইটুকু বলে আলাপী চাপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কাঁদু কাঁদু স্বরে বলে।


‘যা হইছে। ভালো হইছে। বিধবা মানুষ পেট নিয়া করবে কি? আশপাশের লোক জানেনা। রটারটির আগে ঝাঁপ দিছে, ভালো করছে।’

একটানে কথা গুলো বলে তরতর করে চলে যায় আলাপী। তৈবরের চোখ থেকে ঝরঝর জল গড়িয়ে পড়ে। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয় আসে। পাঁজর ভাঙ্গার শব্দ পাই। টের পাই, নাকের কাছে একটি লাশ এসে ভিড়েছে। ঁেঠাটের কাছে তার চোখ। সেই সুরমা আঁকা চোখ কিনা বুঝিনা। কারন চোখ দুটো গেছে মাছের পেটে। সেই একই ঘোমটা কিনা জানীনা! কারন শাড়িটি গেছে ভেসে ঢেউয়ের রেশে।

আমি আর কিছু জানিনা! তারপর মেয়ে মানুষের লাশ শুনলেই আমার দেখতে ইচ্ছে করে!



লেখক পরিচিতি
জয়শ্রী সরকার
বাড়ি নেত্রকোনায়। 

সংস্কৃতি কর্মী। 
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য।
পেশাগতভাবে উন্নয়ন কর্মী। 
গবেষক। গল্পকার। 

1 টি মন্তব্য:

  1. অনেক ভালো লাগলো গল্পটা। মন ছুয়ে গেছে। আশা করবো আরও লিখবেন।

    উত্তরমুছুন