রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

মালেকা পারভীনের গল্প মায়ের নতুন ছবি!!!

(পটভূমি: নিজের জীবনটাকে কখনো খোলা বই বানাবেনা, একসময় ভাবতো সায়রা।যদি লিখতেই হয় নিজের জীবনের কথা,মরে যাওয়ার আগে সময় সুযোগ হলে একটা ছকবাঁধা আত্মজীবনী লিখে গেলেই হবে।তবে কঠিন শর্ত আছে: ততদিনে বিখ্যাত,প্রখ্যাত,স্বনামধন্য, কিংবদন্তী, কালজয়ী জাতীয় একটা ওজনদার বিশেষণ অর্জন করতে হবে।কাজেই দিল্লী বহুত দূর!তবে যাত্রা যেহেতু শুরু হয়েছে, দূরাতিক্রম্য সেই গন্তব্য সামনে রেখে একাগ্র সাধনার পথচলা অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

কথাটা সায়রার মাথায় কোন এক সময় আসে যখন সে হঠাৎ ভাবতে শুরু করে খুব দ্রুত নাম-ডাক কিনে ফেলা কয়েকজন কবি-লেখকের কথা। কোন কারণ ছিল না। এমনি এমনিই সে ভাবলো যে সে কখনো নিজের পরিবারের গোপন কুঠুরির গুঢ় কাহিনী সবার সামনে উন্মুক্ত করে দেবেনা।যেমন দিয়েছেন অরুন্ধতী রায় তার ‘গড অব স্মল থিংস’ বইয়ে। যদিও সরাসরি নয়।তবে সাহিত্য-বোদ্ধারা তা খুঁজে ঘেঁটে বের করে ফেলেছেন।অথবা আরো আরো কেউ। হয়তো সংখ্যাটা অসংখ্য।

সায়রার ক্ষেত্রে এমনটা হলে সে খুব বিব্রত হয়ে পড়বে। অথবা যখন তার নিজের দেশের প্রতিষ্ঠিত হাতে গোনা কয়েকজনের কথা মনে হয় যারা অনেক সময়ই বলা যায়না (বিষয়টা তর্কসাপেক্ষ) এমন অনেক কথাও কোন রাখ-ঢাক না রেখেই অকপট বলে ফেলেছেন।সাহসী স্বীকারোক্তি বলে লোকের বাহবা কুড়িয়েছেন, অর্থও কামিয়েছেন বেশুমার।সেলিব্রেটি নামের ‘শ্যালো এন্ড সুপারফিশিয়াল’ এক তকমা লাগিয়ে নিয়েছেন গায়ে যা যেকোন মাত্রার সিরিয়াস সমালোচনার আঘাতে উড়ে যেতে পারে যেকোন সময়! কিন্ত্ত সেই তথাকথিত সস্তা নাম অর্জনের বিনিময়ে চিরদিনের জন্য লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন জন্মদাতা পিতা-মাতা অথবা কোন কোন নিকটজনদের।

সায়রার পক্ষে এমনটি করা সম্ভব নয় একেবারে।এটাকে তার এক ধরনের ইন্সটিংটিভ ইনহিবিশন বলা যেতে পারে।কিন্ত্ত তা নিয়ে সে মোটেও চিন্তিত নয়।বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ইন্সটিংঠিভ ইনহিবিশন তার আত্ম-সম্মানবোধের ওপর একটা আলাদা মাহাত্ম্য আরোপ করে।এইটা তার বিশ্বাস।তো যাক সে কথা।

সায়রা ভাবছিল, লেখক হলেই কি সব কথা বলে ফেলতে হয়? সরাসরি, কোন রকম আড়ালের আঁচলে না মুড়ে, কোন দ্বিধার ধার না ধেরে? নাকি লেখকের কাজই কেবল সবকিছু বলে যাওয়া?ভাবাবেগের বা লোক-লজ্জার তোয়াক্কা না করে, নির্মম বাস্তবতার সবরকম ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে রুঢ় বাস্তবতাকেই নিের্মাহ দৃষ্টির ছাঁচে ফেলে ঘটনা যেমন ঠিক তেমনভাবেই তা উপস্থাপন করা।

এসব নানাবিধ সাহিত্যিক ভাবনায় ঘুরপাক খেতে খেতে সায়রার কখনো কখনো সমারসেট মমের ‘অব হিউম্যান বন্ডেজ’ এর কথা মনে হয়, অথবা ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ বা ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন’ এর কথা; কখনোবা শাের্লাত ব্রন্তের ‘জেন আয়ার’ অথবা এমিলি ব্রন্তের ‘উদারিং হাইটস’ উদাহরণ হিসেবে মনের জানালায় উঁকি দিয়ে যায়; তাকে বিহবল করে তোলে।এদের মতো করেও তো নিজের জীবনের কাহিনি বলবার চেষ্টা করা যায়।কী অসাধারণ একেকজনের জীবনের বয়ান!স্বতন্ত্র শৈল্পিক দক্ষতার আঁচড়ে চিরন্তন আবেদন নির্মাণ!

যাকগে, সায়রার উর্বর মাথায় এসব চিন্তা বায়োস্কোপের দৃশ্যমালার সাজে একটার পর একটা আসতে-যেতে থাকে যখন সে তার নিজের জীবনের আয়নায় সতর্ক চোখ রাখে।আর দশটা সাধারণ মেয়ের থেকে তার জীবনটা কত আলাদা(তাকে অবশ্য অনেকেই অসাধারণ বা ব্যতিক্রম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পছন্দ করে-আন্তরিক শুভেচ্ছা হিসেবে অথবা ঠোঁট-টেপা তির্যক সম্ভাষণ! অবশ্য কখনোই বক্তার প্রকৃত সুর ধরে উঠতে সায়রার কোন সমস্যা হয়না।কারণ ওই যে, সে যে অসাধারণ বা ব্যতিক্রম!)!এমনকি পেটে ধারণ না করেও সন্তানের মা বনে যাবার আবেগঘন গল্প!প্রতিদিন একটু একটু করে সেই সন্তানকে চিনতে থাকা, তার মনের আকাশটা ছুঁয়ে আসা, তাকে বড় হতে দেখা, ক্রমশ তার বদলে যাওয়ার রকম দেখা!)

--------------------------------------------------------------------------------------------

আজও জনাব মুস্তাকিম বিল্লাহ তেমন কোন কথা বললেননা।যদিও অনেকটা সময় তারা, তিনি এবং সায়রা, পাশাপাশি বসে থাকলেন।মহাখালীর কাছে তন্দুরি নামের রেস্টুরেন্টটায়।ভেতরের দিকে কোনার একটা টেবিলে কিছু নান রুটি আর তন্দুরি চিকেনের অর্ডার দিয়ে।মুস্তাকিম সাহেবের কাছ থেকে কথা শুরু করার কোন ইঙ্গিত না পেয়ে সায়রা বেশ কয়েকবার উশখুশ করে উঠলো।কিন্ত্ত পরিস্থিতির কোন হেরফের হলোনা।

এর মাঝখানে দুবার মুস্তাকিম সাহেবের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।একটা তার অফিস থেকে,অন্যটা তার ছোট মেয়ের কাছ থেকে।সায়রার অনুমান শক্তি ভালো।অনুচ্চ স্বরে দুবারই তিনি ফোনকারিকে জানিয়ে দিলেন,ব্যস্ত আছেন;পরে কথা হবে।

কিন্ত্ত সায়রার ভেতরে একটা অসহনীয় কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে।ঘুরে ঘুরে গলা পর্যন্ত এসে তার নিশ্বাসটাকে আটকে দিতে চাইছে।আজও তাহলে মুস্তাকিম বিল্লাহ ওই প্রসঙ্গটা তুলবেন না মনে হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে সায়রার এক সময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো।

‘মেয়েদের সাথে কথা হয়েছে?সেদিন বলেছিলেন,খুব তাড়াতাড়ি কথা বলে জানাবেন।বেশ কয়েকদিন তো হয়ে গেলো।আমি ভাবছিলাম, হয়তো এর মধ্যে কথা বলে ফেলছেন...’

মুস্তাকিম বিল্লাহ, আটচল্লিশ বছরের নিপাট ভদ্রলোক বিপত্নীক মানুষটা, এক অসহায় দৃষ্টিতে সায়রার দিকে তাকালেন।সায়রা বুঝে নিলো, আজও তিনি তাদের সম্পের্কর কথাটা বলতে পারেননি তার দু কন্যার কাছে।অথচ আজ প্রায় দেড় বছর হতে চললো তাদের পরিচয়, টেলিফোনে কথা বিনিময় আর কদাচিৎ দু-একবার দেখা-সাক্ষাৎ।

সেই অল্প কিছু সময়ের দেখা পাওয়ার জন্য কত নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে সায়রার অধীর অপেক্ষা করে থাকা!চোখের নীচে আঁধার জমে অমোচনীয় কাজলের রেখা টেনে রাখা আর সব কী কী যেন!পরিণত বয়সে প্রেমে পড়ার পরিণতি এই হয় তাহলে?

অথচ এতদিন পরেও মুস্তাকিম বিল্লাহ বিষয়টা তুলতেই পারলেননা কন্যাদের সামনে।জানিয়েছিলেন, মেয়েদের মতামত নিতে হবে।তাদের পছন্দ বা সিদ্ধান্তের ওপরই এই সম্পের্কর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। অবশ্য অন্য কোন ঘটনায়(সম্ভবত আত্মীয়-স্বজন/বন্ধু-বান্ধব এর কাছ থেকে আসা কিছু প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে)ওরা নাকি ইতিমধ্যে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ওদের কোন ‘মা’-এর দরকার নেই।নিজেদের দেখবার জন্য যথেষ্ট বড় হয়েছে।কেবল চার বছরের ভাইটা, মহিম যার নাম, সারাক্ষণ সারাবাড়ি ‘আম্মু’ নামের কাউকে খুঁজে বেড়ায় বলে যদি ওর জন্য একজন ভালো ‘মা’ পাওয়া যেতো!

কথায় কথায় সায়রা এগুলো শুনেছে।খুব আগ্রহ করে নিজের থেকে যে মুস্তাকিম সাহেব এসব বলেছেন এমন নয়।বারবার প্রশ্ন করে, ধৈর্য ধরে জানতে হয়েছে সায়রাকে এরকম কিছু নিতান্ত পারিবারিক তথ্য।এভাবে বলতে গিয়ে একদিন তিনি জানালেন, ছোট্ট মহিম বোনদের কাছে বলেছে, তার ক্লাসের বন্ধুরা তাদের আম্মুদের সাথে স্কুলে আসে; কিন্ত্ত তাকে কেন ড্রাইভার বা বড়াপুর সাথে যেতে হয়, ইত্যাদি।কথাগুলো শুনে সায়রার মনটা আর্দ্র হয়ে ওঠেঅদেখা বাচ্চাটার জন্য।আর বেশ কয়েকবার মনে করিয়ে দেবার পর অবশেষে একদিন তিনি ইমেইলে মহিমের দুতিনটা ছবি পাঠিয়ে দিলেন।অস্পষ্ট, ঝাপসা ছবিগুলোর ভেতর থেকে একটা মায়াভরা শিশুর মুখ কী যেন বলতে চায়!

যতবারই প্রসঙ্গ এসেছে, তার তিনটি সন্তানের, বিশেষ করে অবুঝ শিশুটির, সবটুকু দায়িত্ব নেবার অঙ্গীকার বারবার করেছে সায়রা। তারপরও কিছুতেই যেন মুস্তাকিম বিল্লাহ তেমন করে ভরসা পাচ্ছিলেননা।হয়তো চিরকালীন সামাজিক বাস্তবতা অথবা মৃত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা।কিছু একটা হবে।এসব তো কাউকে বলে দিতে হয়না।পুরো বিষয়টাই অনুভবের,অনুধাবনের।

কোন কোন সময় এমন হয়েছে যে, তার নিদারুন নিির্লপ্ততায় সায়রা ভেতরে ভেতরে চুপসে গেছে।হয়তো সে যা ভাবছে তা কখনোই হবার নয়।সায়রা ভালোবেসেছে মানুষটাকে,তার একাকিত্বটাকে, তার ভালোমানুষিটাকে।মানুষটার সাথে জড়িত সবকিছুকেই আপন করে নিতে চেয়েছে।নিজের মানসিক উদারতার পরিধিতে সবটুকু আস্থা সঁপে দিয়ে।কোন কিছুই মনের মতো নাও হতে পারে জাতীয় যাবতীয় আশঙ্কার উঠানে পা রেখে।

তার নিজেকে নিয়েও অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়েছে।নিজের ক্যারিয়ার, গোছানো সংসার, আপাত নির্ঝঞ্ঝাট সুখ-দুঃখমথিত আটপৌঢ়ে জীবন যাপন। অবশেষে হিসাবহীন দিন-রাত্রির জোয়ার-ভাটা পেরিয়ে, অনেক দুশ্চিন্তা আর ভাবনার সলতে পুড়িয়ে সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে: হলে এখানে এই মুস্তাকিম বিল্লাহর সাথেই; না হলে আর অন্য কোথাও অন্য কারো সাথে নয়।কেন সে নিজের সাথে এমন মরনপণসম গোঁ-ধরা জিদ করে বসলো তা আরেক দিনের জন্য তুলে রাখা গল্প!

তার হঠকারী সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে পরিবারের এক ভীষণ বাস্তববাদী সদস্য পরিষ্কার মুখের ওপর বলে দিলো,“তুমি একটা ঘোরের মধ্যে আছো। তাই এরকম ভাবছো। ঘোর কেটে গেলে দেখতে পাবে, জীবন কত জটিল এবং কুটিল!তিন সন্তানের এক বয়স্ক পুরুষকে তোমার মতো একটা ইয়াং মেয়ে বিয়ে করে সুখে সংসার করবে আমাদের সমাজ তা মেনে নেবার মতো এখনো অতটা উদার হয়নি।তাছাড়া,তোমার নিজের একটা ব্রাইট ফিউচার আছে।মানছি,ভদ্রলোক ভালো মানুষ,সুপুরুষ।অন্য অনেক ঝামেলাপূর্ণ পারিবারিক পরিস্থিতি ছাড়াও তাকে বিয়ে করলে একদিন তোমার নিজের সন্তান হবে। তখন আগের পক্ষের তিন-তিনটা ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তুমি সবকিছু কিভাবে সামলাবে, অ্যাডজাস্ট করবে?না,না,না, ব্যাপারটা যত সহজ ভাবছো, আসলে মোটেও তা নয়।যদি আমার মতামত জানতে চাও,আমি স্ট্রেইট না করে দিচ্ছি।বরং কয়েকদিন তার সাথে কথা বলোনা।প্রথমে একটু কষ্ট হবে।পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।কিন্ত্ত যে জীবনের স্বপ্ন তুমি দেখছো, সেখানে যে দুঃখ-যন্ত্রণা পাবে তার তুলনায় এখনকার এই কষ্ট অনেক কম।তুমি ভাবো,আরো সময় নিয়ে চিন্তা করো...।”

সায়রার নীরব উপস্থিতির সামনে তার সেই শুভাকাঙ্খী এক দমেই কথাগুলো বলেছিল।সে তেমন কিছু বলেনি।দু-একবার তার দৃঢ় সংকল্পের কথাটুকুই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উচ্চারণ করেছিল মাত্র।সে তো বরাবরই একরোখা জিদ্দী কিসিমের একটা মেয়ে!আঠাশ বছরের জীবনে যতগুলি ক্রান্তিকালের মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়েছে, সে সমস্ত সময়গুলিতে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেরপ্রত্যেকটিই তার একেক মাত্রার জিদ থেকে উদ্ভূত, উৎসাহিত!

মাঝে মাঝে গভীর রাতে টেলিফোনে কথা বলার সময় সায়রা বুঝতে পারে, মুস্তাকিম বিল্লাহর গলা ধরে এসেছে।তার হয়তো অনেক কিছু বলার আছে, মনের অশান্ত হ্রদের কিনার ছুঁয়ে আছড়ে পড়ছে নানা স্বপ্নের ঢেউ।কিন্ত্ত জড়তার জাল কেটে সেই স্বপ্নের গল্পগুলো তিনি সায়রার সাথে ভাগ করে নিতে পারছেননা। জীবনের নিদারুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন নিজের, কেবল নিজের, কথা চিন্তা করার সুযোগ নেই।বরং তা সচেতন সাবধানতায় একপাশে সরিয়ে রেখে তাকে হিসাব করতে হচ্ছে মা-মরা সন্তানগুলো কতুটুকু-কি পাবে,আদৌ কিছু পাবে কিনা।এই অনেকটা অসম সম্প ের্কর যোগফল বাবদ।অবাক মানব জনম,আশ্চর্য এই জীবনের যোগ-বিয়োগের সূত্রসমাধানের প্রচেষ্টা!

এর আগে একদিন মুস্তাকিম বিল্লাহর কিছু অস্পষ্ট, কিন্ত্ত সরাসরি, কথার ধাক্কায় সায়রার ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।কথাগুলি ছিল ভবিষ্যতে পরিবারে তার সম্ভাব্য অবস্থানকে ঘিরে। তার ছেলেমেয়েদের বিপরীতে।সে মুহূের্ত তার সেই শুভাকাঙ্খীর সতর্ক পরাম ের্শর কথা খুব মনে পড়ছিল। কী সত্যিসাবধানবাণীই না সে উচ্চারণ করেছিল!আদতেই এই সম্পর্ক কোন পূর্ণতার দিকে যাবে কিনা তা এরকম দোলাচলের সময়টাতে সায়রার স্বপ্ন-মদির চোখে সম্পূর্ণ ধরা দেয়না।যেখানে এত দ্বিধা, জড়তা আর সংকোচের সংকট!মাঝে মাঝে সে হাল ছেড়ে দেয়। হয়তো শেষ পর্যন্ত তিনি সবকিছু, পারিপাির্শ্বকতা এবং নিজের মন, মানিয়ে নিতে পারবেননা।

নিজের মন? কই, এখনো তো একবারও সরাসরি ‘না’ও করে দেননি।বরং, অল্প যে কদিন দেখা হয়েছে, সায়রার দিকে তাকানো তার ছলছল চোখের দৃষ্টি অথবা হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে বলা ঘোর-ধরানো কোন কথা-এসবই সায়রাকে কেবল তার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে সাজিয়ে তোলা ভালোবাসার বাগানটাকে শক্ত ভিতের ওপর গড়ে নিতে সাহস যুগিয়েছে। তা না হলে সে এমন স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস করতে পারে?

অথচ বেশির ভাগ সময় মুস্তাকিম বিল্লাহ সরাসরি কিছু বলতে চাননা। শুধু একই ধরনের কথা এদিক-ওদিক করে বলেন,সায়রাকে ফেরাতে চান তার অনিশ্চিত যাত্রা শুরুর প্লাটফর্ম থেকে।এমনকি অদ্ভূত, অগ্রহণযোগ্য নানা ধরনের মানসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি যেন তার আবেগের গভীরতাটুকুও যাচাই করে নিতে চেয়েছেন।কয়েকবার ভীষণভাবে মন দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ক্ষণগুলোতে সায়রার এমন নিদারণ উপলব্ধি হয়েছে।

“আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন।আমাকে আরো খানিকটা সময় দিন।নিজের সাথে বোঝাপড়াটা সেরে নিতে এই সময়টা আমার জন্য খুব জরুরি।আর একটা কথা যদিও আপনার শুনতে ভালো লাগেনা জানি, তারপরও বারবারবলে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।আমার বাচ্চারাই কিন্ত্ত আমার কাছে প্রায়োরিটি।একদিকে ওরা,ওদের হাসি-আনন্দ,অন্যদিকে আমার নিজের জীবন।আমার নিজের ব্যক্তিগত সুখের জন্য ওদেরকে আমি এতটুকুও কষ্ট দিতে রাজি নই।এই বিষয়ের সাথে আমি কখনো কোনভাবেই আপোষ করতে পারবো না।স্যরি,আপনাকে আঘাত দিয়ে কথা বলার জন্য।কিন্ত্ত এভাবে বলা ছাড়াআমার আর কোন উপায়ও নেই। আমার জন্য আপনার নিখাদ ভালোবাসার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে,শ্রদ্ধাবোধ আছে।আগে বলিনি, আজ না হয় বলেই ফেলি, আমিও আপনাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি।আপনাকে না ভালোবেসে পারা যায়না।কিন্ত্ত এ বয়সে এসে নিজের সুখের চেয়ে সন্তানদের সুখটাই এখন আমার কাছে মুখ্য। না হয় আরেকবার সিরিয়াসলি ভেবে দেখুন, সত্যি সত্যিই আমার এই কঠিন জীবনের সাথে আপনি জড়াবেন কিনা।তাছাড়া, আপনার সামনে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি!হয়তো এখন যেমন করে আমাকে চাইছেন, পরে কাছ থেকে সবকিছু দেখেশুনে আর তেমনভালো নাও লাগতে পারে!মোহভঙ্গ হওয়ার আগেই সবকিছু ভেবে নেওয়া দরকার না?”

তারপর একদিন সব মোহভঙ্গের আশঙ্কা বাক্সবন্দি করে মুস্তাকিম বিল্লাহর সংসারে সায়রার আগমন।শুভাগমন কিনা বলা যায়না।কারণ বড় মেয়েটা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।মৃত মায়ের কথা ভেবে অথবা এতদিনের শূন্যস্থানেএকজন অপরিচিত বহিরাগতের আবির্ভাবে।এই আবির্ভাব শঙ্কার না সম্ভাবনার সে হয়তো তার অল্প বয়সের কারণে বুঝে উঠতে পারেনা। ভরসার আশ্বাস নিয়ে সায়রা তাই তার পাশে গিয়ে বসে। কাঁধে আলতো করে হাত রাখেবন্ধুর মতো।নীরব স্প ের্শ আশ্বস্ত করতে চায়,“ভয় নেই।আমি নিশ্চয় অন্য অনেকের থেকে আলাদা।সময় এলে সেটা দেখতে পাবে।আমার মতো করে আমি থাকবো তোমাদের পাশে।”

ওদিকে,মিষ্টি মুখের মহিম, যার জন্যই নাকি শেষ পর্যন্ত মুস্তাকিম বিল্লাহ সায়রার পাণিগ্রহণ করলেন, তার কাছে সায়রার আকস্মিক হাজির হওয়াটা যেন আকাশের তারা থেকে ‘আম্মু’ হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসা!দাদার কাছে এভাবেই সে তার অনুভবটা প্রকাশ করেছে।

“দাদাভাই, দেখেছো, একটা আম্মু এসেছে আজকে আমাদের বাসায়?” নাতির কাছে নতুন মাকে উপস্থাপনের কৌশলটা এরকম ছিল দাদার।

“আম্মু কি তাহলে আকাশ থেকে নেমে আসলো?” নাতির সহজ সরল বিশ্বাসের কাছে ভ্রকুটিপূর্ণ দুনিয়ার আত্মসমর্পন!

সায়রার সাথে মহিমের মানসিক যোগাযোগটা ঘটে যায় নিমেষের দৃষ্টিবিনিময়ে।সায়রা বসেছিল বেডরুমের খাটের কিনার ঘেঁষে।মহিম ঘরে ঢুকতে গিয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের চোখাচোখি।তারপর সে সটান পেছন ফিরে চলে গেলো সরাসরি দাদার ঘরে।তাদের রুমে এই অপরিচিত মানুষটা কে? তারপর আকাশের তারা বাসায় নেমে আসার কাহিনীর শুরু।

মেয়েরা একসময় অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে।তাদের জড়তাহীন আচরণে, স্বতঃস্ফূর্ত সাবলীল উচ্চারণে।এরপর তারা তাদের গুরু দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়ে ওঠে।এবং এর অংশ হিসেবে ছোট্ট ভাইটাকে একটু ভড়কে দিতে,নতুন ‘আম্মু’কে সে কিভাবে গ্রহণ করেছে সেটা পরখ করতে তারা ছোটখাট একটি অভিনয়ের আশ্রয় নেয়। অবাক করা ব্যাপার হলো অভিনয় করতে গিয়ে তারা নিজেরাই বোকা হয়ে গেলো এবং ফলশ্রুতিতে নিজেদের ভেতরে অস্ফুট গুজগুজ করতে শুরু করলো।অভিনয়টা করবার পেছনে তাদের যুক্তি ছিলো, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভাইটার মনের অভাবটুকু কতখানি পূরণ হয়েছে, আদৌ হয়েছে কিনা, তা যাচাই করে দেখা।কারণ শুধু তার জন্যই তারা তাদের প্রিয় বাবাকে এরকম একটি অপ্রিয়,কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

অভিনয়ের শুরুতে দুই বোন প্রতিদিনের মতো ভাইটাকে আদর করে কাছে ডেকে নেয়। নানা বিষয়ে তাদের রুটিনমাফিক ভাব-বিনিময়,খুনসুটি চলতে থাকে। একসময় বড় বোন মহিমকে বলে,

“ভাইয়া, আমাদের নতুন আম্মুটাকে দেখেছো?”

“হুম, দেখেছি।”

“কিন্ত্ত এই আম্মুটা তো ছবির আম্মুর মতো দেখতে না।” দেয়ালে ঝোলানো তাদের পাঁচ জনের বাঁধানো গ্রুপ ছবিটা দেখিয়ে মহিমকে ধন্দের মধ্যে ফেলার চেষ্ট করে সে।

“ওহ হো, তোমরা বুঝছো না কেন? আম্মুটা তো চেহারা চেঞ্জ করে আসছে।তোমরা কুসুম সিরিয়ালে দেখো না, ওরা কেমন চেহারা চেঞ্জ করে আসে!এই আম্মুটাও ওরকম চেঞ্জ করে আসছে।তাই চেহারাটা অন্যরকম।আমাকে অনেক আদর করছে তো...”

ছোট্ট মানুষটা বোনদের কাছে আরো কী কী সব গল্প বলতে থাকে হঠাৎ করে পাওয়া নতুন আম্মুটাকে নিয়ে। আকাশের তারা থেকে যে ঝুপ করে তাদের ঘরে চলে এসেছে।অ্যালবামের ছবির আম্মুটা থেকে আলাদা একটা চেহারা নিয়ে।তবে চেহারা বদলে যাওয়া তেমন কোন বিষয় না মহিমের কাছে।কারণ সে দেখেছে, টিভিতে ওরকম দেখা যায়।তার শিশুমনের ওপর তাই এর কোন প্রভাব পড়েনা।

একটা নতুন পারিবারিক জীবনের প্রারম্ভে সবাই যখন খাবার টেবিলে একসাথে খেতে বসে, বড়বোন তখন মহিমের গল্পটা বলে।নতুন আম্মুকে তার নিষ্পাপ,নিেভর্জাল শিশু মন কী সহজ ব্যাখ্যায়,কী আন্তরিক বিশ্বাসে গ্রহণ করেছে,তা শুনে সবার চোখ ভিজে ওঠে।বিশেষ করে মুস্তাকিম বিল্লাহর।সেটা আড়াল করতে তিনি পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নেন।পাশের চেয়ারে বসা সায়রা তখন দারুণ সতর্কতায় মহিমের প্লেটে কৈ মাছের কাঁটা বেছে দিতে ব্যস্ত!

*******


1 টি মন্তব্য: