রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'র গল্প | অন্ধবাড়ি

- আর কতটা বাকি রে?

- এই তো আর একটু।

- আধঘন্টা ধরেই তো ‘আর একটু’ ‘আর একটু’ বলে যাচ্ছিস হারামজাদা! কখন আসবে সত্যি কথা বল।

- বেশি বাকি নেই। তুমি ঘ্যানঘ্যান থামাও। অত তাড়াহুড়ো করলে চলে!

- জ্ঞান দিস না! আমার তাড়া আছে। সময় ফুরিয়ে গেলে কী হবে?

- সারা রাত ধরে চাঁদ থাকবে মেসো। অত ভেবো না বলছি তো!

- উরেশশালা!

- কী হল!

- পায়ে একটা চোরকাঁটা ফুটল বোধহয়! দেখবি বাপ একবার! ডিমে ফুটেছে মনে হয়।

- ফুটলে ফুটবে! আর একটু বাকি আছে। একেবারে পৌঁছে তারপর দেখে নিচ্ছি দাঁড়াও টর্চ মেরে। এখন আর এই ঝোপঝাড়ের মধ্যে দাঁড়াব না।

- চল তাহলে। তাড়াতাড়ি চল। রক্ত বেরোচ্ছে মনে হয় অল্প। বুড়ো বয়স। বুঝলি না!

অজস্র ঝোপঝাড়, পুকুরঘাট, তার পাশের বুড়ো সজনে গাছ, বনঝাল গাছের জঙ্গল, মদ্দা তালগাছ, ছোট মাঠ পেরিয়ে এগোচ্ছে তারা। পূর্ণিমা এসে পড়েছে। চাঁদের গায়ে লেগে থাকা নরম ছানার মতো আলো ছিটকে ছিটকে এসে একদম মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির। পূর্ণিমা লেগেছে খানিকক্ষণ আগে। পঞ্জিকার একশো সাতাশ পাতায় অনেকটা এইভাবে লেখা- “পূর্ণিমা, দিবা ঘ ৬।০৬ মি:। শ্রবণানক্ষত্র রাত্রি ঘ ১১।২৫ মি:। প্রীতিযোগ দিবা ঘ ১০।১৮ মি:। ববকরণ”। এই সব গাছপালা এবং মাঝে মাঝে গাছপালাহীন হঠাৎ শূন্যতার তেতো-সোঁদা গন্ধকে একপাশে রেখে হেঁটে চলেছে তিনজনের দল। দলটির মধ্যে সবথেকে বয়স্ক মানুষটি অন্ধ। বহু পুরনো প্রায় মাকড়সার জাল হয়ে যাওয়া একটি কোট আর বারমুডা পরে রয়েছে সে। সেই জালের ভিতর দিয়ে মধ্যরাতের বাখোয়াজী কিছু অন্ধকার এবং পাতা-টাতা নিয়ে পাস করার সময় শোঁ করে একটা শব্দ করে দিয়ে যাচ্ছে। দলের দ্বিতীয় মানুষটির পরনে একটা লাল হাতকাটা ম্যাক্সি। চোখ দুটো শক্ত করে বাঁধা রয়েছে সাদা কাপড়ে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। দুর্বোধ্য চামড়ায় ডোবানো জটিলতর মুখের ভিতর থেকে মাঝে মাঝে হেসে উঠছে সে। এই দুজনের সঙ্গে চলেছে আরও একজন। সে রয়েছে মাঝখানে। ধবধবে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর গামছা পরা। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁটার আঘাতে গামছাটা কয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। এই মানুষটি দেখতে পায়। এই মানুষটি দেখতে পাচ্ছে।

অন্ধ মানুষটির নাম- বংশী কর। বয়স ষাটের কাছাকাছি। পেশা ছিল দুটো। মফসস্বলের এক সিনেমাহলের লাইটম্যান এবং বাড়িতে গ্রামের বাচ্চাদের বাংলা ও সংস্কৃত পড়ানো। ধারাপাত থেকে ‘সরস্বতী মহাভাগে’ অবধি ছিল তার বিস্তার। অ্যাজমার কারণে ‘বিদ্যাংদেহি নমোস্তুতে’-তে এসে খকখক শোনা যেত শুধু। রামায়ণ-মহাভারতও পড়াত গ্রামের ছেলেদের। বংশীর চোখে ছানি পড়েছিল অনেকদিনই। পয়সার অসুবিধার জন্য সেটার অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছিল না। পঞ্চাশ পেরোতে না পেরোতেই দুটো চোখ জুড়েই ছানি পড়ে গেল। ছোট চোখের উপর বেশ কয়েক বছর ধরে তৈরি হচ্ছিল মাছ ধরার জাল। সিনেমা হলের অন্ধকারে থাকার সময় সেই জাল হাওয়ায় নড়ে পতপত করে। জালটি যখন মশারির মতো হয়ে গেল তখনই সরকার থেকে গ্রামে গ্রামে লোক পাঠানো হল হেলথ ক্লিনিকে। চোখ দেখার ডাক্তার আসবে। ছানি থাকলে অপারেশন হবে পাঁচ টাকা দিয়ে কুপন করালেই। বেশ কয়েক বছর ধরে ছানি নিয়ে চলার পর অবশেষে এল সেই দিন। ছানি কাটাতে গেল বংশী। ফিরে এল চোখ দুটো হারিয়ে। চোখ হারানোর পর লাইটম্যানের কাজটা গেল। বংশীর বউ সরমা। বাড়ির কাজ টাজ করে। বরের শরীর খারাপ হলে মাঝে মাঝে নিজেই চলে যেত সিনেমাহলে লাইট মারতে। পার-ডে রোজগার। ওদের কোনও ছেলেপুলে ছিল না। বংশীর অন্ধত্ব আসার পর সরমা নিজের একটা সাদা শাড়ির পাড় ছিঁড়ে চোখ দুটো বেঁধে নিয়েছিল। যতদিন না স্বামীর চোখ ঠিক হচ্ছে ততদিন সেও আর কিছু দেখবে না। কোনও ছেলেপুলে ছিল না ওদের। তবু গ্রামের লোকের কাছে ওরা হয়ে গেল ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারী। ওদের নিয়ে ছড়া কাটা হল- রোদে পুড়ে শুষ্ক হল কাষ্ঠ / চোখ হারিয়ে বংশীবাবু একন ধেতোরাষ্টো। ‘ধেতোরাষ্টো’ বলার পর কয়েকবার তালি দিয়ে ‘হায় গো’ আছে।

অন্ধত্ব আসার পর অনেকবার চেষ্টা হয়েছিল তা সারানোর। সম্ভব হয়নি। অনেক ডাক্তার-বদ্যি করেও হয়নি কিছুই।

একটি ছেলে থাকত বংশী আর সরমার কাছে। ছেলেটিকে আট বছর বয়স থেকেই মানুষ করেছিল তারা। ছেলেটিকে ভালবেসেই বংশী নাম দিয়েছিল সঞ্জয়। সে পড়াশোনা করেছিল ক্লাস টেন অবধি। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কখনও বংশী কখনও বা সরমার সঙ্গে যেত সিনেমাহলে লাইটম্যানের কাজ করতে। এখন গ্রামের পাশের মফসস্বলের একটা মিষ্টির দোকানে কাজ করে। বড় চেহারা। মুখের উপর তেলতেলে হয়ে ঘাম জমলে একদম সিনেমার নায়কদের মত লাগে। বংশী বলত, এই ছেলে আমাদের অহংকার। অন্ধত্ব আসার পর বলত- যা আমি নিজে থেকে কিছুতেই দেখতে পাই না, তা দেখি সঞ্জয়ের চোখ দিয়ে।

তারা তিনজন প্রায় ঘন্টা দেড়েক ঝোপ-জঙ্গল পেরিয়ে অবশেষে এসে দাঁড়ায় ক্ষ্যাপাপুকুরের মাঠে। বিশাল এক মাঠ। টানা পড়ে আছে এই পৃথিবীর তলায় বুক-টুক ছড়িয়ে। মাঠের একপাশে বিশাল বড়ো তালগাছ। শেষপ্রান্তে ক্ষ্যাপাপুকুর। গ্রামের লোকজন এই পুকুরে স্নান করে। পুজো-আচ্চা হলে ঠাকুর ফেলে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ ভেসে ওঠে লাউয়ের ফাঁপা খোলের মতো করে।

মাঠের একপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে থাকে তারা। কেউ কথা বলছে না। তিনজনে শুধু ভস ভস বাতাস ছাড়ছে মুখ দিয়ে। বংশীর অ্যাজমার কষ্টের নি:শ্বাস পড়ছে। খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি দেখা যাচ্ছে। শিরা ওঠা আঙুলগুলো মাঝে মাঝে থাবড়া মারছে তলপেটের কাছটায়। গলার কাছে শ্লেষ্মা জমে বাতাস যাওয়া আসা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই ঘড়ঘড় করে হঠাৎ কথা শুরু হয়। একটানা। আমি কি মরে যাব সঞ্জয়, ওরে! বল তো! ড্যাংড্যাংড্যাং করে মরে যাব নাকি! অ্যাঁ! পায়ের কাঁটাটা এত জ্বালাচ্ছে কেন বল দিকি! একবার দেখে দে না হারামজাদা! বলে সে কাশতে আরম্ভ করে। ভীষণ সেই কাশি।

বংশীর গামছার কোটরে আটকানো জলের বোতল আর টর্চ। “আর কেশো না তুমি। ওহহ! এবার তো এমনিই মরে যাবে! আর চোখ ফিরে পেতে হবে না” বলতে বলতে বংশীর পা-এর ডিম ধরে মাঠে থেবড়ে বসে সঞ্জয়।

তুই চুপ কর মুখপোড়া! পূর্নিমার রাতে এ সব কী অলুক্ষুণে কথা! এতক্ষণে কথা বলে সরমা। সেও মাঠে থেবড়ে বসে পড়ে। “ আহ! এত বকছো কেন! ঠিক এগারোটা তেইশ বাজে এখন। যা করতে হবে মনে আছে তো”? সঞ্জয় বলে।

বংশী আর সরমা এই কথার কোনও জবাব না দিয়ে চুপচাপ মাঠে বসে থাকে পাশাপাশি। সকাল থেকে মাদুলি পরে আছে দুজনে। লাল ম্যাক্সি ছড়িয়ে ছিটিয়ে লেগে আছে ফুটিফাটা কোটের গায়ে। সরমার লিপস্টিক মুছে গেছে প্রায় সবটাই। হাঁটতে হাঁটতে খেয়ে ফেলেছে।

সঞ্জয়ই নিয়ে এসেছিল দুর্গা মাহাতোকে। ওদের বাড়িতে। মাহাতো খুব বড় তান্ত্রিক। জিভটা কী মাখিয়ে কালো করে রাখে। ভয়ঙ্কর দেখায়। সে সব দেখে টেখে বলেছিল, চোখ ফিরে পাওয়া যাবে। তার জন্য আসছে পূর্ণিমায় যেতে হবে গাঁয়ের শেষপ্রান্তের ক্ষ্যাপাপুকুর মাঠে। সেখানে চাঁদ যখন একেবারে তালগাছের মাথায় মাথায় থাকবে তখন মাঠের যে কোনও জায়গায় বসে ওদের স্বামী এবং স্ত্রী দুজনকেই একসঙ্গে লক্ষ্মীর ধ্যান করতে হবে। “ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ সৃণিভির্য্যাম্যসৌম্যয়ো:...” ইত্যাদি। ওই সময়, ঠিক মন্ত্র শুরু হওয়ার পর পরই সঞ্জয়কে টর্চ ফেলতে হবে তালগাছের মাথার দিকে তাক করে। সে তারপর যা দেখবে, তার বিবরণ দিয়ে যাবে। যা চোখের সামনে ভেসে উঠবে তার, সেটারই বিবরণ দিয়ে যাবে সে। এইভাবে ঘন্টাখানেক চলার পরই দৃষ্টি ফিরে পাবে বংশী। তবে এক্ষেত্রে দুটো শর্ত আছে।

১) তিনজনকেই ওইদিন সকাল থেকে পরে থাকতে হবে মাহাতোর দেওয়া মন্ত্রপূত মাদুলি।

২) তিনজনকেই মাঠে আসতে হবে সবথেকে প্রিয় পোশাক পরে।

মাদুলি পরে ছিল তিনজনই। বারমুডা কোনওদিন পরেনি বংশী। কিন্তু পরার ইচ্ছা ছিল। সঞ্জয়ের বারমুডা পরে নিয়েছিল সে। তার বহু পুরনো একটা কোট ছিল। সেটাও প্রিয়। ট্রাঙ্ক থেকে ওটাও বের করতে হয়েছিল তার ফলে। সরমা কোনওদিন ম্যাক্সি পরেনি। লিপস্টিকও না। পাশের বাড়ির নতুন বউয়ের থেকে ধার করে এনেছে। রাত পোহালে ফেরত দেবে। সঞ্জয় তার রোজকার স্যান্ডো আর গামছাতেই স্বচ্ছন্দ।

শুরু করছি তাহলে মেসো। সঞ্জয় বলে।

হ্যাঁ। আর দেরি করিসনি! বংশী নড়েচড়ে বসে।

সরমা এই সময় জল চায়। খেঁকিয়ে ওঠে বংশী। এখন না! একটু পরেই তো সব দেখতে পাবে। তখন খেও যত খুশি। এখন ওকে বাধা দিও না।

মন্ত্রপাঠ শুরু করে ধীরে ধীরে বাবু হয়ে বসে বংশী আর সরমা একসঙ্গে।

টর্চের আলো তালগাছের মাথার দিকে তাক করে সঞ্জয়। মন্ত্র চলতে থাকে। জমাট অন্ধকার ছাড়া প্রথমে আর কিছু চোখে পড়ে না ওর। কিন্তু আস্তে আস্তে সামনেটা সিনেমার পর্দা হয়ে যায়। ও তখন দশ-পনেরো বছর আগে বংশী কিংবা সরমার হাত ধরে যাওয়া মফসস্বলের সিনেমা হলের হাফপ্যান্ট পরা লাইটম্যান। নাক দিয়ে শিকনি পড়ছে।

প্রথমদিকটা সঞ্জয় পুরো অবাক হয়ে যায়। ও কী গো মেসো! কত কী দেখা যাচ্ছে গো আকাশে! তালগাছের মগডাল থেকে দেখা যাচ্ছে! সব ছবি সরে সরে যাচ্ছে। ছটফট করছে। থেমে যাচ্ছে! ম্যাজিক হচ্ছে গো মেসো! ওর কথায় কেউ কোনও উত্তর দেয় না। মন্ত্র পড়াটুকু চলতে থাকে। সঞ্জয় দেখতে থাকে, নিজেকে দেখে, অপরকে দেখে, পৃথিবীকে দেখে। ছোটবেলায় স্কুলে পেনসিল চুরি করতে গিয়ে স্যারের কাছে মার খাচ্ছে, মেসো আর মাসিকে ঘরের দাওয়ায় বসে মুড়ি খেতে খেতে একের ওপর অন্যজনের উঠে যাওয়া দেখে, ক্ষ্যাপাপুকুর মাঠে অল্পবয়সী দুটো ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হাত ধরে মাঝরাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, ওদের গ্রাম থেকে অনেক দূরের শহর কলকাতার রাস্তা পাশে ফেলে যাওয়া বোল্ডারের ভিতর কুকুরকে শুইয়ে থাকতে দেখে ( তার পাশে দোকানের সাইনবোর্ড দেখেই শহরটা ‘কলকাতা’ বলে চিনতে পেরেছিল ), খুব ছোটবেলায় ওকে ডাস্টবিনে ফেলে দিল এক মধ্যবয়স্ক মহিলা- তারপর কোনদিকে যেন চলে গেল, পাহাড়ের উপরে একটামাত্র দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি- সেখানে ছোট ছোট গাছও হয়েছে আবার, নদীর জলের উপর ভাসতে ভাসতে চলে যাওয়া পাতার উপর পিঁপড়ে, হেরে যাওয়া মানুষ, জিতে যাওয়া মানুষ, রাস্তা পেরোনো মানুষ, রাস্তা পেরোতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে পিষে যাওয়া মানুষ, তারপর দেখে ওরা তিনজন জঙ্গল পেরিয়ে আসছে এই মাঠের দিকে, এসে বসল, একটি পিঁপড়েকে দেখে, পিঁপড়ের পেটের ভিতর দিয়ে আবার দেখতে পায় ঠিক প্রথম থেকে যা যা দেখতে আরম্ভ করেছিল তার সবকিছু। স্কুলে পেনসিল চুরি করতে গিয়ে স্যারের কাছে মার খাওয়া, মেসো আর মাসিকে ঘরের দাওয়ায় বসে... সঞ্জয় অবাক হয়ে দেখে ও এতক্ষণ যা যা দেখছিল, সে সবই আবার ফিরে আসছে। সে সব দৃশ্য চলে যাওয়ার পর আবার সে সবই ফিরে ফিরে আসছে। ফিরে ফিরে আসছে। বারবার। বারবার। ও আকাশের থেকে চোখ সরায়। ও মাটিতে চোখ রাখে। কিন্তু মাটি দেখতে পায় না। সেই একই সিনেমা ওর সামনে ক্রমাগত চলে যাচ্ছে। ও গাছের দিকে তাকায়, ও বংশী-সরমার দিকে তাকায়, ও তালগাছের দিকে তাকায়, ও নিজের দিকে তাকায়, কিন্তু কিছু দেখতে পায় না। স্রেফ ওই সিনেমাটুকু বাদে। ও শুনতে পায় বংশীর গলা। ও শুনতে পায় সরমার গলা। ভেঙে এসেছে মন্ত্র পড়ে পড়ে। আর আওয়াজ বেরোচ্ছেই না প্রায়। “কী হল রে! ওরে! কী হল! কিছু দেখতে পারছি না তো! এক কথাই তো বারবার বলে যাচ্ছিস বানচোত তুই! আর কিছু কি দেখতে পাচ্ছিস না! ঢপ মারছিস নাকি”! তীক্ষ্ণ গালাগালি দিতে দিতে খেঁকিয়ে ওঠে বংশী বুড়ো। ধেতোরাস্টো। এক সময় কেঁদে ফেলে সে। গলাটা পাতলা হয়ে যায়। ওরে সঞ্জয় বল না বাপ সত্যি করে! একটু দেখতে চাই রে মরার আগে! একটু ঠিক করে টর্চ মেরে দ্যাখ না রে! ভালো করে নাড়িয়ে নাড়িয়ে। তুই-ই তো আমার চোখ বল। তুই তো আমার অহংকার... সঞ্জয় সব শুনতে পায়। কিন্তু জবাব দেয় না। দিতে পারে না। অন্ধত্ব মানে তো শুধু না দেখতে পাওয়া নয়। দেখাটুকু সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়াও। ওর দেখা আটকে গেছে। ও আর এর বাইরে কিছু দেখতে পারছে না। ও আর এর বাইরে কিছু দেখতে পারবে না। খুব ফিসফিস করে, যাতে কেউ শুনতে না পায় তেমনভাবে বংশীর কথার জবাব দেয় সে অনেকক্ষণ বাদে- সঞ্জয় না বাপ! আমি সঞ্জয় না!

ওর কথা শুনতে পায় না কেউ। তেষ্টা এবং হতাশায় অবোধ জানোয়ারের মতো উল্টে পা ছড়িয়ে মাঠে পড়ে থাকে বুড়ো-বুড়ি। হতাশ মৌন আশ্রয় করে পড়ে থাকে তারা। একে অপরের কাছাকাছি এসে গাদাগাদি করে পড়ে থাকে। ম্যাড়ম্যাড়ে টর্চের আলো বিচ্ছিরি হেসে উপরে উঠে যায়। অনেকক্ষণ বাদে, অনেক অনেকজন্ম বাদে বংশী একবার চেঁচিয়ে ওঠে। আমাকে তবে একটা কিছু খেতে দে রে বাপ! খেয়ে মরি!

আর কথা থাকে না।

প্রাচীন জ্যামিতিক চিহ্নের মতো একটি স্যাঁতস্যাঁতে এবং বিস্ময়কর অন্ধকার তারপর ধীরে জন্ম নেয় এই তিনজন মানুষকে ঘিরে। চাঁদ ফুটে থাকে তালগাছের মাথায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন