রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : ফুড়ুৎ ডানায় মেঘরঙ

শেষ মিনিট অবধি তারা কখনও কেউ কাউকে কিছুতেই বলেনা যে পাঁজরার ভেতরের যন্তরটার লাবডুব বিট্‌ টাল খাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে কিছু খুঁজছে। চোখের পাতা ধোঁয়ার জালে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যাচ্ছে। বলে বড়ো জোর এটুকুনিই,

- আঃ ক’দিন ধরে চোখটা জ্বালাচ্ছে। পাওয়ার চেক করাতে হবে আবারও। কাল অফিস-ফেরত ঘুরে আসব ভাবছি। গচ্চার আর শেষ নেই। তোর গোছানো কমপ্লিট্‌? লাস্ট মোমেন্টে যা করতে থাকিস!


- ওঃ, প্লিজ মা। পেছনে পড়ে থেকো না। একই প্রশ্ন আর ক’বার করবে? দুচারটে জিনিস পড়ে থাকলে থাকবে।

- তাতো বলবিই। কিনে কিনে পাহাড় করিস... কত যে টাকা নষ্ট করিস।

- সব সময়ে তানা দিওনা। টাকা নষ্ট, টাকা নষ্ট! বাতিক হয়েছে তোমার। যা কিনি সব ইউজ করি, বুঝেছ?

- করলেই ভালো। নিজের পয়সা, নিজের রোজগার। যাই হোক, গুছিয়ে নাও। তুই রওনা হলে কাল বা পরশু দিম্মার ওখানে যাব।

- হুঁ, ভালো তো, যেও।

এগুলো অবান্তর কথার খেলা। কিছু একটা বলতে হবে বলে বলা। আসলটা বুঝতে না দেওয়া। এগুলো পাশ কাটানো। ওরা ধীরা আর মধুরা। ক’দিনের ছুটির ইতি। প্রত্যেক শনিবারের পরে অবধারিত রোববার আসবেই। বদল হয়না। সেই সকাল থেকে ধীরা পুবের ব্যালকনিতে বসে থাকে সামনে কাগজ সামনে বিছিয়ে, যতক্ষণ রোদ। অসমান অক্ষরগুলো নাচতে নাচতে লাইনকে লাইন ঢেউ হয়ে যায়। মোদী-মমতা-কেজরিওয়াল-রাজনাথ। সানি লিওঁ-রনভীর সিং-দীপিকা-বচ্চন। পিট্টু লোম ফুলিয়ে পায়ের কাছে ঝিমোতে থাকে।

জানিস, সকালের রোদ্দুর আর খালি চেয়ার বলছিল, হ্যাঁগা তোমার কথা-বলা পাখিটা কই? ওই যে তোমার সই? আলুঝালু পাগলিটা বেলা দশটায় ঘুম ভেঙে আধখোলা চোখে গালে চুম দিয়ে বলবে, আজ কি ব্রেকফাস্ট মা? মুখে ব্রাশ ঢুকিয়ে একগাদা ফেনা নিয়েও বকবকানি। টিভিতে গাঁকগাঁক করে মাস্টার-শেফের পুরনো এপিসোড।

- ম, ম, এট বনাব অজ? চও...

- ধুর, মুখ ধো তো। ওসব কন্টিনেন্টাল ডিশ বানাতে অনেক ঝঞ্ঝাট। যা বানিয়েছি খেয়ে নে।

ব্রেকফাস্টের থালা হাতে তিনলাফে ব্যালকনির চেয়ারে। দু’পায়ের ওপরে ছড়ানো নিউজপেপার, এপাতা ওপাতা, নিমিষে শেষ।

- ওহ, কচুরি! গ্রেট... হাত এঁঠো, পাতাটা উলটে দাওনা। আমার হচ্ছে সুপার-ফাস্ট পেপার রিডিং। অত খুঁটিয়ে পড়ার টাইম কই? হাতের বাটিতে কিগো তোমার?

- ওই যে হেয়ার-প্যাকটা মাখাব তোকে। যা চুল উঠছে তোর। এই, কী নোংরামো! আমার গায়ে ফেলছিস কেন? এহ্‌ মাথা খালি হয়ে গেল যে রে।

- দাঁড়াও দাঁড়াও আগে শান্তিতে খাওয়াটা শেষ করতে দাও। সব একসঙ্গে। এত হড়বড়াও কেন? ওই রাবিশ মাখব বলছি না তা’লে। এত চুল উঠছে কেন বলোত?

- বড়ো অসুখের পরে এরকম চুল ওঠে। সুস্মিকে দেখিস না?

- টাকলি হয়ে যাব নাকি?

- যেতেও পারিস।।

- হ্যাঁ, তুমি তো সেটা চাইবেই। খালি নেগেটিভ। নিজের অনেক আছে কি না!

- আরেঃ! আর গজাবে না বলেছি নাকি? মেখে নে, অন্তত ঘন্টাদুই রাখতে হবে কিন্তু। বিকেলে যাতো, চুলগুলো ছেঁটে আয়।

- এমা, কত কষ্টে লম্বা করেছিলাম... কিন্তু লাভ হবে কিছু? ওককে, যাব কাল। তুমিও চলো, গোঁফটা থ্রেডিং করে আসবে। কী বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে মা। কতবার বলি আপার-লিপ্‌ করে নাও, ক্লিন লাগবে।

- যা তো, জ্বালাস না। নিজেরটা ঠিক কর্‌। গোঁফ থাকুক গোঁফের জায়গায়।


অঢেল এই দুপুরে ধীরা স্রেফ চালেডালে মটরশুঁটিতে গলাভাত। তারপরে আধশোয়া। পাতলা লেপ দিয়ে ঢাকা পা, কোমর। বিছানার অন্যদিক বেজায় খালি, বিলকুল ফাঁকা। চশমা মুছতে হচ্ছে বারবার। আলো কম! দূর, পাওয়ার চেক করিয়ে আসতে হবে। টক্কর টক্কর লুডোর ছক্কা কথা বলছেনা। আধপড়া কাগজ, না-পড়া দেশ আর সানন্দা আর সম্পূর্ণা, ফিল্মফেয়ার, পাশে ডাঁই হয়ে রোজকার মতো। এবারে খানিকটা মনোযোগ পেতে পারে ওরা, যদি অবশ্য মন বসে। তা, যদির কথা নদীতে বয়ে যায়। ইচ্ছেই করেনা।

- একদান খেলো মা, প্লিজ। আরে তুমি তো এমনিতেও হারবে। হে হে, এইতো এমনি লুডোতেও হেরে গেলে। সাপলুডো তোমার ফেভারিট না? হুশ করে ওঠো, নামো! দেখো এই সাপটাকে? খতরনাক... কী মোটা উঃ! হী-হী।

- এই ধেড়ে মেয়ে খাটের ওপরে উঠে দাঁড়িয়েছিস? হাঁটছিস? জানিস এটা কবেকার খাট? তোর জন্মের আগে... নিজেও সাতাশ হবি ক’দিন পরে।

- উফ, জানি। কতবার যে এক কথা বলো। ধেড়ে মেয়ে মানে কি, হ্যাঁ? সা-তা-শ? আঃ... আমার মোটে ছাব্বিশ বছর তিনমাস তেরোদিন মা। তুমি বললে যে আমাকে কুড়ি-একুশ দেখায়? আর নিজে কত? পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছ না!

- আসল তো আর কুড়ি বছর নয়। গরমকালে হাপ্পু পরিস বলে ওর’ম দেখায়। আর আমি খাটের ওপরে লাফাই নাকি? বোকার মতো কথা বলিস। মাথা খারাপ করিস না।

- অব কোর্স লাফাতেই পারো! চলো লাফাই। হী হী। ছাড়ো দেখি, চলো ফেলুদা দেখব ল্যাপিতে। হল-এ তো আর যাওয়া হচ্ছে না। কোন্‌টা দেখবে বলো। আর দেখবে কি? ঢুলুনি-বুড়ি দেখব এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়েছ। একটা সিনেমাও পুরো দেখতে পারো না।

- না ঘুমোবে না! তুই রাত ফুটো করে ল্যাপটপ খুলে চ্যাট করবি। সিনেমা দেখবি না কি আর কিছু, কি জানি! আলো পড়েনা চোখে?

- খিচিরখিচির করোনা তো! ওক্‌কে, রাত্তিরে আমি লিভিংরুমে একলা শোবখ’নে। তখন আবার বলতে এসোনা, মোটে ক’দিনের ছুটিতে এলি... আমার কাছে শুবি না? আর প্লিজ শোনো, আমি চ্যাট-ফ্যাট করিনা। অফিস প্রজেক্টের কাজ থাকে। ছুটি নিয়ে এসেছি তো কী! কম্যিউনিকেট করতে হয়, ডেটা পাঠাতে হয়... প্রেশার কী বুঝবে। এবার এম-বি-এ এ্যাডমিশনের ট্রাই করছি, জানো না যেন?

- এ’কদিনের ভেতরে জামসেদপুরে গিয়ে চারদিন থাকার কি দরকার তোর? তোর বাবা ছুটি নেবে? নিত কোনোদিন?

- সে দেখা যাবে। তুমি প্লিজ ওই এক গল্প রিপিট করোনা। বাবা ছুটি নেবে কি না, আমি বুঝব। তোমার ব্যাপার তো না। কালও ফোন করেছিল যাবার জন্যে। আবার তো ফিরব। ফেরার টিকিট তো কলকাতা থেকেই আছে, না?

- হুঁ। ঘুমোই একটু। ছুটির দিনে দুপুরে একটু না শুলে হয়? তুইও ঘুমো না।

- এইত্তো তোমার শুরু হল। তাহলে আমি আসিই বা কেন, তুমি ছুটি নিয়েছই বা কেন? ঘরে বসে থাকব ঠাণ্ডায়, অন্ধকারে? চলো ডমিনোজ থেকে পিজ্জা খেয়ে আসি।

- এক্ষুণি ভাত খেলি! আর, অর্ডার দিলে ঘরেই দিয়ে যাবে।

- তাহলে মুভি দেখে আসি। ফেলুদা চলছে।

- বেলাশেষে দেখবি? কবে থেকে চলছে। খুব সুন্দর নাকি!

- না। ওসব টিপিক্যাল কেথ্রিজি-টাইপ মুভি তুমি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখে নিও। চলো বাজীরাও-মস্তানি দেখব। হিট হয়েছে। এরকম ছিল নাকি ইতিহাসে? সত্যি ছিল?

- কে জানে? চল যাবি তো।

- কিন্তু হলে বসে ঘুমোবে না মা। টিকিটের দাম অনেক। পয়সা জলে যাবে।

- চেষ্টা করব চোখ খুলে রাখার।

- ওঃ সত্যি মা... কী বোর তুমি। আচ্ছা চলো।

হলে বসে থেকে থেকে খোঁচা, ইন্টারভ্যালে পপকর্ণ বাকেট।

- এই নাও পপকর্ন। আবার ঘুমোচ্ছ? ভালো লাগছে না?

- না রে বাবা ঘুমোচ্ছি না। কী লম্বা সিনেমা রে বাবা। ধুমধারাক্কা...

- হুঁ, খুব লম্বা। এই হিস্ট্রী-বেসড মুভিগুলো এরকমই হয়। আমার তো ভালোই লাগছে।

- হিস্ট্রী না ছাতার মাথা। যত বানিয়ে বানিয়ে... রোম্যান্টিক গাঁজাগপ্পো।

- দেখছ মা, সমানে মেসেজ আসছে – তিনটে নিলে তিনটে ফ্রি। হী হী।

- আমারও আসছে। এত গরমজামা দিয়ে কি করব রে?

- চলো না দেখে আসি। ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে নাকি? স্যাঁতস্যাঁতে, ঠান্ডা। কলকাতায় রোদই ওঠেনা আদ্ধেকদিন।

- মা, বাবার জন্যে একটা নিয়ে নি। গিয়ে দিয়ে দেব।

- কী দরকার? যাকগে, যা ভালো বুঝিস কর।

- তুমি এখানে খোঁজ, কার্ডিগান, কুর্তি-টুর্তি। আমি ওয়েস্টার্ন সেকশনটা দেখে আসছি।

- কি রে হল, পছন্দ হল?

- নাঃ খুঁজছি। দুটো মোটামুটি পছন্দ করেছি। আরো চারখানা। হী হী। ওইক’টা তুমি খুঁজে নিয়ে নাও।

- ধ্যাৎ। জোর করে কী নেব? আর দামের হিসেব কি করে হবে রে?

- সবকটার ম্যাক্সিমাম প্রাইস ধরবে। তারপর তিনটে ফাউ...

- ওরে বাবা, অনেক হয়ে গেল যে রে। অত ক্যাশ এখন আনিনি। কার্ড থেকে দিতে হবে। দ্যাখ পছন্দ হয়েছে সবগুলো? তোদের ওখানে আর ঠান্ডা কই?

- হী হী... এই একটা ছাড়া বাকিগুলো বেশি পছন্দ হল না। তাও নিলাম। তোমার?

- আমিও জোর করে নিচ্ছি। কি করবি তাহলে? পরবি তো? ফেলে রাখিস না।

- তুমি কি করবে? নেবে? আমি এটা নিই খালি, আর বাবারটা। তুমি একটা নাও। নেবে? পছন্দ হয়েছিল যে গ্রে-টা?

- কী ভাবল মা ওরা, পাঁচটা সোয়েটার দলামোচা করে করে কাউন্টারে রেখে এলাম? হী হী।

- আড়াইঘন্টা ধিংতাধিতাং নাচালি। পায়ের অবস্থা এমনিতেই খারাপ।

- ঠিক আছে, রান্না তো নেই। আজ পিজ্জা ডিনার। কাউন্টারের ছেলেটা কীর’ম গলে পড়ছিল দেখলে? স্টুপিড না? একগাদা এক্সট্রা -পাউচ দিয়ে দিল। দেখতে বেশ স্মার্ট আছে।

- সেতো তোকে দেখে। ড্যাবড্যাব করে দেখছিল।

- জানি তো। এরকম করে বোকাগুলোকে কাজে লাগাতে হয়, বুঝেছ? তুমি কিছু নিলে না !

- পছন্দই হল না, কি করব?

- আচ্ছা এই নাও। ক্যাণ্ডেল-স্ট্যান্ড। সুন্দর না? বলো?

- ওমা, কখন নিলি? আর্চিজ থেকে? বাঃ।

- ওই যে তোমাকে দাঁড়াতে বলে গেলাম। জ্বালাবে কিন্তু মাঝে মাঝে, ব্যাটারি চেঞ্জ করবে ফুরিয়ে গেলে। কাল কিন্তু জু।


পিকনিক পার্টি, ভেণ্ডার হকার। নীল হলুদ সাদা গ্যাসবেলুন সিলিণ্ডারের শাসন ছেড়ে উড়ে পালাতে চাইছে। মেয়ের হাতে গোছাবাঁধা। লোকে তাকিয়ে আছে, বয়েই গেল।

- গ্যাসবেলুন নিচ্ছি মা। ও মা...

- হ্যাঁ, লোকে হাঁ করে দেখছে মামন। পয়সা দিয়েছিস?

- না দিয়ে দাও। আরেঃ আরেঃ... মা-আ...

- কী হল রে বাবা!

- হলুদটা উড়ে যাচ্ছে দেখো না-আ। আর তুমি শুধু বাঁদরের ফোটো তুলে যাচ্ছ! ম্যানিয়া! ওই যে দেখো গাছে গিয়ে আটকেছে। এব্বাবা। কাউকে পয়সা দিলে পেড়ে দেবে না? অন্তত লাঠির খোঁচা দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিত! আটকে গেছে। কী বাজে!

- আরেকটা কিনে নে। রাস্তার মধ্যে পাগলামি করিস না।

- আমার বেলুন দারুন লাগে মা। বাবা যখন চাইতাম বাবা কিনে দিত।

- জানি। ছোটোবেলা থেকেই তো।


ইজ্‌ ক্লান্তি ইকোয়েল ট্যু ঘুম? যদিও সব সময়ে মেলেনা। পাশাপাশি বালিশে মাথা, দুজনে মুখোমুখি। পায়ের ওপরে লেপ, বুক ঢাকা। ঘুমও ক্লান্ত। কথামালা গড়গড় করে, তার বন্ধু আর বান্ধবী, তাদের বান্ধবী আর বন্ধু। ফ্যালমেট যশপ্রীত লেসবি। নিজের মতো থাকে, খুব ইন্ট্রোভার্ট। অফিস ক্যাম্পাসে সিনিয়ার মিঃ নিহালনি গে। দারুণ স্মার্ট, জোভিয়াল, ফর্টি-প্লাস। ধীরা শুনে যায়। টুকটাক মন্তব্য ছাড়ে। বিয়ের বয়স, শরীর কী বলে, ধর্ষণ নামের বিভীষিকা। জুভেনাইল আইন, সেই আইনের ফাঁক। স্কুল লাইফে ক্লাসের ছেলেদের পছন্দ করত না। বিরক্ত করলে তেড়ে উঠত। বাড়ি এসে মুখ গোঁজ করে থাকত। ধীরা বুঝে যেত। কী করে তবু ক্লাস নাইনের শেষে তাকে একজন পটিয়েছিল। দুবছরের সিনিয়ার ছিল ছেলেটা। ফর্সা, রোগা, লম্বা। ধীরার এমনকি নামটাও মনে আছে। দুএকবার দেখেছিল। বছরদুই বোধহয় টিঁকেছিল সম্পর্ক। মেয়ে এখনও সিঙ্গল। কাউকে পাচ্ছেনা? ধীরার যে ইচ্ছে করে শাশুড়ি সাজতে।

- ওই ছেলেটার কি খবর মামন?

- কে?

- ওই যে, তুই নাইনে পড়তিস, তখন... মনে আছে তোর বাবার কী ঝাড় আমাকে!

- ও বিতনু? ধূর, কে জানে কোথায়? এখন বোধহয় ইউ-এস-এ থাকে।

- ভালো তো রে! যোগাযোগ হয়না?

- ওহ্‌ পারোও মা, খুব বাজে একটা ছেলে। ধান্দাবাজি করত।

- এবারে বিয়ে কর না মামন, কবে করবি? কেউ প্রপোজ করে নি তোকে?

- দূর্‌ বাবা। আমি নিজের জব নিয়ে ফেঁসে আছি। ডিস্টার্ব করো না তো।

- আচ্ছা করিসনা তা হলে। জানিস আমার কলীগ মণিদীপা এক্সট্রা-ম্যারিটালে জড়িয়েছে। ভদ্রলোক কিছুদিন আগে জয়েন করেছেন আমাদের ব্রাঞ্চে। অপরেশ পালচৌধুরী। কী ঝামেলা তাই নিয়ে। হাজব্যাণ্ড কুণাল বসু এসে অফিসে হাজির একদিন...

- তার পরে?

- আর কি? সব জানাজানি। ওর ছেলে ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। বরকে দেখতে যথেষ্ট হ্যাণ্ডসাম। বেশ ভালো কথাবার্তা। কেন যে এরকম করল ও? অনেক জলঘোলা, কেসটেস, হুমকি। ওই ভদ্রলোক মানে অপরেশ ছাড়ার পাত্র না, তার ফ্যামিলিতে অনেক ঘোটালা।

- ওঃ কীযে করো না তোমরা। তুমি প্লিজ অন্যের এসব ঝামেলায় জড়িও না। যেমন আছ থাক চুপচাপ।

- আমি নেই মামন এসবের ভেতরে। শুনি ব্যাস। মণিদীপা আমাকে বেশ পছন্দ করে। একলা বসে খুব কাঁদছিল একদিন, বলছিল একটু একটু। জানিসই তো, ছেলেদের এমনিতেও তেমন পছন্দ করিনা। তোর বাবার মেজাজ দেখতিস না? ইগো শুধু ইগো! সে চলে যাবার পর থেকে... এতবছর একাই কাটাচ্ছি।

- চ্যাপ্টার ওভার মা। ডোন্ট রিপিট। রিপিট করা স্বভাব তোমার। চেঁচাতেও কম না তখন। ক্যানক্যানে গলায় আমার ওপরে এখনও চেঁচাও। আর, আমাকে বিয়ে-বিয়ে করে ক্ষেপাও কেন তাহলে? প্লিজ মা। আমার কেউ নেই। আমিও আগের চেয়ে অনেক ম্যাচিওর। যখন ভালো পাব, জানাব। আর দেখো, বাবাও তো একাই থাকছে।

- তাহলে একা থাকা ভালো বলছিস?

- অব কোর্স। একটা লেসবিয়ান বান্ধবী ঢুঁড়ে নাও। ব্যাস। মনের কথা বলবে। চলো লুডো খেলি। স্ক্র্যাবল এবার খেলাই তো হলনা। খেলবে?

- না বাবা, এবার ঘুমোই। এইতো আমার লেসবিয়ান বান্ধবী... পাগলিটা। ঊফ, পা যা ব্যথা করছে রে মামন!

- আচ্ছা, শোও তাহলে। একটু ভলিনি লাগিয়ে দিই। তারপরে আমার পিঠটা একবার চুলকে দেবে? এবার দাওনি কিন্তু। এবার তো বিরিয়ানিও খাওয়ালে না তুমি?

- হল? আচ্ছা, কাল বানিয়ে দেব। ঘুমো। সোনা মেয়ে।

- হুঁ, পা ব্যথা না থাকলে দিও।


পিট্টুর পায়ের একটা নখ উপড়েছে। রক্ত বেরিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ডেটল তুলো ব্যাণ্ডেজ।

- ঈস ঈস, কী করে এরকম করলে পিট্টূসোনা? খুব ব্যথা করছে? এইতো, এইতো। এরকম ছটফট করলে কী করে ওষুধ লাগাব, বলো? তুমি কি আমার ওপরে রেগে গেছ? মা, ওকী রেগে গেছে? কালো কুকুরটাকে ড্রেন থেকে তুলে দিলাম বলে?

- রাগ করাটাই স্বাভাবিক। ওই নোংরা ঘেয়োটাকে ড্রেন থেকে তুললি, দুধ-পাঁউরুটি খাওয়ালি। তুলেছিস, ঠিকাছে, খেতে দেওয়ার কি ছিল আবার?

- ঈস কী ছোটো মা ওটা। এই ঠাণ্ডায় খেতে না পেলে মরেই যাবে হয়ত। বাড়িতে তুলে আনব মা? পিট্টুর সঙ্গে বড়ো হবে? আলোমাসি তো দেখাশোনা করেই।

- আর ঝামেলা বাড়াবি না বলছি মামন। তোর ইচ্ছে হলে দুটোকেই নিয়ে চলে যা...

- প্লিজ মা, ওকে দেখতে পেলে দিনে একবার একটু খেতে দিও অন্তত। আমি ওখানে কতগুলো কুকুরকে খাওয়াই জানো তুমি?

- ঠিকাছে। পিট্টুকে এত চটকাস, চিপে চিপে বিরক্ত করিস। ও পছন্দ করছে না লোমও উঠছে কত। ছাড়্‌ খেতে দিই ওকে।

- তোমার জ্বলন হয় না, আমি পিট্টুকে আদর করলে? আমিই কিন্তু ওকে এনেছিলাম মা। ও আমার কিন্তু আসলে।

- হ্যাঁ, তোমার যখন, তুমি নিয়ে পালাও। আমার ঘাড়ে চাপিয়ে গেছ কেন? বোঝার মতো? কোথাও যেতে হলে দশবার ভাবি।

- অব কোর্স আমার পিট্টু। আর বোঝা বললে তুমি ওকে? এত সুইট এত মিষ্টি। আবার বলো, ওকে খুব ভালোবাস? কীসব আবোলতালোল ডাকোও। ও তোমাকে হ্যাপি করে না?

- না, মোটেই না। নিয়ে যা দেখি ওকে। আমি বাঁচি। নিয়ে যা।

- নাঃ, এখানেই থাক। কত ভালো থাকে দেখো না? আমার এত স্ট্যাগার্ড স্কেজিউল।


এভাবেই ওরা। কেউ বলেনা, কেউ খোলে না। অথচ বুঝে যায়। তারপর মুম্বাইগামী উড়োজাহাজের উইণ্ডো-সীটের পাশে স্বর্ণগোধুলি মেঘমুলুকের বাষ্পে আবছা হয়ে যায়। মা তুমি আমাকে খুব মিস করছ? কলকাতার কনকনে ফ্ল্যাটটায় কাঁচের জানালা। নিচে বিকেলের মন-কেমন আলো। তাই মেখে বাস, অটো, ট্যাক্সিরা ভিজে ঝাপসা। এই তো এলি, দিনগুলো ফুড়ুৎ ডানায়...। আবার কবে? কবে আবার রে? কোলের ওপরে, হাতের মুঠিতে এলোমেলো টুকরোটাকরা আর পটভূমিকার বিপুল রোজনামচা। শান্ত পিট্টু তেমনিই গুটিয়ে বসে থাকে। সানশেড-এ পায়রা গুঁগুঁ। বোবা মুখ বোজা বইয়ের ভেতরে আঙুল। সামনে নিত্যকার লিকার চায়ের কাপ, দুটো বিস্কিট। কফি নয়।

মা তুমি না, কফিটা একদম বানাতে পারো না। কী বাজে! এরকম পাতলা হয় নাকি? আমি অনেক ভালো বানাই।

আরে, সেদিন দুধ ছিল না, তাই জল বেশি দিয়ে করেছিলাম।

দেখেছ নিজের দোষ? কিছুতেই ভুলগুলো স্বীকার করো না। আমার থেকে শিখে নিও, কী করে বানাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন