রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

মঈনুল আহসান সাবেরের গল্প : কবেজ লেঠেল

মেলেটারি এয়েছে।’

এই খবরটা নিয়ে আসে আজহার মণ্ডল।

তখন জুন মাস সবে আরম্ভ হয়েছে। যখন-তখন বৃষ্টি। বৃষ্টি মাথায় করেই গঞ্জে গিয়েছিল আজহার মণ্ডল। সে নিজের চোখে দেখে এসেছে। তার বর্ণনা ফুরোয় না। আকমল প্রধানের দাওয়ায় বসে সে এক গল্প ফেঁদে বসে। মিলিটারির চার হাত, এইটুকু সে বলা বাকি রাখে।

গ্রামের লোকজন অবশ্য জানতো মিলিটারি আসবে। ঢাকা শহরে মানুষ মরেছে অনেক, অন্যান্য শহরেও বাদ নেই, এ খবর তারা পেয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকেই এ গ্রামের দু'তিনটে জোয়ান ছেলে চলে গেছে। পাশের দেশে গিয়ে তারা নাকি টেনিং নেবে। তারপর মিলিটারিদের ধরে ধরে শেষ করে দেবে। এ নিয়ে আকমল প্রধান খুব রেগেছে, হে কইলেই হইলো, মেলেটারি মারবে। মারবে না কচু, তোমরা দেখবা মেলেটারি গ্রামটা জ্বালায়ে দেবে। কামড়া ভালা হইলো না। কেউ প্রতিবাদ করেনি সে কথার। তবে রমজান শেখ আশ্বাস দিয়েছে, মিলিটারিদের হাত থেকে গ্রাম সে বাঁচাবেই। শুনে কেউ কেউ আশ্বস্ত হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ লোক অবশ্য বুঝতে পারছে না, কার কথা তারা বিশ্বাস করবে।

আজহার মণ্ডল অনেকক্ষণ ধরে মিলিটারির বর্ণনা দেয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে লোকজন তা শোনে। গঞ্জে যখন এসেছে তখন এ গ্রামে এলো বলে। তখন কি হবে—এই নিয়ে লোকজন খুব চিন্তিত হয়। আকমল প্রধান নিজেও চিন্তিত। কিছু লোক ছুটে রমজান শেখের কাছে প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। কেউ কেউ বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। একজন জানায়, সবাই যেন নিজ নিজ প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখে। পালাতে হতে পারে, আশপাশের কিছু কিছু গ্রামে এমনটাই ঘটেছে।

শুধু কবেজকে মোটেও চিন্তিত মনে হয় না। সে বসেছে আকমল প্রধানের পেছনের বেঞ্চে। মন ভালো নেই তার। সেই প্রথম থেকে একটার পর একটা বিড়ি টানছে। কখনো সে আজহার মণ্ডলের বর্ণনা শুনেছে কখনো তাকিয়ে থেকেছে মানুষজন কিংবা গাছপালার দিকে। মার্চের প্রথমদিকে জেল ভেঙে পালিয়েছে সে। খুনটা করেছিল তার আগের বছরের মাঝামাঝি সময়ে। শুধু যে আকমল প্রধান উস্কে দিয়েছিল তা নয়, লোকটার ওপর ভীষণ রেগেও গিয়েছিল সে। হাটের দিন লোকটাকে পেয়েছিল। কবেজ কোনো সুযোগই দেয়নি, তাকে ঐ হাটভর্তি লোকের সামনেই সোজা জবাই করে ফেলেছিল।

তাই নিয়ে আকমল প্রধানের খুব রাগ--'' ব্যাডা বেয়াক্কেল, তুই কাম করলি একডা।"

করলাম, করণের কতা, পাইলাম আর করলাম - কবেজের সোজা জবাব ।

এহন ধরা তো পড়বি ?"

হয় পরমু, যদি ধরা দেই।"

ধরা অবশ্য পড়েই গিয়েছিল কবেজ। তবে কোনো তথ্যই ফাঁস করেনি। জানতো সে, যদি মামলা ওঠে আদালতে তৰে অসুবিধে নেই, কেউ তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে দাঁড়াবে না। আর যদি দাঁড়ায়ও কেউ, সামলাবে আকমল প্রধান। মামলা আদালতে ওঠার আগেই জেল ভেঙে পালালো সে। দিন কয়েক লুকিয়ে পালিয়ে ছিল। এখন আবার আগের মতই চলাফেলা করে। বোঝা হয়ে গেছে, এখন কেউ ঘাঁটাবে না তাকে।

আকমল প্রধানের দাওয়া খালি হয়ে যায় এক সময়। বিকেল পেরিয়ে গেছে। প্রধান ফিরলো কবেজের দিকে- "চ, ভেতরে যাই।”

ভেতরের ঘরে চৌকির ওপর পা তুলে বসে প্রধান - বড় চিন্তার কতা।

কবেজ আরেকটা বিড়ি ধরিয়েছে। মন ভালো নেই তার।

মাস তিনেক হল বলতে গেলে স্রেফ সে বসে আছে। আকমল প্রধান অবশ্য একটা প্রস্তাব রেখেছে, কবেজ সেটা ভাবছে। তাকে নিশ্চুপ দেখে প্রধান আবার মুখ খোলে --বুঝলি কবেজ বড় চিন্তার কতা।

‘কিয়ের চিন্তার কথা?

-'শুনলি না, মেলেটারি আইছে গঞ্জে'।

'শুনলাম।'

প্রধান একটু রাগে --'অমনে কতা কস ক্যান, মেলেটারি আইছে—'

'আইছে তো আমার কি হইচে।'

প্রধান খুব রাগে-- ' হোয়ায় বাঁশ দিয়ে দাঁড় করাইয়া রাখলে বুঝবি কি হইছে।’

কবেজ চুপ করে থাকলো।

‘তুই বেয়াকেল, তুই বোঝস না'— প্রধান গলা নামায়, এমন সুযোগ আর পাবি না'।
'কোন সুযোগের কতা কন ?'

'রমজান শেখরে শ্যাষ কইরা দে'।

এই প্রস্তাব কবেজের কাছে বেশ আগেই রেখেছে আকমল প্রধান। কবেজ হাঁ কিংবা না কিছুই বলেনি। খুন-টুন করতে ভালোই লাগে কবেজের। তবে বুদ্ধি নাশ হয় না তার। রমজান শেখও শক্ত খুঁটি। তাকে খুন করলে তার লোকজনও ছেড়ে কথা বলবে না।

কবেজ বললো, 'দেখি ভাইবা দেখি।'

প্রধান আবার রাগে-- 'কবেজ, তোর দাদা ছিল লেঠেল, পঞ্চাশজনরে সে একা সামলাইতো, তোর বাপ ছিল লেঠেল, সাত গেরামের লোকে তার নামে জানতো, তাগো বংশের লোক হইয়া তুই এ কি কতা কস, কবেজ লেঠেল, তুই বংশের নাম রাখতে পারবি না।’

কবেজ বললো, 'দেখি ভাইবা দেখি।'

'ভাবাভাবির কিছু নাই'। প্রধান আরো ঘনিষ্ট হয়, 'এইডা একটা সুযোগ। তুই দ্যাখ, এহন শেষ কইরা দে, লোকে ভাববো মুক্তি মারছে হেরে'।

'মুক্তি মারছে'?

- 'হ, মুক্তি তো যারা পাকিস্তান চায় তাগো মারবোই, এইডা এহন হগলেই জানে। কবেজ হাসে, তাইলে তো আপনেরেও মারতে পারে'।

একটু থমকায় প্রধান– “হ তা পারে, তয় চান্স দিমু না, হ্যারা আর ক'দিন, মেলেটারি সব ঠান্ডা কইরা দিব দেখিস। দ্যাশ স্বাধীন করবো, অততো সোজা, ছেলের হাতের মোয়া ?”

কবেজ আবার হাসে– 'আমি অইসব বুঝি না।’

প্রধান তার পিঠ চাপড়ে দিল– 'তোর বোঝনের দরকারও নাই। তুই চান্স একখান পাইছস, হালার পুত রমজানকে শ্যাষ কইরা দে। কবেজ, তুই এই একডা কাম কর বাপ। তোরে নগদ এক হাজার টাকা দিমু , জমি চাইলে জমি দিমু।'

কবেজ বললো— 'দেখি, ভাইবা দেখি'।

এই বলে সে ওঠে। আকমল প্রধান তাকে আবার অনুরোধ জানায়। কবেজ সামান্য হেসে রাস্তায় নামে।

বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ এখনো কালো। মাটির রাস্তায় আধ হাঁটু কাদা। কবেজ এগোতে এগোতে প্রধানের প্রস্তাবটা ভাবে। এক হাজার অনেক টাকা। চাপ দিলে প্রধান আরো কিছু ছাড়বে। কিংবা জমিও নিতে পারে কবেজ। আজকাল মাঝে মাঝে থিতু হয়ে বসতে মন চায়। অনেক তো হল। কিছু জমিজমা এখন হলে আখেরে কাজে দেবে। তবে রমজান শেখকে শেষ করাও কঠিন কাজ। আকমল প্রধানের চেয়ে ক্ষমতা তার কম নয়। যদি বুঝে ফেলে তার লোকজন খুনটা কবেজই করেছে তখন প্রধানও তাকে বাঁচাতে পারবে না। তবে প্রধান একটা কথা ঠিকই বলেছে, মুক্তিবাহিনীর ওপর দিয়ে কাজটা বোধহয় চালিয়ে দেয়া যায়। ইদানীং ঘন ঘন শোনা যাচ্ছে মুক্তিবাহিনীর কথা। মিলিটারিকে নাকি কোথাও কোথাও ভালো মার দিয়েছে তারা। আর যেখানেই মিলিটারি, মুক্তিবাহিনী নাকি সেখানেই। তবে দিন দুই অপেক্ষা করলেই রমজান শেখের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা যায়। মিলিটারি গঞ্জে যখন এখন এসেছে তখন এ গ্রামে তো আসবেই। মুক্তিবাহিনীও আসবে তখন। ব্যাস, তখন সুযোগ পেলেই রমজানের কল্লা সে নামিয়ে দেবে। এই রকম ভেবে সে বেশ পুলক বোধ করে। তবে একই সঙ্গে ব্যাপারটা সে তলিয়ে দেখতে চায়। এখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের একটা ব্যাপার থেকেই যাচ্ছে, সে বোঝে। পাকিস্তানের পক্ষে না গেলে মুক্তিবাহিনী রমজান শেখকে মেরেছে, এ ব্যাপারটা ধোপে টিকবে না। তা রমজান শেখ যাবে তো ওদিকে? যাবে, কবেজের মনে হয়। কদিন আগেও শেখকে সে খুব হম্বি তম্বি করতে দেখেছে। গ্রামের সবাইকে বলেছে, কেউ মুক্তিবাহিনীর পক্ষে গেলে তার ঘর জ্বলিয়ে দেবে। হাসে কবেজ, এগোতে এগোতে এক টুকরো জমির স্বপ্ন দেখে।

দুদিন পর বিরাট বহর নিয়ে পৌঁছে গেল পাক আর্মি, তারা এসে প্রাইমারী স্কুলের আধাপাকা বিল্ডিং-এ আস্তানা গাড়ে। গ্রামের লোকজন ঘরের কপাট দেয়। প্রথমে সাহস হয়নি কারোরই। ঘন্টাখানেক পর দু দুটো মিছিল বেরোয়। দুমিছিলেই পনেরো বিশজন করে লোক। এক মিছিলের নেতৃত্ব দেয় আকমল প্রধান, অন্যটির রমজান শেখ। পাকিস্তানী পতাকা হাতে জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে তারা স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

পাক আর্মির অফিসারটি অল্প বয়সী। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সে হাসি হাসি মুখে দু’মিছিলের লোকজনকে দেখে। তারপর হাত নেড়ে কাছে ডাকে তাদের। বর্তে যায় শেখ আর প্রধান। উঁচু গলায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে দু'জনে একই সঙ্গে এগোয়। অফিসারের সামনে এসে জোর গলায় সালাম জানায় ।

অফিসার হাত বাড়ায়।

'কি'?

'লিষ্ট দাও, লিষ্ট।’

'কিসের লিষ্ট'।

ধমক লাগালো অফিসার। বিধর্মীদের লিষ্ট চায় সে, যারা পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো করতে চায় তাদের লিষ্ট। শেখ আর প্রধান দু’জন দুজনের দিকে তাকায়। এ গ্রামে তো সে রকম কেউ নেই। শুনে অফিসার এমনভাবে তাদের দিকে তাকায় যে শেখ আর প্রধান, তখনই জানায়, হ্যাঁ হ্যাঁ  লিষ্ট তারা দেবে বৈ কি, এই এখনই। স্কুল রুমে বসে লিষ্ট তৈরি হল। গ্রামে দুতিনজন মুক্তিবাহিনীতে গেছে তাদের নাম দেয়া হ’ল। প্রধান আর শেখের যাদের অপছন্দ তাদের নামও তালিকায় ওঠে। একটি কমিটি গঠন হয়ে যায় তখন তখনই। পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তিরক্ষায় জন্যে পনেরো সদস্যের কমিটি। আকমল প্রধান সভাপতি, রমজান শেখ সেক্রেটারি। প্রধানের ইচ্ছে ছিল কবেজের নামও রাখে কমিটিতে। কিন্তু চোখ রাঙানিতে সে ইচ্ছে বাতিল হয়ে যায়।

পাক আর্মির ছোট একটি দল বেরিয়ে পড়ে। তাদের পথ চেনানোর দায়িত্ব শেখ আর প্রধানের। তাদের পেছনে পেছনে অবশ্য ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আরো কয়েকজন আছে। কবেজকেও সঙ্গে রেখেছে প্রধান।

মুক্তিবাহিনীতে গেছে যে তিনটি ছেলে তাদের ঘর জ্বলিয়ে দেওয়া হল। একজনের বুড়ো বাপকে বেয়নেটে গেঁথে ফেললো এক সৈন্য। আরেকজনের চৌদ্দ বছরের বোনকে ধরে সঙ্গে রাখলো, পরে তার ব্যবস্থা হবে। তালিকায় নাম আছে, এরকম আরো কয়েকজনকে ধরা হয়। বাকিদের অনেককেই পাওয়া গেল না, তারা পালিয়েছে। শেখ আর প্রধান দু’জনেই অবশ্য জোর গলায় বলে, পালিয়ে যাবে কোথায়, ধরা তাদের পড়তেই হবে।

প্রথম রাতে দাওয়াত দেওয়ার বিরল সৌভাগ্য জোটে রমজান শেখের। আকমল প্রধান তাতে বেশ মনঃক্ষুন্ন । তরুণ অফিসার তাকে অভয় দেয়, সে যখন এসেছে এবং থাকছে বেশকিছু দিন, তখন প্রধানের বাড়িও সে যাবে বৈকি।

রাতের খাওয়ার পর পাকবাহিনীর বড় অংশটি স্কুলে ফিরে যায়। তাদের স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে প্রধান আর কবেজ আবার ফিরে আসে শেখের বাড়ি। প্রধান জানে, অফিসার আর শেখকে একসঙ্গে বেশিক্ষণ থাকতে মোটেই ভালো কাজ হবে না। অফিসারটি অবশ্য নরম বিছানা পেয়ে শেখের বাড়ি থেকে যাওয়াই মনস্থ করে। তার সঙ্গে অবশ্য দুপুরে ধরা মেয়েটিও থাকছে। রমজান শেখই ধরে বেঁধে মেয়েটিকে পাঠায় অফিসারের ঘরে। প্রধান ঠিক করেছে, শেখ তার যত বড় শক্রই হোক, রাতটা সে এখানেই থাকছে। কবেজকেও সঙ্গে রাখলে সে। প্রধানের পাশাপাশি কবেজও জেগে থাকলো সারারাত এবং চিৎকারে মাঝে মাঝেই চমকে উঠলো।

পরদিন ভোরবেলা ছড়ি দোলাতে দোলাতে বের হয় অফিসার। বাইরে ঘুমহীন বসে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকায় একবার। শিস দিতে দিতে এগিয়ে যায় স্কুলঘরের দিকে। চোদ্দ বছরের মেয়েটি বের হয় না। মেয়েটি মারা গেছে।

দুপুরবেলা আবার কবেজকে নিয়ে পড়ে আকমল প্রধান।

'কি ঠিক করলে তুই' ?

কবেজ বলে– 'মাইয়াটারে মাইরা ফেলাইলো।'

'আরে ঐ কতা রাখ, দুই-একড়া তো মরবোই।'

'ঘর জ্বালায়া দিল যে খামোক ?'

আকমল প্রধান রাগে– 'দিল, কাফেরগো আমনই হইবে।'

'যাদের ধরছে তাদের কি করবো '?

'এত জাননের তোর কি দরকার – প্রধান গরম গলায় বলে- তুই এইসব বুঝ কি ?'

বিড়ি ধরায় রমজান, একটু মাথা চুলকোয়, বলে- 'না, বুঝি না'।

'তয় আমার কতা ভাইবা দেখ, জমি দিমু টাকা দিমু, এমুন– সুযোগ আর পাবি না'।

এক টুকরো জমি হাসে কবেজ, বলে- 'হ ভাবি।’

পরদিন দুপুরে গতকাল যাদের ধরা হয়েছে তাদের লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হল। অফিসারের আদেশে পুরো গ্রাম হাজির হয়েছে মাঠে। অফিসার ছোটখাট একটা বক্তৃতা দিল তাদের উদ্দেশে। রমজান শেখ সেটা বাংলায় বুঝিয়ে দেয় সবাইকে, তারপর অফিসার আঙ্গুলে পিস্তল ঘোরাতে ঘোরাতে এগোয়। এবং লাইন বাঁধা বন্দীদের একজন একজন করে গুলি করে মারে। তা দেখে দুচারজন মূৰ্ছা যায়। কবেজ ফিসফিস করে বলে– 'এইডা কি করে'? প্রধান তাকে ধমকায়--চুপ যা তুই। কবেজ চোখ ফিরিয়ে নেয়। পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে তাকায় একবার। তাকায় পাক অফিসারটির দিকে। তার পাশে দেখা যায় রমজান শেখকে। ইতোমধ্যে অফিসার আর অন্যদের জন্য আরো কয়েকটি মেয়ের ব্যবস্থা করেছে সে। এ তথ্য কবেজকে দিয়ে আকমল প্রধান খুব দুঃখ করে। কবেজ যদি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না করে তবে সব সুবিধা শেখই পাবে।

এভাবে আরো দু'দিন যায়। সৈন্যরা মাঠ কিংবা গোয়াল থেকে ইচ্ছেমতো গরু-মোষ ধরে এনে উৎসব করে। একবেলা গিয়ে পাশের গ্রামের কিছু ঘর জ্বলিয়ে দিয়ে আসে। তৃতীয় দিন সকালে একটি ছোট ঘটনা ঘটে। দুই সৈনিক যে কারণেই হোক নদীর পাড়ে গিয়েছিল। তাদের লাশ পাওয়া যায়। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। অফিসার লাশ দুটো দেখলো একপলক। গম্ভীর মুখে জানালো--যারা গুলি করেছে, তাদের যদি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ধরে আনা না হয় তবে এ গ্রামতো বটেই, আশপাশের পাঁচ-ছটা গ্রামও সে জ্বালিয়ে দেবে।

পুরো গ্রাম কবরখানা হয়ে গেল ঘটনার পরপর। আকমল প্রধান কবেজকে জিজ্ঞেস করে বোকার মত– 'এইবার কি হইবো রে'?

'ঠিকই ই তো করছে' – কবেজ সোজা উত্তর দেয়– 'মারবো নাতো আদর করবো?'

'আর হারামজাদা, গ্রাম যে জ্বালায়া দিব এহন, আর খুব ভালোমন্দের কতা কস, তুই এইসব বোঝস ?’

মাথা নাড়ে কবেজ– ‘না, বুঝি না, তয়—'

'তোর ঐ সব তয় ফয় বাদ দে, শোন তোরে কই, মুক্তিবাহিনী মারছে মেলেটারিরে, তুই মার রমজানরে, সবাই ভাববো তারেও মারছে মুক্তি। তোরে তো ঐ কতা আগেও কইছি। বোঝস না ব্যক্কল। -বোঝছোস?'

কবেজ হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে যায় বুঝছি -- 'সে বলে, দেহি, আরেকড়া দিন দেহি,-- কিন্তু আপনে যাই কন না কেন, মুক্তিবাহিনীর পোলারা কিন্তু মেলেটারি দুই ডারে জবর মার দিছে'। আকমল প্রধান হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে-- 'দেখ, শ্যাষে তোরে না ধরে মেলেটারী'।

গ্রামে আগুন দিতে হল না, লাইন দিয়ে গুলি চালাতেও হল না, তার আগেই মুক্তিবাহিনীর দুজন ধরা পড়ে গেল। এই কৃতিত্বের অধিকাংশ দাবিদার রমজান শেখ।

এ এলাকায় মুক্তিবাহিনী এলে কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে তা জানা ছিল শেখের। বিকেলের দিকে দেখা গেল শেখ একদল সৈন্য নিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছে। সম্ভাব্য দু'তিনটে জায়গায় খোঁজ নিয়েছে সে, ঠিকই পেয়ে গেছে এক জায়গায়। ইতোমধ্যে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। কোমরে দড়ি বাঁধা মুক্তিবাহিনীর দু’জনকে নিয়ে পাকবাহিনীর দলটি ফিরে আসে। তাদের আগে আগে রমজান শেখ।

স্কুলের সামনে দুটি শক্ত খুটি গেঁথে সেখানে মুক্তিবাহিনীর ছেলে দু’জনকে বেঁধে রাখা হল। পাকবাহিনীর যার ইচ্ছা হচ্ছে এসে তাদের চড় খাপ্পড় মেরে যাচ্ছে। বিচার অবশ্য পরে হবে, কাল সকালে, গ্রামবাসীদেরও চড়-থাপ্পড় মারার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা প্রায় কেউই ঘর থেকে বেরুচ্ছে না। নেহায়েত বেরোলে নয় যাদের, তারা গেছে স্কুল প্রাঙ্গণে। আকমল প্রধানও গেছে, কবেজকে সঙ্গে রেখেছে সে।

বোতল খুলে বসেছে তরুণ অফিসার, তাকে কখনো রাগি কখনো সন্তুষ্ট দেখাচ্ছে। রমজান শেখের আজ বড় খুশির দিন। অফিসারের পাশেই টুলে বসার অধিকার পেয়েছে সে। আকমল প্রধানকে অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। কবেজ দেখছে মুক্তিবাহিনীর ছেলে দুজনকে।

অবাক হচ্ছে সে। এরাতো বাচ্চা পোলা, মনে মনে বলে সে। এরা এমন শুয়োরের মতো দাঁতালো পাক মিলিটারি মেরেছে এই হিসেব সে মেলাতে পারে না। এই ঘন্টাখানেক সময়ের মধ্যেই ছেলে দুজনের ওপর ছোটখাটো ঝড় বয়ে গেছে। তাদের সামনেই পাক বাহিনীর এক সৈন্য গিয়ে ছেলে দু’জনকে বুট দিয়ে ইচ্ছেমতো পাড়িয়ে এলো। কিন্তু ওদের মুখ থেকে একটা আওয়াজও নাকি বের হলো দেখ। তাদের নাক-মুখ ফেটে গেছে চোখের কোন থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। ভিজে একসা, পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় বেকায়দায় পড়ে গেছে। তাও যেন সিংহের বাচ্চা। কবেজের মনে হয়, যেন ছাড়া পেলে ওরা এই এখনই আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে।

পরদিন সকালে বিচার বসে। হুকুম জারি হয়েছে গ্রামের কেউ থাকতে পারবে না ঘরে। বিচার দেখার জন্য সবাইকে হাজির হতে হবে মাঠে। ছেলে দু’জনকে রাখা হয়েছে মাঝখানে। সৈন্যরা ছেলে দু’জনকে গোল করে ঘিরে গ্রামের সবাইকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সৈন্যদের পাশাপাশি পাকিস্তানের অখণ্ডতা এবং আঞ্চলিক শান্তিরক্ষা কমিটি সমান সক্রিয়। রমজান শেখ আজ একটা নতুন পাঞ্জাবি পরেছে। মাথায়ও নতুন টুপি, সোনালি সূতোয় টুপিতে আরবি হরফে পাকিস্তান জিন্দাবাদ লেখা।

আকমল প্রধান কাল বিকেল থেকে দমে গেছে। গতকাল বাসায় ফেরার সময় কবেজকে সে আবার বলেছে--'কিরে ভাইবা দেখলি না'?

কবেজ বলেছে– 'ভাবতাছি।'

'তোর ভাবন আর ফুরাইবো না। মেলেটারি যহন চইলা যাইবো তহন দেখবি ক্ষমতা দিয়া গেছে শেখরে। তাহলে আমিও থাকুম না, ভুইও থাকবি না'।

কবেজ মাথা নেড়েছে-'-ক্ষ্যামতা তো হেরে দিবই,– দুধের বাচ্চ দুইডারে ধরায়া দিল'।
এখন এই সকালেও মন খারাপ আকমল প্রধানের। অফিসারের পাশে আরো কয়েকজনের সঙ্গে কবেজকে নিয়ে সেও দাঁড়িয়েছে বটে। কিন্তু শেখের পো যতটা কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে ততটা কাছে ঘেঁষতে সে পারছে না।

প্রথমে একটি বক্তৃতা দিল রমজান শেখ। ছোট বক্তৃতা গুছিয়ে সে কিছুই বলতে পারলো না। বারবার শুধু পাকবাহিনীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করলো আর হিন্দুস্তানী কাফেরদের সম্পর্কে উপস্থিত সবাইকে সাবধান করে দিল। প্রধান ফিসফিস করে কবেজকে বলেন, 'দেখলি দেখলি তুই ? হুনলি তার কতা ? আরে হেতো কইতে পারে না, আমারে দিলে দেখতি—'।

' বিচারপর্ব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। অফিসার প্রথমে তথ্য আদায়ের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু সারারাতের বিরামহীন অত্যাচারে প্রায়মৃত ছেলে দুজন মুখ খোলে না। অফিসার ইশারা করলে বিশাল শরীরের এক সৈন্য এগিয়ে আসে। একটি ছেলের হাত তুলে নেয়, এবং পরমুহুর্তে মট করে কনুইয়ের কাছে হাতটা ভেঙে ফেলে। সে শব্দ উপস্থিত সবাই শোনে। কিন্তু ছেলেটির মুখ থেকে ছোট্ট কোনো আওয়াজ তারা শোনে না। দ্বিতীয় ছেলেটির হাতও এভাবে ভেঙে ফেলা হয়। মৃদু গুঞ্জন ওঠে গ্রামবাসীর মধ্যে। অফিসার ফিরে তাকালে পরমুহূর্তে তারা পাথর হয়ে যায়।

অফিসার ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে আবার ছেলে দু'জনের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু তথ্য আদায়ের চেষ্টা আবারও ব্যর্থ হয়। বাঁশের সঙ্গে বাঁধা ছেলে দুজনের মুখ নুয়ে পড়েছে। কিন্তু তারা কোনো কথা বলে না। আরেক পশলা অত্যাচার বয়ে যায় তাদের ওপর দিয়ে।

তবু অফিসারের তৃতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সে ছেড়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখালে একটি ছেলে থুতু ছুড়ে দেয় তার দিকে। অপমানে ক্রুদ্ধ অফিসারটি সরে আসে এবং হাত ওঠায়। তিনজন বিশাল শরীরের সৈন্য এগোয়।

মিনিট দশেক পর ছেলে দু’জনকে আর চেনা যায় না। তাদের নাকচোখ কিছুই থাকে না, শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

রমজান শেখের মাথায় বুদ্ধি খেলেও বটে। সে অফিসারের কাছে এগিয়ে কি বোঝায়। হাসিমুখে রাজি হয়ে যায় অফিসার। পরমুহূর্তে দেখা যায় শেখের জনাকয়েক সাগরেদ ছুটছে। দুটো উচু বাঁশ জোগাড় করে আনা হয়। ছেলে দু’জনের অবশিষ্ট শরীর বাঁধা হয় বাঁশ দুটোয়। তারপর বাঁশ দুটো তুলে গেঁথে রাখা হয় মাটিতে। রমজান শেখ জানালো, এ ব্যবস্থা কাজে দেবে। মুক্তিবাহিনীর আর কেউ আশপাশের গ্রামে থাকলেও পরিণতির কথা ভেবে চম্পট দেবে। অফিসার রমজান শেখের পিঠ চাপড়ে দেয়।

দুপুরবেলা একথা উল্লেখ করে রাগে ফেটে পড়ে আকমল প্রধান। পারলে কবেজকে সেই খুন করে— 'কিচ্ছু হইবো না তোরে দিয়া। মান্দার পো— দেখলি তো তুই, নিজ চোখে দেখলি কেমনে অফিসারের পেয়ারের লোক হইয়া গেল শেখের পুত। এহন ?'

পরমুহুর্তে সে গলা নামায়-- 'কবেজ, এইডা শ্যাষ সুযোগ। এহনই ফালায়া দে শেখের পুতরে। কেউ বুঝতেই পারবে না তুই করছস। ভাববে মুক্তি তারে মাইরা রাইখা গেছে।’
কবেজ মাথা নাড়ে। 'হ তা ঠিক। দুইডা মুক্তিরে সে ধরাইয়া দিল।– আহারে, দুধের ছাওয়াল,— কি দুষ যে হ্যারা করছিল— '

'চুপ যা'- আকমল প্রধান গর্জে ওঠে--'চুপ যা তুই, হ্যারা দুষ করছে না কি করছে তার তুই কি বোঝস, এইডা পাকিস্তান ভাঙ্গনের ব্যাপার, জুই বোকাস ?'

কবেজ মাথা নাড়ে না, বুঝি না।'-তয় আমি একডা বিষয় বুঝি মুক্তিরা যা করতাছে, তা ঠিকই করতাছে, তারা তাগো কামরে খুব ভালোবাসে'।

আকমল প্রধান বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যায়—'কি কস তুই, এইডা তুই বুঝলি কেমনে ?'
হাসে কবেজ, 'ঠিক কাম না করলে অত অত্যাচার সয় কেমনে?'

এগিয়ে এসে তার মুখ চাপা দিল প্রধান, 'চুপ ব্যাক্কল, মইরা যাইবি এক্কেরে। –ভুইলা যা এইগুলান, —শুধু আমার কতাটা শোন বাপ, তোরে এক দিমুনা তোরে দুই হাজার ট্যাকা দিমু, তোরে জমি দিমু–ক কবেজ, কামটা করবি ?'

কবেজ হাসে। তার চোখ জ্বলজ্বল করে, বলে, 'দেখি, ভাইবা দেখি দুই হাজার ট্যাকা, জমি–'

মাঝরাতে এসে আকমল প্রধানের ঘুম ভাঙায় কবেজ লেঠেল। তার পোশাকে এখানে ওখানে রক্তের দাগ, দুচোখ লাল, চুল উস্কখুস্ক। সে সোজাসুজি প্রধানের দিকে তাকায়, 'দিছি, হেরে শ্যাষ কইরা দিছি' ?

'কারে, কারে '?

'দিছি, রমজান শেখরে শ্যাষ কইরা দিছি।"

'দিছস, প্রধানের গলা বুজে যায় আনন্দে–দিছস তুই কবেজ '?

'হ দিছি, জবাই কইরা ফ্যালাইছি'।

প্রধান আনন্দে লাফায় প্রায়, 'কি নিবি তুই কবেজ, ট্যাকা এহনই দেই, জমি লিখ্যা দেই' ?

হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে কবেজ। একটা বিড়ি বের করে ধরায়। আকমল প্রধানের দিকে ঘোরলাগা চোখে তাকায়। তারপর আশ্চর্য নির্লিপ্ত এবং শীতল গলায় বলে, 'কি দিবা তুমি ? আমিতো হেরে ট্যাকা বা জমির লাইগ্যা খুন করি নাই।'



লেখক পরিচিতি
মঈনুল আহসান সাবের

জন্ম ২৬শে মে, ঢাকা শহরে। পৈতৃক ভিটে একদা বরিশাল। এখন ভাগ হয়ে যাওয়ার পর পিরোজপুর। জন্ম, বড় হওয়া, লেখাপড়া, লেখালেখি, কর্ম ও সংসারজীবন এই এখানেই। ঢাকার নাগরিক দিকটা তাই দেখেছেন কাছ থেকে। অনায়াসে দেখেছন, তাই নাগরিক জীবনের ছোটখাট দিকগুলোও দৃষ্টি এড়ায়নি। লেখাপড়া করেছেন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজবিজ্ঞানে এমএসএস। বড়দের জন্য লেখালেখির শুরু ১৯৭৪ সালে। ও-বছর ২৮শে জুন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল প্রথম গল্প ‘মোহনী তমসা’। তখন তিনি এইচএসসির প্রথম বর্ষে। তারপর বিরতিহীন ও বিরতিসহ লেখালেখি। গল্প, উপন্যাস, কিশোর রচনা, অনুবাদ, রূপান্তর—সব মিলিয়ে বই বোধহয় ৮০ ছাড়িয়েছে। প্রথম বই গল্পগ্রন্থ ‘পরাস্ত সহিস’ বেরিয়েছিল ১৯৮২ সালে। এখন চাকরি করছেন, সাংবাদিকতা। চাকরি জীবনে এই সাংবাদিকতা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি তার। ছোটবেলায় ডাকটিকেট জমানো ছিল প্রিয় শখ। এখন ভ্রমণ। পুরস্কার পেয়েছেন বেশ কয়েকটি। বাপী শাহরিয়ার শিশু সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, ফিলিপ্স পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন