সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

ইশরাত তানিয়া'র গল্প | পদ্মবীজ ও কৃষ্ণ গহ্বর

আরক্তিম আপেলের মতো ফলটি। গন্ধ মনে করিয়ে দেয় মিষ্টি আতা ফলের কথা। এদেশে আসার আগে কখনো নেকটারিন খাইনি। যখনই পাকা নেকটারিন খাই আতাফলের গন্ধ পাই আমি। ভেতরটা নরম এবং সাদা কিন্তু আতার মতো ছোট ছোট কোষ নেই। গোল বাদামী রঙের একটা শক্ত বীচি আছে। শামীমের মতে নেকটারিনের গন্ধ পাকা দেশি গাবের মতো।

‘কিছু কিছু নাকটারিনের ভেতরটা গাঢ় মেরুন রঙের হয়। এই ফল শরীরের জন্য উপকারী। প্রচুর এনার্জি পাওয়া যায়,’ শামীম বলল। সে আমার চাচাত ভাই সাদেকের বন্ধু। বিশেষ কারণে চাচার বাড়িতে এসেছে। শামীমের সব কথাই ঘুরে ফিরে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে এসে শেষ হয়।


ত্রিশ বছর আগে আমার চাচা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন। আগে ক্যানবেরাতে ছিলেন। পঁচিশ বছর ধরে মেলবোর্নে স্থায়ী বসবাস। ছবির মতো বাড়ি সাজিয়েছেন। থীম বেইসড এক একটি কামরা। সামনের বাগানের ঠিক মাঝখানে ফোয়ারা। সেখানে ডানা মেলে শ্বেত মর্মরের পরীশিশু বসে আছে। ডান গালে হাত দিয়ে মাথা সামান্য কাত করে চোখ বুজে ঘুমচ্ছে।

আমি অনেক বছর পর মেলবোর্নে। বছর পাঁচেকতো হবেই। তেমন পরিবর্তন নেই বাড়িটির। শুধু আলগা ঝকঝকে ভাব মুছে গেছে। ঘরের দরজা খোলা। বসার ঘর থেকে বাইরে দেখা যাচ্ছে। ঝাঁজরি থেকে পানি ছিটকে পড়ছে বড় বড় গোলাপের পাপড়ির ওপর। চাচা গোলাপ বাগানে পানি দিচ্ছেন। নতুন ঘাস লাগিয়েছেন এ বছর। নরম-চিকন-মসৃণ ঘাস। রাতে বৃষ্টি হয়েছিল এদিকটায়। ধুলোহীন ঘাস সকালের রোদে সবুজাভ রঙ ছড়াচ্ছে।

‘এটা খুবই রসালো এবং সুস্বাদু,’ মসৃণ গোলাপি আবরণে কামড় দিয়ে আমি বললাম।

‘আপনার চশমার পাওয়ার কত?’ শামীম আমাকে জিজ্ঞেস করল।

আমি প্ল্যাস্টিক ল্যান্সের চশমা পরি। তাই চশমা হাই পাওয়ারের হলেও বোঝা যায় না। কন্টাক্ট ল্যান্স ব্যবহার করতে অস্বস্তি লাগে। একবার ল্যান্স পরার পর চোখ জ্বলছিল। সংক্রমিত হয়ে দুটি চোখ ফুলে গেল। আক্ষরিক অর্থেই রক্তচক্ষু হয়ে রইলাম কিছুদিন। কন্টাক্ট ল্যান্স বাতিল।

চশমার পাওয়ার বলার আগেই সাদেক বসার ঘরে এলো। এখনই বেরুতে হবে। হাতে কাজ নিয়েই মেলবোর্ন এসেছি। চাচাতো ভাইরা আলাদা থাকে। সপ্তাহে দু এক দিন এসে চাচা চাচির সাথে দেখা করে যায়। আমি আসব তাই সাদেক আজ সকালে এখানে এসেছে।

প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে আমি সাদেকের গাড়ীতে বসলাম। গন্তব্য কাউন্সিল অফিস। বাড়ি কিনতে চাই। আমি সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসলাম। সাদেক ড্রাইভিং সিটে। স্টিয়ারিং এ বাম হাত রেখে ডান হাতে চাবি ঢুকালো। গাড়ীর জানলার পাশে এসে শামীম বলল, ‘নেকটারিনে প্রচুর এন্টি-অক্সিডেন্ট আছে।’ তারপর হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানাল।

‘তাহলে সেপ্টেম্বর মাস থেকে তুমি এখানে থাকছ,’ সাদেক আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘হিউলেট প্যাকার্ডে চাকরিটা ভালই হবে।’

‘সে রকমই আশা করছি,’ আমি বললাম।

‘আমি কাজে যাব। ট্রেনে তোমাকে একলা ফিরতে হবে। স্টপেজ থেকে ট্রেনের কার্ড নিয়ে নিও।’

‘মাইকি কার্ড? আছে,’ আমি বললাম, ‘রিচার্জ করে নেব।’

সাবধানে রাউন্ডএ্যাবাউট পেরিয়ে সাদেক বলল, ‘ফ্লিন্ডার্স স্ট্রিট থেকে ট্রেনে উঠলে সুবিধা হবে।’


যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন থেকে আমার চোখের সমস্যা। লম্বা ছিলাম বলে সবসময়ই ক্লাসে পেছনের সারিতে বসতাম। ব্ল্যাক বোর্ডের লেখা ঠিক মতো দেখতে পেতাম না। মনে করতাম এটাই স্বাভাবিক। বই পড়তাম একেবারে চোখের সামনে ধরে। সবাই বলতো চোখ খারাপ হয়ে যাবে। ততদিনে চোখ খারাপ হয়ে গেছে।

রাস্তার পাশে বিলবোর্ডে কিংবা দোকানের সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখাগুলো পড়তে পারতাম। নিচে ছোট অক্ষরে লেখা ঠিকানায় এসে আমি থমকে যেতাম। অক্ষরগুলো মোমের মতো গলে খানিকটা ছড়িয়ে গেছে। মিলেমিশে যাওয়া অক্ষরগুলো অর্থবোধক কোন শব্দ হয়ে উঠত না। ফাউন্টেন পেন এ লেখা শব্দের ওপর কয়েক ফোঁটা পানি পড়লে যেমন ছড়িয়ে যায় সে রকম। চারপাশে সবাই দেখতে পাচ্ছে, পড়তে পারছে। আমি বড় বিষণ্ণ, দীর্ঘ পল্লবের চোখ নিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকি। দৃষ্টি শক্তি আছে। কিন্তু ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না।

সবার সাথে এই পার্থক্য আমাকে বিচলিত করত। সন্ধ্যা নামার মুখে দোকানে দোকানে আগরবাতি জ্বলত। বাল্বের লালচে হলুদ আলো আর আগরবাতির ঘ্রাণে কষ্টের ভার মিশে আমার ভেতর কয়েকটা বুদবুদ ফেনিয়ে উঠত। কিছু সন্ধ্যা বাড়িতে শুরু হতো। হয়তো সেদিন খেলতে যায়নি। জ্বর করেছে কিংবা জ্বর সেরে যাচ্ছে। হালকা ঘামে শরীর স্যাঁতস্যাঁতে। মা চায়ের কাপ আর মুড়ির বাটি রেখে গেছেন। সেদিনগুলোতে বিছানায় শুয়ে আমি খোলা জানলা দিয়ে সারি সারি মণিহারী দোকান দেখতে পেতাম। সেখানে সোনালী আলোর বিন্দু জ্বলত। আমি বুদবুদ বয়ে বেড়াতাম আর গলিত কিছু অক্ষর।

ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছিলেন- মাইওপিয়া। আলো এসে রেটিনার সামনে পড়ে। তাই দূরের কিছু দেখতে পাই না। ভারী লেন্সের মাইনাস পাওয়ারের চশমা নাকের ওপর এসে বসল। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন পর্যাপ্ত আলোর মধ্যে পড়তে হবে এবং এক নাগাড়ে অনেকক্ষন কিছু পড়া বা দেখা যাবে না। ভিটামিন সি ও এ সমৃদ্ধ ফল-সবজী খেতে হবে। চশমা পরে নিজেকে আমার বিজ্ঞ লোক মনে হয়েছিল। খেয়াল করেছিলাম চশমা চেহারায় একটা গম্ভীর ভাব এনেছে। দিনে দিনে চশমার ফ্রেম বদলে গেছে আর আমার চশমার পাওয়ার ক্রমবর্ধনশীল হারে বেড়েছে।

ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার লিমিট। সাদেক গাড়ী চালাচ্ছে। ও আমার চেয়ে দুবছরের বড়। আমাদের সম্পর্ক বন্ধুর মতো। খুব বেশি যোগাযোগ আছে এমন নয়। তবে বোঝাপড়াটা বেশ ভাল। সাদেক ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতে পারে। মেলবোর্নে এসে প্রথমদিকে আমি সাদেকের সাথে ওর ইউনিতে যেতাম। প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইনডোরে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। সাদেক বিয়ে করেছে। মেয়ে মেলবোর্নিয়ান। হাসিখুশি ধরনের। একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ত দুজন। এক বছরের একটা মেয়ে আছে ওদের।

সাদেক ওর ক্যারিয়ার বিষয়ক পরিকল্পনাগুলো বলছে। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না। তবু শুনছি আর আমার নতুন চাকরির কথা ভাবছি। চাকরি পেলেও চাকরিতে ভাল করা কঠিন। প্রকাশ্য অথবা চাপা যেমনই হোক সারা পৃথিবীতে বর্ণ বৈষম্য আছে। রেসিজম ম্যাটার্স।

‘তোমার এডেলেইডে যাওয়ায় সিদ্ধান্তটা আমার কাছে কোনদিনই ভালো মনে হয়নি। আমি খুশি তুমি আবার মেলবোর্ন ফিরে আসছ,’ সাদেকের কন্ঠস্বরে বোঝা যায় সে সত্যি খুশি হয়েছে।

‘জানোই তো এক জায়গায় আমার বেশিদিন ভালো লাগে না,’ আমি বললাম।

‘তোমার মনে হয় না, এক জায়গায় সেটল করা উচিৎ?’ সাদেক আসলে মতামত প্রকাশ করল।

আমরা দুজনই খানিকটা সময় চুপ করে রইলাম।

‘তোমার চোখের এখন কী অবস্থা?’ সাদেক জিজ্ঞেস করল।

‘আগের চেয়ে ভালো না, এইতো!’ আমি কাঁধ একটু উঁচু করে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করলাম।


মেলবোর্ন সেন্ট্রালের কাছাকাছি একটা ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান আছে। কাউন্সিল অফিসের কাজ শেষ করে সেখানে গেলাম। চিকেন বিরিয়ানি অর্ডার করলাম। পাশের টেবলে তিনজন মেয়ে খেতে বসল। এত কাছে বসেছে যে ওদের কথা না শুনে পারছি না। তিনজনই রিসার্চের ছাত্র। কিছুক্ষণ পরে বাংলাদেশের একজন মেয়ে এদের সাথে চেয়ার টেনে বসল। ভারতীয় মেয়েটি বাংলাদেশী মেয়েকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তখনই বুঝলাম এদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি, আর একজন মালয়েশিয়ান। চারজনই কথা বলছিল এবং চারজনই শুনছিল। রিসার্চ থেকে কথা মোড় ঘুরিয়ে চলে গেল তাদের নিজেদের পরিবারিক প্রসঙ্গে।

তামার ঘটিতে বিরিয়ানি আর চিকেন দেয়া হলো সাথে রায়তা। প্লেটে বিরিয়ানি নেবার সময় আমি শুনতে পেলাম ভারতীয় মেয়েটি মালয়েশিয়ান মেয়েটির প্রশংসা করছে। গাঢ় গোলাপি রঙের লিপস্টিকে মালয়েশিয়ান মেয়েটিকে নাকি খুব আকর্ষণীয় লাগছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে দুনিয়া জুড়ে মেয়েদের বৈশিষ্ট্য একই মনে হয় আমার কাছে। সেই ওষ্ঠরঞ্জনী! ঠোঁটের ওপর লিপস্টিক ঘষে কত সুখ ওদের! চেপে চেপে ঠিকঠাক করা। টিস্যু দিয়ে মোছা। কত শেড, কত ফ্লেভার।

ওরা যা কিছু খাচ্ছিল তার মধ্যে আমি রুটি, ডাল-তড়কা আর চিকেন ভিণ্ডালু চিনলাম। বাংলাদেশি মেয়েকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। সে আমার ডান দিকে একটু পেছনে বসেছে। খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। ফিরে যাবার সময় বাংলাদেশের মেয়ের দিকে তাকালাম। মেয়েটি ঠোঁটের ফাঁকে দাঁতে কলম চেপে আছে। গ্লসি লিপস্টিক কলমে লেগে যাচ্ছে। হয়তো কলম থেকে ব্যাগময় রাজ্যের স্লিপ, টিস্যু পেপার, নোটবুকে মেখে যাবে। নাহ্, চিনি না মেয়েটিকে। মেলবোর্নে বাংলাদেশী কমিউনিটির কারো সাথে আমার পরিচয় নেই। মেয়েটিকে চিনব না এটাই স্বাভাবিক।

মেলবোর্ন সেন্ট্রাল স্টপেজ থেকে ট্রেন ধরা যায়। ফ্লিন্ডার্স স্ট্রিটে যাবার প্রয়োজন নেই। সামনে তাকিয়ে হাঁটছিলাম। ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে যুগল বসে। দুপাশে সবুজ ঘাসের সারি। মাঝখানে ওয়াক ওয়ে। পা ফেলতেই পাখি উড়ে গেল। লাল-নীল-সবুজ-হলুদ রঙ বাতাসে ছড়িয়ে। মুহূর্ত পরেই রঙিন পাখি নাম-না-জানা ফুল গাছের পাতার আড়ালে। পায়ের কাছে এমন রঙধনুর পাখি পড়ে থাকে কে কবে দেখেছে! নিজের অজান্তেই যখন পাখির কাছাকাছি এসে পড়লাম ততক্ষণে পাখি নয় পাখির আংশিক উড়ে যাওয়া দেখলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেন চলে আসবে। চশমা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। তর্জনী দিয়ে চশমা ওপরে ঠেলে দ্রুত পা চালালাম। বাতাসের হুল্লোড়ে তখনো পাখির রঙের আভা ভাসছে।

কম্পার্টমেন্ট ভরা যাত্রী। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েকটা স্টেশান পেরিয়ে বসার জায়গা পাওয়া গেল। নামব রিজার্ভার স্টেশানে। জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছি আর ভাবছি মানুষ কাছে গেলে কেনো পাখি উড়ে যায়। পাখি হয়তো চায় আমাদের হৃদয় আকুল হোক। হারাই হারাই ভয় থাকুক। কিংবা বোঝাতে চায় সে আমাদের নিরাপদ মনে করছে না।

এলোমেলো চিন্তার মাঝখানে ট্রেন প্রিস্টন স্টেশানে পৌঁছলো। আমার চোখের সামনে তখন অদ্ভুত একটা দৃশ্য ভাসছে। মসৃণ ঘাড় ছুঁয়ে সোনালী চেইন গলা থেকে নেমে গেছে। এত সরু যে দেখাই যায় না। চেইন ধরে আমার চোখ ওপরে উঠে আসে। চিবুকের ভাঁজ। তারও ওপরে বিষণ্ণ ঠোঁট। ঠোঁটে কি কলম চেপে ধরা- ঠিক মনে পড়ে না। ব্যস্‌, ঐ পর্যন্তই। ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘের আড়ালে পাহাড় চূড়ো অদৃশ্য হয়ে যায়। মেয়েটির নাক, চোখ, মুখের রেখা তেমনি ধোঁয়াশায় মিলিয়ে গেছে। চেহারার আর কিছু মনে করতে পারছি না। কথা হয়েছে একবার। এমন অনেকের সাথেই কথা হয়েছে সময় অসময়ে। বিভিন্ন জায়গায়। মনে না থাকারই কথা। কোনো বন্ধুর বন্ধু হবে মেয়েটি। আমার চেনা ছিল। মেয়েটি আংশিক চেহারা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। এত বছর পর। সেন্ট্রাল মেলবোর্নে বাংলাদেশী মেয়েটির ঠোঁটে চেপে ধরা কলম পুরনো একটি কবিতার খানিকটা চোখের সামনে নিয়ে এলো। আর কবিতার মতো একটি মেয়েকেও।

আমি পদ্মকুঁড়ি, ফুটছি তোমার মানস সরোবরে
অজস্র অজস্র কোটি হয়ে-
সকাল ঝুঁকল আমায় দেখবে বলে,
বিস্মিত ঢেউ উঁকি দিল সবুজ পাতা সরিয়ে...

ট্রেনে প্রায় সবাই বসে আছে। একদল ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে করেই বসেনি। সামনের স্টেশানে নেমে যাবে। এক নাগাড়ে নীচু স্বরে কথা বলছে ওরা। কয়েকজন যাত্রী চোখ বন্ধ করে ঝিমোচ্ছে তবুও কখনো স্টেশান মিস্ করবে না। যান্ত্রিকভাবে একজন সুকন্ঠী নির্দিষ্ট সময় পর পর পরবর্তী স্টেশানের নাম বলছে। আমি কাঁচের জানলার ভেতর দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছি। ট্রেন ছুটছে। রাস্তা, গাছপালা, খোলা প্রান্তর, পাঁচিল, পাঁচিলের গ্রাফিটি পেরিয়ে যাচ্ছে। সব স্টেশান কম বেশি একই রকম। একটা স্টেশন দেখে মনে হলো অনেক পুরনো। স্থাপত্য কৌশল বলে দিচ্ছে এই স্টেশান ব্রিটিশদের তৈরি। নাম পড়তে পারলাম না।


চাচি খাবার তৈরি করে রেখেছেন। মনে পড়ল গত দশ বছরে কেউ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করেনি। চাচিকে বলতে পারছিলাম না বাইরে খেয়ে এসেছি। দ্রুত শাওয়ার নিয়ে তাই খেতে বসতে হলো। চাচার ডিউটি আছে এ শিফটে। চাচা চাচি দুজনই চাকরি করেন। সপ্তাহে দুদিন চাচির কাজ থাকে না। আজ আর আগামীকাল চাচির ছুটির দিন। বাসায় চাচি আর আমি। দেশি সবজির তরকারি দিয়ে আমরা দুজন ভাত খেলাম।

‘সব নষ্ট হয়ে যায়, বাবা!’ চাচি মুখের ভাত শেষ করে বললেন।

আমি ঠিক বুঝলাম না কী নষ্ট হবার কথা তিনি বললেন। পানির গ্লাস নামিয়ে চাচি বললেন, ‘এত ফল-সবজি কে খাবে? সাদেক-সানিকে দেই, আশেপাশের চেনা বাঙালীদের দেই। তারপরও অনেক রয়ে যায়, নষ্ট হয়। তোমার চাচার নেশা, নিজের হাতে গাছ লাগাবে। হাঁটুর ব্যথার জন্য ভারি কোনো কাজ করতে পারি না।’

‘জ্বি’, আমি বললাম।

ব্যাক ইয়ার্ডে চাচার সবজির ক্ষেত। ক্ষেতের পাশে লাউয়ের মাচা। সকালে একটা একটা করে গুনেছি। দশটা লাউ। লাউয়ের মাচার ফাঁক ফোকরে ছোট ছোট করলা ঝুলছে। বাউন্ডারী দেয়াল ঘেঁষে ঝিঙ্গের মাচা উঠে গেছে। এত রকম গাছ। আমি শুধু মরিচ, পেয়ারা আর আম গাছ চিনতে পেরেছি।

‘আজ সন্ধ্যায় শামীম আসবে এখানে। ওর বিয়ের কথা হচ্ছে,’ চাচি বললেন, ‘বিয়ের কথা বলার মতো কেউ নেই ওর। তাই আমি আর তোমার চাচা মেয়ের মায়ের সাথে কথা বলব।’

‘এখানেই পাত্রীর মা আসবেন?’ আমি জিজ্ঞেস করি। চাচিকে দেখলে আমার প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসের মিসেস বেনেটের কথা মনে পড়ে। এখন মনে হলো আমার চিন্তা সঠিক। যদিও তার দুই ছেলে। কোনো মেয়ে নেই।

‘আর কোথায়? আমাদের চেনা মানুষ। কয়েক বছর আগে একবার দেখা হয়েছিল। মাঝে যোগাযোগ ছিল না। এবার ওনাদের আসতে বলেছি,’ চাচি বললেন।

খাবার শেষ করে আমি কফি বানালাম। চাচি আর আমি পারিবারিক কথা বলছিলাম। চাচা আমার বাবার দূর সম্পর্কের ভাই হন। কিন্তু আমার কখনও তা মনে হয়নি। খুবই আন্তরিক আর যত্নশীল। চাচি আমার মাকে খুব পছন্দ করতেন। মা’র জন্য ম্যানিলা থেকে বিছানার চাদর এনেছিলেন। অফ হোয়াইটের মধ্যে খয়েরি রঙের এমব্রয়োডরি করা, মনে আছে।

‘যখন দেশে ছিলাম প্রতি মাসে তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম,’ আমার মৃত বাবা-মায়ের জন্য চাচির চোখ ভিজে ওঠে। তাদের দুজনের মৃত্যুর খবর তিনি এখান থেকে শুনেছেন। দেশে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

আমি কিছু বললাম না। চাচি উঠে গিয়ে রান্নার যোগাড় শুরু করলেন। আমাকে বললেন, ‘তুমি নেকটারিন খেতে পছন্দ করো তাই কোলস্ থেকে নিয়ে এলাম। ফলের ঝুড়িতে রেখেছি। মনে করে খেয়ো।’

কফি শেষ করে আমার জন্য নির্ধারিত রুমে গেলাম। এই রুমটা ছিল সানির। সানি চলে যাওয়াতে গেস্ট রুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জানালার ভারী পর্দা সরিয়ে দিলাম। গ্রীষ্মের শেষ দিনগুলোতে আটটা বাজলে সন্ধ্যা হয়। দীর্ঘ বিকেল।


সার্টিন কাপড়ের কাভার দেয়া পাতলা লেপের নিচে পা ঢুকিয়ে দিয়ে ল্যাপটপে ইমেইল চেক করলাম। ফেইসবুকে আমি নিয়মিত নই। অনেকদিন পর ফেইসবুকে লগ অন করলাম। সার্চ অপশানে গিয়ে কীবোর্ডের ওপর হাত থেমে গেল। আমি মেয়েটির নাম ভুলে গিয়েছি। নামের অদ্যাক্ষর পর্যন্ত মনে পড়ছে না। স্বল্প পরিচিত মেয়েটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না যে মস্তিষ্ক তার নাম মনে রাখবে। চেহারা মনে রাখবে। অথচ কত অপ্রয়োজনীয় নাম ধাম মনে আছে। অজ্ঞাত কোনো কারণে মেয়েটির ভাবনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারছি না। দুপুর থেকে চেহারা এবং নাম মনে করার ক্রমাগত চেষ্টা করছি। এটি সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন। কয়েকজন বন্ধু মিলে নিছক আড্ডা দেয়ার জন্য মেয়েটির বিভাগে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনি সেদিনই মেয়েটির জন্মদিন। আমরা বিব্রত হইনি। জন্মদিন পালনের জন্য সেখানে কোনো উৎসব হচ্ছিল না। মেয়েটির এক বন্ধু তাকে উপহার দিল। তখন জন্মদিনের ব্যাপারটি জানা গেল। মেয়েটি উপহারের মোড়ক খুলে খুব স্বাভাবিক ভাবে চেইন বের করে গলায় পরল। কয়েকজন প্রায় অচেনা ছেলের সামনে সে ইতস্তত বোধ করছিল না। চেইনটি ছিল সরু, সোনালি রঙের। এত সরু যে দেখাই যায় না। মনে হচ্ছিল স্বর্ণাভ আলোর আভা মেয়েটির গলা জড়িয়ে আছে। মেয়েটি কথা বলছিল। বোঝা যাচ্ছিল সে প্রাণশক্তিতে ভরপুর। জড়তাহীন বইছে ঝর্ণার মতো।

মেয়েটির হাতে একটা নোট বই। নোট বইতে সে কবিতা লিখেছিল। নিয়মিত লিখত না। সম্ভবত বিভাগের কোনো স্মরণিকার জন্য লিখেছিল। সিনিয়ার কারো অনুরোধে। কবিতাটি নিয়ে তখন আলোচনা হচ্ছিল। কবিতা আমি বুঝি না। আধুনিক বা উত্তরাধুনিক কবিতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। সেদিন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। ফিজিক্সে পড়ে এবং কবিতা লেখে এমন একজন মানুষ খুব সুলভ নয়। তাই হয়তো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। পদ্মফুলের কথা ছিল কবিতাটিতে। একটা পদ্ম ফুলের কলি ফুটছে।

ভ্রমর-ভ্রমরী খেলা করল আমার সৌরভে-
মৃণাল বাহুতে দোল খেল জলজাত গুল্ম-
আমার বুকে মুখ ডুবিয়ে সুদীর্ঘ শ্বাস নিল কিশোরী।
আমায় আসন করে রোদ পোহাল ফণাযুক্ত সাপ,
তথাগত প্রতীক করল
বীণাপাণি তুলে নিল কোমল হাতে...

একটু একটু করে পদ্মফুল পাপড়ি মেলছে। পূর্ণতায় মুগ্ধ হতে হতে। এক বিশেষ উপলক্ষ্য নিয়ে অসংখ্য পদ্মফুল ফুটে উঠছে। সমগ্রকে ধারণ করছে। তরল আলোয় ভরে যাচ্ছে চারদিক। পদ্মকে ভালোবাসে কিশোরী। সাপও। তথাগত আর স্বরস্বতীও তাকে ধারণ করে। মেয়েটির নাম ভুলে গেছি। মুখাবয়ব কিছু মনে নেই অথচ তার লেখা কবিতা দিব্যি মনে পড়ছে। কবিতাটি কবিকে ছাপিয়ে মনে জায়গা করে নিয়েছে। আমি দেখতে পাচ্ছি সকলের আরাধ্য এক পদ্ম মুখ ভাসিয়ে রেখেছে জলের ওপর। তিরতির করে কাঁপছে বাতাসে।

চাচি দরজায় টোকা দিয়ে জানালেন শামীম এসেছে। চাচির কথায় আমি বাস্তবে ফিরে আসি। আড়মোড়া ভেঙ্গে বিছানায় গড়িয়ে নেই। একটু দেরী করে উঠলেও অসুবিধে নেই। দর্শক এবং শ্রোতার কাজ পরে করলেও চলবে। বাতাসের ঝাপটায় বেশ বড় উইলো গাছ একবার ডান দিকে আরেকবার বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এদেশে বলে উইপিং উইলো। চিরিচিরি পাতাগুলো এমন নত হয়ে থাকে। উইলো গাছকে দেখলেই মনে হয় ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হাওয়া এদিক-ওদিক বেশ এলোমেলো বইছে। মেলবোর্নের আবহাওয়ার মন বোঝা কঠিন। অতি খামখেয়ালি। ফোনের এ্যাপে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখলাম। রাতে বৃষ্টি হবে।

খাটের ওপর বসে আছি। জানালা বন্ধ। ওপাশে শব্দহীন বয়ে যাওয়া বাতাস দেখছি। আর উইলো গাছের শাখা প্রশাখার সক্রিয় হয়ে ওঠা। পাতার প্রতিটি কাঁপন। ডালপালার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া সবকিছু আমার চোখে বাতাসকে দৃশ্যমান করে দিচ্ছে। আমি বাতাস দেখতে পাচ্ছি। আজ অদৃশ্যকে দেখতে পাচ্ছি। কাল দৃশ্যকে দেখতে পাব না। জীবন দেখিয়ে দিল, এভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। আপাত দৃষ্টিতে বিশৃঙ্খলা মনে হলেও আদতে সবকিছু শৃঙ্খলানিয়ন্ত্রিত।

পনের বছর আগের সেই আড্ডায় সবার কথার মাঝে মেয়েটিকে হঠাৎ প্রশ্ন করেছিলাম- কেনো তুমি পদ্ম হয়ে ফুটে উঠছ?

মৃদু হেসে সে বলেছিল- কবিতা এখনো শেষ হয়নি। মেয়েটি ছটফটে। কিন্তু তার ঠোঁটের গড়নটা কেমন বিষণ্ণ। এতক্ষণে আমার মনে পড়ল। কলম নয়। সে ঠোঁটে একটি ডালিয়া ফুলের ডাঁটি চেপে ধরেছিল। বেশ বড় উজ্জ্বল লাল ডালিয়া। ভেলভেটের মতো পাপড়িগুলো ছড়ানো। তার মানে বসন্তের কোনো একদিন তার সাথে দেখা হয়েছিল। জন্মদিনে তাকে কেউ লাল ডালিয়া দিয়েছিল।


বসার ঘরে ঢুকে আমি ভেষজ গন্ধ পেলাম। শামীম কাজ থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। চাচা-চাচি সোফায় বসে। চাচির পাশে একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্র মহিলা। শামীমের হবু শ্বাশুড়ি। মহিলার সারা শরীর কালো পোশাকে আবৃত। অনেকটা বোরখার মতো। শুধু মুখ আর হাতের আঙ্গুল দেখা যাচ্ছে। গায়ের রঙ অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে ফর্শা মনে হলো। চোখ দুটো নিষ্প্রাণ। প্রসাধনহীন মুখ। ক্রিম জাতীয় কিছু মেখেছেন। তেলের মতো চকচক করছে। বিরাট পাশ ব্যাগ কোলে নিয়ে বসে আছেন। বাদামী রঙা কার্পেটের ওপর কালো আলখাল্লা লুটিয়ে পড়েছে।

বিয়ের কয়েক দফা কথাবার্তা আগেই হয়ে গেছে টেলিফোনে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা করে তিনি এসেছেন। ‘আমার শরীর বেশি ভালো না’, মহিলা বললেন, ‘তেমন একটা বেরুই না।’

‘কী হয়েছে আপনার?’ চাচি জিজ্ঞেস করলেন।

‘অনেক সমস্যা। এখন ন্যাচারোপ্যাথির মাধ্যমে চিকিৎসা করাচ্ছি,’ বলে মহিলা ব্যাগ থেকে একটা বাক্স বের করলেন। বাক্সের ভেতর নানান মাপের ছোট ছোট শিশি। বিভিন্ন ধরণের তেল আর জড়িবুটির মিশ্রণ রাখা আছে ওগুলোয়। মহিলা সারা গায়ে এসব মেখেছেন। তিনি সব সময় এই তেল মাসাজ করেন। ভেষজ গন্ধের উৎস জানা গেল।

চাচা-চাচি দুজন উঠে কিচেনে গেলেন। সাদেক ফোনে জানাল সে আসতে পারছে না। জরুরি কাজে আটকা পড়েছে। সাদেকের বিকল্প হিসেবে আমি বসে বসে ‘ন্যাচারোপাথি’র ওপর মহিলার বক্তৃতা শুনছি। শামীম খুব আগ্রহ নিয়ে হবু শাশুড়ির কথা শুনছে।

‘যে দোকান থেকে আমি এসব কিনি সেখানে হাজার রকমের শেকড়বাকড় আছে। তাজা-শুকনো সব পাওয়া যায়। সারাক্ষণ দোকানে ধূপ-ধুনো জ্বলে আর হালকা ধোঁয়া ওড়ে। এক জটাধারী মহিলার দোকান সেটা। সে কী বিশাল জটা,’ একটু থেমে তিনি বললেন, ‘একটু পানি দাও তো, বাবা!’

শামীম পানির বোতল আনতে গেল। মহিলা নিচু স্বরে কথা বলেন। দ্রুত লয়ে এবং কথা বলার সময় সশব্দে লম্বা লম্বা শ্বাস নেন। বাক্সটা ব্যাগে ঢুকিয়ে মহিলা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। যেন কিছু ভাবছেন তারপর বললেন, ‘আমার ইভিল আইয়ের সমস্যা আছে। তাই অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়।’

ইভিল আই জাতীয় চোখের অসুখের কথা আমি শুনিনি। চোখের অসুখ নিয়ে আমি যথেষ্ট পড়েছি। তিনি আমার চোখে চোখ রেখে আমার অজ্ঞতা উপভোগ করলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ইভিল আই মানে অশুভ দৃষ্টি।’

‘কিভাবে আপনি নিশ্চিত হলেন?’ আমি স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলাম। অশুভ দৃষ্টি কথাটি আমার কাছে বুজরুকি মনে হয়।

‘পরীক্ষা করে জেনেছি,’ তিনি বললেন, ‘বিশেষ সূরা এবং আয়াত আছে। ইন্টারনেট থেকেই আমি পরীক্ষা করেছি। ঐ সূরা শুরু হলেই আমার মাথা ঘুরায়,’ লম্বা শ্বাস নিলেন তিনি, ‘আমি সহ্য করতে পারি না।’

শামীম পানি নিয়ে এসে বলল, ‘খাবার দেয়া হয়েছে।’

ভদ্রমহিলা শামীমকে দেখে এ প্রসঙ্গে আর কিছু বললেন না। আমরা রাতের খাবার খেতে বসলাম। আর বিস্তারিত জানা হলো না কিভাবে পরীক্ষা করে অশুভ দৃষ্টির প্রভাব ধরা যায়।

ভদ্রমহিলা রাতে কোনো খাবার খান না। শুধু কালি জিরা, খেজুর আর মধু খান। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে তিনি উঠে পড়লেন। শামীম ওনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা হাতে নিয়েও আমাদের গা বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছে। বিদায় নেবার সময় তিনি অস্ফুট স্বরে আমাকে বললেন, ‘রাতে শয়তান অনেক বেশি শক্তিশালী হয় তাই আমাদের শরীর বন্ধ করে ঘুমোনো উচিৎ। কিছু দোয়া আছে এর জন্য।’

আমি ঘরে ফিরে চাচিকে জানালাম যে মহিলাকে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। চাচা নিরবে হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালেন। বললেন, ‘মহিলা ভেষজ বাতিকগ্রস্ত। লনে এ্যালোভেরা গাছ লাগিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে বাড়ির সবাইকে এ্যালোভেরা জেলি খাওয়াচ্ছেন।’

হঠাৎ চাচি আমাকে বললেন, ‘তুমি ন্যাচারোপ্যাথি চেষ্টা করে দেখো না।’ তিনি হয়তো মনে করছেন এতে আমার অন্ধ হয়ে যাবার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে কিংবা চোখ পরিপূর্ণভাবে সেরে উঠতে পারে। আগরবাতির কষ্ট মিশ্রিত গন্ধ ফিরে আসে। আমার ভেতর থেকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যায়। একের পর এক দোকানীরা বালবের হলদে সোনালী আলো জ্বেলে দেয়। সাইনবোর্ডের ওপর গলিত শব্দের সপ্তবর্ণা বুদবুদ ভেসে যায়।

জানালা বন্ধ। বাইরে বাতাসের চাপা আস্ফালন। মেঘের আড়ালে অবলুপ্ত চাঁদের ক্ষয়াটে আলো। বাতি বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। মেয়েটির ভুলে যাওয়া চেহারা আমি দেখতে পাই না। পাবো না। সামনে এসে দাঁড়ালেও না। চোখের দৃষ্টি দিন দিন ক্ষীণতর হয়ে আসছে। তবুও, আশ্চর্যজনকভাবে চোখ দুটো সক্রিয় হয়ে বিপুল নুনজল সৃষ্টি করতে পারল। জলের উৎস দেখা যায় না। নিরব পতনটুকু দৃশ্যমান।

পাপড়ি তুলে নাও, জন্মান্ধ!
আমার পদ্মবীজ তোমার চোখে ঝরলো
পদ্মরেণু তোমার চোখ ছুঁল
কৃষ্ণ গহ্বরে উড়ল জলজোনাকি।

নিকষ আঁধারে কবিতার শেষটুকু রেডিয়ামের মতো কোমল আলোয় চোখের সামনে কেঁপে কেঁপে ভাসছে। যা আমি দেখি তা কেউ দেখে না। কুয়াশায় অদৃশ্য কিছু, যেটুকু দৃষ্টির অগোচর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন