সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

রুমা মোদক'এর গল্প : কেন্দ্রীয় চরিত্র সম্পর্কিত জটিলতা

সম্পাদক সাহেব গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নন

মফস্বল শহরটি থেকে প্রকাশিত দৈনিক গুলোতে এখন আর খবরের তেমন কোন অভাব যে হয় না এ ব্যাপারটি সম্পাদক সাহেবকে বড় প্রীত করে। সম্পাদক সাহেবের মনে পড়ে প্রথম যখন দৈনিক বের করেন, নিস্তরঙ্গ মফস্বলের জীবনাচরণ থেকে খবর খুঁজে বের করতে তাঁর যে কি অসম্ভব কষ্ট হতো! পত্রিকার পাতা ভরানোর জন্য অত্যন্ত অনৈতিকভাবে তিনি মনে মনে প্রার্থনা করতেন যেন প্রতিদিন কোন না কোন অঘটন ঘটে শহরে। আর সেটা নারী সংক্রান্ত, ধর্ষণ-সংক্রান্ত হলে তো কোন কথাই নেই।

কিন্তু বাংলাদেশ, যেটি কিনা বছরের পর বছর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করে, সন্ত্রাস-নারী নির্যাতন রাজনৈতিক অস্থিরতায় আকন্ঠ ডুবে থাকে, সেখানে সেই বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরে মাসের পর মাস চলে যায় কোন নারী ধর্ষণ তো হয়ই না, সামান্য চুরি ছিনতাই কিংবা রিক্সা দুর্ঘটনা পর্যন্ত ঘটে না! এই শহরের মানুষগুলি সন্ধ্যা হলেই ঘরমুখো, মেয়েগুলি ঘর ছেড়ে বেরোয় না নেহাৎ প্রয়োজন না হলে, রাস্তায় যানজট নেই, অল্প স্বল্প রিক্সা চলে ধীরে সুস্থে; সেখানে অঘটন ঘটার তেমন সুযোগও নেই। তখন সম্পাদক সাহেবকে সারারাত জেগে থাকতে হতো পত্রিকার পাতা ভরাট করার জন্য। এতগুলো টাকা বিনিয়োগ, সম্পাদক সাহেব বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, ব্যবসা আসলে হবে তো! অনেক ভেবে চিন্তেই তিনি মাঠে নেমেছেন। খালি মাঠে গোল দেওয়াটা সহজ জেনে, তথাপি তিনি দেখেছেন শহরের মানুষগুলো পয়সা খরচ করে স্থানীয় দৈনিক কিনতে কোন আগ্রহ দেখায় না। ছোট শহরের মুখ চেনাচেনির সূত্রে সৌজন্য সংখ্যা পাওয়ার প্রত্যাশা করে।

সুখের কথা, অবস্থাটা আস্তে আস্তে পাল্টে গেছে। পত্রিকাটির এখন স্থায়ী গ্রাহক সংখ্যা প্রায় শ’র ঘরে, জেলা শহর ছাপিয়ে উপজেলা, প্রত্যন্ত গ্রামেও সার্কুলেশন হাজারের ঘর ছুঁই ছুঁই, সরকারি বিজ্ঞাপণসহ পাবলিক বিজ্ঞাপণ পর্যাপ্ত। ‘রমরমা’ শব্দটিকে ইতিবাচক ধরে নিলে, সম্পাদক সাহেবের এখন অবস্থাটা তেমনই। খবর নিয়েও তার কোন চিন্তা করতে হয় না, একটার পর একটা ‘হেড লাইন’ যেন তৈরী হয়ে যায়। দেশের হাওয়া দোলা দেয় মফস্বলের হাওয়াকে। আধিপত্য বিস্তারে দুই দলের বন্দুক যুদ্ধ, এম,এ, পরিবহনের মালিক সুন্দরী পতিতা সহ গ্রেফতার, চা বাগানের গহীনে বাস ডাকাতি, শহরতলিতে বাপের হাতে মেয়ে খুন, নেতা-নেত্রী সমাজসেবিদের অনুদান বিতরণের পর ইদানিং পত্রিকার পাতা দখল করে আছে শহরের কৃতি সন্তান মোহাম্মদ তকদির হোসেনের মহান কর্মের খবর আর সেই সাথে সে সম্পর্কিত সংবর্ধনা-অভ্যর্থনা সভা ইত্যাদি আয়োজনের খবরসমূহ।

সে সমস্ত সভায় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের মত আমলারা যেমন সদাহাস্য উপস্থিতি নিশ্চিত করেন, তেমনিভাবে সরকারি দল, বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদেরও রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদের উর্ধ্বে একমঞ্চে উঠার বিরল সুযোগ সৃষ্টি হয়। সভায় বক্তারা তকদির সাহেবের কৃতকর্মের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে কখনোবা তার গলায় মালা পরান, কখনো বা গায়ে উত্তরীয় অথবা হাতে মানপত্র দেন, আর সম্পাদক সাহেব নিজে নির্ধারিত বক্তৃতাটা সেরে নোট বুকে মূল বক্তব্য গুলো টুকে নেন। দিনের পর দিন যায় আমলাদের স্তুতি বাক্য যেমন ফুরোয় না (কেননা শোনা যায় সব দলের প্রথম সারির নেতা এমনকি বর্তমান মন্ত্রীদের সাথে পর্যন্ত তকদির সাহেবের খুব খাতির) নেতাদের আত্মশ্লাঘা যেমন কান্ত হয় না (কেননা এই শহর থেকে তারা তকদির সাহেবের মত ছেলে তৈরী করেছেন) তেমনই সম্পাদক সাহেবেরও হেড লাইনের খবরের জন্য ভাবতে হয় না। উপরন্তু ব্যালেন্স করে পর্যায়ক্রমে আমলাদের ছবি আর নেতাদের ছবি পত্রিকার পাতা শোভাবর্ধন করে, আর সম্পাদক সাহেব ফোন করে “ছবিটা কেমন হলো” জানতে চেয়ে খাতিরটা ঝালাই করে নেন।



ইনি গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র কিনা নিশ্চিত করে বলা যায় না

জিনাত আরা বেগম এর বার বার ধোয়া, বার বার মাড় দেয়া ইস্ত্রিহীন কাপড়গুলো যেমন ধুসর কিংবা কয়েক তালি দেয়া র‌্যাকসিনের জুতো আর ব্যাগ যেমন মলিন, সেগুলোর চেহারা যে পাল্টে গেছে কিংবা তাঁর পঞ্চাশোর্ধ চোখে তা সামান্য রঙিন দেখাচ্ছে তার কোনটাই নয়। পার্শ্ববর্তী মসজিদের ফযরের আযানের শব্দে তাঁর নিত্যকার ভেঙে যাওয়া ঘুম যে কিছুটা স্বস্তি তৃপ্তি অথবা স্বপ্ন কাতর ছিল তেমন ও নায়। ভোর রাতে ব্যস্ত হয়ে উঠা স্বপ্নহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বিষণ্ন দিনগুলিও মোটেই বদলায়নি জিনাত আরা বেগম এর।

কিন্তু ইদানিং সর্বত্র তিনি টের পান তাঁর প্রতি পরিবর্তনীয়-পরিবর্তনশীল এক সমীহ। এই যেমন ফি-সপ্তাহের রুটিন বাঁধা সভায় উপজেলা চত্বরে, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সহ সব শিক্ষক শিক্ষিকারা, এমনকি তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, পাঁচ মিনিট দেরিতে স্কুলে পৌঁছলে যার মুখ ঝামটা, শো-কজ, লেইট মার্ক, এবসেন্ট মার্ক সহ নানবিধ শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয়, সেই কপাল কুঁচকানো বিরক্তিকর মহিলাটি পর্যন্ত উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়ে বসিয়ে দিল শিক্ষা কর্মকর্তার পাশের চেয়ারটিতে, ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানাল তাকে, প্রশংসার ফুলঝুরি উথলে উঠলো অডিটোরিয়াম চত্বর ছাড়িয়ে মাইক্রোফোনের গগনবিদারী শব্দে আশে পাশের আরো দু’একটি অফিস পাড়ায়।

কিন্তু জিনাত আরা বেগম যে তাতে উচ্ছ্বসিত কিংবা তৃপ্ত মোটেই তা নয়। সামনে যখন রত্নাগর্ভা জননীর স্তুতিগাথা ফেনিল ফুলেল, তখন তাঁর ছানিপড়া ঝাপসা চোখে বিরক্তির ছায়াটা কারে নজরে পড়ে না চোখের উপরে থাকা পাওয়ারের চশমাটার কারণে। তিনি তখন মনে মনে জানেন এর কোন কিছুই তার একাকী সংগ্রামের বন্ধুর রাস্তাটিকে মসৃণ করে দিতে পারবে না। মোটেই বদলাবে না তাঁর উদায়স্ত যুদ্ধ করা জীবন যাত্রা। সঞ্চয়হীন নিঃস্ব বৈধব্যের দুর্বহ বোঝা তাকেই বইতে হবে আমৃত্যু। কেবলই যে নিজের রিক্ত জীবনের আক্ষেপেই এতো আয়োজনে তাঁর নিস্পৃহতা তা নয় বরং জিনাত আরা বেগম ভাবেন, ঠিক ভাবেন বললে ভুল বলা হয়, তিনি বিশ্বাস করেন কি এমন হয়েছে যে এতো হৈ চৈ করতে হবে?

পুত্রবধু শিক্ষিতা, চাকুরিজীবী, সুন্দরী না বলা গেলে ও অসুন্দরীও বলা চলে না। সবচেয়ে বড় কথা ঢাকা শহরে ছেলের একার রোজগারে চলা মুশকিল বলেই রোজগেরে মেয়েকে বিয়ে করা-অপছন্দ কিংবা অমত করার মতো উদ্যম-আগ্রহ নেই বলেই কিংবা তাঁর পছন্দে-অপছন্দে কিছুই আসবে যাবে না বলেই নির্বিবাদে মেনে নেয়া পুত্রবধু, বছরে দু একটা ছুটিতে দয়া করে মফস্বলের শ্বশুরালয়ে বিধবা শাশুড়ি আর অবিবাহিতা ননদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে আসে, ঘটনা ঘটার পর এর ওর ডাকে যখন তখন সংবর্ধনা সভায় যোগ দিতে এসে এ ব্যাপারে শাশুড়িমাতার নিস্পৃহতা দেখে স্বামীকে বলেই ফেলে-- এটা তোমার মায়ের বাড়াবাড়ি।

যদিও পুত্রবধুর এ অভিযোগ নিয়ে মহিলা সুলভ কোন গাত্রদাহ সৃষ্টি হয় না তাঁর, তবুও অভিযোগটি মেনে নিক কিংবা না নিক পুত্রের এসময় চুপ করে থাকাটা মোটেই পছন্দ হয়নি জিনাত আরা বেগমের। এই অপছন্দ নিয়ে যদিও তার মাথা ব্যথা নেই তবু অস্বীকার করতে পারেন না মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা ছোট এক টুকরো উপলব্ধিকে। সেটা কি প্রত্যাশা, অহংকার নাকি আক্ষেপ তা তলিয়ে দেখার অবকাশ কিংবা ধৈর্য কোনটাই হয় না জিনাত আরা বেগমের। পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকার নিতে আসা তরুণ সাংবাদিক কিংবা দল বেঁধে ছেলেদের সংবর্ধনার প্রস্তাব দিতে আসা আর সেই সাথে হৈ হৈ করতে করতে যখন তখন পুত্রের বধুসহ গ্রামে চলে আসার ব্যাপারগুলোকে বরং তার বাড়াবাড়ি মনে হয়। জিনাত আরা বেগম তার যাপিত জীবনের সকল অপ্রিয় অভিজ্ঞতা অপমানকর জীবনযুদ্ধ থেকে জানেন, নিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচার নিশ্চয়তার কোন বিকল্প জীবনে নেই।

তাঁর জীবনের চারিদিকে, সামনে-পিছনে, ডানে-বামে নিশ্চয়তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ছেলে তাঁর বিখ্যাত হচ্ছে, নাম কিনছে, মফস্বল দৈনিকের পৃষ্ঠা জুড়ে গর্বিত হাসছে, যখন তখন ডিসি, এস পি, এম পি ফোন করছে, ব্যাপারগুলো কোন আলোড়ন তোলে না তাঁর সংসারের অতি চাপ বহন করা মস্তিস্কে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বুটের আঘাত আর বেয়নেটের খোঁচায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া স্বামী আর নাবালক শিশুপুত্র নিয়ে সংসার যুদ্ধ করেছেন তিনি ত্রিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে। মাঝখানে পঙ্গু স্বামী উপহার দিয়েছেন একখানা কন্যাসন্তান আর নিজে বিদায় নিয়েছেন মেয়েটার বয়স বছর পাঁচ পূর্ণ হতে না হতেই। এতদিন তবু ঝাঁঝ দেখানোর, ভাগাভাগি করার, আশ্রয় নেয়ার যে নড়বড়ে ছায়াটুকু ছিল তাও যখন হারিয়ে গেল তখন থেকে তো যুদ্ধ তার একার। বাড়ি ভাড়া যোগাড় করবেন না ছেলেমেয়ের পরীক্ষার ফিস, বখাটেদের উৎপাত থেকে উদ্ভিন্ন যৌবনা মেয়েকে আগলে রাখবেন না ছেলেকে সীমান্তবর্তী শহরের নেশার আড্ডা থেকে সামলে রাখবেন এ ভাবনাতে বিপর্যস্ত থেকেছে ক্লান্ত জীবন তাঁর।

আজ একটু হাঁফ ছাড়তে চান তিনি, কিন্তু হাঁফ তাঁকে ছাড়ে না। কয়েকবার লোন তোলা প্রভিড্যান্ট ফান্ডের টাকা কাটতে কাটতে মাসের শুরুতে যে কয়টা টাকা বেতন হিসেবে পান তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া আর সংসার চালাতে হাবু ডুবু খান যখন, তখন ছেলের উপর ক্ষুব্ধ আক্রোশ হয় জিনাত আরা বেগম এর। ঘাড়ের উপর চেপে থাকা অনুঢ়া মেয়েটার বেকার অলস জীবনের দিকে তাকিয়ে ভিতর থেকে জেগে উঠা দীর্ঘশ্বাসটা যখন পছন্দ করা পাত্র পরে ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারে না। তখন ছেলের উপর অন্ধ রাগ হয় তাঁর। নিজের কঠোর জীবন সংগ্রাম উৎকণ্ঠিত যুদ্ধ সবকিছু মাথা পেতে গ্রহণ করতে হয়েছে সানন্দে না হলেও নিরানন্দে, বাধ্য হয়ে। বিত্তশালী হবার বাসনা তাড়িত করেনি তাঁকে কখনোই। তাই বলে আদর্শের পরকাষ্ঠা হয়ে মেয়ের জন্য যুগের সাথে অচল তথাকথিত সৎ পাত্র খুঁজবেন এমন অযোগ্য আদর্শ ও তাঁর নেই। জিনাত আরা শুধু চান মেয়েটা তাঁর মায়ের মতো যুদ্ধ না করুক, একটুখানি স্বচ্ছলতায় নিশ্চত জীবন কাটাক। কিন্তু স্বচ্ছল পাত্র পরে তালিকায় উঠার কোন যোগ্যতাই নেই তাঁর মেয়ের, ছেলের এই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠা কি মেয়ের যোগ্যতার মাপকাঠিকে তীè করবে? কিংবা ছেলেটা যে কাণ্ডটা করলো তাতে কি মাথা গোঁজার জন্য অনেক কষ্টে কেনা জায়গাটুকুতে দোচালা একটা ঘর উঠবে, যাতে তাঁর বাড়ি ভাড়ার টাকাটা বেঁচে যাবে? না, এর কিছুই হবেনা। ফলের ছেলের এই বিখ্যাত হয়ে উঠার গর্বিত কার্যক্রমগুলিতে তার অহংকার হয় না, উচ্ছ্বাসতো হয়ই না বরং যতই তার পুত্রবধু অখুশী হোক না কেন তাঁর বিরক্ত লাগে, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেন তিনি।



ইনিও গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হতে পারেন

বাড়ির সামনে বুড়ো আম গাছটি এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে বার্ধক্য জরার ছায়ার নীচে দীর্ঘকালের উত্থান-পতন, ঘটন-অঘটনের সাক্ষী হয়ে। জীর্ণ বাড়িটির পুরোনো ভাড়াটে তকদির সাহেবরা। জীর্ণ বাড়িটি সংস্কার হয়নি দীর্ঘকাল, উঠোনের শ্যাওলা সরেনা কিন্তু ফলবর্তী গাছটি দাঁড়িয়ে থাকে অপলক। গাছটির স্নিগ্ধ ছায়ার নীচে দাঁড়ান তকদির সাহেব। ত্রিশোর্ধ যুবক এই মফস্বল ছেড়েছেন প্রায় সতেরো বছর আগে প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির সন্ধানে। বাকী যে সময়টুকু অভাবের সাথে নৈমত্তিক টিকে থাকা, দৈন্যতা নিয়ে সহপাঠিদের পাশে বসে হীনমন্যতায় ভোগা, আজ প্রতিষ্ঠা খ্যাতির দরজায় দাঁড়িয়ে সেই সময়টুকুর জন্য বড়ো মায়া হয়। মাথার উপরে নুয়ে থাকা ডালটা এককালে কতটা আপন ছিলো ছেলেমানুষি এ অনুভূতিটুকুকে খুব একটা খেলো মনে হয় না অথচ এটাই স্বাভাবিক ছিল তাঁর বর্তমান মানসিক গতি প্রকৃতির কারণে। আর গাছের ডালে বসা সেই দাঁড় কাকটি, তকদির সাহেবের কৈশোরের মুড়ির বাটিতে ছোঁ মেরে যে উড়ে পালাত অচেনা দেশে-যার সাথে সাথে তাঁর ও চলে যেতে সাধ হতো অজানা পাহাড় আর রূপকথার সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে। ছেলেবেলায় কত সাধ হয় মানুষের বড় হতে হতে সাধ্যের টানাপোড়েনে কখন যে সব হারিয়ে যায়--বোঝাও যায়না।

তকদির সাহেবও বুঝতে পারেননি, ছেলেবেলায় গভীর রাতে স্বপ্নকাতর ঘুম ভেঙে যখন সারা দিন স্কুল করে ফেরা ক্লান্ত জেগে থাকা মাকে দেখতেন চল্লিশ ওয়াটের অপর্যাপ্ত আলোতে কাপড়ে সুঁই-সুতা, ফুল-নকশায় জীবন যুদ্ধ আঁকতে, তখন পাশ ফিরে ঘুমোতে ঘুমোতে কান্না এসে থেমে যেতো কণ্ঠের নীচে, মনে মনে বড়ো সাধ হতো অনেক বড় হয়ে, অনেক টাকা রোজগার করে মাকে বসিয়ে রাখবে রাজরানীর আসনে। সেই সাধ যে তাঁর কবে মরে গেছে খেয়ালই করতে পারেননি এতোটা দিন। ঘটনাটার পর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠে, যখন তখন এর ওর ডাকে সংবর্ধনা নিতে এসে মায়ের উদয়াস্ত সংগ্রামটা নতুন করে চোখে পড়ছে তাঁর। বুকের ভিতর চিন চিন কষ্টও অনুভূত হয়-- কিন্তু একই সাথে তকদির সাহেব আবিস্কার করেন সে কষ্টটা মোটেই ছেলে বেলার মত গাঢ় নয় বরং পানসে, আত্মচিন্তার আড়ালে চাপাপড়া সাদা ঘাসের মতো। নিজের এই বদলে যাওয়াটা ও নতুন করে আবিস্কারে নিজেকে নিজের কাছে অচেনা অচেনা লাগে।

ছেলেবেলার তীব্র কষ্টগুলো বড়বেলায় হারিয়ে গেছে বলে যে কষ্টটা, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক মোহাম্মদ তকদির হোসেনের জীবনে তা সত্য, না কি খ্যাতির মোহে তাড়িত, প্রতিষ্ঠার লক্ষে ক্লান্তিহীন অতীত ভুলে থাকা, নীতি-নৈতিকতার ধার না ধরে প্রতিপত্তির সিঁড়ি খোঁজাটা সত্য, এদ্বন্দ্বে বিবৃত হয় সে ইদানিং। দ্বন্দ্বটা তীব্র হয়, তীক্ষ্ণ হয় যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত মা যখন বাড়িতে এলেই সামনে সমস্যার ঝাঁপিটার রুদ্ধ ঝাঁপটা খুলে ধরেন। বোনটার বিয়ে দিতে হবে, বয়স বাড়ছে। চেহারা ভালো নয়, শিক্ষার দৌঁড়ও কম। পাত্রপক্ষ সুন্দরী খোঁজে, বিকল্পে চাকরিজীবী। ভাল একটা প্রস্তাব আছে হাতে। ছেলের রড সিমেন্টের ব্যবসা, বাড়তি যোগ্যতা হিসাবে দুই ভাই আমেরিকায় থাকে, শুধু ঘর সাজানোর মত টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার আর দোকানে আসা যাওয়া করার জন্য একটা মোটর সাইকেল দিলেই বিয়েটা হয়ে যায়। হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না। আশে পাশের সব বাড়িতে জ্বালানি জ্বলে গ্যাসে, অসুস্থ বয়স্ক শরীরে মায়ের কাঠ কয়লার উনুন ঠেলতে খুব কষ্ট, গ্যাস সংযোগটা এবার না আনলে হচ্ছেই না। কত আর বাড়ি ভাড়া গোনা, কেনা জমিটাতে যাহোক একটা ছাউনি তুলে চলে যাওয়াটাই মঙ্গল, প্রেসারটা মনে হয় কন্ট্রোলে নেই ভালো একজন স্পেশালিষ্ট না দেখালেই নয় মাকে।

এসব কিছুর ভীড়ে হৈ চৈ সাক্ষাৎকার সংবর্ধনা তাঁর কাছে খুব স্বস্তিদায়ক হয় না। দুশ্চিন্তার এক দুর্বহ বোঝা ঘাড়ে চেপে থাকে সারাক্ষণ। যদিও তকদির সাহেব জানেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকেনা কিন্তু রাজধানীতে সে প্রলয় তাকে স্পর্শ করে না। রাজধানীতে নিজ জীবনের ব্যস্ততায় দুশ্চিন্তাগুলোকে এড়িয়ে থাকা যায়। বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা স্ত্রীও টিনের ছাউনি দেয়া দু’কামরার বাড়িতে খাপ খাওয়াতে পারেনা বলে আসতে অনীহা দেখায়। তাই পারতপক্ষে বাড়ি আসতে চাননা তিনি। কিন্তু ইদানিং তাকে আসতে হচ্ছে, শিক্ষিতা রোজগেরে স্ত্রী সংবর্ধনার ব্যাপারটি উপভোগ করে বলেই স্ত্রীর মন রক্ষার্থে আসতে হয় তকদির সাহেবকে। এছাড়া নিজ শহরে এসে সজ্জিত মঞ্চে কারুকার্যময় চেয়ারে বসে অতিথি হবার লোভটাও যে তার মনে নেই তা নয়। এই শহরে দৈন্য পোশাকে, খালি পকেটে, তুচ্ছ মানুষের মত হীনমন্যতায়, ছেঁড়া জুতোয় দিনের পর দিন পথ হেঁটেছেন তিনি। কেউ তাকে চিনতো না। আজ তাই ব্যাপারটি কম উপভোগ করেন না তিনিও। বাড়ি এলে শত সহস্র সমস্যার মাঝেও ক্ষণিক আগে শেষ হওয়া সংবর্ধনা সভার প্রশংসা সূচক বাক্যগুলি তার কানে বাজতে থাকে সেতার এর ঝংকার এর মত। নড়বড়ে চকিতে পাশ ফিরতে ফিরতে ভাবেন এই জরাজীর্ণ বাড়ীটি তাঁর দারিদ্রের স্বাক্ষর, সততার জলন্ত উদাহরণ হয়ে বক্তাদের বক্তব্যে হাজারটা উপমার উপাদান যোগান দেয়।



সম্ভাবনাময় দুটি চরিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠার প্রচেষ্টা

মায়ের সাথে অবশ্যম্ভাবী বাদানুবাদটা বেধেই যায় শেষ পর্যন্ত তকদির সাহেবের ধৈর্য্যরে সীমানা প্রাচীর ভেঙে (যাতে কিনা মূল নিয়ামক এর কাজ করে স্ত্রীর উস্কানি, ইগোতে লাগে তাঁর মায়ের নিস্পৃহতা) আর মায়ের বিরক্তির ফাঁক গলে। জিনাত আরা বেগম তপ্ত হয়েই ছিলেন, সংসারের এতো ঝামেলায় ছেলের নির্বিকার থাকা আর পুত্রবধুর নাক কুঁচকানো তাঁর গায়ে সহ্যহীন বিরক্তির লাভা উত্তপ্ত হয়েই ছিল। কখনো কোনো প্রয়োজনেই ছেলের দ্বারস্থ হননি তিনি, আজ পরিবারের এই কঠিন প্রয়োজনটাকে নিজের মনে করবেনা ছেলে? গাঁ বাচিয়ে বলবে--আমার রোজগার তো জানো মা-- ওর বেতনে কোন রকমে টেনে টুনে চলতে হয়, এতো খরচ আমি কোত্থেকে দেবো?

ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকা জিনাত আরা বেগম এবার আগ্নেয়গিরির মত ফুঁসে উঠেন-কোনোদিন না খেয়ে থাকলেও কি হাত পেতেছি তোমার কাছে? ছেলেও সমান উত্তপ্ত জবাব দেয়-- আমি কি চুরি করবো না কি ডাকাতি? মা ছেলের বাকযুদ্ধটা বুদ্ধিমতীর মত নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখে পুত্রবধু। বাদানুবাদটা ক্রমশ শালীনতার সীমা ছাড়াতে থাকে...........................।


এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ঘটনার অস্থিমজ্জার আড়ালে জীবন্ত অস্তিত্ব নিয়ে জেগে থাকে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। ‘‘তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের উপর মালিকের বঞ্চনা’’ শীর্ষক ধারাবাহিক রিপোর্টটি এক কোটি টাকা মূল্যমানের যে আন্তর্জাতিক পুরষ্কারটি পায় তাতে সংবাদপাড়ায় যে হৈ চৈ এর সূত্রপাত হয়েছিল যখন পুরো টাকাটা তকদির সাহেব দান করে দিল ধ্বসে পড়া গার্মেন্টস ভবনটির আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে তখন সব হৈ চৈ বন্ধ হয়ে বিস্ময়াভিভূত করে দিল তকদির সাহেবের পুরো পরিচিত মহলটাকেই। পত্রিকার সম্পাদক সাহেব কনফারেন্স রুমে সম্মিলনী সভা ডেকে তকদির সাহেবকে সংবর্ধনা প্রদানের সূচনা করেন।

সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটে তখন যখন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তাঁকে তাঁর সদর দপ্তরে ডেকে পাঠিয়ে অভিনন্দন বার্তা হাতে ধরিয়ে দেন আর তার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে সরকারি বেসরকারি টেলিভিশনগুলিতে। শুরু হয়ে যায় তকদির সাহেবের খ্যাত হবার গল্প। কেনো টাকাটা দিতে গেল, স্ত্রীর তো আফসোস ছিলোই নেহাৎ সান্ত্বনা হিসেবে নিয়েছিলেন খ্যাতি উপভোগের বিষয়টি, জিনাত আরা বেগম মুখে উচ্চারণ করেননি, কিন্তু ছেলের খ্যাতির অহংকার নয় বিশাল পরিমাণের টাকাটা দানের আপেটাই বরং পীড়িত করে তাঁর অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকে। আর মোহাম্মদ তকদির হোসেন খ্যাতি উপভোগ করেন, উপভোগ করেন সংবর্ধনা আর নিজের মহত্ত্বের বৈচিত্রময় ব্যাখ্যা। তবু বাস্তব সমস্যাগুলোর মুখোমুখি দিশেহারা পালাতে চান যখন, তখন স্বগতোক্তির মতোই মুখনির্গত হয়-কেন যে মহৎ সাজতে গেলাম। কিন্তু কেউ তাদের শুনতে পায় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন