রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

ইশরাত তানিয়া'র গল্প : ঋতু বৈচিত্র্যময়

একটি দুস্প্রাপ্য ভোর আসতে পারে মিলিয়ন মিলিয়ন স্নায়ুকোষে। সচরাচর হয় না যেমন। দরজার নিচের সামান্য ফাঁক দিয়ে শাঁই করে ঢুকে যায় আধেক কিংবা পুরো একটি পত্রিকা। তেমনি একটি সকাল চলে আসে অনুভবে। রোজকার নিয়মিত ঘটনা ঠেলে সরিয়ে একটি সকাল হয়, যার কথা গতকাল কেউ ভাবেনি। আগামীকালের ভোরটিও হতে পারে অভাবিত। তার জন্য রইল কিছু সময় যাপন। কিছুটা কালক্ষেপন। অনন্ত মহাকালের হিসেবে একটি সকাল আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন। সাদামাটা তেমনি এক সকালে স্টীলের আলমারির আয়না থেকে টিপ তুলে কপালে পরল লুবনা। কিছু না ভেবেই। একটা ছোট কালো বৃত্ত মিষ্টি উজ্জ্বল শ্যামলা মুখে হেসে উঠল আর আঠার হালকা ছাপ লেগে রইল আয়নায়।

ওর সাজ বলতে গরমে সামান্য পাউডার, শীতে ঠোঁটে হালকা ভেসলিনের প্রলেপ। বড়জোর চোখের পাতায় কাজলের পেন্সিল বোলানো। গতকাল বিকেলে আতিকের সাথে রবীন্দ্র সরোবরে যাবার সময় বাড়তি একটু সেজেছিল সে। টিপ পরেছিল। এটুকুই। রবীন্দ্র সরোবরে গিয়ে চটপটি খেতে ভালো লেগেছিল তার। আবার লজ্জাও লাগছিল। বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি। কিছুক্ষণের জন্য চটপটির দোকানে ত্রিপলের ছাউনীর নিচে বসেছিল ওরা। প্লাস্টিকের চেয়ারে। সিগারেটের ধোঁয়া, চটপটির গন্ধ, ছাউনীর ওপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ, মানুষের কোলাহল মিলেমিশে অদ্ভুত পরিবেশ। অচেনা তো বটেই।

লুবনার মনে হচ্ছিল সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের একসাথে ঘোরাঘুরি সবই প্রয়োজনের- মার্কেট, হাসপাতালে। আগে কখনো সে আতিকের সাথে কোথাও এভাবে বেড়াতে যায়নি। আতিকের কাছে এ জায়গার নাম শুনেছে সে। যাচ্ছি-যাব করে ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। আতিক সাপ্তাহিক ছুটির বিকেলগুলোতে বলেছে যাবার কথা কিন্তু সে শোনেনি।

একমাসের বাড়ি ভাড়া বাকি ছিল। গতমাসে বেতন হয়নি লুবনার। দু’মাসের বেতন এক সাথে পেয়েই বাড়িওয়ালাকে ভাড়া বুঝিয়ে দিয়েছে। মাসের শেষে ব্যাগ হাতড়ে, ঝেড়ে, উপুড় করে হয়তো দুএকটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের হয়। এর বেশি কখনো নয়। রিকশা বা অটোতে অফিসে যাবার সাধ্য নেই। পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ তারপর বাকী রাস্তা বাসে চড়ে অফিসে পৌঁছানো। মাসের শেষে বাস ভাড়াটা হাতে রাখতে যাকে হিমশিম খেতে হয় বৈকালিক বিনোদন তার কাছে বিলাসবহুল, রবীন্দ্র সরোবর এক দামী টুরিস্ট স্পট।

বাড়ি ভাড়া দিয়ে লুবনার হাতে আর তেমন টাকা থাকে না। আতিক সংসারের খরচ চালিয়ে নেয়। লুবনা আতিকের বিয়ে হল প্রায় চার বছর। বাচ্চা নেই। বিয়ের এক বছরের মধ্যে আতিকের কোম্পানি বন্ধ। লুবনা চাকরি শুরু করে। তখনও আতিকের চাকরি নেই। নিজেদের কারো বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য পাবার উপায় নেই। আতিক চাকরি পাবার পর আরো একটা বছর গেছে ধারদেনা শোধ করতে। তাই বিয়ের প্রথম দুবছর ছোট্ট কোনও আগন্তুককে তারা পরিবারে আনতে চায়নি। এমন আর্থিক অবস্থায় বাচ্চার জন্য সময়টা বড় দুঃসময়। ঘড়ির কাঁটা থামে না। যদিও বা থেমে যায় কখনো দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর পেরিয়ে যায় স্থির কাঁটাকে অবহেলা করে। এখন সঞ্চয় নেই। ধার দেনাও নেই। দুজনের টানাটানির সংসার ঢিমে তালে চলছে।

লুবনার বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। বাচ্চার জন্য চেষ্টা শুরু করেছিল ওরা বিয়ের দুবছর পর। পরের দেড় বছরেও কোনো কাজ হলো না। ডাক্তার তার শরীরটা ছেনে ছুনে ব্যথা করে দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে কিছু টেস্ট করাতে দিল। কী সব হরমোনাল টেস্ট, ট্রান্সভ্যাজাইনাল সোনোগ্রাফি গাল ভারি সব নাম। স্ট্রেস ফ্রী, হাসি খুশি থাকতে বলে দিল। মাস তিনেক হয়ে এলো প্রায়। এখনো লুবনার টিভিএস করানো বাকি। আগামী মাসে আতিক টাকা দিলে টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে লুবনা ডাক্তারের কাছে যাবে। আতিকেরও কিছু ইনভেস্টিগেশান বাকি।

প্রতিদিন সকালে চা নাশতা তৈরি করে আতিকের চোখে ছোট ছোট ফুঁ দিয়ে ঘুম ভাঙায় লুবনা। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বিছানা ছাড়ে আতিক। ঝটপট নাওয়া খাওয়া সেরে লন্ড্রীফেরত শার্ট গলিয়ে নাকে মুখে দুটো গুঁজে আটটার আগেই বেরিয়ে যায়। আজও তেমনি গেছে। লুবনা সকালে গোসল করে বারান্দায় ভেজা গামছা মেলে দেয়। গা থেকে, গামছা থেকে সাবানের গন্ধ বাতাসে মিশে যায়। বেলীর ঝাড়ে ফুল এসেছে। খোলা চোখে বাইরে তাকানো যায় না। অজান্তেই ভ্রু কুঁচকিয়ে চোখ সরু হয়ে যাচ্ছে। আশ্বিনের শেষেও ঝাঁঝাঁ রোদ। সকাল আটটাতেই মনে হচ্ছে মাঝদুপুর।

লুবনা সাড়ে আটটা নাগাদ বেরুবে। ভেজা কাপড় মেলে অফিসের জন্য চুড়িদার কামিজ বের করল। সাথে চলছে এক কাপ চা। ওর সকালের চা তাড়াহুড়োয় শেষ হয়। কি মনে করে টিপ পরল কপালে। টিপের অবস্থান ঠিকঠাক মতো হলো কিনা দেখে আয়না থেকে ওর চোখ ক্যালেন্ডারের পাতায় চলে গেল। আলমারীর পাশেই দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে।

একমাস দশ দিন হয়ে গেল। লুবনার পিরিয়ড হচ্ছে না।

নির্জন ঘরে বিহ্বল বোসে সে। এতদিন পর শরীরে নেমে এলো শীতের নরম রোদ্দুর না’কি অঘ্রানের নতুন ধান। ধান, ধানের কুটো, দূর্বা ঝরছে শরীরময়। কি এক লজ্জা, কি মিষ্টি-কি মিষ্টি, শিরশিরে, নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের ঢেউ একটু একটু করে ওর গায়ে আছড়ে পড়ে।

দেড় রুমের সংসার তাদের। ঠিক সাবলেট নয়। চারতলায় দুটো পরিবারের একটাই সদর দরজা। সারাদিন খোলাই থাকে। শুধু রাতে বন্ধ করা হয়। দরজা দিয়ে ঢুকে লাগোয়া বারান্দা। বারান্দা দিয়েই দুটো পরিবারকে তাদের নিজস্ব ঘরে ঢুকতে হয়। বারান্দাটা ‘এল’ আকৃতির। ‘এল’-এর ছোট প্রান্তে থাকে আতিক লুবনা আর বড় প্রান্তে থাকে শিমুরা। শিমুদের বাসা দুরুমের। শফিক ভাই আর মাসুদা ভাবির একমাত্র মেয়ে শিমু। মাসুদা বিপদে আপদে লুবনাকে আগলে রাখে। এই একটি নির্ভরতার জায়গা আছে তাই লুবনার বাতাসে অক্সিজেন ভরপুর। বুক ভরে সে শ্বাস নিতে পারে। বারান্দায় এসে দাঁড়াতে পারে।

ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। দশ দিন পেরিয়ে গেল অথচ এত কাঙ্ক্ষিত ঘটনা লুবনা লক্ষ্য করেনি। তার পিরিয়ড নিয়মিত। দিন তারিখের সঠিক হিসাব না রাখলেও লুবনা জানে নিয়ম করেই চলছে। সময়ের ব্যবধানে সামান্য আগুপিছু হচ্ছে। সেটাই স্বাভাবিক। অনিয়মিত হলে বরং তারিখ মনে রাখতে কষ্ট হতো। এমনিতেও দিন তারিখ খুব একটা তার খেয়াল থাকে না। দুমাস খুব অর্থকষ্টে কেটেছে। লুবনার মাথা কাজ করছিল না। অফিসে বেতন নিয়মিত। একটা শিপমেন্ট আটকে যাওয়ায় বেতন পিছিয়ে আরেক মাসে গিয়ে ঠেকল। গতমাসের হাত খরচের টাকা মাসুদার কাছ থেকে ধার নিয়েছিল লুবনা। বেতন হাতে পাবার পর বাড়ি ভাড়া মিটিয়ে মাথা একটু স্থির হয়েছে। মাসুদার টাকা সামনের মাসে শোধ করবে। ডাক্তারের কাছে যাবার না হলে এই মাসেই সে মাসুদাকে টাকা ফিরিয়ে দিত। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে লুবনা ডেট মিস করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা খেয়াল করেনি।

লুবনা কপালে হাত দিয়ে বসে ভাবছে। কোনো ভাবনাই স্থায়ী হচ্ছে না। ভাবনাগুলো এদিক সেদিক ভাসছে। আতিককে এখনই কিছু বলবে নাকি রাতে বাসায় ফিরলে বলবে? তার আগে প্রেগন্যান্সী টেস্ট করা দরকার। অফিস থেকে ফেরার পথে টেস্ট কিট কিনে আনতে হবে। আজ কি লুবনা অফিসে যাবে? গেলেও একটু দেরী করে যাওয়া যায়। যাবার সময় মাসুদা ভাবিকে জানিয়ে যেতে হবে। না থাক। নিশ্চিত না হয়ে কাউকে কিছু বলা ঠিক হবে না। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই লুবনার মাথা একটু টলে উঠে। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল চেয়ার ধরে। হাত বাড়িয়ে টিফিন বক্স নিল। মোবাইল ফোন ব্যাগে ঢুকাতে গিয়ে দেখল হ্যাং হয়ে আছে। অন করা যাচ্ছে না। দরজায় তালা লাগিয়ে লুবনা শিমুদের ঘরে ঢুকল।

শিমু স্কুলে গেছে। শফিক শিমুকে স্কুলে দিয়ে তার দোকানে চলে যায়। নীলক্ষেতে বইয়ের দোকান আছে শফিকের। ঘর খালি অথচ দরজা খোলা। রান্না ঘর থেকে ছ্যাঁত-ছোঁত শব্দ আসছে। লুবনা রান্না ঘরে গেল। মাসুদা ওর দিকে তাকিয়ে হাসে। ঝকঝকে এ্যলুমিনিয়ামের পাতিলে ঢাকনি চাপিয়ে জিজ্ঞেস করে- অফিসে যাওনি এখনো?

লুবনা বলে- এই তো বেরুচ্ছি। দেরী হয়ে গেল। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দেন তো ভাবি।

মাসুদা অবাক। লুবনা নিজেই ফ্রীজ খুলে পানি নিয়ে খেতে পারে। মাসুদা উঠে চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখা ওড়নায় হাত মোছে। তারপর পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসে পানি ঢালে। এক বাটি রসমালাই দেয়। লুবনা তৃষ্ণার্তের মতো এক নিমিষে পানির শেষ বিন্দুটুকু শুষে নেয়। মিষ্টি খায় না। কিছু বলতে গিয়েও বলে না। টেবিলের ওপর গ্লাস রেখে বলে- আসি। মাসুদা দুই সেকেন্ড লুবনার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল- কখনও দাঁড়িয়ে পানি খেয়ো না, অমঙ্গল হয়।



রোদ যেন কাঁচের টুকরো। রাস্তায় পা দিয়ে লুবনার মনে হলো শরতের রোদ তার সারা শরীরে কাঁচের মতো বিঁধছে। দশ মিনিট হাঁটলে মতিঝিল। মতিঝিল থেকে বাংলা মটর মোড়ে নেমে আবার পনের মিনিট হাঁটা। লুবনার অফিস ইস্কাটনে। কড়া রোদে এতটা পথ হাঁটলে যদি জ্বর এসে যায়। এখন জ্বর হলে সমস্যা হতে পারে। লুবনা হাঁটা থামিয়ে ব্যাগ খুলল। দুই টাকা, পাঁচ টাকা, দশ-বিশ টাকার নোট মিলিয়ে মোট একশো বত্রিশ টাকা আছে। সিএনজি স্কুটারে অফিসে যাবার মতো টাকাও নেই। ফেরার সময় সন্ধ্যা হয়ে যায়। তখন ভীড় থাকলেও রোদ নেই। চেইন টেনে ব্যাগের মুখ আটকায় লুবনা তারপর ওড়না দিয়ে ভাল করে যতটুকু সম্ভব মাথা-গা পেঁচিয়ে ঢেকে রাখে। বাস ধরতে হবে। লুবনা সাবধানে হেঁটে এগিয়ে যায়।

শাপলা চত্বর পেরিয়ে লুবনা বাস স্টপেজে এসে দাঁড়ায়। চারিদিকে শুধু মানুষ। অফিসগামী লোকেরা ভিড় করে আছে। একেকটি বাস আসছে আর লোকজন হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ছে। মানুষ ভর্তি বাসগুলো হুশ হুশ করে চলে যাচ্ছে। ভ্রাম্যমান দোকানগুলো ফুটপাথ পেরিয়ে রাস্তা অব্দি নেমে এসেছে। হকাররা নানা রকম জিনিসপাতি বিক্রি করছে। পত্রিকা, নকল প্রসাধনী, মোজা, ছাতা, কলম। এমন কি মার্বেল, কারেন্ট আফ্যায়ার্স-এর বই, কাগজি লেবু। চিরুনি, লাইটার, আতর কী যে এখানে নেই লুবনা তা ভেবে কূল পায় না। ছোট ছোট টুল পেতে বাসের টিকেট সাজিয়ে বিক্রি করছে বাস কোম্পানীর লোকজন। টিকেট হাতে লুবনা বাসে উঠল। সৌভাগ্যই বলতে হবে। জানালার পাশে এক সিটের বসার জায়গা আছে। লুবনা বসে পড়ল। জানালা খুলে দিতেই বাস চলতে শুরু করল।

বাতাসে চুল উড়ছে লুবনার। ঘাম ঘাম মুখে ধুলোবালু আটকে যাচ্ছে। সুতির ওড়না দিয়ে সে মুখ মোছে। রেড সিগন্যালে বাস থামলে লুবনা প্লাস্টিকের মিনারেল ওয়াটার বোতল খুলে দুঢোঁক পানি খেয়ে তিন আঙ্গুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোতলের মুখ লাগায়। চোখ রাস্তার পাশে দোকানের পোস্টারের ওপর। চে গুয়েভারা, হলিউডি-বলিউডি ফিল্মের নায়ক নায়িকা, মডেল, খেলোয়াড়দের পাশে ফ্রক পরে হাসছে ছোট মেয়ে। একটা গোলাপি পরি। এলোমেলো চুলের বিষণ্ণ বালক গাছে হেলান দিয়ে ভায়োলিন বাজাচ্ছে। পায়ের নিচে নরম কচি ঘাস। প্যান্ট হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে গেছে। আরেক পোস্টারে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে এক দেবশিশু। ঠোঁটের কোণ থেকে লালা গড়িয়ে চিবুকে এসে জমেছে। এই ঝরল বলে কিন্তু ঝরছে না। নিষ্পাপ হাসি চোখে-মুখে। দেখে দেখে লুবনা চোখ মোছে। পেট্রোল পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ ছাপিয়ে চারিদিকে বেবী পাউডারের গন্ধ ছড়িয়ে যায়।

দুবছর ধরে প্রতিটি মাসে লুবনা ভেবেছে এক দিন তার গা গুলোবে। মনে মনে সুখী কিন্তু মুখে বিরক্তি নিয়ে বলবে- এত ভার ভার লাগছে শরীরটা! আর পারি না। আতিক সস্নেহে চুমু খাবে তার সামান্য ফোলা পেটে। বলবে- আস্তে হাঁটো, লুবনা! এ সময় তাড়াহুড়ো করা ঠিক না। মাসুদা ভাবি নিশ্চয়ই নকশী কাঁথা সেলাই করে দেবেন। মা এতোগুলো করে আচার পাঠাবে। অফিস থেকে ফিরতে দেরী হলে শাশুড়ি বিরক্ত হয়ে বলবেন- সন্ধ্যা বেলা অমন খোলা চুলে বাইরে থেকো না। আলগা বাতাস লাগবে গায়ে। লুবনা জায়নামাযে বসে হাত তুলে আল্লাহর কাছে সুস্থ-সবল সন্তান চাইবে। একুশ মাস ধরে একই লুবনা স্বপ্ন দেখছে প্রতি মাসে। আজ, এখনও সে স্বপ্নে পৌঁছলো। বাস এতো জোরে ব্রেক করল যে লুবনা সামনের দিকে ঝুঁকে গেল। হাত দিয়ে শক্ত করে হ্যান্ডল ধরল। বাস শাহবাগ পেরিয়ে সোনার গাঁ রোডে।

বাংলা মটর মোড়ে এসে বাস থেকে নেমে যায় লুবনা। রাস্তা পার হয়ে ইস্কাটনের দিকে হাঁটা শুরু করে। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে নয় পেরিয়েছে। যাক গে’। ছেলে নাকি মেয়ে হবে, এমন কোনো চিন্তা নেই লুবনার। আতিক বলবে- রাজকন্যা আসবে দেখো! আমার মেয়ে! মেয়ে হলে আমি নাম রাখবো- লীলাবতী! লুবনা হাসবে, বলবে না কিছুই। ছেলে বা মেয়ের নাম সে অনেক আগে ঠিক করে রেখেছে। আতিকের রুচিবোধে লুবনার বিশেষ আস্থা নেই। লীলাবতী, কঙ্কাবতী হলো কিছু? মনে মনে হাসে লুবনা। আতিক একটু মন খারাপ করবে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। লুবনাকে এত ভালোবাসে আতিক! লুবনা দিন বললে দিন। রাত বললে রাত।

লুবনা হাঁটছে আর কী কী সব ভাবছে। পাশ থেকে হঠাৎ একটা রিকশা বেরিয়ে গেল ডান হাত স্পর্শ করে। ছিটকে সরে দাঁড়াল সে। একটা বিদ্রুপের স্বর কানে আসল- মহিলা চোখে কিছু দেখে না। পারলে রিকশার উপরে আইসা পড়ে। কী হলো বুঝতে না বুঝতেই রিকশা বেমালুম হাওয়া। কথাগুলো শুনে লুবনার গা জ্বলছে। এই রাস্তা দিয়ে রিকশা চলা নিষেধ। অথচ সে কিছুই বলতে পারল না। আলটপকা লাফ দেয়াতে ডান পায়ের স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেছে। সেইফটি পিন দিয়ে আপাতত কাজ চলবে। অফিসে গিয়ে পিওনকে দিয়ে স্যান্ডেল মুচির কাছে পাঠাতে হবে। টলটলে চোখে গভীর মায়ায় পেটের ওপর হাত রাখে সে। পড়ে যে যায়নি এটাই বড় কথা।



অফিসে পা দিয়ে এসির ঠাণ্ডা বাতাসে লুবনা ক্লান্তি ভুলে যায়। ডেসপ্যাচে কাজ করে সে। সারাদিন হাজারটা পেপার আসছে যাচ্ছে। ডেস্ক থেকে মুখ তোলার উপায় নেই। ঝড়ের বেগে কাজ করে সে। আজকে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা এন্ট্রি ভুল করল। কিছু ডক্যুমেন্ট এক জায়গার বদলে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিল। সব কিছু ঠিকঠাক করে মোবাইল ফোন অন করল লুবনা। অন হয়ে আবার বন্ধ হয়ে গেল। ফোন সেট চলছে নিজের ইচ্ছে মতো। বিরক্ত হয়ে ফোন ব্যাগে রেখে দিল সে।

একটা থেকে দুটা লাঞ্চ টাইম। লুবনা ঘড়ি দেখে। দশ মিনিট পর লাঞ্চ আওয়ার শুরু হবে। হাতের কাজ শেষ করে সে কম্পিউটারে সব উইন্ডো মিনিমাইয করে। ওয়াশ রুমে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দেয়। ভেজা হাত কাঁধে গলায় বুলিয়ে বেশ আরাম লাগছে। আয়নায় নিজের মুখ দেখল মনযোগ দিয়ে। ক্লান্ত না বরং উজ্জ্বল বলে মনে হলো। ডেস্কে ফিরে এসে টিফিন বক্স খুলে ঠাণ্ডা রুটি আর ভাজি মুখে দিয়ে বুঝল আর খাওয়া যাবে না। এতো বিস্বাদ। তবুও জোর করে কয়েক টুকরো রুটি মুখে পুরল। লাঞ্চের সময় সবার জন্য এক কাপ লেবু চা বরাদ্দ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল লুবনা। একটা প্রমোশন হওয়ার কথা ছিল তার। এতদিনেও খবর নেই ইন্টারভিউয়ের। নিজেকেই খোঁজ খবর করতে হবে।

লুবনার ডেস্ক থেকে একটু দূরে বসেন সালেহা আপা। কাছে এসে বলেন- লাঞ্চ করলে না, শরীর ভালো তো? মিটমিট হাসলেন। প্রশ্নের অনুচ্চারিত অংশটুকু তার ভ্রু ভঙ্গী আর চোখের ঠারে বুঝে নিল লুবনা।

-না, না সেরকম কিছু না। চাপা অস্বস্তি আর ভালো লাগায় বিচলিত লুবনা।

-দেখো, সেরকমই কিছু হবে।

অস্বস্তির অনুভূতিকে চাপিয়ে লুবনার ভালো লাগার অনুভূতি তীব্রতর হয়। কত বিচিত্র অলিগলি দিয়ে অনুভুতি বইছে। অনুভূতির এক ধারার সাথে আরেক ধারা মিশে যাচ্ছে। ভালো লাগা আর লজ্জা মিলে নতুন মিশ্রধারা। সে আবার আরেক গলিতে শঙ্কার অনুভূতির সাথে মিশে যায়। উদ্বেগের কণ্ঠলগ্না হয় ভয়ের অনুভব। মানুষ অনুভূতির কতটুকুই বা বোঝে। প্রায় সবটুকুই উপলব্ধির বাইরে। ভাবাবেগের ধারা থেকে কেউ এক আঁজলা তুলে নেয়, কেউ বা গলা পর্যন্ত ডুবে রয়, কেউবা ভেসে চলল। লুবনা শেষ দলের। দুহাত দিয়ে অনুভুতির স্রোত ঠেলে সরালো সে। সামনে কাগজের পাহাড়। এ পাহাড় ডিঙিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই সে বাড়ি ফিরতে চায়। দুটো বেজে গেছে। আজ ফার্মেসীতে যেতে হবে তাই একটু আগেই অফিস থেকে বেরনোর চেষ্টা করবে। একটা ফাইল হাতে নিল লুবনা।



বাড়ি ফিরে সে প্রেগন্যান্সী টেস্ট স্টিকের প্যাকেট খোলে। সব নির্দেশনা দেয়া আছে। পড়ে না বুঝলেও অসুবিধে নেই। ছবি এঁকে বর্ণনা দেয়া। এখন ইউরিন টেস্ট করা যাবে না। করতে হবে সকালে। আলমারি খুলে কাগজপত্র এবং স্টিক গুছিয়ে রাখে।

বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে খুব ক্লান্ত লাগছিল লুবনার। এবার খুব সাবধানে হাঁটছিল সে। সামনেই ফার্মেসী। রাস্তার পাশে এক মহিলা বাচ্চাসহ ভিক্ষা করছে। বাচ্চার বয়স তিন কি চার হতে পারে। লুবনা ব্যাগ খুলে পাঁচ টাকা দিয়ে দিল। মানুষ কত কষ্ট করে বেঁচে থাকার জন্য। তাদের চেয়েও কত খারাপ অবস্থায় আছে মানুষ। কী এমন হতো বিয়ের প্রথম বছর থেকে চেষ্টা করলে। এতদিনে লুবনার বাচ্চার বয়স হতো তিন। লুবনা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়।

হেলথ কেয়ার ফার্মেসীতে গিয়ে লুবনা ওষুধ ওষুধ গন্ধ পেল। ওষুধের গন্ধমাখা বিকেল বাতাসে একটা ভয়-ভয় অনুভূতি মিশে গেল। ফার্মেসির দেয়ালে প্রিন্টেড প্রমোশনাল ম্যাটেরিয়াল ঝুলছে। হালকা গোলাপি রঙের ওপর গাঢ় গোলাপি রঙে বোল্ড করে লেখা ‘ঋতুবন্ধে এইচ আর টি’। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপী। ঋতুবন্ধ শব্দটিতে লুবনার চোখ বারবার চলে যায়। হট ফ্ল্যাশ, শরীরে জ্বালা ভাব প্রতিরোধ করুন। এ অন্য ঋতু বন্ধ। পোস্টার থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় সে। এরই মধ্যে সেলসম্যান বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্টিকের প্যাকেট কাউন্টারের কাঁচের ওপর ছড়িয়ে দিল। কয়েকটা স্টিক দেখে সে একটা তুলে নিল।

বাড়ির সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ায় লুবনা তারপর ধীরে ধীরে চারতলায় সিঁড়ি বেয়ে ওঠে। অন্যদিন এ সময়ের মধ্যে সে দুবার চারতলায় উঠে যেত। ঘরের তালা খুলে লুবনা ভেতরে ঢোকে। টিউব লাইট জ্বালায়। কাপড় ছাড়ে, ফ্রেশ হয়। তারপর প্রেগন্যান্সী টেস্ট স্টিকের প্যাকেট খুলে দেখে। আলমারিতে প্যাকেট তুলে রেখে চা বানায়। মাত্র সাতটা বাজে। আতিক আসতে আসতে রাত ন’টা বাজবে।

টিভি অন করে চায়ের কাপে চুমুক দেয় লুবনা। গতকাল রিকশায় চড়া একদম ঠিক হয়নি। আকাশী রঙের ম্যাক্সিতে সুতো আলগা হয়ে চারটি বোতামের একটি ঝুলছে। হাতে বোতাম ধরে লুবনা ভাবছে এখান থেকে ধানমন্ডি ম্যালা দূর! কেনো যে পিরিওড বন্ধ হবার ব্যাপারটা আগে খেয়াল করলো না! বোতাম খুলে এলো। উঠে পাউডারের কৌটোতে বোতাম রেখে দিল লুবনা। ইস! গতকাল সিঁড়ি দিয়েও সে কেমন তাড়াহুড়ো করে উঠল। অজানা আশঙ্কায় মনে মনে শিউরে ওঠে সে।

চা শেষ করে লুবনা বিছানার চাদর পাল্টায়। ব্যবহৃত চাদর কাল সকালে আতিক ধুয়ে দেবে। বারান্দায় যায় লুবনা। বুক অবধি দেয়াল। দাঁড়িয়ে গলির রাস্তা দেখে কিছুক্ষণ। রিকশা, গাড়ী চলছে ক্রিং ক্রিং, পিপ পিপ। শিমু পড়তে বেসেছে। সুর করে পড়ছে। সূর্য পূর্বদিকে ওঠে। দা সান রাইজেজ ইন দা ইস্ট। সূর্য অস্ত যায়। দা সান সেটস। অথচ সূর্য ওঠেও না, অস্তও যায় না। সূর্য স্থির। পৃথিবী ঘুরে ঘুরে অত সব কাণ্ড বাধাচ্ছে। দায় সব সূর্যের। লুবনা শুকিয়ে যাওয়া কাপড় ঘরে এনে ভাঁজ করে। রাতের ভাত রান্না করে। সকালে রান্নার জন্য আনাজপাতি কুটে রাখে। তারপর ভাতের ফ্যান ঝরাতে দিয়ে খাটে গা এলিয়ে দেয়।



রাতে ঘুমনোর সময় লুবনা আতিকের হাত ধরে থাকে, বলে- এখনো শিওর না। সকালে টেস্ট করব। সব শুনে আতিক খুব খুশি। আনন্দে আচ্ছন্ন দুজন। আতিক লুবনাকে কাছে টেনে বলে- চাকরি, সংসারের কাজ তোমার অনেক কষ্ট হয়ে যাবে, তাই না? লুবনা হেসে বলে- কষ্ট কেনো হবে? তুমি তো আছো। সংসারের কাজ দুজনে মিলে করব। আতিক লুবনার গালে হাতের উল্টো পিঠ বুলিয়ে আদর করে দেয়। লুবনা বলে- আজ থাক। লুবনার কপালে একটা চুমু দেয় সে। তারপর পাশ ফিরে শোয়।

সকালের অপেক্ষায় লুবনার আর ঘুম আসে না। সে উঠে বসে। সারাদিনের ক্লান্তিতে আবার ঝিমিয়ে পড়ে। একটি নবজাতককে বুকের কাছে নিয়ে সে শুয়ে। তন্দ্রাচ্ছন্ন লুবনা বাচ্চার ছোট ছোট হালকা নিঃশ্বাসের স্পর্শ পায় উন্মুক্ত বুকের ত্বক। দুধ আর লালায় ভেজা খয়েরী স্তনবৃন্তটুকু বাতাস লেগে শিরশির করে। কে যেন ছোট্ট মুখে শুষে নেয়। মুখ সরিয়ে নিলে আবার আলগা বাতাস লেগে শিরশির। রক্তের ধারায় ভারি শরীর টেনে সে হেঁটে যায়। অনাবৃতা। এত রক্ত! বাস স্টপেজ, রাস্তা রক্তে ভাসছে। বাচ্চাটি কাঁদে। সোনা, খিদে পেয়েছে? কেউ নেই কোথাও। শুধু একলা বাস দাঁড়িয়ে। লুবনা দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করে। বাস ছেড়ে দেবে। পারছে না। রক্তে বার বার পা পিছলে যাচ্ছে। মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে লুবনা।

তীব্র অস্বস্তিতে লুবনার ঘুম ভাঙ্গে। ফোঁটা ফোঁটা আলো ছড়াচ্ছে আকাশ। সে টয়লেটে যায়। ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। কাল সন্ধ্যায় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। গলির মাথায় সবজির ভ্যানে লাউয়ের ডগা, ঝিঙ্গে, পটল মিলেমিশে আছে। দাম দস্তুর করছে প্রাতঃভ্রমনকারীদের একজন। পত্রিকা বোঝাই সাইকেল পোঁ পোঁ ছুটছে। দরজার নিচে চলছে বিলি বন্টন। ঝাপসা চোখে চেনা দৃশ্যগুলো যেন অপরিচিত মানুষের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে।



এমন একটি ভোরের কথা গতকাল লুবনা ভাবেনি। টেস্ট কিট ঘুমিয়ে আলমারির ভেতর। বাইরে আশ্বিনের ভোর ঠাণ্ডা বাতাস ছড়ায় চব্বিশ ঘণ্টার স্বপ্নযাপনে। লুবনার মনে পড়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে হবে। কাক ডাকছে, চড়ুইও। কী এক প্রতীক্ষায় লুবনা বারান্দায় দাঁড়িয়েই থাকে। আজকের ভোরটিও অভাবিত তবে গতকালের ভোরের মতো নয়।

1 টি মন্তব্য:

  1. সেই কবে থেকে শুনে আসছি ভোর হবে। আমিও "ভোর হবে" এই বিশ্বাস সন্তানে হাতে ধরিয়ে বলবো, আসি।

    উত্তরমুছুন