রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

সুবোধ ঘোষ : চোখ গেল

শিলং-এর কুয়াশা খেয়ালী হলেও কেমন একটু অলস ও শান্ত। দেখে তবু বোঝা যায়, আর কতক্ষণ থাকবে, কোন দিকে চলে যাবে, কিংবা গলেই যাবে কিনা।

কিন্তু সেই শিলং-এরই মিস্টার নাগের ভাগ্নী অপরাজিত রায় যেন এক ছটফটে খেয়ালের কুয়াশা। গত পূজার সময় কলকাতার দিক থেকে শিলং-এ এল এবং এখনও শিলং-এই আছে । কিন্তু আর কতদিন যে থাকবে, কিংবা একেবারে থেকেই যাবে কিনা, দেখে কিছু বোঝা যায় না ।

থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে কার দিকে যে ঢলে পড়বে আর গলে যাবে এই নবাগতা কুহেলিকা, তাও এখনো কিছুই অনুমান করতে পারা যাচ্ছে না।



বাজার-দোকানের কলমুখরতার প্রান্ত থেকে একটু দূরে, লাবান-এর নিভৃতে একটা গড়ানো জমির গায়ে ছবিঘরের মত সাজানো ছোট বাংলোটাই হলো মিস্টার নাগের বাড়ি । বাড়ির ফটকটা লতানে গোলাপের তোরণের মত। লতার মধ্যে থোকা থোকা সাদা গোলাপ হাসে, আর, যেন সেই লতানে গোলাপের হাসি নিজের মুখে তুলে নিয়ে অপরাজিতা রায় ঐ ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে কিংশুককে স্বাগত ভঙ্গি নিবেদন করে সকালের দিকে, আর হিরন্ময়কে সন্ধ্যায়। হাসির কম-বেশি হয় না। তাই বুঝতে পারা যায় না, অপরাজিতার মন কোন দিকে, কার দিকে ? খিল-খিল করে হেসে ওঠে সামনের বাড়ির ঐ জানালার কাছে প্রফেসরের দুই মেয়ে, মীরা আর হীরা।

বোকা নয় অপরাজিতা, মীরা আর হীরার ঐ হাসির অর্থ বুঝতে পারে। ঐ হাসি হলো একটা মিষ্টিমাখানো টিটকারির ঝংকার। অঙ্কের প্রফেসরের দুই মেয়ের চোখেও যেন অঙ্ক আছে, এক পলক দেখে নিয়েই হিসাব করে বুঝে ফেলতে পারছে, এতদিন হয়ে গেল তবুও দু'জনের কারও জন্যই অপরাজিতা রায় তার মুখের হাসির মাপে কম-বেশি করতে পারছে না । মীরা আর হীরা হয়তো মনে করছে যে, দুজনকেই ভালবেসে ফেলেছে অপরাজিতা রায় ।

সন্ধ্যাবেলায় ফটকে দাঁড়িয়ে বিদায় নেবার সময় হিরন্ময় বলে—আজ তাহলে আসি অপরা ।

সকালবেলায় তেমনি ঐ ফটকের কাছেই দাঁড়িয়ে লতানে গোলাপের একটা পাতা পট করে ছিড়ে নিয়ে কিংশুক বলে—আজকের মত বিদায় দাও, জিতা ।

মুখ লুকিয়ে ফেলে অঙ্কের প্রফেসরের দুই মেয়ে । মীরা আর হীরার কানেও বোধহয় অঙ্ক আছে । শোনামাত্র হিসেব করে বুঝে ফেলেছে যে, অপরাজিতা যেন নিজেকে দুটুকরো করে দিয়েছে। একটা টুকরো হলো, অপরা, আর একটা টুকরো হলো, জিতা । ভালবাসাকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে দুই দাবিদারের হাতের কাছে তুলে দিয়েছে অপরাজিতা।

কিন্তু ভুল ধারণা করেছে মীরা আর হীরা। ঐ সব ধারণার কোনটাই সত্য নয়। অপরাজিতা রায় ভালবাসে শুধু নিজেকে ।

হিরন্ময় আসে, কিংশুকও আসে, কিন্তু দুজনের কাউকেই সত্যি ভালবেসে ফেলেনি অপরাজিতা । তবে নিজের মনের দিকে তাকিয়ে এই সত্য অস্বীকার করতে পারে না অপরাজিতা, তার ভালবাসার জীবনে এই দুজনেরই কোন একজনকে আহ্বান করতে হবে।

গত তিন মাসের মধ্যে অন্তত বার দশেক তো হবে, মামিমাও বেশ স্পষ্ট করে অপরাজিতাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলেছেন—কি রে, তুই এখনো কিছু বলছিস না কেন ?

হয় হিরন্ময়, নয় কিংশুক, দুজনের কোন একজনের নাম মামিমার কাছে মুখ খুলে বলে দিতে হবে এবং তারপর বোধহয় আর দশটা দিনও লাগবে না, তারই সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাবে অপরাজিতার ।

সত্যিই, অপরাজিতার মনের মধ্যে যেন একটা কুহেলিকা ছটফট করছে। হিরন্ময় আর কিংশুক, রূপে-গুণে দুজনেই ভাল । এবং দুজনের দুই ভালত্বের মধ্যে মস্ত বড় পার্থক্যও আছে। তবু বুঝে উঠতে পারে না অপরাজিতার মন, কার ভালবাসা পেলে সুখী হবে তার জীবন । দুপুরের সূর্য আর শেষ রাতের চাঁদ, এই দুয়ের মধ্যে কত পার্থক্য। কিন্তু এর মধ্যে একটি বেছে নিতে বললে কেউ যদি দোমনা হয় আর ফাঁপরে পড়ে, তবে তাকে দোষ দেওয়া যায় না ।

কে জানে, মীরা-হীরা হয়তো অপরাজিত রায়ের মনের গভীরে একটা লজ্জার কাঁটা ফুটিয়ে দেবার জন্যই ওরকম খিল-খিল করে হাসে, কিন্তু জানে না ওরা, অত নরম মাটির মন নয় অপরাজিতার । নরম পাথরের মন । ওদের ঐ টিটকারির ঝংকারের মধ্যে অপরাজিতা রায় একটা হিংসুটে আক্ষেপের কাতরানি শুনতে পায়। অপরাজিতা এখানে আসবার পর থেকে লাবান-এর অমন সুন্দর মীরা-হীরাও নিম্প্রভ হয়ে গিয়েছে। এখন সব আলো নিয়ে ফুটে রয়েছে শুধু অপরাজিতা। মামা মিস্টার নাগকে গাড়ির পিছনের সিটে বসিয়ে অপরাজিতা নিজে স্টিয়ারিং-এর চাকা ধরে বসে, আর একটানা গাড়ি ছুটিয়ে চলে যায় গলফের মাঠের দিকে। অনেক ঘুরে আর অনেক বেড়িয়ে যখন আবার বাড়ির দিকে গাড়ি ফেরায় অপরাজিতা, তখন দেখা যায়, অপরাজিতার ঝকঝকে মুখটা বেশ একটু ক্লাস্ত হয়েছে, আর সেই মুখের উপর রুক্ষ ও ফাঁপানো চুলের এক-একটা সাজানো স্তবক লুটােপুটি করে ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু তবু কী সুন্দর দেখায় । অপরাজিতা জানে, দুধার থেকে অনেক চক্ষুর বিস্ময় ওরই মুখের দিকে তাকিয়ে উতলা হয়ে যাচ্ছে।

কাকে ভালবাসতে হবে, ঠিক এই প্রশ্ন আজও দেখা দেয়নি অপরাজিতার মনে, কারণ অপরাজিতার কল্পনায় আর আকাঙক্ষায় এই প্রশ্নটা জীবনের প্রথম প্রশ্ন নয়। তবে কি দ্বিতীয় প্রশ্ন ? তাও নয়। যার ভালবাসা নিতে ভাল লাগবে, তাকেই ভালবাসতে পারা যাবে, অপরাজিতাও তাকেই ভালবাসবে, এই তো সহজ ও সরল সত্য ।

কিন্তু হিরন্ময়, না কিংশুক ? কার ভালবাসা পেতে ইচ্ছা করে অপরাজিতার। যেমন অপরাজিতার মনের ভিতরে, তেমনি বোধহয় মামা-মমির, মীরা-হীরার এবং লাবান-এর আরও দশজনের চোখে এই প্রশ্ন ঘনিয়ে আছে। অপরাজিতার মনটা যেমন বেছে নিতে পারে না, তেমনি মীরা-হীরাও বুঝে উঠতে পারে না, কাকে বিয়ে করবে অপরাজিতা ।

লতানে গোলাপের তোরণের কাছে দাঁড়িয়ে আজও যে হাসি মুখে নিয়ে অপরাজিতা রায় অভ্যর্থনা জানায় হিরন্ময়কে কিংবা কিংশুককে, সে হাসি অপরাজিতার জীবনেরই একটি জিজ্ঞাসা । অপরাজিতার মনের কুহেলিকা প্রতি মুহূর্ত ছটফট করে ভালবাসছে অপরাজিতাকেই। অপরাজিতা যেন জানতে চায়, তার এই পঁচিশ বছর বয়সের সুন্দর জীবন যে সমাদর ও সম্মানের জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে পিয়াসী লতার ফুলের মত, সে সম্মান ও সমাদর পাওয়া যাবে কার ভালবাসায় ? হিরন্ময়ের কিংবা কিংশুকের । শেষ রাতের চাঁদ অথবা দুপুরের সূর্য, কার আলো পেলে সবচেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে উঠবে অপরাজিতা ।

বললে হিরন্ময়কেই বলতে হয় শেষ রাতের চাঁদ আর কিংশুককে দুপুরের সূর্য। হিরন্ময় বেশ শান্ত, আর কিংশুক বেশ একটু তীব্র । এরাও দুজনেই কলকাতার দিক থেকে এসেছে, এরা শিলং-এর কেউ নয়। তবে এরা দুজনেই যে টাকার মানুষ, সে কথা সারা শিলং কদিনের মধ্যেই দেখে বুঝে নিয়েছে।

টাকার দিক দিয়ে বিচার করলে হিরন্ময় আর কিংশুকের মধ্যে এমন কিছু ছোট-বড় পার্থক করা যায় না। হিরন্ময়ের জুট আর কিংশুকের আয়রন, শেয়ারের দামের হিসাব নিলে কাউকে কারও চেয়ে কম মহৎ বলে মনে হবে না। মিস্টার নাগের কাছে সে-সব তথ্যের কিছুই অজানা নেই। বেহালাতে হিরন্ময়ের পাঁচটি বাড়ি আছে, আর কিংশুকের বাড়ি আছে দমদমে, ছোট-বড় মিলিয়ে মোট সাতটি । হিরন্ময় হলো এক ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর, আর কিংশুক হলো এক ইনসিওরেন্সের। এই শিলং-এই নিজের নিজের টাকায় কেনা দুটি শৌখীন বাংলোর আশ্রয়ে থাকে দুজনে । হিরন্ময় একটু নিকটে আর কিংশুক একটু দূরে। রিলবং-এ এক উঁচু টিলার উপর এক পাইনকুঞ্জের ছায়ার কাছে হিরন্ময়ের বাংলো, বাংলোর গায়ে কাচের কাজই বেশি। আর ডাউকি রোডের পাশে এক নিভৃতে, যেখানে দূরের বনের বুক থেকে ভেজা তেজপাতার সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসে, সেখানে কিংশুকের বাংলো, বাংলোর গায়ে কাঠের কাজই বেশি।

গাড়ি আছে দু'জনেরই। হিরন্ময়ের এক সিডান, আর কিংশুকের এক টুরার ।

হিরন্ময়ের চোখ দুটো ছাড়া মুখের আর সবই দেখতে সুন্দর । আর, কিংশুকের মুখের মধ্যে একমাত্র চোখ দুটি সুন্দর।

আর, এছাড়া আরও দুটি সত্য আছে, যে সত্য হলো দুজনের জীবনেরই দুটি ভয়ানক খুঁত ।

হিরন্ময়ের চোখ হলো পাথরের চোখ। আর কিংশুক হলো বিবাহিত, স্ত্রী আছে, যদিও স্ত্রীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। একজনের চোখের মধ্যে এক অন্ধকারের আঘাতের দাগ, আর একজনের মনের মধ্যে আর এক অন্ধকারের আঘাতের দাগ। এই দুই আঘাতের দাগকে জীবনেরই খুঁত এবং সমান কঠোর ও হিংস্র দুটি খুঁত বলে মনে হয়েছিল অপরাজিতার। অপরাজিতার মত মেয়ের আকাঙ্ক্ষার জগতে দুজনেই অস্পৃশ্য।

প্রথম যেদিন জানতে পেরেছিল অপরাজিতা, কী দুঃসহ মনে হয়েছিল সেই দুই কঠোর সত্যকে । কিন্তু তারপর আর নয়। একজনের শান্ত পাথুরে চোখের মায়ার আবেদনে এবং আর একজনের তীব্র ভাসা-ভাসা চোখের জ্বালার আবেদনে বুঝতে পেরেছিল অপরাজিতা, এই খুঁত জীবনের খুঁত নয়, এই দুটি ভাল মানুষের জীবনের দুটি দুঃখ ।

চোখে একটা ছায়া-ছায়া কাচের চশমা, ফ্রেমটা সোনার, হাসি-হাসি মুখ নিযে আর বাদামী রঙের ছোট্ট একটা স্প্যানিয়েলের গলার শিকল একহাতে ধরে গাড়ি থেকে নেমে যখন তর-তর করে হেঁটে আসে হিরন্ময়, তখন কার সাধ্য বুঝবে যে, ঐ মানুষটার চশমার ছায়া-ছযা কাচের পিছনে নিরেট একটা অন্ধতা দুটি পাথরের চোখের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে ?

আর কিংশুক । মীরা-হীরা কতবার নানা স্টাইলের সাজে ফুরফুরে পরীর মতন রঙিন হয়ে এই ফটকেরই কাছে কিংশুকের চোখের উপর দিয়ে বেণী দুলিয়ে যাওয়া-আসা করেছে ; কিন্তু দেখেছে অপরাজিতা, কোন দোলা লাগে না কিংশুকের মনে । ভুলেও মীরা-হীরার দিকে একবার তাকায় না কিংশুক ! এই দুটি মানুষ দেখতে শুনতে কোন নিখুঁত মানুষের চেয়ে কম নিখুঁত নয়।

মীরা-হীরার খিল-খিল হাসির শব্দ শুনে এক-এক সময় সত্যিই ভয় পায় অপরাজিতা, আর নিজেরই উপর বিরক্ত হয়। ঐ হাসি যেন টের পেয়েছে, অপরাজিতার মনের সমস্যাটা কোথায় । এতদিন ধরে দেখে আর শুনেও অপরাজিতা বুঝে নিতে পারলো না, কার ভালবাসা ভাল লাগবে, এটাও যে অন্ধতারই মত একটা ফাঁপরে পড়া আর দিশেহারা দুর্বলতা । মীরা-হীরার হাসি অপরাজিতার মনের ঠিক সেই দুর্বলতার মধ্যে যেন কাঁটা ফুটিয়ে দেয়, অপরাজিতার মনের অহঙ্কারে ব্যথাও লাগে। কিন্তু আর কতদিন ? এইভাবে থমকে থেকে থেকে যদি একদিন দেখা যায়, ঐ লতানে গোলাপের তোরণে সিডানও আসে না, টুরারও আসে না, তবে ? তবে সেই দিন অঙ্কের প্রফেসরের দুই মেয়ের খিল-খিল হাসির বিদ্রুপাক্ত ঝঙ্কার সহ্য করতে না পেরে বোধহয় ছুটে যেতে হবে চেরাপুঞ্জির সেই মুশমাই প্রপাতের পাগলা জলের উচ্ছাসের কাছে, যার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে অপরাজিতার অপমানিত এই সুন্দর মুখের জ্বালা চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে।

ভয়ই পায় অপরাজিতা । মিররের সামনে দাঁড়িয়ে তার নিজেরই এত আদরের আর এত সুন্দর করে সাজানো রূপের প্রতিচ্ছায়ার দিকে মায়া-ভরা চোখ তুলে তাকিয়ে বুঝতে পারে অপরাজিতা, নিজের উপর খুব নিষ্ঠুর একটা অন্যায় সে নিজেই করে চলেছে। কিন্তু আর নয় ।

মামিমাও হঠাৎ এসে বললেন—কি রে, এখনো কিছু বলছিস না যে ?

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আর বাঁকা করে আঁকা ভুরুর উপর রুমাল ছুঁইয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে কি-যেন ভেবে নেয় অপরাজিতা । তারপরেই উত্তর দেয়—আজই বলবো ।

শুনে খুশি হয়ে চলে গেলেন মামিমা এবং সেইক্ষণেই লতানে গোলাপের তোরণের কাছে কিংশুকের টুরারের হর্ন বাজে ।

ড্রইংরুমের ভিতরটা যেন স্টেজের উপর সাজানো একটা নাটুকে প্রয়োজনের সেট । ভিতরে ঢুকেই একটা কৌচের উপর বসে পড়ে কিংশুক আর তার একেবারে চোখের নিকটের এক কৌচের উপর বসে থাকে অপরাজিতা । কিংশুকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপরাজিতা, অদ্ভুত একটা মুখরতার আবেগ যেন কিছুক্ষণ নীরবে ছটফট করে অপরাজিতার রঙিন দুই ঠোঁটের সুন্দর সন্ধিরেখার আড়ালে, তারপরে বলেই ফেলে অপরাজিতা—আপনি আমাকে কেন বিয়ে করতে চান কিংশুকবাবু ?

হয়তো এই প্রশ্ন শুনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না বলেই একবার চমকে ওঠে কিংশুকের বড়-বড় ভাসা-ভাসা চোখ, কিন্তু শুনতে ভালই লাগে। উত্তর দেয় কিংশুক—তোমাকে ভালবাসি, তাই। এই সহজ কথাটা জানবার জন্য প্রশ্ন করতে হয় না জিতা ।

অপরাজিতা—ভালবাসেন কেন ?

কিংশুক—সুখী হবো বলে ।

অপরাজিতা—কেন সুখী হবেন ?

অপরাজিতার প্রশ্নগুলি যেন ভয়ে-ভয়ে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে কি খুঁজছে । হেসে ফেলে কিংশুক । উঠে দাঁড়ায়, এগিয়ে যায়, আর অপরাজিতার মুখের কাছে বড়-বড় ও ভাসা-ভাসা দুই চোখের পিপাসার জ্বালা ভাসিয়ে দিয়ে কিংশুক বলে—সত্যিই কি জানো না জিতা, কেন তোমাকে ভালবেসে আর বিয়ে করে সুখী হবো আমি !

অপরাজিতা—না, বুঝতে পারি না ।

কিংশুক—তুমি সুন্দর বলে ।

যেন অপরাজিতার জীবনেরই জয় ঘোষণা করে দিয়েছে কিংশুক । অপরাজিতার রূপের মহিমাকে বন্দনা করছে এক পূজারী। দেখতে পায় অপরাজিতা, তার সুন্দর মুখের ছবি কি স্পষ্ট হয়ে ভাসছে কিংশুকের বড়-বড় চোখের তারার বুকের উপর ।

অপরাজিতার মুখের আর একটু নিকটে এগিয়ে আসে কিংশুকের চোখ। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে অপরাজিতা, সে চোখে সত্যিই দুপুরের সূর্যের তৃষ্ণা ছটফট করছে। আস্তে হাত তুলে সেই তৃষ্ণাকে যেন একটু সমাদর করে থামিয়ে রাখে অপরাজিতা, আস্তে মুখ সরিয়ে নেয় ।

অপরাজিতার মুখের সেই লাজুক ভয়ের রক্তচ্ছটার দিকে তাকিয়ে কিংশুক হাসে । —থাক তাহলে, কিন্তু তুমি বিশ্বাস করলে তো জিত ?

অপরাজিতা বলে—বিশ্বাস করি ।

অপরাজিতার কাছ থেকে বিশ্বাসের উপহার নিয়ে চলে যায় কিংশুক ।

আসে সন্ধ্যা, কিন্তু অপরাজিতার মনের মধ্যে কিংশুক, আর কেউ নয়। ঐ কিংশুকই হবে অপরাজিতার জীবনের সাথী। লতানে গোলাপের কাছে সেই পাথরের চোখের মানুষটার চকচকে সিডান আজ শেষবারের মত এসে শেষবারের মত চলে যাবে। শেষ কথা বলে সেই সিডানকে শেষ বিদায় দিতে হবে, এই একটিমাত্র কর্তব্য বাকি আছে। তাই কোঁচের উপর চুপ করে বসে থাকে অপরাজিতা ।

সিডানের হর্ন বাজে । বাদামী রঙের ছোট স্পানিয়েলের গলার শিকল এক হাতে ধরে তরতর করে হেঁটে হিরন্ময় ড্রইংরুমের ভিতরে এসে ঢোকে। হাসি-হাসি মুখ নিয়ে প্রশ্ন করে--অপরা আছে?

-আছি বসুন।

কৌচের উপর বসে হিরন্ময় । এইবার একটি কথা বলে শুধু ওকে উঠিয়ে দিতে হবে, এইমাত্র। সেই একটি কথা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বলে দেবার জন্য প্রস্তুত হয় অপরাজিতা ।

কিন্তু প্রস্তুত হয়েও এবং সামান্য ও ছোট্ট একটি শেষ-কথা বলতে গিয়েও দেরি করে অপরাজিতা । এবং, দেরি করে বলেই দেখতে পায়, চশমার ছায়া-ছায়া কাচের পিছনে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে দুটি প্রাণহীন পাথুরে চোখ ।

—আপনি কোন আশা নিয়ে এখানে আসেন হিরন্ময়বাবু ?

এক কথা বলতে যেন মুখ ফসকে অন্য কথা বলে ফেললো অপরাজিতা ।

হিরন্ময় বলে—ঠিক আশা নিয়ে আসি না, অপরা। আশা করবার সাহস আমার নেই।

অপরাজিতা—তবে কি দেখতে আসেন ?

হেসে ফেলে হিরন্ময়—দেখতে আসি না অপরা, দেখবোইবা কেমন করে ?

চমকে ওঠে অপরাজিতার সুন্দর চোখ, যেন হঠাৎ একটা কাঁকরের কুচি ছুটে এসে চোখে লেগেছে ।

অপরাজিতা—একটা কথা জিজ্ঞাসা করি হিরন্ময়বাবু, কিছু মনে করবেন না ।

হিরন্ময়—বলো ।

—আমি আপনাকে কেন বিয়ে করবো ? কি লাভ হবে আমার ?

—ঠিকই বলেছ অপরা, তোমার কোন লাভ হবে না, লাভ হবে আমার । কিন্তু... ! 


অপরাজিতা—কিন্তু কি ?

হিরন্ময়—আমি তোমার ঐ মুখ কোনদিন দেখতে পাব না, কিন্তু পৃথিবী তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখবে আর দেখামাত্র বলবে যে, তুমি. ।

অপরাজিতা—বলুন ।

হিরন্ময়—তুমি মহীয়সী।

মহীয়সী ? কুহেলিকার দুই চক্ষুতে দুবার এক পিপাসার দুতি যেন চমকে ওঠে। যেন এই ধ্বনি শোনার জন্য অপরাজিতার পঁচিশ বছর বয়সের জীবনের সব অহঙ্কার প্রতীক্ষায় ছিল।

পৃথিবীরই কাছে পূজার মূর্তির মত স্তবে ও গানে বন্দিত হয়ে রয়েছে অপরাজিতা । চক্ষুহীন হিরন্ময়ের মুখের ঐ ছোট একটা কথার মধ্যে যেন সেই ছবি দেখতে পাচ্ছে আর মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে অপরাজিতা ।

হিরন্ময় কুণ্ঠিতভাবে বলে—আমার কথা বিশ্বাস করলে তো অপরা ?

উঠে দাঁড়ায় অপরাজিতা । কুণ্ঠাহীন স্বরে ও স্পষ্ট করে একটি কথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। আপনারই কথা বিশ্বাস করি ।

বিদায় নেয় হিরন্ময়, এবং সেই মুহুর্তে ড্রইংরুম ছেড়ে সোজা হেঁটে ভিতরের বারান্দায় গিয়ে থামে অপরাজিতা । মামিমা বলেন–কিছু বলছিস ?

অপরাজিতা—হাঁ ।

মামিমা—কি ?

অপরাজিতা—হিরন্ময়বাবু।

বিয়ের অনুষ্ঠান তখনো শেষ হয়নি, অপরাজিতার প্রসন্ন মনটা যেন তখন থেকেই কান পেতে রয়েছে, এই পৃথিবীর কাছ থেকে একটি ধ্বনির অভিনন্দন শোনার জন্য। মনে হয় অপরাজিতার, চারদিকের এই এতগুলি ভদ্র ও ভদ্রার মুখে মুখে এখনি এক বিপুল গুঞ্জন জেগে উঠবে—এ কি করলো অপরাজিতার মত মেয়ে ! এ মহত্ত্বের যে তুলনা হয় না।

শুনতে পায় অপরাজিতা, বাসরঘরের দরজার পর্দার ওধারে মামিমার কাছে রাগ করে কথা বলছেন ক্যান্টনমেন্টের মাসিমা—ছি ছি, এ কি কাণ্ড করলো অপরাজিতা ! জেনেশুনেও অন্ধ

ভদ্রলোককে বিয়ে করলো ।

শুনতে পায় অপরাজিতা, ফরেস্ট অফিসারের স্ত্রী মন্ত্রণা তালুকদারও মামিমাকে কথা শোনাচ্ছেন—একজন অন্ধের হাতে এত সুন্দর মেয়েটাকে আপনারা তুলে দিলেন ?

অপরাজিতার কান যেন পুড়তে থাকে। কিন্তু তখন ঘর-ভরা লোকের চোখের সামনে হিরন্ময়ের হাতে হাত দিয়ে ফেলেছে অপরাজিতা । এক অন্ধের স্বামিত্ব স্বীকার করে ফেলেছে অপরাজিতা এবং সেই স্বীকৃতি রেজিস্টারের খাতায় স্পষ্ট ভাষায় উৎকীর্ণ হয়ে গিয়েছে।

খিল-খিল হাসির স্বর। মীরা-হীরা হাসছে। শুনতে পায় অপরাজিতা, মীরা বলছে হীরাকে—এইবার শুভদৃষ্টি হবে বোধহয়।

হীরার হাসিটা ফিসফিস করে । —শুভ অদৃষ্টি ।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই কুয়াশামাখা লাবান-এর এই সন্ধ্যাটা যেন অপরাজিতাৱ জীবনের সবচেয়ে বড় কল্পনা, আকাঙক্ষা ও গৌরবের দাবিগুলিকে বিচার করে রায় দিয়ে দিচ্ছে, তুমি মহীয়সী না ছাই, তুমি একটা বেকুব খামখেয়ালের কুয়াশা ৷

অপরাজিতার ফাঁপানো ও রুক্ষ চুলের ক্রিম-মাখানো স্তবকের মধ্যে সিঁথির রেখা খুঁজে পাওয়া যায় না, নেই-ই বোধহয় । তবু ক্যান্টনমেন্টের মাসিমা অপরাজিতার সেই ফাঁপানো চুলের স্তবকের মধ্যেই এলোমেলো করে হাত চালিয়ে এক জায়গায় সিঁদুরের ছোট একটা দাগ একে দিলেন ।

কিন্তু তারপর ? চব্বিশ ঘণ্টাও পার হয়নি, মাত্র এই সন্ধ্যার পরের সন্ধ্যাটা আসবার আগেই রিলবং-এ হিরন্ময়ের বাড়ির এক কক্ষের নিভৃতে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে অপরাজিতা, সিঁদুরের সেই দাগটা জ্বলন্ত অঙ্গারের রেখার মত শুধু জ্বালাবার জন্যই ছুয়ে রয়েছে অপরাজিতার অদৃষ্ট ।

পৃথিবীর কথা থাক, শুধু রিলবং-এর এই বাড়িটা অপরাজিতাকে কত মহীয়সী করে তোলে, বোধহয় এই একটি মাত্র প্রশ্ন অপরাজিতার মনের মধ্যে শেষ কৌতুহলের ক্ষীণ আলোকটাকে মিটিমিটি করে জাগিয়ে রেখেছিল, তাই একই গাড়ির একই সিটে অন্ধ হিরন্ময়ের পাশে বসে এই বাড়িতে এসেছে অপরাজিতা, নইলে আসতোই না।

কুয়াশা ছিল না, পাইনের বাতাসে হা-হুতাশও ছিল না, দিব্যি আকাশ-রাঙানো বিকাল-শেষের আলো বাংলোর কাচের উপর পড়েছে। চুপ করে বারান্দার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে অপরাজিতা ।

আর, বারান্দারই এক চেয়ারের উপর বসে একটা উল্লাসের আবেগে প্রায় চিৎকার করে ডাক দেয় হিরন্ময়—কাছে এস অপরা।

অন্ধের হাতের নাগালের প্রায় কাছে এসেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় অপরাজিতা । শিউরে ওঠে অপরাজিতার চোখ। এলোমেলো করে দুটো হাত তুলে পাথরের চোখের মানুষটা যেন তার আশেপাশের আর সামনের বাতাস হাতড়াচ্ছে। যেন একটা স্পর্শ শিকার করছে দুটাে অন্ধ থাবা । বারান্দায় এত আলো, কিন্তু লোকটা যেন নিরেট একটা অন্ধকারকে আঁচড়াচ্ছে।

অপরাজিতা বলে—বলো, কি বলছিলে ?

হিরন্ময় কৃতার্থভাবে হাসে—কাল নার্সকে মাইনে-পত্র চুকিয়ে দিয়ে একেবারে বিদায় করে দিয়েছি।

গলার স্বরের তীক্ষ্ণতা কোনমতে চেপে অপরাজিতা প্রশ্ন করে—কেন ?

হিরন্ময় হাসে–এবার থেকে শুধু তোমার হাতের ছোঁয়া ; নার্সের হাতের ছোঁয়ার দরকার ফুরিয়ে গিয়েছে।

—কি বললে ? অপরাজিতার প্রশ্নে তীক্ষস্বরের ধিক্কার আর চাপা থাকে না । রিলবং-এর বাড়ি হিংস্র হাসি হেসে অপরাজিতার জন্য এক বিনে মাইনের চাকরানির জীবনের অঙ্গীকার ঘোষণা করছে। এই লোকটারই মুখে অপরাজিতা প্রথম শুনেছিল সেই কথাটা, তুমি মহীয়সী । আরাধনা করে ডেকে নিয়ে এসে এক মুহূর্তের মধ্যে লোকটা প্রভু হয়ে উঠেছে আর তার অন্ধ জীবনের ঘরে সেবার দাসী হবার জন্য অপরাজিতাকে কাছে ডাকছে।

হিরন্ময় বলে—তোমার হাত কোথায় অপরা ?

এক পা পিছিয়ে সরে দাঁড়ায় অপরাজিতা । মাথাটাকে এপাশে-ওপাশে কয়েকবার দুলিয়ে প্রশ্ন করে হিরন্ময়—তুমি বসে আছ, না দাঁড়িয়ে আছ অপরা ?

অপরাজিতা--কেন ?

হিরন্ময় হাসে—যদি দাঁড়িয়ে থাকো, তবে আর দাঁড়িয়ে থেকো না, বসো ।

বসে না, দাঁড়িয়েই থাকে অপরাজিতা । আর বসলেই বা কি ? ঐ মানুষ কি দেখতে পাবে, আর দেখে খুশি হবে, কিভাবে আর কোন ভঙ্গী নিয়ে বসে আছে অপরাজিতা । অপরাজিতার এই মূর্তি ওর চোখের সামনে ছটফট করলেও ওর চোখের নিরেট অন্ধকার একটুও কেঁপে উঠবে না।

হঠাৎ বলে ওঠে হিরন্ময়—একটা কথা বলতে পারি অপরা, কিন্তু তুমি শুনলেও বোধহয় বিশ্বাস করতে পারবে না ।

বিস্মিত হয় অপরাজিতা—বিশ্বাস করার কথা ছেড়ে দাও, কথাটা বলতে পার।

হিরন্ময়ের মুখটা যেন তার তিমিরময় জগতের একটা উৎকট গর্ব নিয়ে হাসছে। —তোমাকে চোখে দেখতে পাই না বলে আমার মনে এতটুকুও দুঃখ নেই অপরা।

যেন আরশির বুকের উপর প্রচণ্ড এক মূখের হাতের ঢিল ছুটে এসে লেগেছে, অপরাজিতার বুকের ভিতরের সব কৌতুহলের প্রাণ আর্তনাদ করে চূর্ণ হয়ে যায়। মনে হয় অপরাজিতার, তার ফাঁপানো চুলের স্তবকের মধ্যে লুকিয়ে কপালের কাছে একটা আগুনের দাগ জ্বলছে।

অপরাজিতার চোখে একটা অসহ্য ঘৃণার জ্বালা ঝিলিক দিয়ে ওঠে । ঠোঁটে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে অপরাজিতা । —সত্যি বলছে ?

হিরন্ময় হাসে—একটুও মিথ্যে নয়।

অপরাজিতার একটা হাত হঠাৎ হিংস্র হয়ে রুমাল আঁকড়ে ধরে, আর পরমুহূর্তে মাথার ফাঁপানো চুলের স্তবকের আড়ালে লুকানো সেই লাল আগুনের দাগকে একটি কঠোর ঘষা দিয়ে মুছে ফেলে।

হিরন্ময়ের স্তব্ধ পাথুরে চোখ শুধু তাকিয়ে থাকে, কিন্তু দেখে না। কথা বলে না হিরন্ময় । অপরাজিতা এখন এখানে আত্মহত্যা করলেও পাথরের চোখ ঠিক ঐ রকম করে স্তন্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো ।

সন্ধ্যা হয় । বারান্দার আবছা অন্ধকারে রেলিং-এ হেলান দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে অপরাজিতা। পাইনের বাতাসের মর্মরের মধ্যে নিজেরই একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়ে চমকে ওঠে অপরাজিতা, আর মনে হয়, এ কি হলো ? দুটাে বেদনাক্ত চক্ষুর দৃষ্টি তুলে নিজের জীবনটাকে যেন দেখতে পায় অপরাজিতা, ডানাভাঙা পাখির মত সব গৌরব হারিয়ে এক ব্যাধের দুটাে পাথুরে চোখের সামনে পড়ে আছে সেই জীবন।

দপ করে আলো জ্বলে ওঠে বারান্দায় ! স্প্যানিয়েলের সঙ্গে হিরন্ময় বারান্দার এধার থেকে ওধার তরতর করে হেঁটে বেড়ায় ।

দুচোখ ভরা ঘৃণা নিয়ে হিরন্ময়ের চলন্ত চেহারাটার দিকে একবার তাকায় অপরাজিতা । পাথরের চোখের বুঝবার শক্তি নেই যে, এই বারান্দার বাতাসের মধ্যে অপরাজিতার স্নো-মাখা মুখটা সন্ধ্যাকেতকীর মতো নতুন শোভায় ঢলঢল করছে। অপরাজিতার পাউডার ছড়ানো গলা জড়িয়ে ঝিক ঝিক করে হাসছে ব্লাউজের জরি বসানোবর্ডার, দুলছে শ্যাম্পেন-রং ভয়েলের আঁচল, সোনার সরু চেন-নেকলেসের লকেট হয়ে বুকের উপর পড়ে রয়েছে হীরা বসানো ছোট একটি স্বস্তিকা । কিন্তু ঐ পাথরের চোখ মাঝে মাঝে তাকিয়ে অপরাজিতাও এই সুন্দর ও সাজানো রূপের ছবির উপর শুধু অন্ধকার ঢালছে। ঐ মুখ থেকে জীবনে কখনো একথা শুনতে পাবে না অপরাজিতা, তুমি কত সুন্দর, আর এই সাজে তোমাকে মানিয়েছে কি সুন্দর ।

যার মুখ থেকে একথা প্রথম শুনেছিল অপরাজিতা, আর একথা চিরকাল অপরাজিতার কানের কাছে বলতে পারতো যে, সেই মানুষটাই তার ভাসা-ভাসা চোখের জ্বালা নিয়ে এখন বোধহয় চেরা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে, আর ভাবছে, তারই জিতা তাকে এমনি করে এত অবিশ্বাসের বিষে ভরা একটা সাপিনীর মত পিছন থেকে ছোবল দিল কেন ? যে চোখের তারার বুকে অপরাজিতা তার নিজেরই সুন্দর মুখের ছবি ভাসতে দেখেছে, আজ বুঝতে পারে, এক চক্ষুহীন চতুরের মস্ত বড় একটা ভুয়া ভাল-কথার ছলনায় পাগল হয়ে গিয়ে সেই চোখের উপর ধুলো ছুড়েছে অপরাজিতা । কিন্তু সেই ধুলো আজ কী ভয়ানক অভিশাপে তপ্ত হয়ে তাঁর নিজেরই কপালের উপর এসে পড়েছে।

রিলবং-এর পাইনের মর্মর যতই সুর বদল করুক না কেন, অপরাজিতার প্রতিজ্ঞার সুর তাতে একটুও বদলায় না । শুধু চলে যাবার জন্যই এই বাড়িতে আর ক’টা দিন থাকা । ঐ পাথুরে চোখের মানুষটার ছোঁয়া বাঁচিয়ে খুব সাবধানে আর কিছুদিন আলগা হয়ে থাকতে হবে, তারপরেই মুক্তি । সেই মুক্তির প্রতিশ্রুতিকে দিনরাতের প্রতি মুহূর্ত মনে মনে এবং সারাদিনের মধ্যে অন্তত একটি চিঠি লিখে আহ্বান করছে অপরাজিতা। আর একবার সে আসুক, এসে দেখে যাক, তার জিতাই বেঁচে আছে, আর মরে গিয়েছে অপরা। এসে একবার শুনে যাক কিংশুক, অপরাজিতা আজ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে সেই ভাসা-ভাসা চোখের প্রতিশ্রুতিকে, যে চোখে দুপুরে সূর্যের দীপ্তি জ্বলজ্বল করে। আসুক কিংশুক, এসে স্বচক্ষে দেখে বিশ্বাস করে যাক, অপরাজিতাকে অবিশ্বাস করবার আর কোন কারণ নেই। অপরাজিতার ক্ষণিক মূর্খতার ভুল ক্ষমা করে কিংশুক শুধু একবার এসে বলে দিয়ে যাক, অপরাজিতাকে আপন করে নেবার জন্য সে আরও একটু প্রতীক্ষা স্বীকার করে নিতে রাজি আছে। শুধু আর কয়েকটা মাস, কিংবা একটা বছর, যতদিন না আদালতের নির্দেশ অপরাজিতাকে রিলবং-এর এই অন্ধ ভবনের রাক্ষুসে অধিকারের বন্ধন থেকে ছিন্ন করে দেয় । 


রিলবং থেকে ডাউকি রোড, কতই বা দূরে ? চিঠি যেতে দেরি হয় না, চিঠির উত্তর আসতেও দেরি হয় না। ব্যস্ত হয়ে আছে অপরাজিতার হাত, মত্ত হয়ে আছে অপরাজিতার মন।

পাথুরে চোখের হিরন্ময় যখন ছোট স্প্যানিয়েলের সঙ্গে তরতর করে লনের উপর হেঁটে বেড়ায়, তখন অপরাজিতা তার ঘরের নিভৃত থেকে বের হয়ে এসে হিরন্ময়েরই ঘরের ভিতর ঢুকে টেবিলের উপর থেকে একটা পেন তুলে নিয়ে যায়, আর লনের উপর পাতা একটি চেয়ারে বসে চিঠি লেখে, সেই একই কথা । —তুমি একবার শুধু এস, ইতি তোমার জিতা ।

চিঠি লেখা শেষ হলে অপরাজিতার এতক্ষণের নিঃশ্বাসের উদ্দামতাও শান্ত হয় । জামার বুকের ফাঁকে পেন গুজে দিয়ে অলস চোখে পাশের টবের হাসনুহানার দিকে তাকিয়ে থাকে। আস্তে হাঁপ ছাড়ে অপরাজিতা, যেন একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস মৃদু শব্দ করে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে। নিকট দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে হিরন্ময় একবার থামে, পাথুরে চোখ তুলে তাকায়, তারপর চলে যায়।

বেয়ারা এসে চিঠিটা নিয়ে চলে যাবার পর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় অপরাজিতা । এগিয়ে যায়। হিরন্ময়ের ঘরের টেবিলের উপর পেনটা রেখে দিয়ে আবার নিজের ঘরের ভিতর ঢোকে অপরাজিতা । ছটফট করে । মিররের দিকে তাকিয়ে যেন জীবনের শান্তির রূপটাকে চুলে, কেমন বুনো-বুনো হয়ে গিয়েছে মাথাটা ।

পাইনের বাতাস বড় বেশি উতলা হয়ে উঠলো সেই সন্ধ্যায় ; ঝড়ো আবেগ মাঝে মাঝে গুমরে উঠছে সেই হতাশভরা মর্মরের মধ্যে । কিন্তু অপরাজিতার কান যেন পাইনের সেই ঝড়ো গুমরানির মধ্যে গান শুনতে পাচ্ছে। চিঠির উত্তর দিয়েছে কিংশুক। আসছে কিংশুক। আর একটুও দেরি নেই। এই সন্ধ্যাতেই এইখানে অপরাজিতার চোখের সামনে এসে দেখা দেবে কিংশুকের ভাসা-ভাসা চোখ । অপরাজিতার সুন্দরতার জয় যে মানুষের মুখে প্রথম ঘোষণা লাভ করেছে, তার চোখের সামনে সুন্দর হয়ে দেখা দিতে হলে যেমন করে সাজা দরকার, তেমনি করে সেজেছে অপরাজিতা।

রিলবং-এর এই অন্ধভবনে এসে এই কদিনের মধ্যে এই প্রথম হিরন্ময়ের সঙ্গে নিজের থেকে যেচে কথা বললো অপরাজিতা, যদিও বলতে গিয়ে মনের ঘৃণা অনেক কষ্টে মনের ভিতর চেপে রাখতে হয় । এই বাড়ির অন্ধ প্রভুত্ব এখনো আইনমত উদ্ধত হয়ে রয়েছে অপরাজিতার জীবনের উপর। নিয়মরক্ষার জন্যই একটা কথা বলে নিতে হয়, তাই বলে নিল অপরাজিতা ।

অপরাজিতা বলে—আজই বোধহয় এক ভদ্রলোক আসবেন এখানে ।

হিরন্ময়—কে

অপরাজিতা—কিংশুকবাবু।


হিরন্ময় একটু বিস্মিত হয়েও খুশি হয়। —কোন কিংশুকবাবু ? সেই আয়রনের কিংশুক, ডাউকি রোডে বাড়ি কিনেছে যে?

অপরাজিতা—হ্যাঁ ।

হিরন্ময়—সে কি তোমার চেনা ?

অপরাজিতা—হ্যাঁ ।

হিরন্ময়—সে কি শিলঙেই আছে ?

অপরাজিতা—হ্যাঁ ।

হিরন্ময় হাসে—বিয়ের দিন লাবান-এর বাড়িতে আসতে পারেনি বলেই বোধহয় এখানে দেখা করতে আসছে।

উত্তর দেবার দরকার আছে বলে মনে করে না অপরাজিতা, তবুও হয়তো উত্তর একটা দিত কিন্তু উত্তর দেবার সময় আর ছিলো না। গেটের কাছে সেই টুরারের সাইরেন-হর্ন বেজে উঠেছে।

কিংশুক, সেই কিংশুক, ভাসা-ভাসা চোখ নিয়ে, জয়ী অভিযাত্রীর মত ধীরে ধীরে হেঁটে তার জীবনের কামনার কাছে এসে দাঁড়ায় । সোজা এসে অপরাজিতার পাশে দাঁড়িয়ে কিংশুক তার ভাসা-ভাসা চোখের জ্বালা আরও তীব্র করে নিয়ে হিরন্ময়ের মুখের দিকে তাকায় ।


এপাশে আর ওপাশে মাথা দুলিয়ে কি যেন বুঝবার চেষ্টা করে হিরন্ময়। পাথরের চোখ দুটাে বোধহয় আগন্তুক অতিথির পায়ের শব্দটাকে দেখবার চেষ্টা করছে। তারপরেই হাত তুলে নমস্কার জানায় হিরন্ময়, কিন্তু কিংশুক প্রতিনমস্কারের সৌজন্য রক্ষার জন্য হাত তোলে না । হাত তুললেই বা কি, আর না তুললেই বা কি ? পাথরের চোখ দেখতে পায় না ।

হিরন্ময় হাসে—যখন কষ্ট করে এসেছেন, তখন এখানে বসে একটু চা খান আর গল্প করুন, তাড়াতাড়ি চলে যাবেন না কিংশুকবাবু।

কিংশুক ভ্রুকুটি করে হাসে—কষ্ট করে অবিশ্যি আসিনি, চা নিশ্চয় খাব, কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারলেই ভাল ।

অন্ধভবনের সব প্রভুত্বের সৌজন্যকে যেন একটি আঘাতে মিথ্যা করে দিয়ে অপরাজিতার মন নিজের দুঃসাহসের আবেগে বলে ওঠে। —এখানে বসতে হবে না কিংশুকবাবু আমার ঘরে আসুন।

হেসে ওঠে হিরন্ময়—আমি বুঝতেই পরিনি কিংশুকবাবু, এখানে চেয়ার নেই।

অপরাজিতা বলে—অনেক চেয়ার রয়েছে এখানে । কিন্তু এখানে ঝড়ের ধুলো আছে।

ঝড়ের বাতাস আরও মত্ত হয়ে ঝনঝনিয়ে দেয় রিলবং-এর এই অন্ধভবনের শরীরের কাঁচগুলিকে । পাথরের চোখের সম্মুখ দিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্ত পার হয়ে চলে যায় ভাসা-ভাসা চোখের কিংশুক আর জিতা । পাথরের চোখ নিয়ে বারান্দার উপর একা দাঁড়িয়ে হিরন্ময় শিস দিয়ে ডাকতে থাকে, কোথায় ঘুমিয়ে রয়েছে সেই ছোট্ট স্প্যানিয়েল ? কুকুরটা দয়া করে না এলে এখান থেকে যে এক পা নড়তে পারছে না হিরন্ময় ! দিক ভুল করে ফেলেছে পাথরের চোখের মানুষ ।

একবার নয়, দুবার চা খাওয়া হয়ে গিয়েছে কিংশুকের ৷ এক ঘণ্টা নয়, দুঘণ্টারও বেশি গল্প করা হয়েছে। যা বলবার ছিল, তার সবই বলা হয়ে গিয়েছে। যা জানবার ছিল তার সবই জানা হয়ে গিয়েছে। তবু কিংশুক বিদায় নিতে পারে না, আর অপরাজিতাও বিদায় দিতে পারে না ।

বাইরের ঝড়ের চেয়েও বোধহয় বেশি পাগল হয়ে গিয়েছে অপরাজিতার মন, আর সেই মনকে এই নিভৃতে কাছে পেয়ে কিংশুকের ভাসা-ভাসা চোখের জ্বালা আরও তীব্র হয়ে ফুটে উঠতে থাকে। আর প্রশ্ন করার কিছু নেই। এখন শুধু বিশ্বাস নিয়ে এই রাতের মত চলে যাওয়া । সেদিনের মতো বিশ্বাস নয়, অপরাজিতার কাছ থেকে একেবারে বুকভরা বিপুল ও উচ্ছ্বল একটি বিশ্বাস নেবার জন্য একটা ক্ষুধা যেন অশাস্ত হয়ে রয়েছে কিংশুকের চোখে ।

কিংশুক হাসে—তবে এখনো কেন ঐ সোফাতে বসে আছ জিতা ?
তখনি উঠে এসে কিংশুকের পাশে বসে অপরাজিতা । অপরাজিতার সুন্দর মুখের কথাকে একবার বিশ্বাস করে ঠকেও যে-মানুষ আজ আবার সেই মুখের কথাকে বিশ্বাস করতে চাইছে, তাকে বিশ্বাস দেবার জন্যই যেন অপরাজিতার চোখে একটা আকুলতা ফুটে উঠেছে। 


অন্ধভবনের বুকের ভিতর একটা কক্ষের বাতাস যেন এখনই একটা চরম মীমাংসা খুঁজছে, যার পর আর কোন সন্দেহ থাকবে না যে, অপরাজিতার জীবনের উপর ঐ অন্ধভবনের গ্রাস মিথ্যা হয়ে গেল চিরকালের মত ।

অপরাজিতার মুখের বড় কাছে, সেই লাবান-এর বাড়ির ড্রইংরুমের সেই সকালবেলায় এক মায়াময় ছবির মত কিংশুকের ভাসা-ভাসা চোখের আবেদন এগিয়ে আসতে থাকে। মুখ সরিয়ে নেয় না উন্মুখ অপরাজিতা । কিন্তু হঠাৎ...


হঠাৎ বাধায় থমকে থাকে দুটি লুব্ধ আগ্রহ। চমকে ওঠে কিংশুকের চোখ, আর চমকে ওঠে অপরাজিতার কান। বারান্দায় পা ঘষে ঘষে আর থাম আঁচড়াতে আঁচড়াতে একটা শব্দ আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে এই ঘরেরই দিকে ।

কিংশুক বলে—হিরন্ময়বাবু আসছেন।

অপরাজিতা বলে—আসছেন পাথরের চোখ ।

আসুক, একটা নিরেট অন্ধকারের পাথর এখানে এসে দুজনের চোখের সামনে বসে থাকলেই বা কি আসে যায় ? কিংশুক আর অপরাজিতার জীবন্ত দুটি চোখের স্বপ্ন যদি এই সোফার কোলের উপরেই নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিলিয়ে এক হয়ে পড়ে থাকে, তবুও পাথরের চক্ষু বসে বসে দেখবে তার নিজেরই নিরেট অন্ধতাকে ।

দরজার দিকে তাকিয়ে শাণিত ছুরিকার মত উগ্র একটা দৃষ্টির ধিক্কার হেনে অপরাজিত বলে—আসুক। যতক্ষণ না চলে যায় ততক্ষণ আপনি এখানেই থাকবেন।

কিংশুক--কিন্তু যদি না চলে যায় ?

অপরাজিতার দুই চক্ষু হঠাৎ মাতাল পাগলের চোখের মত বিহুল হয়ে ওঠে। তবেই বা বাধা কোথায় ? পাথর দেখতে পায় না ।

ঘরের ভিতরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে একটা সোফার কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে হিরন্ময় হেসে ফেলে—বলতে পারো অপরা, আমি কেমন করে এখানে এলাম ?

ঘরের অপর দিকের সোফায় কিংশুকের পাশে বসে অপরাজিতা গম্ভীর স্বরে উত্তর দেয়—আমি কি করে বলবো ?

আরও উৎফুল্ল হয়ে হাসতে থাকে হিরন্ময়—ম্পানিয়েল এল না, নিশ্চয় কোথাও ঘুমিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু তবুও তো ঠিক বুঝে নিয়ে আর বারান্দার চারটে বাঁক পার হয়ে তোমার ঘরে পৌঁছেছি।

অপরা–তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

সোফার উপর বসে হিরন্ময় । তারপরেই ব্যস্তভাবে প্রশ্ন করে—কিংশুকবাবু কখন চলে গেলেন, কিছু বুঝতেই পারলাম না। যাবার সময় আমার সঙ্গে দুটাে কথা বলে গেলে খুশি হতাম ।

উত্তর দেয় না অপরাজিতা । ঝড়ের বাতাসে অবিরাম ঝন-ঝন শব্দ করে ঘরের জানালার কাচ । কিংশুকের মুখের দিকে তাকায় অপরাজিতা । অপরাজিতার মুখের কাছে কিংশুকের ভাসা-ভাসা চোখ নীরবে হাসে আর এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ...

হঠাৎ হেসে ওঠে হিরন্ময় । চমকে সরে যায় অপরাজিতার মুখ আর কিংশুকের চোখ । অপরাজিতার দুঃসাহসী দুই চোখের ভুরু মিথ্যা ভয়ে অপ্রস্তুত হয়েছে। আরও ক্ষুব্ধ এবং আরও কুটিল হয়ে ওঠে অপরাজিতার চোখ ।

হিরন্ময় বলে—ঝড়ের বাতাসে তোমার মাথার সুন্দর ক্রিমের গন্ধই আমাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছে অপরা। এ যে আমার চেনা গন্ধ, বিয়ের দিন এই গন্ধ ছিল তোমার খোঁপাতে। ছিল কিনা বলো ?

অপরাজিতার ক্ষুব্ধ চোখে যেন তীব্র এক শ্লেষের বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। উত্তর দেয় অপরাজিতা । —ছিল বৈকি ?

হিরন্ময় হাসে—আর একটা সত্য ধরে দেবো ?


শুধু  ভ্রুকুটি করে, উত্তর দেয় না অপরাজিতা ।

হিরন্ময় বলে—আজ তুমি সেই বিয়ের দিনের শাড়িটা পরেছ।

চমকে ওঠে অপরাজিতা । —কেমন করে বুঝলে ?


হিরন্ময় নিজের কৃতিত্বের আনন্দে যেন আটখানা হয়ে হাসতে থাকে। —তোমার শাড়ির আঁচলটা এখন উড়ে উড়ে যে সুন্দর ফিসফাস শব্দ ছড়াচ্ছে, সে শব্দ যে আমার চেনা।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে হিরন্ময় । তারপর বেশ মুখর হয়ে ওঠে। গলার স্বরে অদ্ভুত একটা হাসি যেন নিজের রহস্যের আনন্দে কাঁপতে থাকে। —আরও একটা খবর বলতে পারি অপরা ।

অপরাজিতা—বলো ।

হিরন্ময়—আমার পেন দিয়ে তুমি অন্তত একবার চিঠি লিখেছ।
দুরু দুরু করে অপরাজিতার চোখের দৃষ্টি । পকেট থেকে সাবধানে রুমাল বের করে নিয়ে আস্তে আস্তে কপালের ঘাম মোছে কিংশুক ।

অপরাজিতা—কেমন করে বুঝলে ?


হিরন্ময়—আমার পেনের গায়ে তোমার বুকের গন্ধ পেয়েছি অপরা।

মাথা হেট করে উদ্ধত চোখ দুটােকে হঠাৎ যেন লুকিয়ে ফেলবার চেষ্টা করে অপরাজিতা ।

মনে পড়েছে অপরাজিতার, হিরন্ময়ের একটা পেনকে সেদিন মাত্র কিছুক্ষণের জন্য ব্লাউজের বুকের ফাঁকে স্থান দিয়েছিল অপরাজিতা ।

হিরন্ময় হাসে—ঠিক কি না ?

অপরাজিতা—ঠিক ।

হিরন্ময়—কেন পেলাম বলো ?

অপরাজিত আস্তে আস্তে বলে—জানই তো, আর বুঝতেই তো পেরেছ, তবে মিছে আবার এসব প্রশ্ন করো কেন ?

হিরন্ময়—সত্যিই জানি, আর সবই বুঝতে পারি অপরা।

হাওয়ায় উড়ছে আঁচলটা । শক্ত মুঠো করে অচলটাকে টেনে বুকের কাছে ধরে রাখে অপরাজিতা, ভয়ানক টিপটিপ করছে বুকের ভিতরটা ।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর হিরন্ময় বলে—তুমি কোথায় রয়েছ অপরা ?

যেন হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় ছটফট করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় অপরাজিতা ।

হিরন্ময়—তুমি কি করছো ?

অপরাজিতার গলার স্বর শিউরে ওঠে—কিছু না ।

হিরন্ময় হাসে—তবে কথা বলো ।

অপরাজিতা—আর কি বলবো ? তুমিই বলো, আমি শুনি ।

হিরন্ময় হাসে—তুমি জিজ্ঞাসা কর অপরা, নইলে শুধু নিজের থেকে বলতে ভাল লাগছে না ।

স্তব্ধ দুটি পাথরের চোখের দিকে অপরাজিতা তার দু'চোখের হঠাৎ বিস্ময় তুলে প্রশ্ন করে । —আমার দুঃখগুলি বুঝতে পার ?

হিরন্ময়--পারি অপরা।

অপরাজিতা—কবে বুঝলে ?

হিরন্ময়ের মুখটা করুণ হয়ে ওঠে। —এই বাড়িতেই প্রথম বিকালে ।

অপরাজিতা দম বন্ধ করে । —কি বুঝেছিলে ?

হিরন্ময়—তোমার হাত হঠাৎ দুঃখে আছড়ে পড়েছিল তোমার কপালে।

ভয়ে শিউরে ওঠে অপরাজিতার সারা শরীর। হিরন্ময়ের সোফার দিকে দুপা এগিয়ে যেতেই থমকে দাঁড়ায় । চেঁচিয়ে ওঠে অপরাজিতা—তুমি দেখতে পাও, তোমার পাথরের চোখ নিশ্চয় দেখতে পায় ।

হিরন্ময় বলে—আমার পাথরের চোখ সত্যিই দেখতে পায় না অপরা, কিন্তু আমি দেখতে পাই।

অপরাজিতা—সত্যি করে বল, কি দেখতে পেয়েছিলে সেদিন ।

হিরন্ময়—ঐটুকুই দেখেছিলাম সেদিন ।

অপরাজিতা—কেমন করে দেখলে ?

হিরন্ময় হাসে—তোমার হাতের চুড়ির শব্দ যে হঠাৎ একটা আঘাত খেয়ে ঠুং করে বেজে উঠেছিল।

অপরাজিতা—তাতেই তুমি বুঝে ফেললে ?

হিরন্ময়—হাঁ, তোমার একটুকু থেকেই আমি অনেক পেয়ে যাই অপরা, কিন্তু তুমি একটুও বুঝতে পার না।

অপরাজিতা—আর কোনদিন ধরে ফেলতে পেরেছিলে আমাকে ?

হিরন্ময়—কি বললে ?

অপরাজিতা—বুঝতে পেরেছিলে আমার দুঃখকে ?

হিরন্ময় হাসে—বলবো ?

অপরাজিতা হেসে ফেলে—বলই না !


হিরন্ময়—এই বাড়িতেই এক সন্ধাবেলায় হাসনুহানার কাছে তুমি বসেছিলে, মনে পড়ে তো ?

অপরাজিতার চোখের দৃষ্টি বাতাস-লাগা দীপশিখার মত ফুরফুর করে—হ্যাঁ ।

হিরন্ময়—তোমার মন তখন বড় অশান্ত হয়ে বড় কষ্ট দিচ্ছিল তোমাকে । তোমার ভাঙা ভাঙা কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝেছিলাম...।

অপরাজিতা রুমাল তুলে চোখের উপর চেপে ধরে বলে—উঃ, তুমি কী ভয়ঙ্কর দেখতে পাও।

হিরন্ময়ের দুই ঠোঁটের কাঁপুনিতে যেন এক সমব্যথিত মনের মায়া কাঁপতে থাকে। —নিজেকে বড় একলা বলে মনে হয়েছিল সেদিন, না অপরা ?

হিরন্ময়ের সোফার কাঁধের উপর ভর ছেড়ে দিয়ে যেন এলিয়ে পড়তে চায় অপরাজিতার শরীরটা । দুটাে পাথরের চোখের যাদু ক্ষণে ক্ষণে ভয় পাইয়ে, চমকিয়ে, হাসিয়ে, শিউরিয়ে আর অবাক করে দিয়ে অপরাজিতার স্নায়ু শোণিত আর নিঃশ্বাসের উপর নিবিড় এক ক্লান্তি ঢেলে দিচ্ছে। ছটফটে কুহেলিকা হাঁপাচ্ছে। আর ঘরের ওদিকের ঐ সোফার উপর একলা বসে রয়েছে যে চক্ষুষ্মান এক দুঃসাহস, তারই ভাসা-ভাসা চোখ দুটো স্থির হয়ে রয়েছে। নড়ে বসতে পারে না, জোরে নিঃশ্বাস নিতে পারে না, যেন হঠাৎ এক অভিশাপের মন্ত্রের আঘাতে নিরেট হয়ে গিয়েছে কিংশুকের শরীর।

উঠতে পারে না কিংশুক, উঠে যাবার কথা নয়। শুধু চুপ করে বসে থাকা, যতক্ষণ না জিতা আবার ঐ সোফার স্পর্শকে একটি ঘৃণার ঠেলা দিয়ে হাত তুলে নেয়, আর কিংশুকের সেই সোফাতে এসে বসে। কিন্তু কি ভয়ঙ্কর শক্ত করে ঐ সোফার কাঁধটাকে খিমচে ধরে রয়েছে জিতা । এক অন্ধের প্রলাপের বাঁশি শুনে হঠাৎ মুগ্ধ হয়ে কাছে এগিয়ে গিয়েছে উন্মনা এক হরিণী । কিন্তু আর কতক্ষণ ? ঐ বাঁশির মিথ্যা সুরের মিষ্টি এখুনি ফুরিয়ে যাবে, আর ছুটে সরে আসবে জিতা । জিতাকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না ।

কিন্তু অন্ধের বাঁশির প্রলাপ যেন আরও অদ্ভুত হয়ে বেজে ওঠে । —হিরন্ময় বলে—গাছ যেমন করে ভোরের আলোর মুখ দেখে, আমিও তেমনি করে তোমার মুখ দেখতে পাই অপরা ।

চোখের উপর থেকে রুমাল তুলে নিয়ে অপরাজিতা চেচিয়ে ওঠে। —কী কুৎসিত আমার সেই মুখ ।

হিরন্ময়—কী সুন্দর তোমার সেই মুখ । তুমিও জান না অপরা, তোমার সে মুখ কত সুন্দর ।


যেন ঝড়ের বাতাসের ধাক্কা লেগেছে, তাই সোফার পাশ থেকে ছিটকে এসে একেবারে হিরন্ময়ের পাথুরে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় অপরাজিতা । পৃথিবীর মানুষ শুধু চোখ দিয়ে দেখে অপরাজিতাকে, আর এই লোকটা শব্দ দিয়ে, গন্ধ দিয়ে, আর ছোঁয়া দিয়ে দেখছে অপরাজিতার রূপ। প্রলাপ প্ৰলাপ ! হিরন্ময়ের প্রলাপ আর সহ্য হয় না, হিরন্ময়ের মুখ চেপে ধরবার জন্য হাত তোলে অপরাজিতা ।

কিন্তু হাত নামিয়ে নেয় অপরাজিতা ।

হিরন্ময় হেসে ফেলে—হাত সরিয়ে নিলে কেন অপরা ?

অপরাজিতার হাত থর থর করে কাঁপে । —উঃ, কি ভয়ানক তোমার চোখ ।

হিরন্ময়—বিয়ের সন্ধ্যায় নিশ্চয় এই পাউডার তুমি হাতে মেখেছিলে ।

কোন কথা বলে না অপরাজিতা । অপলক চোখে শুধু গভীর বিহ্বলতা থমথম করে ।

হিরন্ময়ের ঐ পাথরের চোখ শেষরাতের চাঁদের মত মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে কুয়াশার বুকে ।

হিরন্ময় বলে—সেদিন তোমার হাতের গন্ধ আমারও হাতের মধ্যে পেয়েছিলাম, তুমি আমার হাতে হাত রেখেছিলে । কিন্তু তারপর আর সেই হাত কাছে পেলাম না ।

হিরন্ময়ের মুখে অদ্ভুত এক কৌতুকের হাসি ঠাট্টা করতে গিয়েও যেন হঠাৎ করুণ হয়ে যায়। —আমার হাত এখন শুধু সিগারেটের গন্ধ মেখে একলা পড়ে থাকে। 


খপ করে একটা হাত এগিয়ে দিয়ে হিরন্ময়ের হাত ধরে ফেলে অপরাজিতা—এই তো আমার সেই হাত ।

হ্যাঁ সেই হাত। দুই মুঠো দিয়ে হিরন্ময় অপরাজিতার সেই হাত জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে I

কিংশুকের চোখে দুপুরের সূর্য যেন এক অমা-বিভীষিকার ভয়ে হঠাৎ ডুবে গিয়েছে। এই ঘরে যেন শুধু ওরাই দু'জনে আছে, ঐ একজোড়া পাথরের চোখ আর বাঁকা-করে আঁকা ভুরু নিয়ে একজোড়া টলটলে কালো চোখ। মিষ্টি ছলনা মাখানো অবিশ্বাসের এক নিদারুণ জাদুকরী কিংশুকের দুটি চক্ষুকে ধুলো-পড়া দিয়ে অন্ধ করে দিতে চাইছে।

কিংশুকের কান দুটােকেও বোধহয় পাথরের মত বধির করে দিতে চাইছে অপরাজিতা । হিরন্ময়ের হাত ধরে চেচিয়ে উঠেছে সে। —চিরে দাগ করে দাও আমার কপালে, একটা লাল দাগ । তোমার নখে ধার নেই কেন, ছিঃ ।

হিরন্ময়ের হাতটাকে অপরাজিতা তার কপালের উপর তুলে নিয়ে চেপে ধরে । বড় বড় দুটাে জলের ফোঁটা চিকচিক করে অপরাজিতার দুই চোখের দুই কোণে ।

অপরাজিতাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে হিরন্ময় বলে—তোমাকে চোখে দেখতে পাচ্ছি না বলে আমার একটুকুও দুঃখ হচ্ছে না অপরা।

অপরাজিতা—হবেই না তো, তুমি যে চোখের দেখার চেয়ে, তিনগুণ দেখা দেখে নিচ্ছ হিরণ।

একটা অন্ধের দুই বাহুর বন্ধনের মধ্যে চেপটে যেন এতটুকু হয়ে গিয়েছে লাবান-এর মিস্টার নাগের ভাগ্নী। লতানে গোলাপ কাঁটা হারিয়ে শুধু একটা কোমলতার লতা হয়ে পড়ে আছে অন্ধের বুকে একটুও বিধছে না।

ওকি ? কি ভেবেছে ওরা ? এটা যেন ঘরই নয়! যেন গভীর বনের একটা নিরালা । বুনো জ্যোৎস্নায় পাগল হয়ে এক বুনো হরিণের মুখ তার হরিণীর মুখ খুঁজছে, কিন্তু বুঝতেই পারছে না যে, একটা বাঘের চোখ নিকটেই বসে আছে।

কিন্তু এত জীবন্ত এক বাঘের ভাসা-ভাসা দুটাে চোখকে বোধহয় তুচ্ছ শোলার তৈরি একটা খেলনা বাঘের চোখ বলে মনে করেছে জিতা । দেখতে পেয়েছে কিংশুক, অন্ধের বুকটা এক নতুন নিঃশ্বাসের উল্লাসে উদ্বেল হয়ে উঠেছে। আর, জিতাও তার সুন্দর মুখটাকে এক নতুন আগুনের আভায় রাঙিয়ে নিয়ে অন্ধের সেই ভয়ঙ্কর বুকের ইচ্ছাটাকে অপলক চোখে দেখছে। তটের পাষাণের উপর আছড়ে খেয়ে পড়ে চূর্ণ হবার জন্য তৈরি হয়েছে একটা ঢেউ ।

হিরন্ময় ডাকে—অপরা !

অপরাজিতা বলে—কি বলছো হিরণ ?

হিরন্ময় বলে—জানি না কেমন তোমার শাড়ির রং, কেমন তোমার গলার হার আর কানের দুল। নিশ্চয়ই সুন্দর। কিন্তু আমার দেখার আনন্দের জন্য ওসবের কোন দরকার হয় না। আমি শুধু দেখি, তুমি সুন্দর।

পটপট করে কয়েকটা শব্দ হঠাৎ বেজে ওঠে, কেউ যেন তার রূপের খোসা ছিড়ে ফেলছে। একটা রঙিন শাড়ি আর জামা যেন এক ঝড়ের লাথি খেয়ে ছিটকে এসে পড়ে হিরন্ময় হাসে—বলবো ?


যেন ঝড়ের বাতাসের ধাক্কা লেগেছে, তাই সোফার পাশ থেকে ছিটকে এসে একেবারে হিরন্ময়ের পাথুরে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় অপরাজিতা । পৃথিবীর মানুষ শুধু চোখ দিয়ে দেখে অপরাজিতাকে, আর এই লোকটা শব্দ দিয়ে, গন্ধ দিয়ে, আর ছোঁয়া দিয়ে দেখছে অপরাজিতার রূপ। প্রলাপ প্ৰলাপ ! হিরন্ময়ের প্রলাপ আর সহ্য হয় না, হিরন্ময়ের মুখ চেপে ধরবার জন্য হাত তোলে অপরাজিতা ।

কিন্তু হাত নামিয়ে নেয় অপরাজিতা ।

হিরন্ময় হেসে ফেলে—হাত সরিয়ে নিলে কেন অপরা ?

অপরাজিতার হাত থর থর করে কাঁপে । —উঃ, কি ভয়ানক তোমার চোখ ।

হিরন্ময়—বিয়ের সন্ধ্যায় নিশ্চয় এই পাউডার তুমি হাতে মেখেছিলে ।

কোন কথা বলে না অপরাজিতা । অপলক চোখে শুধু গভীর বিহুলতা থমথম করে ।

হিরণ্যয়ের ঐ পাথরের চোখ শেষরাতের চাঁদের মত মায়Lছড়িয়ে দিয়েছে কুয়াশার বুকে ।

হিরন্ময় বলে—সেদিন তোমার হাতের গন্ধ আমারও হাতের মধ্যে পেয়েছিলাম.তুমি আমার হাতে হাত রেখেছিলে। কিন্তু তারপর আর সেই হাত কাছে পেলাম না ।

হিরন্ময়ের মুখে অদ্ভুত এক কৌতুকের হাসি ঠাট্টা করতে গিয়েও যেন হঠাৎ করুণ হয়ে যায়। —আমার হাত এখন শুধু সিগারেটের গন্ধ মেখে একলা পড়ে থাকে।

খপ করে একটা হাত এগিয়ে দিয়ে হিরন্ময়ের হাত ধরে ফেলে অপরাজিতা—এই তো আমার সেই হাত ।

হ্যাঁ সেই হাত। দুই মুঠো দিয়ে হিরন্ময় অপরাজিতার সেই হাত জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে |

কিংশুকের চোখে দুপুরের সূর্য যেন এক অমা-বিভীষিকার ভয়ে হঠাৎ ডুবে গিয়েছে। এই ঘরে যেন শুধু ওরাই দু'জনে আছে, ঐ একজোড়া পাথরের চোখ আর বাঁকা-করে আঁকা ভুরু নিয়ে একজোড়া টলটলে কালো চোখ। মিষ্টি ছলনা মাখানো অবিশ্বাসের এক নিদারুণ জাদুকরী কিংশুকের দুটি চক্ষুকে ধুলো-পড়া দিয়ে অন্ধ করে দিতে চাইছে।

কিংশুকের কান দুটােকেও বোধহয় পাথরের মত বধির করে দিতে চাইছে অপরাজিতা । হিরন্ময়ের হাত ধরে চেচিয়ে উঠেছে সে । —চিরে দাগ করে দাও আমার কপালে, একটা লাল দাগ । তোমার নখে ধার নেই কেন, ছিঃ ।

হিরন্ময়ের হাতটাকে অপরাজিতা তার কপালের উপর তুলে নিয়ে চেপে ধরে। বড় বড় দুটাে জলের ফোঁটা চিকচিক করে অপরাজিতার দুই চোখের দুই কোণে ।

অপরাজিতাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে হিরন্ময় বলে—তোমাকে চোখে দেখতে পাচ্ছি না বলে আমার একটুকুও দুঃখ হচ্ছে না অপরা।

অপরাজিতা—হবেই না তো, তুমি যে চোখের দেখার চেয়ে, তিনগুণ দেখা দেখে নিচ্ছ হিরণ।

একটা অন্ধের দুই বাহুর বন্ধনের মধ্যে চেপটে যেন এতটুকু হয়ে গিয়েছে লাবান-এর মিস্টার নাগের ভাগ্নী। লতানে গোলাপ কাঁটা হারিয়ে শুধু একটা কোমলতার লতা হয়ে পড়ে আছে অন্ধের বুকে একটুও বিধছে না।

ভাসা-ভাসা চোখের জ্বালার সম্মুখে যেন সুন্দর কতগুলি খোসা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে অপরাজিতা, আর নিজের অনাবরণ রূপের আত্মাটাকে দেখছে হিরন্ময়ের চোখের উপর চোখ রেখে। সত্যিই, মহীয়সীর মত ভঙ্গী ধরেছে অপরাজিতা ।

কিন্তু আর নয়, আর এক মুহূর্ত বসে থাকলে সত্যিই পাথর হয়ে যাবে কিংশুকের চোখ । রুমাল দিয়ে চোখ ঢেকে উঠে দাঁড়ায় কিংশুক । পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। তারপর ছুটেই চলে যায় । যেন একটা ভীরু দুঃসাহস হঠাৎ যন্ত্রণায় ডানা-ঝাপটানো পাখির মত শব্দ করে উড়ে চলে গেল ।

হিরন্ময় বলে—কিসের শব্দ ? কেউ গেল ?

অপরাজিতা—হ্যাঁ, চোখ গেল ।

হিরন্ময়—কি বললে ?

অপরাজিতা হাসে—একটা পাখির নাম ।


1 টি মন্তব্য:

  1. কিংশুকের চামড়ার চোখজোরা সুবোধ ঘোষের। হিবণের পাথরের চোখও সুবোধ ঘোষের। চোখ ফুটলো পড়ুয়ার।

    উত্তরমুছুন