বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

জোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প : চাওয়া

প্রভুদয়াল তার বৌকে নিয়ে কি করবে দিশা করতে পারছিল না। 

এত রূপ! ডানাকাটা পরী বিয়ে করে ঘরে এনেছে সে। 

ঘরে আনার পর থেকে নিজে তো সে হকচকিয়ে গিয়েছেই, দশটা মুখ দশবার করে বলছে, হ্যাঁ, রূপসী বটে! একশটা ঘর খুঁজে দ্যাখ, এমন সুন্দর বৌ কারো পাবে না।

শুনে শুনে প্রভু আরো কেমন যেন হয়ে গেছে । ভাবে সে, এই স্ত্রীর জন্য, অর্থাৎ হেনাকে নিয়ে শেষটায় না সে পাগল হয়ে যায়। 

বস্তুত যতক্ষণ অফিসে থাকে, মোটামুটি মাথাটা ঠাণ্ডা থাকে তার, বেশ একটা স্বস্তির মধ্যে সময় কাটায়। যেই মুহূর্তে ঘরে পা দিল, প্রভু অশান্ত হয়ে উঠল, একটা অস্থিরতা তার বুকের ভিতর দাপাদাপি করতে আরম্ভ করল, চেহারা দেখলেই বোঝা যাবে বাস থেকে নেমে বাড়ি পর্যন্ত এই অল্প একটু রাস্তা আসতে আসতেই কী ভীষণ উত্তেজিত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে সে। 

হয়তো হেনা তখন একটা হলদে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে আছে বা নীল রঙের একটা ব্লাউজ কাঁধে ফেলে গা ধুতে বাথরুমে যাচ্ছে বা গা ধুয়ে এসে চুল আঁচড়াচ্ছে বা গা ধুয়ে প্রসাধন করা চুল বাঁধা সব কিছু সেরে হৃষ্টমনে বারান্দার টব থেকে একটা যুঁইফুল তুলে নিয়ে খোঁপায় গুজছে। 

অফিস থেকে ফিরে এক অবস্থায় কখনও সে হেনাকে দেখে না। দেখবে সেটা আশাও করে না। ঘড়ি ধরে অফিস ছুটি হয়। কিন্তু ঘড়ি ধরে কারো বৌ কিছু বিকেলের পোশাক বদলায় না বা গা ধোয় না বা চুলে ফুল গুজে জানালায় দাঁড়ায় না। সময়ের একটু এদিক ওদিক হবেই। 

যাই হোক, প্রভুদয়াল কিন্তু অস্থির হয়ে পড়ে, চোখে মুখে প্রবল উদ্বেগ, দৃষ্টির মধ্যে ভয়ানক চাঞ্চল্য, এমন কি তার শ্বাস প্রশ্বাসের মধ্যেও একটা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার আলোড়ন জেগেছে টের পাওয়া যায়। 

সেজেগুজে বৌ জানালায় দাঁড়িয়ে আছে দেখা মাত্র তার মুখে একটা উদ্বেল হাসি ফুটে ওঠে। হাসির আগায় কামনার ফেনা। যেন এখনি ছুটে গিয়ে বৌকে জড়িয়ে ধরে সে চুমো খাবে। খায়ও।

কিন্তু কোনো কোনো দিন সেটা।

আবার এক এক দিন এমনও হয়, বৌ বাথরুমে ঢুকছে, দুপদাপ শব্দ করে ঘোড়ার মতন ছুটে প্রভু ঘরে ঢুকল। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে তার। শব্দ পেয়ে হেনা চকিত হরিণীর মতন ঘাড় ফিরিয়ে কালো ডাগর চোখ মেলে স্বামীকে দেখল, কিন্তু প্রভু তৎক্ষণাৎ বিষণ্ণ স্তিমিত হয়ে গেল, হাসল না, কথা বলল না ।

ধপ করে সোফার ওপর বসে পডল। 

আধফোটা গোলাপ কলির হাসি মুখে নিয়ে হেনা কাছে এসে দাঁড়াল। এই ‘আধফোটা’ কথাটা প্রভুর দেওয়া। সেই বিয়ের রাতে। প্রভুর এত ভাল লেগেছিল। এর চেয়ে বেশি হাসলে, অর্থাং হাসতে গিয়ে হেনার গোলাপী পাতলা ঠোঁট দুটি যদি আর একটু বেশি ছড়িয়ে পড়ত, তবে যেন সেই হাসির মাধুর্য কমে যেত। তেমনি যদি সে একটু কম হাসত, ঠোঁট দুটি আর একটু বুজে থাকত, তাতেও হেনার হাসির সৌন্দর্য যেন তেমন খুলত না । 

হেনা যখন চুলে ফুল গুঁজে জানালার দাঁড়ায় তখন এই আধফোটা গোলাপ কলির হাসি তার ঠোঁটে লেগে থাকে, বা যখন বারান্দায় নিঃশব্দ দুপুরে নিজের মনে একলা পায়চারি করে। হু", রাতে শোবার সময়ও হেনা গোলাপ কলির হাসি হাসে, বা ঘুম থেকে প্রথম জেগে ওঠার পর। এই হাসি দেখে অস্থির হয়ে প্রভু কতদিন বৌয়ের হাসিমুখে চুমু খেয়েছে। 

ঘড়ি ধরে প্রভুর অফিস ছুটি হয়, ঘড়ি ধরে অফিস বসে। কিন্তু আগেই যা বলা হয়েছে, ঘড়ির কাঁটার সময় মিলিয়ে বাড়ির বৌ কিন্তু চুল আঁচড়ায় না বাথরুমে ঢোকে না। দুপুরের আলস্যভরা হাই তোলার মতন ধীর মন্থর এলোমেলো তার সাজগোজের সময়, খাওয়ার সময় বিশ্রামের সময়-সময়ের কিছু ঠিক থাকে না। সময়টাকে নিজের হাতের মুঠোয় পায় বলে সময় নিয়ে মাছের মতন খেলা করতে হেনা ভালবাসে। কিন্তু এটাই সবচেয়ে অদ্ভূত, অবিশ্বাস্যও বটে, হেনার ঠোঁটের আগায় হাসির একচুল অদলবদল নেই। 

ওর আধফোটা গোলাপ কলির হাসিটাই একটা মনোহর ঘড়ি। কোনদিন এর দম বন্ধ হয় না। হেনার বুকের ভিতর কেউ ঠিক ঠিক সময়ে চাবিটা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে গোলাপ কলি হয়ে তার হাসি নির্ভুল নিয়মে ফুটছে। এবং এই জন্যই বলা হচ্ছিল, চঞ্চল উন্মাদ হয়ে ঘরে ফিরে প্রভু যদি হেনাকে এক এক দিন জড়িয়ে ধরে চুমো খায়, বা আর একদিন বিষণ্ণ স্তিমিত হয়ে সোফার ওপর বসে পড়ে—হেনা তার অবিশ্বাস্ত রকম সুন্দর হাসিটি অধরোষ্ঠে ফুটিয়ে তুলে প্রভুকে উপহার দিতে উন্মুখ হয়ে উঠবেই। 

আজ পর্যন্ত এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটল না। দেড়-দু’বছর তাদের বিয়ে হয়েছে। হেনা হাসছে না, প্রভু এমন একদিনও দেখেনি। 

কি হল, মাথা ধরেছে? হেনার সাদা ধবধবে গ্রীবা ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে। বিষণ্ণ স্তিমিত প্রভু তখন হয়তো মনোযোগ দিয়ে জুতোর লেস খুলছে। কথার উত্তর দিচ্ছে না। তার বুকের ভিতর প্রচণ্ড আলোড়ন। 

ঠিক এই অবস্থায় অন্য মেয়ে, অন্য ঘরের বৌ মুখ কালো করবে? অভিমান নিয়ে কাঠ হয়ে চুপ করে দাড়িয়ে থাকবে ?

প্রভুর জানা নেই। অন্য কারো স্ত্রীর সঙ্গে তার দেখা হয় না, বা এই অবস্থায়- তারা কে কি করে, কাউকে সে জিজ্ঞেস করে না। 

কিন্তু এখানে, নিজের ঘরে, যখন সে জুতোর ফিতে খোলা শেষ করে ঘাড় তুলে তাকায়, দেখে ডানাকাটা পরীর মতন তার আশ্চর্য রূপসী বৌ সেই আধফোট৷ হাসি ঠোঁটে নিয়ে অগাধ কালো চোখ দুটো মেলে একভাবে তাকে দেখছে। 

কিছু হয়নি, আমার কিছু হয়নি। প্রভু গা ঝাড়া দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে বিরক্তি, অসন্তোষ । ঠোট বেঁকাল সে, চেহারাটা বিকৃত করে ফেলল। —দুবার দুটো চিঠি টাইপ করতে গিয়ে ছোড়া এমন দুটো ভুল করল, সেই তখন থেকে মেজাজ খিঁচড়ে আছে। সংশোধন করে দেবার পরেও যদি একই ভুল চোখে পড়ে—বুঝতে পারছ ?

হেনা কথা বলে না। নীরব থেকে তেমনি হাসে। অফিস থেকে মেজাজ খারাপ করে এসেছে স্বামী। সত্যি তো এই নিয়ে তার বলার, সান্তনা দেবার কী আছে? সুন্দর হাসিটি ঠোঁটের আগায় ঝুলিয়ে সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। 

পিছনে তাকিয়ে সে দেখল না আবার পুরুষটির কপালের চামড়া ভুরু ও চোখের ধারগুলো কী ভয়ংকর কুঁচকে উঠেছে। দেখল না, হাতের বদ্ধ মুষ্টি দুটো কোমরের পিছনে ধরে রেখে বুকের মধ্যে অসহ্য রকমের একটা যন্ত্রণা নিয়ে প্রভুদয়াল প্রায় থরথর করে কাঁপছে। 

হয়তো গুনগুনিয়ে তখন গান করছে হেনা দরজার ছিটকিনি আটকে দিয়ে গায়ে সাবান মাখছে। 

প্রভুদয়াল দুমদুম করে পাল্লার ওপর আঘাত করল। 

কি হল! চট করে বাথরুমের দরজা খুলে গেল, গলায় মুখে সাবানের ফেনা নিয়ে হেনা সেই আধফোটা হাসি হাসছে। তোয়ালেটা বুকে জড়ানো। চমৎকার লেস লাগানো শায়ার এখানে ওখানে জলের দাগ, আর সেইসব দাগের ভিতর দিয়ে হেনার তলপেটের চামড়া, কোমরের খানিকটা, উরুর কোন কোন মসৃন অংশ বিকেলের বাদামী রোদ-লাগা আপেলের লোভনীয় দ্যুতি নিয়ে ফুটে বেরিয়েছে। 

কি হল ! প্রভুদয়াল এমন চোখ করে, এমন নীরব থেকে এবং আচমকা এমন অসহায় ভঙ্গি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকল, হেনা অবাক হল না যদিও, মাঝে মাঝে প্রভু এমন তো করেই, কাজেই ঠোঁটের হাসিটা একটু বাড়তে বা কমতে না দিয়ে সুন্দর মাজা গলায় বলল, কিছু চাইছ ? 

সবচেয়ে অদ্ভুত, প্রভুর চোখ মুখ কুঁচকান একেবারে থেমে গেছে। এই মুহুর্তে শিশুর অনির্বচনীয় সরলতা তার মুখে । একটা অসহায় ভাব। প্রায় কান্নার মতন। দেখলে মায়া হয় । 

এমন কি শিশুর মতন তার ঠোটটাও দুবার কেঁপে উঠল। 

কি চাইছি তুমি কি জান না ? 

আমি ঠিক বুঝতে পারিনি- একটু থেমে হেনা আবার বলল, দেখলাম অফিস থেকে মন মেজাজ খারাপ করে ফিরছ— 

না না না, তা নয়। কোথায় গেল শিশুর মায়া ধরানো চেহারা, আবার সেই উত্তেজিত ক্ষিপ্ত অসহিষ্ণু পুরুষ। প্রভু প্রায় চিৎকার করে উঠল, তুমি আমার ওপর রাগ করেছ। 

অ মা, সে কি ! আকাশ থেকে পড়ল হেনা, কিন্তু হাসিটি ঠিক আছে, কেবল ভুরু দুটো ধনুকের মতন বেঁকে উঠেছে- রাগ করব কেন, কখন রাগ করলাম! 

এই তো একটু আগে। জুতোর ফিতে খুলছিলাম, আর তুমি চলে এলে। 

ইস, দ্যাখো, কী অদ্ভূত ছেলে তুমি, মেজাজটা খারাপ তোমার, তাই ভাবলাম গা-টা ধুয়ে আসি। 

না না না, তা নয়। তুমি অভিমান করেছিলে। 

ও মা ! তোয়ালের একটা কোণা এক সেকেণ্ডের জন্য কামড়ে ধরে হেনা তখনি আবার দাঁত আলগা করে ঠোঁট দুটো আধফোটা গোলাপ কলির মতন করে সেই সুন্দর অভিনব হাসিটা হাসল। —কেন অভিমান করব? তোমার ওপর আমি কোনদিন অভিমান করেছি কি ?

এখন করেছ, আজ করেছ। হাত বাড়িয়ে সাবান মাখা হাতটা মুঠোয় তুলে নিল প্রভু- –আমি চুপ করে ছিলাম, কথা বলিনি, তুমি চলে এলে।' 

না না, সত্যি বলছি। অনুনয়ের গাঢ় মধুর রস হেনার গলা থেকে ঝরে পড়ল। অফিসে তোমার স্টেনো চিঠি টাইপ করতে ভুল করেছে- ভাবলাম—হেনার মুখের কথা আটকে গেল। 

প্রভু চিৎকার করে উঠল, অফিস অফিস, এখানে, এই মূহুর্তে, একটু আগে, আমার ঘরে, তোমার কাছে, তোমার সামনে ছুটে এসে রোজ রোজ আমি কী চাই তুমি কি জান না ? 

প্রভুর মোটা ভারি গমগম গলার স্বরে দরজা জানালা দেওয়ালে ঝুলানো আয়না প্রায় থরথর করে কাঁপছিল। ঝনঝন শব্দ হচ্ছিল। 

গোলাপ কলির হাসি নিয়ে হেনা চুপ। 

বল বল, তুমি কি জান না-তার নরম কব্জি ধরে প্রভু প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিল। 

হেনার চোখে প্রায় জল এসে গেল, যেন হাতে একটু লাগল, তবু ঠোঁটের হাসি নিভতে দিল না। —আমি ঠিক বুঝিনি, সত্যি তুমি কী চাইছিলে— 

প্রভু তাকে কথা শেষ করতে দিলে না। — 

কোনদিনই তুমি বুঝবে না, কোনকালে তুমি বুঝতে চাও না। প্রমত্ত অবুঝ অত্যাচারী দস্যুর মতন প্রভু স্ত্রীকে বুকের মধ্যে টেনে নিল, চুমোয় চুমোয় কাচের টুকরোর মতন শরীরটা চুরমার করে দিতে চাইল। প্রভুর গলায় গোঙানির মতন শব্দ আরম্ভ হল। যেন রক্ত চুষতে চুষতে পশু শব্দ করছে। -আমি কি চেয়েছি, কি চাইব তুমি রোজ না বোঝার ভান করে থাক দুষ্টু।

চুল থেকে নখ পর্যন্ত হেনা লাল হয়ে উঠল, অতিরিক্ত পিষ্ট হবার পর ঝাঁকুনি খাওয়ার ফলে একটি রূপসী তরুণীর যে অবস্থা হয় । 

হেনা হাঁপাচ্ছিল। বৌকে ছেড়ে দিয়ে প্রভু হাঁপাচ্ছিল। হেনার চোখেও শীতের হিমকনার মতন জলের আভাস জেগেছে। তবু সে হাসছিল। 

ও, এই এজন্যে, কিন্তু আমি কি ফুরিয়ে গেছি, ফুরিয়ে যাচ্ছিলাম? 

প্রতি মুহূর্তে তুমি আমার কাছে ফুরিয়ে যাচ্ছ শেষ হয়ে যাচ্ছ । হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কিনারের সাবানের ফেনা মুছে ফেলল প্রভু ।-শেষ হয়ে গিয়ে আমার বুক শূন্য করে দিচ্ছ। 

কিন্তু তখনি আবার আমি ভরে উঠছি, আবার আমাকে ষোল আনা ফিরে পাচ্ছ। তোয়ালেটা নতুন করে বুকে জড়িয়ে নিল হেনা--তাই না ?

প্রভু হঠাৎ কথা বলতে পারল না। 

এবার আমায় গা ধুয়ে শেষ করতে দাও লক্ষ্মীটি। সান্ত্বনা দেবার মতন গলার স্বর করে আস্তে দোরটা আটকে দিল হেনা। জল পড়ার ছপছপ শব্দ হতে লাগল। কিন্তু তার চেয়েও সুন্দর একটা স্বর করে ছন্দ নিয়ে ভিতরে থেকে হেনা বলল, গা ধুয়ে নতুন করে ভরে উঠে আমি তোমার কাছে আসব, আবার আমাকে নিঃশেষ করে দিও। 

এই জন্যই তো আমি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি, পাগল হয়ে যাব। বদ্ধ দরজাটার দিকে হিংস্র অসহায় চোখে তাকিয়ে প্রভু মনে মনে বলল, এত রূপ আমি সহ্য করতে পারছি না, তুমি কবে আমার কাছে শেষ হবে, শূন্য হয়ে যাবে, আর আমি শান্তি পাব আমাকে বলতে পার? 

অফুরন্ত ফেণা ও গন্ধ ছড়িয়ে হেনা ভেতরে বসে সাবান মাখছিল। আর প্রভু ছটফট করছিল। একদিন না। এমন রোজ। যতক্ষণ অফিস-অফিস । বাকি সবটা সময়, হেনা যতক্ষণ তার সামনে, সে চঞ্চল ক্ষুব্ধ হিংস্র বিপন্ন। তার যে কী ইচ্ছা করে সে বুঝতে পারে না। 

সেদিন কী কাণ্ড করল। 

তাদের বিয়ের তারিখে ঘরোয়া উৎসব পরামর্শ করে দুজনেই দুজনের বন্ধু বান্ধবীকে বাড়িতে ডেকে এনেছিল। মাঝের হলঘরে খাওয়াদাওয়া শেষ করে গোল হয়ে বসে সকলে গল্প করছিল আনন্দ করছিল। ঠিক সে মুহূর্তে প্রভু উসখুশ করতে লাগল। ঘন ঘন হাতের ঘড়ি দেখছিল একবার উঠে গিয়ে হেনার কানে কানে কী বলেও এল। ঠোঁটে হাসি নিয়ে হেনা ভ্রুকুটি করল। দু-একজন দেখল। কিন্তু তারপর প্রভু আবার কেমন অস্বস্তি নিয়ে এদিক ওদিক করছে, কারো কাছে স্থির হয়ে বসতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না। তখন সকলেরই জিনিসটা চোখে পড়েছে— 

আজ আমরা উঠব, প্রভু। প্রায় এক সঙ্গে সকলে গাত্রোত্থান করার ভঙ্গি করল। হেনার দিকে চোখ রেখে তার বান্ধবীরা বলল, আজ চলি রে হেনা । 

হেনা নীরব। 

প্রভু তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাওয়ার মতন চেহারা করল।–নাইট শো'র টিকিট কেটেছিলাম ভাই। দুজনে একসঙ্গে সিনেমায় যাচ্ছি। 

নিঃশব্দে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।

হাসছিল হেনা ঠিকই। কিন্তু মুখটা কেমন সাদা হয়ে গিয়েছিল। 

হঠাৎ এমন করলে যে ! 

ভিড়। প্রভুর গলার স্বর বিকৃত হয়ে উঠল। এত লোকের মধ্যে আমি তোমাকে কাছে পাচ্ছিলাম না হেনা, কেমন যেন বার বার হারিয়ে যাচ্ছিলে । 

ওফ্‌, আবছা একটা শব্দ করল হেনা, গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর সেই আধফোটা গোলাপের হাসিটা ঠোঁটে ধরে রেখেই ধমকের স্বরে বলল, এই তে৷আমি কাছে আছি—ওরা কতক্ষণ থাকত । খামোকা মিছে কথা বলে—তারপর হেনা দেওয়ালের দিকে চোখ ফেরাল। পাগল, বদ্ধ পাগল তুমি—তোমায় নিয়ে যে কী করব আমি বুঝতে পারছি না। 

আমিও বুঝতে পারছি না। হেনার পাশে সোফার ওপর ভেঙে পড়ল প্রভু, দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।—সত্যি আমি পাগল হয়ে গেছি। 

এভাবে ঘরে, যতক্ষণ সে আছে, বৌ থাকবে—একটা ভয়ংকর উজ্জল আলোর মতন চোখের সামনে, তার শরীরের কাছে হেনা অবিরত জ্বলবে, আর সেই প্রচণ্ড তাপ লেগে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। 

তা না হলে, হেনা ভাবে, এই পুরুষ এমন করবে কেন ! কেবল সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে এই ব্যবহার না, যেন বাইরের জগত, বাইরের আলো, বাইরের সব মানুষের চোখ তার কাছে অসহ্য । যেন সবাই তার প্রতিদ্বন্দ্বী, সকলের ওপর তার হিংসা, সকলকে তার ঈর্ষা সন্দেহ । 

আর একদিন কি তাই হল না! হেনাকে নিয়ে পুরী বেড়াতে যাচ্ছিল। ট্রেনের সীট রিজার্ভ করা, টেলিগ্রাম করে ওখানকার হোটেলের ঘর ভাড়া করা, জিনিসপত্র কেনাকাটা—সমস্ত আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এমন কি ট্যাক্সি ডেকে হাওড়া স্টেশনেও পৌঁছে গিয়েছিল। 

কিন্তু ঐ যে ট্রেনে উঠবে বলে তারা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মাত্র হাজারটা মানুষ গাড়ির জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে চোখ বড় করে প্রভুর আশ্চর্য রূপসী স্ত্রীকে দেখছিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রভুর কপালের রগ দপদপ করে উঠল। তক্ষুনি পুরী ভ্রমণ বানচাল করে দিয়ে হেনার হাত ধরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি করে সে সোজা ঘরে ফিরে আসে। 

বিস্ময় না, বিরক্তি না—কৌতুক, সেই সঙ্গে এক আঁজলা অনুকম্পাও খেলা করে উঠেছিল হেনার গভীর সুন্দর চোখ দুটোর মধ্যে। তাই ঘরে ফিরে গোলাপ কলির হাসি ঠোঁটের আগায় অক্ষুন্ন রেখেই সে প্রভুকে কথাটা শুনিয়েছিল।

এভাবে আমাকে চারটে দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখার, বন্দী করে রাখার কোন মানে হয় না। এতে তোমার যন্ত্রণা আরো বাড়বে। 

আমি এই যন্ত্রণাই চাই, এই যন্ত্রণার মধ্যেই আমার সুখ। প্রভু প্রায় অট্টহাস্য করে উঠেছিল। 

তাই তো বলছি, এত অবুঝ তুমি, এত অস্থির। সারাক্ষণ কেবল আমার চিন্তা আমার ধ্যান। এভাবে চিরে চিরে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত ঝরিয়ে তুমি ক'দিন বাঁচবে শুনি ? 

আমি তো মরে যেতেই চাইছি হেনা, তোমার আশ্চর্য চোখ ভুরু চুল, অসামান্য সুন্দর মসৃণ উজ্জল গায়ের চামড়া, কোমর উরু পা, হু”, পায়ের নখ সব নিংড়ে রস খেয়ে—বিষাক্ত কোন ফলের রস খেয়ে যেমন মানুষ মরে, আমি মরে যেতে চাই। আমি মুক্তি চাই। 

কিন্তু মুশকিল হয়েছে কি, তুমি মরে যাবার পরেও আমি বেঁচে থাকব, এই চুল চোখ চামডা নখ দিয়ে একটি রসালো ফলের মতন আমি ভরে থাকব। তখন কে আমার রূপের গুণ করবে, বা তোমার ভাষায় আমায় নিংড়ে নিংড়ে রস খাবে ? তুমি যদি তখন চলেই গেলে—

প্রায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে প্রভু গোল গোল চোখ করে হেনাকে দেখল। তারপর অন্যদিকে চোখ ফেরাল। একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল । 

তাই তো, নিজেকে ধ্বংস করা যায়, হৃৎপিণ্ড চিরে রক্ত দিয়ে রূপের পূজো করা যায়, কিন্তু তার পরেও তো রূপ বেঁচে থাকে—এই দুর্ভাবনা যে আরও গভীর, এর যন্ত্রণা যে আরও মারাত্মক। 

চেহারাটা বিকৃত করে সে হেনার দিকে তাকাল। তা হলে আমায় কী করতে বল শুনি ? আমায় একটা বুদ্ধি দাও, পরামর্শ দাও হেনা। আমি সত্যি আর পারছি না। শিশুর মত কাঁদল না সে, হিংস্র অত্যাচারী পশুর মতন গর্জন করল না, ঠোঁটটা কামড়ে ধরে মাথার চুল ছিড়তে লাগল। 

মনটাকে উদার কর বড় কর, বাইরের দিকে একটু তাকাও, শান্তি পাবে। আদর করে প্রভুর পিঠে হাত বুলোল হেনা—আমি তো রয়েছিই। এত বড় আকাশেও সন্ধ্যাতারাটি ঠিক জ্বলজ্বল করে—করে না কি ? 

প্রভু শুনল। কিন্তু সান্তনা পেল কি। দু-দিন খুব ভাবল। অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে থাকল। দাঁড়ি কামাল না। সিগারেট খাওয়া বাড়িয়ে দিল। এমন কি পুরো একটা দিন অফিস কামাই করে ফেলল।

যেন সেদিনই, যেদিন অফিসে গেল না, সারাদুপুর টো-টো করে বাইরে বাইরে ঘুরল। যেন বাইরে থেকে ঘুরে এসে মনটা একটু স্থির হল, অন্তত হেনা তাই দেখল। প্রভু জিনিসপত্র বাধা-ছাদায় মন দিয়েছে। 

তা হলে আমরা পুরী যাচ্ছি! খুশি হয়ে হেনা প্রশ্ন করল। 

পুরী না হেনু। আমরা পাহাড়ে যাব। সমুদ্রের চেয়ে পাহাড় অনেক বেশি সুন্দর। অত্যাচারী দস্যু না, আদেখলা শিশু না, প্রেমিকের মতন প্রভু সুন্দর করে হেনার ঠোঁটে চুমো খেল।—কাল সকালেই আমরা রওনা হচ্ছি। 

আহ্লাদে হেনা প্রায় হাততালি দিয়ে উঠল। 

যেন হেনার উপদেশে কাজ হল । রাস্তায় স্টেশনে ওয়েটিং রুমে ট্রেনে লক্ষ মানুষ লক্ষবার করে হেনাকে দেখল। প্রভু গ্রাহ্যই করল না, একটু মাথা ঘামাল না এই নিয়ে। সারারাস্তা গাড়ির জানালার ধারে বসে দুজন গল্প করল, আর, একটু পর পর খাবার খেল। 

চমৎকার ডাকবাংলো পেয়ে গেল তারা। দেবদারু আর ইউক্যালিপটাসের ঘন বন চারিদিকে। সারাক্ষণ পাখি ডাকছে। বাতাসের মর্মর। শুকনো খটখটে নীল আকাশ। আর তিনদিক ঘিরে স্তুপ স্তুপ পাহাড়। খাওয়া-দাওয়ার খুব সুখ । হাত বাড়ালেই তিতির মুরগি মিলছে। খরগোশ। ঘন দুধ। 

দু-দিন—তিন দিন—চার দিন। চার দিনের দিন হেনা আর লোভ সামলাতে পারল না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে। 

প্রভু প্রথম থেকেই যা চাইছিল। হেনার ভয় । চারদিন ক্রমাগত পাহাড দেখে দেখে হেনা ভয়টা কাটিয়ে উঠল। 

একদিন বিকেলে প্রভুর হাত ধরে থেমে, ঘামিয়ে অতিকষ্টে একটা চূড়ায় উঠল। দুজন একটা পাথরের ওপর বসল। একটু বসে বিশ্রাম করল। তারপর আবার উঠে দাঁড়াল । 

এপাশটায় ভয় নেই। ওপাশটাই ভয়ের। ভীষণ খাড়া। সোজা অন্ধকার খাদের দিকে নেমে গেছে। আশ্চর্য, হেনার হাত ধরে প্রভু সেদিকেই চলল। - 

দু-পা এগিয়ে হেনা দাঁড়িয়ে পড়ল। 

কি হল! প্রভু ভুরু কুঁচকোল। 

আর যাব না। হেনা আস্তে বলল । 

ওদিকেই যেতে হবে, প্রভু রীতিমত গর্জন করে উঠল। —তোমার নিয়ে ওখানটায় যাব বলে কষ্ট করে এতটা ওপরে উঠলাম।

দেখতে দেখতে বীভৎস বিকৃত হয়ে উঠল তার চেহারা। 

হেনা অপলক চোখে স্বামীকে একবার দেখল। 

এস। কঠিন সরল হাতে হেনার নরম কব্জি ধরে প্রভু ঝাঁকুনি দিল। 

ওখানে গেলে কী হবে? ছোট করে একটা ঢোক গিলে হেনা প্রশ্ন করল। 

তোমায় ধাক্কা দিয়ে খাদের অন্ধকারে ঠেলে ফেলে দেব, তারপর আমি এখান থেকে নেমে যাব, তারপর আমার মুক্তি। অক্লেশে প্রভু উত্তর করল। কিন্তু তখনি সে স্তব্ধ হয়ে গেল । 

কেননা ভয় পেয়ে হেনা চেঁচাল না, মুখটা একটু ফ্যাকাসে করল না, কাঁপল না, ঋজু সুঠাম তরুণ দেবদারু গাছের মতন সুন্দর শরীরটা নিয়ে অবিচল দাঁড়িয়ে রইল । তারপর আস্তে আস্তে রক্তাভ পরিপুষ্ট অধরোষ্ঠে আধফোটা গোলাপের হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। 

ভয় পেল প্রভু। হেনার হাত ছেড়ে দিল । যেন হেনা মানুষী না, দেবী । 

আমার কাছে তুমি কী চাইছ, বলতে পার প্রভু ? হেনা সামনের দিকে গলাটা বাড়িয়ে দিল ।

না, না, বলতে পারছি না, এই জন্যই তো এত যন্ত্রণা। কোনদিন বলতে পারব না বলেই তো আমি পাগল হয়ে গেছি। ঘাসের ওপর বসে পড়ল প্রভু । 

তারপর পাথরটার গায়ে মাথা কুটতে লাগল, হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল। 

ওঠ, শোন। হেনা তার হাত ধরে টেনে তুলল। সান্ত্বনা দিল। প্রবোধ দিল । -

—এমন করে কাঁদে না । 

প্রভু আর কাঁদল না ঠিকই। কিন্তু চোখের জল মুছল না, কপালের রক্ত মুছল না। হেনার হাত ছাড়িয়ে পাহাড়ের ওদিকটায় ছুটে যেতে পা বাড়াল। 

কি হচ্ছে ! হেনা শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল। 

আমি মরব, আমি খাদের অন্ধকারে ঝাপ দিয়ে সব যন্ত্রণা শেষ করব । 

শোন। হেনা তার হাত ছাড়ল না, অনিন্দ্য সুন্দর গোলাপের হাসি ঠোঁটে নিয়ে প্রভুর চোখের দিকে তাকাল।—আমার কাছে তোমার কী চাওয়ার ছিল, মূহুর্মূহু কি চাইছিলে তুমি কোনদিনই বলতে পারবে না, কিন্তু তোমার কাছে আমার কী চাওয়ার আছে, তা তো শুনছ না। 

কী! হঠাৎ যেন মুমূর্ষ কাতর শূন্য দৃষ্টি নিয়ে প্রভু তাকাল। যেন একটু আশা এল তার মনে, একটু বল পেল। যেন এমন কিছু হেনা তার কাছে চাইছে যার ওপর তার জীবন নির্ভর করছে, এমন কিছু হেনার মুখে শুনবে যাতে তার সব অস্থিরতা সব যন্ত্রণা অবসান হবে।-বলো, বলে আমার কাছে তোমার কী চাওয়ার আছে। একটা ভীষণ আবেগ নিয়ে সে হেনার কাঁধে হাত রাখল। 

হেনা হাত দুটো নামিয়ে দিল না। আকাশের দিকে তাকাল। তারপর ঠাণ্ডা মসৃণ গলায় বলল, ডিভোর্স। তবেই আমার সব যন্ত্রণার শেষ হবে, আমি মুক্তি পাব। 


গোরুর মতন চোখ দুটো করে প্রভু আস্তে আস্তে ঘাসের ওপর বসে পড়ল।

1 টি মন্তব্য:

  1. আমার পড়ার সীমাবদ্ধতার কারনেই হয়তোবা, জোতিরিন্দ্র নন্দীর কোন গল্প পড়া হয় নি । কিছুদিন আগে কুলদা রায় গল্পের বইয়ের পিডিএফ পাঠিয়ে বললেন, " চাওয়া গল্পটি পড়ে দেখেন।" গল্পটি পড়ে মুগ্ধতা নিয়ে টাইপ করে ফেললাম গল্পপাঠের জন্য, আরো অনেককে পড়াব বলে। টাইপ ও বানান সংশোধন করতে গিয়ে আরো দু'তিনবার পড়া হলো। একবারও মনে হয় নি গল্পটির নির্মান শৈলীতে কোথাও কোন খুঁত আছে।

    কোন ঘটনার ঘণঘটা নেই গল্পটিতে। স্ত্রীর রুপে মুগ্ধ বিকারগ্রস্থ একজন মানুষের মনস্তাত্নিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেছেন, স্ত্রীর মোহনীয় রুপটিও তুলে ধরেছেন। ভাষার যাদুতে ভিতর বাহিরের এই অবস্থার চিত্র তুলে ধরা সহজ কাজ নয়।

    বাংলা সাহিত্যের এরুপ আরো কত মনি মুক্তা পাঠের আড়ালে রয়ে গেছে, তা ভেবে মনে হয়-জীবন এতো ছোট কেন?

    উত্তরমুছুন