বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

মাহবুব লীলেন'এর গল্প : দৌড়

বড়োগুপ্ত যতদিন বাড়িতে থাকেন বাঘেরা এদিকে আসে না কেউ। গুপ্তের হাটে বসেই খরগোশ কিংবা কাঁকড়া ধরে খায়; না হলে উপোস দিয়ে অপেক্ষা করে কখন বড়োগুপ্ত বাড়ি থেকে যাবেন আর তারা বাঘের কান্দি ঢুকে আবার গরু মহিষ ছাগল মানুষ ধরে নিয়ে যাবে। বড়োগুপ্তের পূর্বপুরুষরা উত্তর থেকে এসে এখানে বসত করার সময় থেকেই এ নিয়ম চালু।
পুরো এলাকাটাকে বাঘের কান্দি আর গুপ্তর হাট নামে দুই সীমানায় ভাগ করে ঠিক মাঝামাঝি একটা মন্দির তৈরি করেন তারা। মন্দিরের ভেতরে গুপ্তবংশের পূর্বপুরুষ কোনো এক কবির একটা লোহার মূর্তি। লোহার তৈরি কাঠের টুলে বসে লোহার তৈরি বাঁশের কলম হাতে নিয়ে তিনি লোহার তৈরি তালপাতায় পুথি লেখার জন্য গুপ্তর হাটের দিকে লোহার চোখে তাকিয়ে কবিতার কথা ভাবছেন। জঙ্গল থেকে বের হয়ে বাঘেরা যদি দেখে গুপ্তকবির চোখ জ্বলজ্বল করছে তবে বুঝে নেয় বড়োগুপ্ত বাঘের কান্দিতে আছেন। আর যদি দেখে গুপ্তকবির চোখ মরা ইলিশের মতো তবে বুঝে নেয় পুরা বাঘের কান্দিই এখন বাঘেদের সম্পদ। একইভাবে বড়োগুপ্ত গ্রামে থাকলে সব মানুষের জন্য শিকার কিংবা কাঠ সংগ্রহ নিষেধ গুপ্তের হাটে ঢুকে। তখন মানুষেরা নিজের ফসলি গাছের ডাল ভেঙে জ্বালানি করে কিংবা পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে খায়...

গুপ্ত বাড়িটা নদী আর লঞ্চ ঘাটের ঠিক উপরে। ঘাটের নিচে যে পানি সেটা নদী নয় লেক। এক মাইল দূর থেকে লেক বানিয়ে নদীকে টেনে আনা হয়েছে গুপ্তবাড়ির গোড়ায়। লেকটা গুপ্তবাড়ির চারপাশ চক্কর দিয়ে আবার গিয়ে মিশে গেছে বাগধা নদীর ভেতর। আর লেক থেকে তুলে আনা মাটি দিয়ে ধানের জমিতে তৈরি হয়েছে গুপ্তবাড়ির ভিটা আর ঘর। ঘর মানে লোহার বিমের উপর আঁকাবাঁকা টিনের চাল ছাড়া আর কোনো তালা বেড়া দরজা জানালা কিছুই নেই

বড়োগুপ্ত ঘুরে ঘুরে সবগুলো গুপ্তবাড়ি থাকেন। আর পার্বণে এখানে থাকেন অনেক অনেক দিন। সঙ্গে অন্যরাও আসে। এই পার্বণে এক গুপ্তকন্যার সাথে আমিও চলে আসি এখানে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন বড়োগুপ্তকে বলি স্বপ্নে এরকম একটা বাড়ি দেখি আমি। কথা শুনে বড়োগুপ্ত সব গুপ্তের সাথে মিটিং করে বলেন- যদি বাড়িটাকে দেখে রাখতে পারো তবে বাড়িটা তোমার...

তারপর দুসপ্তা ঘুরে তিনি আমাকে ঘর আর উঠান- বাড়ি আর লেক- লেক আর নদী এবং বাঘের কান্দি আর গুপ্তের হাটের সীমারেখা বুঝিয়ে দিয়ে এক সকালে পুরো পরিবার নিয়ে নিজের ঘাটে লঞ্চে উঠেন...

উত্তর দিকে বাড়ি চক্কর দেয়া লেকটা যেখানে সরল রেখা হয়ে বাগধা নদীতে ঢুকে গেছে সেখানে এসে লঞ্চটা গুপ্তবাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়ায়। গুপ্তরা লঞ্চে উঠে আর আমি লেকের পাড় দিয়ে উত্তর থেকে ঘুরে গুপ্তবাড়ির দক্ষিণ রাস্তার দিকে এগোই। দক্ষিণের পথে ছোট্ট একটা ভাসমান ব্রিজ লেকের উপর। একেবারে পানি ছুঁই ছুঁই। এটা পার হলেই গুপ্তবাড়ি

ব্রিজটার দিকে এগোতেই ডানে টের পাই পানির মধ্যে ঝড়। প্রথমে ভাবি লঞ্চ ছেড়ে যাবার ধাক্কায় পানির ঢেউ। কিন্তু একটু পরেই পানির ঝড় সুতার মতো এঁকে বেঁকে ব্রিজের দিকে আসতে আসতে পরিষ্কার কালো আর বড়ো হয়ে যায়। গুপ্ত লেকের অজগর। পুরো বাড়িটা সে পাহারা দিয়ে রাখে...

টাকি মাছের মতো লেজ আর কুমিরের মতো মুখের সাপটা আমাকে তাড়াতে শুরু করে পানি তোলপাড় করে। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি গিয়ে লঞ্চে উঠে পড়ি। বড়োগুপ্ত আমাকে সাপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেননি...

তিনি তখনও ডেকের উপর দাঁড়িয়ে। ঠান্ডা চোখে তিনি হাসলেন- শুধু সাপ নয়। বাঘের সাথেও তোমাকে পরিচয় করানো হয়নি। ওটা তোমার নিজেকে করে নিতে হবে। বাড়ি দেখে রাখা মানে বাড়ি পাহারা দেয়া নয়। বাড়ি দেখে রাখা মানে সাপ বাঘ আর মানুষের সাথে সমঝতা করা। ওটা পারলেই বাড়িটা তোমার...

বড়োগুপ্তর কথা শেষ হবার আগেই আমার পায়ের নিচ দুলিয়ে লঞ্চটা ছেড়ে দেয়। আমি একটা চিৎকার দিয়ে বড়োগুপ্তকে বললাম- স্যার লঞ্চটাকে থামতে বলেন

- ওটা তোমার সমস্যা। যা করার তোমাকেই করতে হবে

কিন্তু আমার হইচই চিৎকারে কিছুই হলো না। খালাসি সারেং কেউ পাত্তা দিলো না আমাকে। আমি আবার বড়োগুপ্তকে গিয়ে ধরলাম- স্যার আপনি না বললে লঞ্চ থামবে না



বড়োগুপ্ত আবারও হাসলেন- ফিরে যাবার উপায় না ভেবে যে পানির ভেতর চলে আসে তার কাছেই কি আমি বাড়ির দায়িত্ব দিলাম?

আমি হাহাকার করে উঠলাম। ক্রমশই আমার বাড়ি দূরে সরে যাচ্ছে। আমি সমানে চিৎকার করছি লঞ্চ থামানোর জন্য। কিন্তু কেউ আমার দিকে তাকায়ই না। এক চ্যাংড়াগুপ্ত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো চিৎকার শুনে- আমনে এমন বেবুতা সেইডা তো বুঝি নাই। লঞ্চ ছাইরগা দিতাছে বুঝেন নাই?

- এই ছ্যামরা সর। ক্যাটর ক্যাটর করিস না এখানে

গুপ্তকন্যা ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দিলো চ্যাংড়াটাকে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল- চুপ থাক। পয়সার হাটে নেমে ফিরতি লঞ্চে চলে আসতে পারবি

পয়সার হাটে গুপ্তকন্যার বাবা মেজোগুপ্ত থাকেন। মেজোগুপ্ত বড়োগুপ্তের পিঠাপিঠি ছোটভাই। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ধাপে ধাপে চলে গেছে গুপ্ত বংশের বাড়িগুলো। বয়সের সিরিয়ালে বড়োগুপ্ত থাকেন একেবারে গ্রামে মেজোগুপ্ত একটু শহরের দিকে আর সেজোগুপ্ত আরেকটু এগিয়ে। বড়োগুপ্ত মারা গেলে মেজোগুপ্ত যখন বড়োগুপ্ত হবেন তখন তিনি চলে আসবেন এখানে। আর তার বর্তমান বাড়িতে এসে উঠবেন তার ছোটভাই। বড়োগুপ্তরা শহর থেকে গ্রামে আসার সময় সব বাড়িতে একরাত করে থেকে থেকে আসেন। আবার যাবার সময় একইভাবে সব বাড়িতে একরাত করে থেকে থেকে যান

পয়সার হাটে যেতে ভাঁটিতে চার ঘণ্টা আর ফিরতে উজানে পাঁচ। যেখানে গিয়ে এই লঞ্চটা থামবে তার দশ মিনিট পরে অন্যঘাট থেকে ছাড়বে ফিরে আসার লঞ্চ

মেজোগুপ্তর ঘাটে নেমেই আমি দৌড় লাগালাম। কিন্তু আটকে দিলো গুপ্তকন্যা- বাবার সাথে দেখা করে যা...

এই বাড়িটা সিমেন্ট-ঢালাই উঠানের দুইপাশ ঘিরে কারুকাজ টিনের চালে তৈরি। এই বাড়ি খুঁটি আর টিনের চালের সাথে এক ফুট করে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা...

হাঁটুর নিচের অংশ শূন্যে ঝুলিয়ে মেজোগুপ্ত একটা খাটের উপরে আধশোয়া ছিলেন। তার ডানপাশে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত খাটের বাইরে ঝুলিয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন গুপ্তকন্যার মামা। আর দুজনের সামনে মেঝেতে তাদের দিকে মুখ করে একজন বসে আছে টুলে। আমাকে দেখেই মেজোগুপ্ত একটু উঠে বসলেন- এলে যখন পায়ে একটা টোকা দিয়ে যাও

- মানে?

গঙগঙ করে গোঙানি দিয়ে উঠল টুলে বসা লোকটা- মানে প্রণাম করতে বলছেন

- আমি কারো পায়ে ধরি না

- গঙগঙ গঙ... বান্ধবীর বাবাকে প্রণাম করবে না?

গুপ্তকন্যা আমার পিঠে হাত রাখল- করে ফেল। কিচ্ছু হবে না

তর্ক করলে আর ফিরতে পারব না। টুক করে মেজোগুপ্তের পায়ে টোকা দিতেই মামাগুপ্ত তার পা বাড়িয়ে ধরলেন- আমাকে?

তাকেও একটা টোকা দিয়ে দাঁড়ানোর আগেই দেখি পুরো বাড়িভর্তি লোক পায়ে তেল মেখে পা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে- আমরাও প্রণাম পাই

আমি সবার দিকে তাকিয়ে মাটিতে দুটো প্রণাম ঠুকে বললাম- এই মাটিতে রাখলাম। সবাই ভাগ করে নিয়েন...

আর কারো দিকে না তাকিয়ে এক দৌড়ে বের হয়ে লঞ্চ ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু রাস্তা দেখে ঘাটের কোনো লক্ষ্মণ চোখে পড়ল না। সাধারণ গ্রামের রাস্তা। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ঘাটটা কোথায়?

- হেমুরে যান

ওই রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে আবারও ধান্দায় পড়লাম। আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম। সেও একই রাস্তা দেখিয়ে বলল- হেমুরে যান

এটা একটা সাধারণ নদীর পাড়। লঞ্চঘাট কোথায়? নদীর পাড়টাও বেড়িবাঁধের কারণে বিশাল উঁচু। বেয়ে গিয়ে উপরে উঠলাম। কোথাও কোনো জনমানুষ কিংবা লঞ্চের চিহ্ন নেই। আবার ফিরে এসে একজনকে জিজ্ঞেস করতে বলল এইটাই লঞ্চঘাট

- কিন্তু লঞ্চ নেই কেন?

- সুমায় অইলে আইবে

নদীর এই পাড়টা কালো কালো মাটির চাক দিয়ে তৈরি। মনে হয় বিশাল চানপুরি কোদাল দিয়ে এঁটেল মাটির চাক একটার উপর আরেকটা তুলে দিয়ে পাড়টা বানিয়েছে কেউ। প্রতিটা চাকের মধ্যে কোদালে কাটার দাগ আর কোনাগুলো বের হয়ে আছে একেবারে টাটকা মাটির মতো। ঠিক তখনই লঞ্চটা দেখলাম...

ওয়াইনের গ্লাসের মতো দেখতে আলকাতরা রংএর একটা লঞ্চ। পুরো লঞ্চটাই কালো কালো আঁশের মতো চাকতি দিয়ে তৈরি। নিচে একটা গোল চাকতি তার উপর একটা সরু খুঁটি তার উপর বিশাল ছড়ানো ডেক। নিচের চাকতিটা পানির নিচে ভাসছে আর ডুবছে। উপরের ছড়ানো ডেকটা হাতের অঞ্জলি পাতার মতো সামনের দিকে লম্বা- চোখা আর পেছন দিকে ভোঁতা

লঞ্চটা পানির উপর দিয়ে কানিবগার মতো ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে এসে থামল ঘাটে। নিঃশব্দে নামা আর উঠা শেষ করে আবার পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করল বাইচের নৌকার মতো পানিতে খপাৎ মেরে। ঠিক সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মাথায় আমাকে নামিয়ে দিলো বাঘের কান্দি গুপ্তবাড়ির ঘাটে...

উত্তরের মূল রাস্তা ধরে বাড়িতে উঠে এলাম আমি। নিজের জন্য এখন ঘর বানাতে হবে আমার। বাঘের কান্দিতে অন্যের ঘরে থাকে না কেউ। কিন্তু বড়োগুপ্ত এখন আর গ্রামে নেই; বাঘেরা যে কোনো জায়গায় শিকার ধরতে পারে। বড়োগুপ্ত বাড়ি নেই; লেক থেকে যে কোনো সময় উঠে আসতে পারে সাপ। চালের টিন নেই আমার; আকাশ থেকে যে কোনো সময় নামতে পারে বৃষ্টি...

ক্লান্তিতে ভেঙে আসা শরীর নিয়ে আমি উঠানের অন্যমাথায় দাঁড়াই। পায়ের বুড়ো আঙুল বাঁকা করে মাটিতে গেঁথে উঠানের বালিতে একটা চৌকোনা দাগ টানি। এটা আমার ঘর...

কিন্তু এই ঘর বড়ো বেশি কাঁচা। যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘরের সীমা দেখে শত্রু অন্যপথে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত পাকা হয় না ঘর। ঘুমুবার আগেই নিজের ঘরটাকে পাকা করে নিতে হবে আমায়...

আমি হাঁটু গেড়ে বসি বাঘ সাপ আর বৃষ্টির সাথে সমঝতার আশায়। থুতু ফেললে যেখানে গিয়ে পড়ে সেখানে চোখ রেখে শুরু হয় আমার ঘরশুদ্ধির প্রার্থনা- ও বৃষ্টি ও সাপ ও বাঘ; ঘর মানে শুধুই বালির উপরে এক অস্পষ্ট রেখা। কাউকে ঠেকানোর ক্ষমতা সে রেখার নেই; নেই আটকে রাখার জোর। ঘর মানে শুধুই এক নড়বড়ে সমঝতার নিয়ম। ও বৃষ্টি; আকাশের ছাদ ভেঙে আমার ঘুমে প্রবেশ করো না তুমি। ও বাঘ; এই দাগের ভেতরে শিকার খোঁজো না তুমি। ও সাপ সূর্যাস্তের পরে আমার শত্রু হয়ো না তুমি। ও বৃষ্টি ও বাঘ ও সাপ তোমাদের শক্তি নিজের ভেতরে সংহত রেখে তুচ্ছ এই সীমারেখা তোমরা স্বীকার করে নাও। স্বীকার করে নাও এক ক্ষুদ্র মানুষের নিজস্ব নিয়ম। স্বীকার করো এই ঘর। গ্রহণ করো এই তুচ্ছ বালিরেখা। গ্রহণ করো আমাকে...

আমাকে গ্রহণ করো হে শত্রুসমাজ নগণ্য এক তৃণের মতো অনুল্লেখ অবহেলায়...

1 টি মন্তব্য:

  1. মাহবুব লীলেনের দৌড় গল্পটি পড়লাম। ইন্টারেস্টিং। মনে হয় স্বপ্নের মধ্যে এসেছিল এই কাহিনী।

    উত্তরমুছুন