বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

শিপা সুলতানা 'র ছুটির লেখা : হায় নূরী! হায় নূরী!

মন বাঙালিয়ানা বৃষ্টি এদেশে আসা অবধি দেখিনি আর। টানা পাঁচদিন থেকে ঝরছে তো ঝরছেই। বিকেল মাত্র চারটা। কিন্তু রাত দশটার অন্ধকার পৃথিবী জুড়ে। বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়েছে সোফার ওপর। দুজনের গায়ে দু'টি চাদর দিয়ে জানলার কাছে এসে বসেছি। ইচ্ছা করছিল জামাইকে বলি আজ কাজে না গেলে হয় না? জানি, বললেও কোনো কাজ হতো না!

বছরে কত কত রাত চমকে উঠি ঘুম থেকে। বৃষ্টি! বৃষ্টি হচ্ছে। দেশের বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে মুখে! কোথায় বৃষ্টি! ঘুমের ভেতর ঝরে পড়ে কত কত রাতের সর্বনাশ করে গেছে বোকা বৃষ্টি! এই ঝুম বৃষ্টি দেখে সেই দুঃখ ভুলে যাবার কথা কিন্তু বেকামা বৃষ্টিতে না যাবে ভেজা না কোনো রোমান্স! নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে বেডে পড়ব নাকি! আমি চিন্তিত আছি পানিকদু আর চাইনিজ কুমড়ার ঝাড় নিয়ে। শিম ছ্যাঁচড় জাতীয় লতা কিন্তু লাউ আর কুমড়া? অসময়ের লাগাতার বৃষ্টিতে গাছ পচে যেতে পারে। তাহলেই গেছি। গত দশ/বারো বছরে যে পরিমাণ স্টাডি করেছি নেট আর মানুষের কাছ থেকে, কৃষির ওপর পিএইচডি করা এখন সময়ের ব্যাপার। কিন্তু কখনও একটি লাউয়ের মুখ দেখিনি। এবার এসপার ওসপার দেখে ছাড়ব। কিন্তু তার আগেই যদি গাছ ঝরে যায়! দেখব নাকি ছাতা মাথায় করে! কিন্তু গার্ডেন এর এখানে ওখানে স্লাগ আর স্নেইল ভর্তি। রোদ উঠার পর সে যখন হেল্প করবে তখুনি কেবল দেখতে পারব। 

বৃষ্টি ধরে আসেনি কিন্তু কলঙ্কের কালি সরে যাচ্ছে আকাশ থেকে। অল্প অল্প রোদ আসছে বার্চ গাছের মাথায়। এবছর গার্ডেনে একটা প্লাম গাছ রুয়েছি। কেবল এই একটি ফলকেই এদেশে ফলের সন্মান দেয়া যায়। খুব দেখে শুনে কিনে এনে রুয়েছি। এমনকি ৩ মিটার লম্বা হলেই যে ফল আসবে, তাও দেখেছি। গাছ রুয়ে এ যে প্লাম ট্রি, গাছের শরীর থেকে সার্টিফিকেট খুলে ফেলে দিচ্ছি, ভাবলাম আরেকবার পড়ি। কিছুই তো মনে রাখতে পারি না। কেউ কেউ আছেনই ফুল নয় ফল নয় বৃক্ষ তোমার নাম কী! তখন বড় বাঁচা যাবে। জুসি এন্ড সুইটি প্রেসিডেন্ট প্লাম! কোন প্রেসিডেন্ট কিসের প্রেসিডেন্ট? কিন্তু এ কী!? আশেপাশে আরও কোনো প্লাম গাছ থাকলেই নাকি এই গাছে প্লাম আসবে। এসব কী! এটাও বেকামা গাছ। অর্থাৎ আমার আঙ্গিনায় যা-ই আছে, বৃষ্টি, লাউ, কুমড়া, প্লাম- সবই বেকামা!

জানলা থেকে সরে যাব, কিন্তু কি দেখলাম! নূরী? নূরীকেই দেখলাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হারামজাদি মুচকি মুচকি হাসছে না? তড়িত ব্লাইন্ড তারপর কার্টন নামিয়ে দিলাম জানলায়। তারপর নিচতলার সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে চা বানাতে গেলাম। কিচেন থেকে দশ বারো হাত দূরে বার্চ গাছ। ঘর থেকে আমি কিছুই দেখব না কিন্তু নূরী আমাকে দেখবে! হারামজাদির সাহস দিনকে দিন বাড়ছেই। বেশি রাগ উঠে গেলে স্লাগ ম্লাগ মানব না, গাছের নিচে চলে যাব! ঈদ এলেই তার মিচকে শয়তানি উছলে উঠে। এবার তারও এসপার ওসপার করা দরকার।

কোনো এক ঈদে নূরীরা ছয় ভাই বোন নানাবাড়ি আসে বেড়াতে। বাবা চিটাগাং ওয়াপদা অফিসের ইঞ্জিনিয়ার। সেই আসাই শেষ আসা। তাদের বাবা নতুন বিয়ে করে পত্রপাঠ ডিভোর্স দিয়ে দেয় তাদের মাকে। বছর দিন নানাবাড়ি থেকে পাশের গ্রামে এসে ভিটা কিনে ছিমছাম একটি ঘর তুলেন তাদের মা। বাকি ভাই বোনেরা খুব অল্প বয়েসি হলেও নূরীর বড় বোন তখন এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। পালিয়ে যান কোনো এক বড় ঘরের ছেলের সাথে। সেই ছেলের পরিবার মধ্যরাতে আগুন দেয় নূরীদের ঘরে। আবার এক বস্ত্রে গাছতলাতে নূরীরা। এক সময়ের সচ্ছল বধু নূরীর মা আমাদের বাড়িতে কাজের বেটির পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠেন। নূরীরা যে যেভাবে পারে কাজের বিনিময়ে পেট পালতে থাকে। মা যদি কলসি ভরে আনেন নূরী দেবে উঠান ঝাঁট। মা যদি বোয়াল কুটেন নূরী ফট করে কাচকি মাছের পেট ফাটাবে। ফ্রি বলে কিছু নাই। তবে কোনো কটু কথাও নাই। অল্প হলেও তাদের অতীত সবার জানা। 

নূরীর মা ছিলেন তোলা রাশির জাতিকা। কোথাও কোনো সুর শুনলেই মহিলার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিত। মাঝে মাঝে আমাদের মা-চাচিদের মনে উদাস ভাব এলে, নতন মেহমান এলে, নূরীর মাকে কাজ থেকে অবসর দিতেন। অবসর না, তপ্ত বালু থেকে ফুটন্ত কড়াইতে ফেলতেন। টেপ রেকর্ডারে নাগিনীর বীনের বাঁশি কিংবা ধামাইল ছেড়ে দিতেন। নূরীর মা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ধীরে ধীরে জেগে উঠতেন ঘুমভাঙা নাগিনীর মত। তারপর সেকি গতি! সেকি নৃত্য! কখন শেষ হয়ে গেছে গান। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে বাড়ির মাথায়। নূরীর মায়ের হুশ নেই। ফর্সা চিকন শরীর থেকে শায়া আর ব্লাউজ ছাড়া খসে গেছে সুতির নরম শাড়িখানি! চোখবোজা, ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মায়ের দিকে চেয়ে করুণ সুরে কাঁদছে নূরী- 'আম্মা বাড়িত যাইমু, আম্মা আম্মা...'. শেষ মুহুর্তে চেতনা হারিয়ে ধপাস করে পড়ে যেতে যেতে কেউ একজন ঝাপটে ধরে নূরীর মাকে।

বাড়িতে মা-চাচিদের পালা শেষ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে নতুন বৌতে ভরে উঠছে বাড়ি। তারচেয়ে দ্রুত নবজাতকদের আবির্ভাব। সকল ভরসা নূরীর মা। সরিষা তেলের বাটি নিয়ে দরজায় খিল দিতেন, বেরিয়ে আসতেন ঘণ্টা দুই বাদে। এভাবে আট/নয় মাস। লেবার পেইন উঠলে রাত বিরাত নেই, নূরীর মা হাজির...

নূরীও জাগল হয়ে উঠছে। আমাদের বন্ধু হচ্ছে। লাজুক মুখচোরা মেয়েটি প্রিয়তর হয়ে উঠছে সবার। ভুলেই গেছে হাজার অপমানের একটি ঈদের দিন বেড়াতে না নিয়ে যাবার আমার অন্ধকার অধ্যায়!

চা বানিয়ে কাগজ কলম লয়ে বসি। ঈদের রান্নার লিস্ট বানানো দরকার। কী কী রান্না হবে কিসে কী উপাদান লাগবে। দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এর ভেতর লাইট অফ করে পর্দার ফাঁক দিয়ে নূরীকে দেখে নিয়েছি। ভিজে ভিজে নিউমুনিয়া বাঁধাবে নাকি! বরফ শীতল বৃষ্টি। ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করেছে হয়তো, মুখটা বেজার বেজার দেখলাম! 

সেমাইতে জাফরান দেব? জনে জনে কোলেস্টরল, ডাবল না সিঙ্গেল ক্রিম দেব? পাটিসাপটার পুর আরো ঘন করতে হবে। ঘি নয় পোলাওতে এবার শুধুই এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল...

দরজায় কেউ নক করছে। বাচ্চাদের পোশাক অর্ডার করেছিলাম, ডেলিভারি হয়তো। নাহ আমার ব্লাউজ নিয়ে আসছে টেইলার মহিলা। খুব সখ করে সাদা কালো ভারি একটি বেনারসি কিনেছি। বেনারসির চল নাই আজকাল, তবে খুঁজলে কি না মিলে! 

যদি বৃষ্টি না হয় ঈদের দিন, সোফার এক কোণায় শাড়িটি ভাঁজ করে রাখব।এটাই চলে আসছে পনেরো/ষোল বছর থেকে। যদি বৃষ্টি হয়! হোয়াটস আপের ডিসপ্লে পিকচারে। ঈদের দিন আমি কোথাও যাই না। এমন কি তার পরেও খুব একটা না। ঈদকে সেভাবেই সাজাই যেন সবাই আমার বাড়িতেই আসে। বিয়ের পর কেমন কেমন লাগে বলে অনুরোধে দু/একবার ঢেঁকি গিলেছি। কিন্তু এভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর। বছরের সবচেয়ে বাজে এবং বিরক্তিকর নিরস দিন হচ্ছে দুই ঈদের দিন।

লিস্টির কিছুই হয়নি। উঠে গিয়ে আরেক কাপ চা বানাই। ঘন ডানো দুধের চা পেলে আয়েস করে খেত নূরী। কেবল মনমত চা পেলেই সে হয়ত তার বাবার দেয়া অপমান ভুলে যেত ক্ষণিকের তরে! এখানে ডানো ফানোর চল নেই। চা বানিয়ে ব্যাক গার্ডেনের দরজা খুললাম। ঝম করে বেশ কিছু পানি ঢুকে গেলো ঘরে। 'নূরী ঘরে আয়...'. নূরী কই! হারামজাদির ভাব দ্যাখো।গাছপালার আড়ালে ঘাপটি মেরে গেছে। 'নূরী ঘরে আয়...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন