বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

বিপ্রদাশ বড়ুয়ার গল্প : ফিরে তাকাতেই দেখি


ছাত্রদের ফেব্রুয়ারির মিছিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোকটি ঘটনার জালে জড়িয়ে পড়ে। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছরের যুবক। ভাগ্যের হাতে...বরং বলা যায় সমাজের ক্ষমতাবানদের হাতে মার খেতে খেতে লোকাটি একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে। কারও কোনো ক্ষতি করার লোক নয় সে, বরং সে-ই আজ ক্ষতির শিকার। মার খেতে খেতে আধমরা।


রাস্তা থেকে একরকম ছুটতে ছুটতে সে একটা অফিসের চত্বরে গিয়ে নিশ্বাস নিতে থাকে। নিশ্বাসও আর ভালো করে নেওয়া হলো না। সেখানে কি আর দশজনের সঙ্গে মৃত ও আহতের স্তূপে গাদাগাদি পড়েছিল, নাকি আর কিছু অথবা সবই ঘোরের মধ্যে ঘটেছে তা আর সে মনে করতে পারে না। জ্ঞান ফিরে আসার পর একবার ভাবল। তারপর উঠে পড়িমরি দৌড় দেয়। মার খেয়ে অনেকক্ষণ সংজ্ঞাহীন বা ঘোরের মধ্যে মাটিতে পড়ে ছিল। তারপর কারা যেন টানাহ্যাঁচড়া করে নিয়ে রাখল আহত মানুষের গাদার ওপর। সে এক ভয়াবহ মার। মারটাও নাকি ছিল আইনমাফিক। হুঁশ হওয়ার পর তার সারা শরীরে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে যায়। তখন সে অন্য মানুষ।

তার নিচে পাঁচ-সাতজন, ওপরে তিনজন, এপাশে-ওপাশে তো আছেই। অনুমান করে দেখলে তিনটি স্তূপে সত্তর জনের কম নয়। নিচে যারা পড়েছিল তাদের মধ্যে দুজনের গা ঠান্ডা—সে বুঝে নিল ওরা মৃত। এও বুঝতে পারল পাশের কয়েকজন একটু নড়াচড়া করছে। কর্মকর্তা শ্রেণির টাইকোট পরা হেঁটে যাওয়া একজনকে সে চিনতে পারল, কিন্তু যেখানে সে পড়ে আছে সেখান থেকে ডাকা শোভন কি না ভেবে উঠতে পারল না। নাকি স্বপ্ন দেখছিল কে জানে!

লোকটি হঠাৎ কাঁপতে লাগল। বুঝল জ্বর আসছে। হুহু বানের মতো জ্বর এল। জ্বরের ঘোরে দেখল অনেক লোকজন এসে গেছে ততক্ষণে, অ্যাম্বুলেন্স এল ওঁয়া ওঁয়া কাঁদতে কাঁদতে। স্ট্রেচার নামল, চার-পাঁচজনকে তুলে কেঁদে কেঁদে আবার বেরিয়ে গেল। আর একটা এসে ঢুকল। রাস্তায় এদিকটায় গাড়ি-ঘোড়া নেই, একেবারে মৃতের শহর। দিন-দুপুরেই এ অবস্থা।

একজন বিদেশি সাংবাদিক কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিজের কথা টেপ করছিল। খাঁটি সাদা চামড়ার সাংবাদিক, কাঁধে টেলিলেন্সের একটি এবং আরেকটি মুভি ক্যামেরা। ছ’ফুটের বেশি লম্বা সে, ভয়-ডর নেই, নিশ্চিন্তে একা চারদিক হেঁটে হেঁটে বেড়াচ্ছে, ছবি তুলছে। আশপাশে ত্রিসীমায় কালো চামড়ার কোনো সাংবাদিক বা চিত্র-সাংবাদিক নেই। ওদিকে নাগকেশর গাছে ফুল ফুটে আছে, এটা তাদের মরশুম। দূরে একটিমাত্র বিলাতি শিরীষ গাছেও হালকা গোলাপি ফুল ফুটেছে। বিদেশি সাংবাদিক কী মনে করে ফুলের ছবিও তুলে নিল মুভি ক্যামেরায়।

চারদিকে লোকজন কথাবার্তা বলছে, অফিসের লোকজন ভয়ে ভয়ে সারবন্দি হয়ে দাঁড়াল বেরিয়ে যাবার জন্য। যাওয়ার সময় ওরা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল মানুষের স্তূপের দিকে—ঐ পর্যন্তই, সাহস করে কেউই কিছু বলতে পারল না। তাদের মধ্যে একজন লাল কাপড় দিয়ে মাথার রক্তক্ষরণ চেপে ধরে চলেছে, এক মহিলার নাকের ডগার জানালার কাচের টুকরো লেগে কেটে গেছে বলে রক্তের দাগ, এক মহিলা মুখে আঁচল চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আরেকজন লোক কোথা থেকে মহিলার শাল পেয়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটছে। নারী-পুরুষের একটা দীর্ঘ মৌন মিছিল বেরিয়ে যাচ্ছে অফিসের চত্বর থেকে, যেন যুদ্ধবন্দিরা এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে স্থানান্তরিত হচ্ছে কড়া প্রহরায়। রাজপথে নামতেই ওরা দেখল পিচঢালা রাস্তা ইটপাটকেলে ভরা, ডালপালা ও সবুজ পাতাও ঝরে পড়ে আছে আর পোড়া পোড়া দাগ, পানিতে ভেজা, ওদিকে তখনো একটা হোন্ডার টায়ার পুড়ছে। একটা গাড়িও।

কিছুদূর যেতেই দেশি সাংবাদিকরা ছুটে এল। একজন পাঞ্জাবি পরা ফরসা সিআইএর দালাল লেখক ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আধকুড়ি ছবি তুলে নিল। ক্ষতিগ্রস্ত জেনেভা ক্যাম্প থেকে যুদ্ধবন্দিদের সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যের ছবি তুলছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের দৃশ্যও অনেকটা এরকম ছিল। ভিয়েতনাম, অ্যাঙ্গোলা বা লেবাননের প্যালেস্টাইনি উদ্বাস্তুদের সঙ্গেও ছবিটা মেলানো যায়।

লোকটিকে যখন অফিসের ভেতর ধরে মারছিল তখন সে জোর করে হাত ছাড়িয়ে টেবিল ও আলমারি ফেলে দৌড় দিয়েছিল। আলমারির পেছন থেকে বঙ্গবন্ধুর একখানা আয়না বাঁধানো সরকারি ছবি বেরিয়ে পড়েছিল। ধুলোবালি মাখা কাগজে সুন্দর করে মোড়ানো। লোকটি কাগজ ছিঁড়ে ছবির কাঁচ আছড়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তার হাত-পা ও শরীর তখন দৈত্যের মতো নিশপিশ করছিল, অসুর-শক্তি তখন তার গায়ে। সেও অল্প সময়ের জন্য, শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতে হয়। লাঠিপেটায় একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে সে, শরীর একসময় যেন কর্কের মতো জলের ওপর ভেসে ওঠে। তারপর সে দেখতে পায় লোহার জাল-ঘেরা জানালা ও স্পষ্ট লাইটওয়ালা সারি সারি দাঙ্গাগাড়ি আসছে আর যাচ্ছে, অ্যাম্বুলেন্স এসে আবার আহতদের নিয়ে যাচ্ছে—সবকিছুই যেন পরিকল্পনামাফিক বা নাটকের মহড়া চলছে যেন, শহর জুড়ে অ্যাম্বুলেন্সের শুধু ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া।

এত কিছুর মধ্যেও বসন্তের হাওয়া বইছে। শীতও আছে। লোকটি অনুভব করল তার ঘাড় বেয়ে ঠাণ্ডা গলে গলে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। কাঁপছে সে। পুরো-হাত জামার ওপর হাতকাটা সোয়েটার, তাতেও ঠাণ্ডা কনকন করছে, যেন বরফ পড়ছে। বিকেল নেমে পড়েছে, রোদ হয়ে গেল আরও ঠাণ্ডা, খিদেয় তলপেটে চিনচিন ব্যথা শুরু হয়েছে, ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ, যেন অনেকদিন পর বাঁধ ভেঙে ঘুম নামছে চোখে, তবুও সে কোনোমতে হেঁটে চলেছে। পশ্চিম আকাশ শহরের ঘরবাড়ির ওপর নেমে নাইতে শুরু করেছে।

কোনোমতে পালিয়ে রাস্তায় নামল সে। রাস্তায় একটিও মানুষ দেখতে পেল না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল। সারা শহর অস্বাভাবিক থমথমে। ক্বচিৎ দু-একজন পথচারী হন হন ছুটছে। পা চলছে না তার, তবুও শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য লোকটি যথাসম্ভব জোরে জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যেতেই গুমটি ঘরের মতো চায়ের দোকান দেখতে পেল সে। ঠকঠক শব্দ করে দোকানদারকে ডেকে তুলতে চেষ্টা করল। অনেকক্ষণ পর সে দেখতে পেল দোকানের দরজায় তালা ঝুলছে। হতাশ হয়ে সেখান থেকে আবার হাঁটতে লাগল। ক্লান্ত শরীরে কিছুদূর পৌঁছে একটি রাজনৈতিক দলের অফিসের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ভালো করে দেখল দরজায় তালা মারা কিনা। কড়া নেড়ে নেড়ে লোক ডাকল। দরজা খুলে দাঁড়াল খদ্দরের পাঞ্জাবি-পাৎলুন পরা এক বর্ষীয়ান লোক। সে কিভাবে শুরু করবে ভাবতে ভাবতে বর্ষীয়ান নেতা জিগ্যেস করল, কে তুমি? তুমি কী গণতন্ত্রে বিশ্বাস করো?

কথা নেই, বার্তা নেই, হঠাৎ অমন প্রশ্ন শুনে লোকটি চমকে উঠল বিদ্যুৎ আবিষ্কারক গ্যালভানির সেই ব্যাঙটার মতো। তারপর একটু শক্ত হয়ে দাঁড়াল। অতশত ভাবার ফুরসত নেই তার। মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিল বুঝি, কোনোমতে এক পাশ বন্ধ কপাটে এক হাত ঠেকা দিয়ে সামলে নিল। তারপর ধরা গলায় বলল, আমাকে রাতের মতো একটু আশ্রয় দেবেন?

বর্ষীয়ান নেতা আবার বলল, তুমি কোন রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাস করো তা না জানা পর্যন্ত তোমাকে আশ্রয় দিতে পারি না। তা ছাড়া তুমি আহত, তুমি দাগি অপরাধী বা পলাতক আসামিও হতে পারো।

হাতড়ে মাছ ধরার মতো লোকটি বলল, আমি অকারণে মার খেয়েছি, আমার কোনো দোষ ছিল না। আমি পলাতক আসামিও নই, ডাকাত-গুন্ডাও নই, কারও পাকা ধানে মইও দিইনি।

তোমার বিশ্বাস?

লোকটি মুষড়ে পড়তে পড়তেও খমখম করে বলল, আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। এই লুটপাটের দেশে এছাড়া উদ্ধারের আর কোনো পথ নেই। সমাজতন্ত্রই দিতে পারে নিরাপত্তা...আমাকে আপাতত একটু আশ্রয় দিন।

না বাপু, এখানে কোনো সমাজতন্ত্রীর জায়গা নেই, আমি আমেরিকান গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। সামাজিক নিরাপত্তার চেয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার বড়।

লোকটির ইচ্ছে হলো রাজনৈতিক নেতার মুখে এক দলা থুতু ছিটোয়। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে আপন মনে বলল, নেই। জায়গা নেই। তোমার আমেরিকান গণতন্ত্রের নমুনা তো চোখের সামনে এইমাত্র দেখে এলাম। আমার গায়ে তার চিহ্ন আছে।

বর্ষীয়ান ধুরন্ধর নেতা কপট দুঃখবোধ দেখিয়ে বলল, তোমার এই অবস্থার জন্য আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। থাকতে দিতে না পারলেও একটা উপায় বাতলে দিতে পারি। এই সোজা কিছুদূর গেলে একটা লাল রঙের মসজিদ পাবে, সেখানে থাকার চেষ্টা করতে পারো। মসজিদের ইমাম খুব ভালো লোক। আমার কথা বলো।

লোকটি সত্যি সত্যি থুতু ছিটাল, তবে মাটিতে। টলতে টলতে রাস্তায় নামল, কিন্তু মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারল না। আহত মানুষের স্তূপ থেকে বেরিয়ে এ পর্যন্ত আসতে তার প্রাণ ঠোঁটে এসে ঠেকেছে, একটু খুললেই বেরিয়ে যাবে সেই অবস্থা, আর রাতের টহলদার পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দু-তিনবার সদর রাস্তা ফেলে গলিতে ঢুকে আত্মগোপন করেছে, আকাশের একমাত্র প্রহরী একটি তারার দিকে চেয়ে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করেছে, বাতাস থেকে জোরে জোরে শ্বাস টেনে মুক্তির নিশ্বাস ফেলতে চেয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় তার মনে হলো কে যেন ভারি পায়ে তার পিছু নিয়েছে। ডানে, বাঁয়ে ও শেষে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে—বঙ্গবন্ধু। ঊনসত্তর-সত্তর সালের গণ-আন্দোলন সময়ের যে-ছবিটি ফ্রেমে বাঁধা আছে অবিকল সেই চেহারা, তার থেকে বয়স একটুও বাড়েনি, মুখের কোথাও একটু বলিরেখা নেই, এমনকি গলার আওয়াজ পর্যন্ত এক রকম। একবার মনে হলো তোপখানার ছবি বাঁধানোর দোকানের দেয়াল যে ছবিটা টাঙানো আছে অবিকল সে-রকম। সেই মুখ সেই দীপ্তি, সেই ব্যক্তি। লোকটি আর একটুও ইতস্তত না করে বলল, তুমি কী করে বেরিয়ে এলে? তোমার তো এ সময় এখানে আসার কথা নয়?

বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি তো চিরকাল তোমাদের লোক। আন্দোলন করে দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলাই আমার কাজ।

লোকটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, আমি তো আন্দোলন করতে পথে নামিনি, আমি তো রাজনীতি করি না, ভাড়াটে লোকও নই।

খুব ভালো কথা। সবাই রাজনীতি করে না। তবে রাজনীতি না করলেও তোমার ভাগ্য রাজনীতি ও দেশের ভাগ্যের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। পালিয়ে এক চুলও যেতে পারবে না।

লোকটি মরিয়া হয়ে বলল, গত সাত বছর ধরে অনেক আন্দোলন হয়েছে রাজনীতির ধারাও পাল্টে গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোও ভাঙতে ভাঙতে বালির টুকরো হয়ে গেছে, এখন আর তোমার সময়ের রাজনীতি নেই, তাজউদ্দীনের মতো খাঁটি নেতাও নেই।

বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি জানি।

তোমার কবরের ওপর স্মৃতিসৌধও ওঠেনি। তোমার ছবিও সবার পেছনে রাখে, আবার শত্রুদের সাহসও নেই যে তোমার নাম উচ্চারণ করে তোমাকে কিছু বলে।

সব আমি জানি। বঙ্গভবনে ছবি আছে জানি, ঘৃণা ও ভালোবাসায় সবার মনের মধ্যে আছি, তাও জানি। তাজউদ্দীনের প্রতি অবিচার হয়েছে, তাও স্বীকার করি। অবিচার হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে।

কী করে জানতে তুমি? এইমাত্র তোমাকে সেই অফিসের আলমারির পেছনে রাখা ছবির ফ্রেম থেকে মুক্ত করে এনেছি। আমার যদি টাকা-পয়সা থাকত তবে তোমাকে জলোচ্ছ্বাসে ধোয়া উপকূলের চর এলাকা দেখিয়ে আনতাম। টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যেতাম খুব সাধারণ একটি কবর দেখাতে। টাকা থাকলে সেখানে মর্মর পাথর দিয়ে একটি স্মৃতিসৌধ গড়তাম।

গরিব দেশে ওসব বেমানান হতো।

লোকটি এবার মরিয়া হয়ে বলল, সবই যদি জানো ও বোঝো তাহলে আমার মতো চাল-চুলোহীনের সঙ্গ নিয়ে কী ফায়দা তোমার? আমার নিজেরই থাকার জায়গা জোটে না তো সঙ্গে চলছ কেন? কোথায় যাবে তুমি? কী উদ্দেশ্য? ক্ষমতাসীনরা তোমার স্মৃতি ধুয়ে-মুছে ফেলার চেষ্টায় আছে।

কোথায় যাব জানি না, তবে এখানে আর থাকব না।

রাসেলকে কোথায় রেখে এলে?

বঙ্গবন্ধু এবার নিরুত্তর।

লোকটি কী মনে করে আবার বলল, কিছু মনে করো না আমার সামর্থ্য থাকলে তোমাকে ঠিক সঙ্গে নিয়ে যেতাম। তবুও কোথায় যাবে বলো।

চট্টগ্রামে যাব। দেখি ওরা মনে রেখেছে কি না।

তাই যাও। আমিও দেখি বস্তিতে থাকার জায়গা মেলে কি না।

ওদেরই থাকার জায়গা নেই তো তোমাকে আশ্রয় দেবে কী? তা ছাড়া তোমার ক্ষত-বিক্ষত চেহারা দেখে তোমাকে সাংঘাতিক গোছের মানুষ মনে করতে পারে।

লোকটি বলল, না, তার মোটেই সেরকম নয়। আমি বরাবর ওদের কাছেই যা সাহায্য-সহানুভূতি পেয়েছি। তোমাকে ওরাই প্রকৃত ভালোবাসে। এখনো ওদের মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে।

তাহলে তাই করো। তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়–ক। আমি চললাম।

লোকটি কাঁপতে কাঁপতে টলতে টলতে গলি-ঘুঁজি পেরিয়ে তেজগাঁও রেললাইনের ধারে পৌঁছল। সেখানে চটের আড়াল তুলে, চাটাইয়ের ছাউনি খাটিয়ে লোকজন শুয়ে আছে। কারও কারও ঝুপড়িতে দরজা নেই, জানালা নেই। দরজাও যা সিংহদুয়ারও তাই, সারা গায়েই ঘুলঘুলি। কারও কারও বিছানোর কাঁথা নেই, খড় বিছিয়ে শুয়েছে অনেকে, কেউ শুয়েছে ছেঁড়া চাটাইয়ে। গরমের রাতের শিশিরে বস্তিতে শান্তি নামবে, সবাই ঘুমুবে। শীতে খড়বিচালি পেতে শোবে, গরমের দিন আসতে-না-আসতে সেগুলোই আবার চুলোয় চলে যাবে। ওদের চাহিদা খুব কম।

তাকে দেখে বস্তির লোকগুলো সহানুভূতি জানাল। নানা প্রশ্ন করল, ক্ষতগুলো ধরে ধরে দেখল। বস্তির এক সন্তান ও স্বামীহারা নারী নিজের আস্তানায় তাকে শুশ্রুষা করল। যত্ন করে রক্তের দাগগুলো মুছে দিল ভেজা তেনা দিয়ে, তারপর লোকটির শীত তাড়াতে যত্ন-আত্তি করল। লোকটি শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্যে নিজে পুলকিত হলো। মনে মনে আরও ভাবল, বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে আনলে একটা থাকার জায়গা করা যেত বৈকি। সবাই খুশিও হতো।

মেয়েটি আদর করে বলল, লক্ষ্মীসোনার মতো ঘুমাও তো। শরীরের অবস্থার কী হয়েছে একবার ভেবে দেখেছ?

লোকটি ওকে বলল, তুমি এখানে কী করে এলে? তোমার জায়গা এটা তো নয়?

তুমি ঠিক ধরেছ। আমি নদীর তাড়ায় ঘরবাড়ি হারিয়েছি, মহাজনের পাল্লায় পড়ে শহরে এসেছি কাজের আশায়। মিছিলে হারিয়েছি কিশোর ছেলে, অসুখে পড়ে স্বামীও তালাক দিয়ে ছেড়ে গেছে আমাকে। এখন আমি ইট ভাঙি, রাস্তার কাজ করি, ছাদ পেটানোর কাজে লাগি।

তোমার বড় কষ্ট, তাই না?

আমার একজন অভিভাবক চাই, তোমার মতো একজন ভালো মানুষের সঙ্গে থেকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই, আর ঠগের পাল্লায় পড়তে চাই না—এই বলে ওর মাথাটা বুকে টেনে নিল। লোকটিও জীবনে এই প্রথম স্বপ্নে স্বপ্নে ভেসে সুখের পাঁচ পা একটু দেখল—নারীর হৃদয় কী মনোরম কী রমণীয়। আরও ভাবল, আশ্চর্য, বেছে-বুছে তার সঙ্গেই কিনা দেশি ও বিদেশি চক্রের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কথা বলল বঙ্গবন্ধু! কিছু টাকা থাকলেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসে রেখে দিত। আহা, কোথায় গেল এতক্ষণে কে জানে! স্ত্রী-পুত্র সকলকে হারিয়ে কী কষ্টেই না আছে!

সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে সে মেয়েটিকে বলল, চলো আমরা শহর ছেড়ে চলে যাই। আমার গ্রামে এখনো ভিটেটুকু আছে বোধহয়। সেখানে কিছু একটা করে দিন কেটে যাবে। যাবে আমার সঙ্গে?

মেয়েটি উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আর কেন এখানে পড়ে থাকা তাহলে, চলো, এক্ষুনি চলো।

ওরা হাঁটতে হাঁটতে অবরুদ্ধ শহর পেরিয়ে সদরঘাটে পৌঁছল। সদরঘাট তখন কোলাহলে ভরা। লোকজন লঞ্চে উঠছে। ওরাও পটুয়াখালীর ইস্টিমার ঘাটে গিয়ে পৌঁছল। খুশিতে উপচে পড়ে ওরা ইস্টিমারের দিকে ছুটে গেল। প্রথমে মেয়েটি উঠল, তারপর সে যেই উঠতে যাবে, যেই রিলিঙে হাত দিল, অমনি ইস্টিমার দিল ছেড়ে। লাফিয়ে রেলিং ধরে উঠতে যাবে অমনি কোথা থেকে ইস্টিমারের প্রহরী এসে তাকে মারতে শুরু করল। রেলিং আঁকড়ে ধরা হাতে সে লাঠির বেদম মার খেতে লাগল। ছাড়, শালা ভাগ, বোঁচকায় কী আছে আগে দেখা, কী নিয়েছিস বল। নিশ্চয়ই ডাকাতের সর্দার, অস্ত্র আছে ওতে, ছাড় ছাড়...।

সে যতই উঠতে চায় ওরা তার হাতে ততই আঘাত করে। ইস্টিমারের লোকজন মজা পেয়ে হাসছে। আকাশে একটিমাত্র নক্ষত্র আকাশের অভিভাবক হয়ে জ্বলজ্বল করছে, চারদিকে সন্ধের অভিমানী আঁধার, দু’হাতের আঙুলগুলো থেঁতলে গেছে মার খেতে খেতে। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, আমাকে উঠতে দাও দয়া করে, আগে উঠতে দাও, নইলে এক্ষুনি পড়ে যাব।

ঘেউ ঘেউ করে উঠল রক্ষীদল, জাহান্নামে যা বেটা, হাত ছাড়। হাত ছাড় আগে।

ইস্টিমার থেকে মেয়েটি চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, দোহাই ওগো, ও আমার স্বামী, আমার ঘরের মানুষ, ওকে উঠতে দাও তোমরা, নইলে এক্ষুনি পড়ে যাবে।

কে কার কথা শোনে! মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে সারা হচ্ছে আর লোকটিও ফুলে-ফেটে যাওয়া আঙুলের দিকে তাকিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলছে, দোহাই তোমাদের, আগে আমাকে উঠতে দাও, নইলে এক্ষুনি পানিতে পড়ে যাব। আর সত্যিই তাই, একসময় সে দেখল ফেটে যাওয়া আঙুলগুলো আর তার রইল না, সে পাড়-ভাঙা মাটির মতো একসময় শব্দ করে বুড়িগঙ্গায় পড়ে গেল। ইস্টিমারের ইঞ্জিনের শব্দে ওর শব্দ থই পেল না।

আশ্চর্য! হুঁশ হওয়ার পর লোকটি একসময় আবিষ্কার করল, সে হাজতের মেঝেয় পড়ে আছে। সারা শরীরে মারের ব্যথা, রক্তের দাগ ও শীতের কাঁপুনি। রক্ত জমাট বেঁধে আছে, মাংসপেশির ব্যথা আরও শক্ত ও গভীর হয়ে বাসা বেঁধে আছে বর্ষার আকাশের থমথমে মেঘের মতো, জঙ্গি মিছিলের উদ্ধত মুঠোর মতো।

তারপর সে উঠে বসল এবং বলল, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি কোনো দোষ করিনি। আমাকে যেতে দাও।

কিন্তু তাকে ছাড়বে কেন? শেষে একজন প্রহরী বলল, কেন, দাঙ্গাহাঙ্গামা করার সময় খেয়াল ছিল না, জানিস না কী কারণে তোকে ধরে এনেছি?

আমার কোনো দোষ নেই, আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম মাত্র, আমি দোষ করিনি।

হাঁক দিয়ে বলল পাহারাদার, চুপ কর, নইলে মেরে তক্তা বানিয়ে দেব। সারা শহরে তুই নষ্টামি করে বেড়াচ্ছিস, ভাবছিস ধরা পড়বি না!

লোকটির মনে হলো, ঐ তেলতেলে হাত দু’খানি অন্য কোনো কাজের চেয়ে লোক ঠ্যাঙানোর জন্যই তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও মেঝে থেকে উঠে সে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল, চোখ দুটো রগড়ে নিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, আমাকে না ছাড়লে এই দেয়ালঘর-গরাদ চুরমার করে দেব। আমি তোদের কোনো আইন মানি না। সবকিছু ছারখার করে দেব।

কী বললি, এত সাহস? চুপ কর, নইলে মুখ ভোঁতা করে দেব।

লোকটি এবার গর্জে বলল, দেয়াল আমি ভাঙবই, কারাগার আমি ভাঙবই।


তারপর সে বিড়বিড় করে আপন মনে বলতে লাগল, এ সময় বঙ্গবন্ধু যদি সঙ্গে থাকত!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন