বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

মেঘ অদিতি'র গল্প : আতর ছড়ানো সে বিকেলের কথা

অগ্রহায়ণের কোনো এক বিকেলে বুনো ছাতিমের গন্ধের সাথে যখন মিশে যায় মিহি আতরের ঘ্রাণ তখন গ্রামের পথ ধরে সে হেঁটে চলে। অন্যমনস্কতায় বেশ বার পথের এখানে ওখানে দাঁড়িয়েও পড়ে সে যেন বা পথ ভুলে গেছে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে কিছু বা ম্রিয়মাণও বটে। সেই অবসরে তার যাবতীয় মালামাল  বহনকারী অল্পবয়সী কিশোরটি জিরিয়ে নেয় আর অবাক চোখে তাকে দেখে।
এই তো এখন, মৃদু আলোর শেষ বিকেলে সে যখন চোখ রেখেছে জাম গাছের উঁচু ডালটায় এবং একদৃষ্টে বেশ অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে, দেখলে মনে হয় তার মন কোথায় যে উড়ে চলেছে। কিশোরটি তার মাথা থেকে ভারি সুটকেসটি নামাবার চেষ্টায় বিফল হয়ে বোকার মত দাঁড়িয়ে তখন।  ডালে আটকে থাকা একটা একলা ঘুড়ি কি তাকে এখন আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে নাকি সে হারিয়ে গেছে টাইম স্পেসে জমা পড়ে থাকা তার অমল শৈশবে.. অথবা আসন্ন কোন সঙ্কেতবাহী এই আতরগন্ধা হাওয়া  তাই নিয়ে সে চিন্তিত..

তার বাম হাতে ধরা ক্যারি ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা টয় গান যেন অচেনা জায়গাটিকে  গানটিও চিনে নিতে চাইছে। আর তার অন্য হাতের বন্ধ মুঠো খুলে যাচ্ছে হাত থেকে বেরিয়ে আসছে ঝুপ ঝুপ  ভেঁপু, গুলতি,  নাটাই, মাটির ঘোড়া ! বেরিয়ে এসেই হাওয়ার সাথে মিতালি পাতিয়ে ওরা ভ্যানিশ। যদিও অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আচ্ছন্নতা চিরে  বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে তীক্ষ্ণ কান্নার রোল। সে জামগাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অবাক দৃষ্টি মেলে চারপাশটা দেখে নেবে তখন। দূর থেকে তার দিকে এগিয়ে আসা এক অবয়বের দিকে তাকিয়ে দেখবে কই একজন তো  নয় ধীরে ধীরে এক দুজন করে এগিয়ে আসছে অন্যরাও। তার হাতের খোলামুঠো তখন আবার হযতো বন্ধ হবে। যদিও ভেঁপু, গুলতিগুলো আর তার মুঠোয় ফেরত আসবে না। আদুল গা, ঝাঁকড়া চুলের দু চারটে শিশু, কোথা থেকে জুটে যাবে এক নেড়ি কুকুর। নেড়ির হা মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জিভ আর ঘনঘন নাড়তে থাকা লেজে ভর করে থাকা সঙ্কেত বুঝতে গিয়ে সে হয়তো তখনই বুঝতে পারবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে আতর লোবানসহ মিহি চা পাতার গন্ধ।  আর তারপর, হৈমন্তিক সেই বিকেলে শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং নেড়ি কুকুর, প্রতিটি মুখের ওপর সে বারবার তার উদভ্রান্ত দৃষ্টি ফেলবে।  

আজকাল ছেলেটা রাতে সহজে ঘুমাতে চায় না। চার বছর বয়স অথচ সারাদিন টইটই করার পরও ক্লান্তিহীন। ঘুম পাড়াতে গিয়ে পিঠের হালকা স্নেহের চাপট যে কখন রাগে তাই জোরালো হয়ে ওঠে।  থেকে থেকে প্রায়ই আনমনা আফরোজা। মনের মধ্যে কেবল কু ডাকে। পাশের ঘর থেকে শাশুড়ি জোবাইদা বানু নাতির নাম ধরে ডাকেন। সজলও বিছানা ছেড়ে তড়াক করে উঠে বসে। সারাদিন খাটাখাটির পর এত রাতে দাদী নাতির আহ্লাদে আফরোজার বিরক্ত লাগে। মুখে কিছু বলতে না পেরে সজলের গায়ে জোর চাপট  লাগিয়ে দিলে সজল মায়ের উষ্মা বুঝতে পেরে চোখ বুজে ফেলে। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে ও। আজ সজল ঘুমিয়ে গেছে তাড়াতাড়ি। আফরোজা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে তার পাশে বসে থেকে একটু আগে মশারির কোণগুলো লাগিয়ে মশারিতোষকের নিচে ভালো করে গুঁজে দিয়েছে। মাথার কাছের জানলাটা খোলা বন্ধ করতে হবে।  আজকাল সকালের দিকে হিম পড়ে। ছেলেটার ঠাণ্ডাভাব।  সাবধান থাকাই ভালো। কদিন ধরে আফরোজার শরীরও ভালো যাচ্ছে না। রাত হলেই কেমন জ্বর জ্বর আসে। জানলা বন্ধ করে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় ও। ঘষে ঘষে পণ্ডস ক্রিমে  মুখমণ্ডল সুরোভিত করে কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরে।  শাশুড়ি টিপ  একেবারেই পছন্দ করেন না। মুসলমান ঘরের বৌ, যে কপালে আল্লাহর কালাম লেখা সেখানে টিপ কেন পড়বে, এসব  গোনাহর কাজ বলেন তিনি। আফরোজা তাই রাতে সবার আড়ালে নিজেকে গুছিয়ে তুলতে তুলতে টিপ পরে নিজের জন্য আর আজগরের ফোনের কথা ভাবে।  শাশুড়ি মার ঘর থেকে আর কোনো ডাক আসে না।  মানে তিনি এবার ঘুমিয়েছেন। সে নিশ্চিন্ত হয়ে এদিককার আলো কমিয়ে ঘরের সাথে লাগোয়া ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকে সে আলো জ্বালে। এই ঘরটাতে আগে আজগর তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখতো। শাশুড়ি ডাঁই করে রাখতেন রাজ্যের বাসনকোসন।  আজগরকে বলে বলে একটা বড় একটা কাচের আলমারি বানিয়ে তাতে বাসনকোসন রাখার ব্যবস্থা করেছে আফরোজা। আর আজগর বিদেশ চলে যাবার পর ঘর সাফসুতরো করে চৌকি পেতে, একটা আলনা, ছোট একটা টেবিল বসিয়ে সেটা চলনসই গোছের শোবার ঘর বানিয়েছে। আর কিছুদিন যাক। আজগর পাকাপাকিভাবে ফিরে এলে  সে সজলকে এই ঘরটাই দেবে, আজ ছোট তো কি ছেলে তো দিন দিন বড়ই হবে। একটা আলাদা ঘর তার চাই, সেকথা ভেবেই সে গুছিয়েছে। তবে আপাতত এঘরটি  তার ভাবনাঘর। চৌকিতে একটা লাল ফুলছাপ চাদর, দুটো বালিশ। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ধীরেসুস্থে আফরোজা তার মোবাইল ফোন খোলে।
বাড়ির উঠোনে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ। সমবেত উচ্চারণে বাড়ির আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ছে সুরা ইয়াসিন। চোখে কি বাষ্প জমছে না কি আলো আরও কমে এলো সে বুঝতে পারে না। তার হাতে এখনও ধরা সেই ব্যাগ যেখান থেকে বিপুল বিস্ময়ে থেকে থেকে উঁকি দেয় সেই টয় গান। তার সাথে আসা মালামাল বহনকারী সেই কিশোরটি আপাতত উঠোনের এক কোণে জুবুথুবু দাঁড়িয়ে থাকে। তেষ্টায় তার ছাতি ফেটে যাচ্ছে। বাড়িভর্তি লোক অথচ সে সাহস করে কাউকেই বলতে পারে না এক গেলাস পানি দেবার কথা। মুহূর্তে জোবাইদা বানু তার নিজের ঘরে। জায়নামাজে বসে  কোরআন তেলওয়াতের ভেতর দিয়ে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় তিনি থেকেথেকেই কেঁপে ওঠেন। এসময়ই  সজলের বাপ এসেছে, মামা এসে গেছে, ভাইজান আইছে  এইসব ফিসফাস বাতাসে ছড়িয়ে দ্রুত অন্দরমহলে পৌঁছে যায়। তিনি রেহালে কোরআন শরীফ রেখে হাতের তসবীহটি নিয়ে উঠে দাঁড়ান। দাঁড়াতে গিয়ে শরীরটা কেমন টলে উঠলে পাশের আলনাটি ধরে তিনি সামলে নেন। ধীরে ধীরে   ঘরের দরজায় এসে দরজাটি ভর দিয়ে দাঁড়ান। উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দৃষ্টির তাকে যেন চেরাইকলের মত ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। তিনি  ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। অথচ উঠোনের সে মানুষও অচেনার দৃষ্টিতেই জোবাইদা বানুর দিকে তাকিয়ে। তিনি এগিয়ে আসতে চান সন্তানের কাছে। তিন চার কদম পা ফেলেন কি ফেলেন না, মুখ থুবড়ে পড়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। চারদিক আবার উচ্চকিত। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া  জোবাইদা বানুকে ঘিরে আবার এক নয়া উত্তেজনা। কে যেন বলে ওঠে, সবই তকদির রে ভাই। নইলে কী করে একই দিনে এতসব ঘটনা.. হাতপাখা, পানির ঝাপটা, হৈচৈ আর সমস্ত ফিসফিসানি তখন একটা ঝাপসা পথের রূপ নেয়। পায়ে পায়ে সে উঠোনের কোণে দুচোখে শঙ্কা মাখা তৃষ্ণাকাতর অচেনা সেই কিশোরটির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
ফিরোজা পাথরের নাকফুলে আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে ছবিতে। আগেরবার যখন আজগর এসেছিল তখন শীতকাল। উত্তরে হাওয়ার দাপট সেবার এত বেশি যে দুপুর পেরুলেই লোকজন আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে উষ্ণতা নিতে নিতে একে অপরের সংসারী কথাবার্তায় ঢুকে যেত। আর সন্ধেরাতেই রান্না খাওয়ার পাট চুকিয়ে  যে যার লেপ কম্বল আর ভারী কাঁথায় নিজেদের জড়িয়ে নিত। আফরোজা আজগরের হাতে গণা প্রতিটা রাত তখন উষ্ণতা জড়ানো। তেমনই এক রাতে ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে যখন একে অন্যের শ্বাসপতনের শব্দগুলো বুকের ভেতর জমা করছে তখন আজগর  তাকে বলেছিল, যখন আমি কাছে থাকি না তখন আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে তোমার? আফরোজা বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে নীরবে হ্যাঁ বলেছিল। তখনই বালিশের নিচ থেকে তার হাতে এই মোবাইল ফোন গুঁজে দেয় আজগর। তারপর থেকে প্রতিটি রাতে  হাতেকলমে শেখাতে থাকে ফোন ইন্টারনেটের ব্যবহার, ভাইবার বলে একটা কি আছে তাতে ওরা একে অন্যকে দেখতে পাবে কী করে সেসব। দিনের অন্য সময়ে যা কথোপকথন তাতে দৈনন্দিন আফরোজা, সজল বা জোবাইদা বানু সবার উপস্থিতি থাকলেও রাত গভীর হলে আজগর আফরোজাকে চায় আলাদা করে। আজ এই রাতে এখন আজগর আফরোজাকে কী একটা যেন  বলে যার উত্তরে আফরোজাকে ঘনঘন মাথা নাড়তে দেখা যায়। কিন্তু কতক্ষণ পারা যায়.. প্রেমিক পুরুষটির সমস্ত চাওয়াকে নির্মমভাবে অস্বীকার করতে। অতএব সে হার মানে।  সলজ্জ মুখে ফোনটাকে সে সামান্য উঁচু করে ধরে। তারপর বুক থেকে শাড়ির আঁচল সামান্য সরায়। ব্লাউজের দুটো হুক খুলতে খুলতে বলে, আর কয়দিন পরই তো দেশে আসতেছেন.. তাও আপনে এইরকম করেন। ক্যান করেন গো নির্লজ্জ মানুষ..তর সয় না?

এবছর ফসল ঘরে উঠেছে আশাতীত। প্রায় প্রতি বাড়িতেই এখন ধান কাটা, মাড়াই-বাছাই লেগে আছে। আজগরদের তিনপুরুষের বর্ধিষ্ণু এই পরিবারে এসবের জন্য জনা বিশেকলোক দিনরাত খাটে। তাদের দুবেলা খাবার দেন জোবাইদা বানু। রান্নাঘরের দায়িত্ব সম্প্রতি আফরোজা পেয়েছে। রান্নার কাজে তিনজন নিয়োজিত থাকলেও দেখাশোনার ভার  আপাতত আফরোজার। সাদাচোখে শাশুড়ি স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছেন বলে মনে হলেও আসল চাবিটি তারই কাছে। কাজেই ভুলচুক হবার উপায় যেমন নেই আবার তেমন হলে শাশুড়ির ঘরে ঠিক ডাক পড়ে তার আর তখন জবাবদিহি করতেও বাধ্য হয়।  ফলে তার ব্যস্ততা আগে চাইতে অনেকটাই বেশি। সজল খুব মা ঘেঁষা নয় বরং দাদীর সান্নিধ্যই বেশী চায়। আফরোজা সজলকে শাশুড়ির হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনেই রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়েছে।  আজগর প্রতিবছর একবার দেশে আসে। মাস খানিক ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে যায় কর্মক্ষেত্রে। এবার আজগর দেশে আসছে এই অগ্রহায়ণে। আর মাঝে একটা দিন। রান্নাঘরে কাজের চাপ ক্রমে তাই বাড়ছে। ঢেঁকি ছাটা চাল থেকে ঢেঁকিতেই চালের আটা তৈরি হচ্ছে। সেই আটা কুলোতে চালুনিতে খবরের কাগজ পেতে শুকোনো হচ্ছে। আজ হবে পাকন পিঠে। কাল নকশী পিঠে। আর পরশু আজগর বাড়িতে পা রাখলে গরম গরম চিতুই এর সাথে হাঁসের কষা মাংস। পুকুর ভরা শিঙ মাগুর সরপুঁটি ছাড়াও আছে আরও  কত মাছ। পরশু দুপুরের পর জাল ফেলে মাছ ধরা হবে। রাতে আজগর এলে অন্তত তিন পদের মাছ আফরোজা সামনে দেবে। এই দুদিন মোটে দম ফেলার সময় নেই তার। সজল দাদীর ন্যাওটা হওয়ায় এবার আফরোজা  নিশ্চিন্তমনে কাজগুলো গুছিয়ে নেবে ভাবে।
বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানেই কবর হবে। মাটি খোঁড়ার কাজ শেষ। দাফন হতে দেরি হলে মুর্দার কষ্ট হয়। অতএব তাকে তৈরি হতে হয় আসন্ন মাগরিবের আগেই। আত্মীয়দের কেউ তাকে সাবান তোয়ালে আর গোসলের পানি এগিয়ে দেয়। যন্ত্রচালিতের মত সে গোসল করে, ওযু করে। কারো ধোওয়া পাঞ্জাবি পাজামা তাকে এগিয়ে দিলে নির্বাক সে তা পরিধান করে। মাথায় কেউ টুপি পরিয়ে দেয়।  মসজিদ থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আজান, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ..আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসুল্লাল্লাহ্..

বাদ মাগরিব জানাজা,  নামাজীদের কাতারে সে দাঁড়িয়ে যায়।

সকাল থেকে আজ বাড়ি ভর্তি ছোট বড় নানা মানুষের আনাগোনা। হাঁড়িভর্তি পাকনপিঠা থেকে প্লেটে প্লেটে পিঠা আর জগভর্তি ডাবের পানি ট্রেতে করে আফরোজা জুবাইদা বানুর ঘরে দিয়ে আসে। জুবাইদা বানুর বোনপোরা  এসেছে আজগরের আগমন উপলক্ষে। এসেছে আজগরের বড় জ্যেঠার মেয়ে জামাই। আফরোজার ছোট দুই ভাই বোন এসে পড়লো বলে।  অন্যান্যবার আজগর আসার সময় আত্মীয়দের দু চারজন যারা ঢাকাবাসী তারাও আজগরের সাথে গ্রামে আসে। এবারটা আজগর একাই আসছে। আফরোজা বারবার বলেছিল তার ছোট ভাইটিকে ঢাকা পাঠাবে কি না। আজগর মত দেয়নি। বাড়িভর্তি মেহমান। আফরোজা রান্নাঘরে। সজলকে সকালের দিকে একবার সে কাছে পেয়েছিল। তারপর থেকে তার আর পাত্তা নেই। দাদী আর অন্যদের সাথেই হয়তো মেতে আছে। কিন্তু দুপুর যে গড়ায়, ছেলেটার কি আজ খিদেও পায় না.. আফরোজা সজলকে খোঁজে। ঘরে ঘরে।  শাশুড়ির কোলে। নেই। শাশুড়ি জায়নামাজে বসে জোহর শেষে নফল নামাজ পড়ছেন। কোথায় গেল? আগে তাও দুপুরে সজল ঘুমাত। কদিন আগেও সে ঠেসে ধরে তাকে ঘুম পাড়িয়েছে। এখন আর তার নাগাল পাওয়া ভার। উঠোনে নিমের ছায়ায় চেয়ার পেতে  আফরোজার নন্দাই আর খালাতো দ্যাওর বসে আড্ডা দিচ্ছে। সজল সেখানে নেই। ননদের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো সে পাশবালিশ জড়িয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। বাড়ির বাইরে বসে দুপুরে খাবার পর বিড়ি টানছিল  বসে যারা মাড়াইয়ের কাজ করে। তারাও বলতে পারলো না। তাহলে সজল? কোথায়?

জাল ফেলতে গিয়ে প্রথম চিৎকার ভেসে এলো আজগরদের উঠোনে বসে থাকা আত্মীয়দের কানে। সজলকে যখন তোলা হলো  তখন তার শরীর অনেকটাই ফুলে ঢোল। আফরোজা আসার আগেই সজলকে ঘাটলায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে
দাফন শেষে সে যখন বাড়ি ফিরে এলো  তখন সমস্ত পাঞ্জাবী জুড়ে গোড়ের মাটির আঁকিবুকি। তাকে ঘিরে আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী। স্তব্ধ রাতকে ফালাফালা করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন জুবাইদা বানু। তাকে ধরে ধরে উঠানে এনে তার পাশে বসিয়ে দেওয়া হলো। ঘাটলাতে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা আফরোজাকে তার ঘরে এনে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান পুরো ফেরেনি।  সামান্য সময়ের জন্য হয়তো জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে আবার চলে যাচ্ছে গভীর আচ্ছন্নতার মাঝে।  চিতুই গোলাতে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে বাড়ির মেনি বিড়াল। গোলা আপাতত লাউগাছের গোড়ায় কেউ ঢেলে দিয়েছে।  হাঁসের মাংস পুড়ে কয়লা কেন না সে সময় নানা সরোগোলের মাঝেও কেউ বলে উঠেছিল চুলোতে কি পুড়ছে? কেউ হয়তো দৌড়ে গিয়ে চুলোর আগুনে পানিও ঢেলে দিয়েছিল। বাড়িতে তিনদিন আর চুলো জ্বলবে না।  

গ্রামে ঢোকার পর থেকে সে একটিও কথা বলেনি। বাড়ি ঢোকার পর থেকে সে এক ঢোক পানিও পান করেনি। দাফন শেষে বাড়ির উঠানে সে  এসে বসেছে। কেউ তার সামনে একটা নিচু ছোট গোল টেবিল এনে রাখে। এক জগ সরবত, খান ছয়েক গ্লাস,  এক প্লেট বিস্কুট ট্রেতে করে কেউ রেখে যায়। হয়তো প্রতিবেশী কেউ। কেউ তার সামনে সরবতের গ্লাস ধরে। সে ভ্রূক্ষেপ করে না। উঠানের মৃদু আলোয় ভাবলেশহীন  তাকে কেউ ম্লান ক্লান্ত ভাবে। কেউ ভাবে সন্তান শোকে দুখী একটা মানুষ বোধহয় পাষাণ হয়ে গেছে। জুবাইদা বানু ভাঙ্গা গলায় কাতর অনুরোধ জানাতে থাকেন, বাবা এই সরবতটা অন্তত মুখে দে।

ম্রিয়মাণ  আলোয় সে তখন মার দিকে চোখ তুলে তাকায়। তারপর ঘুরে ঘুরে প্রতিটি মুখের ওপর দৃষ্টি রাখে এবং বাড়ি ফেরার পর প্রথমবার স্পষ্ট উচ্চারণে তিনবার বলে ওঠে-  তালাক, তালাক, তালাক।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন