শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

বুদ্ধদেব বসু-র সাক্ষাৎকার : আর্ট অফ ফিকশন


সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী :

আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ও লোথার লুৎসো


প্রশ্ন।। বুদ্ধদেব, প্রথমে আমাদের আলোচনার একটা পুরনো প্রসঙ্গ সামান্য ছুঁয়ে যেতে চাই, সে হলো আপনার উপন্যাসের গঠন-প্রসঙ্গ। মনে পড়ছে আগে একদিন এই প্রশ্নটি তুলেছিলাম যে, পরিকল্পিত রূপবিন্যাস এবং নির্মীয়মাণ গঠনবিকাশ এদের মধ্যে হয় তো নির্বাচনের একটা ব্যাপার আছে । এখন, এই মাপকাঠিতে আপনার উপন্যাসকে কোন্‌খানে রেখে আপনি দেখবেন ?

উত্তর ।। অন্তত নিজের কথা বলতে গেলে আমার মনে হয় যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ-দু’টোই অল্প-অল্প ক’রে রয়েছে। যখন আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি, পুরো বিষয় সম্পর্কে তখন আবছা একটা ধারণা মাথায় থাকে। কখনো এরই মধ্যে শেষটা ভেবে রাখি, কখনো বা নয় ।
এমন হ’তে পারে যে, মাত্র একটা বা দুটো চরিত্র আমায় টানছে, কিংবা হ’তে পারে আমার কোনো বন্ধুর জীবনের কোনো ঘটনা, অথবা আমার নিজের জীবনের--হ’তে পারে তা-ও, আর...কিন্তু শেষ অবধি চিন্তার প্রস্তুতি থাকে একটা, যদি "তা’ লেখা শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত-নির্দেশের আকারে না-ও হয় ; এবং এই লেখার পদ্ধতি--আমার ক্ষেত্রে গত ২৪-২৫ বছর-ভীষণ শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার, কখনো আট, দশ, বারোবার একটি মাত্র পৃষ্ঠা আমি লেখালেখি করি, আর এটা এগোতে থাকে এইভাবেই। উপরন্তু গদ্যের ছন্দোরক্ষা এবং নির্দিষ্ট একটা অন্তঃসঙ্গতি আগাগোড়া বজায় রাখতে বিশেষ যত্ন নেওয়া--এ আমার এক ধরনের বাতিক বলতে পারেন। এবং আমি নিশ্চিতভাবে মনে করি, শ্রেষ্ঠ বা অনতিশ্রেষ্ঠ প্রত্যেক লেখকের ক্ষেত্রেই উদ্ভাসমান স্বজ্ঞা কিংবা যেন একটা কিছু উঠে আসছে গভীর থেকে--এইরকম অনুভব ঘটে থাকে ; এমনকিছু জিনিস আছে যেগুলো আগে থাকতে ভেবে রাখা সম্ভব নয়। সেজন্য আমি মনে করি, আমার উপন্যাসের গঠন-পদ্ধতি সম্পর্কে সমগ্র বক্তব্য এটুকুই। আগাগোড়া এ বেড়ে ওঠেনা কোনো সামঞ্জস্য বজায় রেখে, যেমন আপনি বলেন, এবং আমি মনে করি একে খানিকটা অন্তত পূর্বপরিকল্পিত হতেই হবে। শেষ পর্বটা হ’লে সবচেয়ে কঠিন, এবং লেখা শুরুর আগেই তা যদি আপনি ভেবে নিয়ে না-থাকেন, তবে আরো বেশি কঠিন এটা, কোনো চুক্তিসম্মত লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগে অবধি এর জন্য অনেক অনুমান, অনেক প্রয়াসের দরকার পড়ে ।


প্রশ্ন ।। বুদ্ধদেব, আমার আর একটি পর্যবেক্ষণের কথা সেদিন উল্লেখ করেছিলাম--আপনার উপন্যাস একেবারে প্রথমবার পড়তে গিয়ে এ-কথাটা সচেতন বা অসচেতনভাবে আমায় ধাক্কা দিয়ে যায় যে, উপন্যাস লেখার সময়ে আপনি হয়তো সাঙ্গীতিক-গঠনের কিছুকিছু সূত্র দ্বারা পরিচালিত হন। আপনার উপন্যাসের বিভিন্ন পর্বাঙ্গের নানা শিরোনামায় ঋতু এবং দিনের বিভিন্ন সময়ের এমন একটি প্রয়োগ লক্ষ করেছি। অন্য কোনো এক প্রসঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীতের কতকগুলো সূত্র আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, অর্থাৎ বৈচিত্র্যের সূত্র : বিভিন্নরকম উপস্থাপনা, মুড এবং আবহাওয়ার একটি আবর্তন। এ জাতীয় পর্যবেক্ষণ আপনি কি গ্রহণ করবেন ?

উত্তর। হ্যা। এটা আমার খুব ভালো লাগছে যে, আপনি আমার ষ্টাইলের মধ্যে কিছু সাঙ্গীতিক-উপাদান খুঁজে পেয়েছেন, তবে সাঙ্গীতিক শব্দটি এখানে অবশ্যই ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত প্রসারিত অর্থে। আমি জানি, (লুৎসেকে... ) আপনি একজন সঙ্গীতজ্ঞ, শব্দটির প্রকরণগত-অর্থের দিক থেকেই, জানি--আপনি নিজে বাজান এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দু-দেশের সঙ্গীতেই অনুরাগ আপনার। সে-অর্থে আমি হচ্ছি দুনিয়ার ক্ষুদ্রতম সঙ্গীতবিদ, কিন্তু মনে হয় আপনার পর্যবেক্ষণটা আমি বুঝেছি। নিজের মতো করে, নিজের ভাষায় তর্জমা ক’রে বলতে গেলে বলবো, যেটা আপনি বলতে চাইছেন তা হ’লো, আমি যা আগেই জানিয়েছি, বাক্যগুলোর ভিতরে একটা সুনির্দিষ্ট ছন্দ বজায় রাখতে আমি চেষ্টা করি। অন্যভাবে বলতে গেলে মনে হয়, গদ্যরচনায় বৈচিত্র্যমুখর ছন্দ আনার জন্য তাতে আমি নিজস্ব বিনীতভঙ্গিমায় কবিতার উপাদান প্রবেশ করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের কয়েকটি মহলে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল বাক্য লেখার জন্য আমি অভিযুক্ত। তা’ আমি করি। তা’ করি সচেতনভাবে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে, কেননা আমি অনুভব করেছি, ছোট ছোট বাক্যের উপর নির্ভরশীল হ’য়ে চলাটা আমার মাতৃভাষার একটা অভাবের দিক। এবং মনে হয় এ-বিষয়টি নিয়ে আমরা আগে আলোচনা করেছি যে, যদি একজন সাবধান না হয়, তার গদ্য তবে হ’য়ে পড়ে ভোঁতা, ক্লান্তিকর, কারণ, আপনি জানেন, বাংলায় ক্রিয়াপদ সর্বদা বা প্রায়শই আসে বাক্যের শেষে। এখন, রবীন্দ্রনাথই আমাদের শেখালেন বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে, শেখালেন কী ক'রে বাক্যের সঙ্গে খেলতে হয়, তাকে উলটিয়ে নিতে হয়, লাঙ্গুলে মোচড় দিতে হয় তাকে--ইত্যাকার সব ব্যাপার। বলা উচিত, কবিতার পঙ্‌ক্তির মতোই বাক্যগুলোর সঙ্গেও খেলতে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি পাক দিয়ে বা পাক খুলে তাদের ছোট বা বড় ক’রে, ব্যাকরণের দিক থেকে সম্পর্কশূন্য বাক্যখণ্ড যুক্ত ক’রে নিয়ে খেলতে। এতে হয়তো পাঠক সামান্য নিঃশ্বাসের কষ্ট অনুভব করবেন, কিন্তু বিশ্বাস করি, গদ্যকে স্বনির্দিষ্ট একটি ঋজুতা অর্পণ করে এটি, যে-ঋজুতা কবিতা পেয়ে যায় ছন্দের আঁটোসাটো বাঁধন থেকে। সুতরাং এদিক থেকে দেখলে আপনার মন্তব্য আমি গ্রহণ করতে বাধ্য, কারণ সঙ্গীতে আমি নেহাৎই একজন অজ্ঞ ব্যক্তি, একমাত্র ভালোবাসা আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান--যাকে খুব কমই পারি পেরিয়ে যেতে ।


প্রশ্ন। আমি জানি না, এ ব্যাপারে আপনি একটু বেশি বিনীত হচ্ছেন কিনা, তা সে যাই হোক, ফলশ্রুতি নিশ্চিতভাবে দাঁড়ালো এক উঁচুদরের শৈল্পিক সমগ্রতা, আপনার উপন্যাসে যা আপনি অর্জন করেছেন, এবং এই পূর্ণায়তির মধ্যে, যে-চিঠিটি এক্ষুণি পড়লেন আপনি, তারও অবশ্যই একটা সুনিশ্চিত স্থান রয়েছে, কমবেশি আনুষ্ঠানিক সে-স্থান। এখন, আমি বেশ কল্পনা করতে পারি, আপনার কিছু পাঠক আপনার এ-চিঠিগুলোর ভাববস্তুকে ধ’রে নিলেন বাণী হিসাবে, রুশোর সেই প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তনের ধরনেই প্রায়। তা’, এ-জাতীয় ব্যাখ্যা কি আপনি অপছন্দ করবেন ?

উত্তর ।। ‘মৌলিনাথ’-এ আমি এমন একজন মানুষকে দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম যে সারাজীবন ধ’রে, অজস্র মূল্য দিয়ে, নিজেকে উৎসর্গ ক’রে, কঠোর চেষ্টা করেছে একজন পরিপূর্ণ শিল্পী হ’য়ে উঠতে। ফ্লবেয়ারের মতোই কোনো একজন, বলবো আমরা, যা...এ-আদর্শ মানুষের স্বভাবের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না ; এবং অন্যজাতের শিল্পীর ক্ষেত্রে, যেমন ধরা যাক, তলস্তয় বা দস্তয়েভস্কি, ভীষণ গভীরভাবে বেঁচে ছিলেন তাঁরা--যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে, জুয়ার মধ্যে দিয়ে, মাতলামি, ভালোবাসাবাসি, সবরকম জিনিসের মধ্যে দিয়ে, আর খেলাধুলো—এবং এইরকমভাবেই তাঁরা দুজনে কাটিয়ে গেছেন তাদের আগ্নেয়-জীবন। আর একটা ধরন আছে, যা মোটামুটি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিককার ধরন, নিজেকে যা বহির্জগত থেকে বিযুক্ত ক’রে ফেলে--খানিকটা উইলিয়ম বাটলার ইয়েটস্‌-এর সেই পরিশ্রুত বা "Refined in the Imager'-এর আইডিয়ার মতো--নিজেকে তৈরি করার অভিপ্রায়ে--শুধুমাত্র শিল্পের জন্য বেঁচে থাকতে। এখন, স্বভাবত এ-ব্যাপারটা যেকোনো মানুষের উপর একটা সাংঘাতিক চাপ সৃষ্টি করে, সে তিনি যতই গুণী হোন। এবং এই চিঠিটা দেখিয়েছে তার-এ ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবে রুশোর ধরনের, যেমন বলেন আপনি, যখন আপনার জন্য পড়ছিলাম, তখন আমাকেও আঘাত করেছিলো এটা। কিন্তু এ হ’লো একজনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, বা বলবো প্রতিক্ষেপ, যখন সে-মানুষ দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, বছরের পর বছর নিজেকে বন্দী ক’রে রেখেছে নিজের পড়াশোনায়, ফিরিয়ে দিয়েছে মেয়েটিকে--আসলে দুজন মেয়ে--যারা তীব্রভাবে তাকে ভালোবাসতো, পেয়েছিলো তার চেয়েও কমবয়সী এবং আরো বেশি পছন্দমতন স্বামী, তার বয়সের পক্ষে কমই উৎকেন্দ্রিক। তাই এ হলো- সে যাক, তাই যখন বলি এ হলো রুশোর মতো, তখন ঐতিহাসিক ভাবে আমরা ভুল নয়, কিন্তু সেই সঙ্গে এ-ও আমাদের যোগ করতে হবে যে, নিছক রুশো নয়, এ হলো প্রতিক্রিয়া, একজন মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যে-মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সারাজীবন চেষ্টা করেছে।


প্রশ্ন ॥ আপনার অনুমতি নিয়ে আর একটি জিনিস আমি জিজ্ঞেস করতে চাই । একজন অত্যন্ত-প্রভাবশালী জর্মন সমালোচক,--খুব বেশিদিন হ’লো মারা যাননি--নাম অ্যাডোরনো, অঙ্গীকারবদ্ধ শিল্পকর্ম এবং যাদের তিনি বলছেন অন্তর্বৃত শিল্পকর্ম--এ দুয়ের মধ্যে একটি পার্থক্যরেখা টেনেছেন, তাদের দাঁড় করিয়েছেন অঙ্গীকারবদ্ধ শিল্পের বিরুদ্ধে, দাবি করেছেন যে, শেষপর্যন্ত এই অন্তর্বৃত শিল্পকর্মই, অঙ্গীকার-আশ্রিত অ-সাহিত্যিক শিল্পকর্মের চেয়েও, আরো বেশি স্থায়ী, প্রভাবসঞ্চারী। যদি আপনি পুনর্বার এমন একটি মাপকাঠি কল্পনা করেন, এ দুটি বস্তু হচ্ছে যার দুই মেরু, নিজেকে কোথায় রেখে আপনি দেখবেন ?

উত্তর।। আমি মনে করি আমি হচ্ছি অন্তর্বৃত শিল্পীদের দলে, অন্ততপক্ষে প্রকরণগত দিক দিয়ে। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণ আমায় ভাবিয়েছে। অঙ্গীকারবদ্ধ বলতে আজকাল আমরা বুঝি—ফরাসীরা যাকে বলেছে engage-- অঙ্গীকারবদ্ধ ; কিন্তু এর একটা রাজনৈতিক ইঙ্গিতভঙ্কিমা আছে। কিন্তু মনে হয় এটা বিরোধিতা, অন্তর্বৃত...মনে হচ্ছে আপনার ব্যবহৃত বিশেষণটা আরো ভালো ছিল-- যেমন রুদ্ধ ও মুক্ত, অন্তর্বৃত ও প্রত্যক্ষ ; তলস্তয় বা দস্তয়েভস্কির নাম করবো আবার, পছন্দ করেন যদি, তাঁরা ভীষণরকম মুক্ত লেখক, কিন্তু জড়িত নন কোনো রাজনৈতিক ধর্মমতে। ‘যুদ্ধ ও শান্তি’র পুরোটাই রাজনীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি ঠিক জানিনা কোনটার প্রভাব বেশি স্থায়ী। হয়তো সমকালীন লেখায়, বিশেষত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে, যখন সারা পৃথিবী জুড়ে রাজনৈতিক এবং সমাজতান্ত্রিক কোলাহল আর হাঙ্গামা চলছে, অঙ্গীকারবদ্ধ বা মুক্ত লেখকেরা কোনো-না-কোনোভাবে হয়তো একটা সাংবাদিকতার রঙ এনে ফেলেছিলেন নিজেদের লেখায়--তাঁদের মৃত্যুর পর যা চিহ্নিত ক’রে দেয় তাঁদের সময়কে ; কিন্তু সংবৃত লেখকেরা সময়ের দ্বারা চিহ্নিত হন না, জেমস জয়েসের ইউলিসিসকে এখনো বেঁধে ফেলতে পারেনি সময়, তবে সেই সব লেখকদের কথাও ভাবতে পারি--যাদের তা পেরেছে। কিন্তু যদি আমরা সাহিত্যের সম্পূর্ণ চৌহদ্দিটিকে বিবেচনা করি, বিবেচনা করি বিশ্বসাহিত্যের সামগ্রিক ইতিহাসকে, তাহলে এটা অত্যন্ত-ভঙ্গুর একটা উক্তি হ’য়ে যায়, তাই নয় কি? কোন্‌ কবি হোমারের চেয়েও চেয়েও বেশি চিরায়ত ? মহাভারতের চেয়ে কোন বই বেশি চিরন্তন ? এবং এগুলো হলো অত্যন্ত বেশিরকমের মুক্ত-গ্রন্থ। তাই, আমি মনে করি, জর্মন সমালোচকের পর্যবেক্ষণটি একটা জায়গা পর্যন্ত ঠিক, বিশেষভাবে আমাদের সময়ে ; এবং আমার কাজের জন্য বারবার আমায় যে ‘গজদন্তমিনারবাসী কবি’ বলা হয়, তাতে আমি লজ্জিত নই। ‘গজদন্ত-মিনার" বলতে ঠিক কী বোঝায় আমি জানি না । জর্মন ভাষায় এরকম একটা শব্দ আছে না, অনেকটা ‘শিল্পকবিতা” গোছের, মানে যেটা হলো Kunst...?

প্রশ্ন।। Kunst poesie?

উত্তর।। হ্যাঁ,, Kunst poesie, এমন কিছু, যা সৃষ্ট, এমন কিছু যা “লোকায়তের’’ বিরোধী, তাই তো ?

প্রশ্ন॥ এমন কিছু, যা নির্মিত, দেখুন, জর্মন ‘Kunst'এর দুরকম মানে,- ‘শিল্পিত’, আবার ‘কৃত্রিম’-দুই-ই।

উত্তর। ঠিক, ঠিক্‌। তাই আমি মনে করি, সেই গোষ্ঠীরই আমি অন্তর্ভূক্ত, কবিতা ও গদ্য দু-দিক থেকেই।


প্রশ্ন ৷ বুদ্ধদেব, তাহলে স্বীকার ক’রে নেওয়া যাক যে, যে-কোনো শিল্পকর্ম, যে-কোনো লেখাই খানিকটা আত্মজীবনীমূলক ; তথাপি কেউ আবারও কিছুটা পার্থক্য টানতে পারেন--আত্মজীবনীমূলক লেখা এবং যাকে বলা যায় ‘বাস্তবায়িত শিল্প'--দুয়ের মধ্যে। এবং এ-প্রসঙ্গে আমি আপনাকে একজন ফরাসী ঔপন্যাসিকের একটি অত্যন্ত কৌতূহলজনক বক্তব্য দেখাতে চাই, ইনি প্রতিবেশী দেশ জর্মনীতে একটি উপন্যাস লিখে অত্যন্ত সাফল্য লাভ করেছেন-এই তো ক’দিন আগে, নাম : "Le roi-des-aulnes',যা গ্যোয়েটের 'Erlkoenig’ এর উল্লেখ । এখন, এই উপন্যাসের ব্যাপারে যখন তাকে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, তার নায়ক ‘Tiffauges'এর মধ্যে কতটা তিনি নিজেকে সনাক্ত করতে পেরেছেন। খুব কৌতূহলজনক একটি কথা তখন তিনি তুললেন ; বললেন : ‘আমি বিশ্বাস করি, একজন ঔপন্যাসিক’--তাৎক্ষণিক তর্জমা করছি—‘সেইসব চরিত্র সৃষ্টির জন্য নিজের কাছে ঋণী থাকেন, যেগুলো তার নিজের মতো নয়। সত্যিকারের একজন ঔপন্যাসিকের এই হলো সংজ্ঞা । আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্যিক সৃজনশীলতাকে এখান থেকেই যাত্রা শুরু করতে হবে।‘ তা, আপনি কি এঁর সঙ্গে একমত, অধিকন্তু এ-প্রসঙ্গে আপনার নিজের উপন্যাস ‘মৌলিনাথ'কে কীভাবে এনে আপনি দেখবেন ?

উত্তর ॥ আচ্ছা । তা এই ফরাসী ঔপন্যাসিক বলেন যে, লেখকের কর্তব্য সেই জাতের চরিত্র সৃষ্টি করা, যারা তার মতো নয় একেবারেই, তাই তো ?

প্রশ্ন। মোটামুটি তাই।

উত্তর। কিন্তু এখানে আমি তাঁর সঙ্গে পুরোপুরি একমত হ’তে পারছি না। প্রথমে আমাদের সকলেরই জানা কয়েকটি দৃষ্টান্ত গ্রহণ করা যাক। এই যেমন, তলস্তয় একজন খুব বড় জাতের বস্তুমুখী লেখক ছিলেন, নয় কি ? তিনি ছিলেন শান্ত, নিরাবেগ, হোমরীয় একটা ব্যাপার ছিলো তাঁর মধ্যে কিন্তু একই সঙ্গে, তাঁর জীবনবৃত্তান্ত জানা থাকার ফলে, অন্তত পক্ষে আমি অনুভব করি যে, ‘আনা কারেনিনা” লেখার সময়ে নিজেকে তিনি চিরে ফেলেছিলেন, বা নিজেরই কয়েকটা টুকরো--গোটা মানুষটা তা নয়। অবশ্যই-চিরে ফেলেছিলেন দুজন মানুষকে, একদিকে লেভিন--লেভিন রূপে তাঁর উৎকৃষ্টতর সত্তা, আর তলস্তয়ের যৌবনের অসংযমী দিনগুলো রূপ পেয়েছিলো ভ্রনস্কির মধ্যে। এখন, এ-প্রসঙ্গে, কিভাবে... বলছিলাম যে, তলস্তয় নিশ্চয়ই মানুষ হিসাবে লেভিন আর ভ্রনস্কির সামগ্রিকরূপের সঙ্গেও তুলনার-অতীত এক মহত্বের অধিকারী ছিলেন, কিন্তু কথাটা হচ্ছে, লেভিনের ভিতর রয়ে গিয়েছিলো পরিণত তলস্তয়ের উপাদান এবং ভ্রনস্কির ভিতর খুঁজে পাই আমরা যৌবনদীপ্ত তলস্তয়কে। একটি মানুষ, যে কখনো ঘোড়ায় চড়েনি, ঘোড়াকে ভালোবাসেনি কখনো, কেমন ক’রে সে পারলো অবিস্মরণীয় সেই ঘোড়দৌড়ের ছবি আঁকতে? জানেন তো, এ হলো, শেষ অবধি--এ হলো মানুষ ; এমনকি ফ্লবেয়ারও সফল হননি--সম্পূর্ণ বিবিক্তি, পরিচ্ছন্ন এবং ব্যক্তিগত স্পর্শ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হ’য়ে হাসপাতালের বিছানার মতো কোনো একটা ছবি আঁকতে। কখনোই আমি লিখতে পারিনা কোনো তাহিতি-রমণীর কথা, যাকে কোনোদিন দেখিনি। আমার যুরোপীয় ও আমেরিকান অনেক বন্ধু আছেন, কিন্তু তাঁদের একজনকেও কোনো উপন্যাসে নিয়ে আসতে আমি সাহস করবো না, কারণ আমি অনুভব করি যে, এঁদের সম্পর্কে জ্ঞান আমার সীমিত। আগেকার দিনের ব্রিটিশ ঔপন্যাসিকেরা, ভারতবর্ষ নিয়ে যাঁরা উপন্যাস লিখেছেন, এ-সম্পর্কে তাঁদের একটা বিরাট দুর্বলতা ছিলো, কেননা ভারতবর্ষ তাঁদের কাছে খানিকটা হলো বিদেশ, খানিকটা--"আপনি জানেন, ঐরকম সব ব্যাপার। লোকজন সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলে তাঁদের ভিতরে, তাদের চামড়ার ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। তবে অবশ্যই এক্ষেত্রে আমরা দু রকমের ধরন দেখি ; যেমন, গ্যোয়েটের শতকরা প্রায় ১০ ভাগই আত্মজীবনী,--গদ্য, কবিতা দু’ক্ষেত্রেই। শিল্পিত লেখকদের মধ্যে, ‘Kunst-poetry-দের মধ্যে সফল ছদ্মবেশ আছে একটা, যেমন ফ্লবেয়ারের। নিজের কথা বলতে গেলে...ঠিক সেই বিশুদ্ধ...আমার গোটা আমি, আমার প্রকৃত আমিটাকে একটা উপন্যাসের ভিতর বজায় রাখা একদম অসম্ভব ; সত্যি বলতে, নিজের প্রকৃত-আমিকে কি আমি জানি ? কিন্তু শুধু বাইরের ব্যাপারগুলো দিয়ে যদি আমরা মৌলিনাথকে ভাবি, একটা পৃষ্ঠা যার থেকে পড়লাম--এখন, আমি একজন বিবাহিত মানুষ, ছেলেমেয়ে আছে, গৃহস্থ, আমার একটা সুখী বিবাহিত জীবনও আছে--বাইরের দিক থেকে আমি তো একেবারেই মৌলিনাথের মতো নই ; নিজের শিল্পের জন্য ছেড়েছি কিছু, কিন্তু জীবনের মধুও তো পান করেছি অনেক। তবু, মৌলিনাথের ধারণাটা আমি বুঝি। তার জীবাণু রয়েছে আমার মধ্যে, আমিই হ'তে পারতাম সে। না-হলেও আমি মনে করি না যে, তাকে ডিঙিয়ে গিয়ে কোনোকিছু বিশ্বাসযোগ্য কাজ আমি করতে পারতাম। আর মনে করি, সেটাই হলো...জানিনা নান্দনিকের ভাষায় কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, কীটস যাকে বলেছেন 'negative-capability”। যেমন ধরুন, আমি লম্পট নই, কিন্তু নিজেকে পর্যবেক্ষণ ক'রে, বিশ্লেষণ করে এক-এক সময়ে মনে হয় যে, তা আমি হ’লেও হ’তে পারতাম। এটা কোনো-কোনো ক্ষেত্রে একটা বেছে নেওয়ার ব্যাপার, কোনো-কোনো ক্ষেত্রে… অর্থাৎ, প্রায়শই একটা বেছে নেওয়ার ব্যাপার। তাই একজন লম্পটকে আমি এঁকে তুলতে পারবো বলে মনে করি। কিন্তু যেহেতু আমি যুদ্ধ সম্বন্ধে কিছুই জানি না, কোনো যুদ্ধে লড়াই করিনি কখনো, সংবাদপত্র ছাড়া কোনো ধারণাই নেই আমার, কী করে যুদ্ধ করতে হয়--তাই যুদ্ধের দৃশ্য আঁকা অবশ্যই আমার পক্ষে একেবারে অসম্ভব । এবং এরকম ক্ষেত্র অনেক আছে। প্রসঙ্গত টোমাস মানকে ধরুন--আমরা আগের সন্ধ্যায় তাঁর কথা আলোচনা করছিলাম। তিনি একজন এত-বড়ো লেখক, কিন্তু সীমানা তাঁর তলস্তয়ের অর্ধেকও নয়। সেটা নিশ্চয়ই তাঁকে লেখক হিসাবে ছোট করেনা, শুধু পার্থক্যটা দেখিয়ে দেয়, দেখিয়ে দেয় যে, যে-কোনো লেখক, তিনি যতই গুণী হোন, নিজের পরিপার্শ্বের উপর তাঁকে নির্ভর করতে হবে; তাঁর পরিপার্শ্ব, তাঁর চারপাশ, যা তিনি জানেন, যা তিনি দেখেছেন, যা অনুভব করেছেন, যেসব মানুষকে ভালোবেসেছেন তিনি, বা করেছেন। ঘৃণা, এই সমস্ত কিছু।


প্রশ্ন। এ উপন্যাসে আপনার চমৎকার সূচনাদৃশ্য, শেষঅবধি একরকম কেন্দ্রিত-আলো যেখানে ফোকাস করছে পাঠমগ্ন যুবকটির উপর, মৌলিনাথ কবিতা পড়ছেন, সুইনবর্ন পড়ছেন তিনি, রবীন্দ্রনাথ নয়,--আচ্ছা, এটা কি একটা কাকতালীয় ঘটনা ?

উত্তর। এটি আমাদের ফেরৎ নিয়ে যাচ্ছে আত্মজীবনী প্রসঙ্গে। তখন, আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং সেকালে-১৯২৮ বা ২৯ হবে সেটা, অনেক অনেক বছর আগে, অন্তত ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এডোয়ার্ডীয় সূর্যাস্তের আমেজ লেগে ছিলো তখনো, সেসময়ে আমি, খুব অল্পদিনের জন্য, সুইনবর্ণের প্রতি নিবিড়ভাবে অনুরক্ত হ’য়ে পড়েছিলাম। বেশিদিন রইলো না এই ঘোর, খুব শিগগিরই উপলব্ধি করলাম, কত অগভীর তিনি। কিন্তু আপনি জানেন, কারোর ক্ষেত্রে প্রথম যৌবনের এইসব স্মৃতি কত মহার্ঘ, এবং আজ অবধি আমার মনে সুইনবর্ণের জন্য একটা দুর্বল কোণ বজায় আছে। রবীন্দ্রনাথের বদলে তাঁর সুইনবর্ণ আবৃত্তি করার আরও একটা কারণ ছিলো। এই পঙক্তিগুলো এক হিসাবে সুইনবর্ণের বিধর্মী আচরণের সাক্ষ্য, অন্ততপক্ষে একজন অল্পবয়সী বাঙালী কবি হিসাবে আমি, বলতে পারেন, সবে যে কবিতা লিখতে এবং প্রকাশ করতে শুরু করেছে--লিখতে নয়, শুরু করছে প্রকাশ করতে--আমার কাছে এই পঙক্তিগুলো ছিলো রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মতো। জানিনা, আপনিও অনুভব করেন। কিনা, একটা বিশেষ... অনেকরকম ব্যতিক্রম সত্বেও শেষ অবধি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটা স্পর্শ আছে--অবশ্যই তিনি আমাদের কাছে সবকিছু, আমাদের সর্বেসর্বা, তাঁকে ছাড়া আমরা কিছুই নই ; সেটাও একটা প্রশ্ন। এখন, এই প্রশ্নগুলো "Tho laurel, the palms and the paean, the breasts of the nymphs in the brake'--বেদনার তীব্র-দংশন বর্জিত এই প্রাচীন গ্রেকোরোমান পৃথিবী, অন্তত সুইনবর্ণ যেমন দেখিয়েছেন, অথবা চৈতন্য বা নৈতিকতার তীব্র বেদনা--এখন এটা, আপনি বুঝতে পেরেছেন যেটা, যথেষ্ট ছোট ছিলাম আমি, কিন্তু পিছনে তাকালে, মানে...মানে আর কি সাহিত্যের ইতিহাস, এর একটা বিরাট আবেদন ছিলো আমার কাছে, এবং সুইনবর্ণকে আমি এই যুক্তিতেই রেখেছি। খানিকটা আত্মজীবনী, এবং কিছুটা আবার ইন্দ্রিয়মুখরতা, বা এমনকি কামুকতাও, যা সেসব দিনে--সেই ১৯২০-এর শেষদিকে ভ্রুকুটি অর্জন করেছিলো বাংলা লেখার জগতে, আর 'মৌলিনাথ' লেখার সেটাই হচ্ছে সময়; অশ্লীল লেখক হিসাবে ভীষণভাবে আমরা নিন্দিত হলাম, এবং আমি এখনো নিন্দিত ।


প্রশ্ন। যদি বাংলাদেশে এমন কোনো কবি এবং লেখক থেকে থাকেন, যার প্রতি আমি 'poeta-doctus' নামটা ব্যবহার করতে পারি, সে হ’লেন আপনি ।

এটা ঠিক প্রশংসা নয়, কারণ আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনার ভেতরের প্রাজ্ঞ ব্যক্তি এবং শিল্পীটির মধ্যে কোনোরকম সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা হয়েছে কিনা, অথবা এ-দু’টি আপনার এ-দুই অংশ সবসময়ে একজাতের সামঞ্জস্যের ভিতর থাকে, এই মুহূর্তে যেরকম দেখছি ?

উত্তর। শব্দের নিজস্ব অর্থ, অ্যাকাডেমিক অর্থ অনুযায়ী আমি একজন পণ্ডিত ব্যক্তি কিনা, আদৌ তা জানিনা, কিন্তু বুঝি যে সেটার--অর্থাৎ, পাণ্ডিত্যের-একটা মেজাজ আমার মধ্যে আছে। এটা বেড়ে উঠেছে পরবর্তী কালে। যতদিন তরুণ ছিলাম, বা ছিলাম তারুণ্যময়, এ ব্যাপারটা একদম ছিলো না আমার, অর্থাৎ, যতদিন-না বয়স পৌঁছলো চল্লিশে ; কিন্তু এটা এসেছে বোদলেয়র আর রিলকের অনুবাদ করতে করতে। আমার পক্ষে এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিলো। আমাকে টীকা লিখতে হতো, লিখতে হতো বাঙালী পাঠকদের জন্য ; পরোক্ষ উল্লেখ ছিলো অজস্র--গ্রীক, রোমান, ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে নেওয়া--যেগুলো মূল পাঠে রাখতাম আর টীকায় যাদের ব্যাখ্যা ক’রে দিতে হতো। তাই, এটা—এবং আমি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ও অনুবাদ করেছি, একজন পণ্ডিত হিসাবে আমার প্রতিষ্ঠার সেই হলো সূচনা ; সে সময়ে আমায় প্রচুর পড়তে হতো, দেখতে হতো অভিধান, এ এমন একটি জিনিস যা আগে কখনো করিনি ; এবং ক’রে আনন্দ পেতাম। ঘটনাচক্রে সে সময়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি পড়াচ্ছিলাম, একটি আর একটিকে সাহায্য করেছে ; আমার উদ্দীপনার একটা অংশ আসতো তুলনামূলক সাহিত্যবিভাগের পাঠক্রম উদ্ভাবনের চেষ্টা, টেক্সট্-বই অনুসন্ধান এবং মূলত, ক্লাসঘর থেকে। সৌভাগ্যবশত সেকালে আমার ভালো ছাত্রও ছিলো অল্প কয়েকজন, খুব আকর্ষণীয় ও উদ্দীপক অভিজ্ঞতা এটা । তাই, সেটাই ছিলো কিভাবে,...তা এখন, মহাভারত নিয়ে যে বইটা লিখছি, তার কথা আপনাকে আমি বলেছি ; ঠিক এরকম কাজ আগে কোনোদিনও করিনি। পাদটীকা আমি ঘৃণা করি-- সারাজীবন ঘৃণা করেছি। পাদটীকাকে, কিন্তু এ-গ্রন্থে তা রাখতে হয়েছে অজস্র পরিমাণে, ঠিক নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নয়, বরং যে নতুন ক্ষেত্রে প্রবেশ করছি, আপেক্ষিকভাবে তা’ আমার কাছে নতুন--সেজন্য। প্রতি পদক্ষেপে আমি চাইতাম নিশ্চিত হ’তে যে, অন্তত তথ্যের দিক দিয়ে যেন ভুল না করি, আর চাইতাম পাঠকদের, চাইতাম--তাঁরা যেন পরখ ক’রে নেন আমার তথ্যগুলো সঠিক কিনা। তাই, যদি ভুলচুক করতাম কখনো, তাঁরা আমাকে তা জানাতে পারতেন। এবং এই ব্যাপারটাই আমায় নিয়ে গেছে নানা ক্ষেত্রে, শুধু মহাকাব্য নয়, পুরাণ নয়, সর্বত্র, যেহেতু সামগ্রিকভাবে এ এক নতুন ভুবন আমার কাছে—ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে, মানে—হয়তো তার গভীরতা, গহনতম গভীরতা নয়, কিন্তু সেইসঙ্গে পেয়েছি মনের মতো ও উদ্দীপক এইসব-কিছু, এটা আমাকে বাঁচতে সাহায্য করেছে।


প্রশ্ন। শেষ জটিল প্রশ্নটি, একজন পাঠকের দৃষ্টি থেকে, আপনার ভাষাপ্রয়োগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে করছি। এই পাঠকের কথা আপনি আগে বলেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, তার মনের উপর একধরণের চাপ দিতে আপনি দ্বিধাবোধ করেন না। নিজের উপন্যাসের জন্য যে-পাঠককে মনের ভিতর দেখেছেন, বোধহয় তার কথাই বলতে চেয়েছিলেন আপনি ?

উত্তর।। নিশ্চয়ই। সাধারণভাবে বলতে গেলে, নিওলিট পাঠককুলকে আমি মনশ্চক্ষুতে দেখিনা--আপনি জানেন শব্দটা, ইদানীং ভারতবর্ষে, খুব-চালু --বাংলায় এখন অনেক উপন্যাস রয়েছে যেগুলি সোজাসুজি নব্যশিক্ষিতদের জন্যই লেখা, সংক্ষিপ্ত শব্দভাণ্ডার এবং ছোটো-ছোটো বাক্য--ইত্যাদি নিয়ে। আমার আপত্তি নেই কোনো । কিন্তু এখন আপনাকে একটা কৌতুহলপ্রদ ব্যাপার বলবো। একজন পাঠক, যিনি কোনো-এক অদ্ভুত কারণে আমার লেখার প্রতি তীব্রভাবে অনুরক্ত, কখনো তিনি স্কুলের অন্দরমহল দেখেননি, মেদিনীপুর জেলার জনৈক কৃষক তিনি, চাষ করেন নিজে, করেন এখনো ; ছোটবেলায় নিজের প্রচেষ্টাতেই লেখাপড়া শিখেছিলেন। তিনি কবিতা লেখেন, নামটা জানা থাকতে পারে : বিনোদ বেরা। এখন এ ব্যাপারটা শুধু লেখক হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা নয়, পুরো লেখা জিনিসটার উপরই একটি নতুন আলো নিক্ষেপ করছে। আমরা নাগরজনেরা প্রায়ই, যারা স্কুলটুলে পড়েনি, নিচু ক’রে দেখি দেখি তাদের, তারা তা-নয়.. কিন্তু শুধু ভারতবর্ষের জনতা সম্বন্ধেই এটা আমি সবসময়ে অনুভব করি। যখন বিদেশে ছিলাম, প্রায়ই শুনতাম, আমরা একটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন অশিক্ষিতের দেশ। তো, আমার জবাব ছিলো, নিরক্ষরের দেশ ঠিক, কিন্তু অশিক্ষিতের নয়। মুখে-মুখে এবং আরো অনেক...সেখানে, আমি মনে করি সংস্কৃতির স্তর এখানে কিঞ্চিৎ উঁচু। সে যাই হোক, আমার লক্ষ্য সবসময়ে হলো, আদর্শ পাঠক, শ্রেষ্ঠ পাঠক। আর পাঠক হিসাবে আমার অভিজ্ঞতাসমূহ--পুরো রবীন্দ্রনাথ আমি পড়েছি, অর্থাৎ, সেসময়ে যতটা তিনি প্রকাশ করেছিলেন, তখন আমি খুব অল্পবয়স্ক ছিলাম, ছোট একটি বালকমাত্র--অবশ্যই বুঝিনি সবকিছু, কিন্তু সেই পরম আনন্দের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্মৃতি আমার মনে আছে, পরম-আনন্দ যা তিনি শব্দের বিশিষ্ট প্রয়োগের মাধ্যমে দিয়েছিলেন আমায়, অনেক শব্দ--যাদের আগে দেখিনি, আভিধান ছাড়াই সেসবের অর্থ আমি অনুভব করতে পারতাম ; বিষয়বস্তুর থেকে সোজা ছিলো এটা । এমনকি ইংরেজীর ক্ষেত্রেও কখনো-কখনো এমন হতো। তো আমি... যদিও এটা ছিলো একটা বিদেশী ভাষা, কিন্তু খুব ছোটবেলায় আমি এটি শিখেছিলাম, আর জানেন, অর্থ টর্থও অনুমান করতে পারতাম বেশ। তাই আমি বলবো না, বলা সম্ভবও নয় যে দুরূহ স্টাইল পাঠকের পক্ষে একটা বাঁধা ; অবশ্যই তা আপনার জনতার সংখ্যাকে কমিয়ে দেবে, ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা খারাপ, কিন্তু আমি নিজে বোধ করেছি যে, যন্ত্রণা পাওয়ারও একটা আনন্দ আছে। টেমাস মান সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার কথা আপনাকে বলবো। দুর্ঘটনাবশত ছোটবেলায় আমি তাঁকে খেয়াল করিনি--মানে বলতে চাই, যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে--যদিও তার ‘যাদু-পর্বত’ বহু আলোচিত ছিলো সেসময়েই। আমার একজন কবি-বন্ধু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নামটা আপনার জানা থাকতে পারে, একজন অপূর্ব কবি ও গদ্যলেখক। এক সন্ধ্যায় তিনি আমাকে বললেন, ‘কী, আপনি টোমাস মান পড়েন নি । নিশ্চয়ই পড়বেন, তাঁর মনটা জানা আপনার ভীষণ দরকার।’ এবং তিনি আমায় তার ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর কপিটা ধার দিলেন, তখন সদ্যসদ্য যেটা বেরিয়েছে। যদিও তখন আর আমি তরুণ নাই। -- চল্লিশের কাছাকাছি বা চল্লিশ পেরিয়ে গেছি—তবু অধ্যায়ের পর অধ্যায় জড়ে সেই উপন্যাস পড়তে গিয়ে কষ্ট হলো খুব ; কিন্তু যতই তা করলাম, যতই তাঁর বাক্যগুলোর সঙ্গে, তাঁর চিন্তার জটিলতাসমূহের সঙ্গে লড়াই করলাম; ধীরে ধীরে যতই উপলব্ধি করলাম তাঁর অপরূপ মাস্টার প্লান, তাঁর সজ্জা ...একটি প্রতিজ্ঞাপত্রের উল্লেখ করেন তিনি, সম্ভবত দশম অধ্যায়ে, তাতে আমরা ফিরে আসি ৫১তম অধ্যায়ে--এইরকম সব জিনিস, আমায় মুগ্ধ করেছিলো এটি। এবং আমি জানি, এর থেকে ও আগে আরো নানা কিছু থেকে...আর-একটি প্রাচীর হচ্ছেন মার্সেল প্রুস্ত, যৌবনে তাঁকে আমি চেষ্টা করেছিলাম, বহুবার, ব্যর্থ হয়েছি ; কিন্তু, জানেন, মাত্র পাঁচ বছর আগে ইংরেজীতে তার বারো-ভাল্যুম পড়লাম সানন্দে, সোল্লাসে। তাই মনে হয়, এটা একটা খারাপ চিন্তা নয় যে, সর্বশ্রেষ্ঠের জন্য আপনি লিখুন এবং অপেক্ষা করুন, যতদিন না আপনার পাঠক--ক বা খ যথেষ্ট পরিণত হয়। এটা কোনো বিবৃতি নয়...আশা করি কোনো অহংকারের গন্ধ নেই এতে, কিন্তু সবটুকু বলবো যে, দীর্ঘ ও জটিল বাক্য, নতুন শব্দ ইত্যাদি সম্বন্ধে, কথকতার চালের সঙ্গে সংস্কৃতের চাল মেশানো সম্বন্ধে, আমার কোনোরকম দ্বিধা নেই। আমি মনে করি, যদি আমার একশ'-জন পাঠকও থাকে, কিছুকালের জন্য সেটা করা যায়।


প্রশ্ন।। বুদ্ধদেব, আজ এবং আগের দিন এ-প্রসঙ্গ আমরা বেশ কয়েকবার ছুঁয়ে গিয়েছি, তবু, ‘মৌলিনাথের স্বপ্ন’ কবিতাটির সঙ্গে অন্বয়সূত্রে, আপনার সাহিত্য-কৃতিতে গদ্য ও কবিতার সম্পর্ক-প্রসঙ্গে আমার জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন । উপন্যাসটি শেষ করার পর--মনে হয় ১৯৫২'এ প্রথম সংস্করণ--আপনি ১৯৬৫ সালে পুনর্বার বসেন--এবং এর একটি গদ্যাংশকে রূপ দেন কবিতার।

উত্তর ।। মনে হচ্ছে, আমার স্টাইলের সাঙ্গীতিকতার বিষয়ে আপনার প্রশ্নের উত্তরেই এ বিষয়টা আমরা ছুঁয়ে গিয়েছিলাম। তবু, আবার বলছি, আমার গদ্যের মধ্যে একটা ছন্দ বজায় রাখতে সবসময়ে আমি চেষ্টা করি, চেষ্টা করি সে ছন্দ দুলিয়ে নিতে, যদি তেমন করে বলা যায়, দুলিয়ে নিতে--চিন্তার প্রবাহ অনুসারে । তা, যখন গ্রন্থে ঐ-অংশটুকু লিখেছিলাম ‘মৌলিনাথ'-এ, তখন খুব সচেতন ছিলাম তার কাব্য সম্ভাবনা সম্পর্কে ; এমনকি গদ্যের মধ্যেও ছিলো লুকনো, গোপন, ধ্বনিসাম্য ও অর্ধমিত্রাক্ষর, দুটি বিপ্রতীপ ধ্বনির মধ্যে মৌখিকভারসাম্য-এইসব। কবিতাটি আমি লিখেছিলাম, কিছুটা হয়তো মজার জন্য, বাকিটা--এটা হয়তো একটি আত্মসচেতনতার লক্ষণ--কবিতা ও গদ্যের ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনাকে স্পষ্ট প্রমাণ করতে। কবিতাটির কাব্যত্ব নিয়ে আমার কোনো দাবি নেই, কিন্তু অন্তত আপনার মতো একজন বিদগ্ধ কবির কাছে গদ্যাংশ এবং কবিতার তুলনার ব্যাপারটা এবং তাদের পার্থক্য আকর্ষণীয় ব’লে মনে হ’তে পারে। যে-পার্থক্য আনিবার্যভাবে প্রবেশ করেছে কাব্য সংস্করণে ।

প্রশ্ন। শেষ প্রসঙ্গ, আগের দিন আমি আনন্দ পেয়েছিলাম খুব, যখন এখানে, কলকাতার এই অংশে “Hugo Won Hofmansthall'এর আর একজন ভক্তকে দেখতে পেলাম। ইনি এমন একজন, যিনি

Letter of Lord Chandos পড়েছেন--যা, আপনি জানেন, আমার দেশে একটা সাহিত্যিক ইতিহাস তৈরি করেছিলো। ভাবতে অবাক লাগে, কবি ও লেখক হিসাবে কখনো আপনি এই Chandos-সমস্যার মুখোমুখি এসেছেন, অর্থাৎ ভাষা-ব্যর্থ হওয়ার আচম্‌কা উপলব্ধি ; কিভাবে তাতে প্রতিক্রিয়া হবে আপনার। আর এর থেকে যদি এক ধাপ পিছিয়ে যেতে পারি, আপনার প্রদেশে থাকবার সময়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, এমন এক সংস্কৃতির আমি মুখোমুখি হচ্ছি যা লেখককে একটা নির্দিষ্ট মর্যাদা দেওয়া সত্ত্বেও প্রবলভাবে মৌখিক; এখন, লেখক জীবনের কোনো বিশেষ মূহুর্তে কি আপনি প্রশ্ন করেছেন নিজের পেশাকে, ভেবেছেন পেশা বর্জনের কথা-মানে, আগে যাকে বলছিলাম Chandos-সমস্যা, সেই সূত্রে ?

উত্তর । আমি মনে করি, প্রতিটি কবি বা লেখক তার সাহিত্যজীবনের কোনো-না-কোনো পর্বে--যদি তিনি মোটামুটি দীর্ঘায়ূ হন, যদি অল্পবয়সে তাঁর মৃত্যু না হয় --তবে Lord Chandos’এর সমস্যা অনুভব করবেন মনের গহনে । কিন্তু শেষ দিকে ঐ ভাষা, ঐ বাংলাভাষা--যাকে নিয়ে বসবাস করছি আমি গত পঞ্চাশ বছর বা আরও বেশি--আমাকে ভীষণ-কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে তার সঙ্গে । কখনো-কখনো বাংলাকে দোষ দিই তার অপর্যাপ্ততার জন্য, কিন্তু পরমুহুর্তেই নিজেকে বলি, যা এতাবৎ ভাষায় নেই, তা তাকে দেওয়া--এ তো তোমারই কাজ। আসলে মনুষ্যভাষা তার চূড়ান্ত-পর্যায়ে এবং উচ্চতম জমিতে পৌঁছেও সবজাতীয় অনুভূতির মাত্রা, শ্রেষ্ঠ অনুভূতির মাত্রা-প্রকাশের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত রয়ে যায়। এবং তাই আদিম যুগের রহস্যমেদুর ধর্মাচরণে, হিন্দুধর্মেরও বিশেষ কয়েকটি প্রশাখায়, যেমন তন্ত্রবাদে, ঈশ্বরকে আবাহন করা হয় অর্থহীন উচ্চারণে, ডাইনিপ্রতিম হিং-টিং-ছটের সাহায্যে--বোধ্য শব্দের চেয়ে আরো শক্তিমান বিবেচিত হয় ছন্দ। লেখকের নিজের পেশা সম্বন্ধে অসন্তোষের এ-একটা কারণ। অন্যটি হচ্ছে--এটিও Lord Chandos'এর পত্রের অন্তর্ভূক্ত--জীবন ও শিল্পের মধ্যে ভীষণ অমোঘ সেই বৈষম্য। ইতিমধ্যেই আমরা এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি। এই যে ‘একজনকে কেন এত কঠিন সংগ্রাম করতে হবে, লেখার জন্য লড়তে হবে কঠোরভাবে'-এ দ্বন্দ্ব প্রবলভাবে নিহিত ছিলো বোদলেয়রের ভিতরে। একজন প্রেমিক হ'য়ে, স্বামী হ’য়ে, উপার্জক হ’য়ে কিংবা পিতা বা বন্ধু ইত্যাদি হিসাবে বেঁচে থাকা কি আরো ভালো নয় ? সুখী হওয়ার জন্য চেষ্টা করাই কি একজনের লক্ষ্য নয় জীবনের ? লেখনকর্মটির মানে, আর যাই হোক, সুখের নয়। তাহলে আমার ক্ষেত্রে এ-প্রশ্নের জবাব, জানেন আপনি , একজন কবি এ সমস্ত প্রশ্নের যে জবাব দেন, অবশ্যই তা নির্ভর করে, প্রথমত, তাঁর বিশেষ অবস্থার উপর, কিন্তু সবচেয়ে বেশি হলো তিনি কি ধরনের মানুষ তার উপর। এখন, আমি হচ্ছি এমন একটা লোক, অন্য কোনো কাজ যার দ্বারা হবে না, কোনো কাজই নয় একমাত্র বই লেখা ছাড়া--যদি এতেও ভালো হই--কিন্তু মনে হয়, একমাত্র ঐ জিনিসটিই আমি করতে পারি। ধরে নেওয়া যাক, আমার ভিতর এটাও প্রদত্ত, মিলটনের কথায় ধরা যাক যে, এ হলো পিতার পুত্রকে-প্রদত্ত একটি গুণ। প্রায়ই দারুণ ক্লান্ত হ'য়ে পড়ি, হ’য়ে পড়ি উত্যক্ত, কিন্তু সেইসঙ্গে এটা অনুভব করি যে, আমি পারবো না...মানে, জীবনের শেষদিন অবধি স্বাস্থ্য যদি আমার ভালো থাকে, কিছু না ক’রে, ডেস্কে বসে কিছু না ক’রে বেঁচে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব, তেমন হ’লে ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত। প্রথম কথা হলো, আমার সমস্ত স্নায়ু, গোটা শারীরিক অবস্থান সেই কাজটির সুরে বাঁধা ; যাবতীয় অসুবিধা সত্ত্বেও আমি খুব ভালো থাকি, শান্তিতে থাকি এতে। এটা একটা জিনিস, আর কারোর জীবনযাপনের উপার্জনের প্রশ্ন হলো অন্য একটি। আমার বই বিক্রী হয় না, আগে যা লিখেছি তার উপর নির্ভর ক’রে আমার চলতে পারে না দিন, তাই আমাকে...বলবো, এটা হচ্ছে একটা দিক মাত্র, কিন্তু যদি অজস্র টাকা থাকতো আমার, আমি বই লিখতাম ; কারণ বিরত থাকতে আমি পারবো না, কিছুতেই না। আর গীতার কৃষ্ণের কথায় নিজেকে তাই বলি, এ আমার ‘স্বধর্ম’, গুরুতর অপরাধ একে বর্জন করা, এমনকি অপ্রচুরভাবে এ কাজ করাও অন্য লোকের নৈপুণ্যদীপ্ত কাজের চেয়ে ভালো।


১৯৭৩
মূল সাক্ষাৎকারটি ইংরেজিতে নেওয়া ।
বাংলায় তর্জমা করেছেন শ্রী অভিজিত দাশগুপ্ত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন