বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

আহমেদ খান হীরক'এর গল্প : যে তিনটি খুনের পর

তখনও তেমন সকাল হয় নি। তবু তুমি একটা উঁচু ছাদের ওপর থেকে সূর্যটাকে দেখলে। সুষম বৃত্তাকার বেলুনের মতো, যেন বাতাসে বাতাসে ঠাঁসা। আর তুমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে, আরও দূরে একটা জীবনানন্দ দাশের চিল উড়তে দেখে ভাবলে ওটা শকুন কিনা।
আর এরকম দ্বন্দ্বের ভেতর, তুমি নয়তলা থেকে লাফ দিলে। নিচে। যেখানে তখনও জেগে ওঠে নাই পৃথিবীর ঘুম।

তুমি লাফ দিলে যেন এক বাজপাখি। আর পড়ে যেতে যেতে, বিরুদ্ধ বাতাসে, তোমার চুল কিছুটা উড়ল, তোমার ফতুয়া ফত ফত করে পাল হয়ে গেল ঢেউ হয়ে গেল আর তখন তোমার মনে পড়ল পুনর্ভবার কথা। যার কথা তুমি কতদিন আর মনে করো নাই। কেন করো নাই এমন ভাবনায় তুমি আচ্ছন্ন হলেও হতে পারতে কিন্তু তোমার মনে পড়ল পুনর্ভবার বুকে ছোট্ট যে একটা ঘাট ছিল আর তাতে ওই সূর্যের মতো প্রায় নিখুঁত গোল অথচ হলুদ একটা পাথর ছিল, আর পাথরে পা রেখে পায়ের ফেটে যাওয়া অংশগুলো সেদিন পরিষ্কার করছিল সীমা ভাবী। তার ছাপ শাড়ির আঁচল আলগা হয়ে গিয়েছিল আর ভেতরের লাল ব্লাউজে থরোথরো কাঁপছিল বুক, বুকের ভেতর একটা সোনার চেন কাঁপনে করছিল চিকচিক। তুমি আর আতু একটু দূরে বসে বসে বুকের মাংস দেখে দেখে বালিতে কলমিকাঠি ঘঁষছিলে তীব্রভাবে। আর হাতের আন্দোলনটা অনুভব করে যাচ্ছিলে মাংসের ভেতর, রক্তের ভেতর।

অথচ তোমাদের এসব দেখা বারণ ছিল। কারণ তুমি আর আতু দু’জনেই ছিলে ভালো ছাত্র। তুমি ফার্স্ট আর আতু সেকেন্ড। বরাবর। সেভেন পর্যন্ত। টিচাররা বলত মানিকজোড়। বরাবর আতু তোমার থেকে দু’পাঁচ নাম্বার কম পেত। আর আতু, যেন তা, মেনেই নিয়েছিল। আতু কখনওই ফার্স্ট হতে চাইত না। হতো না। তোমার তাই আতুকে খুব ভালো লাগত। কিন্তু সীমা ভাবীর মাংস দেখার আগেই আতু একটা বই এনেছিল তোমার কাছে। বইয়ের নাম ‘নিঝুম রাতের গল্প।’ ব্লাউজহীন লালশাড়ি পরা এক লম্বা মেয়ে শুয়ে ছিল প্রচ্ছদে। আর ভিতরে কত যে গল্প আর ছবি। পড়তে পড়তে তুমি পাগল হয়ে গিয়েছিলে। তোমার মনে হয়েছিল এত বিস্ময় এত আনন্দ এত প্লাবন আছে এই রোদ্রের পৃথিবীতে?

তুমি আতুকে বলেছিলে আরও নিঝুম রাতের গল্প আনতে। আতু তার ভাইয়ের তোশক উল্টে উল্টে খুঁজে খুঁজে এনেছিল সীনা সাক্সিনা আর কলিকাতা-৭০০০। রসময় গুপ্ত। লম্বা ছোট নানান সাইজের আরো আরো নিঝুম রাতের গল্প। তুমি বইয়ের ভেতরে বইগুলো ঢুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে। তোমার বিকালগুলো কেমন যেন মেঘে ঢেকে যেত। সব যেন থমকে থমকে যেত। গলা আর বুক শুকিয়ে যেত। কোথাও যেতে তোমার আর ভালো লাগত না। পড়ার যে বইগুলো তোমার ভালো লাগত এতদিন, যাদের ঘ্রাণ না নিলে তোমার বুক যেন শুকিয়ে যেত, তুমি আর সেগুলোর দিকে আর তাকাতে পারতে না। আলো না, তোমার অন্ধকার ভালো লাগতে শুরু করেছিল। পৃথিবীর ভেতরের পৃথিবীটা যেন খুলে গিয়েছিল তোমার কাছে। খোসা ছাড়িয়ে যেন বেরিয়ে এসেছিল ভুট্টার সরস দানা। তোমার মুখে লেগে থাকতে শুরু করেছিল কচি ভুট্টার দুধকষ।

আর এইটে তুমি সেকেন্ড হলে প্রথম। ফার্স্ট হলো আতু। তোমার চেয়ে সাত নাম্বার বেশি পেয়ে। অপমানে তুমি কাঁদলে কতক্ষণ। বাগানের ভিতর তুমি একা একা ঘুমিয়ে থাকলে একটা দুপুর। চালার কোঠায় লুকিয়ে রাখা নিঝুম রাতের গল্পগুলো তুমি নাভির কাছে লুকিয়ে নিয়ে ফেলে এলে বাজারের বড় ইঁদারায়। ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেললে। আর ওই রাতে তুমি এই দুপুরের সিদ্ধান্ত নিলে। ওই বয়সেই তুমি যে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে তা ভাবতে এখ কঠিন লাগে, বেশ কঠিন লাগে। কিন্তু জীবন তো আসলে কঠিনই এক বিষয়, কঠিন আর জটিল... জটিল ঈর্ষার মোড়কে জমানো এক সাবধানী কাচ যেন জীবন। যাকে কিছুটা লুকিয়ে আর কিছুটা প্রকাশ্যে রাখতে হয়, আর খুব সাবধানে ধরতে হয়, যেন হাত না কেটে যায়। তাই তুমি ওই ঘাটে, পাথর ঘাটে, সীমা ভাবীর বুকের মাংস দেখতে দেখতে অপেক্ষা করেছিল। তোমার হাতের কাঠিটা এতটা ঢুকে গিয়েছিল যে বালুর ভেতর থেকে পানি বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল। তুমি গুটিসুটি মেরে সীমা ভাবীর চলে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলে। আতু তখন কোমরে গামছা বেঁধে পায়ে পায়ে কেচকি মেরে বসে ছিল। আর সীমা ভাবী পানিতে নেমে ডুব দিতে গেলে আতু উঠে গিয়ে আকুন্দ গাছের নিচে পেশাব করতে বসেছিল। পেশাব করতে গিয়ে সে খুব নাড়াচাড়া করছিল আর তুমি মনে মনে ভেবে নিয়েছিলে তোমার করণীয়।

ঘাটে আর কেউ তো ছিল না। দেরি হয়ে গিয়েছিল আসলে। প্রতিদিনের গোসল করার মানুষগুলো ততক্ষণে ভাত পর্যন্ত খেয়ে নিয়েছিল দুপুরের, কেউ কেউ হয়ত ঘুমে চলে গিয়েছিল। সীমা ভাবী তাই আলগাভাবেই গোসল সেরে উঠছিল। শাড়ির আঁচলটা অনেকখানি এলিয়ে দিয়ে এমনকি বুকও কচলে নিয়েছিল। তোমাদের দিকে তাকিয়ে বলছিল, তোরা গোসল করবি না নাকি? আয় পানিতে... বেলা তো জোহর পার!

আতু তোমাকে বলেছিল, চল নামি।
আতুর মুখে ঘাম ছিল। আতুর নামার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তুমি নামো নি। তুমি বলেছিল, ভাবী যাক তাইলে নামব।

তোমার বলায় কোনও এক রহস্য থাকায় আতু একটু হেসেছিল। ভেবেছিল তুমি বোধহয় পানিতেই কচলাকচলি করবে। তার মুখের মধ্যে আরেকটু নিষিদ্ধতা জমে উঠেছিল। আর ভাবী তখন ডালিতে রাখা কাপড়গুলো উঠিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল। ভাবীর ভেজা শরীরে কাপড় সেঁটে লেগে ছিল। কিন্তু তোমরা তখনও এত বড় হও নি যে ভাবির চলে যাওয়ার দিকে নজর দিয়ে থাকবে। তোমাদের দৃষ্টি তখনও কেবল সোনার চেন পরা জায়গাটি ঘিরেই ঘুরপাক খেত। ফলে তোমরা ভাবীকে না দেখে এবার পানিতে নেমে যাও। আর তুমি আতুকে নতুন একটা খেলার আমন্ত্রণ জানাও। তোমরা একটু সাঁতরে যাও দূরে। আতুকে বলো চুপচাপ ভেসে থাকতে পানিতে। তারপর তুমি আতুর গামছাটা বেঁধে দাও তার দু’পায়ে। আতু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডুবতে শুরু করে। ছটফট করে। পানি ঝাপটায়। হাবুডুবু খায়। আর তারপর আতু ডুবেই যায় একেবারে। আর ভাসে না। পুনর্ভবা তাকে তলিয়ে নেয়। নেয়ার পর তুমি পুনর্ভবাকে ভালোবেসে ফেল। তোমার মধ্যে কোনও ভাবান্তর হয় না। অথবা হয়। তুমি ভাবো আতু মরে গেলে ক্লাসে আসলে তুমিই ফার্স্ট। তুমি ছটফটে বুক নিয়ে পাথরের ওপর এসে বসো। আর তোমার তখন সীমা ভাবীর বুকের মাংসগুলো মনে পড়ে। তুমি সীমা ভাবীর সোনার চেন মনে করে নিজেকে কচলে নাও অনেকটা সময়।

ওটা ছিল তোমার প্রথম খুন। বাতাসে ফতুয়া ভাসিয়ে আতুর মুখটা মনে করার চেষ্টা করো তুমি। কিন্তু নিচের দিকে পড়তে পড়তে তোমার শুধু সীমা ভাবীর মুখটাই মনে আসে। বিশেষত সেই সোনার চেনটা ঝলকে ওঠে স্মৃতিতে। আর সেই ঝলকটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই যেন একটা রোদের ঝিলিক হয়ে, তোমার পড়ন্ত শরীরের সামনে, এসে দাঁড়ায় রোদেলা। যাকে ভালোবেসে তুমি রোদ ডেকেছিলে। রোদ, তোমার এই মেঘলামনের একমাত্র অবলম্বন। একমাত্র উৎকর্ষতা। নয়তলা থেকে একটা বাজের মতো পড়তে পড়তে তুমি আরও একবার ওই উদয়ীমান সূর্যটাকে যেন দেখতে চাইলে, পারলে না, শহরের আরও বহুতলে এখনও ঢেকে আছে সূর্যটা। অথচ রোদ তো তোমার মনে উঠেছিল ভার্সিটির প্রথম ইয়ারেই। তোমার সাথেই ভর্তি হয়েছিল সে পদার্থ বিজ্ঞানে। তাকে দেখার পর নিজেকে তোমার পদার্থ পড়া এক বিশেষ অপদার্থ বলে মনে হতে শুরু করেছিল। সে ক্লাশে আসত আলো ছড়িয়ে আর সে যখন চলে যেত, তখন তুমি চলে যাওয়া দেখতে শিখেছো মানুষের, তোমার মনে হতো কেউ যেন সমস্ত কালো অন্ধকার ছড়িয়ে, পৃথিবীর তাবৎ আলো নিয়ে চলে যাচ্ছে। তোমার ভয় হতো তাকে। মনে হতো তার সামনে কথা বলতে গেলেই তোমার জিভ সরবে না। তুমি তোতলাতে শুরু করবে। আর তোমাকে নিয়ে সে খিলখিল করে হেসে উঠবে। আর তোমাকে নিয়ে হেসে উঠলেই তুমি নিশ্চিত মরে যাবে। তুমি তাই শুধু তাকিয়েই থাকতে পারতে তার দিকে। তার খোলা চুল শাদা পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ে থাকত। আর তুমি তা দেখতে দেখতে যেন হারিয়ে যেতে তলিয়ে যেতে। ফিজিক্সের ক্লাশরুমকে তোমার তখন পুনর্ভবা মনে হতো। মনে হতো কারও ত্বকের ঘ্রাণে তুমি তলিয়ে তলিয়ে যাচ্ছো। অথচ রোদ বসে থাকত তোমার চেয়ে অনেক দূরে। একটা চুপচাপ ঘুঘু হয়ে। অথবা একটা অনির্দিষ্ট দুপুর হয়ে। এভাবেই তোমার প্রথম বর্ষ কেটে গিয়েছিল—শুধু রোদকে দেখে দেখেই, কোনও কথা না বলে। তুমি সাধারণত কারও সাথেই কথা বলতে না, কিন্তু তখন তুমি একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলে। এমনকি ক্লাশের টিচাররাও তোমাকে ঘাঁটাত না। তুমি সকালে ক্লাশে এসে, রোদেলার অপেক্ষা করতে। আর রাতে হোস্টেলে ফিরে গিয়ে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করতে।

একটা বছর কেটে গিয়েছিল। তুমি ভেবেছিলে কোনও একদিন রোদেলার সাথে কথা বলবে তুমি। ভেবেছিলে দৈব কিছু হবে। সিনেমায় যেমন হয় আর কি। হয়ত তোমার সাথে তার ধাক্কা লেগে যাবে। তার হাতের বইপত্র ছড়িয়ে পড়বে। তুমি সেই বইগুলো তুলে দেবে। রোদেলা হয়ত বলবে থ্যাংকস। বা ধন্যবাদও বলতে পারে। ফিজিক্সে পড়লেও তার মধ্যে কেমন একটা অসম্ভব জীবনানন্দ দাশ আছে। তাকে দেখলেই কেমন নির্জন নির্জন লাগে। একটা রোদমরা বিষণ্ণ বিকালের মতো লাগে।

অথচ সেই নির্জনতা ভেঙে টু স্ট্রোক মটরসাইকেলের মতো খ্যাটখ্যাট করে শব্দ তুলতে তুলতে এলো লোকটা। তোমাদের ডিপার্টমেন্টে কোন ভার্সিটি থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল লোকটা। প্রফেসরের নাম ছিল মনির হোসেন। সারাক্ষণ থাকত সানগ্লাশ পরে। পকেটে সারাক্ষণ পানমশলা। কিছুক্ষণ পরপর পানমশলা মুখে দিয়ে গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে থাকত তোমার রোদের দিকে।

ক্লাশে তোমার ভ্রু কুচকে আসে। তোমার মনে হয় তোমার প্রিয় ঘুঘুটাকে মারতে এসেছে কোনও চতুর শিকারী। আমগাছঘেরা পদার্থের ক্লাশরুম ধীরে ধীরে তোমার কাছে নরক হয়ে ওঠে। প্রফেসর ইচ্ছা করেই দাঁড়াত রোদের পাশে আর তারপর ট্যারা চোখে তাকিয়ে থাকতো তার গ্রীবা আর বাহুর ত্বকের দিকে। চোখ দিয়ে যেন চেটে নিচ্ছে এরকম মনে হতো তোমার। তোমার শরীর ঘিনিয়ে ওঠে বারবার!

আর তখন তোমার আতুকে মনে পড়ে। আতুর কচি মুখটা মনে পড়ে। পাথর ঘাট আর পুনর্ভবাকে মনে পড়ে। তার স্রোতকে মনে পড়ে। আর একটা লাল গামছার কথা মনে পড়ে। কিন্তু এ শহরে কোনও পুনর্ভবা তো নাই। তোমার তাই আফসোস হতে থাকে। প্রফেসর মনির হোসেনকে দেখলেই তোমার আফসোস হতে থাকে।

আর এরকম একটা দিনে দৈব তোমাকে ডাকে। তোমার নিয়তি তোমাকে ডাকে। ফিজিক্স যে নিয়তি অতিক্রম করে গেছে সেই নিয়তি তোমার সামনে এসে হাজির হয়। একটা রাঙতারোদের দিনে, কাঁচা হলুদ শাড়ি পরে, তোমার সামনে ঝলমল করে ওঠে রোদ। বলে, একটা বছর হয়ে গেল, আপনার সাথে পরিচয় হয় নি। আপনার কথা কত জনের কাছেই তো শুনলাম। ভাবলাম নিজে এসেই পরিচিত হই!
তুমি তোতলাও না। হাসো মৃদু।
রোদ বলে, আপনি এত ভালো ছাত্র! জীবনে নাকি কখনও সেকেন্ড হন নি!
তোমার তখন সীমা ভাবীকে মনে পড়ে। বলো, একবার হয়েছিলাম... ক্লাশ এইটে!
রোদ কপালে চোখ তোলে। বলে, সত্যিই? একবারই সেকেন্ড হয়েছেন সম্পূর্ণ জীবনে? কী আশ্চর্য!

তোমাদের কথা চলতে শুরু করে। তোমার মনে হয় এই মেয়েটার জন্য তুমি সেকেন্ড হতে পারো। শুধু সেকেন্ড না এই মেয়েটার জন্য তুমি ফেলও করতে পারো। কিন্তু তুমি ফেল করো না, ফেল করে রোদ। মনির হোসেনের সাবজেক্টে। রোদ মন খারাপ করে বলে, টিচারটা এত খারাপ! ওই লোকটা বলেছিল আমি যদি ওর কথা না শুনি তাহলে নাকি আমাকে ফেল করিয়ে দেবে... আর লোকটা সত্যি সত্যি...
তুমি বলেছিলে, কী করতে বলেছিল লোকটা?
রোদ কিছু বলে নি। তার মুখটা কেমন মলিন হয়ে উঠেছিল। কপালের চামড়া কুঁচকে এসেছিল লজ্জা আর ঘৃণায়। সাথে সাথে তোমার রোদজ্বলা চকচকে দুপুরটা লহমায় হারিয়ে গিয়েছিল মেঘে।

দুইদিন পর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে টিচার্স কোয়ার্টারের এক রুমে। যে রুমে বাস করতেন মনির হোসেন। রুমের এটাচ বাথরুমের ভেতর হাতপায়ে গামছা বাঁধা অবস্থায় কয়েকজন আবিষ্কার করে মনির হোসেনকে। গামছাবাঁধা অবস্থায় তাকে উল্টো করে কেউ ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে বড় একটা পানিভর্তি বালতিতে। উদ্ধার করার পরও বেঁচে ছিল মনির হোসেন। কিন্ত সেই বেঁচে থাকাটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না তার। এক অদ্ভুত আতঙ্কের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। তুমি সে খবর পাও একটা টং চায়ের দোকানের পাশে। খবরটা পাওয়ার পর একটা পাকোরার অর্ডার দিয়ে গাছের গুঁড়ির ওপর বসে তুমি রোদেলার অপেক্ষা করতে থাকো। তোমার তখন সব কিছু ভালো লাগতে শুরু করে। পাকোরাকে মনে হয় হৃদয়...তুমি চিবিয়ে চিবিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে হৃদয়ের অথবা পাকোরার তাপ মুখের ভেতর পুরতে থাকো।

ধেয়ে আসা মাটির দিকে তাকাতে তাকাতে তোমার মনে হয় যে এটা আসলে ছিল তোমার দ্বিতীয় খুন। দ্বিতীয় এবং অবিস্মরণীয় খুন। তোমাকে বাতাস গ্রাস করতে থাকে। তোমার মনে হতে থাকে দু’হাত ছড়ালেই তুমি নিশ্চয়ই বাজপাখির মতো উড়ে যেতে পারবে। তুমি তোমার দু’হাত বাড়িয়ে দাও ছড়িয়ে দাও বাতাসে। দেখতে থাকো তোমার দিকে ধেয়ে আসছে নিচের সব কিছু। তুমি তবে মনে করতে পারবে না তোমার তৃতীয় খুনটা?

ভাবতেই তোমার মুখ কুচকে ওঠে। এই আনন্দময় ছুটে যাওয়ার মধ্যেই একরাশ কষ্ট যেন তোমাকে গ্রহণ করে। তুমি একবার ওপরে তাকাতে চাও; যেখানে একফোঁটা মোমের মতো শাদা তোমার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। যেখানে নিশ্চয় এখনো ঘুমিয়ে আছে রোদেলা! তুমি তো তাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছো, তার কি আর জেগে উঠবার ক্ষমতা রয়েছে?

রোদেলাকে তুমি বিয়ে করে ফেলেছিলে। পড়ালেখার পাট চুকাতে না চুকাতেই। তোমার জন্য কঠিন কিছু ছিল না। কখনও দ্বিতীয় না হওয়া ছাত্রের জন্য এখনও চাকরির বাজার সরগরম থাকে। ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তুমি স্কলারশিপ পেয়ে গিয়েছিলে আমেরিকা যাবার। রোদেলাকে রেখে একা যেতে হবে বলে সেটি গ্রহণ করো নি তুমি। তুমি গ্রহণ করেছিলে রোদেলাকে। রোদেলার পরিবার আর তোমার পরিবার হাসতে হাসতে তোমাদের বিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের রাতে, তোমাদের দেখে, সবাই বলেছিল খুব ভালো জুটি... টোনাটুনি যেন... যেন মানিকজোড়...

আর তখন তুমি হঠাৎ ভয় পেয়ে গিয়েছিলে। তোমার জীবনে তো আরেকটি মানিকজোড় ছিল। তুমি আর আতু। আতু আর তুমি। কিন্তু সেই জোড়ার একজন নেই। তোমার তখন লাল গামছা আর পুনর্ভবা আর পাথরঘাট মনে পড়ে যায়। কাজী বলেন, কবুল?
তুমি কবুল করে নাও তোমার যা কিছু দোষত্রুটি পাপপূণ্য আর আনন্দধারার মতো, জীবনানন্দের কবিতার মতো রোদেলাকে।

তোমরা যেন চাঁদের বুকে ঘর বাঁধলে। সোনাছড়ানো দিন আর রুপাছড়ানো রাত কাটতে লাগল তোমাদের। রোদেলার ত্বক, ত্বকের প্রতিটা লোমকূপ থেকে বেরিয়ে আসা ঘ্রাণ তোমাকে সারাটা দিন আচ্ছন্ন করে রাখত। রোদেলার হাত ধরে নয়তলার ছাদের ওপর উঠে গভীর রাতের তারাগুলোকে মনে হতো একেকটা স্বপ্নের বীজ। তোমরা যেন সেগুলো নিয়ত ছড়িয়ে দিচ্ছো সেগুলো তোমাদের আকাশের অনন্ত উঠানে।

আদুরে বেড়ালের মতো রোদেলা তোমার গালে গাল ঘষত আর বুকের ভেতর মাথা গুঁজে রাখত। তোমার মনে হতো একটা সুখের ডাস্টবিন তোমার ওপর উপুড় করে দিয়েছে কেউ। তোমার শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসা, স্নেহ, আদর আর গলগলে সোনামধু। রোদেলাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে তুমি সারাটা সময়। ছেড়ে দিলে, মনে হতো, নিজের সবচেয়ে প্রিয় প্রত্যঙ্গ তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তুমি বিচলিত বোধ করতে। মনে হতো কী যেন নেই কী যেন নেই। এই না থাকা, কখনও কখনও, তোমাকে আতঙ্কিত করে তুলত। তুমি ভাবতে, তুমি কি তবে, মানুষ হিসেবে অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ছো? তোমার নিজের কাছ থেকেই তুমি গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছো? অথচ তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরেকটা স্বতন্ত্র মানুষ? তুমি তলিয়ে যাচ্ছিলে। যেভাবে তলিয়ে গিয়েছিল আতু। আতুকে ভুলতে পারতে না তুমি। রোদেলার বুকে মাথা রেখেও তোমার মাঝে মাঝে আতুর কথা মনে পড়ে যেত। রোদেলাকে তাই একদিন বলেছিলে, সোনা পরো না তুমি?
রোদেলা হেসেছিল মৃদু। বলেছিল, তুমি বললে পরব। কী পরাতে চাও... কোমরবিছা?
দুষ্টুমি ছিল রোদেলার মুখে। তুমি বলেছিলে, না একটা পাতলা সোনার চেন... গলায়... যার প্রান্তটা তোমার বুকের ভেতর আমার নাকের মতো মুখগুঁজে থাকবে...

সেদিনই আলমারি থেকে একটা সোনার চেন বের করে নিয়েছিল রোদেলা। তুমি রোদেলাকে বলেছিলে, একদিন আমার গ্রাম নিয়ে যাব তোমাকে। একটা নদী আছে সেখানে...

রোদেলা বলেছিল, পুনর্ভবা, না?

তুমি খুব অবাক হয়েছিলে এই ভেবে যে, পুনর্ভবার কথা রোদেলা জানে। তোমার অবাক মুখের ওপর রোদেলা তার আলতো হাসি রেখে বলেছিল, প্রতি রাতেই তুমি পুনর্ভবার কথা বলো। ঘুমের মধ্যে। এক ধরনের ছটফট করতে করতে!

তুমি একটু হাসতে চাও। কিন্তু তোমার মনে হয় মুখের মাংসপেশীগুলোর সাথে হৃদয় কোথাও তাল দিচ্ছে না। তুমি বলো, পুনর্ভবা আমার প্রথম প্রেম।

রোদেলা বলে, আর আমি?

তুমি বলো, তুমি হয়তো প্রথম নও। যদিও তুমি প্রথম বলে আমার ভ্রম হয়...

রোদেলা হেসেছিল বেশ খানিকটা। আর নিজের বলা কথাগুলো তোমার নিজের ভেতরই তখন গুঞ্জরিত হচ্ছিল যে রোদেলা তবে তোমার প্রথম প্রেম নয়! যেন নিজেই তুমি প্রথম আবিষ্কার করো বিষয়টি। ক’রে, তোমার একটু উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। তখন রোদেলা কানে কানে ফিসফিস করেছিল, অথচ বাসায় কেউ তো ছিল না, তবু তার কণ্ঠ মিশেছিল খাদে, বলেছিল, শোনো এবার আমাদেরকে আমাদের প্রথম ভালোবাসাটিকে নিয়ে আসতে হবে পৃথিবীতে!

তুমি প্রথমে বুঝতে পারো নি রোদেলার কথা। কী এমন বলছে যে তার কণ্ঠ নেমে যাচ্ছে পাতালের দিকে! আর তারপর রোদেলা তোমার কানের লতিটা কামড়ে দিয়েছিল অল্প করে। তখন তোমার যেন বোধিপ্রাপ্তি হয়েছিল আর তুমি বুঝতে পেরেছিলে রোদেলা, তোমার নির্জন রোদ, আসলে তোমাদেরই আরেকটা অংশ চাচ্ছে। প্রার্থনা করছে একটা শিশু। তোমার একটু ধাক্কার মতো লাগে তাতে। যা তোমার মুখের রেখাগুলোকে হয়ত আড়ষ্ট করে দেয়। আর রোদেলার চোখ সেই রেখাগুলো ছুঁতে পারে। রোদেলার কণ্ঠ খাদেই থাকে তবু। বলে, তুমি চাও না?

তুমি চাও কিনা তুমি বুঝতে পারো না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এক অসম্ভব ঈর্ষার ঝলক তোমার ভেতর খেলে যায়। ঈর্ষা? তোমার নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়, ঈর্ষা কেন? তোমার মনে হয় তুমি যেমন রোদেলাকে পেয়ে পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠেছো, রোদেলাকে ছাড়া তুমি যেমন অসম্পূর্ণ মনে করো নিজেকে—রোদেলা তাহলে তেমন মনে করে না? বরং তোমাকে পেয়েও সে সম্পূর্ণ নয়। তার এখন একটি শিশু চাই? শিশু! আরেকটি মানুষ। শিশু! আরেকটি সত্তা। শিশু! তোমার মাথার ভেতর শব্দটি আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকে। পড়তেই থাকে।

মাটি খুব কাছাকাছি। ধেয়ে আসছে যেন তোমারই দিকে। গুগল ম্যাপ যেভাবে আকাশ থেকে ঢুকে যায় ভূমির দিকে, আর ভূমি তখন ধেয়ে আসে যেন ওপরে, তুমিও ঠিক সেভাবেই ঢুকে যাচ্ছো, আর মাটি আর কংক্রিট কটোমটো চোখে ধেয়ে আসছে তোমার দিকে। আর তোমার মনের ভেতর গুঞ্জরিত হচ্ছে একটা শব্দ, শিশু। শিশু। যে শব্দটিকে তুমি কখনও সন্তানে রূপান্তরিত করতে পারো নি। মনে হয়েছে সে তোমার অংশ নয় বরং এক নির্মম প্রতিপক্ষ। যে তোমার রোদেলার ভেতর থেকে এসে, রোদেলার শরীর বেয়ে এসে, রোদেলারই ওপর ভাগ বসাবে। যে তোমার রোদেলার উরু আর জঙ্ঘায়, কোমরে আর গ্রীবায়, ওষ্ঠে আর স্তনে, তোমার দখল পাওয়া সমস্ত স্থানে, তোমার আগে পৌঁছাবে। তোমাকে সেকেন্ড করে দেবে। ক্লাশ এইটে আতু যেভাবে করে দিয়েছিল। তুমি হবে শোচনীয় দ্বিতীয়।

কংক্রিট ছোঁয়ার মুহূর্তটি হঠাৎ তোমার কাছে খুব ধীর হয়ে যায়। সিনেমায় দেখানো স্লো মোশনে যেন তুমি, আসলে তোমার মাথার একপাশ আর শরীরের ভার, কংক্রিটকে স্পর্শ করে। বিকট শব্দ হয় বোধহয়। কারণ তোমার শরীরটা কংক্রিট স্পর্শ করার মুহূর্তেই নয়তলা ভবনের সামনের এই রাস্তাটি হঠাৎ খুব সজাগ হয়ে ওঠে। কয়েকজন ছুটে আসে তোমার দিকে। সূর্যের আলোর একটা ঝলক তোমার চোখকে বিদ্ধ  করে। আর ওই শাদা আলোর মধ্যে তোমার রোদেলাকে মনে পড়ে। যার শরীরে একটা শিশু এসেছিল। একটা শিশু, যে তোমার সন্তান, কিন্তু যাকে তুমি সন্তান ভাবতে পারো নি আসলে। সে ছিল নিতান্ত তোমার প্রতিপক্ষ। সে আসছিল তোমাকে দ্বিতীয় করে দেয়ার জন্য। তুমি তাকে আসতে দিতে চাও নি। তুমি তাই তার আসার পথটা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলে। তুমি তাই রোদেলাকে নিথর করে দিতে চেয়েছিলে। আর তুমি যা চাও তুমি তাই করে ফেলতে পারো। অতীতেও করেছো তুমি। তোমাকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।

কাজটি সহজ ছিল, সহজ। তোমার মুখ ছুঁয়ে থাকা রোদ্রের মতো শাদা ওয়ারঅলা একটা বালিশ তুমি চেপে ধরেছিলে তোমার নির্জন রোদেলার মুখে। যেন জীবনানন্দের কবিতার শ্বাসরোধ করতে চাইছো তুমি, এমন মনে হয়েছিল তোমার। ফুলস্পিডে ফ্যান ঘুরছিল মাথার ওপর। যেন এরোপ্লেনের মতো উড়ে যাচ্ছে শীতের পাখি। তুমি বালিশের চাপটা বাড়াতে বাড়াতে দেখছিলে জেগে উঠছে রোদেলা। সে তার বিস্ফোরিত চোখে তোমাকে দেখতে চেয়েছিল, হয়ত চিৎকারও করতে চেয়েছিল, কিন্তু তোমার ধীর ভালোবাসার অনন্য দুটি চোখের শীতল দৃষ্টি দেখে চুপ করে থেকেছিল। চুপ করে নিজের মৃত্যুকে তার শরীরের ভেতর স্থির হতে দিয়েছিল। হাল ভাঙা নাবিকের মতো শুধুই দূরে আরও দূরে তাকিয়েছিল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পেরেছিল।

একটা শাদা বিছানা নয়—যেন ছড়ানো পৃথিবীর মধ্যে একফোঁটা সুখী লাবণ্যের মতো শান্ত রোদেলা ঘুমিয়ে ছিল যখন, তখন তোমার ভেতর কেঁপে উঠেছিল। তুমি ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিলে। শাদা ওয়ারের বালিশটা প্রথমে মাথার নিচে তারপর বুকের ওপর আর তারপর নাকের ওপর চেপে ধরেও তোমার ঘুম আসছিল না। অথচ তোমার মনে হয়েছিল তুমি ঘুমাতে চাও। ঘুমাতে চাও। যেমন ঘুমাচ্ছে তোমার রোদ। তুমি তাই ছাদে উঠে গিয়েছিলে। ছাদে। নয়তলার ছাদে। আর সূর্যের দিকে তাকিয়ে, উঠতি রোদ্রের দিকে তাকিয়ে, তোমাকে এই মাটি ডেকেছিল। যেখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে তোমার রক্ত প্রবাহ। গলগল করে ছুটে যাচ্ছে নর্দমার দিকে। তোমার চোখ বুঁজে আসছিল। আর বুঁজে যাওয়া চোখের ভিতর দিয়েই তুমি দেখতে পাচ্ছিলে মেরুন শাড়ি পরে তোমার দিকে ছুটে আসছে কেউ। তুমি তাকে চিনতে না পেরে আবারও ঘুমিয়ে যেতে চাইলে। আর তোমার শরীরটা লুঙ্গিপরা কেউ তুলে ধরে যেন নিয়ে যেতে চাইছে কোথাও। ভ্যানের একটা চাকার ওপর তোমার হাত পড়ে থাকে, ঘষা খায় বারবার, চামড়া জ্বলে যায়, কেউ সেদিকে তেমন খেয়ালই করে না, গুরুত্ব দেয় না। তোমার ঘষে যাওয়া হাতের জন্য মায়া হয়, তুমি হাতটা সরিয়ে আনতে চাও, কিন্তু পারো না। তোমার সিদ্ধান্ত তোমার শরীর মেনে নেয় না।

তোমাকে কোথাও যেন নিয়ে যাবার জোর চেষ্টা হতে থাকে। চারিদিকে খুব হল্লা তোমার ভেতর একবার পৌঁছায় একবার পৌঁছায় না। তোমার কাশি আসে খুব, বদলায় তুমি বমি করে দাও হড়হড় করে। কেউ যেন তোমার মুখটা মুছে দেয় পরম মমতায়। আর তোমার ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাথার ভিতর বাতাস ঢুকতে থাকে খুব। চিরবদ্ধ থাকা করোটির জায়গাগুলো বাতাস পেয়ে কেমন নগ্ন হতে থাকে—খুলে ফেলতে থাকে থাকে তাদের অন্তর্বাস। তোমার মনে পড়ে শৈশবে তুমি দীর্ঘক্ষণ আটকা পড়েছিলে এক কবরে। আর শাবল দিয়ে খুঁড়ে তোমাকে যখন বের করতে চায় অন্যরা, শাবলে খোঁড়া গর্তের ফাঁকা দিয়ে হু হু করে ঢুকতে শুরু করেছিল বাতাস আর তোমার তখন খুব আরাম হয়েছিল। তোমার এখন খুব আরাম হতে থাকে। মাথার ভেতর যেন খেলতে থাকে নিষিদ্ধ বাতাস!

চোখ খুলে একটা হাসপাতালের মতো জায়গায় নিজেকে একবার দেখ তুমি। শাদা দেয়াল চারিদিকে। দেয়ালগুলো দেখে প্রথমে তোমার খুব ভ্রম হয়। মনে হয় দেয়ালগুলো তুলার মতো নরম নরম মেঘ। আর তখন একটা কণ্ঠ শুনতে পাও তুমি, আতু ভাই, আতু ভাই... আপনার ফ্রেন্ড... আমি কিছু জানি না... কখন ছাদ থেকে... আপনি তো জানেনই ওর...

চোখ খুলতে বাধ্য হও তুমি। দেখ একটা ডাক্তার। তুলোর মত এপ্রোন পরা ডাক্তার। ডাক্তার তোমাকে ডাকছে তোমার ধরে। ডাক্তার কি তোমার চেনা? ডাক্তারকে তোমার অচেনা মনে হয়। এমন লোককে কখনও দেখ নি তুমি। কিন্তু একটা কণ্ঠ বারবার তাকে আতু ভাই বলে ডেকে যায়। তাহলে এই ডাক্তারের নাম আতু। তোমার বাল্যবন্ধুর নামে নাম? কণ্ঠটি আবার বলে, আতু ভাই, আপনি ডাকলে তো লাভ নেই। আপনাকে তো ও চিনতে পারে না। আপনি ওর কাছে এখনও সেই ছোট। যাকে পুনর্ভবায় সে গামছা বেঁধে’...

ডাক্তার বলে, তবু। তবু ডাকি। যদি চিনতে পারে। যদি এখন এই ক্রুসাল টাইমে বেরিয়ে আসে সে ভ্রম থেকে। যদি বাঁচবার ইচ্ছাটা তার আবার তৈরি হয়।’

কণ্ঠটি বলে, আজ রাতে আমাকে জাপটে ধরেছিল একবার। একটা বালিশ দিয়ে। আমি বেরিয়ে এসেছিলাম একপাশে কোনওমতে। কিন্তু কখন যে একা একা ছাদে...

ডাক্তারের পাশের কণ্ঠটির দিকে তোমার এবার তাকাতেই হয়। মেরুন শাড়ি পরা কণ্ঠটি কি তোমার চেনা? তুমি শরীরটা দেখ। ওই গ্রীবা আর ত্বক আর ওই ঘ্রাণ... এখনও ওই ঘ্রাণ।

তুমি চেনা আর অচেনার মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকো। আর হারাতে হারাতে তুমি তোমার খুন হয়ে যাওয়া বাল্যবন্ধুকে দেখ তোমার মাথায় সেলাই করে দিতে। দেখ তার পাশে রোদেলার উৎকণ্ঠা। ওর মধ্যেই তুমি রোদেলা ঈষৎ স্ফিত উদরের দিকে তাকাতে চাও। শিশুটি কি তাহলে এখনও ওখানেই আছে? তুমি খুব অস্থির বোধ করতে থাকো। তোমার হাতে খুন হয়ে যাওয়া মানুষগুলো কেন তোমাকে ঘিরেই ঘুরছে তুমি বুঝতে পারো না। তোমার একবার সেই প্রফেসরের কথা মনে পড়ে। কে যেন বলেছিল প্রফেসরটি কিছুদিন আগে মারা গিয়েছেন। আর তখন তুমি খুব করে হেসেছিলে। যে মানুষ তোমার হাতে খুন হয়েছিল পাঁচ বছর আগে সে কিছুদিন আগে কিভাবে মারা যায়? পৃথিবী আনন্দময়, তখন তুমি ভেবেছিলে। তুমি রোদেলার দিকে তোমার হাত প্রসারিত করতে চাও। রোদেলা কি তাহলে বেঁচে আছে? তাহলে তার বাল্যবন্ধু আতুও কি বেঁচে আছে? আতু কি তাহলে এই ডাক্তারের সমান বড় হয়ে যেত, এখন বেঁচে থাকলে? আতু কি ডাক্তার হতো, এখন বেঁচে থাকলে?

ডাক্তার বলে, না, হলো না!’

রোদেলার আর্তি শোনা যায়। আর তুমি অন্তত একটি খুন করতে সফল হও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন