রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

শমীক ঘোষের গল্প : তুলসীতলা

তিন হাত। কিংবা আর একটু বেশি হবে। অতটাই চওড়া। লম্বায় বেশ খানিকটা হবে উঠোনটা। উঠোনের পর টানা বারান্দা। অ্যাসবেস্টসের চাল। তারপর সারি দিয়ে তিনটে ঘর। পাকা। দুটো ঘর তালাবন্ধ। আর একটার দরজা ফাঁক হয়ে আছে। ভোরের পায়ে এখনও কুয়াশার চাদর। সামান্যই। উঠোনের দুই প্রান্তে দুটো টিনের দরজা। একটা বাইরে যাওয়ার। আরেকটা চানঘরের। চানঘরের একটু আগে একটা পাতকুয়ো। অর্ধেক। বাকি অর্ধেক পাঁচিলের ওধারে। তিন ইঞ্চি গাঁথনির পাঁচিল। ইটের পিঠে ইট জুড়ে। তার প্লাস্টার নেই। চুন ছিল আগে। তারও পাট চুকে গেছে বহুদিন। উদোম ইট নামের ছাপ নিয়ে বসে আছে মুখ বার করে।
ইটের ইতিউতি শ্যাওলার আস্তরণ। নীচের দিকে আর কুয়োর পাশে জমাট সবুজ। অন্য জায়গায় শুকনো ধূসর। কুয়োর একটু আগে সিমেন্টের খানিক উঁচু একটা বেদি। তার মধ্যে মাটি দিয়ে স্বয়ং হরির ঠাঁই। তুলসী গাছ। দুটো নকুলদানা গত রাতের হিমে ভিজে প্ৰায় মিশে গিয়েছে মাটির সঙ্গে।

সুমতি উঠে পড়েছেন একটু আগে। বারান্দায় হাত-পা ছড়ানোর চেষ্টা করছিলেন একটু। কোমরে বাতের ব্যথা। শীতের সকালে সোজা হতে কষ্ট হয়। কিন্তু সকালে ওঠা তাঁর বহু দিনের অভ্যেস। কোমরের ব্যথাটা একটু ধরে আসার পর মধ্যের দরজার সামনে দাঁড়ান দু-দণ্ড। বন্ধ তালাটাতে হাত বোলান। ঘরের উপরের শিকলটা ঠেলে একটু ভিতরের বাতাসটা শোঁকার চেষ্টা করেন। জানালা-দরজা বন্ধ। বদ্ধ বাতাস। সেই বাতাসে পুরোনো দিনের গন্ধ। ঘরের ভিতর যেন তাঁর সমস্ত অতীতটা পড়ে আছে। গলার হরীতকীর মালাটা স্পর্শ করেন সুমতি। একসময় কণ্ঠি ছিল এইখানেই। মিনতি, সঞ্জীবের জন্ম এই ঘরে। তার আগে তার প্রথম পোলাটা। নীল হয়েই জন্মেছিল। চলে গেল একদিনের মধ্যে। আরতিও এই ঘরেই ঢুকেছিল বিয়ের পর। সঞ্জীবের ছেলে সোনাই। তাঁর দাদু। সেও এই ঘরেই থাকত। ওরাও চলে গিয়েছে বেশ কয়েদিন। সঞ্জীব যাওয়ার আগে তালা মেরে গিয়েছিল। চাবিটা আর নেওয়া হয়নি। তালাবন্ধ ঘরের ওপারে সুমতির সংসারের অবশিষ্টটুকু পড়ে আছে। এখন আর পৌঁছানো যায় না সেইখানে। শুধু বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে সামান্য বাতাসে বদ্ধ ঘরের যেটুকু বোঁটকা গন্ধ। ওইটুকুই সুমতির। নিষিদ্ধ আনন্দ যেন। কেউ দেখে ফেললে লজ্জা লাগবে।

‘পোলাডায় চইল্যা গেল। মায়ে-বউয়ে কি বিবাদ হয় না কুনো দিন। মা-র আর কয় দিন। চইল্যা যামু তুলসী চোখে দিয়া। হেইটুকুও কি দিতে আসব হ্যায়?' কতদিন পোলাডার মুখ দেখেননি। মেয়ে মিনতি এই মাসের টাকা দিতে এসেছিল পরশু দিন। সুমতি কেঁদে ফেলেছিলেন।

'দোষ তোমারও কি কম মা। এত ঠাকুর ঠাকুর। এত শুচিবাই। কোন মেয়ে তোমার সাথে মানিয়ে নেবো?'

'হঃ, সব দোষ তো আমারই। সকড়ি কাপড়ে মাইয়ামানষে কেমনে আনাজে হাত দ্যায়, কেমনে ঠাকুর ছোঁয়। ঘরে পিচ্চি পোলা। প্ৰাণে ডর নাই।'

সুমতির চটকা ভাঙে। পাঁচিলের উপর থেকে কী যেন একটা নেমে এল কুয়াশার ভিতর দিয়ে। তুলসী মঞ্চের উপর বসে চেটে খাচ্ছে গত রাতের নকুলদানা। বিড়াল। সাদার উপর কালোর ছোপ ছোপ। হালকা কুয়াশা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে অল্প।

'হই। যা। যা। তুলসীতলায় আইস উঠসে। হারামজাদা।' সুমতি একটু এগিয়ে ঝাঁটাটা তুলে নেন। বিড়ালটা পিছনে ফিরে দেখে। নির্বিকার। ডাক দেয়। ম্যাও। 

কাছে যেতে বিড়ালটা স্পষ্ট হয়। গত কয়েকদিন ধরেই আসছে। মিনি বেড়াল। পোয়াতি। পেটটা ফুলে ঢাউস হয়ে আছে। সুমতি ঝাঁটাটা চালিয়ে দেন শূন্যে। বিড়ালটা ভয় পায়। ছুটে পালতে যায়। ছুটতে একটু কষ্ট হয় যেন। শ্লথ গতিতে বেরিয়ে যায় টিনের নীচের ফাঁক দিয়ে। সুমতি তাড়া করে যান। দরজাটা খুলে ফেলেন এক ঝটকায়। বিড়ালটাকে মারার একটা জেদ চেপে গিয়েছে। 

বাইরের পৃথিবীটা তখনও নরম। আলো সবে কুয়াশা ছিঁড়ছে অদম্য হাঁটার বাসনায়। সিধে লম্বা বাইরের গলিটা। শহরের সঙ্গে বেমানান ইট দিয়ে বাঁধানো। কংক্রিটের রাস্তায় গিয়ে মিশেছে কর্পোরেশনের কালের পাশ দিয়ে। একদিকে নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ি কতগুলো। টালির চাল একটায়। তার মধ্যে বেমানান একটা বিরাট দোতলাও আছে। দু-দুটো গ্রিলের বারান্দা ওপরে নীচে। অন্য দিকে এক ফালি জমি। বাড়ি ওঠেনি। শরিকি বিবাদ আছে। জমির শেষে অল্প একটু খালি জায়গা। কাঁচা। এইপাশে সুমতি থাকেন। ওইপাশে তুষার। ওর বাবা-মা এসেছিল পার্টিশনের পর। সুমতিদের আগে। তবে ওদের দেশ ছিল খুলনায়। কেমন ঘটিদের মতো কথা বলার ছিরি। রান্নায় মশলা দেয় খুব বেশি। তুষার লেখাপড়া করেছে অনেক দূর। ভালো চাকরি করে। সুমতি শুনেছেন ওরা নাকি উঠে যাবে। ছেলেটাকে দিয়েছে ইংলিশ মিডিয়ামে। সুমতি, তুষারের দরজার পর গলিটা সরু হয়েছে ক্রমশ। সরু হতে হতে ঢুকে গিয়েছে বস্তির আধো অন্ধকারে। টালির চাল, কোথাও ইট, কোথাও দরমা। কাঁচা রাস্তা। দুৰ্গন্ধ। বস্তির মধ্যে হেলেদুলে এই গলি-সেই গলি করে সোজা রেললাইন। তার ওপারে বালিগঞ্জ। 

প্রথমে সুভাষগ্রাম। বিয়ের পর প্রথমে কিছুদিন মধ্যমগ্রামে। সাতষট্টিতে যখন এসেছিলেন, এইখানে বস্তি ছিল না। রেললাইন অবধি ফাঁকা জমি । আগাছার চাষ। এদিক-ওদিক কয়েকটা ডোবা। তারপর ধীরে ধীরে সব বদলে গেল। বস্তির লোকের বেশির ভাগ দোখনো। এসেছে ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর, ডায়মন্ড লাইন থেকে। আর আছে অল্প কিছু খোট্টা-বিহারি। 

দু-তিনজন বস্তির লোক দাঁত মাজছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আবছা কুয়াশার মধ্যে তাদের কালো চাদরগুলো জেগে থাকে। 'বাপ্পার মায়ে কই যায়। আজ তাগো ইশ্‌কুল নাই।'— সুমতি বলে ওঠেন। বাপ্পা তুষারের ছেলে। স্কুল ইউনিফর্ম পরা বছর সাত আট বয়স হবে। পিঠে ব্যাগ। হাতে ওয়াটার বট্‌ল দোলাচ্ছে বাচ্চাটা। মায়ে-পোলায় ফিরে আসতাছে ক্যান। 

বাপ্পার মায়ের আগে বাপ্পাই বলে ওঠে, 'মসজিদ ভেঙে দিয়েছে দিম্মা। স্কুল হবে না আজ।'

'হায় রাম! মসজিদ ভাঙে কেডায়? ক্যান ভাঙে?' 

‘রাম মন্দির। বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। রাস্তায় পুলিশে ছয়লাপ। আমরা তো কিছুই জানি না কাকিমা। বাপ্পাকে স্কুলে দিতে যাচ্ছিলাম। সবাই বারণ করল। কার্ফিউ নাকি।'

জানলার পাল্লা খোলার শব্দ হয়। বাড়ির নীচের তলার জানলা খুলে মুখ বাড়ান এক মাঝবয়সি টাক-মাথা, ‘আপনি শোনেন নাই বউদি। ছ-টা পনেরোর আকাশবাণীর নিউজে কইছে। কাল রাইতে ভাইঙা দিছে। রায়ট লাগছে গোটা দ্যাশে। কলকাতায় নাকি কার্ফিউ।'

‘আমি তো বাপ্পাকে তৈরি করছিলাম। ওর বাবা ওঠে আরও পরে। সকালে রেডিওর নিউজ শোনা হয় না। পেপারও তো আসেনি এখনও। '

‘পেপার কি আজ আর দিবে? হে কি আইতে পারব?'—টাক-মাথা বলে চলেন। 

আলোচনার মাঝে এসে যোগ দেয় কালো চাদরে মুড়ি দেওয়া জনাকয়েক বস্তিবাসী। ‘সব থেকে মুশকিল আমাদের জায়গাটায়। কাছেই শালা পার্ক সার্কাস। মোল্লাগুলো রেললাইন ধরে চলে এলেই হল।'— বলার আগে লোকটা মুখের কালো মাজন ফেলে থুক করে। সুমতি চেনেন ছেলেটাকে— তারক। রিকশা চালায়।

‘বাবরি মসজিদ নাকি ভাঙছে। কিন্তু হেইডা কই জায়গায়? পার্ক সার্কাসে?' সুমতি জিজ্ঞাসা করেন।

‘না না, উত্তরপ্রদেশ। ওখানে আগে ওরা রাম মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়েছিল। এখন আবার রাম মন্দির হবে বলে...’ 

‘উত্তরপ্রদেশ কত দূর?'— জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু পারেন না সুমতি।

‘হেইডা কি ঢাকার থেকেও দূরে?'

বাপ্পা আর ওর মা দরজায় টোকা মারে জোরে। ওদের পাল্লা দুটো কাঠের। জানলা থেকে অদৃশ্য হয় টাক-মাথাও। তারক মুখ থেকে কয়লার মাজন আঙুলে তুলে আরও জোরে দাঁত মাজতে থাকে। সুমতি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন একা। 

পৃথিবীর আলো সদ্য কৈশোর ছুঁয়েছে। হঠাৎ যেন কুয়াশা কাটিয়ে দেখা যাচ্ছে অনেক দূর। বর্ষার ভিজে একটা ধানখেতে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো মুখ। অস্পষ্ট অচেনা সারি সারি মুখের মধ্যে একটা দুটো মুখ আদল নেয়। চেনা হতে হতে হঠাৎ কখন অচেনা হয়ে যায় পৃথিবী। শুধু কিছু মুখ বদলায় না। 

সুমতি ঢুকে আসেন উঠোনে। টিনের দরজাটাকে হাট করে খুলে দেন। পা দিয়ে ঘষাটে ঘষটে একখানা আধলা ইট দিয়ে লাগিয়ে দেন পাল্লাটাকে দেওয়ালের সঙ্গে। কুয়ো থেকে জল তুলে প্রবল বেগে ঢালতে থাকেন উঠোনে। শীতের হিম লাগা ঠাণ্ডা উঠোন আরো ঠাণ্ডা হয়ে যায় কুয়োর জলে। ঝাঁটা দিয়ে সবেগে ঘষতে থাকেন উঠোনটাকে— ‘ময়লা পরিষ্কার করন লাগব। বড় ধুলা সমস্ত উঠোনে।'

স্নান করে ভিজে কাপড়ে উঠোনে আসেন সুমতি। শীতের ঠাণ্ডা বাতাস ঝাপটা মারে ব্লাউজহীন গায়ে। তুলসীথানে জল দেন– 'হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।'

ঘরে আসার ঠিক আগে আবার দেখতে পান বিড়ালটাকে। পোয়াতি বিড়াল কেমন পাগল করা দৃষ্টি নিয়ে শুয়ে আছে সঞ্জীবের ঘরের সামনে। ‘হই। হই। যাহ্‌।' বিড়ালটা শরীরটা টেনে টেনে কুয়োর উপর লাফ দেয়, পাঁচিল দিয়ে চলে যায়। সুমতি জল নেন মগে। খানিকটা জল হাতে করে ছুড়ে দেন বিড়ালটার দিকে। বিড়ালটা লাফ দিয়ে চানঘরের টিনের ছাদে উঠে যায়। 

সুমতি ঘরে ঢোকেন। জানলার পাল্লাগুলো খুলে দেন। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে একটু মিঠে রোদ ঢোকে ঘরে। একপাশে তক্তাপোশ পাতা। উঁচু করে ইটের উপর। তার নিচে অসংখ্য বয়েম। বিস্কুটের টিন। দু-চারটে বাক্স। তক্তাপোশের একপাশে কাঠের সিংহাসন। তার উপর রাধা-গোপাল বিরাজমান। আর আছে মা লক্ষ্মীর পট। কাঠের গায়ে গা লাগানো জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। একটা গুরুদেবের ছবি। 

সিংহাসনের উপরে দুটো জানলার মাঝে ফ্রেমে বাঁধানো গোটা গোটা কালো ছাপা অক্ষর। হারে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হারে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। ‘রায়ট লাগছে কলকাতায়। রায়ট নোয়াখালিতে। হিন্দুগো মারতাছে মুসলমানেরা। তাগো পাকিস্তান চাই।'

‘আমাগো কী হইব ?'

‘আমাগো গেরামের আধাই মোসলমান। কিন্তু আজ অবধি কেউ কাউরে কিছু বলছে?' 

'কিন্তু এইহানে যে পাকিস্তান ডাক পড়ে?'

রায়ট বেড়েছিল আরও। ঢাকা শহর থেকে অনেক দূরে তাদের গ্রাম কুসুমপুর। সুমতির বাবা জয়রাম সাহার ছিল মুদি দোকান। একচালা দোকানঘর। তার পিছনে মাটির বাড়ি। একপাশে আলাদা রান্নাবাড়ি। নারকেল-সুপুরি-কলার গাছ এদিক-ওদিক। একপাশে শিউলি গাছ। তুলসী গাছ ছিল সেই বাড়িতেও। 

সুমতির সই ছিল সাইদা। তার সঙ্গে জল অচল।

‘তরা তো নিচু জাত। তাইলে আমাগো পানি খাইস ক্যান্‌?'

‘তগো পানিও তো বোসেরা, মিত্তিরেরা, ঘোষালরা ছোঁয় না।'

‘আমি তোরে তো ছুঁই।'— সাইদার হাত ধরে ফেলতেন সুমতি। দুই সই ছুট লাগাতেন ধানখেতের মধ্যে দিয়ে। আমবাগানে টক আম, চালতা, নোনা ছোঁয়াছুঁয়ি মানত না এমনিতেই। কখনো কখনো দু-জনেই ছুটি লাগাতেন আরও দূরে। ঘন বাঁশবন আর ঘাসের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দূরে বংশী নদীর ধার অবধি। প্রতি বছর পুজোর সময় যাত্রা হত। সেই পালাও দেখতে যেত দুই সহচরী একসঙ্গেই।

‘তগো হিন্দুগো দেবতাদেরও নিকাহ-শাদি হয়! হা হা হা!'

‘কী কস! কইতে নাই। পাপ হয়।' বন্ধুর ঠোঁটের উপর হাত রাখতেন সুমতি।

‘তগো আল্লাহ্‌র মতো নাকি? মূর্তি নাই, ছবি নাই! কইলেই হইব ভগবান। ভগবানরে

দেখতে কেমন।'

‘তোবা তোবা।'

আবার শিবরাত্রির আগে সাইদা এসে দাঁড়াত, ‘তগো ঠাকুররে কইস আমার

জন্য যেন একটা ভালো দুলহা দেখে। দাড়িঅলা হুজুর বর নিকাহ করুম না।'

সুমতির থেকে কিছুটা ছোটই ছিল সাইদা। তাঁর তখন নিকাহর কথা হচ্ছিল। বিয়ের কথা হচ্ছিল সুমতিরও। তাঁর বয়স তখন প্রায় পনেরো।

‘মুসলমান পোলাপানগো হালচাল ভালো না। এদিকে মাইয়াডা বারমুখি। কত মাইয়ার সর্বনাশ হইতাসে। তর মুসলমানগো সাথে এত মেলামেশা ক্যান?'

নোয়াখালির রায়টের আঁচ এসে পড়ল কুসুমপুরেও। প্রথমে আপত্তি তুলেন মুসলিম লিগার ফয়েজ আলি। ‘তগো হরিসভার কীর্তন আমাগো শোনা গুনাই।'— সাইদাই বলেছিল তাকে। 

উনুনে আঁচ দিতে শুরু করেন সুমতি। আগে স্টোভ ছিল তাঁর। সঞ্জীব যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে। সেও অনেকদিন। একটা আস্ত ঘুঁটে পেতে দেন উনুনের ভেতরের লোহার শিকগুলোর উপর। বাকি ঘুঁটেগুলো ভেঙে ভেঙে সাজাতে থাকেন তার উপর। তারপর গুল দিয়ে ভরাট করে দেন। উনুন সাজানো হলে কাগজে আগুন ধরিয়ে নীচের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দেন। 

আগুন জ্বলেছিল কুসুমপুরের পাশে গ্রাম ফরিদনগরে। বংশী নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সেই আগুন দেখেছিলেন তিনি। একাই। সাইদা আসছিল না। তার বাপ লিডার হইছে। মাইয়াগো ঘর থিক্যা বার হওন নিষেধ। বোরখা পরন লাগব। কালো ধোঁয়া যেন ঢেকে দিচ্ছিল আকাশটাকে। হেমন্তকালের মেঘহীন আকাশে কালো ধোঁয়া যেন আরও ঘোর কৃষ্ণ রং নিয়েছিল। নদীর ধারে কাশের বন শুকনো। খড়খড়ে। গোটা পৃথিবীটাই যেন জ্বলে উঠবে যে কোনো মুহূর্তে। সুমতি অস্ফুটে বলেছিলেন, ‘গোপাল রক্ষা করো।'

মা কাঁদছিল। বাবা দোকান বন্ধ করে বসেছিল বাইরের দাওয়ায়। গ্রামের আরও কেউ কেউ এসেছিল। বলেছিল, ‘থাকন যাইব না।'

‘যামু কোথায়?'

‘কলকাতাতেও দাঙ্গা চলতাসে। কয় হাজার রোজ মরে সেইখানে।'

‘যশোর চলো। খুলনায়। শুনি সেইগুলি ইন্ডিয়া হইব। কলকাতার থিক্যা মানুষ পলাইয়া আসন্তাসে ওইহানে।'

ঘুঁটে জ্বলে ওঠে। চিড়বিড় করে আওয়াজ হয় উনুনের ভিতর। সাদা ধোঁয়া পাক খেতে খেতে ঢেকে দেয় উঠোনের অবয়ব। চোখ জ্বালা করে ওঠে সুমতির। উনুনটাকে আরও ঠেলে দেন খোলা দরজার দিকে। দরজা দিয়ে বের হতে থাকে সাদা ধোঁয়া। গলির বাতাস ভরে যায়।

সুমতি ঘরে ঢুকে আসেন। নীচু হন। ব্যথা করে ওঠে কোমরটা। তক্তাপোশের তলা থেকে টেনে বার করে আনেন চালের টিন। মেরি বিস্কুটের টিন ছিল কোনো কালে। এখন তার গা থেকে রঙের চলটা উঠে গিয়ে মরচে ধরা কালো। চাল বাড়ন্ত । চাল কিনতে হবে। আজ কি দোকান খুলেছে? ঝুড়ি খোলেন। সামান্য কটা আলু। আর একটা পেঁপে অবশিষ্ট। সুমতি চটিটা পরে নেন। ধোঁয়া অতিক্রম করে বেরিয়ে পড়েন বাইরে। উঠোনের দরজাটা খোলাই থাকে।

গলির মুখে টাইমকলের জল এসেছে। স্নান করছে একজন গামছা পরে। দু-তিন জন দাঁড়িয়ে আছে। যাওয়াই যাচ্ছে না।

‘হেবোদা, কতদিন চলবে মাইরি।' 

সুমতি জলের ছোঁয়া এড়িয়ে এগিয়ে যান নিঃশব্দে। গলির পর পিচ রাস্তা। তার একদিকে বস্তি, আরেক দিকে মধ্যবিত্ত মহল্লা। বস্তির মাঝখানে ভগবন্তের মুদির দোকান। একটাই ঘর। জানলা নেই। শুধু একপাশে টিনের ঝাঁপ দোকানের। তার সামনে একটা লোহার শিক আড়াআড়ি লাগানো। থরে থরে বয়েম সাজানো থাকে চারদিকে। চানাচুর, ঝালমটর, কচুভাজা, বাচ্চাদের লাল-সবুজ-কালো লজেন্স, বেকারির কেক-বিস্কুট। ভেতরে লম্বা উঁচু চৌকির উপরে বসে ভগবন্ত দোকান চালায়। দোকানের ঝাঁপের পাশেই দরজা। তার ভিতর দিয়ে ভগবন্তের সংসার। সংসার বলতে চৌকির নীচটা। মাটিটা অনেকটা খুঁড়ে প্রায় একটা মানুষের দাঁড়ানোর মতো জায়গা চৌকির নীচে। তার মধ্যেই স্টোভে রান্না করে ভগবন্তের মেয়ে। ভগবন্তের দোকানে ঝাঁপ পড়ে না কখনো। দরজাও খোলা থাকে। নইলে এই শীতেও দমবন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা। আজ ভগবন্ত বয়েমগুলো সরিয়ে রেখেছে পিছনে। দোকানের পাল্লাটা অর্ধেক করে নামানো। সুমতি উঁকি দেয় দরজায়।

'মুদি, দোকান বন্ধ কইরা রাখছ।'

'আপ সুনেননি? বোড়ো রাস্তার সব দুকান বন্ধ। হামার তো বন্‌ধ্‌ধ করনেকা ইন্তেজাম ভি নেই। কাচ-উচ সরিয়ে রেখেছি সুধু।'

‘রায়ট লাগসে নাকি।'

‘রাম মন্দির হোবে। মসজিদ-উসজিদ ভেঙে দিয়েছে। হামার দেশে তো বহুত ঝামেলা হোবে। ভাগলপুরে রায়ট হোয়েছিল। শালা তকলিফ হামার। ঘোরের খবর লিব কীভাবে। কী লিবেন?'

‘চাউল লাগব। দুই কিলো। মাইয়া কোথায় তোমার?'

‘ছোকরিকে বস্তির ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ইসব খারাপ ওয়ক্ত আছে। কোই ভি এসে দোকানে লুট করবে। অউর ফির মুসলমানদের দোষ।' 

সুমতির হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল বহুদিন আগের একটা রাত্রি। 

‘অছিমুদি তো মোসলমান। মাইয়াগুলার যদি নদীর ভিতর লয়্যা গিয়া সর্বনাশ কইর‍্যা দ্যায়!'— মায়ে কইছিল।

‘মোসলমান তো কী করুম।'

‘কী করুম মানে! মাইয়া পোলা লয়্যা মরুম নাকি!'

‘তুমি বুঝো না। বুঝতাই বা কুন দিন।' 

‘কী বুঝি না আমি? আপনে বুঝেন? ভিটেছাড়া হইয়া পথে বসুম। কলকাতায় যাইবেন। কলকাতায় আমাগো আছে কেডা শুনি। কলকাতায় কি রায়ট নাই? সেইখানে তো কত লোক মরে প্রতিদিন।'

জয়রাম সাহা অসহায় ভাবে তাকিয়েছিলেন স্ত্রী দিকে। গতকাল রাত্রে হরিসভায় কারা যেন গরুর মাংস রেখে দিয়েছে। গ্রামের হিন্দুরা একে-একে চলে যাচ্ছে। সবার আগে গিয়েছে উঁচু জাতেরা। শোনা যাচ্ছে, তাদের গ্রামেও আক্রমণ হবে যে কোনোদিন। তাগোও যাইতে হইব। বাপ-দাদার এতকালের ভিটে। কত জিনিস। সুমতির মা পুঁটুলি বাঁধছিলেন।

‘হিন্দু মাঝি পামুটা কুনহানে। তা ছাড়া নীচু জাতগো যোগেন মণ্ডল আছে। সে কয় মোসলমানগো লগে পাকিস্তানে যাওন লাগব। নীচু যাতে লুট কইরা কাইটা ভাসায়ে দেয় যদি, মোসলমানগো দোষ হইব। কিন্তু আমাগো কী হইব?'

গোটা ভিটেটাই যেন নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সুমতির মা। সুমতিও। এতকালের শিউলি গাছ। বংশী নদী। পুকুরধার। বাঁশবন। সাইদা। এতসব নেবেন কী করে।

সেই সন্ধেয় তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে গিয়ে মা কেঁদে ফেলেছিল— ‘গোপাল রক্ষা করো।' কাঁদছিল সব থেকে ছোটো বন সুন্দরীও। তার দুটো হাঁস ছিল। প্রতিদিন সকালে তাদের ঝাঁপি খুলে দিলে নিজেরাই হেঁটে যেত পুকুর অবধি। বিকেল হলে সুন্দরী ডাক দিত— ‘চই চই। চই চই।' হাঁস দুটো জলের ভিতর থেকে উঠে আসত সুন্দরীর পিছন পিছন।

‘মা, হাঁস দুইটারে লইবা না। ও মা।'

‘চুপ কইরা থো।'

‘ও মা অগে কী হইব! ও মা।'

হাঁস দুটোর ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন সুমতি। চেয়েছিলেন সই সাইদার সঙ্গে একবার দেখা করে আসতে। পারেননি। ওগো বাপে লিডার। যদি কয়্যা দ্যায়!

অন্ধকার রাতে যখন আসছিলেন তখন যেন হাঁসগুলো আর্তনাদ করে উঠেছিল। সেই আর্তনাদ যেন অনেক দূরে নদীর ভিতরে শুনতে পাচ্ছিলেন সুন্দরী আর সুমতি। অছিমুদ্দির গাছড়া নৌকা জল কেটে ততক্ষণে অনেক দূরে। আলো নেই। শীতের নদীর হাওয়ায় কেঁপে উঠছিল সুমতির বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখা সুন্দরী। শুধু তার বুকের কাছটা অল্প গরম হয়ে উঠেছিল সুন্দরীর চোখের জলের উষ্ণতায়। 

নামার সময় অছিমুদ্দি জয়রাম সাহাকে জড়িয়ে ধরেছিল— ‘জয়রামভাই, আল্লা হাফিজ।' জয়রাম কী বলেছিলেন স্পষ্ট শুনতে পায়নি কেউ। তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে গিয়েছিল কান্নায়।

শীতের দুপুরে নরম রোদ জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে তেরছা হলুদ একটা চৌকো খাঁচা এঁকেছে বিছানার উপর। সুমতি শুয়ে ছিলেন। ঘুম আসছিল না তাঁর। জানলার বাইরে বস্তির লোকেদের চিৎকার। অন্য দিন বস্তির বাচ্চারা চিল্লায়। আজ বেশি ভিড় বড়োদের। কাজে যায়নি কেউ। বিড়ির গন্ধ ভেসে আসে। সুমতির অস্বস্তি হয়। জানলা দিয়ে ভেসে আসে কথাগুলো—

‘ট্রেন লাইন ধরে হেঁটে এসেছিল?'

‘না না, চালতাবাগান বস্তির ভিতর দিয়ে। ব্রিজের উপর পুলিশ আছে না।'

‘ক-বস্তা নিল?'

‘কত বস্তা জানি না। তবে পেটোই নিয়েছে। বলল সোর্ড-ফোর্ড নেবে না। পেটো হলেই চলবে।' 

‘টাকা নিল দিনুদা?'

‘দিনুদা হেবি মাল। টাকা ছাড়া ও দিচ্ছে!'

‘এই সময় হিন্দুদের থেকে টাকা নিল। ওদের জায়গাটা পেরোলেই তো আমরা। ওরা মরলে কি আমরা বাঁচব?'

বাইরের রান্নার জায়গায় বাসন পড়ার আওয়াজ হল। সুমতি উঠে বসেন। কোমরের ব্যথাটা চিনচিনিয়ে উঠল। কোনোমতে ঘরের দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বিড়ালটা আবার এসেছে। তাকে দেখে সরে যায় একটু। সুমতি বিড়ালটাকে তাড়া দেন।'

‘দিম্মা!'— বাপ্পা পাঁচিলের উপরে উঠে বসেছে। 

‘পইড়া যাবি। নাইমা আয়।'

বাপ্পা লাফ দিয়ে নামে উঠোনের ওপর— ‘দিম্মা মুসলমানরা এলে তুমি কী দিয়ে মারবে?'

সুমতি হাসেন। 

‘বলো না দিম্মা। কী দিয়ে মারবে।'

‘আমারে কিছু কইব না। 

‘অ্যাঁ, তোমাকে কিছু বলবে না! বাবা বলছে ওরা এলেই সব কিছুতে আগুন লাগিয়ে দেবে।'

‘তর বাপে বাঁচাইবো আমাগো।'

‘ধুর! জানো দিম্মা, আমি দরজার খিল খুলে লুকিয়ে থাকব। এলেই মাথার ওপর দড়াম!'— বাপ্পা খিল চালানোর অভিনয় করে দেখাল। 

সোনাই বাপ্পার বয়সিই হবে। হয়তো একটু বড়ো। সুমতির হঠাৎ সোনাইয়ের কথা মনে পড়ে। ওরা থাকে গড়িয়ায়। ওখানে সোনাইও কি বাপ্পার মতো মুসলমানদের জন্য অপেক্ষা করে? সুমতি চকিতে একবার তাকান বন্ধ ঘর দুটোর দিকে। কত বছর তিনি সঞ্জীবকেও দেখেননি। 

‘দিম্মা আমি যাই।'

‘পাঁচিল টপকাইতে হইব না। তুই দরজা খুইল্যা যা।'

‘আমাদের বাড়ির দরজা খুলবে কে? মা ঘুমোচ্ছে।' বাপ্পা আবার পাঁচিলে ওঠার তোড়জোড় করে। 

‘বান্দরবাসী পোলাপান! পইড়া যাইবি!' 

ঘরই ছিল না প্রথমে। দরজা থাকবে কীভাবে? খুলনা থেকে কলকাতায় আসার ট্রেনে প্রবল ভিড়। অনেক মানুষ। ট্রেনের ভিতরে, ছাদে, দরজা ধরে ঝুলছে, ঝুলছে দুটো কামরার মাঝে, জানলায়। তাদের সঙ্গে পুঁটুলি, বাক্স, তোরঙ্গ। পারলে যেন বাড়ির ইটগুলোও নিয়ে আসে। নিয়ে আসে খড়ের চাল। 

মা খুলনা স্টেশনে এসে বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কথাটা, ‘শুনছেন নি, ওই পারে আমাগো ভিটার মতো একখান বাসা বানায়েন। আর একখান শিউলি গাছ।' সুমতির ইচ্ছা করেছিল বংশী নদীটাকে নিয়ে আসতে। পুকুরপাড়টা, আমবাগানটা। সেইসব কিছুই ছিল না। শিয়ালদা স্টেশনে শুধু মানুষ আর মানুষ। তাদের আবরু গিয়েছে, মান-ইজ্জত গিয়েছে। স্টেশনটা যেন তাদের বিরাট সংসার। মাদুরে, শতরঞ্চিতে, চাদরে আলাদা আলাদা ভিটে। আলাদা আলাদা সংসার। তাদের কারো কোনো তুলসীথান ছিল না। 

সুমতি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। এক হাতে খামচে ধরেছিলেন ছোটভাই কার্তিকের হাত আর আরেক হাতে বাবা জয়রামের ফতুয়ার খুঁট। যদি হারিয়ে যায় বাবা। তখনও কলকাতা জ্বলছে। স্টেশনের বাইরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। গান্ধিবাবার কথাও শোনেনি কেউ। স্টেশনের ভেতরেই গভীর রাত্রে ভেসে আসত মানুষের চিৎকার। অনেক দূরে কালো আকাশ গরম হয়ে উঠত আগুনের আঁচে।

সুন্দরী বুকের মধ্যে কাঁদত রাত্রে, ‘দিদি আমার হাঁসগুলার কী হইব। খাঁচা খুইল্যা দিয়া আইলাম। কিন্তু রাইতে অগো ডাকব কেডায়?' সুমতি ভয় পেতেন অন্য। লোলুপ পুরুষ স্পর্শের। 

সেইখান থেকে উঠে আসা শেষ পর্যন্ত। বাবা জয়রাম মুদির ক্রমশ কাপড়ের দোকানের কর্মচারী হয়ে ওঠা। তারও অনেক পরে সঞ্জীবের বাবার হাতে ধরে মধ্যমগ্রামে। তারপর এইখানে। 

বাইরে একটা চিৎকারের আওয়াজ শোনা যায়। সুমতি আবার দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন। বস্তির ছেলেগুলো চেঁচায়। 

‘কী হইছে? হই তারক।'

‘কিছু না ককিমা। টফি পুলিশের মার খেয়েছে।'

‘পুলুশ এইখানে আইছে নাকি?'

‘নাহ্‌ বড়ো রাস্তায় গিয়েছিল। ইস্টেটম্যান না কী ইংরেজি কাগজ কিনবে বলে। তখন পুলিশ মেরেছে।'

‘টফি মানে তরফদারের ছুটো পোলা?'

তারক হাসে। উত্তর দেয় না। বস্তির বাকি লোকদের চিৎকার-চোঁচামেচি চলতেই থাকে।

‘কী হয়েছে কাকিমা?'— তুষার দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

‘তরফদারের ছুটো পোলারে পুলুশ মারছে।'

‘টফি? পুলিশ কখন এল।'

‘ইঞ্জিরি কাগজ কিননের লিগা গেছিল নাকি।'

হা হা করে হেসে ওঠে তুষার— ‘ও তো মাধ্যমিকে ফেল করেছিল দু'বার। ও পড়বে ইংরেজি কাগজ! আসেন কাকিমা। ভিতরে আসেন।'

সুমতি তুষারের পেছন পেছন ঢোকেন। তুষারের বাড়িটা সুমতির মতোই। শুধু তাতে সংস্কারের ছাপ আছে। বারান্দায় গ্রিল বসানো। বেতের সোফাসেট। বাইরের দিকের ঘরের ভিতর কাচের আলমারি। কাঠের শাটার লাগানো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি সেট। 

‘তুষার, দাঙ্গা কি খুব বাড়ছে?'

‘দাঁড়ান। স্পেশাল বুলেটিন দিচ্ছে টিভিতে মাঝে মাঝে। খুলি।'

টিভি খোলে তুষার। হিন্দিতে কথা বলতে থাকেন ঘোষিকা। এক বর্ণও বুঝতে পারেন না। তবুও বেতের মোড়ায় বসে ঠাহর করার চেষ্ট করেন। ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বাপ্লার মা। 

‘চা খাবেন কাকিমা?' 

সুমতি সম্মতি দেন। 

‘গোটা দেশেই খুব মারামারি। কলকাতায় দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আর্মি নেমেছে।'

‘গুলি কইর‍্যা কারে মারব?'

‘যে বাইরে বেরোবে। বড়ো রাস্তায় যাবে। দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য কাকিমা।'

‘দাঙ্গা কি জোরদার হইতাছে নাকি?'

‘তা-ই তো মনে হচ্ছে কাকিমা।'

‘রাম মন্দির বানানোর লগে এতগুলি মানুষ মরব। হেইডা তো পাকিস্তানের মতন নূতন দ্যাশের দাবি নয়। অগো কি পাকিস্তানের মতো হিন্দুগো নূতন দ্যাশ করন লাগব?' বাপ্পার মা ঢোকে। দু-কাপ চা নিয়ে। সুমতি হাতে নেন। কাপ থেকে ঢেলে নেন প্লেটে। ফুঁ দিয়ে চুমুক দিতে থাকেন। বাপ্পা হাতে একটা ভারী খিল নিয়ে ঢোকে— 'এই দ্যাখো দিম্মা। এইটা।'

‘বুঝলেন কাকিমা, এইটা দিয়ে বাপ্পা নাকি মুসলমান মারবে!'— তুষার হেসে ওঠে। পৌষ মাসের দিন শেষ হয়। অবসন্ন আকাশ মুখ ভার করতে করতে অন্ধকার হতে থাকে। সুমতি ফিরে আসেন। কুয়ো থেকে জল তুলে গা ধুয়ে ফেলেন। কাপড় বদলান। একটা প্ৰদীপ জ্বেলে দেন তুলসীতলায়। দুটো নকুলদানা রাখেন মাটির ওপর। কপালে হাত ঠেকান— ‘গোপাল রক্ষা করো।' আর ঠিক তখনই শুনতে পান আওয়াজটা। বারান্দার ভিতরের কোণ থেকে। চমকে তাকিয়ে দেখতে পান বিড়ালটাকে। প্রসব করছে। আরেকটা সদ্যোজাত বিড়ালছানা মাটিতে পড়ে কাঁদছে। 

সুমতি ঠোঁটটা শক্ত করেন একটু। এগিয়ে গিয়ে দেখেন বিড়াল মাকে। সদ্যোজাত ভিজে সন্তানকে চাটছে। সুমতিকে দেখে একটু ভয় পায় বিড়ালটা। কিন্তু প্রসবরত অবস্থায় তার সরে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। প্রথম পোলাটা হল যখন সুমতি খুব কেঁদেছিলেন। তার সমস্ত শরীরটা ছিল নীল। বেশিক্ষণ বাঁচেনি। তারপর মিনতি। সেইবারও তাঁর ভয় করেছিল। এইটাও বাঁচবে তো! সঞ্জীবের সময় কিছুটা সাহস হয়েছিল তাঁর। সুমতি তাকিয়ে থাকেন খানিকক্ষণ। নিজের ঘরে এসে ঢোকেন। তক্তপোশের তলা থেকে টেনে বার করেন দুটো চটের বস্তা। পাপোশ করবেন বলে রেখেছিলেন। 

বিড়ালটার দিকে এগিয়ে যান। চটের বস্তাটা পেতে দেন সামনে। ধীর গতিতে বিড়ালটা ঠাণ্ডা মেঝে থেকে চটের উপর উঠে বসে। দুটো বাচ্চা মাটি থেকে তুলে মায়ের কাছে চটের উপর দিয়ে দেন সুমতি। বিড়াল ধরলেন, আবার স্নান করতে হবে। তার আগে উনুনে আঁচ দিয়ে জল গরম করতে হবে। খানিকটা গুঁড়ো দুধ আছে এখনো। 

সুমতি উনুনে আঁচ দিতে থাকেন। খানিকটা দূরে বিড়াল-মা পরিচর্য করছে তার সদ্যোজাত সন্তানদের। বাইরে তখন নিকষকালো একটা রাত আস্তে আস্তে ঢেকে দিচ্ছিল আকাশটাকে। শুধু সুমতির উঠোনে, তুলসী গাছের তলায় একটা প্রদীপের আলো, শীতের হাওয়ায় অল্প অল্প কাঁপছিল। আর তার একটু পিছনে দুটো নকুলদানা গোপালঠাকুরের অপেক্ষায় শীতের হিমে ভিজে মাটিতে মিশে যাচ্ছিল।






1 টি মন্তব্য:

  1. আমার সোনার বাংলাভাষা, আমার গহীন বাংলাভাষা, তরতরাইয়া যাওগো মাঝি তরতরাইয়া যাও।

    উত্তরমুছুন