শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

দেবর্ষি সারগী'র গল্প : পদ্মার গ্রাস

ভোর রাতে, আকাশে যখন কিছু কিছু তারার বুক তখনও থিরথির করে কাঁপছে, তোমার ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল এবং ঘাড় তুলে তুমি লক্ষ করলে তোমার আবছা শিয়রের কাছে ওৎ পেতে বসে আছে একটা হিংস্র শ্বাপদ অচেনা পশু, যে এক্ষুণি ভোরের শূন্য দিগন্ত তোলপাড় করে ছুটতে ছুটতে তোমার ঘরে ঢুকে পড়েছে। তুমি চিৎকার করে লাফিয়ে উঠবে।
আমাদের গ্রামবাসীরা এভাবেই চিৎকার করে জেগে উঠল যেদিন তারা আবিষ্কার করে পদ্মার জল অতর্কিতে গ্রামে ঢুকে পড়েছে। পদ্মাকে তারা একটা শ্বাপদ জন্তুর সঙ্গেই তুলনা করে । তফাত শুধু এটুকু যে, এই জন্তুটা অসীম, এর কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ কেউ জানে না। কিংবা এই জন্তুটা চারপাশে শুধু ধারালো দাঁতওলা মুখ দিয়ে তৈরি, ধড় কোথায় বলা শক্ত।

ভাল করে ভোর হবার আগেই গ্রামবাসীদের ভেতর হুলস্থুল পড়ে গেল। দিশেহারা পুরুষেরা শাবল গাঁইতি দিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ভাঙতে লাগল, যাতে জালনা-দরজা বা কড়িবরগা বাঁচানো যায়। আতঙ্কিত মেয়েরা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। গোয়াল থেকে বেরিয়ে গরু ও মোষ আকাশ ছিঁড়ে ডাকতে লাগল। রক্তচক্ষু ঘোড়ারা উন্মাদ হয়ে দৌড়তে লাগল। হাঁস ও মুরগিরা প্রবল জ্বরে ভোগা জীবের মতো বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। আমাদের গ্রামে তো সবাই খুব দুঃখী। কোনওরকমে বেঁচে থাকি আমরা।

দুপুরের আগেই নদীটার জল অনেকখানি এগিয়ে এল গ্রামের ভেতর। এবং চোখের সামনে আমরা দেখতে পেলাম আমাদের চাষের জমিগুলো অন্তর্হিত হয়ে গেল প্রায় একশ ফুট জলের গভীরে। পাটখেতগুলো পাটগাছসহ অন্তর্হিত হয়ে গেল। বড় বড় নারকেল গাছ, পেঁপে গাছ, ফুলের ঝোপঝাড় অন্তর্হিত হয়ে গেল। বিকেলে অস্তগামী সূর্যের কমলা রঙটা যখন জলের ঢেউকে জাপটে ধরে শাসন করার চেষ্টা করছিল, তখন একে একে অন্তর্হিত হল আটটা বাড়ি। রাতের অন্ধকারে অবশিষ্ট জমি ও বাড়িঘর ছেড়ে আমরা পালিয়ে গেলাম অনেক দূরে। ফলে আকাশে থিরথির করে কাঁপতে থাকা তারাদের দৃষ্টির সামনে আর কী কী জলের গভীরে অন্তর্হিত হল সেটা তারারাই জানে। ভোরের আলো ফোটার পর দেখি চারদিকে শুধু নদী। একটু দূরে যে আমাদের গ্রাম ছিল, আমাদের বাড়িঘর ছিল এসবই যেন একটা মায়া, ভ্রম। ওখানে বাড়িঘর যেন কখনওই ছিল না। এতদিন আমরা শুধু স্বপ্ন দেখেছি।

চতুর্থ দিনে গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো অশ্বত্থ গাছটা অন্তর্হিত হল। অষ্টমদিনে গ্রামটার বড় বাড়ির অনেকগুলো, রাস্তা, সরকারি অফিসগুলো, হাসপাতাল, থানা ও ইস্কুল। আমাদের নিজেদের তো আর বাঁচাবার কিছু ছিল না, ফলে আমরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে যেতাম নদীটার গ্রাস করার ক্ষমতা। তখন আমরা আমাদের জমিজমা বা বাড়িঘর হারানোর দুঃখ ভুলে আচ্ছন্ন, ভূতগ্রস্ত দৃষ্টিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম নদীটার গিলে খাওয়ার দিকে। খেতে খেতে নদীটা যতই এগোতে থাকে আমরা আমাদের লোকজন ও পোষা জীবজন্তু নিয়ে আর জিনিসপাতি নিয়ে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে ততই পেছনে দৌড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। এভাবে আমরা আমাদের মূল গ্রাম থেকে প্রায় মাইল দেড়েক পেছনে পালাবার পর এক বর্ষণমুখর দুপুরে আমার ঠাকুমা হঠাৎ চেঁচিয়ে সবাইকে বলল :

'বোকা হওয়ার একটা সীমা আছে! আর কত পেছনে পালাবি? তোরা যত পালাবি, নদীটাও তত তোদের দিকে এগিয়ে আসবে। দেখছিস না? নদীটা কি তাই করছে না ক'দিন ধরে? কাল রাতে রাক্ষসীটা স্পষ্ট আমার কানে কানে বলল, ওর আসল লোভ জমি গাছপালা খাওয়া নয়, মানুষ খাওয়া। তাই যতক্ষণ সে সামনে মানুষ দেখবে ততক্ষণ ওর ছুটে আসা থামবে না।'

নদীটাও সত্যি দেড় মাইল এগিয়ে এসেছে। নদী থেকে একটু দূরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা রোগা নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা চুপ করে ঠাকুমার কথা শুনলাম। এই ক'দিন তেমন বৃষ্টি ছিল না, আজ দুপুর থেকে হচ্ছে, তবে আশ্বিনের বৃষ্টি বলে বিশেষ জোর নেই। কিন্তু জল একটু বাড়তেই নদীটার ভাঙন বেড়েছে। যা বুঝতে চেষ্টা করলে বোধবুদ্ধি অবশ হয়ে যায় তা হল, নদীটার বুকে যে গর্জে ওঠা উত্তাল স্রোত বইছে তা নয়, তবু যে কোন্‌ অন্তঃস্থিত শক্তিতে সে মাইলের পর মাইল জমি খেয়ে ফেলছে বোঝা শক্ত। গ্রামবাসীদের মতে এটা কোনও রূপকথা নয়-- নদীটার অন্ধকার তলদেশে সত্যি সত্যি হিংস্র নখর ও দাঁতওলা রাক্ষসরাক্ষসী আছে।

ভেজা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বাবা নদীর দিকে তাকিয়ে। চোখজোড়া লাল, পরপর অনেকদিন ভাল করে না ঘুমোলে মানুষের চোখ যেমন হয়ে যায়। তবে বাবা তেমন ভেঙে পড়েনি। বাবার মতে ভিটেমাটি বা জমিজমা প্রকৃতির জিনিস, নদীটাও প্রকৃতির জিনিস, তাই প্রকৃতির জিনিস প্রকৃতি খেয়ে নিচ্ছে তাতে দুঃখ করে কী লাভ। বাবার মতে এটা ঠিক খেয়োখেয়িও নয় । এটা রূপান্তর, প্রকৃতিতে যা প্রতি মুহূর্তে হয়ে চলেছে। দাদার একদম পছন্দ নয় এসব কথা। লোভী, রাগী প্রকৃতির দাদা এ ক'দিনে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে। বাবার মুখ থেকে ওসব কথা শুনে একদিন সে হেঁসো হাতে বাবার দিকে তেড়ে গিয়েছিল। দাদার রাগকে বাবা ভয় পায়। তাই এই কথাগুলো বাবা এখন বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে যাতে দাদার কানে না যায়।

'তা কী করতে হবে আমাদের?' ঠাকুমার কথার উত্তরে দাদা বলল বিদ্রুপের সুরে। বৃষ্টিতে একটু ভিজে গিয়েছিল বলে আমাদের পোষা বেড়ালটা জোরে জোরে গা ঝাড়ছিল। বৃষ্টি থেমে গিয়েছে, কিন্তু আকাশ মেঘলা।

সবাই অনেকক্ষণ চুপ। বাবাও কোন কথা বলছিল না।

'দ্যাবতাকে ডাক।' গলার গভীরে নিজের চাপা ফোঁপানিকে লুকোবার চেষ্টা করে ঠাকুমা বলল। 'নৌকো করে তিনি আমাদের নদীটার ওপারে নিয়ে যান, যাতে রাক্ষসীটার চোখের আড়ালে যেতে পারি। এবার তো ওর চোখ আমাদের পরিবারের দিকেই।'

দ্যাবতা মানে আমাদের গৃহদেবতা, বিপদে আপদে যিনি আমাদের রক্ষা করেন। কিন্তু এবার এত বড় বিপদটায় তাঁর কোনও পাত্তাই নেই। ঠাকুমা নিজে এবং বাবাও কেঁদে কেঁদে অনেক ডাকাডাকি করেছিল, সেই ভোরবেলায়, যেদিন নদীটা অতর্কিতে আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে।ন আমাদের ভিটে ও জমিজমা তখনও বেঁচেছিল। আর ঠাকুমা ও বাবা গৃহদেবতাকে আকুল স্বরে ডেকেছিল। কিন্তু তিনি দেখা দেন নি। তাঁর মনমর্জিকে আমরা আজও ভাল করে বুঝিনি।

'ঢ্যামনা।' নিচু গলায় দাদা বলল, স্পষ্টতই আমাদের গৃহদেবতার উদ্দেশ্যে, এবং অন্য কেউ হলে সে মারাত্মক সব গালাগাল দিত, ধারালো অস্ত্র হাতে ধরে হয়ত তেড়েও যেত । গৃহদেবতাকে এভাবে গালাগাল দেওয়ার ব্যাপারটা হয়ত বৌদির মনে ভয় ধরাল। সে কাছে গিয়ে দাদার হাত ধরল, তার দু'চোখে ভয়ার্ত অনুশাসন, দাদাও হয়ত বুঝতে পারল তার অন্যায় হয়েছে, ফলে সে কেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল এবং নিজের হাত থেকে বৌদির হাত সরিয়ে দিল না। আমাদের এরকম ভয়ঙ্কর বিপর্যয়, অথচ গৃহদেবতার কোনও দেখা নেই; এই ব্যাপারটা হয়ত সবারই মনকে হঠাৎ গাঢ় মেঘের মতো ছেয়ে দিল। ভীতু ও ভারাক্রান্ত মুখে আমার স্ত্রী হঠাৎ আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার হাত চেপে ধরে। ঠাকুমা বসেছিল গরুগাড়ির ছাউনির ভেতর। হঠাৎ সেখান থেকে বাবাকে নিজের কাছে ডাকল। একটু আগে আমাদের ছোট ছেলেমেয়েরা খিদের জন্য কান্নাকাটি করছিল। কান্না থামিয়ে তারা সবাই হঠাৎ বড় বড় চোখ মেলে নদীটার দিকে তিকে তাকিয়ে থাকল। আমাদের একটা সুন্দরী মুরগি দেমাকি ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে মোরগটার সঙ্গে গুলতানি মারছিল। মোরগটা হঠাৎ তাকে ছিনালিপনা ছেড়ে গম্ভীর হবার উপদেশ দিল। রক্তচক্ষু, ক্ষিপ্ত ঘোড়াটা নিজের সমস্ত বিদ্রোহ ও ভীতি ত্যাগ করে অসহায় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে নদীটার দিকে তাকিয়ে থাকল। গাইগরুটা শান্ত স্নেহের সুরে নিজের দু'মাসের বকনাটাকে কাছে ডেকে ব্যাকুল ভঙ্গিতে তার গা চাটল, তারপর তাকে বুঝিয়ে বলল এখন ওরকম ছোটাছুটি করতে নেই, কারণ আমরা সবাই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে চলেছি। বেড়ালটা লেজ উঁচু করে করুণ দৃষ্টিতে আমার স্ত্রীর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল জলে ডুবে মরে গেলেও সে আমার স্ত্রীকে কখনওই ভুলবে না, কারণ অতখানি অকৃতজ্ঞ সে নয়। এটা ঠিক যে আমাদের পরিবারে আমার স্ত্রীই বেড়ালটাকে সবচেয়ে ভালবাসে। মাদা হাঁসটা একটা মাদি হাঁসের পিঠে ওঠার চেষ্টা করছিল। কপট রাগ দেখিয়ে ও লাজুক হেসে মাদি হাঁসটা তাকে পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল এখন ওসব করার সময় নেই, বেঁচে থাকলে ওসব করার ঢের সুযোগ পাবে।

নদীর বুক থেকে মৃদু গর্জন ভেসে আসছে, আর মাঝেমাঝে শোনা যাচ্ছে বড় বড় মাটির চাঁই ভেঙে জলের তলহীন গভীরে পড়ার শব্দ। তীর জুড়ে অন্যান্য গ্রামবাসী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। তারা রহস্যপূর্ণ ভাঙনটা দেখছে। কিংবা হয়ত নিরাশ মুখে অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয়তম মানুষটির শবদেহ হাজার হাজার বছর ধরে অতলান্ত সামুদ্রিক গাছপালার ফাঁক দিয়ে ভাসতে ভাসতে, অসংখ্য নদীর ভেজা বালির ভেতর দিয়ে ভাসতে ভাসতে আজও তীরে এসে পৌঁছল কিনা দেখতে। চারদিকে এই সাময়িক নৈঃশব্দ্য ছিঁড়ে হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে এক আধপাগলি বুড়ির কান্না। গত পরশু তার দোতলা বাড়িটা নদীর ভেতর মিলিয়ে যাওয়ার পর তার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।

আর ঠিক তখনই আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি অনেক দূরে নদীর ওপর দিয়ে ভেসে আসছে একটি বিপুল কালো নৌকো, যা নাকি কোনও পাহাড় দুমড়ে- মুচড়েই তৈরি করা হয়েছে। আরও কাছে এগিয়ে আসার পর নৌকোটার আয়তন এত বড় দেখাতে লাগল যে বিস্ময়ে আমরা কেমন অসাড় বোধ করলাম। নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের গৃহদেবতা। আমরা সাবধানে জলের দিকে ছুটে গেলাম।

ক্রমাগত ভেঙে পড়া অস্থির তীরে নৌকোটাকে কোনওরকমে ভিড়িয়ে তিনি পাড়ে দাঁড়ানো সমস্ত গ্রামবাসীর উদ্দেশে বললেন যে ইচ্ছে করলে তারাও নৌকোয় উঠে পড়তে পারে। গ্রামবাসীরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। কিন্তু কেউই উঠতে রাজি হল না, কারণ তাদের কারও কারও বাড়িঘর বা জায়গাজমি এখনও বেঁচে আছে, ফলে ওসব ছেড়ে তারা এখ্নই অনত্র চলে যেতে চায় না। আর কেউ কেউ সরল অথচ স্পষ্ট কথায় জানাল তিনি তাদের গৃহদেবতা নন, তাদের প্রত্যেক পরিবারেই আলাদা আলাদা গৃহদেবতা আছেন, তাই পরের গৃহদেবতার সাহায্য গ্রহণ করে তারা নিজেদের গৃহদেবতাদের রুষ্ট করতে পারে না।

আমাদের গৃহদেবতা হাসলেন। তারপর আমাদের ইঙ্গিত করলেন নৌকোয় উঠে পড়তে।

হুলস্থুল পড়ে গেল। প্রথমেই মোরগটা নিজের সাতটা পত্নী নিয়ে উড়ে গিয়ে নৌকোর পেছন দিকে তোলা খুব উঁচু ছাউনিটার সবচেয়ে উঁচু অংশে বসল। তারপর পাড়ের মাটি শুঁকতে শুঁকতে এবং জল দেখে ভয়ে ইতস্তত করতে করতে বেড়ালটা হঠাৎ অব্যর্থ লাফ দিয়ে নৌকোটার পাটাতনে পড়ল। তারপর আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলতে লাগল, 'চলে এসো, ভয়ের কিছু নেই! এই তো আমি কেমন চলে এলাম, ভয়ের কিছু নেই!' এরপর আমরা একে একে নামতে লাগলাম নৌকোয় : বাবা, ঠাকুমা, মা, দাদা, বৌদি, তার ছেলেমেয়ে, আমার ছেলেমেয়ে, ঘোড়াটা, আমার স্ত্রী, বাছুরসহ গাইগরুটা, আমি, মালপত্র নিয়ে গরুর গাড়িটা, একজোড়া ছাগল, হাঁসগুলো, আমাদের বাড়ির পায়রাগুলো, ইঁদুরগুলো, টিকটিকিগুলো, আরশুলাগুলো ও মাছিগুলো। সবাই ওঠার পরও দেখা গেল নৌকোটার সবটাই প্রায় খালি। আমি খুশি হতাম যদি অন্য গ্রামবাসীরাও নৌকোয় চাপতে রাজি হত। নিশ্চয়ই সমস্ত গ্রামটার কথা ভেবেই নৌকোটার আয়তন ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু না ওঠার পেছনে যে তাদের যুক্তি আছে, ফলে উঠতে তারা ভয় পাচ্ছে। তবু নৌকোটার চারপাশের খালি অংশগুলো আমার ভেতর কেমন শুন্যতাবোধ সৃষ্টি করছিল। আবার, আমার নিজের মানুষজন ও জীবজন্তুদের নিয়ে অনুভব করছিলাম একটা নিরাপত্তাবোধও। এক মুহূর্তের জন্য আমি হঠাৎ এমন অভিভূত হয়ে পড়লাম যে জলের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির কথা ভুলে গেলাম। এবং এই নৌকোটা করেই কয়েক দিন বা কয়েক ঘন্টা জগৎ ভ্রমণ করিয়ে আমাদের গৃহদেবতা যদি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন এবার আমাদের নৌকোকে অনন্তকালের জন্য পাতালের জলে ঠেলে দেবেন, আমার অন্তত কোনও অনুতাপ থাকবে না। জীবন নিয়ে মনের ভেতর হঠাৎ গভীর নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি হলে মানুষ মনে হয় আর মরতেও ভয় পায় না। নৌকোকে ছেড়ে দিলেন গৃহদেবতা। আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভবে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল আমার সমস্ত মন। এই গ্রামেই তো সেই কবে একদা জন্মেছিলাম, এবং আকাশটা ঘন কালো মেঘে ঢাকা তখনও। হয়ত একটু পরেই আবার আশ্বিনের ক্ষণজীবী বৃষ্টিটা শুরু হবে। গ্রামবাসীদের কেউ হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছিল না। আমরাও কেউ হাত নাড়াতে পারছিলাম না। পরস্পরের মুখের দিকে সবাই শুধু তাকিয়ে থাকলাম ম্লান আচ্ছন্ন অনড় দৃষ্টিতে।

তীর ছেড়ে নৌকো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গভীর জলের দিকে। জলের ওপর যে জায়গায় আমরা এখন নৌকোয় বসে আছি সেখানে কয়েকদিন আগে কারও একতলা কারও দোতলা বাড়ি ছিল, কারও প্রশস্ত উঠোন ছিল, ইট দিয়ে ঘেরা ফুলের বাগান ছিল। আমাদের নিজেদের বাড়িঘর যে ঠিক কোন্‌ জায়গায় ছিল তা বোঝার জন্য আমি মুখ ঘুরিয়ে পেছনদিকে তাকালাম। পেছনে শুধু জল, গভীর নদী, ঠিক কোন্‌ জায়গায় ছিল আমাদের বাড়িটা? বোঝা শক্ত। চোখের দৃষ্টি আবার সামনে ফিরিয়ে নেবার সময় ঠাকুমার সঙ্গে চোখাচোখি হল, অভয়ের হাসি হাসল ঠাকুমা, আর ভয়ের কিছু নেই, তারপর দাঁড় ধরে নৌকো চালাতে ব্যস্ত গৃহদেবতার দিকে তাকিয়ে থাকল চাপা অভিমানী দৃষ্টিতে। আমার সবচেয়ে ছোট ছেলেটা হয়ত তখনও ভয় পাছিল। সে টলতে টলতে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই চোখে পড়ে হঠাৎ, আমারই চোখে প্রথম পড়ল : ছেড়ে যাওয়া তীরের অপেক্ষকৃত এক নির্জন জায়গায় অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করতে করতে আমাদের পোষা কুকুরীটা নৌকোর দিকে তাকাচ্ছে। সে কোথায় ছিল এতক্ষণ? সকালেও তো আমাদের সঙ্গেই ছিল, তারপর কোথায় চলে গিয়েছিল? নৌকোয় একে একে ওঠার সময় আমরাও বা কী করে ওর কথা ভুলে গেলাম?

'এই দাঁড়াও, আমরা ওকে ভুলে গিয়েছি।'

সবাই তাকাল অনতিদূর তীরের দিকে। সবাই চিনতে পারল আমাদের কুকুরীটাকে।

বিস্মিত চোখে ঠাকুমা নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে ক্রমাগত সহানুভূতিসূচক শব্দ বার করে গেল।

'হারামজাদিকে পই পই করে বললাম এখন পাড়া বেড়াতে যাসনে--কখন যে কী হয়!' ঠাকুমা বলল ক্রোধ ও মায়া মেশানো অদ্ভুত গলায়।

সবাই ঠাকুমাকে সমর্থন করল।

'এত নাগর জোটালে এরকমই হয়।' খুব উঁচু ছাউনিতে বসে থাকা মুরগিদের একজন গলা বাড়িয়ে বলল। 'কখন যে কার মন রাখতে ছুটে যেতে হয়! কাল সকালে আমি নিজে দেখেছি পেছনে এগারটা কুকুর নিয়ে দুলে দুলে চলেছে।'

'হারামজাদি বলে হারামজাদি!' ঠাকুমাকে তোষামোদ করার ভঙ্গিতে বেড়ালটা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল। 'এই বিষ্যুৎবারের আগের বিষ্যুৎবারের আগের বিষ্যুৎবারের কথা--আমার স্পষ্ট মনে আছে। একটা পুঁটিমাছ খাচ্ছিল। আমি একটু বললাম, মাথাটা তুই খা, শুধু লেজটা আমাকে দে। তা হারামজাদিটা ডাইনির মতো দাঁত বার করে তেড়ে এল। আমার কথা বিশ্বাস কর মা, ও কিন্তু কুকুরীর বেশে কোনও ডাইনিই।'

হাঁসগুলোর সঙ্গে বেড়ালটার খুব ভাব। তারা নৌকোর পাটাতনের নিচে জমা জলে জড়সড় হয়ে বসেছিল। বিরক্ত হয়ে তাদের একজন বেড়ালটার উদ্দেশে বলল, 'বড্ড চেঁচাস তুই! তোর কথা কে অবিশ্বাস করছে?'

ডাইনি তো কেউ কখনও দেখেনি, পশুরাও না, ফলে ঘোড়াটা বলদদুটো ছাগলদুটো পায়রাগুলো ইঁদুরগুলো টিকটিকিগুলো আর ছেলেমেয়েদের সবাই গলা বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখতে লাগল আমাদের কুকুরীটাকে, যাকে নাকি সবাই চেনে। এবং যে ঘনায়মান কালো আকাশের নিচে আর নির্জন পাড়টার কিনারে কখনও সামনের পা দুটো ফাঁক করে দাঁড়াচ্ছে, কখনও অস্থিরভাবে একবার বাঁয়ে একবার ডাইনে দৌড়তে দৌড়তে আমাদের নৌকোটার দিকে তাকাচ্ছে। ভয়ে সে এতই দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল যে মুখ দিয়ে কোনও শব্দ পর্যন্ত করতে পারছিল না।

'ও ডাইনি নয়, হিংসুটে বেড়ালটা চায় ও মরুক। ওর পেটে বাচ্চাও আছে।' বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে আমাদের গাইগরুটা বলল। কুকুরীটা যে অন্তঃসত্ত্বা সেটাও আমাদের খেয়াল ছিল না।

'নৌকোটা ভিড়িয়ে ওকে তুলে নাও!' আমি বললাম।

'গাধার মতো কথা বলিস না!' দাদা খেঁকিয়ে উঠল আমার দিকে তাকিয়ে। তারপর আদেশের সুরে গৃহদেবতার উদ্দেশে বলল, 'আপনি চলুন।'

দাদাকে সবাই ভয় পায়, সম্ভবত গৃহদেবতাও, ফলে সবাই চুপ করে থাকে। নৌকো এগিয়ে চলেছে। তার সঙ্গে তাল রেখে পাড় দিয়ে কুকুরীটাও দৌড়চ্ছে। একবার নিচু হয়ে সে সামনে পা দিয়ে মাটি আঁচড়াল। কী ভেবে হঠাৎ একটু পেছন দিকে কয়েক পা দৌড়ল। তারপর নৌকোটার দিকে তাকাতে তাকাতে তীরের পাশ দিয়ে দৌড়তে লাগল।

নৌকোয় অনেকক্ষণ পূর্ণ স্তব্ধতা। পশুগুলোও চুপ। তারা হয়ত ভয় পাচ্ছিল বেশি কথা বললে দাদা তাদের একে একে ধরে জলের ভেতর ছুঁড়ে দেবে।

'তোমরা চল। আমি ওকে সাঁতরে নিয়ে আসছি।' আমি বললাম, কারণ কথাটা বলার জন্য কেউ যেন আমার স্নায়ুর অন্ধকারে বসে দুর্মর ভাবে চাপ দিচ্ছিল আমাকে।

সবাই অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে। ঠাকুমা ধমক দিতে লাগল। মা চেঁচিয়ে গালাগাল দিতে লাগল। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা ফুঁপিয়ে উঠল। শান্তভাবে আমি তাদের বোঝালাম ভয়ের কিছু নেই, পাড় থেকে নৌকোটা তো খুব বেশি দূরে যায়নি, আমি ওকে ঠিক নিয়ে আসব সাঁতরে।

'যাচ্ছে যাক না। যতক্ষণ না ফিরে আসছে ততক্ষণ নৌকোটা না হয় আস্তে আস্তে চলুক।' দাদা বলল হঠাৎ খুব চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মতো বুঝদার গলায়।

দাদা আমাকে কখনওই ভালবাসেনি।

জলে নামার জন্য আমি যেদিকে গৃহদেবতা দাঁড় বাইছিলেন সেদিকে এগিয়ে গেলাম, কারণ ওখান থেকে নামা বা আস্তে করে ঝাঁপ দেওয়া বেশি সুবিধেজনক। ওখান থেকে পাড়ের দূরত্বটাও কম।

'এরকম গভীর জলে ওকে নিয়ে সাঁতরাতে পারবে?' শান্ত, স্নিগ্ধ গলায় হঠাৎ গৃহদেবতা জিজ্ঞেস করলেন আমাকে। তাঁর মুখটা আমার এত ভাল লাগে যে একবার তাকালে অনেকক্ষণ আর চোখই ফেরাতে পারি না। এবং অন্যদের হলেও আমার নিজের কখনওই তাঁর ওপর কোনও অভিমান হয়নি।

'পারব মনে হয়।' সঙ্কুচিত হেসে তাঁর দিকে না তাকিয়ে বললাম।

'যদি ভেসে যাও?'
'দেখি চেষ্টা করে।'
'যদি কুকরীটা ভেসে যায়?'
'কী জানি। দেখি চেষ্টা করে।'
'কেন এই পাগলামো করছ? কুকরীটার কথা কি এখন ভাবার সময়?'
'এখন যদি নাও ভাবি, পরে যে সারা জীবন ওকে নিয়ে প্রায়ই ভাবতে হবে। সে ভাবনা থেকে যে নিস্তার পাব না।'
'কী ভাবনা?'
'যে ওকে আমরা নদীর গ্রাসের সামনে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম।'
'তা সেটা তো বাধ্য হয়েই।'
'কিন্তু ভাবনাটা তো তবু মনকে ছড়বে না। গরম লোহার মতো করে মাঝে মাঝে ছ্যাঁকা দেবে মাথায়। কখনও যে আর ভুলতেই পারব না পাড়ে ওর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা।'

'মনে পড়বে। আবার কাজকর্মে ভুলেও যাবে। এভাবেই তো মানুষ বাঁচে।'
 'ওরকম করে বাঁচতে আমি হয়ত সুখ পাব না। বাঁচতে আমার ভাল লাগবে না যে! হয়ত প্রায়ই মৃত্যু কামনা করব নিজের। নিজেকে তো আমি চিনি।'
'কেমন হলে বাঁচতে ভাল লাগে?'
'গভীর কোনও অনুতাপের ক্ষত কোথাও না থাকলে। ওটার গ্রাস করার ক্ষমতা যে এই নদীর গ্রাস করার ক্ষমতার চেয়েও বেশি।'

এত কথা আমি গৃহদেবতার সঙ্গে আমি কখনওই বলিনি। সঙ্কোচে কেমন আড়ষ্ট লাগছিল।

'আপনি নৌকো চালান, আমি আসছি।'

বলে আমি ঝাঁপ দিলাম জলের ভেতর, যা হয়ত ষাঠ ফুট গভীর বা একশ ফুট কিংবা এক হাজার ফুট, যা আমার কাছে সমার্থক, কারণ আমার নিজের উচ্চতা তো মাত্র পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। সাঁতার আমি খারাপ কাটি না, ফলে মাথা সোজা করে এবার ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করলাম। তারপর কয়েকবার হাত ও পা চালালেই পাড়ে পৌঁছে যাব, খুব বেশি দূরে পাড়টা নয়। কিন্তু হতভম্ব হয়ে লক্ষ করলাম ওপরের দিকে আমি উঠতেই পারছি না। জলের অন্তঃস্রোত আমার মাথার ওপর দিয়ে ভয়ঙ্কর ভারী কোনও ঝড়ের মতো বয়ে চলেছে। সেই অন্তঃস্রোতে আমি ডিগবাজি খেতে লাগলাম। তবু প্রাণপণ চেষ্টা করে গেলাম পাড়ের দিকে নিজেকে ঠেলার। তারপর হাঁপিয়ে উঠে হাল ছেড়ে দিয়ে স্রোতের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। একবার কুকরীটার কথা মনে পড়ল আমার ক্রমহ্রাসমান স্মৃতিতে। একবার দাদার।

জলের অনন্ত গভীরতার ভেতর দিয়ে আমি ভেসে চললাম। আমি বোধহয় মারাই গিয়েছি, কারণ এতক্ষণ ধরে তো কেউ জলের তলায় থাকতে পারে না। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কতক্ষণ পর বলা শক্ত (কারণ সময় সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন মূক অন্ধ বধির মানুষের জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানের মতই), হঠাৎ কারও আঙুলের স্পর্শ পেলাম আমার ভাসতে থাকা শরীরে। ধীর ভঙ্গিতে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলাম আমাদের গৃহদেবতাও জলের গভীরে নেমে এসেছেন।

'কী করব, আমি যে আর ওপরের দিকে উঠতেই পারলাম না।' সঙ্কোচের সঙ্গে বললাম।

কোনও কথা না বলে তিনি আশ্চর্য হাসিতে মুখ ভরিয়ে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আমার একটা হাত ধরে জলের গভীরে ভেসে বেড়াতে লাগলেন। কোনও কথাই তিনি আর বলছিলেন না। আমিও কোনও কথা বলছিলাম না, যদিও সাঁতরে ওপরের দিকে ওঠার ব্যাপারে আমার ব্যার্থতা ও অসহায়তা আমি বারবার অনুভব করছিলাম, আর তাঁকে সেটা আবার বলতে ইচ্ছে করছিল।

আমার হাতটা ধরে তিনি জলের আরও গভীরতর স্তরের ভেতর দিয়ে ভাসতে লাগলেন। নিমজ্জিত বাড়িগুলো চোখে পড়তে লাগল, যেন তুমূল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ওগুলো কোনও মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ওদের খুলে নেওয়া জানলা ও দরজার ফাঁকগুলোর ভেতর দিয়ে আমরা ভেসে গেলাম। সন্ন্যাসীর জটার মতো ভাসতে থাকা গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো বটগাছটার শেকর ও ঝুরিগুলো দেখলাম। কারও উঠোনের তুলসীবেদীটা দেখলাম। ভেতরে পোঁতা তুলসীগাছটার পাতাগুলো ছোট ছোট নরম আঙুলের মতো নড়ছিল। একটা কাঁসার থালাটাকে দেখলাম ডিগবাজি খেতে খেতে মেঘের ভেতর দিয়ে অস্পষ্ট চাঁদের মতো ভেসে যাচ্ছে।

'আবার কেউ স্মরণ করছে আমাকে। ওপরে যেতে হবে।' গৃহদেবতা হেসে বললেন। 'কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে।'

আরও অনেকক্ষণ আমার হাত ধরে তিনি ভেসে বেড়ালেন। ওপরে সম্ভবত একবার বৃষ্টিও হল।

'এবার যে আমাকে যেতেই হবে।'

বলে আস্তে আস্তে নিজের আঙুল আলগা করলেন আমার আঙুলের বেষ্টনী থেকে। আমার ভেজা চুলে একবার হাত বোলালেন। তারপর সুন্দর সাবলীল অনুপম ভঙ্গিতে জল ঠেলে ঠেলে ওপরের দিকে উঠে যেতে লাগলেন।

তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি কাঁদলাম। আমি হাসলাম। তারপর জলের ভেতর বালির অণুপরমাণু নামার মতো করে আস্তে আস্তে ভেসে যেতে লাগলাম নদীটার শান্ত বিছানার দিকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন