বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র গল্প : শাল


সে বার ধানের ফলন বেশ ভালোই হওয়ায় শ্রীবিলাস নিজের পুরনো তূষের চাদরটি ছোট ছেলেকে দিয়ে নিজের জন্য একটি সাদা খদ্দরের চাদর কিনলেন। সকালের কাজকম্মো সেরে সেটি গায়ে দিয়ে যখন রোদ্দুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসলেন সেই সাদা চাদরে আলো খেলে গেল।

ছোট ছেলেকে তার মা পুরনো নস্যি রঙা চাদর বাঁদিক ডানদিকে ফেলে ঘাড়ের কাছে বেঁধে দিয়েছে। বড়দের চাদর তার মাথা থেকে হাঁটুর তলা অব্দি ঢেকে গেছে, মায় হাফ প্যান্ট অব্দি। ওরকম বাঁধা অবস্থায় ঠুঁটো জগন্নাথটি হয়ে সে বাবার ধপধপে সাদা চাদরের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। অবশ্য বেশিদিন ছেলেটিকে বাবার চাদরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়নি, দ্বিতীয়দিনই শ্রীবিলাস চাদরটির কোনায় কাদা লাগিয়ে ফেলেন এবং স্ত্রীর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছোট ছেলের তূষের চাদরের গিঁট খুলে টান মেরে নিয়ে নতুন সাদা চাদরটি ছেলের গায়ে জড়িয়ে দিলেন। এবং হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন--
“ আমার কি এসব বাবুগিরি মানায় রে খোকা, ও তুই গায়ে দে”

এবার খোকাকে পায় কে! তেলচিটে পুরনো চাদর সে সামলাতে পারতো না খালি পিছলে নিচের দিকে নেমে যেত, মা কে পরিয়ে দিতে হতো। কিন্তু খদ্দরের চাদর সে পুরোটা না খুলে দুভাঁজ করে নিজে নিজেই গায়ে দিতে পারছে।এই চাদর গায়ে দিয়ে আফ্রিকার জঙ্গল আর চাঁদের পাহাড় পেরিয়ে খোকা ম্যাট্রিক পাশ করে যেবার শহরের কলেজে পড়তে গেল, মা তার প্যাঁটরায় যত্ন করে সেই চাদরখানি গুছিয়ে দিলেন। শীত আসায় খোকা চাদর বার করে দেয়ালে টাঙানো দড়িতে ঝুলিয়ে রাখে। আর ওইটেই হয় কাল। কলেজে হোস্টেলে যত দাদা শ্রেণীর ‘ন্যাতা’রা ছিল বক্তৃতাবাজীর জন্য প্রায় রোজই সেই চাদরটা তাদের দরকার হতো।

“ এ্যাই তর একখান সাদা চাদর আসে না? ওইখান আজ লাগব” এইভাবে প্রায়েই খোকার সাধের চাদর উধাও হতে লাগল। তাও মাঝে মধ্যে পেলে খোকা সে চাদরে ওম কুড়োত খানিক। মুখে মুখে চাদরের পদোন্নতি হয়ে নাম হলো ‘শাল’। আর শাল নাম হতেই তা একদিন ইঁদুরেরও প্রিয় হয়ে ওঠে, আর তাতে দুটো ফুটো ডিজাইন হয়ে ওঠে। অবশ্য তাতে তেমন অসুবিধ হয়নি। এদিক ওদিক করে ভাঁজ করে কাঁধে ফেলার কাজ ঠিকই চলতে লাগল। একদিন সন্ধ্যে নামার মুখে শাল গায়ে খোকা হলে ফিরছে, শিউলি এসে ধরে তাকে – তোমার অর্ধেকটা শাল আমারে দাও তো শী্ত লাগে”। শিউলি খুব ডাকাবুকো, খোকা না করতে পারেনা, এক শাল দু’জন জড়ায় আর সেই প্রথম খোকা শিহরিত হয় উষ্ণ অথচ নরম কিছুর ছোঁয়ায়।

যৌবনের পাঠ শেষ করে খোকা যশোরে আসে চাকরি-সূত্রে, শাল-সহকারেই। যশোরে এসে সেই শাল প্রীতি যেন আরো বাড়লো। এত বছর নেতাদের ব্যবহারে শাল হয়ে পড়েছে বেশ নরম আর ন্যাতানো, গায়ে দিলে লাগে মাখন আদর। মাঘের শীতে লেপের নিচেও খোকা গায়ে শাল জড়িয়ে ঘুমোয়। রাতে দুই মেয়ে সুড়সুড় করে সেই চাদরে ঢুকে পড়ে। টুকি দেয় শালে ফুটোয়।

শীতের দেশের ডাকে সাড়া দেবার পর জিনিসপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর্ব শুরু হয়েছে। খোকার বউ হাঁড়ি-কড়া, ছাঁকনি, খুন্তি একের পর এক এগিয়ে দেয় আর তার ভাই দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন করে। শিল-নোড়ায় হাত দিতেই ভাই চমকে ওঠে – নারে দিদি ওইটা নেওয়া লাগবে না। এইভাবে খোকার বউএর ভাই অনেক কিছু ছাঁটাই করে নিয়মমাফিক ওজনের বাক্স গুছিয়ে দেয় দিদি-জামাইবাবু আর ভাগ্নিদের জন্য। সবাই মিলে বিমানে উড়ে এসে জুড়ে বসে বিদেশবিভূঁতে। খোকার মন ভালো থাকে না, বউ সব বুঝিয়ে দেয়, দেখিয়ে দেয়, তবু সে প্রায়েই হারিয়ে যায়। ঝাঁ-চকচকে পেল্লায় সব গাড়ি-বাড়ি দেখে তার মন কাঁদে তাদের গ্রামের বাড়ির রান্নাঘরের উনুনের পাশটির জন্য। যেখানে বসে তার মা গরম ভাত নামিয়ে একটু হলুদবাটা কাচালঙ্কা ডলে মেখে দিত। উদাসমুখে মাঝবয়েসি খোকা ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। তুষার-ঝড়ে পড়ে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফেরে। ফিরে কাঁপতে কাঁপতে খোঁজে প্রিয় শাল।

1 টি মন্তব্য: