বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

শেখ তাসলিমা মুন'এর গল্প : রূপান্তরের গল্প

প্লেনে উঠে সংকীর্ণ একটুখানি সিটে কোন রকমে বসে পড়ে রেশমী। বসে পড়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা তার। সংকীর্ণ চাপা সীটগুলোর মাথার উপরে হ্যান্ড লাগেজ রাখায় সবাই ব্যস্ত। যে যার জায়গা খুঁজে পেতে মরিয়া। এতটুকুন তর সইছেনা কারো। রেশমী নিজের সীটটি দেখতে পেয়ে নিজেকে কোনমতে প্রবেশ করিয়ে ছেড়ে দেয় নিজেকে। আহ! মনে হয় কয়েক বছর পর যেন বসলো সে।শেষ মুহূর্তে একগাদা ঝামেলা। দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছিল। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে রাত ১২ টায় বাসায় পৌঁছুনো, তাতেও কাজ বাকী থেকে গেছে।
বেশির ভাগ সময় গেছে জ্যাম আর কাদায়। পেছনে পড়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। রেশমী উড়বে দূর আকাশে। স্বল্পখরচের এ এয়ার ক্রাফটের সংকীর্ণ জায়গাটিতে বসে রেশমীর হঠাত মনে হয় কি আশ্চর্য এমুহূর্তে তার হাতে কোন কাজ নেই। এখন শুধু বসে বসে একটি ভয় ও অস্বস্তিকর অনুভুতিকে কাছে নিয়ে আসা। তার সামনে দাঁড়ানো। এ কদিন মনে তাকেই এড়াতে সে দিনরাত কাজে ব্যস্ত রেখেছিল নিজেকে। 

জীবনে এই প্রথম বিমানে চড়া। নার্ভাস। তবে ভয় লাগছেনা রেশমীর। পাশের যাত্রী একজন পুরুষ। অনেকক্ষণ পাশাপাশি এত ঘেসাঘেসি বসে থাকতে হবে ভেবে অস্বস্তি লাগছে রেশমীর। কিছু করার নেই। যতটা সম্ভব দূরত্ব নেওয়া যায় রেশমী সেভাবে বসে আছে। এতটা সময় কিভাবে যাবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন রেশমীর। ভদ্রলোক ইতিমধ্যেই জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন রেশমী কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে। যদিও রেশমী জানতে চায়নি তবু তিনি নিজে থেকে বলেছেন, তিনি লন্ডন বিজনেস পারপাজে যাচ্ছেন এবং প্রায়ই তাকে কাজে লন্ডন যেতে হয়। রেশমী সাথে একটি বই রেখেছে। ভাবছে পড়া শুরু করবে কিনা। একটু দেরী করা যাক। ট্রেতে করে এয়ারহস্টেজ জুস বন্টন করছে। এক টুকরো ওয়েট টিস্যু পেয়েছে হাত মুখ মুছতে। আহ! জুস না হলেও এটি দরকার ছিল রেশমীর। মুখ আর হাত খুব আরাম করে মুছে নেয় রেশমী। 

এক মাথা চুল উঁচু করে খোঁপা বাঁধা। ক্রিম কালারের থ্রিপিস পরনে। কালই নিউমার্কেট থেকে কিনেছে। এই প্রথম পরেছে রেশমী। দু হাতে এক ডজন করে ম্যাচ করা চুড়ি। চুড়িগুলো টুংটাং করছে। রেশমী অস্বস্তি বোধ করছে। অন্যদের ডিস্টার্ব হচ্ছে মনে হয়। খুলে ফেলবে নাকি? খুলে আবার রাখার সমস্যা। পাশের ভদ্রলোক এবার বম্ব ফাটালেন, ‘আপনাকে বেশ সুন্দর লাগছে।‘রেশমী খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। এ কথার কি উত্তর দেওয়া যায়? সে কি সীট বদল করবে? কনফ্লিক্টে যেঁতে চাচ্ছেনা রেশমী। চুপচাপ বসে থাকে। ‘ নতুন বিয়ে হয়েছে? স্বামীর কাছে যাচ্ছেন?’। রেশমী আবারও অস্বস্তিতে পড়ে। এবার উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ’। 

-ইয়াং ব্রাইড! অনেক অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে আপনার। 

- আমি অনার্স ফাইনাল দেবো। আমার বয়স কম নয়।

ভদ্রলোক মুচকি হাসছে। খাবার এসে গেছে। এয়ারহস্টেজগুলো সাদা এবং বিশাল আকৃতির। লম্বা চওড়া। আপেলের মত গালে লাল রঙ। রঙটা অরিজিনাল না রুজ রেশমী বুঝতে পারেনা। টুংটাং ছুরি কাটলারিজের শব্দ। এয়ারহস্টেজ শীতল হাতে খাবারের ট্রে নামিয়ে রাখছে। মুখে কোন অভুব্যাক্তি নেই। অভ্যস্ত হাতে গ্লাসে জুস ঢালছে, আইস মেশাচ্ছে। নিচু হয়ে আরেক যাত্রিকে জিজ্ঞেস করছে কি মিল কি ড্রিংক্স তার চাই। রেশমী মনে মনে মুখস্ত করছে কি বলবে সে। চিকেন ছাড়া কিচ্ছু নেবেনা সে। বলা যায়না শুকোর টুকোর এখনও সে খায়নি। প্লেনে উঠেই এ জিনিস খেতে পারবেনা সে। 

সাদা এক টুকরো চিকেন সাথে মাখন দিয়ে মাখা একটু ভাত। ছোট ছোট বক্সের ভেতর এক সুন্দর করে দেওয়া রেশমী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। একটি গোল রুটি। একটু লেটুস। নরম তুলতুলে এক টুকরো কেক। 

- এনজয় ইয়ুর মিল। পাশের সীটের সহযাত্রী উইশ করেন। 

চিকেনের রঙ দেখে রেশমী ঝামেলায় পড়ে যায়। সাদা। চিকেন রোস্টের মত নয়। একেবারে সাদা একটুকরো চিকেন। গোলমরিচ থাকতে পারে সাথে। সাবধানে এক চামুচ রাইস মুখে দেয়। মোটা ভাত মাখন মাখানো। বেশ ভাল লাগছে রেশমীর। ভাতটুকুন খেয়ে কেকটি মূলত রেশমী আনন্দ করে খেয়ে ট্রেটি গুছিয়ে রাখলো। 

- খাওয়া শেষ? 

- হ্যাঁ।

- সে কি? এত অল্প খেলে হবে কি করে? 

রেশমী কথা বাড়ায়না। দুচোখে এবার ঘুম নেমে আসছে। অনেক ঘুম। মনে হয় অনেকদিনের ঘুম। কতদিন যেন সে ঘুমুতে পারেনি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে রেশমীর। 

কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতো জানেনা রেশমী। 

- এই যে শুনছেন? আর কতক্ষণ ঘুমুবেন? ব্রেকফাস্ট এসে গেছে। উঠুন। 

রেশমীর ঘুম ভাঙলেও দম বন্ধ হয়ে যায় দেখে যে সে ঐ ভদ্রলোকের ঘাড়ে এতক্ষন ঘুমিয়ে ছিল। উফ! এর থেকে মরে গেলনা কেন রেশমী? ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা! জীবনে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সে কি আর পড়েছে? মরমে মরে যেতে যেতে মরিয়া হয়ে রেশমী বলতে থাকে। আই অ্যাম সো স্যরি! আমি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত ছিলাম। আমি অত্যন্ত লজ্জিত। আমি দুঃখিত।

- কেন? এত ক্ষমা প্রার্থনার কি হয়েছে? আমিতো দেখছিলামই আপনি কত ক্লান্তভাবে ঘুমুচ্ছিলেন! এতে দোষের কিছু নেইতো। আমার কাঁধে কোন সুন্দরী নারী ঘুমায়নি আজও। আমি বিষয়টিতে অনারড ফিল করছি। 

রেশমীর মরে যেতে ইচ্ছে করে। সে নববিবাহিত। স্বামীর কাছে যাচ্ছে। যে স্বামীর কাঁধে সে কোনদিন ঘুমায়নি। কি ভয়ানক উদ্ভট ঘটনাটা সে ঘটিয়ে বসছে। যা শুধরানোর কোন পথ নেই। এ ঘটনাটি কি সে স্বামীকে বলতে পারবে? রেশমী জানেনা। তাকে সে এখনও চেনেনা। তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে কাঠ হয়ে বসে থাকলো। 

স্টপ ওভার। ছ ঘণ্টা অপেক্ষা। চমৎকার সব দোকানপাট। রেশমী ঘুরছে। কত জিনিস উপচে পড়ছে। তার চোখ ধাঁধানো সব সামগ্রী। স্বর্ণের দোকানের সামনে গিয়ে ভিম্রি খেলো সে। আরে। এখানে দেখি ভারতীয় শাড়ী সালোয়ার কামিজ শালেরও দোকান আছে! কিনবেনা রেশমী তবু দোকানটিতে ঢুকে দেখে। সময় কাটাতে হবে। রাতের ঘটনাটি ভুলতে এখন তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। ভদ্রলোক তার নিজের ডেস্টিনেশনের দিকে চলে গেছে। যাওয়ার আগে রেশমীকে সুখী সমৃদ্ধ দাম্পত্যজীবন উইশ করেছে অনেকবার। কোন অসুবিধা হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে বারবার বলে গেছে। দেখিয়ে দিয়ে গেছে ইমিগ্রেশনের পথ। সমস্যা নেই সমস্যা নেই বলেও বিচলিত বোধ করেছে রেশমী। ভদ্রলোক যাওয়ার সময় বারবার পিছু ফিরে তাকিয়েছে। তার চোখ চিক চিক করে উঠেছে ভুল কিনা রেশমী জানেনা জলে। ওহ! কি বিব্রতকর অবস্থা। রেশমীর মনে হচ্ছিলো, ভদ্রলোক চোখের সামনে থেকে চলে গেলে সে হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু এখন তার খারাপ লাগছে। গলার কাছটায় কিছু দলা পাকিয়ে উঠছে। একি আশ্চর্য! সে নববিবাহিত। স্বামীর কাছে যাচ্ছে। সেখানে স্বামী তার বড় পার্টি আয়োজন করে অপেক্ষা করছে। বিদেশ বিভুইয়ের বধূবরণের আয়োজন চলছে। সেখানে তার বন্ধু স্বজনও রয়েছে তার অপেক্ষায়। রেশমী অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, তার ভেতরটা শূন্য লাগছে। দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করছে ভদ্রলোকের কাছে। সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে। নিজের আচরণের কোন ব্যাখ্যা মেলেনা তার কাছে। কিছুক্ষন পাশাপাশি বসা মাত্র। অতিরিক্ত ক্লান্তির জন্য ঘুমিয়ে পড়া। খুব সংকীর্ণ সীটের কারনে হেলে তার দিকে কাত হয়ে পড়েছিল মনে হয় রেশমী। ভদ্রলোক তাকে কাঁধে নিয়ে ঘুমুতে দিয়েছে সারাটা সময়। তাকে না ডাকা পর্যন্ত সে কোনকিছু টের পায়নি। এমন মরণ ঘুম তার এসেছিল? কয়েক ঘণ্টা পাশাপাশি বসলেই কি অনুভুতি এসে যাবে? একি তরল সে? না, এসব থেকে বেরুতে হবে। রেশমী রাগে বড় বড় পা ফেলে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ে। 

রেশমী স্বামীকে এক প্রকার চেনেনা বললেই চলে। এক সপ্তাহই ছিল বিয়ের পর। বিয়ে করতেই দেশে যায় তার স্বামী। টানা দু মাস থেকেও কনে পছন্দ হয়না তাদের। ফিরতি ফ্লাইটে বিদেশ চলে যাবার এক সপ্তাহ আগে রেশমীর সন্ধান পায় তারা রেশমীর ছোট খালার মাধ্যমে। দেখা মাত্র পছন্দ এবং আকদ। রেশমীর জন্যও ছিল শকিং। এভাবে কি সে বিয়ে করতে চেয়েছিল? মাত্র অনার্স শুরু করেছে। একজন রূপকথার রাজপুত্র কোথাও অপেক্ষা করে আছে ভাবতে ভাল লাগে কিন্তু সে এখনও জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। রেশমী জানে তাকে ছেলেরা পছন্দ করে। সুন্দরী বলতে যা বুঝায় সে তেমন না হলেও তার চোখে মুখে একটা দীপ্তি আছে। চোখের তারায় বুদ্ধি খেলা করে। ঘন কালো চুলগুলো পিঠ ছড়িয়ে থাকে। সেগুলো তার চলনের সাথে কথা বলে চলে। সে আকর্ষণীয়। কবিতা পড়ে। এমন একটি মেয়েকে ছো মেরে দূর দেশে থাকা একটি ছেলে নিয়ে গেল। ছেলে বিদেশে থাকে। উন্নত দেশে। বাবা মায়ের তর সয়নি। রেশমীর আঙুলে যখন চকচকে দামী পাথরের আংটিটি উঠে এলো তখনও বুঝে উঠতে পারেনি কি ঘটে চলেছে। অদুরে বসে থাকা ছেলেটিকে খারাপ লাগছে সেটিও নয়। আত্মিয় পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে ছেলেটি কিছুটা মুখ নিচু করে আছে। সুদর্শন। রেশমীর সম্পূর্ণ অপরিচিত। 

তিন দিনের জন্য তাদেরকে কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেয় দুপরিবার। কি অস্বস্তি। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ছেলের সাথে তাকে কক্সবাজার যেতে হচ্ছে। অথচ এমন একটি কল্পনা তার কিশোরী বয়স থেকে তার সাথে চলে আসছে। খুব আপন প্রানের প্রিয় কাউকে নিয়ে একদিন সে সমুদ্র দেখবে। সমুদ্রে সূর্য ডোবা দেখবে। সমুদ্রের বালি মাখামাখি পাশাপাশি শুয়ে থাকবে। সেখানেই চলেছে সে দূর দেশে থাকা এক অচেনা যুবকের সাথে। যাকে সে এক সপ্তাহ আগেও চিনতোনা তার সাথে চলেছে সমুদ্রে। যে প্রিয় মানুষটিকে সে কল্পনা করেছে মানুষটি কি সে? 

দুপুর গড়িয়ে কিছুটা ক্লান্ত তারা হোটেলে চেকইন করে। ধীরে সাবধানে দুজনই রুমে ঢোকে। একটি ডাবল বেড। দুদিকে দুটি সুন্দর সিংগল কৌচ। মাঝখানে সুদৃশ্য টেবিল। চা কফির সরঞ্জাম সাজানো। একটি রাইটিং টেবিল। দেওয়ালে টিভি। রেশমী জানালার পাশে কৌচে নিজেকে ছেড়ে দেয়। রাস্তায় ভদ্রলোকের সাথে টুকটাক কথা হয়েছে। ও হু হা উত্তর দিয়েছে। বিয়ের পর একটু কথা হয়েছে। ভদ্রলোকই বলেছে। তার এক্সপেকটেশন কি জানতে চেয়েছে। সে চেষ্টা করবে তার এক্সপেকটেশনকে ফুলফিল করতে। দাম্পত্যজীবন উভয়ের আন্ডারস্টান্ডিং এর উপর সফল হয় ইত্যাদি সব। রেশমী সব শুনে গেছে বেশি। 

- তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। চেঞ্জ করো আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। 

রেশমী স্বস্তি পায়।

দুজন দুজনের কাছে অপরিচিত থাকায় শারীরিকভাবে কাছে আসা ছিল দুজনের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। একজন মানুষকে না জানলে কি তার এতটা কাছে আসা যায়? রাতের খাবার খেয়ে সমুদ্রের বালিতে রেশমী আর তার স্বামী হেঁটে বেড়িয়েছিল। এক সময় রেশমীর স্বামী তার হাতটি মুঠোবদ্ধ করে নিয়েছিল। অপরিচিত একজন মানুষের হাতের ভেতর তার হাতটি ছটফট করে উঠেছিল। তবু ছাড়িয়ে নিতে পারেনি সে। সে তার বিবাহিত স্বামী। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার অর্থ কি হবে রেশমী বুঝতে পারেনি। অনেকটা দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে যখন তারা রুমে ফিরে এসেছিল তখন ক্লান্তি ভর করেছিল দুজনের শরীরে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল ঘুমে। কিন্তু দুজনই বুঝতে পেরেছিল সেটি বুঝি নববিবাহিত এক দম্পতির হানিমুনের ভাষা হবে না। বাইরের পোশাক বদল করতে করতে সময় পার হয়েছিল আরও কিছুটা। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে অন্যজন বাথরুমে ঢুকলে চোখে নেমেছিল রাজ্যের ঘুম। রেশমির স্বামী বিবেচনার পরিচয় দিয়েছিল। ঘুম ভাঙায়নি তার। সেও রেশমীর পাশে শুয়ে পড়েছিল। 

পুরো তিনটি দিন তারা বীচ হোটেলে কাটিয়ে দিয়েছিল। খুব ঘনিস্ট হতে পারেনি কেউই। চেষ্টা করেও নয়। একটা দূরত্ব থেকে গেছে। বিয়ের পরপরই তাকে চলে যেতে হবে এমন ভাবনা মনে হয় আরও জড়তা সৃষ্টি করেছিল। একজন মানুষ বিয়ের পাঁচদিন পর চলে যাবে জনেই কি তড়িঘড়ি কাছে আসা যায়। ঘুমের অচৈতন্যে রেশমী অনুভব করেছে কেউ তাকে তার দিকে জড়িয়ে নিচ্ছে। ক্লান্তি এবং জড়তায় কুঁকড়ে থেকেছে রেশমী। ভালবাসা তার কাছে একজন মানুষের সাথে দীর্ঘ পরিচয়। তার অভ্যেসগুলো জানা। কি গান প্রিয় তার? কোন কবিতাটা? কোন রঙ? কোন লেখক? কোন বই? কিছুই জানেনা সে। কেবল মাঝে মাঝে স্বামীর মুঠোর ভেতর তার হাতটি ঘেমে উঠেছিল। নিজেকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে পারেনি সে। 

শীতের প্রারম্ভ। এক বেডরুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটটি একটি শান্ত লেকের পাশে। এখনও হাঁস সাঁতরে বেড়ায়। হাঁসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে রেশমী। হাঁসগুলো মাথা পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে দেয়। রেশমি তাকিয়ে থাকে। কখন ওরা মাথা পানি থেকে তুলে ঝাড়া দেবে। এমনভাবে ঝাড়া দেবে যেন পানিতে গোসল করে চুল ঝেড়ে নিলো। চারপাশটা ছবির মত। নির্জন। রেশমি বসে থাকে আর ভাবে এ যেন এক অন্য জীবনে সে। এখানে এই শহরে কাউকে চেনেনা সে। কোন কোলাহল নেই। গাড়িগুলও যেন চলে নিঃশব্দ। বাচ্চারাও যেন কাঁদে শব্দ না করে। এত পরিচ্ছন্ন। এত নিখুঁত সব। কোথাও কোন গড়মিল নেই। গোলযোগ নেই। চারপাশে নিস্তব্ধ সময়। রেশমির কাজ কেবল অপেক্ষা করা। স্বামী ফিরবে সেই রাত গভীরে।

স্বামী এখানে কি কাজ করে রেশমি এখনও জানেনা। শুনেছে দু শিফটে কাজ করে। বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। সমস্ত পরিবার তার টাকার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। রেশমি এখনও কিছু করেনা। ও বাসায় থাকে। বাইরের প্রবেশে কিছুটা কুন্ঠিত অনুভব করে রেশমি। কাঝে মাঝে একা একা বের হয়েছে। একা একা এদিক ওদিক ঘুরেছে। দোকানে দোকানে ঘুরে দেখে কিছু কিনতে পারে এমন টাকা তার কাছে নেই। দেশ থেকে আসার সময় তার ব্যাগে দুশো ডলার করে বাবা দিয়ে দিয়েছিল। সেটি সে এখনও ভাঙায়নি। ওভাবেই রয়েছে। স্বামী অবশ্য তাকে হাত খরচের টাকা নিতে পিড়াপিড়ি করেছে। সে নেয়নি। না না। তারতো কিছু লাগেনা। গরম কাপড় জুতা কোট এসব এক দফা দেশ থেকে নিয়েই এসেছে। আবার এখানেও এক শনিবার স্বামীর সাথে গিয়ে কিনে এনেছে। সব আছে তার। শনিবার দাওয়াত হয় কোন কোন বাঙালি বাসায়। দেশ থেকে আনা শাড়ি পরে যায়। বিয়েতে পাওয়া গহনাগুলোও পরে। বেশির ভাগ মানুষ সেখানে দেশ নিয়ে আলোচনা করে। রেশমিতো মাত্র দেশ থেকে আসলো। ওরা যেভাবে আলোচনায় মেতে ওঠে ও পারেনা। মনে হয় আলোচনার বিষয়গুলো বেশ আগের। মাঝেমাঝে রাজনীতি আসে। হাত নেড়ে নেড়ে গরম হয়ে যায় পুরুষেরা। মেয়েরা তাদের শাড়ির গল্প বলে। এ শাড়িটা আমার খালা শ্বাশুড়ি দিয়েছিল ভাবী। একই ধরনের গল্প। একই কথা। রান্না। অনেক প্রকার রান্না। একবার এক বাসায় যা রান্না হয়, পরের বার অন্য বাড়িতে আরও বেশি রান্না হয়। একটি প্রতিযোগিতা লেগে থাকে। রেশমি ছটফট করে ওঠে। 

রেশমি এখনও রান্না পারেনা তেমন। মুরগিটা নিজের মত করে করে। ডাল। ডিম ভাঁজি করে ফেলে তার সাথে। তার বাসায়ও তার স্বামী দাওয়াত দিয়েছে মানুষজন। দুটো মুর্গি আর মিক্সড সব্জি করে বোঝে সে এক অচেনা পৃথিবীর আরেক অচেনা পৃথিবীতে আটকে পড়ে যাচ্ছে সে। জানালা দিয়ে চোখ মেলে সে দেশটি দেখে, তার যাপিত জীবনের দেশটি সেটি নয়। কিভাবে সে এ চক্র থেকে বের হয়ে আসবে রেশমি জানেনা। রেশমি দেশ থেকে আসার সময় একটি সঞ্চয়িতা আর গিতাঞ্জলি নিয়ে এসেছিল। স্বামীর আসতে রাত হয়। বইদুটো খুলে বুঝতে পারে সে কোথায়ও নেই। রবীন্দ্রনাথ দূরে সরে যাচ্ছে তার থেকে। 

রেশমি এখানে এসে স্বামীর সাথে সম্পর্কটি বুঝে উঠতে পারেনি। বিয়ের পর সেই যে তিনটি দিন কক্সবাজার কাটিয়েছিল, সে দিন কটিতে বরং সে একটি সম্ভাবনা দেখেছিল। মনে করেছিল অপরিচিতের গণ্ডি পেরিয়ে তার সাথে একদিন একটি সম্পর্ক হবে। এমনইতো সবার হয়। তারও হবে। একটি অপেক্ষা কাজ করেছিল। স্বামীকে বিদায় দিতে সবার সাথে সেও গিয়েছিল বিমানবন্দরে। হঠাৎ বুকটা হু হু করে উঠেছিল। আহা! মানুষটাকে মনে হয় আরও একটু গুরুত্ব দিয়ে যতন করা যেতো। ইমিগ্রেশন পার হয়ে হাত নেড়ে চলে গেলে গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে উঠে এসেছিল। এর নাম কি তবে মায়া? মাত্র পাঁচটি দিনে মানুষটার উপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। মায়ার উপরই গড়ে উঠবে ভালবাসা? 

এখানে রেশমির সাথে স্বামীর দেখা হয় খুব কম। কাজ আর বাঙালি বাড়ি দাওয়াত খেতে যাওয়া। ভরা পেটে ঘরে ফিরে শুয়ে পড়া। অন্ধকারে একটি হাত হাতড়ে ফেরে রেশমির শরীর। নির্বাক নিঃশব্দ শরীর শরীর খুঁজে নেয়। নিঃস্পন্দ রেশমি সময়ের কাছে নিজেকে সপে দেয়। সে জানে কখন শুরু হবে কখন শেষ হবে। রেশমি উঠে গিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে এসে শুয়ে থাকে। ঘুম চলে গেছে তার চোখ থেকে। পাশে কাঁটা গাছের মত পড়ে মানুষটি ঘুমায়। হালকা নাক ডাকে। রাতের নির্জন প্রহরে এ সামান্য নাক ডাকা রেশমির কাছে একমাত্র শব্দ হয়ে ওঠে। উঠে গিয়ে ছোট্ট বসার ঘরটিতে বসে। অচেনা শহরের দিকে তাকাতে তার ভয় করে। এ ঘুমন্ত শহরের সে সম্পূর্ণ অচেনা। অদূরে শোবার ঘরে যে মানুষটি শুয়ে আছে। নিঃশ্বাসের উঠানামায় চারপাশ সশব্দ হয়ে উঠেছে, এ নতুন ভুবনে ওই মানুষটিই তার একমাত্র চেনা মানুষ। রেশমি বিছানায় ফিরে আসে। কিছুটা কাছে ঘেঁষে আছে রেশমি। মানুষটি চারপাশ আলোড়িত করে ঘুমিয়ে যায়। রেশমি একসময় ঘুম না অচেতনতার গভীরে ডুবে যায় সে জানেনা। 

রেশমি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন নয় যেন সত্য। প্লেনে তার পাশের যাত্রী, যার কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে মারাত্বক অস্বস্তিতে পড়েছিল, সে ভদ্রলোকের সাথে সে দূরে কোথাও বেড়াতে গেছে। কি কান্ড! তার সাথে সে দেখা হলো কখন? জায়গাটি অনেকটা কক্সবাজারের সমুদ্রের মত। কিন্তু পানি খুব নীল। বালি ধবধবে সাদা। ভদ্রলোক তাকে পানির কাছে নিয়ে বসিয়েছে। 

- কি ব্যাপার চোখমুখ শুকনো কেন? ঘুমোননা ঠিকমত? 

- আরে আপনি এখানে? কি ব্যাপার? 

- হুম। আপনাকে একা দেখে আসলাম। 

- আচ্ছা বলুনতো আমি এখানে কিভাবে আসলাম? 

- আপনি আমার সাথে এসেছেন এখানে। আপনাকে নিয়ে এসেছি। 

- কি বলছেন? এখন না বললেন আমাকে একা দেখে এসেছেন?

- হুম। সেটাইতো বললাম! 

একটি টেবিল। দুপাশে দুটো চেয়ার। টেবিলের উপর এক রাশ গোলাপ। টিম টিম করে জ্বলছে দুটি প্রদীপ। ভদ্রলোক বলছে, আসুন বসুন! ওর চেয়ারটা একটু টেনে ধরে ভদ্রলোক। রেশমি মন্ত্রমুগ্ধের মত গিয়ে চেয়ারটিতে বসে। ভদ্রলোক উল্টো দিকে। 

- এবার বলুন। কেমন আছেন? ঘুমান না কেন? 

- ঘুমোই না কে বললো? 

- আমি জানিতো। সেদিন কিভাবে আমার কাঁধে ঘুমিয়ে পড়লেন। তার চোখমুখ এমন হতেই পারেনা। 

- আচ্ছা আপনার মনে কি আছে বলুন দেখি? আপনি এখানে কেন এসেছেন?

- আপনাকে নিয়ে যেতে। আপনাকে নিয়ে আমি দূরে কোথাও চলে যাবো।

- মানে? এসব কি বলছেন? 

- ঠিকই বলছি। 

- কিচ্ছু ঠিক বলছেননা। আমি এক্ষুনি বাসায় যাব। আমার স্বামী সেখানে চিন্তা করছেন। টেবিল টান দিয়ে রেশমি উঠে দাঁড়ায়। ফুলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে, ক্যান্ডেলটিও। হঠাৎ আগুন ধরে যায় ফুলগুলোতে। দাউ দাউ করে গোলাপগুলো পুড়ে যাচ্ছে। আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে। রেশমি ‘আগুন’ ‘আগুন’ করে চিৎকার করছে। গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছেনা। প্রাণপণে চিৎকার করছে। রেশমি ধড়মড় করে উঠে বসে। অনেকক্ষণ লাগে তার বুঝতে সে কোথায়। সে স্বপ্ন দেখছিল। সে চারপাশে তাকায়। জানালা ভেদ করে তির্যকভাবে রোদ প্রবেশ করেছে ঘরে। রেশমি ক্লান্তভাবে আবার শুয়ে পড়ে। খুব অবাক হয়ে যায়। সে এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিল। এ কি ধরনের স্বপ্ন। সে কেন ওই ভদ্রলোককে স্বপ্ন দেখল? কি লজ্জা! ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছে রেশমি। সেই যে বিমানে ঘুমিয়ে পড়ার পর আবারও এক অস্বস্তি। ছিঃ ছিঃ। নিজের উপর খারাপ ধারনা হচ্ছে রেশমীর। না তার শরীরটা ভাল নেই। শরীর ঠিক থাকলে এসব আজেবাজে স্বপ্ন দেখার কথা নয়। ডাক্তার দেখানোর কথা ভাবে রেশমি।

দুবছর হলো রেশমি শহরের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজাইন বিষয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি এক রুমের বাসায় সে একা থাকে। লেকের ধার ঘেঁষে সারি সারি এপার্টমেন্ট। লেকের পাশ দিয়ে হেঁটেই বাসায় ফেরে রেশমি। সারাদিন ক্লাস করে রুমে ফিরে নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য ইজিচেয়ারে ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। আলতো হাতে রেফ্রিজারেটরের ডালা খুলে ঠান্ডা পানীয় গ্লাসে ঢেলে ব্যালকুনিতে দাঁড়ায়। স্থির লেকে তির তির করে বাতাস বয়ে যায়। এক ঝাক হাঁস দল বেঁধে সাঁতরে যায়। এখনও রোদের আভা ঘিরে আছে চারপাশ। গ্লাসে আলতো চুমুক দিয়ে রেশমি শেষ রোদের মিষ্টি আলোয় মুখ ধুয়ে নেয়। একটু পর সন্ধ্যা নামবে। লেকের পাশের লাইটপোষ্টের আলোগুলো জ্বলে উঠবে। লেকের জলে আলোগুলো ছিটকে পড়বে একসাথে। রেশমি জলের গায়ে আলোর তারায় ডুবে যাবে কিছুক্ষন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন