বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

নাহার মনিকা' গল্পদূর থেকে আসে

‘অর কাছে কি শুনবেন, আমি কইতাছি, খাড়ান…’, ভেজা লুঙ্গি গুটিয়ে পানি চেপে ছপ ছপ শব্দে সামনে এসে দাঁড়ায় কাসেম। বালুর বস্তা ট্রাকে ওঠানোর কাজ কি আজকে তাড়াতাড়ি শেষ! ঘোমটার কোনা কামড়ে ওর বৌ ততক্ষণে বারান্দার খুটি আঁকড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেছে। ছনে ছাওয়া নীচু বারান্দায় মিলির কোলের ওপর খাতা, হাতে টেপ রেকর্ডার।
-‘ওনার কাছ থেকে শুনলে সমস্যা কি?’
-‘আরে নাহ, গেরাইম্যা মেয়েলোক, কি কইতে কি কইবো…আর আপনেগো সামনে, হ্যাহ’, দু রকমের মানে ছুঁড়ে দিয়ে কাসেম হাসে, হাত উঁচিয়ে একটামাত্র নেওটা বাচ্চা নিয়ে ইতি উতি চাওয়া মুরগীটাকে তাড়ায়। গামছা দিয়ে মাথা মোছে, বৌ একটা শুকনা লুঙ্গি এনে দিলে তার পরনের ভেজাটা গোল বৃত্ত বানিয়ে উঠোনে পরে থাকে। 

একে চটানো যাবে না, আপাতত ভালো একটা র‍্যাপোর্ট বিল্ডিং হয়েছে। সেই দশটা থেকে একসঙ্গে বসে বৌটার কাজ কর্ম দেখলে, মুড়ি মাখা খাইয়ে সবে সে মুখ খুলতে শুরু করেছিল, সব কথা বোঝা যায় না, তবু মিলি চেষ্টা করছিল। শাশুড়ি ভায়ের বাড়ি বেড়াতে গেছে, সময় ভালো ছিল। এখন কাসেম এসে মুরগী তাড়ানোর মত ক’রে বৌটাকে পাক ঘরের ওদিকে পাঠিয়ে দেয়।

-‘আচ্ছা, তাইলে আপনার সাথেই কথা বলি’… মিলি হেসে গলে গিয়ে কাসেমকে আংশিক বশীভূত করতে চায়। বশীকরণ অত সহজ হয় না।কাসেমের ধুলো ধুলো গায়ের ত্বক, খড় দৃষ্টি, জ্যালজ্যালে লাল গেঞ্জি দুপুর গড়ানো লক্ষ্যভেদী রোদের দিকে কাৎ হয়ে হঠাৎ নিজের ওপরে শামীমকে কপি পেষ্ট করে দেয়।

ফিল্ড থেকে মিলি ফিরেছে গতকাল, আর আজকে বিকেলে অফিসের কাজে ভার্সিটি এলাকায় যাওয়ার কথায় শামীম বিরক্ত হলো। তারপরও দুজনের গন্তব্য নির্দ্দিষ্ট করেই নিচে নামছিল, সিঁড়ির গোড়ায় নেমে ফিরতে একটু দেরী হবে শুনে শামীম প্রায় চিৎকার করে ওঠে,… ‘ঐ খান থেকে ছয়টার মধ্যে ফিরে আসা যাবে না কেন? অফিসের কাজে তোমার আর কোন ভাতাররা আসবে শুনি?’... নিঃশ্বাস বন্ধ ক’রে শামীমের বাক্যবাণ শোনে মিলি। অপমানে দু কান ঝাঁ ঝাঁ করে, তারমধ্যেও খেয়াল হয় এটা নিচে বাড়িওয়ালার মেইন গেটের দরজা। 

দারোয়ান ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে। কোলাপ্সিবল গেটের একটু দূরে কালো শিকের খাটিয়ার ওপরে তার তোষক পাতা বিছানা, দুমড়ানো দৈনিক কাগজ আর নাস্তার প্লেট। বাড়িওয়ালার ফ্ল্যাটের দরজা অল্প ফাঁক করা। কে জানে, শামীমের দাঁত চিবিয়ে বলা বাক্যটা ওদের কারুর কানে গেল কিনা। বিশেষ ক’রে বাড়িওয়ালার রোগা পাতলা বোনের কানে গেলেই হয়েছে। অন্যান্য ফ্ল্যাটে খবর যেতে কয়েক সেকেণ্ড লাগবে। সিঁড়ি বেয়ে চারতলায়ও ওঠার কষ্টটাও করবে না। ওর মোবাইল টু মোবাইল ফ্রি। এমনিতেই মিলির চাকরী বিষয়ে তার উচ্চ মূল্যায়ন!- ‘মাইক্রোবাস আইসা বাসার সামনে থামে, ব্যাগ ট্যাগ নিয়া কই যেন যায়’। 

অথচ ভাড়া নেয়ার সময় তার আর শামীমের চাকরী, বৃত্তান্ত সব বাড়িওয়ালাকে বলা আছে, তবু তার ‘নাই কাজ খই ভাজ’ টাইপের বোনটা এগুলি বলে বেড়ায়, মোড়ের দোকান থেকে দুধ কিনতে গিয়ে মিলি নিজেই শুনেছে। পাত্তা দিলে ভেজাল বাড়বে। কিন্তু শামীমের এই মেজাজ বিস্ফোরণের সংবাদ ফ্ল্যাটের সবাই পেলে মিলির অবস্থা কি দাঁড়াবে সেটা কি শামীম ভাবে একটু? ও নিজেও তো তার ফিল্ড ঘুরে এসেছে, উচ্ছসিত হয়েছে,…‘আমার যদি তোমার মত চাকরী হইতো…ব্যাংকের চাকরীতে লাইফ নাই’, সেই শামীমই যদি মানুষের সামনে তাকে এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে!

-‘কি, তুমি সেই কখন থেকে একটু পর পর ঘড়ি দেখতেছো কেন?...শামীম ভাইকে নিয়ে আসলেই পারতা… আমাদের সঙ্গ ভালো লাগতেছে না, না?’… মুরাদকে ন্যাকামীর জন্য কড়া একটা ধমকের ইচ্ছে জিভের ডগা থেকে বুদ্বুদের মত উড়িয়ে বাতাসে মিশিয়ে দেয় মিলি, একমাত্র ওরই এখনো চাকরী বাকরী নাই। 

সোশিওলজির জুবায়ের স্যারের কাছ থেকে ফাইনাল রিপোর্টটা নিতেই আজকে এখানে আসা। কালকের সেমিনারে স্যারের পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হবে। সকালের প্ল্যানারী সেশনে এটলিষ্ট চেয়ারপার্সনের হাতে রিপোর্টটা দিলে তার পক্ষে আলোচনায় সুবিধে হয়। ইউনিভার্সিটিতেই যখন আসছে, মুরাদ আর অনিন্দিতাকে খবর দিয়েছিলো,…‘থাকিস, একসঙ্গে বিকেলে চা খাবো’।

এ রকম বিকেলে ভার্সিটি এলাকা বরাবরের মত জমজমাট। ভীড় একটু বেশী কি? অনেকদিন বাদে মিলি এলো, প্রায় বছর দুই হবে। গাছপালা, চারপাশে আরেকটু ভীড়ভাট্টা বেড়েছে, আর কোন বদল নেই। মিলির নাকি পরিবর্তন বোঝার ক্ষমতা কম, শামীমের মতে ‘অবজারভেশান পাওয়ার’ নাই।

-‘… না রে তোদের সাথে দেখা হয়ে এত ভালো লাগছে, এখন মনে হচ্ছে শামীমকে আসতে বললে পারতাম, তোদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো। ও আসতে চাইছিল, আমিই… ধ্যাৎ, বন্ধুদের মধ্যে আবার বাইরের মানুষ টানা কেন…’ মিলির মাথার মধ্যে শামীমের-“তোমার নাগরদের সঙ্গে তুমিই মারাও গিয়া”-লম্বা খোঁচামারা কথা শিং মাছের বিষকাটা ফোটায় আর সে ভ্রু কুচকিয়ে হাসে। 

শামীমকে সে যথেষ্ঠ আল্লাদ করেই বলেছিল, কিন্তু তার মিলির বন্ধুদের সঙ্গ ভালো লাগেনা। রাজনীতির আলাপ আর টেবিল চাপড়ে গ্লাস উল্টে ফেলা, তা না হলে নাকি আড্ডার মানহানি হয়। গেলে মিলি নিজেই যাক, তবে হ্যা, ঢাকা শহরে থাকলে ঘরের বৌয়ের কারফ্যু সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু। অনেক কথা ঝম ঝম করে বলতে ইচ্ছে করে,- ছয়টার আগে কি কোন দূর্ঘটনা ঘটে না? খুন, ধর্ষণ ছিনতাই হয় না? 

তবে ছয়টার পরে একা মিলি যাবেই বা কই? তার নিজের কাছেও অধিকাংশ সন্ধ্যাবেলার ঢাকা শহর হলো জরাগ্রস্থ এক তিমি মাছ, গায়ের ফোঁড়া ফেটে গিয়ে গোলাপী ঘা আর সেখান থেকে গলিত লাভা বেরিয়ে আসছে। থাক, কারফ্যুর ভালোমন্দ নিয়ে কথা বাড়ায় না, শামীম খুশ তো দুনিয়া খুশ। 

অনিন্দিতার বকবকানি একদম কমেনি,…‘খুব ভালো করছিস, আমিও এই সুযোগে আমার দুই মেয়েকে পল্লবের জিম্মায় দিয়া আসলাম। না হলে হয় নাকি? আমিতো সব সময় পল্লবরে বলি, বাচ্চাদেরকে যেমন আমি সময় দেই, তোমাকেও দিতে হবে। ছুটির দিনে পুষি টুশির সব ভার ওর উপরে… খেলতে নিয়া যায়, গেমসে সঙ্গ দেয়া সব ওর…’

-‘আছিস আরামে…’ মিলি জোর করে হাসে।

জুবায়ের স্যারের পেপারটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিন জন ডাসের দিকে এগোয়, পাঁচটা পয়ত্রিশ বাজে। মনটা হঠাৎ বেখাপ্পাভাবে খারাপ হয়ে যায় মিলির, শামীমের রাগী মুখটার পেছনে কাসেমের চেহারা উঁকি দেয় ক্রমাগত। এ রকম বিকেল যেখানে ঘড়িতে ছ’টা মনোরম হয়ে উদ্বেগহীন বাজে, তখন শামীম যদি তার সঙ্গে না আসতে চায়, তবুও কেন কারফ্যু তার জন্য? 

সেমিনারটা রাজেন্দ্রপুরে হলেই ভালো ছিলো, বাড়ি ফেরার টাইম নিয়ে অন্তত টেনশন থাকতো না।

২.

রিসেপশানেই দুই সাংবাদিকের সাথে দেখা হয়ে গেল।একটু জড় সড়, তবে চোয়াড়ে ভাব আছে। নামকরা দৈনিক বলে কথা! সেমিনার দোতলার বলরুমে। সোনারগা হোটেলের মসৃণ মেঝেতে মিলির নিজেকে অনভ্যস্ত লাগে। এদেরও কি সে রকম লাগছে? ফিসফিস কথা বলতে বলতে মিলির পেছন পেছনে আসে। 

নীল কার্পেট মোড়া চারকোনা ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোল টেবিলে চারটে করে চেয়ার। নামে সেমিনার হলেও আসলে গ্রুপ ওয়ার্ক, ব্রেইন স্ট্রর্মিং। এক্সপার্টদের মতামত নিয়ে একটা ফাইনাল রিপোর্ট, যেটি আগামী মাসে জাকার্তায় সায়মা ওয়াহিদের প্রেজেন্টেশান।

সাংবাদিকদের একজন মিলির কাছে জানতে চায়- নাদিরা মকসুদ আসছেন কিনা। 

ছয় মাস আগে থেকে তার ডেট কনফার্মড। ডোমেষ্টিক ভায়োলেন্স এন্ড ভিক্টিম’স নেটওয়ার্ক এর ওপরে তার যে পেপারটা উইমেন’স ডেভেলপমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল এ ছাপা হয়েছে তা নাকি বড় বড় রিসার্চাররা রেফারেন্স দিচ্ছেন, কোট করছেন। ওনাকে বাদ দিয়ে হয়? নাদিরা মকসুদকে নিয়ে বাজারে কথাবার্তাও চালু আছে, চেইন স্মোকারের মত এক বয়ফ্রেন্ডকে বিদায় জানিয়ে আরেকজনকে হাত বাড়িয়ে ঘরে ঢোকায়। তাকে দেখে এসব কিছুই মনে হয় না মিলির, মহিলা এত শার্প আর শাদামাটা! 

শামীমকে গল্প করতে গিয়ে উল্টো ঝাড়ি খেয়েছে, মিলি এসব ধান্ধাবাজির বোঝেটা কি? এন জিও কালচার, টাকা মারার ধান্ধা এসবের মধ্যে কি শরীরের খাই তালা আটকানো থাকে? একবার চড়া ঝগড়াও হয়ে গেছে, এই এনজিওর টাকাই কিন্তু সংসারে ঢালে সে, পদ্মার ওপারে যে প্লট কেনার প্ল্যান- এই চাকরী না থাকলে পারবে তারা? শামীম তবু থিওরী কপচাবে, জাহাঙ্গীর নগরে পড়ার সময় তত্ত্বকথা এত বিরক্ত লাগতো না, এখন রাগে মাথা ঝিম ঝিম করে মিলির।

হলের বাইরে বারান্দায় ব্যুফে। সকালের চা কফির সাথে রকমারী স্ন্যাক্স। আস্তে আস্তে গুঞ্জনে ভরে উঠছে হল। প্রফেসর শওকাত জামিল শুরু করবেন। চমৎকার বলেন ভদ্রলোক। মিলির স্পোকেন ইংলিশটা যদি এদের ধারে কাছে হতো! সারা মাস নেত্রকোনা পরে থাকলে কেমন করে হবে! তাও যদি নেত্রকোনা শহর হতো। জারিয়া, ঝাঞ্জাইল, সেই কংস নদীর ধারে। থই থই পানি উপচানো বিলের পাশে বাজার, সেখানে মেঝে পাকা টিনের দু ঘরের বাসায় মিলি, আমেনা আপা, আর জুনায়েদ থাকে। জুনায়েদ আর মিলি এন্থ্রোপলজি, আমেনা আপা ইকোনমিক্সের। সুশীলদা ঘন ঘনই আসে, এডমিনিষ্ট্রেশন দেখতে, চৌকির ওপর খাতাপত্র বিছিয়ে টাকা পয়সা বুঝিয়ে সিগ্নেচার নিয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন, থানা, চেয়ারম্যান এদের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তার কথাবার্তায় ক্ষমতার ছাপ চলে আসে। আমেনা দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, ‘…বাজারে থাকি বুঝ না?...একজন পাওয়ারফুল লোকের ব্যাকিং থাকা দরকার…’। 

রিক্সা, নৌকা, ট্রলার পায়ে হেঁটে কত কিছুতে যে পারাপার হতে হয়! রোদে পুড়ে যাওয়া হাতের ত্বক নিয়ে এখন এই পাঁচতারা হোটেলের শাদা কাপের অভিজাত কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে একটু সংকুচিত থাকে মিলি।

প্রফেসর শওকতের প্রাণবন্ত ওপেনিং স্পিচ শেষ হলে তারপর পরিচয় পর্ব। ক্যমিউনিকেশন এক্সপার্ট অসীম রায় সবাইকে নিয়ে চেয়ার সরিয়ে টেবিলগুলোকে ঠেলে হলের কোনায় গুজে দিলে মাঝখানের ফ্লোরে বিস্তর জায়গা। সেখানে সবাই গোল হয়ে দাঁড়ানো। প্রথমজন নিজের নাম বলে নিজের সম্পর্কে একটা বিশেষণ বলবে। একটা সুতলীর গোলক থেকে সবার হাতে সূতো ধরিয়ে দিয়েছেন ভদ্রলোক। টিমওয়ার্কের মাজেজা বোঝাতে এভরিবডি, সামবডি, এনিবডি আর নো-বডি কৌতুকটা জমিয়ে দিলো,… জরুরী একটা কাজ করতে দিলে এভরিবডি ওয়াজ সিওর দ্যাট সামবডি উড ডু ইট… এনিবডি ক্যুড ডু ইট, বাট নো-বডি ডিড ইট… হাঃ হাঃ হাঃ…অসীম রায় গ্রুপকে বোরড করেন না, তার নামে এই লেবেল সাঁটা।… ‘আমাদের সব সেক্টরে এখন সামবডি, এনিবডি অবস্থা’… বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা দুই চার বাক্যে বলে সিচ্যুয়েশন কন্ট্রোলে নিয়ে আসেন ভদ্রলোক, তার হাতের দড়ি টান টান, এই না হলে ক্যমিউনিকেশন এক্সপার্ট!

মিলির পাশে সুসান লানিয়েল, ফ্রেঞ্চ ক্যানাডিয়ান, প্রোগ্রাম ইভালুয়েশন এক্সপার্ট। তার রেকোমেন্ডেশন পেলে সিডা থেকে তাদের গ্রান্ট প্রোপোজাল ‘উইদ রিয়েলি কাইন্ড কনসিডারেশন’ দেখা হবে। 

বৃত্তে দাঁড়িয়ে নার্ভাস লাগে মিলির। তাকে এর বাইরে রাখলে পারতো সায়মা আপা, কিন্তু জন হপকিন্সের ডিগ্রীই তো শুধু না, এই অর্গানাইজেশন দাঁড় করাতে যে ডিসিপ্লিন লাগে তা উনি রপ্ত করেছেন, সব দিকে খেয়াল। কিন্তু মিলি বলবে কি, সবার নাম আর তাদের নিজের সম্পর্কিত একটা বিশেষণ মনে রাখতে তেমন সমস্যা না, কিন্তু সবার সামনে গলা উঁচিয়ে ইংরেজীতে কথা বলতে জেরবার হবার যোগাড়!
বাঁচিয়ে দিলো সায়মা আপাই, ইশারায় নাদিরা মকসুদকে ফোন করার কথা বলাতে সে দড়ি থেকে হাত সরিয়ে নিলে সুসান লানিয়েল তার লাল কোকড়া চুল ঝাঁকিয়ে হাসে।
‘… ও হ্যা তোমাদেরকে ফোন করতে পারছিলাম না, আমার একটু প্রবলেম আছে, তৈরী হয়ে প্রায় বেরিয়ে গেছিলাম’…সংযত ধরা গলায় বেছে বেছে বাংলা শব্দ ব্যবহার করছেন নাদিরা আপা,…‘আমার মায়ের য়্যাজমা য়্যাটাক হয়েছে আর আমার ড্রাইভার ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছে’…ক্যুউড ইউ প্লিজ টেল সায়মা দ্যাট আই এম এক্সট্রিমলি সরি…ওর ফোন বোধহয় বন্ধ আছে, আই উইল ট্রাই টু কাম য়্যাজ সুন য়্যাজ পসিবল, আদার ওয়াইজ…’।

এই মেসেজ তো সায়মা আপাকে দেয়া যাবেনা, মহিলা হার্ট ফেইল করবে, ডোনার ইম্প্রেস করতে তার ভালো ট্রাম্পকার্ডের একটা হলো নাদিরা মকসুদ, যদি একদমই না আসতে পারে!

পাঁচ তারা হোটেলের বারান্দা থেকে ঢাকা শহরের ফুরফুরে বাতাস খায় মিলি, নিচের বাগান পরিচর্যারত মানুষ দু’জনকে দেখতে আমোদ লাগে। বাথরুমে চুল আঁচড়ে আবার যখন সেমিনার হলে ফেরে ততক্ষণে সায়মা আপার কান্ট্রি রিপোর্ট প্রেজেন্টেশনের জন্য তৈরী। সুশীলদা ল্যাপটপ এর পাওয়ার পয়েন্ট থেকে বড় স্ক্রীণে প্রজেকশন দিচ্ছে।

ডোমেষ্টিক ভায়োলেন্সের প্রকরণ এর ইন্ট্রোটা বেশী বড় না, পুরনো বিষয়, অত ডিটেইলড বলার দরকার নেই। নিও ফেমিনিষ্ট থিওরী ভিত্তি করে ম্যাক্রো আর মাইক্রো লেভেলে ডোমেষ্টিক ভায়োলেন্সের ফর্ম আর ধরণকে মানুষের ব্যক্তিগত আর পারিবারিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করবেন। তারপর ফোকাস থাকবে- কালচারাল অ্যান্ড ইভালুয়েটিভ পারস্পেক্টিভ থেকে ডোমেষ্টিক ভায়োলেন্স, এই আলোচনার শাখা বিস্তৃত হবে ভিক্টিম আর তাদের রিসোর্স, তাদের নেটওয়ার্কিং কেমন আর কতটুকু এফেক্টিভ। সবশেষে কেস ষ্টাডিজ……’, লোও’রিয়্যাল প্যারিসের ব্রুনেত হাইলাইটস দেয়া সায়মা আপার চুলের ষ্টেপ ব্লাউজের ডিপ নেক থেকে দু আঙ্গুল ওপরে, চুল আর কালো ব্লাউজের মাঝখানে তার ফর্শা পিঠের খাঁজ থেকে থেকে ঝলসে ওঠে, চা রঙ্গের সিল্কের সঙ্গে যুৎসই ডার্ক লিপষ্টিক। 

প্রায় প্রত্যেকটা শব্দ মিলির মুখস্থ, ছয় বছর প্রায়, একই কথা বিক্রি করছেন সায়মা আপা, তাদের অফিসে কম করেও প্রতি দুমাসে একবার সে এইকথা শোনে। সায়মা আপা তত্ত্ব আর রেফারেন্স খুব পছন্দ করেন। শামীমের সাথে জমবে। 

আর মিলির নিজের জন্য ‘বস ইজ অল ওয়েজ রাইট’ এর বাইরেও মাস গেলে নিয়মিত বেতন, ফিল্ডের পারডিয়েম, আর সবচেয়ে বড় কথা কেন জানি শামীমের থেকে মাসে অনেকগুলো দিন দূরে থাকা তার ভালো লাগতে শুরু করেছে! বাপের বাড়ি, বা আর কোথাও অজুহাত ছাড়া এত দিন কি থাকা যায়?

-‘…মিনিষ্ট্রি থেকে কাউকে ডাকেন নাই…? সাংবাদিক ছেলেটা, বেরিয়ে এসেছে।

সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রনালয় তো আছেই, নামী সংগঠনগুলোকেও নিমন্ত্রণপত্র মিলি নিজে ঠিকানা লিখে আক্কাসকে দিয়ে পোষ্ট অফিসে পাঠিয়েছে গত মাসে। সায়মা আপা কথাও বলেছেন, ইনফ্যাক্ট সেক্রেটারীদের কেউ একজন তার নিকট আত্মীয়।

ছেলেটা মিলির জবাবে সন্তুষ্ট হয় না। তার হাতে ধরা শীষ কলম কালি চোয়ালে সে বার বার টিস্যু পেপার দিয়ে মোছে। 

-‘আপনাদের হ্যাণ্ড আউটস কিছু থাকলে দ্যান, লাঞ্চের পরে এমনিতেও থাকতে পারবো না। অন্য এসাইনম্যান্ট আছে’।

- ‘আমরা মূলত আমাদের গবেষনা রিপোর্ট ফাইনাল করার আগে কিছু ডেটা, কেস ষ্টাডিজ শেয়ার করে এক্সপার্টদের কাছে থেকে মতামত সংগ্রহ করছি’,…জ্ঞান জাহির করার সুযোগ পেয়ে মিলির নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ লাগে।

লাঞ্চের আগে প্রথম প্ল্যানারী সেশন শুরু হয়ে গেছে। শাহানুর করিম একাই অনেকক্ষণ যাবৎ বলছেন, নারীর ইস্যুতে নিবেদিত প্রাণ। মাঠে মিছিলের মানুষ, ফর্সা চামড়া পুড়ে তামাবর্ণ। বয়স হলেও তেজ চোখে পড়ে, মিছিল মিটিং এর এমন কোন ছবি পত্রপত্রিকায় আসে না যেখানে শাহানুর অনুপস্থিত।‘…ডোমেষ্টিক ভায়োলেন্স একটা চিরন্তন ব্যপার’,…কিন্তু আজকে তার কথাবার্তা কেমন খাপ ছাড়া। মিলি এর আগেও জাবিতে তাদের ডিপার্টমেন্টে এর কথা শুনেছে,‘…কেন আমি সিঙ্গেল মাদার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি? আমার নিজের উদাহরণই কিন্তু জবদদস্ত কেস ষ্টাডি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এত টাকা খরচ করে দূর্গম এলাকায় যেতে হয় না…ভিক্টিম তো এমনিতেই ভিক্টিম আর সে যদি দুই স্তন আর যোনিঅলা জীব হয় তাহলে বিচারের আগে ভিক্টিমের দোষ খোঁজে আমাদের সমাজ আর প্রশাসন’। 

সায়মা আপা ঝানু প্রেজেন্টার, মিষ্টি হেসে সামলে দিলেন,…‘আসলে আমরা আর্থ সামাজিক দিক থেকে প্রিভিলেজড গ্রুপটি আমাদের স্যামপ্লিং এ অন্তর্ভুক্ত করিনি, নির্যাতিতদের পরিসংখ্যান দেখলে দেখবেন দারিদ্র আর নির্যাতনের গলাগলি বেশী’… সায়মা আপার হাসির এই কায়দা কি মিলি এই জীবনে শিখতে পারবে? 

এবার মিলির করা কেসষ্টাডি বড় পর্দ্দায়, পর্যায়ক্রমিক স্লাইডে কাসেমের বৌ, ঘোমটায় আঘাতপ্রাপ্ত মুখের ডান দিক কিছুটা ঢেকেছে, কানের পাশ দিয়ে চোখা কঞ্চি ঢুকে গিয়েছিল, মুখ বরাবর কাসেমের বালুর বস্তা টানা শক্ত আঙ্গুলের ডবল স্ট্রোক ঘুষি, দাঁত ভেঙ্গে গাল থেতলে যেতে সময় লাগেনি।

অফিসের ক্যামেরায় মিলির তোলা ছবি। সায়মা আপার বয়ানে ইংরেজী শুনতে শুনতে মনে হয় এটা অন্য গল্প। গত কয়েক মাস ধ’রে নিয়মিত দেখা হওয়া, -মুরগীর বাচ্চা বেজীতে নিয়ে গেলে স্বামী, শাশুড়ির মার খেয়ে মুখ ভেঙ্গে যাওয়া তরুনীটি কি এই যাকে এমন ক’রে এখানে দেখানো হচ্ছে!

শেষ হলে সায়মা আপা কমন ডিনমিনেটরগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য সবাইকে আহবান করেন। মিলি আর সুশীলদা দুটো হ্যান্ড মাইক্রোফোন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে নিয়ে যায়।

‘লিসেনিং টু উইমেন’…সেই চুরানব্বইয়ের কায়রো কনফারেন্সের থিমটাই ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু কাসেমের বৌ ভাঙ্গা মুখ আড়ষ্ট জিভ নিয়ে কথা বলতে পারেনা। মিলি অনেক চেষ্টা ক’রে কিছু শব্দ উদ্ধার করতে পেরেছে, বাকীটা পাড়া প্রতিবেশীর কাছে শোনা।

লাঞ্চে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। সাংবাদিকের বুদ্ধি আছে, সায়মা আপাকে ধরেছে। মাছের কাটলেট আর সালাদ প্লেটে নিয়ে উনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। 

মিলি সুশীলদার সঙ্গে খাবার নিয়ে হলের কোনায় দাঁড়িয়ে খায় আর হাসা হাসি করে‘ সেই এক ভ্যান ভ্যান…ব্লা ব্লা ব্লা, দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষার হার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।

-‘সুশীল দা, পারডিয়েমের টাকাটা আজকে কোন ভাবে পাওয়া যায় না?’

-‘এখানে শেষ হতে হতে তিনটা, অফিসে অত ক্যাশ নাই, ফিরতে ফিরতে ব্যাঙ্ক বন্ধ। নাহ, কালকের আগে হবে না’।

মন বিরূপ হওয়ার কিছু নাই, এ সব ব্যাপারে সুশীলদা সবসময় হেল্পফুল। খাওয়া শেষ করে সুশীলদার সঙ্গে নিচে নেমে হোটেলের এয়্যডমিনিষ্ট্রেশন অফিসে যায়। আজকের প্রোগ্রামের জন্য তাদের ইনভয়েস নিতে হবে। পঁচাশি হাজার টাকার চেক, শুধু একা সুশীলদার ক্ষমতা বহির্ভুত, সায়মা আপার সই লাগবে।

লাঞ্চের করেই সুসান লানিয়েল চলে গেলেন, তাকে সন্ধ্যায় কাঠমান্ডুর ফ্লাইট ধরতে হবে।এরপর সেশন তেমন জমজমাট হয়না। ভরা পেটে কফিও তেমন জুৎ করতে পারে না। ছড়ানো চেয়ার টেবিলগুলোর মত গা ঢিলে দেয়া সেশনে শাহানুর করিম একাই অনেকটা সময় নিজের অভিজ্ঞতা বয়ান করেন। জুবায়ের স্যার দেরীতে এসে কফি আর কুকি দিয়ে লাঞ্চ সারতে সারতে সায়মা আপার সঙ্গে কোন চ্যাপ্টার শেয়ার করে ফাইনাল রিপোর্ট লিখবেন সে আলোচনায় সময় নিলে প্রশ্নোত্তর পর্বটাও গা ছেড়ে দেয়।

সকাল থেকে হয় সুশীলদা, না হয় মিলি ক্যামেরা বদলা বদলি করে ফটো তুলে গেছে, এবার ফিনালে হিসেবে গ্রুপ ফটোর জন্য সবাই আরেকবার স্মিতহাস্য। 

৩.

আজকে আর অফিসে ফিরতে হবেনা, ভাবনাটি মিলিকে চাতুরীর যোগান দেয়,-আপার বাসা থেকে ঘুরে আসা যায়। তিনমাস তো হবেই সে রুবাইটাকে দেখে না। একটা কিছু কিনে নিলে ভালো হতো, কিন্তু থাক, প্রথমত-হাতে টাকা নাই, দ্বিতীয় সমস্যা- মিরপুর দশ গিয়ে শ্যামলী ফিরে আসতে আসতে শামীম যদি বাসায় ফিরেই আসে, মিটিং এর অজুহাতটা বরং হাতে রইলো। হোক, আজকে খালি হাতই হোক।

অনভ্যস্ত এসির বাতাস থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা মাত্র মিলির মাথা টং করে ধরে গেলো, সি এন জি থামিয়ে কিছু কেনার ইচ্ছেটাও চলে গেল। 

রুবাই ঝাঁপিয়ে কোলে আসে। ছয় বছরের ছেলেটা গত বৎসরও এর চেয়ে বড়সড় ছিল! ডেঙ্গু, হাসপাতাল- রুবাইকে নিয়ে আপা খুব ভুগেছে। আপা মিলিকে একটা ফোন কেন করেনি- এ কথাটা গলায় জোর এনে বলতে গিয়ে থেমে যায় সে। শামীমের সামনে অনেকদিন ধরে সে বাপের বাড়ির প্রসঙ্গ উচ্চারণ করে না। দুলাভাইয়ের সৌদিআরবের শ্রমিকের চাকরী নিয়ে ওর উন্নাসিকতা আছে। 

আপার ম্লান মুখ শুধু রুবাইয়ের ডেঙ্গুজ্বরের কথা বলছে না। কাগজে মিলি পড়ছে নিয়মিতই, সৌদি আরবে শ্রমিক ছাটাই, দুলাভাইয়ের কিছু না তো? টুম্পা ঝুম্পার ঘরে তাদের আব্বুর সাথে ছবি। তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে আপার ভাড়া বাসা রাস্তার বেশ ভেতরে। মেয়েগুলোকে স্কুল থেকে হেঁটে ফিরতে হয়। আপার চেহারাতে দুঃশ্চিন্তা তাহলে স্থায়ী ছাপ নিয়ে নিলো! 

দুই মেয়ে ফিরলে তাদের প্রাইভেট টিউটর আসবে। রুবাইকে সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। 

এই বাসায় কোন বারান্দা নেই। জানালার গ্রীলে দাঁড়িয়ে একটু দূরে গার্মেণ্টস ফ্যাক্টরীর কোলাহল ভেসে আসে। বিকেল মরে যাওয়ার আগে মাথা তুলছে।

আপা রুবাইকে গরম পানিতে গা মুছিয়ে দিচ্ছে, মমতাময় হাত দেখতে কী যে ভালো লাগে।

মিলির হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, আজকে ফিরবে না। শামীম রাগে উন্মাদ হয়ে যাবে? গেলে যাক। কাল সে এখান থেকেই অফিসে যাবে, পারডিয়েমের টাকা তুলে আবার মিরপুরে আসবে। শামীমকে একটা খবর দিতে হয়। না, ফোন না, একটা এসএমএস পাঠাবে সে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন