বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম'এর গল্প : কয়েক টুকরো বরফ

গোপন ইচ্ছেটা প্রীতম জানত, খরচ শেয়ারে। সাহসটুকু জোগাড় করতে হাজারটা বিষয় ভাবতে হয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান প্রথম বেতন দিয়ে কী করে? মুদি দোকানের বাকির খাতা থেকে বাপের নাম কাটায় বা টাকার খামটা মা’এর হাতে দিয়ে সিনেমার দৃশ্যের মতো চোখের পানি ফেলে। সবই করেছি শুধু হাজার পাঁচেক টাকা সরিয়ে। ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ করতে করতে একসময় প্রীতম বলেই বসলো, ধুর শ্যালা ঢ্যামনা, নিজের ভাইবোনদের দেখেও কিছু শিখিসনা।
এক বাক্যেই ভেতরে ধাক্কা খেলাম, কী আছে রিকশার পর্দা মার্কা এই জীবনে? ইচ্ছেটাই পূরণ হোক এবার। রিকশার পর্দা যেমন বৃষ্টি ছাড়া কোনদিন সিটের নিচের অন্ধকার থেকে বের হয় না, এ জীবনও তাই। ঈদ নববর্ষ ছাড়া যেন কোন আনন্দ আসতে নেই। সেটুকুও যদি হতো ওই অন্ধকার খুপড়ির মতো বাড়িটাতে। গত দু’বছর ধরে কোন ঈদেই আমার বাবা’র বাড়ি আসার সুযোগ হয়নি। তিনি নাকি ছুটি পান না। এদেশের কোন অফিসটা ঈদের সময় ছুটি দেয়না? মা বলে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি হইছে তোর বাপের, দ্যাখোস না, দুই দিনের জন্য আইসাও রাইত ভইরা টিভির সামনে বইসা ঝিমায় আর দিনে ঘুমায়! ঘটনা সত্যি, মাসে একবার এসেও ফয়জুল হাসান নামের লোকটা কারও সাথে বিশেষ কথাবার্তা বলেন না। হাজার সাতেক টাকা ধরিয়ে দিয়ে আবার নাই। বাপ ডাক শোনার প্রক্রিয়া চরিতার্থে বৈরাগ্যটা বেশি প্রয়োজন ছিল। ঢাকা শহরে চার সন্তান জন্ম দিয়ে এখন এসব তানাবানা করলে হবে! আমি বাবা ওসব ঘর সংসারে পা দেব না। বহু কষ্ট করেছি এতদিন। এই নভেম্বরে একটা উন্নয়ন সংস্থায় জয়েন করে প্রথম বেতন পেলাম। 

মধুপুর বনের ‘দোখলা’ রিসোর্টের কথা বলেছিলাম পকেটের কথা ভেবে। ঢাকা থেকে দূরে নয়, আবার জ্যাম ধরলে কাছেও নয়। দুপুরের আগেই পৌঁছেছি। শাল বনের গাছগুলো বেশ ন্যাড়া ছাড়া টাইপ। শীত ভালোই নামছে এদিকে। প্রীতমের অবশ্য এসবে খেয়াল নেই। নয়তো অমন আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে কেউ বাঘের কথা জিজ্ঞেস করে? আরে এই খরখরে বনে তো বিলাইও থাকার কথা না। বনের কর্মচারিরাও মনে হয় কিছুটা নির্বোধ টাইপ হয়ে যায়। বন সংরক্ষকের অফিসে ভুঁড়ি উঁচিয়ে বসে থাকা লোকটা কান খোঁচাতে খোঁচাতে হোটেলের ম্যেনুর মতো বলল, “ভোরের দিক একটু ভিত্রে গেলে মায়া হরিণ পাবেন, মুখপোড়া হনুমান আছে। সন্ধ্যায় বন মোরগ। দুপ্রে বেজি, বন বিলাই, পাখি নানা কিছিমের”। এই লোকের কথা শুনে প্রীতমের ওপর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ব্যাটা বুড়ো বয়সে বাঘ দেখার শখ, চিড়িয়াখানায় গেলেই হয়। আমরত মায়া কেন নিষ্ঠুর হরিণ দেখার ইচ্ছেও নেই। দুটো দিন শুধু বুঁদ হয়ে থাকতে এসেছি।

- আরে তুই বোকা নাকি? এসব জিজ্ঞেস করে ওই লোকরে একটা ‘ভাইব’ দিলাম।

- কিসের ভাইব? 

- খুব প্রকৃতি টকৃতি দেখতে এসেছি। ইমেজ ক্রিয়েট করা।

- তুই একটা সেই রে। মাথায়ও আসেনি। 

দুপুরে খেয়ে সামান্য একটু গড়িয়ে উঠেই প্রীতম বললো চল, বন দেখে আসি। হাঁটতে হাঁটতে আমলকির বাগান পেড়িয়ে একেবারে শালবনের পাশ দিয়ে এসে পৌঁছালাম হলুদ ক্ষেতের পাশে। এখানকার মাটিও একটু হলদে মতো। পাশ দিয়ে দু’জন মাথায় মড়া ডালের আঁটি নিয়ে চলে গেল। একটু বাদেই হয়ত উঠোনে আগুন জ্বালবে ওই দিয়ে। শীতের বেলার রুগ্ন আয়ুষ্কাল এখন। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই কঙ্কাল সদৃশ পত্রপল্লব বিহীন বনটাতেই মোহময় আলো নামলো আকাশ থেকে। তারপরই দ্রুত পেঁয়াজের খোসার রঙ ছড়িয়ে সন্ধ্যা। বাড়ির জন্য মন খারাপ লাগছে। এমন সুন্দর একটা দৃশ্য মিতু আর মা কেউ দেখল না। প্রীতম গুনগুন করে গানের সুর ভাঁজছে। হঠাৎই ওর মোবাইল। এমন ভাব ধরল যেন এই ফোন আসার কথা ও জানতই না। বন থেকে রিসোর্টের কাছাকাছি আসতেই শায়লা পৌঁছে গেছে। এজন্যই বলি দোখলার নাম শুনে অমন ডিগবাজি দিয়েছিল কেন প্রীতম। একপাশে ডেকে মিন মিন করে বললাম। অলরেডি সন্ধ্যা, এই মেয়ে ফিরবে কীভাবে?

- অত ভয় পাচ্ছিস কেন? না ফিরলে ক্ষতি কি? 

- বাড়িতে?

- সেটা ওর চিন্তা। যে কাজে এসেছিস, তাই কর।

মনটা মিইয়ে গেলো। বেতন থেকে শেয়ারে একটা শিভাস রিগ্যালের বোতল কিনেছি। সেটা এক কথা তাই বলে কেউ যদি জানে, আমাদের সাথে একটা মেয়ে বনের ভেতর।

- তুই একটা দুই পয়সার কয়েন। দেখলিনা বাজারে আইসাই হাওয়া? শেখো শেখো নিজের ঘর থেকেই শেখো।

- দুঃসময়ে পাশে থাকার শোধ নিলি?

- যা বাবা, মিতু ভেগেছিল এটা দুঃসময়? শিখতে বললাম। দশ বছরের ছোট বোনটা নিজের ইচ্ছেতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আর একটা মেয়ে দেখেই ভয়ে তোমার ইয়ে হচ্ছে।

একটু হাঁফ ছাড়লাম। মধ্যবিত্তের সংকট বড় সাংঘাতিক। মিতু মাস তিন আগে কলেজের এক ছেলের সাথে পালালো। ছেলের ফ্যামিলির সাথে কথা বলে, মামলার ভয় দেখিয়ে মিতুকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কাজগুলো প্রীতমই সামলেছে। আমার বাপ মোবাইলে ফোন পেয়ে ঢাকা এসে মা’এর সামনে মিনমিন করে বললো, এত কষ্ট করি তোমাদের জন্য আর মেয়েটারেও একটু সামলায় রাখতে পারো না? 

- কতো কষ্ট করো? পাঠাও মাসে সাত হাজার টাকা। আমার স্কুলের চাকরি না থাকলে কোথায় ভাইসা যাইত তোমার সোনার সংসার?

- আহ্, রেবেকা এভাবে কথা বইলোনা। আগের চাকরিটা থাকতে কি এত কম টাকা দিছি? অফিস বন্ধ হয়ে গেলে আমি কি করবো বলো? 

- কিছুই করবানা। ওইখানে যে সংসারটা সাজাইছ সেইখানে সন্ধ্যা বাতি দাও আর খাতায় হিসাব লিখো। এই সংসারত সবুজ আর আমার ওপর দিয়া তুমি খালাশ। 

- এই একটা কথা কেন তোমার বারবার মনে হয়, আমার চারটা ছেলেমেয়ে আছে। অমন খারাপ কিছু আমারে দিয়া সম্ভবনা কবে বুঝবা? হিসাব রাখার কাজ, ছুটিছাটা নাই।

- তলে তলে কিছু না করলে দুই বছর হইয়া গেল। নেত্রকোনা কতদূর ঢাকা থিকা যে ছেলেটারে পর্যন্ত একবার যাইতে দিলানা?

- রেবেকা, থাক এখন ওইসব প্রসঙ্গ। মিতুরে ফিরায় আনার ব্যবস্থাটা বেশি জরুরি।

- তুমি যে কি ফিরায় আনবা জানা আছে বলে আমার মা এবার মেয়ের উদ্দেশ্যে বাপের মতো নিমকহারাম জাতীয় বাক্য প্রয়োগ করে রান্না ঘরে ঢুকলেন। সেদিন বিকেলে প্রীতম মিতুকে ঘাড় ধরে ফিরিয়ে আনার পরপরই আমার হিসাব রক্ষক পিতা ছুটি না থাকার অজুহাতে ফিরে গেছেন। অবশ্য মোবাইলে দুইবেলা করে মিতুর আপডেট নিয়েছেন। 

একবেলার ভেতরই প্রীতম খবর নিয়েছে, মিতু মুন্সীগঞ্জ পদ্মা রিসোর্টে। ধরে এনে সব ঠিকঠাক করাতে মোটামুটি ভবনদী পাড় হয়েছে আমাদের। তবে এর পুরো কৃতিত্ব প্রীতমের। মাত্র বছরখানেক ধরে বন্ধুত্ব অথচ মনে হয়না, কোনদিন অপরিচিত ছিল। মন খোলা ছেলেটার ওপর রাগও করতে পারছিনা। ভেবেছিলাম, বোতলটা খুলে একটা জমিয়ে আসর বসাবো। খেতে খেতে মন খুলে কথা বলব। সবাই তো অমনই বলে। স্রেফ দুটো দিন একটে রাতই তো একটু হাত পা ছেড়ে থাকতে চেয়েছি। মনটাই খারাপ হয়ে গেল শায়লা নামের বদ মেয়েটাকে দেখে। প্রীতম কি শায়লাকে বিয়ে করবে? ওদের প্রাইভেসি দিতে আমি বারান্দায় বসে আছি। দুজন দরজা খুলেই বসে গল্প জুড়েছে। এরমধ্যে কেয়ারটেকারটা এলো।

- স্যার রাতের রান্না রেডি। কখন খাবেন?

- একটু দেরিতে খাই?

- না মানে, আমি সব গুছায় রাইখা বাড়ি যাবো তাই।

- চলে যাবেন?

- টর্চের আলো ফেইলে পা দিলেই বাড়ি। এই যে কাঁকড়াগুনি গ্রাম দেখা যায়। 

- রাতে তাহলে পুরো রিসোর্ট ফাঁকা থাকে? অন্য গেস্টত দেখলাম না।

- শীতের দিন, মানুষজন কম। 

আমাদের আরেকটা রুম লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে চোরা হাসি দিল লোকটা।

ইঙ্গিত শুনে একটু ঢোক গিললাম। তবে এরা মনে হয় এসব ঘটনায় অভ্যস্ত। তবে ওর সাথে কথা না বলে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। কেয়ারটেকারকে আধা ঘণ্টাবাদে আসার কথা বলে প্রীতমকে ডাকলাম। 

- কি হইছে?

- এই ধান্দা থাকলে আমারে টানলি কেন?

- আরি আস্তে, খেপছিস কেন? সবাই ম্যাচিউরড, অতো ইথিকস দেখাবিনাতো। 

- তোর অফিস থেকে বুকিং দেওয়া, যদি জানে?

- বয়েই গেল। খাবার দিতে বলেছিস?

- না। জানতে চাইছিল রুম লাগবে কিনা।

- বলিস নাই লাগবে?

- তোর সাথে কথা না বলে! খাবার দিতে বলব?

- বল। এইখানে মনে হয় কেয়ারটেকার চলে যায়।

- বলছিলাম কি, তুই তো মনে হচ্ছে শায়লার সাথে গল্প করবি।

- নাহ্, ঠিক করছি ওর কোলে মাথা রাইখা কবিতা শুনব।

- রসিকতা করিসনা। বোতল আমার একাই খুলতে হবে বুঝছি, কিন্তু বরফতো নাই।

- ফ্রিজ আছে কি জন্যে? তোর কি ধারণা ফরেস্ট অফিসারগুলা বাগানের লেবু দিয়া শুধু রঙ চা খাইতে আসে? 

- কত শখ করলাম বনের ভেতর বসে দুই বন্ধু জোসনা দেখতে দেখতে খাবো।

- শোন, আমি তোর প্রেমিকা না, বন্ধু। খাবার দিতে বল। কম হাঁটা হয়নাই পেট চোঁ চোঁ করছে। 

প্রীতম, শায়লা আর আমি খেতে বসেছি। মেয়েটা কেমন স্মার্টলি বললো

- প্রীতম শোনো, বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছু মিথ্যে কথা বলতে হবে তখন কিন্তু সামনে আসবানা।

- আসলে কি হবে?

- সত্যি বলে ফেলব বাড়িতে। বলেই মেয়েটা হাসছে। 

- আরে ধুর সেইটা না হয় বইলো তাই বলে আবার সিদ্ধান্ত বদলাইওনা। এই রাতে তোমারে কিন্তু দিতে যাব না। আমার বন্ধুর আবার বাঘের ভয় আছে। 

বলেই প্রীতমও হাসছে। আর আমার সারা শরীর তখন অপমানে কাঁপছে। শায়লা আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

- এই উঠোনের মতো খালি বনে বাঘ আছে আপনার বিশ্বাস হয়?

- আমি কখন বললাম?

- ওহ্, ও মজা করছে। আচ্ছা আপনি অমন মুখ গোমড়া করে আছেন কেন? শোনেন, আমি গাজীপুরের একটা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়ি। একরাত বাইরে থাকলে বাসায় টের পাওয়ার কথা না। আর আপনি যা ভাবছেন, বিষয়টা তেমন নয়।

- আমি কিছু ভাবছিনা।

- না ভাবলে সহজ হচ্ছেন না কেন? হিল স্যান্ডেলের মতো খট খট করে কথা বলছেন। শোনেন, আমি বাজি ধরে এসেছি। 

- বাজি ধরে আসছেন মানে?

এই কথা জিজ্ঞেস করতেই শায়লা আর প্রীতম আবার হাসছে। আশ্চর্য মানুষ, এত সহজ সবকিছু? ওরাও আহামরি স্বচ্ছল না। আমি কেন পারি না! শায়লা এবার প্রীতমকে প্রস্তাব দিলো, বারান্দায় বসে কবিতা পড়বে।

- পাগল হইলা নাকি? ভিতরে যেয়ে লেপ মুড়ি দাও। আমরা বোতল খুলব।

- তোমরা মদ খাবে! ওমা আমার কি হবে?

- বাজি ধরার সময় মনে ছিল না সুন্দরী? দেখো কি হয়। দুজনই হেসে গড়াচ্ছে মানে আসলেই একটা বোঝাপড়া আছে ওদের। 

খাওয়া শেষ হতে কেয়ারটেকার সব নিতে এলো।

- আমি বাড়ি যাইতেছি, ভোরে আসব। রুম লাগবে কিনা কইলেন নাতো?

- ভালো হতো। আপনারে কত দিতে হবে?

- খুশি কইরা দিয়েন। আসলে রাইতে লোকজন কম বইলা বাড়ি যাই বলে নিজেই একটা সাফাই গাইলো। সেও মনে হয় টের পেয়েছে, আমরা বস লেভেলের নই।

- কিছু প্রয়োজন হলে ?

- অসুবিধা নাই স্যার। গার্ড আছে গেটের কাছে। যদিও একটু বুড়া মানুষ, শীতের রাত গুটায় থাকে। ডাক দিলেই আসব। 

তবে নাইট গার্ডকে ডাক দিতেই সে আসেনি। লোকটা চলে যেতেই আমার মনে পড়লো। বরফের কথাই বলা হয়নি। প্রীতমকে মনে করাতেই সে ঝামটা দিল, সময়মত কিছুই মনে থাকেনা। এখন আর কি, পানি মিশিয়ে চালা। 

চুপ করে আছি দেখে প্রীতম খোঁচাচ্ছে। আচ্ছা তোর সবকিছুতেই এতো আটকায় কেন বলতো? 

প্রীতম কিভাবে জানবে কেন আটকায়? ভাগ্যিস মিতুর বিষয়টা ছাড়া অতকিছু জানেনা। মা আর আমি কতো কষ্টে দুই বছর ধরে সংসার টানছি ও বুঝবেনা। বাপটাতো ঢ্যারশ। অবসরে যেয়ে এখন নেত্রকোনার কোন অফিসে হিসেবের খাতায় রোল টানছে। মাসে একবার বাড়ি যায়। কুঁই কুঁই করে দু’দিন থেকে চলে আসে। উত্তরায় যখন বায়িং হাউজে কাজ করতো তখনো কোন হাতি ঘোড়াটাই মেরেছে সে? দেশের বাড়ির গুষ্ঠিসুদ্ধ আত্মীয়দের প্যানা টানতেই জেরবার। মা নীলক্ষেত স্কুলের প্রাইমারি শিক্ষক। আজিমপুরের তিন রুমের বাসায় আত্মীয় স্বজন নিয়ে ঠাসাঠাসি, মা’এর মেজাজ, তিন নম্বর ভাইটার জ্বরের প্রলাপ, বোনের উচ্চস্বরে পড়া মুখস্ত। জীবনটা তিতিয়ে উঠেছে। ভাগ্যিস বাপটা মাসে যায় বলে মিতু মা’এর সাথে ঘুমায়। এই সুবাদে আমরা তিনভাই এখন দুটো রুম পেয়েছি। অবশ্য তিন ভাই সংখ্যার হিসেবে থাকলেও দু’জন হয়ে গেছে। তুহিন মানে মেঝটার হঠাৎ কী হলো, সে বাড়ি ফেরেনা। শুনেছি কি নাকি পার্টি ফার্টি করে। প্রীতমকে বোঝানো যাবে কোথায় আটকায় আমার? মাত্র চাকরিটা হয়েছে। পুরো পরিবারের ভরসা। যদি জানতে পারে, এখানে একটা মেয়েও ছিল ওদের মনটা ভেঙে যাবে। ধুর সেই বাড়ির কথা, আমার আর মুক্তি নেই। যা আছে কপালে। প্রীতম যা ইচ্ছে করুক। আমার বহুদিনের শখটা পূরণ হোক। ভেবেছিলাম আমি বারান্দায় বসবো। ওরা বারান্দার চেয়ার দখল করেছে। 

ব্যাগ থেকে শিভাস রিগ্যালের বোতলটা বের করে ডায়নিং টেবিলে রেখে গ্লাস বের করলাম। বরফের জন্য ফ্রিজের পাল্লা টান দিয়ে দেখি, তালা। ট্যুরিস্ট স্পটের নিরাপত্তা। মাথায় বাজ পড়লো। বারান্দা থেকে শায়লার গানের সুর আসছে... সে কোন বনের হরিণ ছিল আমার মনে... মানুষ বনে এলেই এই গানটা গায় কেন? মনের ভেতরটা কাঁপছে আমার। নাকি শুরুতেই ধরে গেল? দ্বিতীয় দফা গলায় ঢেলে হাওয়ার উদ্দেশ্যে বললাম ...বন্ধু চিয়ার্স। প্রীতম ভেতরে এসেছে।

- যাহ, একাই শুরু করলি? ওকেও ডাকি। এখানে বসুক, বাইরে যে ঠান্ডা পড়ছে।

মনটা বেশ উৎফুল্ল এখন। শায়লাকে আপন আপনই লাগছে। আহা বেচারি শুধু নারী হওয়ার দায়ে রোষে পড়েছে। আমারই অযোগ্যতা। সারাজীবন ভাইবোনের কাছে আদর্শ চরিত্র প্রমাণের চেষ্টা। বাপটা যে কেন অতগুলো ছেলেমেয়ে জন্ম দিল না হলে অনায়াসে আমাদের মধ্যবিত্ত ডাকাই যেত। যাহ্, বাবা ভালো ধরেছে মনে হয়। দুঃখ দুঃখ ভাব আসছে, এইত চাই। বারান্দার বাইরেই শালবনের গায়ের ভেতর একটা শীতের রাত পায়চারি করছে। সামনে শেষ হতে উন্মুখ শিভাস রিগ্যালের বোতল। আহ্, জিনিসটার রঙটা যা, একেবারে পুড়ে যাওয়া চাঁদের মতো। সুকান্ত কী কোনদিন শিভাস রিগ্যালের সাথে চাঁদ মিলিয়ে দেখার কথা ভেবেছে? আরে ধুর সে বুঝে উঠার আগেই কাট মেরেছে। ধরেই গিয়েছে আমার। এরমধ্যে প্রীতমও ভেতরে এসে আমার গ্লাস থেকে একটা লম্বা সিপ মেরে মুখ বাঁকালো। ধুর বরফ ছাড়া পুরো স্পিরিট। বরফের কথা আগে মনে করবি না? আমি আসলেই একটা ঢ্যামনা। কোনদিন কোন মেয়ের হাতটা পর্যন্ত ধরতে পারলামনা। এই ঢ্যামনা হওয়ার পেছনে কে দায়ি? নিশ্চই ওই ফয়জুল হাসান নামের লোকটা। আমার মনে হয় একটু সাহসও বাড়ছে নয়ত নিজের বাপকে নিয়ে এভাবে ভাবা যায়। এই যা মনটা যেন সত্যি কেমন করছে। আহা বাপটাকেই বা কেন দোষ দিচ্ছি। নেত্রকোনায় হিসেবের খাতায় জের বার হচ্ছে বুড়োটার। কোথায় খায়, কোথায় ঘুমায় কোনদিনত ভালো করে জানতেও চাইনি। যাকগে, আমার কি! বয়সকালে মনে ছিলনা? এখন সামলাও। ঠিক আছে চাকরি যেহেতু পেয়েছি, মাসে মাসে কিছু দেবো তোমাকে বাপ। নাহ্, এই তিতকুটে মালটা আরাম করে খেতেই পারছিনা। একটু বরফ না হলে মহিমান্বিত রাত মাঠে মরতে বসেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে প্রীতমদের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। 

- এই যাচ্ছিস কোথায়? ধরেছে তোকে, পা টলছে। 

- চুপ কর। এটুকু খেয়েই ধরে নাকি?

- ওরে বাপ, দু পেগ চরিয়েই হাই হয়ে গেলি। যাচ্ছিস কোন বনে শুনি?

- বরফ আনতে।

- বরফ আনতে বনে? বাহ্ বাহ্।

- ধুর শালা, গার্ডটার কাছে ফ্রিজের চাবি আছে।

- শীতের রাত এমনি চালিয়ে দে। তবে যে অবস্থা আর না খাওয়াই ভালো, উগড়ে দিবি।

- উগড়াবেনা। দেখ, বরফ আমি বের করেই ছাড়ব ফ্রিজ থেকে। তুই না বলিস আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না?

- কখন বললাম হবে না? বেতন পেয়েই বোতল খুলতে শিখেছিস। তোর হওয়া আটকায় কে। কিন্তু এখন দয়া করে ভেতরে আয়, কুয়াশা পড়ছে তোর মাথায়।


প্রীতম আমার ¯্রফে বন্ধু। মাথায় কুয়াশা পড়ছে এটাও ভাবছে ও। আমার প্রথমে কান্না পেল তারপর রোখ চেপে গেলো। না আজ বরফ চাই ই চাই। সুন্দর করে গ্লাাসের মুখে বিট লবন মেখে, সোনার চাঁদের রঙের পানিতে দু’টুকরো বরফ ছেড়ে দিব। একটা দারুণ গ্লাস বানিয়ে প্রীতমের সামনে ধরে বলব, তোর জন্য। তুই আমাকে এমন একটা রাত দিয়েছিস। শায়লার কবিতা শুনতে শুনতে তুই আমার বানানো গ্লাসে চুমুক দিবি। যাহ এই বোতলের দাম পুরোটাই আমার। নাহ বরফ আমার চাই-ই-চাই। যেন স্রেফ এই অনুপস্থিতিই সব আয়োজন নষ্ট করেছে। আরও দ্রুত পা চালিয়ে গার্ডের ঘরের কাছে পৌঁছালাম। সত্যি কি বেশি খেয়েছি না অনভ্যস্ততা? হালকা লাগছে কিন্তু। গার্ডটা খচ্চর। তোকে পাহাড়া দিতে বসানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত টিকিটাও দেখলাম না। টঙের ঘরটার কাছে আসতে কটেজ থেকে কতদূর হেঁটেছি? কয়েকশ মাইল? দ্যাখো শালার কান্ড, পাহাড়ার নামে কম্বলের ভেতর সেঁধিয়েছে। কী গন্ধরে বাবা ঘরে, কম্বল থেকে আসছে নাকি! ওর ভেতরেই সাপের মতো কুন্ডলি পাকিয়ে ঘুম। আমি যে ডাকছি শুনছেনা? এই যে নাইটগার্ড চাচা, একবার উঠে ফ্রিজ থেকে কয়েক টুকরো বরফ দিয়ে মেহেরবানি করেন। জমছেনা আমাদের। পাহাড়ার নামে নাক ডাকাচ্ছেন? দেখলামতো বনের ভিতর দিকে গাছ কেমন সাবরে দিচ্ছেন সবাই মিলে। এবার দয়া করে উঠুন। এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি, শায়লা হাসছে। প্রীতমও তাকিয়ে আছে বারান্দা থেকে, কেন আমাকে চিনতে পারছেনা? একেই বলে ভালো জিনিস। ভাগ্যিস দাম দিয়ে কিনেছিলাম। গার্ডকে যে ভাষায় ডাকছি প্রীতমের মনে হয় বিশ্বাস হচ্ছেনা। হা হা হা শালা, তোমার একারই সাহস আছে? কিন্তু এই গার্ডটা উঠছেনা কেন? টিনের দরজাটা সরিয়ে আরেকটু এগিয়ে কম্বলের কোনা ধরে টানলাম। হে মহান সম্মানিত চাচা, এই বনের রাজাধিরাজ কৃপা করুন। কয়েক টুকরো বরফ না হলে স্পিরিট সমতুল্য ঠেকিতেছে অমৃত। আপনার চরণে নিবেদন, ফ্রিজের চাবিটি দিন। লোকটার এতক্ষণে হুশ ফিরছে। সবে সে কুন্ডলির জট খুলছে কম্বলের নিচে। আমি বলে যাচ্ছি, বনের রাজা উঠুন উঠুন আপনার সম্মুখে আমি দন্ডায়মান। সামান্য পা টলছে মনে হয় আমার। ঘরটার ভেতর আলো এত কম। ‘দোখলা’ রিসোর্টের নাইটগার্ড কাছিমের মতো কম্বলের তলা থেকে মাথা বের করলো। আমি যেন আরও কি কি বলছিলাম, বরফ বরফ করে। লোকটা তার সস্তা চৌকিতে উঠে বসতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ উঠলো। অন্ধকারেও কি দেখা যায়? লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নাকি আমি হেলুসিনেটেড হয়ে ভুল দেখছি? চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমার দিকে আসছে। মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব। আমার নাম জানলো কেমন করে! এমন ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললো, সবুজ পইড়া যাবা, এইখানে বসো। পড়ে যাচ্ছিলাম, আমাকে ধরে ফেলেছে সে। গার্ড ময়লা কম্বল টেনে দিচ্ছে আমার শরীরে। শরীরের ভেতর শত শত বছর আগের কোন এক পূর্ব পুরুষ বলছে... সবুজ পইড়া যাবা। নেত্রকোনা আর মধুপুর বন কি এক জায়গায়? উফ্! আমার শুধু কয়েক টুকরো বরফ দরকার ছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন