বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

নাসরীন জাহান'এর গল্প : জনক

ঝনাৎ... স্টিলের গ্লাস লাফিয়ে পড়ে মেঝেতে। এবং ইদানীং অল্প ভয়ে ভীত আমার গলার রগ ফুঁড়ে আর্ত চিৎকার বেরিয়ে আসে।

তারপর থেকে আমার অসহ্য রাতজাগার যন্ত্রণার শুরু। পাশের বেডের রোগীর হাত নাড়া লেগে মধ্যরাত তছনছ করেছে স্টিলের গ্লাসটি। এবং সেই অসহনীয় শব্দের ধ্বনি সোডার মতো আমার কোষে কোষে ছড়াতে থাকে। এক জীবনের মতো দীর্ঘ একটি মধ্যরাতের পথ ধরে আমি ক্রাচে ভর দিয়ে এগোই, মূলত এগোনো ছাড়া আমার দ্বিতীয় কোন পথ খোলা থাকে না।
আমাকে রায়হান বলছিল, কিছুটা ঝুঁকে, অস্পষ্ট ফিসফিস-- দেখ, দেখ শিশুটি হাসছে, কি ঝকঝকে দাঁত তার...।

আমিও কি ঘোরে, কি বিস্ময়ে শিশুটির দাঁত দেখছিলাম, তারপর প্রতিবাদ করেছিলাম।--ওতো এখনো পেটে, কী করে দেখছ তুমি!

আমার দৃষ্টি চামড়া ফুঁড়ে গভীরে যায়... স্বপ্নের মধ্যে রায়হানের সাথে এমনই অবিন্যস্ত কথা হচ্ছিল। ইদানিং শিশু, শিশুর হামা দেয়া, তার বিকৃত আকৃতি, লাফানো... মোট কথা শিশুতোষ স্বপ্ন ছাড়া আর কোন স্বপ্ন আমি দেখি না। কিন্তু এর মধ্যে কেমন অস্পষ্টতা, ভয়, বুক খামচে ধরা, বিকলাঙ্গতা এসবই বেশি চারপাশ ছায়া করে থাকে। সুস্থ ঘুম হয় না আমার। হাসপাতালে মধ্যরাতের বাকরুদ্ধ নির্জনতায় ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার মতো করুণ ঘটনা আর নেই। চেয়ে থাক, হাঁটাও চোখ ছাদের অনন্ত পথ ধরে, হৃৎপিণ্ডের কলজে কাঁপানো ঘন্টা বাজছেই... বাম পেটে বসে থাকা শিশু হামা দিয়ে ডানে আসে। কী কষ্টে পাশ ফেরা, শিরশির শরীর কাঁপে।

তারপর আছে সেই অবিনাশী ভয়। সংস্কার, দুশ্চিন্তার ভয়। শকুনের মতো তীক্ষè ঠোঁটে ন’মাস ধরে যে ভয় আমাকে খুবলে খাচ্ছে। পেটে সন্তান নয়, ডাকিনী পুষেছি। যে কোন সময় পেট ফুঁড়ে দীর্ঘ হাত পা বেরিয়ে আসবে। মধ্যরাতে হুবহু সেই দৃশ্য দেখি। শিশু ডাকিনী বেরিয়ে এসেছে, কী বিশাল দাঁত, কালো রক্ত! পুরো হাসপাতাল মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। অথবা এগোচ্ছে আমার দিকে। কে যেন পেটে সন্তান নয়, সাপ ধরেছিল। জন্মের পর ভীত মা-কে পেছনে ফেলে সেই সাপ গহীন বনে চলে গিয়েছিল।... ঈশ্বর সন্তান নয়, তেমন একটি সাপ চাই আমি... আমার বেঁচে থাকা দীর্ঘায়িত হোক।

কী ভয়! বাদুরের ডানার মতো মিশমিশে কালো, সন্তান ভূমিষ্ঠ ভাবনায় আনন্দহীনতার ভয়। সেই সাপ যদি ঠোঁটে বিষ নিয়ে জন্মায় ?

এইভাবে ভয়ে ভয়ে, দিনগুলি রাতগুলি যায়।

রায়হান আমাকে বলে, অমন শাদা চোখে চেয়ে থাক কেন ? তুমি কি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছ ? 

আমার শুকনো ঠোঁটের দু’ফালি আলগা হয়, কেন ? আমার কি মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে ?

ভোগাস... ঝেড়ে ফেলে সে, আজকাল তো শত শত এসব নর্মাল হচ্ছে, ভয় পাচ্ছ কেন ? 

আমি অস্পষ্ট, চাপা কণ্ঠে বলি, বিশ্বাস কর, আমি এই ন’মাসে একবারও মৃত্যু চিন্তায় কাতর হই নি।

তাহলে ? অমন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছ কেন ? রায়হানের এই ধরনের উদ্বেগের কোন উত্তর দিই না। আমার দৃষ্টির সামনে ঝুলতে থাকে একটা ছবি--দেখেছিলাম সেই কবে, একটি উপজাতীয় মেয়ে জননী হলো, শিশুটির জনক ছিল প্রকৃতি। মেয়েটি ঘুমিয়েছিল, পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক তীরন্দাজ। মেয়েটিকে কাঁপিয়ে, নিজে কেঁপে পথের তীরন্দাজ পথেই হারিয়ে গেল। কেবল মেয়েটি জানল প্রকৃতি শিশুটির জনক। গভীর রাতে ঠিক যেখানে সে ঘুমিয়েছিল, সেই ডোবার পাশে শিশুটিকে প্রসব করে চলে এলে আলোময় সমাজে। 

মধ্যরাতের গভীর জঙ্গল তছনছ করেছিল শিশুটির আর্ত কণ্ঠস্বর। আমিও সেই রমণী, হুবহু হেঁটে যাই বনের পথ ধরে, শিশুটিকে প্রসব করি... তারপর দৌড়াই...।

হায়! মধ্যরাত! এই ন’মাসে আমার ওপর দিয়ে কতগুলো সীমাহীন মধ্যরাত হেঁটে গেছে, আমি না গুনে বলতে পারব। প্রথম তিনমাস অনবরত বমি, উপড়ানো বমির স্রোত, কোমর পেঁচিয়ে ধরে সেই বমি হাত দিয়ে স্পর্শ করেছে রায়হান। চারপাশে ভুনা খিচুরী, সারি সারি মিষ্টি, মাছ ভাজির অশ্লীল গন্ধ, পাশে শুয়ে থাকা রায়হানকে মনে হতো জিওল মাছ। সারারাত মাছের গন্ধে থিতিয়ে থাকতাম। তারপর আমার সেই জঘন্য ভাবনা, ক্লান্তি, যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বিন্দু বিন্দু বেড়ে উঠেছে সন্তান। তখনো মধ্যরাত, সারাদিন সেই নিদ্রাহীন কুৎসিত রাতের ভাবনায় সিটিয়ে থাকতাম। আজ সেই সন্তান বড় হয়ে আমার গলা স্পর্শ করেছে, নিঃশ্বাস আটকে আসে আমার । ওর জন্ম, বেড়ে ওঠা এইসব ভাবলে নিজেকে মনে হয় পৌরসভার কর্মচারীদের লোহার আংটার নিচে পড়া পাগলা কুকুর। ইঞ্জেকশন পুষ করা হবে... একসময় ঝিম... কেঁউ কেঁউ করতে করতে ঝিমিয়ে যাব।

হে রাত্রি, হে মধ্যরাত আমাকে গ্রাস কর, ঘুম থেকে জেগে যেন জানালার কার্নিসে আমি কোনো সূর্য না দেখি,... বিড়বিড় করি... ‘ঐ তার আলুলায়িত বেদনার কালো, তারই চুলে দীর্ঘকাল আমার এ স্নান।’ 

আমার সমস্ত কৈশোর জুড়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমার বন্ধু, নীলু, আমি ওকে শাদা হয়ে হয়ে মরে যেতে দেখেছি। নীলু ভয় পেত অন্ধকার। আমি দেখেছি কি সীমাহীন অন্ধকার স্রোতে সেই শাদাকে শোয়ানো হয়েছিল। আমার নিজের বাড়িটি ছিল একটি প্রাচীর। তার মধ্যে আমার একমাত্র স্বাধীনতা ছিল নীলু। নীলু আমাকে শিখিয়েছে একটি বিড়ালের মৃত্যুও কষ্টের। পথ না চিনলেও ছুটতে ছুটতে অনেক দূর চলা, তারপর পথ খুঁজে দিনকে ছায়া করে ঘরে ফিরে বাবার শাসনকে ক্ষুদ্র করে দেখা নীলু আমাকে শিখিয়েছিল। সেই বয়সেই সে পড়েছিল আলেক্সন্দার বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ।’ জলচর ইকথিয়ান্ডরের ব্যথায় নীলু কি নীল ছিল। তার সেই নীলে আমিও নীলার্দ্র হতাম।... একটি অজানা পৃথিবীর রহস্য দুলতো দৃষ্টির সামনে।... একটি ফড়িং ধরেছিল সে, এত আলতো ভঙ্গিতে, সম্ভবত ফড়িংটিও টের পায় নি তার ডানায় ভর করেছে দু’আঙুলের প্রতিবন্ধকতা। উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল-- আল্লাহর কাছে যা, গিয়ে বলিস আমি দোযখকে ভীষণ ভয় পাই।

সেই নীলু। আমার সকাল দুপুর রাত্রি জুড়ে যে ছিল আমার ছায়া, মরে গেল। রেল লাইন ধরে মহাজীবনের দিকে হেঁটে যেতাম, মনে হতো আমি কোনোদিন বাঁচব না। আমার এখানেই শেষ, নীলুহীন আমার কি শূন্য প্রতিদিনের কৈশোর। আস্তে আস্তে সেই শূন্যতায় সবুজ ঘাসের আস্তর পড়েছে। আমি এবারও দাঁড়াতে পারব... এই রকম প্রলোভনে নিজেকে খাড়া করাই। বাঁশ দিয়ে লতানো ডাল সোজা করার মতো।

ঘনঘোর বাতাসের ধাক্কায় পরক্ষণেই ডালের পতন।

হাতের লোম সতর্কভাবে কান খাড়া করে। তেরো নাম্বার বেড জুড়ে তখনো সেই স্টিল পতনের ভয়াবহতা। কম্পিত হাত উঁচু পেটের ওপর রাখি। শিশুটি নড়ছে। ওর এই পেটের মধ্যে বেড়ানোর সময়টাতেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। পাশাপাশি সেভলনের তীব্র গন্ধ নাভি স্পর্শ করে। শেষ প্রহরের নির্জনতায় আমার চিন্তার শিরা উপশিরাগুলি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সন্তানের প্রতি ঘৃণায় বিষিয়ে উঠি। মনে হয়, ‘প্রেম ছিল, আশা ছিল জ্যোৎস্নায়,-- তবু সে দেখিল কোন ভূত ? ঘুম ভেঙ্গে গেল তার ?’

দিনের আলো রাতের ভয়াবহতা শুষে নেয় কিছুটা। উজ্জ্বল আলোর পথ ধরে রায়হান আসে। ওর মুঠোয় ভর দিয়ে ভারী শরীরটা দাঁড়া করাই। হাসপাতালের মিশ্র দুর্গন্ধ, মৃতপ্রায় রোগীর গোঙানি... এইসব থেকে চোখ সরে গিয়ে জানালার কাছে আটকে যায়। আমি স্পষ্ট দেখি যেন, নিচে পা ঝুলিয়ে জানালার কার্নিসে বসে আছে হুবহু জিতুর চেহারার একটি শিশু। কয়েক ফুট বড় হলেই শিশুটি পূর্ণাঙ্গ জিতু।

ভয়! আমার দুই ভুরু একত্রিত। এতে রায়হানের আশঙ্কা, তোমার কষ্ট হচ্ছে ? হায় কষ্ট! নীল কষ্ট! সংস্কারের কষ্ট! আমাকে ন’মাসে বিন্দু বিন্দু গ্রাস করে নিলাক্ত করা কষ্ট। আমি বলি, এই ব্যাপারটার অর্ধেক ভাগ তুমি যদি নিতে পারতে ? এই গর্ভজনিত কষ্টের ?

রায়হান আকুল--খুব বেশি কষ্ট ? 

কী বিচ্ছিরি! আয়নায় রূপ দেখে মুগ্ধ হবো ভেবে মুখ বাড়াই, খুলে ফেলি দুল পাথরের। ল্যাপটে দেই টিপ। কতদিন এমন হয়েছে, রায়হান গভীর ঘুম থেকে জেগে কি এক মোহগ্রস্ততায় আমাকে আকর্ষণ করেছে তার প্রতি, আমার চোখ জেগে থাকার ভারে ক্লান্ত, আমি বিপরীত ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দ্রুত নেমে এসেছি মেঝেতে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই তার নিদ্রিত মুখ দেখে আমার সত্তা উজাড় করা কোমলতা উপচে উঠেছিল।

পোকা হাঁটছে... হাঁটছে হাঁটছে, কী বিচ্ছিরি দ্বিধা দ্বন্দ্ব, নিজেকে চিনি না, চিনি না আমি কে... কোথায় জন্ম... পোকা হাঁটছে... নিসর্গ খেলছে আমাকে নিয়ে, স্রেফ বল, লোফালুফি-- এমনই মামুলি, ফেলে আছড়ে খেলছে... পোকা হাঁটছে, রক্ত মাংসে মগজে শিরায়। রায়হান তখনো মরিয়া ছিল, এত বিষণœ থাক তুমি ? কী হয়েছে তোমার ? রায়হানকে প্রথম পিতা হওয়ার নাজুক অনুভূতি গ্রাস করছে দেখে আমি শূন্য চোখে সেই অনুভূতির দিকে চেয়ে থাকি। নিজের সাথে কতদিন যুদ্ধ, এমনো তো হতে পারে, সন্তানটি রায়হানেরই। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসেব পরমুহূর্তেই আমাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, অন্ধকারের পাঁক থেকে বেরোনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।

চলে যাওয়ার সময় হাজারো সাবধান বাণীর মধ্যে রায়হানের আন্তরিক উচ্চারণ... ইস্! শাদা হয়ে যাচ্ছ! এবার আমারই ভয় করছে।

শাদা হতে হতে নীলু মৃত্যুর ঘনকালোর মধ্যে ডুবে গিয়েছিল, মনে পড়ে। মুখে তবুও চটুলতা-- শাদা হয়ে যাচ্ছি ? ধুৎ! ভয় পাচ্ছ। তুমিই তো চাইতে, আমি আরেকটু ফর্সা হই।

হালকাভাবে নিচ্ছ... রায়হান গম্ভীর। তোমাকে একটা জিনিসই আমি বুঝাতে পারি না, তোমার এসব আচরণের প্রভাব সন্তানের ওপর পড়বে। এটা সায়েন্সের কথা।

সন্তান! কী আজব শব্দ! কী মৃত্যুর মতো নিষ্ঠুর শব্দ! সায়েন্স আর কী বলে! নিয়ম মতো লাল স্রোতের আগমনের পর এগারো, বারোদিনের ডগায় জিতু নামের এক মহাশক্তির দিকে আমি তর্জনীর ডগায় করে আমার দেহটি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। বিজ্ঞানের হিসেবে সন্তান আসার সেটাই একজন নারীর সহজ সময়। বরফের হিম নিয়ে দিন পেরোচ্ছিল। মাসের শেষে যেদিন আমার পুনরায় রঙিন পিরিয়ডের সময়, তার একদিন আগে বিয়ের রাতে প্রবল কান্নার মধ্যে দিয়ে আমি রায়হানের মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম। পরদিন নিশ্চিত আমার ঋতুবতী হওয়ার কথা। কোনোদিন এই নিয়মের বাইরে যায় নি... হলো না। সায়েন্স কি বলে ওই রকম সেইফ পিরিয়ডের দিনে রায়হানের উষ্ণতায় নিমজ্জিত হওয়া সন্তানটি রায়হানের ? কী ভীষণ দমবন্ধ দিন কেটেছে! পরদিন অসুস্থ হওয়ার ব্যাপারটি চেপে গিয়ে রায়হানকে আমি আমার ডেট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তী এক সপ্তাহ অব্দি। এক সপ্তাহ পেরুলে তখনো যখন স্রোতের কোনো সন্ধান নেই, রায়হান আপ্লুত। আর আমার ‘ভীত প্রেম বুকে জড়ো, কোলাহল উঠে নখ থেকে।’ জঙ্গলের গহীন থেকে জুজু বুড়ি ডাকে... আয় সোনা আয়।

তার জটাচুলে নিজেকে পেঁচিয়ে, জট থেকে বেরিয়ে তার মুখের গন্ধে প্রবেশ করে, আবার বেরিয়ে... দিন যায় ক্রমশ...। 

রায়হান চলে গেলে শুরু হয় পাশের বেডের রোগীর এক জীবনের গল্প। কান দুটি শূন্যে পাঠিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকি। ভদ্রতায় মাথা নাড়ি। বুকের মধ্যে ইটের ভাঙ্গন চলতে থাকে ক্রমাগত। ফ্যানের বনবন আমার অস্তিত্ব তোলপাড় করে।

আমি স্পষ্ট একটি বিশাল নদী দেখি, তার ওপর অসংখ্য ঢেউ দেখি, তার ওপর একটি নৌকা ভাসতে দেখি, নৌকায় ভেজা কাপড়ের আমাকে শায়িত দেখি, জিতুকে মুখের কাছে উপুড় হতে দেখি, ছোট্ট রেকর্ডারে নষ্টালজিয়া আনন্দশংকরকে কাঁদতে দেখি। আকাশের নিচে এমন একটি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার কিছুটা খেসারত আমরা দু’জনই দিয়েছিলাম। তীরে দাঁড়ানো কিছু উটকো ছেলের অশ্লীল মন্তব্য। যাকগে, আমাকে জিতু প্রতারিত করেছে... তেমন বিরহে আমি বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি না, বিয়েটা ভালোবাসার উৎকৃষ্ট পরিণতি। কিন্তু সব কিছুর পরেও আমি শেকড়ের মধ্যে লালন করি এমন কিছু গতানুগতিকতা, ঝেড়ে কাশলেও যা খসতে চায় না। আমার বিবেকের মর্মমূল পর্যন্ত এই বিশ্বাস পৌঁছে গেছে... রায়হানকে আমি ঠকাচ্ছি। এবং নৈতিকভাবে সেই অধিকার আমার নেই।

ব্যাপারটা তার কাছে প্রকাশ করার মতো সাহস, যোগ্যতা কোনোটাই আমার নেই। ফলে, ‘একশো বনের বাতাস এসে একটি গাছেই হুলস্থুল’।

ভালোবাসার পাগলামির সময়টাতে জিতুর ব্লেডের তীক্ষèতায় হাত কেটে ফেলার বিন্দু বিন্দু রক্তে হাসপাতালের বেডে আমি পেট ফুঁটো মাছ ভেসে থাকি।

লম্বা নখ চেপে ধরি তলপেটের উঁচুতে। রাত্রি এসেছে নিয়ম মতো। তলপেটে আধা চাঁদ আকৃতির সরু দাগ বসে যায়। দাগটা পেট থেকে ক্রমশ বুকের ওপর উঠে আসে। বিহ্বল তাকাই চারপাশে। যেন লাশকাটা ঘর, লম্বা পড়ে আছে মানুষের লাশ। আমার রুগ্ন সত্তা ছুটতে থাকে, নীলুরে... তোর মৃত্যু কতটা শাদা ? কতটুকু শাদা ধারণ করলে আমি নীলু হবো ? আমি চুমুক দিয়ে পান করি কৈশোরের সবটুকু বিষ্... ওহ্ রায়হান, আমার স্বামী রায়হান... এরকম বিড়বিড় করে জোরালোভাবে অর্ধাঙ্গনকে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকি আমি। যদি সব জানো তুমি, ঘৃণার ফেনায় কতটুকু কুৎসিত, অস্পষ্ট হবে তুমি ? দ্বিচারিণী... অসতী... এমন কত শব্দ তুলে আনবে অভিধানের অসংখ্য শব্দ খুঁড়ে... ?

শুয়েছিল নীলু। ওর শরীর কাঁথার নিচে। একটি বৃদ্ধা বসেছিল মাথার কাছে এমন ভঙ্গিতে, যেন মৃত্যু দাঁড়িয়েছে তার সামনে। কুঁচকানো আঙুল নীলুর অসংলগ্ন চুলে ঢুকিয়ে ভাঙ্গা কণ্ঠে বলছিল,... ঘুমোও, ঘুমোও...। ওই মহিলার মুখ মনে হতেই মা’র মুখ এগিয়ে আসে। সৃষ্টিকর্তার মুখোমুখি সেজদায় পড়ে থাকা মা’র স্বপ্নেও কি কোনোদিন মেয়ের এই আকৃতি ধরা দেয় ? কি বিশাল দেয়াল ছিল চারপাশে, ধর্ম বাবাকে নিষ্ঠুর করেছিল। সারাক্ষণ লাল চোখ এবং ত্রস্ততার ভয়। যেন সৃষ্টিকর্তা রামদা হাতে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ের বিভীষিকায় কঠোর বাবা আমার চারপাশে অন্ধকার, ইটের পর ইটের গাঁথুনি... আমাকে ফ্রেমবন্দি ফটো বানিয়ে ফেলেছিলেন। জিতু তার যৌবন দিয়ে সেই প্রাচীর টপকেছিল। 

বিদ্রোহের স্বাধীনতা এবং আমার ভেতর তাঁদের সিরিঞ্জ দিয়ে প্রতিদিন বিন্দু বিন্দু সংস্কার ঢোকানোর ফলে আমি হয়েছি মিশ্র।

পরদিন অল্প অল্প ব্যথা। নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি... সহজ হও... জীবন অনেক দীর্ঘ... পৃথিবী অনেক বিশাল। রায়হানেরই এক বন্ধু সেই সহজতার ওপর ফলমূল রাখতে রাখতে বলে, প্রার্থনা করি, আপনার ছেলেটা রায়হানের মতো চমৎকার হোক।

ভেতরের বিস্ফোরণ চেপে ক্ষেপে উঠি আমি, আমার মতো হলে অসুবিধে কী ? আমি কি খুব মন্দ ?

না না... সে বিব্রত, ছেলে হবে বাবার মতো, এটাই তো সুন্দর।

ছেলেই হবে, কে বলল ? তাছাড়া সন্তান হবে আমার মতো... কী এক গোয়ার্তুমিতে আমি বালিশের মধ্যে তলিয়ে যাই। বিব্রত বন্ধুটি অপ্রস্তুত হয়ে বলে, আমি এত কিছু চিন্তা করে বলি নি।

ঘুম আসে, আসে ঘুম আমার চোখে, আমাকে ডুবায়, ভাসায় আমাকে ডুবায়, ভাসায় স্রোতের ওপর, ডুবায়, ঘুম,নাকি লুকিয়ে থাকার ভান ? ডুবায়...।

কী আশ্চর্য! সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, সন্তান জন্মের কোনো লক্ষণ অনুভব করছি না। ঘুমভাঙ্গা ভোরে আমি এই সত্যটা আবিষ্কার করি। কাঁথা এসেছে রায়হানের বাড়ি থেকে। সেগুলো বিন্যস্ত করে, বিছানা পেতে আমি সকালের মেঝে ধরে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় আসি। লম্বা করিডোর। অনেক নিচে ঘাসের কার্পেট। ‘--এই যে লকার দেখো, এইখানে রাখো ডান হাত, এখানে গুপ্তধন, এইখানে সেই বস্তু থাকে।’

তারপর বেডে ফিরি। যথারীতি রায়হানের প্রবেশ ঘটে। তারপর ডাক্তার, শাদা নার্স। আমাকে চমকে দিয়ে রায়হান এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে-- তুমি কাউকে ভালোবাসতে আগে ? নিজেকে সামলে আমি ঠোঁট চেপে বলি, এখন নয় কেন ?

আবারো ইয়ার্কি! সে সিরিয়াস। গত রাতে কেন যেন মনে হলো আমার। তারপর বিয়ের পর থেকে তোমার আচরণ খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলাম, আমার সন্তান তোমাকে আনন্দ দিচ্ছে না ঠিক। 

তোমার সন্তান! ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠি। আবার গোলমাল, নাজুক বিপর্যয়। এই তো সুযোগ! আমি কি বলে দেব ? বলে দিয়ে বিপর্যয় ডাকা পুণ্য ? ঢেকে রাখা পাপ ? আসলে কি পাপ কোথাও আছে ? এক মহাশক্তি সিঁড়ি দিয়ে টানতে টানতে আমাকে তিনতলায় নিয়ে গেল। তিনতলায় নীল সন্ধ্যা নেমেছিল, সন্ধ্যায় কি পাপ ছিল ? সেতারের মৃদু ছন্দে ? নাতিশীতোষ্ণ ঘরের আরামে, মিষ্টি গন্ধে, ফোমের শয্যায় পাপ ছিল ? প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়েছিলাম যে অমোঘ সুখে, সেখানে ? কিংবা জিতুর সেই কণ্ঠে.. জীবনে কিচ্ছু চাই না। বিয়ের কোনো প্রথায় আমার বিশ্বাস নেই, তোমাকে ব্যবহৃত আসবাব করব না তাই। শুধু আমার একটি ভ্রƒণ, আমার সব গভীরতার স্বাক্ষর, সৃষ্টিকর্তা যদি চান, তবে স্থাপিত হবে তোমার ভেতর। এই ভ্রƒণের এটাই যোগ্য স্থান... তারপর চলে যাব... কোথায় যাব ?

সেই কণ্ঠে আমার সব দেয়াল ধ্বসে পড়ায় পাপ ছিল ? নাকি রায়হানের পাশাপাশি সন্তানকে কেন্দ্র করে আমার মৃত্যুর মতো দ্বন্দ্ব, গ্লানি, এটাতে পাপ ? আমি কী জানি ?

রায়হান আমার নিশ্চুপতার দিকে চেয়ে আছে। আমি সমঝোতা বুঝি, মানিয়ে চলা বুঝি, আমি বলি, তোমার উদারতা ঢাকা সন্দেহের অবসান হোক। আমার ভয়কে তুমি অশ্রদ্ধা করছ।

তারপরই আমার সরল স্বামীটির অনুতাপ শুরু হয়। এবং সে দিন থেকেই আমার নিজের প্রতি ঘেন্নার শুরু। ফ্লাক্স, ঝুড়ি, ফিডার..আর্থিক সঙ্গতির বাইরে প্রবল উৎসাহে এসব কিনছে রায়হান। আমার শাদা চোখের সামনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁথা ওড়ে, ঝুড়ি ওড়ে, বেলুন ওড়ে... হেঁটে যায় আমার সন্তান, যেন তার দিকে তর্জনী তুলে জিতু... তার দু’হাত ধরে ঝাঁকায়, বিপন্ন কণ্ঠে বলে, বাবা বলো, বাবা।

কী চমৎকার হৃদয়ের বিশালতা, বিশ্বাসের বড়ত্ব, নিজের ভ্রƒণের প্রতিপালন করবে অন্য মানুষ, তবুও ভ্রƒণ দেয়া চাই, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কি লোভী, ক্ষুদ্র আকাঙক্ষা! এইসব ভেবে ভেবে ন’মাসে নিজেকে আমি শূন্যে নামিয়ে এনেছি। আমার সন্তানের কোনো যথার্থ বাবা নেই, এই শূন্যতা আমি কোথায় লুকাই ? রায়হান যত সরল, আমার কষ্টের শেকড় ততটা গভীর।

ঘরে হয়তো চেয়ে দেখছি এক দৃষ্টে এ্যাকুরিয়ামে মাছ। কমলা, নীল...। রায়হান সহজ স্বপ্নে লিপ্ত, ছেলে হলে নাম রাখব...।

আমার মেয়ে হবে, আমি বলি... চোখ মাছেই নিবদ্ধ।

আমি বলছি ছেলে... দুটি মাছ একাত্ম হচ্ছে, আবার দুদিকে। তিনতলার আদিমতা আমাকে টেনে নেয়। জিতুর মুখ ভিজে গেছে, ফোঁপানো কান্নায় আমি ওর আকাশি শার্ট ডুবিয়ে দিচ্ছি।

টেবিলে রাখা ডায়রি দিয়ে এ্যাকুরিয়ামে সজোরে আঘাত করি। একাত্ম হওয়া দুটি মাছ চমকে দু’দিকে সরে যায়।

ভীষণ বিস্মিত রায়হান দাঁড়ায়, তুমি কি ভাবছ মেয়ে হলে আমি...।

সারাদিন বৃক্ষপতনের শব্দ স্মৃতির ভেতর। সারারাত ভীত ত্রস্ত হরিণের পাল, ধাবমানতার শব্দ রেখে যায় বুকের ভেতর।

আমার পুরোটা জীবন কি এইভাবে যাবে ? সন্তানের ভেতর জিতুকে আবিষ্কার করে, ওকে কেন্দ্র করে ডালপালা মেলতে থাকা রায়হানের স্বপ্নে... দ্বন্দ্বে, কষ্টে... এই রকম অর্থহীন অস্থির জীবন যাবে ? আমি কি কোনোদিন সুস্থ গাছ হতে পারব না ? আমার চুড়ো কি স্পর্শ করবে না আকাশ ? এই রকম রক্তপাত, এইরকম সিদ্ধান্তহীনতা, বিবেকের পচা কামড়... এক জীবন ? আর আমার সেই ক্ষয়িষ্ণুতার ওপর পা ফেলে লাফাবে উদ্ভাসিত সন্তান, তার ডাল হবে, পাতা হবে, আকাশ ছোঁবে সে।

তোমাকে একটি কথা বলব আজ... নিজেকে ভয়ঙ্করভাবে প্রস্তুত করে রায়হানের মুখোমুখি হই। বলে দেব সব। তারপর একদম একা হেঁটে যাব পতনের পথ ধরে। নিজেকে সুতো বেঁধে উড়িয়ে দেব শূন্যে, গ্যাস বেলুন। আগ্রহী রায়হান আমার মুখোমুখি হয়, এমন ভঙ্গি, যেন সে জানেই তাকে বলার মতো কিছু বিষয় আমার সংরক্ষিত আছে।

কী লাভ একটি মানুষের স্বপ্নের ভেতর ফাঁকির হাওয়া ঢুকিয়ে ? সে জানুক, এ সন্তান তার নয়, জেনে সিদ্ধান্ত নিক এরপর তার পক্ষে আমাকে করুণা করা সম্ভব কি-না। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসেবে যদি হেরফের হয় ? সন্তানটির পিতা যদি রায়হানই হয়ে থাকে... এ-তো আরো ভয়ঙ্কর জটিল বিভ্রাট।

সুইপার হাসপাতাল ঝাঁট দেয়। ভারি শরীরে মেঝেতে দাঁড়াই, ঝি চাদর পাল্টে দেয়। পাশের বেডের রোগী ঝেড়ে থুথু ফেলে মেঝেতে। কী যে হাঁসফাঁস লাগে! একটি আলগা বোঝাকে দীর্ঘদিন গায়ের সাথে বয়ে বেড়াও। এতে যদি বিন্দুমাত্র আনন্দও থাকত!

কী কথা... ? রায়হানের আগ্রহ গলা স্পর্শ করছে।

আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমার পেট থেকে একটি বিড়াল বেরিয়েছে... অদ্ভুত কায়দায় কথাটা ঘুরিয়ে ফেলি। অ... নেতিয়ে পড়ে রায়হান। ও-কি ভয়ঙ্কর কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল ? আশাভঙ্গ হয়েছে ? মানুষের নিজে সহ্য করতে পারবে না, এমন কথা শোনার এত আগ্রহ থাকে কেন ? রায়হান খাড়া হয়..সব বিকারগ্রস্ততা! তুমি অঘটন না ঘটিয়ে ছাড়বে না।

জান, যখন নীলু মারা যায়, তখন সন্ধ্যা ছিল... আমি বলে যাই। ওর বাসায় যাওয়ার জন্য আমি যখন সরু গলিটা পেরুব, একটি ভয়ঙ্কর বিড়াল, খাড়া লোমে আবৃত, অদ্ভুত কালো, আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, কি মৃত্যুর মতো তার চোখ, ঝাঁক ঝাঁক লোমের গভীরে জ্বলজ্বল করছিল... মনে হচ্ছিল... এবার আমি নেতিয়ে পড়ি।

যথারীতি গাঢ় দুশ্চিন্তাসহ প্রস্থান ঘটে রায়হানের। 

ভয়ঙ্কর গন্ধ। একটা শিরশিরে চুলকানো, রক্তে রক্তে। শিরার ভেতর পিঁপড়ে হাঁটে।

‘হায়! পৃথিবীতে কে কেমন আছে, কেউ তা জানে না।’

পুনরায় বৃত্তাকারে ডাক্তাররা, শাদা নার্স। কিঞ্চিৎ বিচলিত কেউ কেউ... এরা যদি বলত হয় মা, নয় সন্তান... আমি উদ্ভাসিত হয়ে উঠি... রায়হান কোনটা চাইত ? সবাই কোনটা চায়... বীজ, না চারা ?

পুনরায় রাত্রি। এরমধ্যে বাবা এসে দেখে গেছেন আমাকে। মা’র অসুস্থতা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ ছাড়াও তাবিজ টাবিজ বেঁধে দিয়ে গেছেন কব্জিতে। আমার অস্থিরতা ক্রমশই উঁচুতে উঠছে। গরমে, গন্ধে বমি উগড়ে আসে। মাঝে মাঝেই পেটের এক অংশে চিনচিনে ব্যথা টের পাই। ডাক্তার বলে, ফল্স পেইন। ধরা যাক গভীর যন্ত্রণা, আমি তড়পাচ্ছি। চারপাশের মৃতের নিঃশব্দতার মধ্যে আমার গোঙানি... ডাক্তার বললেন, মৃত সন্তান হয়েছে।

মাথা থেকে শিরা বেয়ে ঘাম পায়ের পাতায় নামে। ধরা যাক, জন্মের পর শিশুটি ঘুমিয়ে আছে আমার পাশে, আমি আমার আঙুল চেপে ধরলাম তার গলায়। আমার এক জীবন বিধ্বস্ত করা শিশুটিকে স্থির করে দিলাম। মৃতের যন্ত্রণায় আস্তর পড়বে ক্রমশ। কিন্তু বেঁচে থাকলে, চোখের সামনে, বুকের মধ্যে প্রতিদিন খচখচ।

আল্লাহ্! আমাকে শক্তি দাও। রাতের ঘন-নির্জনতায় আমাকে এইসব জটিলতা আঁকড়ে ধরে। কী চমৎকার শিশুটি ঘুমন্ত... আমি তার গলায়... অদ্ভুত এক পথ। তারপর আমি আরো কয়েক বছর পর রায়হানের সন্তানের সামাজিক মা হব। জন্মের স্বীকৃতি নিয়ে কোনো দগদগে গ্লানির পাঁকে আমাকে আর ডুবতে হবে না।

আমি যখন এইসব ভাবছিলাম তখন রায়হান আসে, ওর হাত আমার মুঠোয়। কী কোমল হাত, ওর এত কাছে আমি... এত ভয়ঙ্কর চিন্তা করছি। ভাবনার যদি শব্দ থাকত ? নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ফ্যান ঘুরছে হাসপাতাল তোলপাড় করে। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

জানো রায়হান... এক সপ্তাহ আগে আমি একটি মুরগি কাটছিলাম। পুরো গা ছিলার পর যখন দা দিয়ে হাত পা আলগা করছিলাম মনে হচ্ছিল আমি আমার শিশুটির হাত পা কেটে ফেলছি। কী ভয় পেয়েছিলাম... আমি এখনো স্পষ্ট শিশুটির সেই অবস্থা দেখি...। রায়হান চিৎকার করে উঠে প্রায়... তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছ! তারপর নিজেকে সামলায়। কী চমৎকার একটি ছবি টাঙিয়েছিলাম, বিছানায় তোমার পায়ের কাছে, সাবানের ফেনায় একটি শিশু স্নান করছে... রায়হান আমাকে সুন্দরের পথে নিয়ে যায়... তুমি তার চেহারা ভাব। ওইরকম একটি শিশুর মা হবে, ভাব।

ওসব সাবানের ফেনা নয়, ঘিনঘিনে বীর্য... বলতে বলতে আমি বমি উগরে দেই, প্রতিদিন আমার তা-ই মনে হতো। তোমাকে বলি নি।

আমাকে আছড়ে ফেলে রায়হান ছুটে যায়, সম্ভবত ডাক্তারের রুমে।

যেন প্যাথিড্রিন নিয়েছি, এমন অবশ পড়ে থাকি আমি। জিতুর চুম্বন, উষ্ণ নিঃশ্বাস... টের পাই আমার নিঃশ্বাসের কাছে। জিতুর ঘামের গন্ধ, বুকের লোম...। আমি চোখ বুজে ওই বুকে হাত রাখলেও ওকে চিনতে পারব। সন্তানটি আমি জিতুর হাতে তুলে দেব... বলব, দেখ ওর বুকেও হুবহু এক গন্ধ। এই গন্ধ আমি পারফিউমের স্রোতেও ঢাকতে পারব না।

বিশাল শূন্য আকাশে চিল উড়ছে... চিল ও চিল... কোথায় তোমার বাস ? 

আকাশে। আমিও আকাশে যাব... তোমার ঠোঁটের নিচে লুকিয়ে রাখব আমার সন্তানকে। তোমার উড়ন্ত ডানার নিচে আমি চেয়ে চেয়ে তার হাসি দেখব।

অল্প অল্প করে ব্যথা বাড়ছে। বিছানায় ছটফট করি। আমার সন্তানের যথার্থ পিতাটি যদি একবার আসত। দাঁড়াত আমার পায়ের কাছটিতে। তার চোখ দেখে তাকে ঘৃণা করার যন্ত্রণাটি একবার যদি ভুলে যেতাম ?

বেঁচে থাক সন্তান... আমি বরং নীলু হয়ে যাই। এক ধাপ এক ধাপ করে ব্যথাটা বাড়ছে। ভীষণ অন্ধকার স্রোত! কবে কোথায় দেখেছিলাম পাথর ভাঙ্গছিল এক লোক... তার হাতে ফোস্কা পড়েছিল। বড় বড় ফোস্কা। কী ভয়াল গর্ত! জিতু আমাকে বই দিয়েছিল... সারি সারি বইয়ের স্তূপে আমাকে তলিয়ে সে চাইত আমি হই খোলা মানুষ। নিজে সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করত না। অথচ ভ্রƒণ স্থাপনের সময় সে সৃষ্টিকর্তাকে মধ্যে রেখেছিল... চাই তো আমিও হই সৃষ্টিকর্তাবিহীন। সৃষ্টিকর্তার অবারিত ছাদ সরে যাক... বৃষ্টিতে ভিজি আমি ক্ষয়িষ্ণু বৃদ্ধা। মাঝখানে পড়ে আমি দু’দিক হারিয়েছি, মৃত্তিকা নেই পায়ের তলায়, মাথা ঠেকাব, আকাশ নেই... কী অপার শূন্যতা! টলমল হেঁটে আসে বিবেকযন্ত্রণা... রায়হান গিনিপিগ... স্রেফ বল..খেলছি। সন্তান তুলে দেব ওর হাতে। নিজের ভ্রƒণের পরিপূর্ণতা ভেবে প্রসারিত হবে ওর ঠোঁট।

সৃষ্টিকর্তা! তোমাকে বিশ্বাস করি। তুমি আছ বিশ্বাস করি। আমি মৃত্তিকায় দাঁড়াতে চাই... আমার ব্যথার যন্ত্রণা তুমি শুষে পান কর।

রাতের গভীরতার মতোই যন্ত্রণার গভীরতা বাড়তে থাকে। বুক থেকে সব কুয়াশা সরে গেছে শরীর যন্ত্রণার তোড়ে। কি ভীষণ কষ্ট! থেকে থেকে কোমরের পেছন থেকে ঘা দিচ্ছে এমন এক শক্তি... যেন বল্লমের ধার। আমাকে খুঁড়ছে। ঘনঘন দেখে যাচ্ছে ডাক্তার। এক সময় আমার বিষাক্ত দেহ ট্রলিতে উঠানো হলো। কোথায় যাচ্ছি আমি! আমার গতিময় শরীর খিঁচুনি দিয়ে উঠছে। দাঁতের সাথে দাঁত লেগে যাচ্ছে। তিনতলা... জিতুর স্পর্শ কি কুৎসিত... কাঁচা টয়লেটের গন্ধ। থরথর কম্পিত দেহকে অন্য কোথাও রাখা হলো। ঈগর... তুমি কি তোমার ঠোঁটের ভেতর আমাকে স্থান দিচ্ছ ? ধর্মমতে ব্যভিচারিণীর শাস্তি কি... মাটিতে পুঁতে তার মাথায় পাথর ছুড়ে মারা ? আমার ভাবনার শব্দ কি শুনে ফেলেছে সবাই ? পাথর ছুঁড়ছে আমার মস্তকে ?

হেঁটে যাচ্ছি... যেন কয়লার খনি... সারি সারি শ্রমিক, কয়লা... তার নিচে, সেই ঘন কালো গহ্বরের পথ ধরে নেমে যাই... ওগো মেয়ে, জননীযন্ত্রণা... নেমে যাও মৃত্যুর কয়লাখনিতে। হাওয়া নেই, রোদ নেই, ‘কোথায় হারিয়ে এসেছ তোমার বুকের সেফটিপিন ?’

আমার শেষ আর্ত চিৎকারের মধ্যে, আমাকে ফুঁটো মাছ নির্ভার করে দিয়ে বেরিয়ে আসে একটি শিশু। আমার নেতিয়ে পড়া শরীর ঢেকে যায় তার অবিশ্রান্ত চিৎকারের শব্দে। এত কান্না জমা ছিল ওর বুকে ?

তারপর সকাল। ভয় পাচ্ছি। শিশুটির মুখে, বুকে যদি সেই গন্ধ থাকে! তাকাতে ভয় পাচ্ছি। এই তো শুরু হলো একটি শিশুর পরিচয়হীন জীবনের। অন্ধকারে পুনরায় ধাবিত আমি শক্তি সঞ্চয় করে শিশুটিকে দেখি।

হাত পা নাড়ছে। হঠাৎ কি এক আবিষ্কারে আমি উদ্ভাসিত হয়ে জেগে উঠতে থাকি। এত অপাংক্তেয়, এত ক্ষুদ্র করেছি নিজেকে নিজে! নিশ্চয়ই পরিচয় তার আছে। কুয়াশার জট থেকে বেরোতে বেরোতে রোদের আলোয় শিশুটিকে উল্টেপাল্টে দেখি। বিচিত্র আনন্দের মধ্যে জিতু নয়, রায়হান নয়, শিশুটির একমাত্র জনক হিসেবে এক সময় আমি নিজেকে চিহ্নিত করি।

২টি মন্তব্য:

  1. কি অসাধারণ বিশ্লেষণ!ঘটনার নানান ঘনঘটা নেই, সময়-স্থান-কাল পাত্র চরিত্র বর্ণনার বিশদ প্রয়োজন হয়নি তাঁর। অথচ যা' লিখলেন, যেভাবে ভাবলেন - তা' অন্যরকম দারুণ! অদ্ভুত সব অনুভুতির আবিষ্কার, কি গভীর করে দেখতে পাওয়া!

    উত্তরমুছুন