বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

প্রতিভা সরকার'এর গল্প : বডিগার্ড

আমি জানি আমার কমলা রং স্যুইমস্যুটে ঢাকা শরীরের কারণেই কলেজ স্কোয়ারে এই সময়টা এত ভীড় জমে। এই সময়টা, মানে যখন ইউনিভার্সিটির পেছনে ওই একই রঙের সূর্য ট্রামলাইনটাকে ছায়ায় ঢেকে টুপ করে উধাও হয়ে যায়, আর ফেরার তাড়া চিউইংগামের মতো আটকে যায় মানুষজনের শরীরের পেছনটায়। তাতে আমার কিছু না অবশ্য, আজ প্রায় ন'বছর হল সাঁতার কাটতে আসি এখানে।
মোটাসোটা বাচ্চা ছিলাম ছবছুরে, তখনও দেখেছি ওই চিউইংগামের মতোই চিপকে থাকা চাহনি, এখনও দেখি, শুধু দেখেই যাই। নিজেকে মাঝেমাঝে মনে হয় বলরামের বেকড রসগোল্লা, নাগালে পেলে তারিয়ে তারিয়ে খাবার জন্য বিন্দাস মুখের সারি, কারো বয়েস আমার বাবার মত, কেউ যেন ক্লাস টেনের বন্ধু। এরমাঝে ছোটবড় যারাই আছে, সবাই রেলিং আঁকড়ে ধরে প্রায় ঝুলতে থাকে, কখন বিকিনি পরা নায়িকা এন্ট্রি মারবে। এইতো গতবছর পুজোর সময় কাশ্মীর ট্যুরে যাব বলে মায়ের সাথে বসে দেখলাম কতবছর আগেকার ফিল্ম, কাশ্মীর কি কলি। ছবিটায় শর্মিলা ঠাকুর, মানে করিনা কাপুরের শাশুড়ি বিকিনি পরে প্রেম করছিল। কিন্তু বুড়োগুলোরও চোখ সওয়া হয়নি দেখছি এই কলকেতা শহরেও। আর বর্ধমানে মামাবাড়ি গেলে তো স্ট্রিক্ট বারণ আছে সাঁতারের কথা কাউকে বলতে। মায়ের ধারণা, এতবড় মেয়ে কলেজ স্কোয়ারে গিয়ে সাঁতার কাটে এটা শুনলেই নাকি সবাই বুঝে যাবে আমি স্যুইমস্যুট পরি।

ভাগ্যিস বাবার উৎসাহ ছিল। নাহলে বেরিয়ে যেত স্কুবা ডাইভিং এর স্বপ্ন, প্রবাল প্রাচীর, নীল তিমির ফিন ঘুরিয়ে স্লো সাঁতার আর এই পোষাকে আমার নাচনকোঁদন। বাবার কাছে প্রথম শুনি এলীন লোনারগানের কথা। স্কুবা ডাইভিংএর আনকনটেস্টেড রাণী। অস্ট্রেলিয়া গ্রেট বেরিয়ার রিফে হাবি টমকে নিয়ে ডাইভিং এক্সপিডিশনে গেছিল। সঙ্গে আরও ডাইভার ছিল। কিন্তু বেমক্কা হারিয়ে গেল এলীন। সঙ্গের মানুষগুলোকে নিয়েই। আজ অবধি এদের শরীরগুলোর টুকরোটাকরাও চোখে পড়েনি কারো। 

তাতে কি, যখন কলেজ স্কোয়ারের এই পঁচিশ মিটার উঁচু পাটাতন থেকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিই এই শরীর, আলতো মোচড়ে সোজা হয়ে লাট্টুর মত ঘোরাই নিজেকে, তখন এই হাতদুটোকে মনে হয় দুই ডানা! আমি একটা এলবাট্রস পাখী, নিচের জলে পড়লেই হয়ে যাব একটা বিশাল নীল রঙের তিমি। তখন আমার ভয়ডর থাকে না, গোলদীঘির নিচে গজিয়ে ওঠে অদৃশ্য প্রবাল প্রাচীর, তারা স্লো মোশনে ভাসতে থাকে, নড়তে থাকে, আমাকে ডাকে, আয় আয়। হারিয়ে যাব জানলেও সে ডাক অগ্রাহ্য করি এমন ক্ষমতা আমার নেই। তখন আমার হাত ধরে থাকে স্বয়ং এলীন। তার সোনালী চুল লেপ্টে থাকে ভিজে বুকের ওপর। আমার চোখে ছুরির মতো ঢুকে থাকে নীল চোখের অভয় দেওয়া চাহনি। ভয় কিসের! দাঁড়িয়ে থাকুক লোভী হ্যাংলাদের দল। যা দেখলে ওদের সুখ হয়, দেখতে থাকুক।

নাহলে যখন কাজলদা মারা গেল জলে ডুবে, মা কম হুজ্জোতি করেছিল! রোজ যেমন করে, সারা বাড়ি গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্র করার ফাঁকে বলেছিল,

-- জানিস, মানুষটা লাইফ সেভিং সার্টিফিকেট হোল্ডার ছিলেন?

-- তাতে কি! উনি তো রেনোভেশনের জন্য বাঁধা বাঁশের স্ট্রাকচারের তলায় চিংড়ি খুঁজতে গিয়ে ঢুকে গেছিলেন। আর বেরোতে পারেন নি।

-- চিংড়ি খুঁজতে! শুনছ তোমার মেয়ে কি বলছে! ধিঙ্গি মেয়ে, সাঁতারের জন্য আর কত মিথ্যে বলবে!

বাবা ওঘর থেকে বলল, না, না তুমি জান না সর্বাণী, কাজল দত্তের বুড়োবয়েসে একটা ছেলেমানুষি স্বভাব হয়েছিল ইদানিং। কুচো চিংড়ি ধরতেন জলে ডুব দিয়ে। মামন ঠিকই বলেছে।

-- যেমন বাপ তার তেমনি মেয়ে। ওই সাঁতারই তোমাদের সর্বনাশ করবে, দেখে নিও। এমনিতেই তো দ্যাখায় যেন উনিশ বছরের মেয়ে। ঐ পোশাকে একগাদা লোকের সামনে সাঁতরাতে তোর লজ্জা করে না ! 

মা মুখ ঝামটা দিয়ে রান্নাঘরে গেলে আমি বাবাকে চেয়ারের পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরি।

-- বাবা,বাবা গো! রাখ না কাগজটা।

-- বলো গো সোনা কি বলবে।

-- আমাকে ফিন কিনে দেবে না? মাছের পাখনার মত পায়ে আটকানো থাকবে। আর আমার স্কুবা ট্রেনিং, তারই বা কি হবে?

-- হবে গো মা সব হবে। আগে ক্লাশ টেনের পরীক্ষাটা ভাল করে পাশ কর। আমিও খোঁজখবর নিই এদেশে কোথায় স্কুবার ট্রেনিং দেওয়া হয়। তারপর দেখা যাবে।

তাই আমি রোজ গোলদিঘিতে ডাইভিং প্র‍্যাকটিস করতে যাই। দেড়ঘন্টা বাদে শুকনো জামা পরে স্কট লেনের বাড়িতে ফিরে আসি সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ। ক’দিন ধরেই দেখছি মেঘনা গুলজারের ফিল্ম রাজির নায়িকা দুর্দান্ত স্পাই আলিয়া ভাটের বর সেজেছিল যে ছেলেটা,সেইরকম শ্যামলা লম্বা একটা ছেলে উদাস চোখে ডাইভিং প্ল্যাটফরমের ব্রিজ যেখানে ধারে গিয়ে ঠেকেছে সেইখানকার গেটে রোজ দাঁড়িয়ে থাকে। আমার থেকে বেশি বড় হবে না। আমি ডাইভ দিই, ডানদিকে কিছুটা সাঁতরিয়ে হাফ সার্কেল কেটে ব্রিজে ওঠার আগে চোখের কোণায় তাকাই, দেখি সে দাঁড়িয়েই আছে। ছেলেটা যে অন্যদের মতো হামলে পড়ে আমার শরীর জরিপ করে, তা কিন্তু নয়। চোখে চোখ পড়লে হাসা বা ইশারা কিছুই করে না। কেমন যেন মনে হয় ও আমার ডাইভিংয়ের ছন্দে তালকানা হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। চোখ ফেরাতে পারে না। আমি নীচের ড্রেসিংরুমে জামা পালটে বাড়ির রাস্তা ধরি, ও একইরকম ঘোরলাগা চোখ নিয়ে পেছন পেছন আসতে থাকে। স্কট লেনের মুখে আমি বাঁ দিকে টার্ণ নেবার আগে তাকাই, দেখি সে ছেলে হাওয়া। রোজ রোজ এমনি চলছিল। মাকে বললে তো সাঁতার বন্ধ হয়ে যাবে, আর বাবাকে বলাটা ঠিক হবে কিনা কে জানে।

ক্লাসে একমাত্র রেবন্তীর সঙ্গে আমার গলায় গলায়। ও বলল,
- ছাগলটা নিশ্চয় তোর প্রেমে পড়েছে। 
- ছাগল বলছিস কেন !

আমি মৃদু আপত্তি জানাতে রেবন্তী কুলকুলিয়ে হাসে।

-আরিব্বাস, এখনই এতো প্রেম ! জেনে রাখ প্রেমে পড়লেই ছেলেগুলো ছাগল হয়ে যায়। 

প্রেম কাকে বলে জানি না, তবে দু একদিন ও না এলে আমি ওকে খুঁজি। ডাইভিংএ মন বসে না। গুপ্তদার কাছে হেভি ঝাড় খাই। 

- তোকে গ্লেনমার্ক ন্যাশনাল একোয়াটিক চ্যাম্পিয়নশিপে পাঠালে ক্লাবের নাম ডুববে দেখছি। মাঝে মাঝে তোর কি হয় বল দেখি ! দ্যাখ একশ বছরের এই ক্লাব থেকে অলিম্পিয়ানস, ইংলিশ চ্যানেল সাঁতারু সবই বেরিয়েছে। তোর ওপর এতো ভরসা আমাদের। আর তুই…

আমি মাথা নীচু করে পরের বারের প্রস্তুতি নিই। তবে চোখের আড়ে খোঁজটাও জারি রাখি।

সেদিন কালিকা চপের দোকানের সামনে আমি সপাটে পেছন ফিরলাম,

-এই তোর নাম কিরে ? আমায় ফলো করিস কেন রোজ রোজ ? 

- না না ফলো করব কেন ! আমি তো শ্রদ্ধানন্দ পার্কের গায়ে মেসে থাকি।

-তোর কি সাঁতারে কোন ইন্টারেস্ট আছে ? ওখানে যাস কেন প্রায়ই ? আমায় দেখতে ? 

- না, মানে, আমি তো তোমায় ডিস্টার্ব করিনি। কথাও বলতে চাইনি। মানে তুমিই তো…। কত লোক দাঁড়িয়ে থাকে, আর আমি থাকলেই…

আতাক্যালানে ছেলেটার অবস্থা দেখে আমার মায়া হল। বন্ধুত্ব হয়ে গেল তাই। ও জয়পুরিয়া কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার। দু চার বছরের বড় বলে পাত্তা দিই না, তুইতোকারি চালাই। স্কুবা ডাইভিংয়ের গল্প করি, আমার এম্বিশনের কথা শুনে ও অবাক হয়ে যায়। গ্রামের ছেলে তো, ভাঙরের ওদিকে কোথায় যেন বাড়ি। আমার কথা শুনেই যায় হাঁ করে। নিজে বলে খুব অল্প। এদ্দিনে এইটুকু জানা গেছে যে ওর ডাকনাম রাণা। আমাকে দেখে ওর নাকি লিটল মারমেইডের গল্প মনে পড়ে যায়। তাই বন্ধুরা বারণ করলেও ও গেটে দাঁড়িয়ে থাকতো, আমি রক্তমাংসের মেয়ে কিনা দেখার জন্য। যখন বুঝতে পারলো আমি তাইই, ততোদিনে ওর অভ্যেস হয়ে গেছে ওখানে দাঁড়ানো আর আমাকে দেখা। বন্ধুরা একশ মেয়ে দেখে গোল দিঘিতে এসে, ও দেখে একজনকেই। 

রোজ সন্ধে বেলা আমার হয়ে গেলে একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরি। আমি ওকে গোল দিঘির গল্প শোনাই। বাবার কাছ থেকে শোনা সব গল্প। নাকি আগে হোগলার মতো গোলপাতাওয়ালা আগাছায় ঢাকা ছিল এই চত্বর, সেই থেকে গোল দিঘি। বলি, যখন ডাইভ দিয়ে জলে নামি তখন বেশি জল ছিটকে উঠলে সেটা ডিসক্রেডিট। নামতে হবে এক্কেবারে ডলফিনের মতো, স্মুথ মসৃণ। আঙুলের ডগা থেকে শুধু জল পড়বে ফোঁটায় ফোঁটায়, তেলের ভেতর থেকে ভর্তি চামচ তোলার মতো। নামতে নামতে কিভাবে লাট্টুর মতো ঘুরপাক খাই, ডিগবাজি আর মোচড়, সেসব সিক্রেট ও বোঝে কি বোঝেনা জানি না, কিন্তু খুব মন দিয়ে শোনে সবটা।

স্কট লেনের মুখে এসে রাণা আবার ঘুরে যায় মেসে ফিরবে বলে। আমি ওকে ডাকি ভিক্টর বলে। স্কুবার রাজা ভিক্টর বার্জ, চল্লিশ বছর ধরে যিনি প্রশান্ত মহাসাগর চষে বেরিয়েছেন। ভিক্টরের জীবন নিয়ে লেখা পার্ল ডাইভার আর ডেঞ্জার ইজ মাই লাইফ বইদুটো পড়ে তো রাণা মুগ্ধ। আমায় বলে, তোর জীবন নিয়ে আমি এইরকম বই লিখব। চেষ্টা চালিয়ে যা, তোর হবে। আর কাকু পাশে আছেন যখন চিন্তা কি ! 

বাবা মায়ের লক্ষ্মীপুজোর বাতাসা কিনতে বেরিয়েছিল। আলগোছে ঠাকুরঘরের চৌকাঠের ওপারে সেটা নামিয়ে রেখে আমায় বলল,

- মামন, একটু শুনিস তো ওঘরে।

-কেন জ্বালাও বাবা ! দেখছ তো, আমি সাঁতারে যাব বলে প্রিপারেশন নিচ্ছি। এখনই তোমার যতো কথা মনে পড়ল ! 

- আয় না, বেশিক্ষণ আটকাব না তোকে। জরুরী কথা।

আমি আরো কিছুক্ষণ গাঁইগুঁই করে বাবার কাছে যাই। বাবা ডানহাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে।

-সোনামেয়েটা আমার দেখতে দেখতে কতো বড় হয়ে গেল। 

- আঃ, ছাড়ো না বাবা, বলছি দেরি হয়ে যাচ্ছে।

- এইতো ছাড়ছি ছাড়ছি। শোন, রোজ সন্ধের সময় কার সাথে গল্প করতে করতে ফিরিস তুই ?

আমার একমূহুর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে যায় যেন, কানমাথা গরম হয়ে যায়। যেন আমার কি এক সিক্রেট বাবা জেনে ফেলেছে যেটা জানা বাবার মোটেও উচিৎ হয়নি।

-কে বললে তোমায় !

- তা দিয়ে কি হবে ! শুধু বল ছেলেটা কে।

- বন্ধু, আবার কে ! ওর নাম ভিক্টর।

-আচ্ছা। কোথায় আলাপ হল তোর সঙ্গে ?

- কেন, তোমার এতো খবরে কাজ কি,বাবা। আর এটা তোমায় বললোই বা কে ? বল, বল, নইলে এমন কাতুকুতু দেব না, বুড়ো…

- আরে ছাড়, ছাড়। বলছি দাঁড়া। সুকান্তকাকুর নীচতলায় ওদের মেস। সুকান্ত আমায় বললে তোর মেয়েটাকে দেখি রোজ আমাদের মেসের রাণার সঙ্গে ফিরতে। 

- তুমি কি বললে ?

আমি রাগে দম চেপে জিজ্ঞাসা করি। ঐ হোঁতকা সুকান্তকাকুকে হাতের নাগালে কলেজ স্কোয়ারে কখনো পেলে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিতাম। 

- আমি আর কি বলব। বললাম কে জানে, বন্ধুটন্ধু হবে হয়তো।

- হ্যাঁ বাবা, বন্ধুই। গেলাম আমি, মোট্টে সময় নেই আমার।

- ওরে শোন শোন।

কে শুনবে! আমি কাঁধে ব্যাগ ফেলে ভোঁকাট্টা। পেছন থেকে শুনলাম বাবার চেঁচানি, ‘ওরে কথাটা শেষ হল না রে। আরো কথা আছে। তবে প্রথম কথাটা হল এই যে মা যেন জানতে না পারে।’ 

মা জানবে কি, পুজোর ঘরে ঢুকে এতো জোরে ঘন্টা নাড়ছে আর মন্ত্র পড়ছে যে বাজ পড়লেও শুনতে পাবে না। আজ ভক্তি বেশি, কারণ আজ রামনবমী। 

হাঁপাতে হাঁপাতে স্কোয়ারে ঢুকে দেখি লোকে লোকারণ্য। মমি সিনেমার সেই গুবরে পোকাগুলোর মতো পালে পালে বিদ্যাসাগরের মূর্তির দিক থেকে প্যারামাউন্টের দিকে তাদের গতি, নয়তো উল্টোবাগে। ফুচকা, ঘুগনি, আইস্ক্রিম সব যেন উড়ে যাচ্ছে ঝড়ের মুখে কুটো ওড়ার মতোই। এক দল ছেলের কপালে দেখি লম্বা সিঁদুর টিপ, অর্ধেক ঢেকে গেছে গেরুয়া ফেট্টিতে। ডানহাতে চওড়া রুপোলি বালা, কারো হাত থেকে ঝুলছে হেলমেট। পাশ কাটাতেই এমন শিস ছাড়লো একখানা, মনে হল কানের

ভেতর মোটা সুঁই ঢুকিয়ে দিল কেউ। পাত্তা দিই না এসব। অভ্যেস হয়ে গেছে। কোটিখানেক সিটি, লাখখানেক চোখ মারা, হাজারখানেক কনুই খায়নি এমন মেয়ে এ শহরে নেই। আমাকে তো কতো ছোটবেলায় সেনকাকু জলের নীচে বাগে পেয়ে সারা শরীর হাতড়ে কি খুঁজেছিল কে জানে। এখন জানি। তাই ফান্ডা নিয়ে মাথা উঁচু করে চলি। আয় কে আসবি বাপের ব্যাটা।

আসলে কে কি চায় না বুঝতে পারলে আমার খুউব কনফিউজড লাগে। এই যেমন ভিক্টর। কথাই বলে কম, চাহিদা কি আজও বুঝিনি। কথা বলতে ভালো লাগে, বলি। এইটুকুই। বাবার কানে তোলার কি হল বুঝলাম না। কলেজ স্কোয়ার থেকে স্কট লেনের মুখ। এইটুকু তো রাস্তা ! তাতেও এতো জবাবদিহি ! সত্যি এরা জান কয়লা করে দেবে দেখছি।

ভাবতে ভাবতেই চেঞ্জ করেছি, ডাইভিং বোর্ডে উঠেছি, অমনি সারা কলেজ স্কোয়ার জুড়ে কি সিটি, কি সিটি ! আর সঙ্গে উড়ে আসা কুৎসিত মন্তব্য। স্বাভাবিক। আমার মতো বড় মেয়ে আজ আর কেউ নেই। অর্চিতার আসবার কথা ছিল, এতো ভিড় দেখে বাড়ি থেকে এলাউ করেনি হয়তো।

গুপ্তদা গম্ভীর মুখ করে কানের কাছে বললেন,--আজ দেখছি হাওয়া খুব গরম। ডাইভ দিবি না বাড়ি যাবি ?

--ছাড়ো তো। অতো পাত্তা দিলে চলে না। এখন নেমে ওদের ভেতর দিয়ে আমি যেতে পারব ? গায়ে হাত চালিয়ে দেবে।

--তা অবশ্য ঠিক। ঠিকাছে, কর তুই।

করব কি, জলে ধনুক থেকে বেরোনো তিরের মতো নামছি, আর কানে আসছে অকথ্য সব কথা। মাথা তুলে সাঁতরে ব্রিজে উঠে বোর্ডের দিকে হেঁটে যাচ্ছি, চিৎকার করে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বর্ণনা দিচ্ছে। বিশেষ করে চওড়া পেছনের। বুঝতে পারছিলাম এভাবে হবে না। অতো দূরে দাঁড়িয়েও ওরা আমার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে। মন খারাপ করেই আবার চেঞ্জ করে বোর্ডের নীচের ছোট খুপরিটা থেকে বেরিয়েছি, দেখি গেটের কাছে গোলমাল আর জটলা। ঠিক যেখানে ভিক্টর দাঁড়ায় সেইখানটাতে। গোলমালটা ক্রমশ বাড়ছে দেখে গুপ্তদাকে বললাম, সবাইকে ডাকো। গার্ডদেরও।

খুব কু ডাকছিলো মনটা তাই কেউ আসবার আগেই এগিয়ে গেলাম। 
দেখি ভিক্টর পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে, --না আপনারা এইভাবে ভিডিও করতে পারেন না। ওর পারমিশন নিয়েছেন ? এতো অকথ্য কথা বলছেন ! কেন, কেন, কেন ?

অতো শান্ত ছেলেকে চেনা যাচ্ছে না। মাথার চুল এলোমেলো, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আর ওকে ঘিরে ধরা ছেলেগুলোর মুখে ফুটে উঠছে পিশাচের মতো হাসি। একজন হাতের মোবাইলটা ওর নাকের ডগায় ঘুরিয়ে বলল,

--কেন বাওয়া, তুমি শালা একাই দৃষ্টিভোগ মারবে কেন ! আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি ! মালটা তোর কে হয় রে গান্ডু ? 

আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম গুপ্তদা তখনো লোক জড়ো করতে পারেনি। কিন্তু ছেলেগুলো হাত চালাতে শুরু করে দিয়েছে। পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে, কিন্তু পড়ে যাবার আগেই সামনে থেকে লাথি ঘুঁষি মেরে খাড়া করিয়ে দিচ্ছে। এরই মধ্যে একটি দোহারা ছেলে ছুটে এল,

--কি হয়েছে, ফারুক? একি একি ওকে সবাই মিলে মারছেন কেন ? ও তো আমাদের কলেজে পড়ে।

ফারুক নামটা শুনে আমি থমকে গেলাম। মারকুটে লোকগুলোও। ও তো কখনো এই নামটা বলেনি ! ভিক্টর নাম দেওয়াতে খুব খুশি হয়েছিল মনে পড়ছে। আমি তিন পা পেছোলাম যেন। অজানা অচেনা নামভাঁড়ানো ছেলে, কি দরকার ওর জন্য ঝামেলায় জড়িয়ে। কিন্তু এবার দঙ্গলটা রক্তের স্বাদ পেয়েছে।

--উরিশ্লা, এটা আবার কাটা, নেড়ের বাচ্চা ! কতো বড় বড় কথা মাড়াচ্ছিল। আজ শালাকে উচিৎ শিক্ষা দোব।

ভিড়ের আনাচেকানাচে কখনো ভিক্টরকে দেখতে পাচ্ছি। ওর ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, পাঞ্জাবি ছিঁড়ে গেছে, চশমা উধাও। ওর কলেজের ছেলেটিও বেদম মার খাচ্ছে।

আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে গুপ্তদা ছুটে গেলেন। সঙ্গে আমাদের একগাদা লোক।

--একি কি করছেন আপনারা ? খামোখা মারছেন কেন ছেলেটাকে ?

--খামোকা !! কি বলছেন মোসাই ! একটা টেররিস্টের বাচ্চা আমাদের ঘরের মেয়ের ইজ্জত নষ্টের ফিকিরে থাকবে, আর আমরা ছেড়ে দেব ? জিজ্ঞেস করুন ওকে কেন শ্লা এইখানে দাঁড়িয়েছিল।

--কিন্তু ভিডিও তো তুলছিলেন আপনারা। 

নিজের গলার আওয়াজে নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। যাব না ভেবেও কখন গুপ্তদার পেছন পেছন ঠিক জটলার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছি নিজেও জানি না। আমার চারপাশে মজাদেখা মানুষের মুখ। ভিক্টর হাঁ করে তাকিয়ে আছে, মার-খাওয়া ছেলেটাও।

পালের গোদাটা ফিরে তাকালো, --এই যে বুনু, তুমিও এসে গেছ ! ভালোই করেছ। এইবার বলতো, এই ছেলেটা তোমাকে বিরক্ত করে কিনা। এখানে দাঁড়িয়ে তোমাকে মাপে কিনা ?

পাশ থেকে কে একজন বলল--হ্যাঁ, আওয়ারগ্লাস ফিগার তো। মাপতেই হবে।

অনেকগুলো খুকখুক হাসি অগ্রাহ্য করে আমি অভ্যাসের বাইরে গিয়ে সবার সামনে একদলা থুতু ফেললাম মাটিতে। ভিক্টরের দিকে সোজা তাকালাম। এলোমেলো মাথাটা বুকের ওপর ঝুলে রয়েছে। ছেঁড়া পাঞ্জাবিতে রোগা চেহারাটা লাগছে যেন মামাবাড়ির খেতের কাকতাড়ুয়া। এইবার আমার সব কনফিউশন কেটে যাচ্ছিল। ভিক্টর একটা সহজসরল বন্ধুত্বের সম্পর্ক চেয়েছিল। তার সঙ্গে না আছে সুইমস্যুটের সম্পর্ক, না আছে জাতপাত, রামনবমী, ঈদ। সেই সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়াবে একটা নাম এটা ও চায়নি। মনে ছিল হয়তো মায়ের আচারবিচার নিয়ে আমার বলা গল্পগুলো। সুকান্তকাকুর উদ্বেগের কারণও খুঁজে পেলাম। বাবা আরো কি বলতে চেয়েছিল বুঝে গেলাম। জালিম জমানা পাতার ওপর বৃষ্টি ফোঁটার মতো এই স্বচ্ছ সম্পর্কগুলোকে রাখতে দেয় না। ওদের অঙক মেলে না, অস্বস্তি হয়, শিরশির করে মন, তারপর একসময় আতঙ্কে চেঁচাতে থাকে, যেমন চেঁচাচ্ছে এই রাম কা আউলাদ। এইখান থেকে আমাকে ফিরে যেতে হবে প্রবালদ্বীপে, এলীনের কাছে। হাঙরের চোয়াল বাঁচাতে চাওয়া ছোট্ট রঙিন মাছ হলে চলবে না আমায়। হাঙরের মতোই তাই দাঁত বার করে বললাম,

--কে বলল আপনাকে ও আমাকে বিরক্ত করে ! আমার নাম ঈলিনা। এখানে সবাই আমাকে চেনে। বিরক্ত করার সাহস কেউ পায় না।

একেই নাম শুনে জাত বুঝতে পারেনি গাড়লটা, তারপর গুপ্তদা আমার সমর্থনে এগিয়ে আসায় রণে ভঙ্গ দিতে দিতেও ফিরে এলো বড় হাঙরটা।

--আচ্ছা বুনু, শুধু এইটা বল ওকি তোমার বয়ফ্রেন্ড ?

--না দাদাভাই, ও আমার বডিগার্ড। এই যে যতক্ষণ এখানে থাকি চোখ দিয়ে চেটে খান আপনারা, আমার তখন একজোড়া চোখের দরকার হয় যে এই চ্যাটচেটে পিচুটির মতো চাউনিগুলোকে গল্প বলে ভুলিয়ে দেবে, মনে করিয়ে দেবে মায়ের পুজোর সিংহাসনের সামনে থেকে উঠে আসা ধূপকাঠি আর চন্দনের গন্ধ। বুঝলেন দাদা, তাই বাড়ি থেকে ওকে আমার বডিগার্ড রেখেছে। বডিগার্ড, মানে দেহরক্ষী। জানেন তো কথাটা ? বডি এন্ড মাইন্ডগার্ড। বুঝলেন দাদা ?

তাকিয়ে দেখি ভিড় একদম পাতলা। বাজপোড়া গাছের মতোই দাঁড়িয়ে আছে শুধু ভিক্টর আর তার বন্ধু।

আমি পেছন ফিরে গুপ্তদাকে বললাম,--আমায় একটু বাড়ি পৌঁছে দাও না গো। শরীর ভালো নেই। কাল থেকে বাবাকে আসতে বলব।

৯টি মন্তব্য:

  1. দুর্দান্ত!!

    উত্তরমুছুন
  2. অনবদ্য।
    "জালিম জমানা পাতার ওপর বৃষ্টি ফোঁটার মতো এই স্বচ্ছ সম্পর্কগুলোকে রাখতে দেয় না। ওদের অঙ্ক মেলে না, অস্বস্তি হয়, শিরশির করে মন, তারপর একসময় আতঙ্কে চেঁচাতে থাকে, যেমন চেঁচাচ্ছে এই রাম কা আউলাদ।..."

    উত্তরমুছুন