বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

সুদেষ্ণা দাশগুপ্তের গল্প : মিলনের জন্যে

মেজপিসির কাছ থেকে জরুরি তলব পেয়ে দোলন এক সপ্তাহ যাবৎই ভাবছে যে একবার বেহালা ঘুরে আসবে। কিন্তু যা হয় আর কি। ভাবাই সার। মনে মনে কথাটা ঘুরে ফিরে সেই আসছেই নানা কাজের ফাঁকে। আর মনে খুঁতখুঁতুনি। ইশ! মেজপিসি কি ভাবছেন।
বয়স্ক মানুষ একবার আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন, আর আমি কোন ভি-ভি-আই-পি যে সময় হচ্ছে না? দোলন আরও আশ্চর্য হয়, মেজপিসির কথাটা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে আর সাথে সাথে আরও কত যে কথা দোলনের মনে পড়ে যাচ্ছে, তার শেষ নেই। সবই ভুলে গেছিল এতদিন। যেমন আগের মাসে দু’দিন দুধওয়ালা আসেনি, বাইরে থেকে দুধের প্যাকেট কিনতে হয়েছে, কিন্তু দোলন এ’মাসে যখন দুধের দাম মেটালো তখন দু’দিনের টাকা কাটতেই ভুলে গেছে। আরও কাকে কাকে ফোন করার ছিল, করেনি। ড্রাই-ক্লীনার্সে দু’টো কার্ডিগান ধুতে দেওয়া আছে সেগুলোও আনতে ভুলে গেছে। সেসব পরে আনা যাবে, কিন্তু এই শনিবারে দুপুরবেলা অফিস থেকে বেরিয়ে বেহালা’য় একবার মেজপিসির সাথে দেখা করে আসবেই দোলন। শনিবার দুপুর আড়াইটেয় অফিস থেকে বেরিয়ে বিবাদি-বাগ বাসস্ট্যান্ডে এসে বেহালা’র মিনিবাসে চেপে বসে দোলন। বসলে কি হবে, এদিক থেকে বেরিয়ে গেলেও বেহালা’র মুখটায় কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে থাকল বাসটা! দোলনের চিন্তা হচ্ছে ফিরবে কিভাবে। ঠিক করে নেয় ফেরার সময় অটো করে টালিগঞ্জে এসে মেট্রোতে বাড়ি ফিরবে। বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই মেজপিসির প্রশ্ন –- 

‘হ্যাঁ রে দোলন, কাল রবিবার একেবারে দুপুরে ভাত খেয়ে বেরোবি তো?’ দোলন কিছু না বলে মিটিমিটি হাসে। মেজপিসি সেই পুরনো দিনের মানুষটিই আছেন। একই শহরে থেকে এখন আর কে কার বাড়ি রাত কাটায়! কিন্তু প্রথমেই এসব নিয়ে কথা শুরু হলে মেজপিসির সমস্যার কথাই তো শোনা হবে না। 

‘কি রে, দোলন হাসছিস যে? রাতে একটু ফ্রায়েড-রাইস বানাই তাহলে?’ 

‘সেসব পরে হবে, এখন বলো তো কিসের এত জরুরি তলব?’ পিসেমশাই বাড়ি নেই। মিন্টু আছে। ওপরের ঘরে। মিন্টু মাস দুই হল দেশে ফিরেছে আমেরিকা থেকে। পড়াশুনো মাঝপথে বন্ধ করে। দোলনের থেকে অনেকটাই ছোট মিন্টু। আগে তো খুব ভাব ছিল দোলনের সঙ্গে। এখন আর কথাই হয় না। মেজপিসির সাথেই শুধু কখনও কখনও টেলিফোনে কথা হয় দোলনের। দোলন শুনেছিল যে মিন্টু ফেরার পর থেকেই খুব মুষড়ে আছে। দোলন ঠিক করে নেয়, তাড়াতাড়ি এখানে কথা সেরেই একবার মিন্টু’র ঘরে গিয়ে ওর সাথে আগের মত খানিক হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরবে। মেজপিসি একটা রেকাবিতে লুচি, আলুভাজা আর বাটিতে পায়েস নিয়ে দোলনের সামনে খাটের পাশ থেকে একটা টুল টেনে রাখলেন। 

‘এ কী, এত খাবার কে খাবে? আর আমাকে ডাকলে না কেন? চলো খাবার টেবিলে বসে খাই।’ 

‘না না এখানে বসেই খা। তোর সাথে কথা আছে। এ ঘরে কেউ আসবে না।’ দোলনের মনে হলো মেজপিসি কিরকম এক মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। 

‘হ্যাঁ রে, তোদের অফিসে তো অনেক মেয়েরা কাজ করে, তাই না?’ মেজপিসির প্রশ্নে অবাক হয়ে দোলন বলে, ‘হ্যাঁ, করে তো, কেন ? কি হয়েছে?’ 

‘না, বলছিলাম যে, দোলন, একটু তো কাউকে কাউকে নিয়েও এবাড়িতে আসতে পারিস। তারপর মিন্টুর সাথেও আলাপ করিয়ে দিলি, কারো সাথে যদি বন্ধুত্ব হয়ে যায় তো মন্দ কি, বল?’ 

দোলন বেশ কিছুক্ষণ হাঁ করে নিজের পিসির দিকে তাকিয়ে থাকে। মেজপিসির কথার উদ্দেশ্য কিছুই বুঝতে পারে না। চিরদিনের পরিচিত মানুষটা কি করে এত পালটে গেলেন, দোলন এতেই অবাক হয় সবচেয়ে বেশি। তখনও মেজপিসির বিয়ে হয়নি। আসলে মেজপিসির বিয়ে দেরিতেই হয়েছে তখনকার দিনের হিসেবে। ছোটপিসি তখন কলেজে পড়ে, একটু হয়ত সাজগোজ করে কোনোদিন কলেজে গেল। বাপ রে! মেজপিসির সে কি বকা ছোটবোনকে। দোলনের বেশ মনে আছে। এমন কি দোলনও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। বছর দশ কি এগারো হবে। কুমারিত্ব কাটতে চলেছে। আর সব বন্ধুরা কি সুন্দর হাল-ফ্যাশনের ফ্রক, টাইট স্কার্ট পরে। কিন্তু মেজপিসি দোলনকে নিজের হাতে বানানো জামাই শুধু পরাবে। আর প্রতিটি জামাতেই লাগানো থাকে ঠিক বুকের ওপর থেকে ফ্রিল দেওয়া ঝালর। গম্ভীর মুখে মেজপিসি বলেন --‘বুকের ওপরে একটা ঝালর থাকলে ভালো, দোলন এখন বড় হচ্ছে। আর সুন্দরই তো লাগে।’ দোলনের একটুও ভালো লাগে না। সেই বস্তাপচা স্টাইলের ফ্রক। মেজপিসির ওপর খুব রাগ হতো তখন দোলনের। আরে! বড় হচ্ছে তো কি? সব বন্ধুই তো বড় হচ্ছে, কই তারা তো এরকম জামা পরে না। বরং দোলন’দের সবারই তখন মনে হতো এবার তারা খানিক বড় হলো। এতো সম্মানের, লুকোনোর তো কিছু নেই। 

সেই মেজপিসি আজ বলেন কি? ধীরে ধীরে সব খোলসা হয়। মিন্টু নাকি ভীষণই অবসাদে ভুগছে। যে মেয়েটির সাথে তার বহুদিনের বন্ধুত্ব, সেই মেয়েটি হঠাৎ মিন্টু’র সাথে সমস্তরকম সংসর্গ ত্যাগ করেছে। দু’জনেই আমেরিকা’র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ করতে গেছিল স্নাতকোত্তর পরীক্ষা পাশ করার পর। সেখানে গিয়েও বছরখানেক সব ঠিকঠাকই ছিল বলে মেজপিসির ধারণা। আর তারপরেই গন্ডগোল। এখন মিন্টু’র শারীরিক-মানসিক কোনও অবস্থাই ঠিক নয়। মোটমাট মেজপিসি ভীষণ চিন্তায় আছেন মিন্টু’কে নিয়ে। তাই দোলনকে জরুরি তলব। যে কোনোভাবে একটি বান্ধবি যদি মিন্টু’র যোগার হয়ে যায় তাহলেই ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রায় আটটা নাগাদ দোলন যখন মেজপিসির বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে তখন মেজপিসি চোখে জল নিয়ে এই কথাটিই বললেন। 

****** 

এরপর প্রায় মাস চারেক দোলনের ব্যস্ততা থাকল তুঙ্গে। মেয়ে তুতুনের ফাইনাল পরীক্ষা ছিল। দিন পনেরো ছুটিও নিয়েছিল দোলন পরীক্ষার সময়টায়। ইন্দ্র, দোলনের স্বামীর তো এ’ব্যাপারে কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। তার শুধু অফিস, মিটিং, ট্যুর। বাড়িটা শুধু রাতে শোওয়ার জন্য। সেখানেও ফোন আসার অন্ত নেই। দোলন মাঝেমাঝেই বিরক্ত হয়। গজগজ করে। কিন্তু বোঝে এসব করে কোনোই লাভ নেই। সংসার যদি একেবারেই অচল হয়ে পড়ে তাহলে দোলনকেই অফিসে ইস্তফা দিতে হবে। অবশ্য এই করে করেই তো তুতুন বড় হয়ে উঠল। একটাই সুবিধে যে দোলনের শ্বশুর-শাশুড়িও এই আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তুতুন স্কুল থেকে ফিরে দাদু আর ঠাম্মির কাছে গিয়েই ওঠে। দোলন মাঝে একদিন ফোন করেছিল মেজপিসিকে। সেই একই অবস্থা, মেজপিসির কাঁদো-কাঁদো গলা দুশ্চিন্তায় ভরা। এক রবিবার তুতুনের জেদে দোলন এসেছে এক শপিং মলে, ইন্দ্রও আছে সঙ্গে। আইনক্সে সিনেমা দেখে, একটা খাওয়ার জায়গায় বসেছে তিনজনে। সেইসময়েই এল মেজপিসির ফোন। গলায় বেশ খুশির ছোঁওয়া। মেজপিসি ফোনে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিচ্ছেন দেখে এদিকে ইন্দ্র’র মেজাজ বিগড়োচ্ছে। অন্য কান দিয়ে দোলন শুনছে ইন্দ্র মেয়েকে বলছে--‘দেখ, দেখ তুতুন, আমার ফোন এলে ঘ্যানঘ্যান করে। আর এখন দেখ! ওয়েটার এসে দাঁড়িয়ে আছে খাবারের অর্ডার দিতে পারছি না এই মোবাইলের জ্বালায়।’ 

অনেক কষ্টে দোলন মেজপিসির ফোন রাখতে পারল। উহফ! কিছুতেই ছাড়ছিলেন না। খাবারের অর্ডার দিয়ে দোলন হাসিমুখে ইন্দ্রকে বলে--‘আরে রাগ করছ কেন? মেজপিসির ফোন। জানো, মিন্টুর বান্ধবি যোগার হয়েছে শেষ পর্যন্ত।’ বলেই মিটিমিটি হাসি দোলনের। 

‘তোমার মেজপিসি তাহলে মেয়েধরা হয়ে বেরিয়েছিলেন বলছ? খপ করে ঝোলাতে পুরে নিয়েছেন ছেলের জন্য একজন বান্ধবি?’ ইন্দ্রও মজার ছলে বলে ওঠে। 

বহুদিন পর মেজপিসির মধ্যে খুশি-উচ্ছাসের আভাস পেয়ে দোলনের ভাল লাগল। কি দুশ্চিন্তাতেই না ছিলেন এই পাঁচ-ছ’মাস। মিন্টু’র কিছু ছাত্র-ছাত্রী হয়েছে, মেজপিসিই সব যোগার করেছেন নাকি। ইন্দ্র’র কথাই মিলে যাচ্ছে তাহলে, মনে মনে হাসে দোলন। তাদের মধ্যেই একটি মেয়ের সাথে নাকি মিন্টু’র ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। যাই হোক, আবার একদিন যে বেহালা’য় যেতে হবে সেটা মেজপিসি পইপই করে বলে দিয়েছেন। দেরি করা চলবে না। না, এবার দোলন আর দেরি করে না। এই রবিবার দুপুরে ইন্দ্র আর তুতুন কি একটা ইংরিজি ছবি দেখবে ডিভিডি’তে, সকাল থেকেই ঠিক করেছে দু’জনে। দোলনও তাল বুঝে ঠিক করে ফেলে যে আজ মেজপিসির বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে। ইন্দ্র আবার ড্রাইভার-সেন্টার থেকে একজন ড্রাইভার বুক করে দিয়ে বলে ওর গাড়িটা নিয়ে যেতে। বাব্বা! দোলন আজ খুব নিশ্চিন্তে যেতে পারবে বেহালা, রাত হলেও অসুবিধে হবে না। দরজা খোলাই ছিল, মেজপিসির বাড়ি ঢুকেই দেখে মিন্টু বসার ঘরের সেন্টার-টেবিলে ঠ্যাং দু’টি তুলে সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। বেশ খোশমেজাজেই মনে হলো দোলনের। ওকে দেখে হই হই করে উঠল --‘মা দেখো দোলনদি এসেছে, বসো বসো দোলনদি।’ 

এ’বাড়ির জন্য সঙ্গে করে আনা কেকের বাক্সটা ভেতরে ঢুকে দোলন রেখে এসে সোফায় বসে মিন্টু’কে মেজপিসিকে ডাকতে বারণ করে। 

‘এই, মেজপিসি মনে হয় একটু শুয়েছে দুপুরে, থাক পরে ডাকিস। তোর সাথে কতদিন পরে দেখা হলো, আয় একটু গল্প করি।’ 

মিন্টু বরাবরই দেখতে ভালো। লম্বা, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, বেশি ফরসা নয় তবে কালোও বলা চলে না। পুরুষালি চেহারা। আগে জিমে যেত। আমেরিকা থেকে ফিরে এখন কি করে তা অবশ্য দোলন জানে না। এখনকার সংযোজন খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর গোঁফ। এগুলো আগে দেখেনি দোলন। 

‘কি রে এক মুখ জঙ্গল নিয়ে বসে আছিস কেন? খুব তো শুনলাম প্রেম ট্রেম করছিস, তাহলে এ মুখ কেন?’ মিন্টু’কে একটু খ্যাপানোর উদ্দেশ্যে দোলন বলে। 

‘হ্যাঁ ঠিক বলেছিস, চুমু খেতে গেলে বেশ অবস্ট্রাক্ট করে।’ মিন্টু’ও পালটা জবাব দেয়। 

‘পাজি, বাঁদর, হতচ্ছাড়া, খুউব না! কথার কোনো ছিরি নেই।’ দোলন সোফার কুশনটা দিয়ে মিন্টু’র পিঠে মার লাগায়। দোলন আর মিন্টু’র কথাবার্তায় মেজপিসি ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন। দোলনকে দেখে খুব খুশি। আজ আর দোলন জানিয়ে এ’বাড়িতে আসেনি। হঠাৎ দোলনকে পেয়ে মেজপিসি খুব খুশি হলেন। 

‘আজ তো রবিবার রে দোলন, ইন্দ্র, তুতুন ওরা কেন এলো না?’ 

‘কি যে বলো না মেজপিসি, ওরা এলে তো সেই ভদ্রলোকটির মতো বসে থাকতে হতো, আমাদের প্রাইভেট টকগুলো তো হতো না।’ 

হাসতে হাসতে মেজপিসি বলেন -‘সেই আগের মতো পাজিই আছিস। মিন্টুর সাথে গল্প কর তিনকাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসি।’ 

মিন্টু’র সাথে কথায় কথায় দোলন শুনল পুরো ঘটনা। মিন্টু ক’মাস হলো বাড়িতে ফিজিক্স-অনার্সের কিছু ছেলে মেয়েকে পড়াতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ঝুম্পা বলে একটি মেয়েও আসে। ভাল নাম দেবারতি, কিন্তু মিন্টু আর এখন তাকে সে নামে ডাকে না। মেয়েটি পড়াশুনোয় বেশ ভাল কিন্তু ধরণ-ধারনে খানিক ছেলেমানুষ। পার্ট-টু পরীক্ষা দেবে এবার। 

‘বুঝলি দোলনদি, দেখতে যে আহামরি কিছু তা কিন্তু নয় দারুণ চার্মিং বুঝলি।’ 

‘হ্যাঁ রে, সবটাই বুঝেছি কিন্তু মেয়েটা মানে ঝুম্পার কি মত? সে কি আদৌ তোর প্রেমে পড়েছে?’ 

মিন্টু ‘হ্যাঁ সূচক’ ঘাড় নাড়ে। মেজপিসিও পরে অনেক কথা বলেন এ’ব্যাপারে। দোলন বুঝছে অনেক কথাই মেজপিসির বলার আছে দোলনকে। ঝুম্পা’র সাথে মেজপিসিও কথাবার্তা বলেন। শকুন্তলা পার্কে থাকে। এক ভাই এক বোন। ঝুম্পা’ই বড়। দোলন অবাক হয় মেজপিসির মিন্টু’র ব্যাপারে এতটা অগ্রণী ভূমিকা দেখে। মিন্টু’র একজন বান্ধবি হয়েছে, সে অবসাদ কাটিয়ে উঠেছে, পড়ানো শুরু করেছে খুবই ভালো কথা। কিন্তু তা বলে মেয়েটির হাঁড়ির খবর নেওয়া হচ্ছে কেন এখন থেকেই। 

‘না রে দোলন, তুই বুঝছিস না, আমি ভাবছি বিয়ে দিয়ে দেব ওদের।’ মেজিপিসির কথায় দোলন অবাক হয়। মিন্টু তো এখনও চাকরি-বাকরি কিছু করেই না। মেজপিসি জানান যে মিন্টু কয়েকটা কোম্পানিতে এর মধ্যেই ইন্টারভিউ দিয়েছে এবং একটি ভালো জায়গায় যোগ দেবার প্রাথমিক কথাবার্তাও চলছে। সবই ঠিক কিন্তু ঝুম্পা’কে মেজপিসি যতটা দেখেছেন, বুঝেছেন যে তার উচ্চশিক্ষার একটা আকাঙ্খা আছে। আছে কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন। 

‘এতো খুবই স্বাভাবিক মেজপিসি। আজকের মেয়ে। নিজের কোনো উচ্চাকাঙ্খা থাকবে না? এ তুমি কি বলছ?’ স্বাভাবিকভাবেই দোলন ঝুম্পার সমর্থনে বলে ওঠে। 

মেজপিসিও তক্ষুণি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেন, ‘বিয়ের পরও তো পড়াশুনো চালিয়ে যেতে পারে। আমরা তো আর তেমন শ্বশুরবাড়ি হবো না যে পড়াশুনো ছাড়িয়ে বাড়ি বসিয়ে রাখব।’ 

মেজপিসির এতটা ব্যগ্রভাব দোলনের অদ্ভুত লাগে, কিন্তু বোঝে যে কেন মেজপিসির এমন তাড়াহুড়ো। মিন্টু’র আগের সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ায় মিন্টু’র যা অবস্থা হয়েছিল মেজপিসি আর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাইছেন না। কিন্তু ব্যাপারটা দোলনের ঠিক পছন্দ হয় না। দোলন শোনে যে মেয়েটির বাড়িতে এখনও কেউ কিছু জানেন না। এদিকে ছেলের বাড়ির অবস্থা প্রায় সানাই বাজার আগের মুহূর্ত যেন! আশ্চর্য! দোলন বেশ ভালো মতো দুশ্চিন্তা নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরে আসে। যদিও মেজপিসিকে আরও খানিক বোঝানোর চেষ্টা করে বিফল হয়। 

***** 

এর পরের সপ্তাহে বুধবার দোলন অফিসে লাঞ্চের পর নিজের কম্পিউটারে চোখ রেখেছে, রিসেপশন থেকে ফোন এল কেউ দেখা করতে এসেছেন দোলনের সাথে। বাইরে বেরিয়ে মেজপিসিকে বসে থাকতে দেখে দোলন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে প্রথমে, তারপরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে নিজের টেবিলের সামনে বসায়। হন্তদন্ত গলায় মেজপিসি বলেন, ‘শুক্রবার তোকে একটু ছুটি নিতে হবে রে দোলন। সকাল সকাল আমার বাড়ি আসতেই হবে। ইন্দ্রকেও বলিস ছুটি নিতে। আমি চাই ক-জন যেন থাকে সেদিন।’ মেজপিসিকে ধাতস্থ করিয়ে দোলন শোনে যে, এই শুক্রবার মিন্টু আর ঝুম্পা’র রেজিস্ট্রি বিয়ে। মেজপিসির বাড়িতেই। ইন্দ্র’র ট্যুর আছে, কিন্তু তুতুনকে নিয়ে দোলন না গেলে মেজপিসি কিছুতেই সব কিছু করে উঠতে পারবেন না। শেষের দিকে মেজপিসি দোলনের হাত দু’টিও ধরে ফেললেন। 

‘আচ্ছা, মেজপিসি, ঝুম্পার মা-বাবা থাকবেন তো সেদিন?’ 

এড়িয়ে যাওয়ার সুরে মেজপিসি উত্তর দেন, ‘দেখি রে দেখি! সবই হবে। একা হাতে বুঝতেই পারছিস। তোর পিসেমশাই তো আর এসবের মধ্যেই নেই।’ 

দোলন সবই বুঝল। মন সায় না দিলেও বুঝল যেতে হবেই। ইন্দ্র কলকাতায় নেই, ওকে ওপর-ওপর ফোনে জানাল যে তুতুন’কে নিয়ে শুক্রবার বেহালা যাবে, বিশেষ দরকার। উপহার নিয়ে যাওয়াটা উচিত হবে কি না বুঝতে না পেরে, দোলন দু’টো খামে এক হাজার করে টাকা রেখে সঙ্গে রাখল। এগারোটা’র পরেপরেই পৌঁছোল মেজপিসির বাড়ি। মেজিপিসির দু’জন বান্ধবিকে দেখল বসে আছেন। মিন্টু একটা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বারবার ঘড়ি দেখছে, খেয়াল করল সে। আজ আর দোলনের মিন্টু’র সাথে কোনো ঠাট্টা করতে ইচ্ছে করল না। ভেতরের ঘর থেকে ব্যস্ত হয়ে মেজপিসি বেরিয়ে দোলনকে দেখে যেন স্বস্তি পেলেন। তুতুন’কে কাছে টেনে বলেন --‘আয় তুতুন মা, বল তো দুপুরে কি খাবি? চাইনিজ না মোগলাই?’ এর পরেই ঘরে একটি অল্পবয়েসী মেয়ে চুড়িদার-কামিজ পরে ঢোকে আর মেজপিসি সাথে সাথেই বলে ওঠেন --‘এসো ঝুম্পা ভেতরে এসো, দোলন তুইও ওপরের ঘরে আয় তো।’ দোলন খেয়াল করে মিন্টু’র অস্থিরতাও কমে এল। 

ওপরে মিন্টু’র ঘরের দরজা বন্ধ করে দোলনের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হল, সিল্কের শাড়ি পরিয়ে ঝুম্পা’কে একটু সাজিয়ে দেবার। মেয়েটির মুখে কিন্তু দোলন খুশির আলোর থেকে দুশ্চিন্তা, ভয় এসবের আভাস পায়। জিগ্যেসও করে ফেলে দোলন -‘তোমার মা-বাবা জানেন না কিছু?’ ঝুম্পা মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ে। দোলন আবার জিগ্যেস করে, ‘তাহলে? তুমি কেন…’ ‘না কাকিমা বলেছেন, এখন কিছু না, শুধু রেজিস্ট্রি করা থাকবে, পরে…’ 

এরপর যা যা হওয়ার সবই হলো। উকিল এলো, রেজিস্ট্রি হলো। মিষ্টি মুখও হলো। টেবিলে সবাই মিলে চিনে-খাবার খাওয়া হলো। দুপুরে খাবার পর মেজপিসির বান্ধবি দু’জনও ফিরে গেলেন, পিসেমশাইও গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে চলে গেলেন। এমনিতে না দিলেও আজ প্রথম থেকেই দোলন তুতুন’কে নিজের মোবাইল-ফোন দিয়ে রেখেছে গেম খেলার জন্য, তাই তুতুন ব্যস্ত মোবাইলে। আরও খানিক পর দোলন আর মেজপিসি বসার ঘরে মুখোমুখি বসে। যে মেজপিসির সাথে দোলনের গল্প শেষই হতে চায় না কখনও, সেই দু’জন মাথা নিচু করে চুপ করে বসে আছে। 

ফেরার পথে গাড়িতেও দোলন স্থানুর মতো বসে রইল। মেজপিসির শেষ কথাটা কিছুতেই মাথা থেকে সরছে না, --‘দোলন মিন্টু আর ঝুম্পাকে ওপরের ঘরে যেতে বল, আমি চাই ওদের ফুলশয্যাটা এখনই হয়ে যাক।’ হঠাৎ পাশে বসা তুতুনের জন্য ভয়ে দোলনের সারা শরীর কেঁপে ওঠে, প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে মেয়েকে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন