বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

গল্প নিয়ে আলাপ : তাজের ছবি:জীবনানন্দ দাশ

লীনা দিলরুবা
ছেলেটি ছবি আঁকতে ভালোবাসে। তার স্বপ্ন, কল্পনায় সারাক্ষণ খেলা করে চিত্রকলা। ছবির মূর্ত- বিমূর্ততায় সে খুঁজে ফেরে জীবনের আনন্দ। এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম, সুররিয়ালিজম-তার মনের ভেতর চিত্রকলার বিমূর্ততার কোন ঘরানা খেলা করে তা আমরা দেখি না, বরং দেখি বিচিত্র সব দার্শনিক ভাবনা।
যাকে পুরোপুরি বিমূর্ত মনে হয়। সে এক স্বপ্নভুক পুরুষ। জীবনানন্দ দাশ-এর লেখা 'তাজের ছবি' গল্পের এই স্বাপ্নিক নায়কের নাম বিজন।

শ্রীবিলাস বিজনের বাবা। বাবা-মা'র একমাত্র পুত্র সে। বড় হয়েছে, বাবা চান ছেলে চাকরি করুক। এই ছেলেই যে তাদের সব। ছেলেকে বড় করতে গিয়ে কীভাবে কি হয়েছিল সেটি লেখক লিখেছেন-'ত্রিশ বছরের দাম্পত্যজীবনের এই একটিমাত্র সন্তান। একে আঘাত দিতেও ভয় হয়-অবহেলায় হারিয়ে ফেলতেও।'   

চেয়ে-চিন্তে শ্রীবিলাস ছেলের জন্য সরকারি অফিসে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে ফেলেন। কিন্তু বিজনের চাকরিতে রুচি নেই। বিজন নিজেকে আর্টিষ্ট বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। তার পিতা যে কোনো-এক সাহেব এর কাছে পুত্রের চাকরির দেন-দরবার করেছে সে নিয়ে তার বিস্তর বিরক্তি। পিতাকে সাফ জানিয়ে দেয়, 'আমি হলাম আর্টিষ্ট-এই-ই আমার পথ। সাহেবদের সঙ্গে দেখা করতে বলো তো পেরি ব্রাউনের সঙ্গে দেখা করতে পারি-অবিশ্যি ব্রাউন সম্বন্ধে আমার বিশেষ যে খুব শ্রদ্ধা আছে তা নয়- তবে তিনি যদি আর্ট সম্বন্ধে কিছু-কিছু জানেন দু-দণ্ড বৈঠকি হয়, মন্দ না।'   

তবু ছেলেকে রাজি করাতে বাবার অনুরোধ চলতেই থাকে। একটা চাকরি বিজনের করা উচিত। এদিকে বিজনও জানিয়ে দেয় শেষ কথা, চাকরি এবং আঁকাআঁকি এ-দুটো কোনোভাবে একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। শ্রীবিলাস প্রশ্ন করে, চাকরি আর আর্ট কি পাশাপাশি চলে না? নিজের যুক্তিকে পক্ষে টেনে বিজন তার স্বভাবমত ভুরু কপালে তুলে পিতার উদ্দেশ্যে বলে-  'তোমার এই যে যুক্তি এ হচ্ছে সংসার পরিবারে নিযুক্ত শতকরা একশোটি মানুষের যুক্তি। কিন্তু আমরা যারা এই একশোটি মানুষের বাইরে, আমরা জগৎটাকে একটু আলাদাভাবে দেখি।'
-‘কী বলতে চাও?’
-‘ছবিই আঁকব শুধু।’
-‘এটা ঠিক করলে?’
-'আমি ঠিক করি নাকি?’
-‘তবে কে?’
-‘ঠিক করে আমাদের জীবন।’
মহাভারতে পাঁচ ভাইয়ের কমন পত্নী কৃষ্ণা-দ্রৌপদী- পাঞ্চালীর,  (যে, যে-নামে ডাকি না কেন) পাঁচ সহোদরের স্ত্রী হবার নিয়তি কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল? পঞ্চপাণ্ডবের মাতা কুন্তী? স্বয়ংবরসভায় পুত্র অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করার পর কুম্ভকারগৃহে এসে যখন কুন্তীকে জানান, তিনি ভিক্ষে এনেছেন। ঘরের ভেতর থেকে কুন্তী দ্রৌপদীকে না দেখেই বলেন, ‘তোমরা সকলে মিলে একে ভোগ কর।’ পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে কুন্তী অপ্রতিভ হলেও দ্রৌপদীর জীবন তখনই নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চপাণ্ডব মাতৃআজ্ঞা পালনার্থে দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন। দ্রৌপদী হয়ে গেল পাঁচ ভাইয়ের এক স্ত্রী। বিজনের ক্ষেত্রেও জীবনানন্দ যেন সেরকম বুঝিয়ে দিলেন। বিজন কি করবে, সেটি ঠিক করে দেবে বিজনের জীবন। আর কিছু নয়। জীবনানন্দের কবিতার মতোই আশ্চর্য কুহক খেলা করে তাঁর কথাসাহিত্যে। কবিতার মতো তাঁর গল্পেও একইরকম ধোঁয়াশা দেখা যায়।   
কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া এক ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। তাঁর আত্মহত্যার কারণ, সরকারি চাকরি না পাবার হতাশা। সরকারি চাকরি নামক সোনার হরিণের দেখা না পেয়ে ছেলেটি ছাদ থেকে লাফিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিল। খবরটা পড়ে ভাবছিলাম- মানুষের জীবন কী এতোটাই তুচ্ছ? সেই ছেলেটি যদি জীবনানন্দের ‘তাজের ছবি’ গল্পটি পড়তো তাহলে সম্ভবত এই  স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার বদলে জীবনের আশ্চর্য সৌন্দর্যের দিকে ফিরে চাইতো, আরেকবার। সিদ্ধান্তটি পরিহারও করতে পারতো!

গল্পে জীবনানন্দ বিজনের মুখে সংলাপ বসিয়ে তার পিতাকে জীবন সম্পর্কে নিজের মতামত জানায়-ট
'আমাদের জীবনের সৌন্দর্য ও বিচিত্রতা এত বেশি! কিন্তু আমাদের অন্ধতাও কি কম! সার্কাসের আফিমখেকো একটা বুড়ো বাঘ দেখবার জন্য হাজার-হাজার লোক ছুটবে। কিন্তু পাশে ছোট ছোট সুন্দর শ্যামপোকা উড়ে আসছে কিংবা যে ঘাসের ওপর দিয়ে চলেছি-এসবের দিকে কেউ তাকাবে না-।

বিজন বলে-
‘একটা মস্তবড় খেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিককার রোদ আকাশ ডালপালা আর পাখির ভিতর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বারবার গভীর করে জেনে নিতে হয় জীবন কী সুন্দর- কী অনিবর্চনীয়।’

বিজন আরও বলে-
‘কিন্তু কী দুঃখের কথা, চাকরি পরিবার সংসার নিয়ে অল্প বয়সেই লটকে পড়ি আমরা, পৃথিবীর এত জায়গা থাকতে বেছে নিই মারকুট্টিমারা শহর, খোপের মতো বাসা, খোঁয়াড়ের মতো অফিস-।
এতসব কি শ্রীবিলাস বোঝেন ! জীবনানন্দের কবিতা ‘আট বছর আগের একদিন’ এর নায়ক মরার সংকল্পে যেদিন দড়ি হাতে অশ্বত্থ বৃক্ষের কাছে দাঁড়িয়েছিল সেদিন সে এই জ্ঞান নিয়ে বিদায় নিতে চেয়েছিল-  ‘যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় না ক’ দেখা।’ বিজন হয়ত ফড়িঙের, দোয়েলের সেই অলীক জীবনের দেখা পেয়েছিল, যার উদাহরণ বিজনের পিতার জীবনে ঘটেনি। ছেলের চাকরিতে যোগ না-দেবার দৃঢ়তায় শ্রীবিলাস ব্যাথিত হন। তার কিছু দেনা রয়েছে, বিজন চাকরি না করলে সেসব কে শোধ করবে? চিন্তিত তিনি। বিজন বিচলিত নয়। সে জানায়, ছবি বিক্রি করে সে পিতার দেনা শোধ করবে। সেই ছবি যেটি হয়ত তাজমহলের ছবি হবে। তাজমহল? বিজন পিতাকে জানায়, উইলিয়াম ড্যানিয়েল-এর আঁকা প্রায় একশো বছর আগে তাজমহলের ছবির পাশে তালগাছ দেখা গিয়েছে। যমুনার পাড়ে তালগাছ থাকার কথা নয়, তবু ছবিতে এমন দেখেছে, তাজের পাশে যমুনার পাড়ে দুটো তালগাছ। বিজন আসলে ছবি নিয়ে অনেককিছু জানে। সে ইমপিরিয়্যাল লাইব্রেরিতে বসে ছবি সম্বন্ধে বইপত্র পড়ে। বিজনের বান্ধবী মাধবীর সঙ্গে ছবি নিয়ে গল্প করে। মাধবীর পোট্টেট আঁকে সে। মাধবীর কাছে উইলিয়াম ড্যানিয়েল-এর তাজের সেই ছবির গল্প করার পর, মাধবী বিজনকে আইডিয়া দেয় তাজের তিন রকম ছবি আঁকার। একরকম হচ্ছে ঝরঝরে ভোরের বেলায় সোনালি পেঁয়াজি রঙের আলোয়, একটি জ্যোস্নায়, আরেকটি বর্ষায়। বান্ধবীর কথায় বিজন মুগ্ধ হয়ে তাজের তিন রকম ছবি আঁকতে আগ্রায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে পরিচয় হয় আরেকটি মেয়ে, সন্ধ্যার। সন্ধ্যার সাহায্যে একদিন গভীর রাতে ঘোর বর্ষায় বিজন ঠিকই তাজমহল দেখে এসে ঘরে ফিরে তাজের ছবি আঁকতে বসে যায়। এই ছবি, স্বপ্ন, কল্পনা মাধবী এবং সন্ধ্যাকে বিজনের নিকটবর্তী করে, সময় তখন কিছু পরিস্থিতি তৈরি করে যখন মনে হয় এ-দুজনার কেউ একজন বিজনের জীবনসঙ্গী হবে। এজন্য কিছু উপলক্ষ্যও সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরে বাস্তবে এসব কিছ্ইু হয় না। মাধবী বা সন্ধ্যার সঙ্গে বিজনের কোনো স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয় না। বিজনের সেই স্বপ্নের তাজের ছবি কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। শিল্পী হিসেবে বিজন কোনো অবস্থানও তৈরি করতে পারে না। বিজনের দুই বান্ধবীর অন্যত্র বিবাহ হয়ে যায়। বিজনের পিতা-মাতা দুজনই দেহত্যাগ করেন। বিজন হয়ে পড়ে একা। রিক্ত। তার স্থান হয় এক মেসবাড়িতে।
বিজন আগে পরিপাটি পোশাক পরতো। এখন তার গায়ে নোংরা খদ্দরের জামা, পায় ছেঁড়া স্লিপার। রাস্তার ধারে একটি ছেলে গুলিবাঁশ দিয়ে বুলবুলি পাখি মারছিল, বিজন তাকে বাধা দিতে যায়। কিন্তু তার বেশভূষা এত খারাপ সেই ছেলেটি বিজনকে পাত্তা দিতে চায় না। অথচ এই ছেলেটিই আগে গুলিবাঁশ দিয়ে বুলবুলি পাখি মারতে গেলে বিজনের তেড়ে আসায় পাখি মারতে নিবৃত হয়েছিল, কারণ তখন বিজন পরিপাটি পোশাক পরতো। সময়ের ফেরে সব কেমন বদলে গেল! গুলিবাঁশের আঘাতে সুন্দর বুলবুলি পাখিগুলো মারা যাচ্ছে- এই ব্যথা নিয়ে বিজন মেসবাড়িতে ফেরত আসে, সেখানে এসে সে দেখে তার বাকি তিন রুমমেট বিড়ি টানছে। সবাই দেয়ালের গায় যেখানে সেখানে থুতু ফেলছে। এরা সবাই অফিসে চাকরি করে, মাইনে পায়।
এভাবেই গল্পটির যবনিকাপাত হয়।

বিজনের জীবনের গল্পের এই পরিণতি নিয়তি বললে নিয়তি। জীবনানন্দ পাঠককে, ‘মানুষের জীবনের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়’- এর গূঢ় অর্থ বোঝাবেন বলে শিল্পী, প্রেমিক এবং স্বপ্নভুক বিজনকে এখানে নামিয়ে আনলেন। হয়ত গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা শিথিল করার কোনো ইচ্ছে জীবনানন্দের ছিল না, তাই জীবন যে প্রকৃতপ্রস্তাবে চাকরি, প্রতিষ্ঠা আর নিরেট টাকা-পয়সার খেলা সেই ধারণাই তিনি শেষ পর্যন্ত  টিকিয়ে রাখলেন।

তাজের ছবি’ গল্পে জীবনানন্দ কোথাও কোথাও কবিতার মতো পঙক্তি ব্যবহার করেছেন। যেমন-
‘এর মন ঢের অবসর পেয়েছে।’

‘গোলদিঘির পূব-দক্ষিণ কোণে একটা ম্রিয়মান নারকোল গাছ।’

‘ভোরের বেলা যখন সূর্যের সোনালি পেঁয়াজি রং নিটোল গম্বুজ মিনারে এসে পড়ে।’

‘সমস্ত শ্রাবণের আকাশ মেঘে গেছে ভরে।’

‘তরবারের ফলার মতো রোদ ঝলকায়।’

‘তরমুজের রসের ধোঁয়াটে রঙের মতো বৃষ্টির করুণ আলো।’  
জীবনানন্দ দাশ এর মতো নিজস্ব চেতনালব্ধ কবি কবিতায় যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন সেটি এখন মিথ। তাঁর কবিতার ব্যঞ্জনা বহুবিস্তারী ছিল সেখানে শব্দই কথা রেখেছিল। আমরা দেখলাম, শব্দের যাদুকর যখন গল্প লিখলেন তখন তার যাদু যেন ভিন্ন মাত্রা পেল। নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য কথাসাহিত্যে জীবনানন্দের পদচ্ছাপ রাখা, এ-তো অনেক পরের উন্মোচন। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস পাঠকরা পড়তে পেল, যখন তিনি আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই। সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বরের কবিতা রচনা এবং প্রকাশ করে তিনি সাহিত্যজগতে যে রোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দেন, জীবৎকালে তাঁর কথাসাহিত্যকে লুকিয়ে বাক্সবন্দি করে রেখে অন্যরকম এক সাসপেন্সও বজায় রাখেন। সংলাপের পর সংলাপ বসিয়ে ‘তাজের ছবি’ গল্পে জীবনানন্দ মানবজীবনের যে সকরুণ রূপের মোড়ক উন্মোচন করেন সেটি জীবনানন্দের সময়ের পর আজ বহুকালের ব্যবধানেও সমান প্রাসঙ্গিক। জীবনানন্দের নির্মেদ অথচ কবিত্বপূর্ণ গদ্য বাদ দিলে এটিও গল্পটির বড় তৃপ্তি এবং প্রাপ্তি।  


লেখক পরিচিতি
লীনা দিলরুবা
প্রবন্ধকার।   
     

1 টি মন্তব্য:

  1. দেবব্রত ঘোষাল২ জুন, ২০১৮ ৬:৫৬ PM

    জীবনানন্দের 'তাজের ছবি" গল্পটি আমার পড়া নেই। কিন্তু এই গল্পপাঠ-এ এই লেখকের পাঠ পড়ে, আমার মতো পাঠক যথার্থই উপকৃত। গল্পটি পড়ার উৎসাহে আছি।

    আমার জীবনেও জীবনানন্দের ওই 'বিজন'কে কিছু মাত্রায় কয়েকজনের মধ্যে দেখেছি। তাই লেখকের সাথে আমি একমত যে গল্পটি এখনো প্রাসঙ্গিক। বিজনের বলা, '‘একটা মস্তবড় খেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিককার রোদ আকাশ ডালপালা আর পাখির ভিতর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বারবার গভীর করে জেনে নিতে হয় জীবন কী সুন্দর- কী অনিবর্চনীয়।"-- পড়ে মনে পড়লো জীবনানন্দের অন্য একটি গল্পের শেষ লাইনগুলো, " অশরীরী পিতৃপুরুষেরা যোগের সৌন্দর্য অনুভব করিয়াছিলেন, কিন্তু বিয়োগের শূন্যতা ও মাধুর্য যে কত দূর তাহা তাহারা বুঝিতে পারিতেন, পল্লবিত বটগাছের দিকে না চাহিয়া একটা দীর্ঘ অগ্নিশিখা আকৃতির ঠুঁটো মঠের দিকে নক্ষত্রমাখা নিবিড় রাতে যদি একবার তাকাইয়া দেখিতেন "(সঙ্গ,নি:সঙ্গ)।

    উত্তরমুছুন