বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

গীতা দাসের গল্প : গাতাটায় ফেনা-স্নান

বিজ্ঞাপনটা দেখলেই বৈচির মাথার ভিতরে ফড় ফড় করে উঠে।মন আনচান হয়।এখনো বিজ্ঞাপনের মতো করতে না পারার দুঃখে বুক টনটন করে।ঢুকঢুক একটা শব্দ কোথায় যেন গা মারে।সাবানের ফেনারা সব চোখের পাতা ভেজায়।
চোখ থেকে ফেনা সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়ার, ভরিয়ে দেয়ার জন্য মনে মনে অনেক হিসাব নিকাশ করছে।সুযোগ পেলেই ইচ্ছাটা মিটিয়ে ফেলবে। 

বৈচির বহুদিন নিজের খাওয়ার পর টিউবয়েলে থালটা ধুয়ে ঐ থাল দিয়েই জল খাওয়া হয় না। শহরে তো পানি ফুটিয়ে ফাটিয়ে তবে খাওয়া।শহরে আসার পর প্রথম প্রথম টেপের জলে প্লেট ধুয়ে অভ্যাশবশত প্লেট দিয়েই টেপের জল খেয়ে ফেলতো বৈচি। মামী দেখে ভীষণ বকা দেয়। ডায়রিযা হবে। টেপের জল খাবি না। 

মামীর উদ্বেগ যতটা না বৈচির অসুস্থতার আশংকায়,এর চেয়ে বেশি ঝামেলা বাঁধাবে বলে।তবে কিছুই হয়নি।অবশ্য এখন আর খায় না।

গাঙের জল খেয়ে সওয়া বৈচির পেট।কতদিন নাওয়ে বসে মুড়ি খেয়ে গাঙের জল খেয়েছে। হাঞ্জু গাঙের জল খেয়ে সওয়া পেট তখন খারাপ হয়নি। পরে একদিন খারাপ হয়েছিল।এখন তো তার মর্যাদা বেড়েছে।মান বেড়েছে।ভাব বেড়েছে।তার আচার আচরণের পরিবর্তন হয়েছে।অভ্যাস পরিবির্তন হয়েছে। বোতলে জল নিয়ে রাস্তায় বের হয়। বাড়িতে গেলে হাগু করে আসলে ভাইয়ের পোলাপানদের সাবান দিয়ে দুই হাত ধুয়ানো আর স্যান্ডেল নিয়ে পায়খানায় যাওয়াকে ভাইয়ের বৌয়েরা আদিগিলামি মনে করে। নিজের মা পর্যন্ত মেয়ের আচরণে রুষ্ট। 

রুষ্ট সে নিজেও হয় এমন অপরিচ্ছন্ন কায়-কারবার দেখে।এজন্য বাড়িতে এসে থাকতে তার ভালো লাগে না।

বৈচিকে মহিলা মামী ডাকতেই বলেছে।বৈচিও আগ্রহ ভরেই মামী ডাকে।পেট ভরে খেতে দেয়।মাথা ভরে নারকেল তেল দিতে দেয়।চোখ ভরে টেলিভিশন দেখতে দেয়। পায়ে স্যান্ডেল পড়তে দেয়। শীতে মুখে ক্রিম মাখতে দেয়।টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে দেখা ক্রিমই কিনে দেয়, যদিও মামীকে কখনো টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে দেখা ক্রিম মাখতে দেখেনি বৈচি। সে তো শীতে স্নান সেরে মুখে সরিষার তেল দিত। তাও শীতে সারা শরীরে তেল মাখতে পারতো না। শীতে সারা শরীর টানটান লাগতো। সারা শরীরে তেল মাখলে রান্না হবে কিসে।

টেবিল চেয়ারে বসেই খায়। প্রথম প্রথম রান্না ঘরে কোনায় পিঁড়ি ছাড়া বসেই খেত।মামী পরে টেবিল চেয়ারে বসেই খেতে বলেছে। প্রথমদিন তো চেয়ারে বসে টেবিল প্লেট রেখে খেতে গিয়ে আদরের আনন্দে আর আরামে চোখের জল মুছতে মুছতে খেযেছে। 

সিনেমায় দেখা গৃহকর্তৃ মামীর মতো নয় এ মামী।মামী জানে বৈচির যেমন পেটের দায়ে, পিঠের ঘায়ে শহরে এ বাসায় থাকা দরকার, তেমনি মামীরও বৈচির মতো কাউকে সার্বক্ষণিক বাসায় দরকার। কাজেই দুজনে দুজনার স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। তবে মামী করছে সজ্ঞানে আর বৈচি করছে সগুণে। 

বৈচির বাইরে যাওয়া নিষেধ।মা বাবা তো মামীর কাছেই সঁপে দিয়ে গেছেন।মামীও উঠন্ত বয়সের মেয়েকে বাইরে যেতে দেন না। 

বৈচির একটা শখ শহরে এসে মনে জেগেছে। টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের একটা দৃশ্য এ সাধ জাগিয়েছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না তা মেটাবে কবে।বিজ্ঞাপন দেখলেই বৈচির মাথা ভনভন করে উঠে। পেট বুটবুট করে। বুক ধড়ফড় করে।মটমট করে মনের ভেতরে যেন বৈশাখী ঝড়ে ডাল ভাঙে। 

যে কোনদিনই মেটাতে পারে, তবে সাহস পাচ্ছে না। মামী উনার কোন জিনিস অন্যে ব্যবহার করুক তা পছন্দ করেন না।একদিন নিজের ছেলে বাথরুমের গাতাটায় স্নান করতে নেমেছিল। মামীর সে কি ধমক।যতটা না ঠান্ডা লাগবে বলে তারচেয়ে বেশী অপরিষ্কার করছে বলে। মামীর নাকি গা ঘিন ঘিন করছে। বৈচি সব পরিষ্কার করলেও গাতাটা মামীই পরিষ্কার করে। ঐদিন প্রথমে বৈচিকে দিয়ে ইচ্ছেমতো গাতাটা মাজিয়ে ঘষিয়ে নিয়েছে।পরে আবার নিজে চুড়ান্ত প্রলেপ দিয়েছে।মামাও এটায় নামে না। 

মামী সবদিকেই ভালো,শুধু তার নিজস্ব কিছু অন্যকে ব্যবহার করতে দেয় না।প্রথমে এসেই বৈচি ভুল করে ফেলেছিল।পরে মামী বৈচিকে সবই পইপই করে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তবে মায়ের তোয়ালে দিয়ে বাচ্চাদের মুছালেও যে সমস্যা তা বুঝতে পারেনি। বৈচিদের বাড়িতে এক গামছা সবাই ব্যবহার করে। 

রাগের চোটে মামাকে বলেছিলেন,যাও,ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।এতো করে বুঝিয়ে বলার পরও একই কাজ করে।

বৈচি চুপ করেছিল বলে রাগ কমেছে।মামা পরে বৈচিকে বলেছিলেন,কিরে বাড়ির মতো চললে হবে! 

আজকেও আবার সেই বিজ্ঞাপন।সাবানের বিজ্ঞাপন।একটা সুন্দরী নায়িকা সাবানের ফেনা ভর্তি গাতায় সাবানের ফেনার মাঝে বসে আছে।গা উদোম,তবে গোপন কিছু দেখা যাচ্ছে না।আজকে অন্য আরেকজন। ফেনার মধ্যে আবার লাল গোলাপের পাঁপড়ি উড়ে উড়ে পড়ছে। নায়িকা একটু আধটু চোখ খুলছে আর বন্ধ করছে। বৈচির গা কেমন এক আরামে, আমেজে, আবেশে শির শির করে উঠে। 

না, সাধটা পূরণ করেই ফেলবে।বাথরুমের গাতাটায় ছোট পুষ্কুনি বানিয়ে স্নান করার সাধ। ছোটবেলায় দাপিয়ে নদীর জলে স্নান সেরেছে। বাংলা সাবানে শরীর ঘষেছে, কিন্তু উদোম গায়ে নয়।আর বাংলা সাবানে এতো ফেনাও উঠেনি। 

কিন্তু মামীর কড়া বারণ তার বাথরুম ব্যবহার না করা।সাহস সঞ্চয় করছে। 

মামী তাকে গন্ধ সাবানই কিনে দেয়।তবে মামীর গন্ধ সাবান না। আর মামী বাথরুমের ছোট পুষ্কুনিতে একটা বোতল থেকে গোলা সাবান দিয়ে স্নান করেন। জলের লাহান।গুললে অনেক ফেনা হয়। বৈচির এ জীবনের সাধ সে গোলা সাবানে বাথরুমের গাতাটায় ছোট পুষ্কুনিতে স্নান করা।

আজই স্নান করবে।মনস্থির করেই ফেললো।মামা অফিসে।মামী অফিসে। ছোট দুইজনই স্কুলে।মামা দুজনকে স্কুলে দিয়ে যায়।বৈচিই তাদের স্কুল থেকে আনে।কাছেই স্কুল। তাকে পিচ্চিরা দিদি ডাকে।দিদিও মনভরে যত্ন করে। 

সবাই বাইরে চলে গেলে বৈচি কাপড়-চোপড় সাবানের গুঁড়া দিয়ে ভিজায়, বিছনাপাতি ঝাড়ে, আনাজ তরকারী ধুয়ে কাটে, মাছ মাংস ধুয়ে রান্না করে। স্নান সারে। পরে স্কুলে যায়। ছুটাবুয়া ঘরদোর মুছে কাপড়-চোপড় ধুয়ে দিয়ে যায়।বৈচি ফাঁকে বুয়াকে দিয়ে টুকটাক অন্য কাজও করিয়ে নেয়। 

আজ রান্নার ঝামেলা নেই।গতকাল গেস্ট ছিল।অনেক কিছু রান্না হয়েছিল। রয়ে গেছে। মামী বলে গেছে আজ হরতাল দিতে। মানে রান্না বন্ধ রাখতে। ফ্রিজের খাবারে দুপুর ও রাত হয়ে যাবে।কাপড়-চোপড় ধুতে হবে না।একটু জলকাঁচা করলেই হবে।এ হরতালে বৈচির একটু জিরান হয়।ছোটদের স্কুল থেকে এনে শুধু খাবার গরম করে দিলেই হবে।ছুটাবুয়া কাজ সেরে চলে গেছে।

বৈচি বিছনাপাতি ঝেড়ে, ফার্ণিচার মুছে মামীর বাথরুমে ঢুকে। তাড়াহুড়ায় গোলা সাবান ঢালতে গিয়ে একটু বেশিই পুষ্কুনিতে পড়ে যায়। তাড়াহুড়া সময়ের নয়।ভেতরের তাড়া কাজ করেছে।যাকগে। মামী কি আর মেপে রেখেছে!বাথরুমের ছোট পুষ্কুনিটি কানায় কানায় ফেনা।বৈচি আনন্দে ডগমগ। শরীরটা ভিজিয়ে রাখে। আহা!কি শিরশিরে অনুভূতি।শরীরের এক ইঞ্চিও বাকি নেই যেখানে সাবান লাগেনি। দাঁড়িয়ে ফেনাসহ নিজেকে আয়নায় দেখে। আবার ডুবে যায়। কতক্ষণ চলে এ খেলা তা বুঝতে পারেনা। 

হঠাৎই দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা। কলিং বেল রেখে দরজার ধাক্কায় বৈচি ভড়কে যায়। পরক্ষণেই মামীর গলার উচ্চস্বর কানে আসে। 

কি হলো? কোন বিপদ আপদ নয়তো!এতোক্ষণ কলিং বেল টিপছি কোন সাড়া শব্দ নেই। মোবাইলও ধরে না। এমনটি তো হয় না।

পাশের দুই বাসার লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজও পাচ্ছে বৈচি।তবে কি বলছে বুঝা যাচ্ছে না। 

বৈচি জানে মামী অনেক সময় ছেলেমেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। এমনটা হয় স্কুল কোন কারণে আগে ছুটি হয়ে গেলে মাস্টাররা মামীকে ফোন দেয়। আজ কি তাই হলো? মামী তখন বৈচিকে আগে যেতে বলে।অনেক সময় মামীও অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে আসে।তবে সাধারণত মামী ছুটি নেয় না। মোবাইল ফোন নিয়েই তো বাথরুমে ঢুকেছিল।ফোন কি বেজেছে!মামীর বাথরুমে নিজের শুকনা কাপড়ে ভিজা হাত মুছে দেখে মামীর অনেক মিস কল। বৈচির আজ সাবানের বুদবুদের নেশায় ফোনের শব্দ কানে যায়নি।

শরীর এখন কাঁপছে। কিছুটা মামীর ভয়ে, কিছুটা অনেক সময় সাবানের ফেনায় ডুবে থাকাতে আর কিছুটা হয়তো এখন কি করবে ভেবে না পেয়ে।

যদিও বৈচির সব হিসাব কিতাব করা। তাড়াতাড়ি শরীরে জল ঢেলে কাপড় পরে বলবে বাথরুম ধুচ্ছি। 

কিন্তু শরীরে সাবানের ফেনা ধুতে কলে যে জল নেই! 

বৈচি জোরে বলে, মামী খুলতাছি।

বলেই মামীর বাথরুমে রাখা নিজের শুকনা কাপড়গুলো দিয়ে শরীরের ফেনা মুছে ওইগুলোই কাঁধে নিয়ে বুদবুদিয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুলে। 

মামী তো অবাক। কাঁপছে কেন? ভিজা কাপড়ে কাঁধে আধা ভিজা কাপড় কেন? 

বৈচি কাঁপতে কাঁপতেই বলে, কাজ কম বলে আমি আপনের বাথরুমডা ধুইতে চাইছিলাম, কিন্তু মোনে অয় জ্বর আইতাছে। 

তার কাঁপানি দেখে মামী এ নিয়ে প্রশ্ন না করে বলে, কাপড় বদলে টেবিলে রাখা দুইটা প্যারাসিটেমল খেয়ে ফেল আগে,পরে কথা বলি।

মামী নিজের বাথরুমে ঢুকে একটু তছনছ পায়। বেশি অবাক হয় বাথ জেলের কেপ খোলা পেয়ে। কিন্তু অসুস্থ বৈচিকে কিছু বলে না। 

বৈচি কাপড় পাল্টিয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ে। তবে প্যারাসিটেমল টেবিল থেকে নিলেও খায় না। যদিও তার সত্যি সত্যিই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে এবং মন কাঁপিয়ে বমি আসে। সে তাতে খুশিই হয়। অনেকের প্যারাসিটেমল খেয়ে হাফ ছেড়ে জ্বর ছাড়ে। আর জ্বর আসাতে বৈচি হাফ ছেড়ে বাঁচে।

৫টি মন্তব্য:

  1. অনেকদিন পরে আপনার লেখা পড়লাম। বেশ ভালো লাগছে।
    তবে "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ" হলে ভালো হত আরো বেশি। একটা নিশ্চিত শান্তি নিয়ে পাঠক শেষ করবে গল্পটি। "এরপর কি হল" বিষয়টি থাকলো না।
    এ ছাড়া কিছু বানান ভুল ও আঞ্চলিকতা দোষেদুষ্ট হয়েছ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ত‌িয়াশা চাকমা২৫ মে, ২০১৮ ১২:১৫ AM

      অাঞ্চল‌িকতা থাকত‌ে পার‌ে যদ‌ি সচেতনভাব‌ে লেখক ব্যবহার কর‌েন। ব্যাপারটা দ‌োষ‌ের কিছু নয়।

      মুছুন
  2. ত‌িয়াশা চাকমা২৫ মে, ২০১৮ ১২:০৭ AM

    প্রান্ত‌িক নারীর মন‌ে অাজক‌ের বিজ্ঞাপন জগৎ!এবং তার জ‌েগে ওঠা সাধ!বিষয়বস্তু হ‌িসেবে ঘরের সহযোগী মানুষের কথা ব‌েমালুম উধাও হয়‌ে যায় অাজক‌ের কথাসাহিত্য‌ে । এট‌ি তার ব্যত‌িক্রম। গাঁথুন‌িও চমৎকার। ল‌িখত‌ে থাকুন। বাংলায় নতুন ধরন‌ের গল্প জমুক।

    উত্তরমুছুন
  3. এই প্রথম আপনার গল্প পাঠের সুযোগ হলো দিদি। একটা বিজ্ঞাপনকে ঘিরে সুন্দর একটা গল্প লিখে ফেলা যায় ব্যাপারটা বেশ লাগলো। আশা করবো আরো লিখবেন। শুভকামনা। :)

    নাহার তৃণা

    উত্তরমুছুন