বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

উম্মে মুসলিমা'র গল্প : সুবর্ণা

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা নয়। ঢাকার এক বস্তিতে বাস করতো এক কালো কুচ্ছিত মেয়ে। নাম তার সুবন্না। তো সুবন্নার বয়স তেইশ হলেও তার বিয়ে হয় না। হবে কেমন করে? নামেই সুবর্ণা। দেখতে কুবর্ণা। মা রেখেছিল নাম। ভাগ্যিস বস্তির কেউ ও নামের অর্থ জানে না। এরই মধ্যে বস্তির চারজন রিকশাওয়ালা ওকে প্রস্তাব দিয়েছে। বিয়ে করতে নয়।
যদি যৌবনজ্বালা থাকে তবে মেটাতে পারে তারা। এর মধ্যে একজন আবার বলেছে তাকে বিড়ি খাওয়ার পয়সা দিলে সে রাজি। সুবন্না বটি হাতে সবাইকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়। বটির গোড়ায় রাশি রাশি রজনীগন্ধা, গাঁদা, কাঠবেলি, গোলাপ। সে শাহবাগে অর্ডারি মালা সাপ্লাই দেয়। ওর কাজ এতো নিখুঁত যে আশেপাশের সব দোকান সুবন্নাকে অর্ডার দিতে চায়। বলে ‘এই সুবন্না, আমরা আটআনা বেশি দেবো পার মালা, আমাদেরগুলো করে দিস’। বেশি অর্ডার নিলে বুঝি কাজ ভালো হয়? মা এনে ফেলেছিল এ বস্তিতে সেই এতটুকুন কালে কোন সে দূরের গাঁ থেকে অভাবের তাড়নায়। রাস্তা পার হতে গিয়ে শাড়ির ছেঁড়া পাড়ে পা আটকালে ওখানেই মাকে চিড়েচ্যাপটা করেছিল ট্রাক। সেও হয়ে গেল পাঁচ’ছ বছর। এক বস্তিতো চাচীর কাছে ছিল সে এতদিন। কিন্তু যেদিন মাত্র একখিলি মশলাদার পানের লোভে চাচী এক বাহাত্তুরেকে কথা দিয়েছিল সুবন্নার ব্যাপারে সেদিন থেকে সুবন্না আরো দূরে সরে গিয়ে আলাদা হয়েছিল। চাচী বলে দিয়েছিল ‘তোর ঐ হাঁড়ির পাছার কালি শৈলে কেউ পা-ও পোছপে না’।

সুবন্না মালা গাঁথে। স্বপ্ন দেখে। মায়ের কাছে শোনা কয়েকটা গল্প মিলিয়ে মিশিয়ে নিজে নিজে একটা গল্প তৈরী করে। একটা সুঁচকুমার ও কাজলরেখার গল্প আরেকটা সুখি-দুখির। সুবন্না শুধাতো মাকে
‘ও মা, কাজলরেখা দেখতি কিরাম?’
‘সোন্দর পরীর মতন। নাজার মেইয়ি না?’
সুবন্নার বিশ্বাস হয় না‘তেবে তার নাম কাজলরেখা ক্যান?’
‘তা তো জানিনি। রুপকতা তো’
‘আমার নাম কাজলরেখা’
‘না, তুই আমার সুবন্না’।

মালা সাপ্লাই দিয়ে ফিরে কোন একদিন রাতে ঘরে ঢুকে ও যেন দেখতে পায় ওর নিজ হাতে সেলাই করা নকশি কাঁথার ওপর এক রাজপুত্র শুয়ে আছে। সারা গায়ে মুখে চোখে সূঁচ বেঁধা। যন্ত্রণায় কাতর। ঝুড়িভরা ফুলের মউ মউ গন্ধে ভরে উঠলো ঘর। রাজপুত্র বলে ওঠেÑ
‘কে ওখানে?’
‘আমি কাজলরেখা’
‘অ’
‘আপনার কি অনেক কষ্ট?’
‘খুব কষ্ট। সারা গা ব্যথা। চোখ ব্যথা। কিছু দেখি না’
‘আমি আপনার সব কষ্ট দূর করে দেব’
‘সে কি সম্ভব কাজলরেখা? এতো সূঁচ! এতো বেদনা!’
‘রোজ তিনটে করে সূঁচ তুলবো। আর গাঁদা ফুলের বোঁটা বেটে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেবো’
‘কিন্তু সাবধান! চোখের সূঁচগুলো সবশেষে। যেদিন চোখের সূঁচ তুলবে সেদিন উষালগ্নে ভালো করে পদ্মদিঘিতে ¯œান করে নতুন শাড়ি পরে শেষ সূঁচদুটোতে হাত দেবে। সেদিন আমি তোমাকে প্রথম দেখবো। আমরা মালা বদল করবো’।
সুবন্না ওর জীবনের সবচেয়ে সেরা দুটো মালা সেদিন সারারাত ধরে গাঁথবে।

এর পরপরই কাজলরেখা আর সূঁচরাজার রূপকথা মোড় নেয় সুখি-দুখির উপকথায়। সেই যে দুখি নামের অসুন্দর হাড়গিলে মেয়েটি চাঁদের বুড়ির কাছে তার উড়ে যাওয়া তুলো ফেরত আনতে গিয়েছিল। মা সুবন্নার মাথা কোলের মধ্যে নিয়ে চুলে বিলি কাটতো আর বেড়ায় হেলান দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প বলতোÑ

‘যাতি যাতি যাতি দুখি দেখে কি এক গাইগরু তার আঁতুরি বাছুর নিয়ি এক্কেবারে নেজে-গোবরে। সে দুখিকে ডাইকি বোলে Ñ ও মেইয়ি, আমার গা-ডা এট্টু ধুইয়ি দিয়ি যাবা? গোবর-নাদা সাফ কইরি দিবা? বাছুরডার মুখটা আমার ওলানে ধইরি দিবা? দুখির চোখে গরুর দু:খে পানি। সে বড্ড যতেœর সাতে গরুর সব কাজ কইরি দেয়। এরাম কইরি ঘাটে ঘাটে আরু কতোজনের কতো কাজ হাসিমুখি কইরি তেইগি দুখি পৌচায় চাঁদের বুড়ির কাছ’।

‘খিদি প্যাটে এতো কাজ করার কী দরকার ছিইলু দুখির? দুখি এতো ভালো ক্যান মা?’

‘নাচার মানষির কাজ কইরি দিলি আল্লা তাক পুরুস্কার দেয়’

‘আল্লার পুরুস্কার কি আসমান তি পড়ে?’

‘না, মানুষির হাত দিয়িই আসে’

‘তে তুই যে মানষির এতো উবগার করিস তোর পুরুস্কার কই মা?’

‘দেবে। তু বড় হবি। এট্টা ভালো বিয়ি হবে। তুই সুখি হলি সিডাই তো আমার পুরুস্কার’

‘যে ছুরোতজামালের জরমো দিইচিস, তার আবার বিয়ি!’

কেন বিয়ে হবে না? ও তো দুখির মতো চাঁেদর বুড়ির কাছে যাবে। যেদিন সূঁচরাজার গায়ের সব সূঁচ তোলা হয়ে যাবে, শুধু চোখের দুটো বাকি থাকবে সেদিন সুবন্না তার ছেঁড়া বালিশ থেকে সব তুলো বের করে নতুন করে সেলাই করতে বসবে। উত্তরি বাতাসে তুলো উড়তে থাকবে। সুবন্নাও তুলোর পেছন পেছন দৌড়াতে দৌড়াতে চাঁদের বুড়ির কাছে পৌঁছে যাবে। রাস্তায় শুকনো পাতাজমা কলাগাছের নিচে বিশ্রাম নিতে গেলে কলাগাছ বলবেÑ
‘কে ও, সুবন্না না? কোথায় যাও?’
‘তুলো উড়ে গেছে গো কলাবতী মা, চাঁদের বুড়ির কাছে ফেরত আনতে যাচ্ছি’
‘তা বেশ। দেখ, কী আবর্জনা আমার পায়ের গোড়ায়। একটু সাফ করে দেবে?’
‘কেন দেবো না? বিলক্ষণ। এক্ষুণি দিচ্ছি’।

কলাগাছের তলা সাফসুতরো করে তারপর সুবন্না চলে যাবে চাঁদের বুড়ির কাছে। বুড়ি তাকে রূপের ঘাটে ¯œান করে আসতে বলবে।

‘খরবরদার! তিন ডুবের বেশি না’
‘সেতো আমি জানি বুড়িমা। মায়ের কাছে আমার সব শোনা আছে’।

অথৈ রূপ নিয়ে সুঁচরাজার চোখের শেষ সূঁচ দুটো খুলে বিন¤্র ভঙ্গিতে বসে থাকবে সুবন্না। রূপের আলোয় সুঁচরাজার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। আবারও চোখ কোচলে দেখতে থাকবে সুবন্নাকে। সূঁচরাজা বলবে।
‘কে বলে তুমি কাজলরেখা? তুমি আমার সুবন্না’।
তারপর মালাবদল। সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকবে সুবন্না আর সূঁচরাজা। তখন তো আর সূঁচ থাকবে না। সুবন্না তাকে কেবল ডাকবে আমার রাজামশাই।

অনেক রাত জেগে সুবন্নাকে মালা বানাতে হয়। সুবন্না মালা গাঁথে আর স্বপ্ন দেখে। চোখে রাজ্যের ঘুম। বাতাসে নিভে যায় কেরোসিনের প্রদীপ। হঠাৎ হাতে সূঁচ ফুটে যায়। অতো রাতে কে দরজা ঝাকাচ্ছে? বেড়ার দরজা। নাকি বাতাসে কাঁপছে? কই, আকাশে তো ছিটেফোঁটা মেঘ নেই। পূর্ণমাসী চাঁদের আলো সুবন্নার বেড়ার ঘরের ছিদ্র দিয়ে বিছানায় পাতা নকশিকাঁথাকে আরো বেশি নকশি করে তুলেছে। চাঁদের আলোর ছিটে যেন লালনীল সুতোর বুননে সলমাজরির কাজ। মেঝেতে পাতা বিছানা, সারা মেঝেয় ফুলের ছড়াছড়ি, চাঁদের থির জ্যোৎ¯œা, যেন ফুলশয্যার রাত। কে দরজা নাড়ে? সূঁচরাজা? রক্তঝরা আঙুল জিবে চুষে নিয়ে বটি হাতে দরজার ঝাঁপ আলগা করে সুবন্না। মা কালির মতো খড়গ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পায়ের কাছে প্রায় নতজানু নতমুখ বসে আছে এক ক্ষীণকায় ছিন্নবস্ত্র মানুষ।

‘কো গো আপনে?’
‘বড্ড খিদে। এট্টু ভাত। খুধার জ্বালা বড় জ্বালা’।
কোরোসিন আলো জ্বালিয়ে মুখের কাছে ধরে সুবন্না। আলো ফেলা মুখে নেই কোন ভাবান্তর। চোখের পাতায় সূঁচ নেই। পাতাই নেই তো সূঁচের কী দরকার? অন্ধ ভিখিরি। তবে মুখখানা রাজার মতন। শরীরের রঙে ঠিকরে পড়ছে জ্যোৎ¯œা। হাত ধরে ঘরে তোলে সুবন্না তার রাজাকে। সুবন্না জানে সূঁচরাজা আর সুখি-দুখির গল্প জোড়তালি লাগিয়ে নিজেকে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা নিজেকে সান্ত¦না দেয়া বৈ আর কিছুই নয়। অন্ধ ভিখিরিকে দেখে সে গল্পটাকে একমুহূর্তে অন্যভাবে সাজিয়ে ফেলে। এ অন্ধ যুবক ভিখিরি তার মায়ের আশীর্বাদ। থাক না, সে অন্ধই থাক। সূঁচ তুলে তাকে চক্ষুষ্মান করার দরকারটা কী?

সে রাতে সুবন্না ডালে-চালে খিচুড়ি রেঁধে পরম আদরে মুখে তুলে খাইয়ে দিল তার রাজাকে। নিজ হাতে মুখ মুছিয়ে দিল। রাজা শুধালোÑ

‘ও মেয়ে, তোমার আর কেউ নেই?’

‘যার থাকার সে যদি এতোকাল বাদে আসে তা’লি আর কিডা থাকপে? ’
‘ও তাই। নাম কী গো ভালোমেয়ে তোমার?’
‘সু্উুবন্না’
‘সুবন্না! আহ্্ তাই। তোমার ঘরে এতো সুবাস কেন সুবন্না?’
‘আইজ যে আমাগের ফুলশয্যা গো’ খুব আস্তে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো সুবন্না। এ যেন করুণাময়ের উপহার। তার মায়ের আশীর্বাদ। সব ফুল ঢেলে দিল মাটিতে বিছানো তার নকশি কাঁথার ওপর। যে দুটো মালা গাঁথা হয়ে গেছে তার একটা দিল রাজার হাতে একটা ও নিজে। হাত ধরে ফুলের সিংহাসনে বসালো তাকে। বললোÑ

‘মালাবদল হবে না’?

সুবন্না ভিখিরির বুক ছুঁয়ে মাথা নোয়ালো। ভিখিরি কাঁপা হাতে সুবন্নার গলায় মালা পরিয়ে দিল। সুবন্না মালা পরাতে গিয়েই লবঙ্গলতিকার মতো ভিখিরির বুকের মধ্যে ঢলে পড়লো। ফুলের শয্যা টেনে নিল ওদের।

অনেক বেলা হয়ে গেছে। সূর্য বেড়ার জানালার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় এক ঝলক আলো ফেলে যেতেই সুবন্না ঝট করে চোখের ওপর হাত বিছিয়ে দেয়। এমনধারা জীবন্ত স্বপ্ন সে আগে কোনদিন দেখেনি। কী আশ্চর্য! ও তো কোনদিন ব্লাউজ খুলে ঘুমায় না। ওর গায়ে কোন ব্লাউজ নেই কেন? এত বেলা অব্দিও তো কোনদিন আগে ও ঘুমায়নি। স্বপ্ন এমন মধুর! সূঁচরাজার গল্পের কথা ভাবতে ভাবতেই বুঝি ওর এ দশা! কিন্তু গায়ে কেন ওর অন্যরকম গন্ধ? শরীর কেন এতো নির্ভার? ও কেন ফুলের বিছানায় শুয়ে? সকাল সকাল শাহবাগে গিয়ে মালা জমা দিতে হবে। কিন্তু মালা তো গাঁথেইনি ও গতরাতে। কেবল দুটো মালা বদল করেছে সে আর তার অন্ধ রাজা। কেন এ স্বপ্নটা তার সত্যি হলো না? সে তো বেশি কিছু চায় না। কেবল তার শরীরের সঞ্চিত সবটুকু বেদনা বিলিয়ে ভারমুক্ত হতে চায় সে। হোক না সে অন্ধ, হোক ভিখিরি, হোক হাভাতে। এ কি তার খুব বেশি চাওয়া? কেবল কালো কুচ্ছিত বলে কি ওর বেদনা নেয়ার কেউ থাকবে না? স্বপ্নে কি সাধ মেটে? কিন্তু ওর কেন শরীরটাকে পাখির পালকের মতো হালকা লাগছে? হায়! ওর জীবনে এমন রাত কি আর আসবে? আরে! গান গায় কে? ভারি সুরেলা গলা। এবার উঠে ব’সে চোখ খোলে সুবন্না। খালি গায়ে শাড়ি পেঁচিয়ে নিতে গিয়ে হঠাৎ নিজের উন্মুক্ত শরীরকে ওর কেমন অচেনা মনে হয়। ধুসর আয়নায় নিজের মুখের ছায়া পড়তেই ও চমকে ওঠে। ওর কালো রঙে যেন লাবন্যের বন্যা। ঠোঁট দুটোয় মলিনতা নেই আর। দুহাতে চোখ ডলতেই তার ঘরের পৈঠা থেকে আবার ভেসে আসে গান

‘মিলন হবে কতো দিইনেএ-এ আমার মনের মানুষেরো সনে, আমার মনের মানুষেরো স-অ-অ-অনে’।

ও, তাহলে ওকে ভূতে পায়নি? ঐতো তার অন্ধ রাজা গান গাচ্ছে। সুবন্না চুল আঁচড়ায়, খোপায় নকশি কাঁটা আটে। ব্লাউজ পরতে গিয়েও না পরে তার রাজার ছিন্ন চাদর গা থেকে সরিয়ে নিজের খোলা শরীরের ছোঁয়া দিয়ে পেছনে দাঁড়ায়। গান থামিয়ে রাজা ঘুরে দাঁড়িয়ে সুবন্নাকে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে।
‘উরি বাবা! চিমসে শৈলে জোর তো খুব!’
‘তোমকে পেয়ে জোর যেন আরো বেড়ে গেছে সুন্দরী। তুমি আমার জেবনডা ভরে দিয়েছো’
‘বাবা! কতা তো না যেন্ রেডিও! আমি সুন্দরী তুমি জানলা কিরাম কইরি?’
‘তোমার গায়ের সুবাস। আর তুমি যে সুবন্না গো!’
‘সুবন্না মানে জানো তুমি?’
‘জানবো না? আমি যে ছেঁওড়ির সাঁইবাবার শিষ্য’ বলে গান গেয়ে ওঠে 
‘ভবে মানুষ গুরু দীক্ষা যার, ভবে মাহানুষ গুরু দীক্ষা যাআআআআর’।
‘কী সোন্দর গলা তুমার। নাম কী আমার গায়েনের?’

‘তুমি যদি সুবন্না আমি তা’লি সুকণ্ঠ’
‘বড্ড খটমটে’
‘তা’লি পরে জম্মান্ধ’
‘হেট্, জন্মান্দ কারুর নাম হয়? তুমি আমার রাজা। আমার সূঁচরাজা’
‘তা হবে। যে নারীর হাতে মালা গাঁথা সূঁচ তার জেবনসাথি সূঁচরাজা। মন্দ কী?’
ওরা দিনভর ভালোবাসাবাসি করে। সুবন্নার মনে কোন দ্বিধা নেই। মালাবদল করেছে তো বিয়েই করেছে। তার সূঁচরাজা তাকে গান শোনাবে আর সে মালা গেঁথে দুজনের পেট চালাবে। অন্ধ মানুষের কাছে সে সুবন্না না কুবন্না সে হিসেবের দরকার কী? একজন জন্মান্ধ, একজন কৃষ্ণবর্ণ। একজন অক্ষম একজন সক্ষম। সুবন্না গায়েনের শরীর ঘেষে সারাদিন মালা গাঁথবে আর গায়েন মেটাবে তার দেহ আর প্রাণের দাবি। সেও উজাড় করে দেবে তার আযৌবন সঞ্চিত সুধা। সে ডালি ভরে ফুল আনবে তার সূঁচরাজা অপেক্ষায় থাকবে। এতদিনে সে বুঝতে পারবে ঘরে ফেরার আনন্দ। রাজা তো রাজাই। তাকে কিছুই করতে দেবে না সে। সুবন্না তার অসীম প্রেম দিয়ে রাজার গৌরব রক্ষা করে যাবে।

দুদিন ফুল আনতে যায়নি সুবন্না। শরীরে নিত্য জাগরণ আর বুকে ভালোবাসার তুফান। যৌবনের এ দুই মহারথী এতো ক্ষমতাধর আগে জানতে পারেনি সুবন্না। এতো দেখি নাওয়া-খাওয়াও ভুলিয়ে দেয়! আজ না গেলে দুটো মানুষের পেট চালানো দায়। রাজার অন্ধ চোখের ওপর চুমো খেয়ে সকাল সকাল খালি ঝুড়ি মাথায় বেরিয়ে যায় সুবন্না। শরীরে তার হালকা হাওয়ার দোলা। রাজা সুবন্নার শরীর ছুঁয়ে গান গেয়ে বিদায় দেয় ‘পড়শী যদি আমায় ছুঁতো, যম যাতনা সকল যেত দূরে..’।
সুবন্নার বাধা দোকান ‘ফুলবাসর’-এ পৌঁছাতেই দোকানের চ্যাংড়া ছেলেটা হৈ হৈ করে উঠলো।

এই যে মহারাণী, কোথায় ছিলি দুদিন? পাঁচটা হেভি অর্ডার ফিরাতে হলো তোর জন্যে। এতো কামাই করলে তোর পেট চলবে? নে নে হাত লাগা। আজ এখানে বসেই করতে হবে কয়েকটা’

‘ই: আমি মইরি গেলি ফুলবাসর অচল হয়্যি যাবে?’
‘আল্লা তোকে বাচায়ে রাখুক। তুই আমাদের লক্ষী। শাবানা আসছিল। বলে দিইছি তোর খোঁজ আনতে পারলে একটা কাজ ওকে দেব। কাজের যা ছিরি ওর! খালি গায়ের রঙ ফর্সা হলেই সব হয় না।’

কালো সুবন্নাকে একটু উৎসাহিত করার চেষ্টা সেটা ও বুঝতে পারে। সুবন্না মালা বানাতে হাত লাগায়। ও তো এখন মহারাণীই। তার রাজা আছে না ঘরে? প্রথম ফুল গাঁথতে গিয়েই সূঁচ ফুটলো আঙুলে। আবার কী হলো? তার রাজা তাকে মনে করছে নিশ্চয়। তাড়াহুড়ো করলে কাজ ভালো হবে না। কিন্তু ওর যে ঘরে ফেরার তাড়া। আহা, লোকটাকে কতক্ষণ না খাইয়ে রাখবে? দুপুর গড়িয়ে গেল হাতের কাজ শেষ করতে। একটু বেশিই পারিশ্রমিক পেল আজকে ও। সোরোয়ার্দ্দি উদ্যানের ভেতর হাসানমামুর ইটালিয়ান হোটেল থেকে দুজনের জন্য পলিথিনে ভাত আর ডিম রান্না নিয়ে দ্রুত পা চালালো। খিদেয় ওরও পেট মোচড়াচ্ছে। মোড়ের দোকান থেকে একটা তিব্বত ¯েœা কিনে নিল। যদিও তার অন্ধ রাজার বুঝার উপায় নেই তার মুখখানা ¯েœামাখা না প্রসাধনহীন। তবুুুুুুুুুও একটা সুন্দর গন্ধ তো দিতে পারবে। নিজের কাছে তো মনে হবে মুখটা তার ঢলঢল। লোকটাকে সে ঠকাচ্ছে না। রাজা নাকি তার গায়ের সুবাস পায়। গায়ের আবার সুবাস কিসের? ফুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে থাকে শরীরে। নাকি শরীরের আলাদা কোন গন্ধ থাকে?

ত্রস্ত হাতে ঘরের দরজার বেড়া ঠেলে ঢুকতেই সুবন্না দেখে তার রাজা বেড়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছে। মুখখানা বিষণ। গলায় গান নেই। তার আগমনে কোন অস্থিরতা নেই। ভারি খিদে পেয়েছে মনে হয়।

‘কী হইছে রাজা? আমার দেরি হয়িছে বইলে রাগ কইরিছো? আমু তো এ্যখুনু খাইনি। আগে দুজুন খাইয়ি নিই তাপ্পরে রাগ কিরাম কইরি ভাঙাতি হয় তা দেকাচ্চি’।

খাওয়া শেষ হয়। সুবন্না আঁচল দিয়ে রাজার মুখ মুছিয়ে দেয়। রাজা ঢেকুর তোলে কিন্তু কথা বলে না। সুবন্না রাজার গলা জড়িয়ে ধরে। কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে সুর করে বলে Ñ

‘তুমি মোর জেবনের সাধনা-আ-আ’
নিজের গলা থেকে সুবন্নার হাত ঘেন্নায় সরিয়ে দেয় অন্ধ গায়েন। বলেÑ
‘শাবানা আসছিলো তোমার খোঁজে। তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ। তুমি সুবন্না না। তুই কালো, তুই কুচ্ছিত! তুই আমাকে ঠকায়ছিস। তুই জোচ্চর!’
থুঃ করে ঘরের মেঝেয় বিছানো ফুলের মধ্যে একখাবলা থুতু ফেলে হাতের লাঠি তুলে নিয়ে অন্ধ ভিখিরি পথ হাতড়িয়ে বেরিয়ে গেল।

কালো রঙের সুবন্না মালা গাঁথার জন্যে আনা ছড়ানো ফুলের মাঝে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকার সময় বেড়ায় ঝুলানো ঝাপসা আয়নায় নিজেকে দেখতে পেল। আয়নার মুখটি না কাজলরেখার না সুখির না সুবন্নার।

আমার গল্পটি ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন