বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

জেসমিন চৌধুরী'র গল্প : 'মনীষার বাগান'

কথাটা আরিফকে কী করে বলবে মনীষা ঠিক করে উঠতে পারেনি। ও কি সহ্য করতে পারবে? বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের সম্পর্কটা তেমন ভালো যাচ্ছে না, মনীষার মনে হচ্ছে আরিফের জীবনে তার প্রয়োজন একটু একটু করে কমে এসেছে। নিজের কাজ নিয়েই মেতে আছে সে। হয়তো ভালোই হবে, আরিফ আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে। কী ই বা এমন বয়স হয়েছে তার? তার জীবন থেকে মনীষার বিদায় নেয়ার এটাই তো ভালো সময়। আরিফের অফিস থেকে ফেরার সময় হয়ে এলো বলে। শরীরটা আজ একেবারেই ভালো নেই তবু উঠে দাঁড়ায় মনীষা। ক্লিনিং কাবার্ড থেকে ফাইবার ক্লথটা বের করে নেয়। আরিফ ফেরার আগেই ঘরটা সুন্দর করে গুছিয়ে নেবে সে। খবরটা সাজানো গোছানো ঘরেই তাকে দেবে, একটা এলোমেলো ঘরে বিশ্রী খবরটা দেয়া ঠিক হবে না। আরিফ কি খুব ভেঙ্গে পড়বে? নাকি ‘ওহ আচ্ছা’ বলে স্টাডিতে ঢুকে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে আবার? 

শেলফের বইগুলোর গায়েও প্রচুর ধূলা জমেছে, আরিফের বাংলা নাটক আর কবিতার বিশাল কালেকশন, তার নিজের অনেকগুলো ইংরেজি সাহিত্যের এনথলজি, সেক্সপিয়ারের রচনা সমগ্র, ঢাকার ফুটপাথ থেকে কিনে আনা সমারসেট মমের ছোটগল্পের ছয়টা সংকলন। আজকাল বই আর তেমন একটা পড়া হয়না, আরিফ ব্যস্ত, মনীষা নির্লিপ্ত। উপরের তাকের বইগুলো নামাতে গিয়ে মনীষার গলার কাছটায় হঠাত চিনচিন করে উঠল। হালকা চিনচিনে ব্যথাটা আজকাল বেশ ঘনঘনই হচ্ছে। 

আপন মনে চোয়ালের ডানদিকটায় হাত বুলায় মনীষা। চোয়ালের হাঁড়ের ফুলে উঠা জায়গাটাকে আগের চেয়ে খানিকটা উঁচু মনে হচ্ছে। শুরুতে ব্যথা ছিল না একেবারেই, গত কয়েকমাস ধরে ব্যথা হচ্ছে, ঘুরেফিরেই আসছে। ব্যথাটা এতো হালকা যে ঠিক ব্যথা বলা যায় না, ইংরেজিতে বলতে গেলে ‘স্লাইট ডিসকমফোর্ট’। ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করে সার্জারিটা করিয়ে নিলেই হয়তো ভালো হতো। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছিল, মনীষা চাইলেই তারা সার্জারি করে হাড়ের উঁচু জায়গাটা কেটে ফেলে দিতে পারে। কিন্তু যেহেতু ম্যালিগনেন্ট কিছু পাওয়া যায়নি, ব্যথা নেই, তেমন একটা দৃষ্টিকটুও নয়, সেহেতু সার্জারির ঝামেলায় না যাওয়াই ভালো। কতদিন আগের কথা? বছর তিনেক তো হবেই। এই তিন বছরে মনীষার স্বাস্থ্য এবং আরিফের সাথে তার সম্পর্ক দুটোই খারাপের দিকে গেছে, কিন্তু আরিফ বোধ হয় এর কোনোটাই খেয়াল করেনি। 

নতুন কেনা ডাইসন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পুরোটা বাসার কার্পেট নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে নিল মনীষা। যন্ত্রটা আসলেই বেশ ভালো, একেবারেই হালকা কিন্তু ময়লা টানে ঝড়ের গতিতে। পয়সা খরচ করে কেনাটা ভুল হয়নি তাহলে? আপন মনে হাসে মনীষা, এই যন্ত্রের ভালো মন্দে তার আর কী আসে যায়? সে তো আর এসব সাথে নিয়ে যাবে না? 

আজ বেশ কড়া রোদ উঠেছে, কাপড়গুলো বাগানের টানা দড়িটাতেই মেলে দিয়েছিল। এতোক্ষণে শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়ই। বাগানে পা দিতেই তার গোড়ালি অবধি কাদায় গেড়ে যায়। শুধু কোনোমতে কাপড় শুকানো, তাতেই এতো ঝক্কি, বাগান করা ছেড়ে দিয়েছে সেই কবেই। পাশের বাসার আফ্রিকান বুড়ি আন্টি বলেছিল এই এলাকার মাটির নিচ দিয়ে নাকি বয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এক নদী, তাই এখানের বাগানগুলো কখনোই শুকনা থাকে না। হয় পাকা করে নাও, অথবা কাদার সমুদ্রে সাঁতার কাটো। আর কোনো পথ নেই। 

শুরুতে অবস্থা এতোটা খারাপ ছিল না, গ্রীষ্মের তিনটা মাস বেশ শুকনাই থাকত বাগানটা। মে/জুন মাসে কাঠের বেড়ার কাছটা ঘেঁষে রাই সরিষা আর লাউশাক লাগাত মনীষা। বিদেশের মাটিতে নিজের বাগানের ট্রেলিস বেয়ে লাউয়ের লতাকে বাড়তে দেখার সুখটাই অন্যরকম, খাওয়াটা পরের কথা। তারপর ধীরে ধীরে আশেপাশের সবগুলো বাড়ির বাগান একে একে পাকা হতে থাকল, আর তাদের বাগানের পানি একটু একটু করে এসে জমতে লাগল মনীষাদের বাগানে, কাদা বাড়তে লাগল। সেবার মনীষার লাউয়ের লতার গোড়াটা একফুট বড় হয়েই পানিতে পচে গেল। 

আরিফ বলল, ‘বাগানটা পাকা করে নিতে হবে। এই সমস্যার আর কোনো সমাধান নেই।‘ 

মনীষা রাজি হলো না, ঘাস ছাড়া আবার বাগান কীসের? 

সেই থেকে বাড়িটা বিক্রি করার জন্য পীড়াপীড়ি করে আসছে মনীষা। শহর থেকে একটু বাইরে খানিকটা উঁচু এলাকায় বাগানসহ একটা বাড়ির দাম আর কতই বা হবে? ছোট থেকে বাগান করার সখ মনীষার। ঠিক সখ নয়, অনেকটা স্বভাব বলা যেতে পারে। তাদের বাড়ির সামনে পেছনে চারপাশ ঘিরে বিরাট বাগান ছিল। বাবা নিজের হাতে গাছের যত্ন করতেন, মনীষাও বাবার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা বাগানে পড়ে থাকত। সেই থেকে গাছপালার সাথে তার সখ্যতা। 

বনের পথে হাঁটতে গিয়ে একটু পরপর থেমে যায় সে, জংলী গাছগুলোর পাতায় হাত বুলিয়ে টেক্সচার দেখে, বুনো ফুল কুড়িয়ে নেয়। আরিফ বিরক্ত হয়। সে কাজের মানুষ, হাঁটতে গিয়ে বারবার থেমে যাওয়া ভালো লাগে না তার। পাতার মধ্যে এতো দেখবার কী আছে? সেই এক সবুজ রঙই তো! সবুজেরও যে কত শেড, কত আভা মনীষা আরিফকে বোঝাতে পারে না। বাগান করার বিষয়টাই যেন আরিফ বোঝে না। তিনমাস যত্ন করে পাঁচ পাউন্ডের লাউশাক খাওয়া, সময়ের শ্রাদ্ধ ছাড়া আর কী? ঘাস দেখতে চাইলে পার্কে গেলেই তো চলে, বাসার পেছনে জঙ্গল লাগিয়ে রাখার কোনো মানে হয়? 

বিষয়টা অমীমাংসিতই থেকে যায়। কিছুদিন হলো আরিফের প্রমোশন হয়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে, ছুটি কমেছে। ফান্ডিং কাটের কারণে মনীষার নার্সিং এর চাকুরীটা চলে যাওয়ার পর অনেক একা হয়ে গেছে সে। আরিফ বলছিল, ‘একটা চাকুরী গেছে তো কী হয়েছে? অন্য কোনো হসপিটালে দেখো, ঘরে বসে তো বোরড হয়ে যাবে একদম’। 

মনীষা কিছু বলে না। আরিফ হয়তো ধরে নিয়েছে মনীষা এক সুযোগে একটু আরাম করে নিচ্ছে। নিজের কথাগুলো যে আরিফকে বুঝিয়ে বলবে আরিফের সেই সময় কোথায়? সেবার মিসকারেজ হওয়ার পরও যখন একের পর এক প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ আসতে লাগল, রক্তে একগাদা প্রেগন্যান্সি হরমোন, আরিফ কিছুটা ভয় পেয়েছিল। একটোপিক হতে পারে ভেবে অবজারভেশনে রাখা হয়েছিল তাকে। তারপর ধীরে ধীরে হরমোন নেমে গেল, সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরল মনীষা। আরিফ এ নিয়ে আর কোনো কথাই বলল না। মনীষার শরীরটা দুজনেরই, কিন্তু তার মনটা একান্তই তার একার। 

সেই মনে অব্যক্ত সব কষ্ট নিয়ে মনীষা সমস্ত দিন বাসায় বসে থাকে, বন্ধুবান্ধবও খুব একটা নেই তার। পরপর তিনবার মিসকারেজ হবার পর তার আর কারো সাথেই মিশতে ভালো লাগে না। বাচ্চাদেরকে নিয়ে মানুষের আদিখ্যেতা নিজের প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতকে বারবার তাজা করে তুলে। মাঝে মধ্যে টুকটাক বাজার করতে যাওয়া ছাড়া ঘরেই থাকে মনীষা। একাকীত্ব গা সওয়া হয়ে গেছে কিন্তু বাগান করতে না পারার অতৃপ্তি মা হতে না পারার কষ্টের মতই তাকে তাড়া করে ফেরে। বাসা বদলানোর কথা কয়েকবার আরিফকে মনে করিয়ে দিয়েছে মনীষা, কিন্তু তার এখন এসব ভাববার অবসর নেই। কাজ ছাড়া অন্য কিছুই আজকাল তার মাথায় ঢোকে না। 

গত দুই সপ্তাহ ধরে আরিফ ইউকেন্ডেও কাজ করছে, বাসায় ফিরছে দেরি করে। বাসায় ফিরেও স্টাডিতে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, মাঝে মধ্যেই আবার কার সাথে ফোনে কথা বলছে। বাসায় যে আরো একজন মানুষ আছে, সেটা যেন সে ভুলেই গেছে। মনীষাও ঠিক করে নিয়েছে সে আর আরিফকে জ্বালাবে না, সে তো চলেই যাবে। মনীষা চলে গেলে আরিফকে তো কাজ নিয়েই থাকতে হবে, তা-ই থাকুক না হয়। 

ড্রেসিং টেবিলের স্টুলটায় বসে একটু আগে শ্যাম্পু করা চুলে চিরুনী চালায় মনিষা, গলার কাছটায় আবার সেই চিনচিনে ব্যথাটা! বাইরে গাড়ির শব্দ শুনে ঘড়ির দিকে তাকায়। মাত্র পাঁচটা বাজে, এরই মধ্যে চলে এলো আরিফ? মনীষা কি তাকে কথাটা এক্ষুনি বলবে, নাকি রাতের খাবারের পর? এতো প্রস্তুতির কি আসলেই প্রয়োজন আছে? গত কিছুদিনে অনেক দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে তাদের মধ্যে, তার এভাবে চলে যাওয়াটা হয়তো আরিফ সহজভাবেই নিতে পারবে, কে জানে! 

‘মনি! মনি!’ নিচের ল্যান্ডিং থেকে আরিফের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। কতদিন পর আজই কেন আদরের নামটা ধরে ডাকছে ও? উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা ঘুরে যায় মনীষার, চোখ অন্ধকার হয়ে আসে, আবার বসে পড়ে স্টুলটায়। সিঁড়িতে আরিফের পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, এক সাথে দুটো তিনটে করে সিঁড়ি টপকে উঠে আসছে ও। 

দুই হাত পেছনে রেখে মনীষার সামনে এসে দাঁড়ায় আরিফ, ‘বলো তো আমার হাতে কী?’ 

মনীষা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ তার অনেক দিন আগের চেনা আরিফ যে তাকে আদর করে ‘মনি’ বলে ডাকত, প্রায়ই নতুন সব কাণ্ড করে তাকে চমকে দেয়ার চেষ্টা করত, অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে তাকে নিয়ে ঘুরতে যেত। আজ কেন সেই আরিফ ফিরে এলো? সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর? এই আরিফকে সে কি করে ছেড়ে যাবে? এমন তো কথা ছিল না! 

‘এই নাও চাবি। মর্টগেজ, কমপ্লিশন সব শেষ, এখন শুধু তুমি গিয়ে বাড়িটায় ঢুকবে’। 

মনীষা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে, তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, চাবিটা ঝাপসা হতে হতে কুয়াশার মত মিলিয়ে যেতে থাকে। না, সে কিছুতেই আরিফের সামনে কাঁদবে না। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয় মনীষা। পেছন থেকে তাকে দুই হাত জড়িয়ে ধরে আরিফ, 

‘রাগ করেছ মনি? দিনরাত কাজ না করলে কি ডিপোজিটের টাকাটা জমাতে পারতাম বলো? তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে কিছু বলতেও পারছিলাম না’। 

তাহলে আরিফের গত কয়েকদিনের বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ততা এই নিয়ে? একটা ঘর কেনার ঝামেলা কম নয়, মনীষা জানে, অথচ সে কী অভিমান করে বসেছিল আরিফের উপর। কিন্তু আরিফের জন্য যে আরো অনেক বড় একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে, সেকথা মনীষা কী করে তাকে বলবে? সে তো আরিফের মত পরিকল্পনা করে সারপ্রাইজ দিতে চায়নি। 

মনীষার অবাধ্য চোখ থেকে বড় বড় দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে আরিফের হাতে। 

‘আশ্চর্য মনি, আমি ভাবলাম তুমি খুশিতে পাগল হয়ে যাবে, আর তুমি কী না কাঁদছ? এদিকে ফিরো তো।’ 

মনীষা ফিরতে চায়, প্রাণপনে আঁকড়ে ধরতে চায় আরিফকে, এতো শক্ত করে যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে ছিনিয়ে নিতে পারে না। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখা রিপোর্টটা আজই পেয়েছে সে, ডাক্তার তার কাছে গোপন করেনি কিছুই, গোপন করবার নিয়ম নেই এদেশে। তিনবছর আগের আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হওয়া গ্রোথটা তলে তলে অনেক হিংস্র হয়ে উঠেছে, তার হিংস্রতা যে এতোটা ছড়িয়ে গেছে মনীষা নিজেও টের পায়নি। এখন আর খুব বেশি সময় নেই তার হাতে। 

মনীষার নীরবতা আরিফের কানে ঢোকে না। সে বলে যেতে থাকে, 

‘শোনো, সেই যে গেল বছর মার্সি নদীর পাড় বেয়ে উঠতে গিয়ে একটা বাড়ির বাগান দেখে তুমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলে, বলেছিলে ‘বাড়ি চাই না, শুধু যদি এমন একটা বাগান পেতাম!’ তার পাশের বাড়িটাই কিনেছি তোমার জন্য, বাগানটা আরো অনেক সুন্দর। দামটা এতো বেশি বলেই তো এতোদিন ধরে খাটতে হলো। বাগানে কতগুলো লাউগাছ লাগাবে বলো? নিজের হাত মাচা বেঁধে দেব আমি। ও বৌ, অনেক রাগ হয়েছে, এবার এদিকে ফেরো তো!’ 

মনীষা ফিরতে পারে না, নিজের অজান্তেই চোয়ালের হাঁড়ের গ্রোথটায় হাত রাখে, চিনচিনে ব্যথাটা আবার ফিরে এসেছে। সে মনে মনে ভাবে, ‘আমি আর কখনোই ফিরতে পারবো না আরিফ, অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে’। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন