সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

আহমাদ মোস্তফা কামাল'এর গল্প : ভয়

তখন সন্ধ্যা নামছিল। এ-তো নতুন কিছু নয়; সন্ধ্যা তো প্রতিদিনই আসে, নিয়মের ব্যতিক্রম না ঘটিয়েই আসে, শুধু এই শহরেই নয়, আসে পৃথিবীর সব শহরে, সব জনপদে; তবু সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল অন্যরকম। কয়েকদিন ধরে সূর্যটা যেন আগুন ঝরাচ্ছে-- রোদ নয়, যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এসে লাগলো গায়ে-- এরকম মনে হয় বাইরে বেরুলে।
তবু শহরবাসীদের না বেরিয়ে উপায় নেই, কেউ তো তাদেরকে আর বসিয়ে খাওয়াবে না! যদিও তারা বা তাদের পূর্বপুরুষেরা একদিন, সুদূর অতীতে কোনো একদিন, খাদ্যের সন্ধানেই এখানে এসেছিল, শুনেছিল এই শহরে খাদ্যবস্তুর ছড়াছড়ি, কিন্তু এসে দেখেছে-- এখানে কেউ কারো জন্য খাবার সাজিয়ে বসে থাকে না, জোগাড় করে খেতে হয়, জোগাড় করতে হলে যুদ্ধ করতে হয়, কাড়াকাড়ি-মারামারি-হানাহানি করতে হয়, নইলে না খেয়ে শুকিয়ে মরতে হয়। তারা ওই যুদ্ধেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
অবশ্য ঘরে বসে কোনো আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করা গেলেও হয়তো তারা তা করতো না, বাইরে বেরুতোই। কারণ ঘরে শান্তি নেই। তীব্র ভ্যাপসা গরম, এতটুকু হাওয়া নেই কোথাও, কিংবা থাকলেও কোনো ঘরে ঢুকবার উপায় নেই-- গায়ে-গায়ে লাগানো দালানকোঠা, দোকানপাট, বিদ্যানিকেতন-উপাসনালয়, বাজার-শপিংমল-হোটেল-রেস্তোরাঁ-পতিতালয় এমনভাবে ঘিঞ্জি হয়ে আছে যে নিঃশ্বাস আটকে আসতে চায়। তবু দিনশেষে ক্লান্ত শরীর-মন নিয়ে সবাই ঘরের দিকেই ফিরছিল, যেমন ফেরে প্রতিদিন। সেই দিনটি হয়তো প্রতিদিনের মতো ছিল না, নইলে সন্ধ্যাটা ওরকম হবে কেন? তখনও ঘরে ফেরা হয়নি সবার। হবেই-বা কীভাবে? রাস্তায় মাছি থিকথিকে ভিড়, মানুষ আর মানুষ, লক্ষ লক্ষ মানুষ, কোটি কোটি মানুষ, ওপর থেকে তাকালে এতগুলো মাথাকে মাছির ঝাঁক বলে মনে হবে নিশ্চয়ই। জবাই করা পশুর জমাটবাঁধা রক্তে কিংবা কুষ্ঠরোগীর দগদগে ঘায়ের পুঁজে যেমন অসংখ্য মাছি ঝিম মেরে বসে থাকে, ঠিক সেরকম। কিংবা হয়তো ঠিক সেরকমও নয়। কেউ তো আর কখনো উঁচু থেকে তাকিয়ে দেখেনি যে, এই শহরের চলমান জনস্রোতকে দেখতে কেমন লাগে! সুউচ্চ ভবন আছে প্রচুর এই নগরে, কিন্তু ছাদে উঠে আকাশ দেখার বা নিচের দিকে তাকিয়ে দেখার বিলাসিতা নেই, সময় নেই, ইচ্ছেও নেই কারো। আসলে যে কী আছে নগরবাসীর জীবনে, সে সম্পর্কে কেউ কিছু জানেও না, তারা নিজেরাও ঠিকমতো জানে না। জানবেই-বা কীভাবে? কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, এমনকি কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকায় না কখনো, গিজগিজে ভিড়ের ভেতরেও হেঁটে যায় একা। ফলে এরকম চির অচেনা-অনাত্মীয়-অপ্রিয় শহরে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরা সহজ ব্যাপার নয় কারো জন্য। পথেই কেটে যায় ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা, অনির্দিষ্টকাল, কে যে কখন বাসায় ফিরবে কিংবা আদৌ ফিরতে পারবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সন্ধ্যার অন্তত ঘণ্টাদুয়েক আগে কর্মস্থল থেকে ছুটি পায় তারা, তবু সন্ধ্যার পর মানুষের স্রোত থেকে যায় রাস্তায়। প্রতিদিনকার ব্যাপার এটা। তবু সেদিনের সন্ধ্যাটা অন্য দিনগুলোর মতো ছিল না। হয়তো তখন সূর্য ডুবছিল, কিংবা কিছুক্ষণ আগেই হয়তো ডুবে গেছে-- এ শহরে কেউ তো আর সূর্যাস্ত দ্যাখে না, কখন যে সূর্য ডোবে তার খবরও রাখে না কেউ-- তবু সন্ধ্যা যে ঘনিয়ে এলো সেটি বুঝতে কোনো সমস্যাই হয় না কারো। সত্যি বলতে কি, সন্ধ্যা হলো কি না, এ নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। এ শহরে সন্ধ্যা তার স্বাভাবিক রূপলাবণ্য নিয়ে নামে না বহুকাল হলো, কতদিন তার হিসেবও রাখেনি কেউ; তাদের জীবন এমনিতেই নানা বিদঘুটে হিসেবনিকেশে ভরা, বলা যায়-- হিসাব মেলাতে মেলাতে হিমশিম খাওয়া কিংবা মেলাতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়া মানুষ তারা, রূপময়ী সন্ধ্যার কথা ভাবা এদের জন্য নিতান্তই এক বিলাসিতা। ম্যাড়ম্যাড়ে বৈশিষ্ট্যহীন সন্ধ্যায়, থিকথিকে ভিড়ের ভেতরে, ভ্যাপসা গরমে ঘামতে ঘামতে, ধুলোবালিতে দমবন্ধ করা গরম বাতাস থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে বাঁচাতে তারা কেবল ভাবতে থাকে-- কতদূর, আর কতদূরে গন্তব্য, আর কতটা সময় পার হলে তারা নিজেদের ঘুপচি ঘরে শরীরটাকে সেঁধিয়ে দিতে পারবে? কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যায় তাদের ভিন্ন কিছু ভাবতেই হলো। হঠাৎ, হ্যাঁ হঠাৎই, কারণ এমন হয়নি তাদের জীবনে এর আগে কোনোদিন-- এক তীব্র অচেনা ভয় জাপটে ধরলো তাদের। ছোটবেলায়, অমাবস্যার রাতে, যেমন হঠাৎ করে ভূতের ভয়ে সিঁটিয়ে যেত তারা, যুক্তিহীন-অসংজ্ঞায়িত-অভাবনীয় ভয়, আগ্রাসী দমবন্ধ করা ভয়-- সেইরকম ভয়ে কুঁকড়ে গেল তারা। চলমান মানুষের স্রোত হঠাৎ থমকে গেল, শিশুরা মায়ের বুকে প্রাণপণে মুখ গুঁজে রইলো, মায়েরা আর কোনো আশ্রয় না পেয়ে শিশুটিকেই বুকে চেপে রইলো, আর কর্মজীবী মায়েদের শিশুরা তারস্বরে ভয়ার্ত চিৎকার শুরু করলো-- তাদের মায়েরা তখনও পথে, ভিড়ের ভেতরে, থমকে থাকা জনস্রোতের মাঝখানে। আকাশ বিদীর্ণ করা সেই সম্মিলিত চিৎকারে নগরবাসীদের ভেতরে নেমে এলো এক অভূতপূর্ব স্তব্ধতা; একদিকে অচেনা ভয় অন্যদিকে শিশুদের চিৎকার-- যেন লক্ষ লক্ষ সাইরেন বাজছে, জানাচ্ছে বিপদসংকেত, সেই চিৎকারে পোষা আর বেওয়ারিশ কুকুরগুলো একসঙ্গে বিলাপ শুরু করলো, হ্যাঁ বিলাপই, ঘেউ ঘেউ নয়, সুর করে একটানা কান্নার মতো ডাক, এরকম বিলাপ কেবল মায়ের বুকের ওম পেলেই থেমে যেতে পারে, ওদের তো মা নেই, থামাবে কে? থমকে থাকা জনস্রোত অনুভব করতে পারলো-- এই অভাবনীয় ভয়টি ক্রমশ আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে, কিন্তু আতঙ্কিত মানুষের আর্তচিৎকারটি তাদের কণ্ঠ ফুটে বেরুচ্ছে না। তারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো, কিন্তু তাতে ভয় আরো বাড়লো, কারণ কারো কাছেই কোনো মুখকে চেনা বলে মনে হলো না। আর হবেই-বা কীভাবে, এই নগরে তো কেউ কখনো কারো দিকে তাকায়ইনি, কিংবা সুদূর অতীতে তেমনটি ঘটে থাকলেও-- যেমনটি তারা শুনেছে পিতৃপুরুষের স্মৃতিকথায়, একদা নগরবাসী পরস্পরের দিকে হাসিমুখে তাকাতো, বাড়িয়ে দিতো সহমর্মিতার হাত, উষ্ণ করমর্দনে পরস্পরকে সম্ভাষণ জানাতো-- সেসব তারা দেখেনি কোনোদিন। কতকাল আগে এই নগরের বাসিন্দাদের ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গেছে, সেখানে এখন বিরক্তি, শঙ্কা আর ভয়; চোখের কোমল ভাষা হারিয়ে গেছে, সেখানে এখন সন্দেহ ও ক্রুরতা-- করতল থেকে উষ্ণতা হারিয়ে গেছে, সেখানে এখন নিরাবেগ শীতলতা-- কেউ তার খবরও রাখেনি। এখন পাশের মানুষটিকেও শত্র“ মনে হয়, অচেনা কেউ কথা বলতে এলে শঙ্কা, সন্দেহ ও সংকোচ জাগে, ভাবে-- মনে কোনো কুমতলব নেই তো লোকটার? আর এরকম হবেই-বা না কেন? লোকজন এখন বাজারের ব্যাগে শাক-সবজী-মাছ-মাংসের বদলে চাপাতি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কে যে কখন কার ঘাড়-গলা-মাথায় কোপ বসিয়ে দেবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই; পশু জবাই করার বদলে চাপাতি এখন ব্যবহৃত হয় মানুষ জবাই করার জন্য, কোপাকুপির জন্য, মানুষের রক্তে হোলি খেলার জন্য। তারা এভাবে মরে যেতে চায় না। মরতে একদিন হবেই তারা জানে, তবু কোপ খেয়ে মরতে তাদের খুব ভয়, কারণ এভাবে মরার জন্য দায় চাপবে তাদের কাঁধেই, তারা কী কী দোষ করেছিল যে চাপাতিওয়ালারা তাদেরকে কোপাতে বাধ্য হলো তা খতিয়ে দেখার জন্য নির্দেশ দেবেন স্বয়ং রাষ্ট্রশৃঙ্খলামন্ত্রী, এমনকি নগরপ্রধানও সেই সুরে সুর মেলাবেন, শৃঙ্খলাবাহিনীর প্রধানরা একযোগে তাদের দোষ খোঁজার জন্য মাঠে নামবেন, না খুঁজে পেলে দোষ বানাবেন; খুন হয়ে যাওয়া মানুষটির পরিবার করুণ চোখে এসব কর্মযজ্ঞ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে আর ভাববে, তাদের স্বজনটি কি সত্যিই এমন ছিল? মৃত্যুর পর এসব ঝামেলা কে পোহাতে চায়? তারা তাই যথাসম্ভব নিজেদেরকে চাপাতিমুক্ত রাখতে সচেষ্ট থাকে। নারীরা থাকে আরো বিপদে, আতঙ্কে ও আশঙ্কায় সর্বদা কাঁপতে থাকে শরীর ও মন। কারণ, এই নগরে পুরুষের হাত সর্বদা খুঁজে বেড়ায় নারীর শরীর; রাস্তা--ঘাটে, পার্কে-উদ্যানে, মার্কেটে-যানবাহনে সর্বত্র সেসব হাত সক্রিয়; নারীরা প্রতিদিনই লোলুপ হাতের কুৎসিত স্পর্শ নিয়ে, গ্লানি নিয়ে, অশুচি নিয়ে বাসায় ফেরে। সব সময় যে এত সহজে ফিরতে পারে তাও নয়। সুযোগ পেলে তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়, মাইক্রোবাসে ঘুরে বেড়ায় একদল পুরুষ, তারা পথ থেকে তুলে নেয় কোনো যুবতী নারীকে, মাইক্রোবাস শহরের ভেতরেই ঘুরতে থাকে, যুবতী ধর্ষিত হতে থাকে সেখানে, কেউ ফিরেও দেখে না; বাসের ভেতরে ধর্ষণ করা হয় কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে থাকা কোনো তরুণীকে; খেয়ানৌকায় পার হওয়ার সময় ধর্ষিত হয় কোনো নারী; রাস্তায়, পার্কে, বাসা-বাড়িতে, এমনকি জনপদের সবচেয়ে নিরাপদ বেষ্টনির ভেতরেও ধর্ষিত হয় নারীরা; আর তারপর সমস্বরে সেই অপমানিত-লাঞ্চিত মেয়েটিরই দোষ খুঁজতে থাকে সবাই-- নিশ্চয়ই সে পুরুষদের প্রলুব্ধ করেছিল, নইলে পুরুষেরা অহেতুক তাকে ধর্ষণ করতে যাবে কেন? আবার যুবকেরা, বয়স্ক মানুষেরা পিটিয়ে মেরে ফেলে শিশুদের, শিশু হত্যার জন্য তারা প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে অভিনব সব পন্থা; কখনো রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে করতে পিটিয়ে পিটিয়ে, ঠিক যেমন করে সুরাপান করে শীতপ্রধান দেশের লোকেরা; কখনো গুহ্যদ্বার দিয়ে কমপ্রেশার পাইপ ঢুকিয়ে হাওয়া প্রবেশ করিয়ে; কখনো স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ তুলে ফেলে; কখনও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তারা। ফলে এই ভয়কাতর সন্ধ্যায় জনবহুল রাস্তায় প্রতিটি মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে একা একা। অনুভব করে-- ভয়টি আতঙ্কে রূপান্তরিত হয়ে ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে তাদের, অবশ করে ফেলছে চেতনাকে, পা দুটোকে গেঁথে দিচ্ছে কংক্রিটের ভেতর, নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে চলার শক্তি, পাথরের মতো ভারী হয়ে যাচ্ছে নিজেদের পলকা শরীরগুলো, তবু তাদের কিছুই করার নেই। ভয় পেলে মানুষের আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়, তারা জানে, যেমনটি তারা পেতো শৈশবে বাবা-মায়ের কাছে; জানে যে, একমাত্র মানুষই পারে মানুষকে আশ্রয় দিতে, মানুষই পারে মানুষের ভয় তাড়াতে, কিন্তু চারপাশে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও ভয়টি ক্রমশ বেড়েই চলেছে; এই মানুষগুলোই ভয়টিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে; পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি যে খুনি নয়, ধর্ষক নয়, ছিনতাইকারী নয়, চোর নয়, ডাকাত নয়, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? তাদের ব্যাগে, প্যান্টের পকেটে, আস্তিনের তলায় যে চাপাতি লুকিয়ে রাখেনি, বা পিস্তল, অথবা নিদেনপক্ষে ছুরি, সেটাই-বা বোঝার উপায় কী? তারা অনুভব করে উঠতে পারে, এতকাল ধরে-- কতকাল তার হিসেব কেউ রাখেনি-- তারা পরস্পরকে সন্দেহ করে এসেছে, অবিশ্বাস করে এসেছে, এমনকি ঘৃণা করে এসেছে, তাদেরকে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধু বলে গ্রহণ করা যায় না, এমনকি বিশ্বাসও করা যায় না, বিশ্বাস এক প্রতারক শব্দ, এক বোকামির নাম এই শহরে, বন্ধুত্ব এক অসম্ভব শব্দ, প্রেম শব্দটিও তারা মুছে ফেলেছে বহুকাল আগেই যার যার ব্যক্তিগত অভিধান থেকে। তারা ঘনায়মান অন্ধকারে নিয়ন-বাতির কৃত্রিম আলোয় দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে আবিষ্কার করে জগতের সবচেয়ে অসহায় মানুষ হিসেবে, যে মানুষ কাউকে বিশ্বাস করতে শেখেনি, কাউকে ভালোবাসতে শেখেনি, কারো দিকে মমতার চোখে তাকাতে শেখেনি। তারা ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। যদিও ফিরেও কিছুই করার থাকবে না তাদের, থাকে না কোনোদিন। খায়-দায়-ঘুমায় আর টেলিভিশন নামক বোকা বাক্সের সামনে বসে থাকে। যদিও ওই রঙিন পর্দায় এখন আর কোনো গান বেজে ওঠে না, কোনো সিনেমা নয়, নাটক নয়, তবু ওই বাক্সই তাদের একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। পর্দায় এসে নগরের জ্ঞানী লোকেরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে ঝগড়া বাঁধায়, তারা মহা-আনন্দে সেই ঝগড়াই দ্যাখে, ভাবে ঝগড়াই বোধহয় এই জনপদের একমাত্র সত্য, একমাত্র বিনোদন। এই যে দুই দলে বিভক্ত হওয়ার পদ্ধতি, সেটিও বেশ পুরনো। হয় তুমি এই দলে নয়তো ওই দলে, ওই দলে থাকলে এই দলের শত্র“, এই দলে থাকলে ওই দলের শত্র“; এই দুই দলের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি, তৃতীয় কোনো দলে থাকা বা নিরপেক্ষ থাকার কোনো অধিকারই নেই নগরবাসীর। যদিও এই দুই পক্ষকেই তারা মনে মনে ঘৃণা করতে শুরু করেছে বহুকাল আগেই, তবু তারা তা প্রকাশ্যে বলে না, বলার অধিকারও নেই, এবং ভিন্নতর কিছু বেছে নেবার অধিকার বা সুযোগ না থাকায় এই দুই পক্ষের কোনো একটিকে তারা শাসন ক্ষমতায় বসাতে বাধ্য হয়। কয়েক বছর পরপর এই দু-পক্ষ একটি করে ‘বেছে নাও’ নাটকের অবতারনা করে, এবং জানায় যে, বেছে নিতে হবে ওই দুটো পক্ষের যে-কোনো একটিকেই। তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসিত ভাষায় বিষোদগার করে নিজেদের পক্ষে সমর্থন চায়, কিন্তু ওই চাওয়া পর্যন্তই, সমর্থকদের ধার তারা ধারে না, কারণ তারা জানে-- এই নগরের বাসিন্দারা চিরকালের জন্য নীরব-নিশ্চুপ হয়ে গেছে, বিষকাঁটা দিয়ে তাদের সারা শরীরে খোঁচালেও তারা এমনকি উঁ ধ্বনিটিও করবে না। ভয়ে। হ্যাঁ ভয়ে। তারা কথা বলতে ভয় পায়, এমনকি কোনো শব্দ করতেও ভয় পায়। এবং এই দুই পক্ষই নগরবাসীর মনে ভয়টি সফলভাবে সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। একদিনে নয়, দীর্ঘদিন ধরে এই দুই পক্ষের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে এই ভয়ের প্রাচীর, যদিও দুই দল আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের শত্র“, কোনো বিষয়েই তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি কোনোদিন, তবু এই একটি বিষয়ে তাদের কর্মকাণ্ডে কোনো দ্বিমত ছিল না-- নগরবাসীর মনে ভীতি সঞ্চার করে তাদেরকে চিরদিনের জন্য চুপ করিয়ে দিতে তারা যে কতরকমের পদ্ধতি অবলম্বন করেছে! ফলে তারা এখন ভাবতেই পারে, এই অথর্ব জনগণ নিয়ে চিন্তার কী আছে? জনতা তাদেরকে বেছে নিলেই কী, না নিলেই কী? আর তাই জনতা ওই ‘বেছে নাও’ নাটকের সক্রিয় অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলেও তা হতে পারে না, পরিণত হয় দর্শকে, তাদের হয়ে অন্য কেউ বেছে নেয় কোনো একটি পক্ষকে। অতঃপর মসনদে আসীন হয়ে তারা ক্ষমতার সুরক্ষায় মনোযোগী হয়, কৌশলী হয়, প্রয়োজনে নির্মম হয়, কারো হাতে তুলে দেয় ছুরি-চাপাতি, কারো হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। কথা বললেই নেমে আসে তার যে-কোনো একটি। হত্যারও কত কত রূপ, কত কত শিল্পিত উপস্থাপনা হতে পারে তার প্রদর্শনী হতে থাকে বছরের-পর-বছর। জনপদের মানুষের মনে ভয় জমে, আতঙ্ক জমে, অনিশ্চয়তা জমে। 

আর এসবকিছু জমা হতে হতে যখন প্রাচীরের মতো চারদিক থেকে তাদের পৃথিবীকে ঢেকে ফেললো, তখন এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তাদের কাছে। তারা শুনলো, বর্তমান নগরপ্রধানকে সুলতানা রূপে মসনদে অধিষ্টিত রেখেই ক্ষমতা-কাঠামোতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, পূর্বতন মন্ত্রীদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে, এই জনপদে শুরু হয়েছে উসমানিয়া খেলাফত, এখন থেকে তাদের নির্দেশেই চলবে সবকিছু। এ আবার কেমন পরিবর্তন? সুলতানাকে মসনদে রেখে নতুন খেলাফত চলবে কেমন করে? এসব প্রশ্ন মনে এলে সঙ্গে সঙ্গে জনতার এ-কথাও মনে পড়ে যে, মহামান্যা সুলতানা বহুকাল ধরেই খেলাফতের প্রতিষ্ঠাদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং যে-কোনো অবস্থায় তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন। উসমানিয়ারা অকৃতজ্ঞ নয়, নতুন খেলাফত জারি হলেও পুরনো সুলতানাকে তারা সসম্মানে, স্বমহিমায়, স্বস্থানেই রেখেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই নতুন শাসনকর্তাদের প্রথম নির্দেশটি ভেসে এলো জনতার কাছে-- 

‘তোমরা সবাই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো।’ 

নির্বিকার-নিশ্চুপ-প্রতিবাদহীন-ভীতসন্ত্রস্ত--ম্রিয়মান-মৃতপ্রায় জনতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন, নির্দেশমোতাবেক নিজেদের কান শক্ত করে ধরে মনে মনে ভাবলো-- ‘যাক, কানই তো ধরতে বলেছে শুধু, প্রাণ তো আর কেড়ে নেয়নি!’ বেঁচে থাকার আনন্দে গভীর তৃপ্তির শ্বাস ফেললো তারা, ভয় কেটে বুকে ফিরে এলো সাহস, লক্ষকণ্ঠে জয়ধ্বনি শোনা গেল নতুন খেলাফত আর সুলতানার নামে। সেই বিপুল ধ্বনি শুনে ক্রুর-নিষ্ঠুর এক হাসি ফুটে উঠলো সুলতানার ঠোঁটে, ভাবলেন-- এতদিনে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে এই বেয়াড়া-বেয়াদব মানুষগুলোকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারলেও টু শব্দটি করার সাহস হবে না এদের আর কোনোদিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন