স্বকৃত নোমানের গল্প : কালাপীর

ঞ্চ তখনো ছাড়েনি। কেবিনে শুয়ে জোসেফ ক্যাম্পবেলের পাওয়ার অব মিথ পড়ছিল নেহাল। অর্ধেকের বেশি পড়া হয়ে গেছে, এ ভ্রমণেই পুরোটা শেষ করার ইচ্ছে। বই বন্ধ করে মোবাইলটা হাতে নিল। ফেসবুক ওপেন করে দেখল মেসেঞ্জারে সমরকান্তির মেসেজ। লঞ্চে উঠেই চর কুকরী মুকরী যাত্রার কথা জানিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিল। সেটা দেখে সমর লিখেছে, ভোলা হয়ে যাস। লঞ্চঘাটে আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব।

নেহালের মনেই ছিল না সমর যে এখন ভোলায়। দেখা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে, ঢাকার রেডিসন হোটেলের এক অনুষ্ঠানে, সমর যখন ঝালকাঠির এসপি। ভোলায় বদলি হওয়ার সম্ভাবনার কথা সমর বলেছিল সেদিন। নেহাল জনপ্রিয় দৈনিকের ব্যাস্ত সাংবাদিক, প্রতিদিন কত সচিব উপসচিব ডিসি এসপির সঙ্গে তার দেখা হয়, কথা হয়―কজনের কথা আর মানে থাকে!

অবশ্য সমরের কথা আলাদা। দশজনের সঙ্গে তাকে মেলানো যায় না। ভার্সিটির যে কজন ব্যাচমেটের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সমর তাদের একজন। একদিন আগে জানলেই লঞ্চের টিকেট বাতিল করে দিত নেহাল। রোজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে ‘নিউ সাব্বির’ লঞ্চটি পরদিন সকাল নটা-সাড়ে ন-টায় ভোলার ঘোষের হাট পৌঁছায়। ভোলা শহরে যেতে হলে লঞ্চ পাল্টাতে হবে। লঞ্চ ছাড়তে মাত্র আধা ঘণ্টা বাকি, এখন কি আর তা সম্ভব? চাইলেই তো হুটহাট লঞ্চ পাল্টানো যায় না। ভিআইপি কেবিন পাওয়া তো এত সহজ নয়। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ এখন লঞ্চকেই নিরাপদ মনে করে। বরিশাল-ভোলা-খুলনা-মোরেলগঞ্জ রুটে চাইলেই ভিআইপি কেবিন পাওয়া যায় না। মোরেলগঞ্জ রুটের ‘এমভি বাঙালি’ বা ‘এমভি পারাবতে’র কেবিন তো মন্ত্রী-এমপি-সচিবের ফোন ছাড়া সম্ভবই না। ‘নিউ সাব্বিরে’র কেবিন অবশ্য খালিই থাকে। বিশেষ করে শীতের দিনগুলোতে যাত্রী থাকেই না বলতে গেলে। সবে মার্চের শুরু। তবু অজানা কারণে প্রথমে নেহালকে কেবিন দিতে রাজি হয়নি কাউন্টার ম্যানেজার। কেবিন নাকি খালি নেই। নেহাল তার পেশাগত পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে গেল ম্যানেজারের সুর। জানাল, কেবিন খালি আছে, কিন্তু এসি নষ্ট। নেহাল বলল, সারিয়ে নিন, এখনো দুদিন বাকি। ম্যানেজার আর কথা বাড়ায়নি। 

নেহাল যাচ্ছে অফিসের কাজে। ভোলা জেলার সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা চর কুকরী মুকরী। ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি, খুন, পেনসিডিল-ইয়াবা ব্যবসা, ম্যানগ্রোভ বনের গাছ কাটা, হরিণ শিকার...হেন অপরাধ নেই যা ঘটছে না সেখানে। পুলিশ-কোস্টগার্ড কোনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। দৈনিক সময়প্রতিদিনে-র চরফ্যাশন প্রতিনিধি সপ্তাহে দশটি নিউজ পাঠালে পাঁচটিই থাকে চর কুকরী মুকরীর। জেলা প্রতিনিধিও এ দ্বীপের উপর একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে। তবুও প্রশাসন নির্বিকার।

সেদিন পত্রিকার সাপ্তাহিক মিটিংয়ে চর কুকরী মুকরীর প্রসঙ্গ তুললেন সম্পাদক। ব্যাপারটা আসলে কী? মাত্র চল্লিশ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট একটা ইউনিয়ন কন্ট্রোল করতে পারছে না প্রশাসন! আরেকটা পুলিশ ফাঁড়ির দাবিতে এলাকাবাসী উপজেলা সদরে মানববন্ধন করেছে, ডিসি বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে, অথচ কেউ তা আমলেই নিচ্ছে না। স্থানীয় সাংসদও নিশ্চুপ।

চিফ রিপোর্টার বলল, আমি চরফ্যাশন করসপন্ডেন্টের সাথে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। আরেকটা পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কন্ট্রোলে রাখা আসলেই অসম্ভব। কিন্তু সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের যাবতীয় কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত।
সম্পাদক বললেন, হোম মিনিস্ট্রিতে কথা বলেছ?
হ্যাঁ, মিনিস্টারকেই ফোন দিয়েছিলাম, তিনিই জানালেন।

নেহালের ঠিক বিশ্বাস হয় না। সে ভেবে পায় না চর কুকরী মুকরীর অবস্থা এতটা খারাপ হয় কী করে। তার মনে পড়ে পঁচিশ বছর আগের স্মৃতি। বয়স তখন মাত্র বাইশ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। কৈশোর থেকেই তার বাড়িপালানোর স্বভাব। মাত্র তেরতে লোকালে চড়ে চলে গিয়েছিল চট্টগ্রাম। তাতেই বেড়ে গিয়েছিল সাহস। তারপর থেকে হাতে টাকা-পয়সা এলেই বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে চম্পট দিত। কখনো কক্সবাজার, কখনো চট্টগ্রাম আর কখনো ঢাকা।

সেবার আন্তঃনগর এক্সপ্রেসে ঢাকায় এসে উঠেছিল কমলাপুর সর্দার কলোনিতে, গ্রামের দূরসম্পর্কের এক চাচাতো ভাইয়ের মেসে। দুদিন ছিল। তৃতীয়দিন ফেরার জন্য কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে তার মনে হলো, লঞ্চ-ইস্টিমারের কথা কেবল বই-পুস্তকে পড়েছে, জীবনে কখনো চোখে দেখেনি, এবার না দেখে ফিরবে না। মুহূর্ত দেরি না করে রিকশায় গুলিস্তান গিয়ে চড়ে বসল সদরঘাটের বাসে। লঞ্চে উঠে ঘুরে ঘুরে মনের সাধ মিটিয়ে ডেক, কেবিন, মাস্টার কেবিন, ছাদ সব দেখতে লাগল। ভুলে গেল নামার কথা। হঠাৎ লঞ্চ দিল ছেড়ে। একটুও মন খারাপ হলো না তার। ছেড়ে দিয়েছে তো কী হয়েছে, লঞ্চ তো আর সাগরে ডুব দেওয়ার জন্য যাচ্ছে না। পকেটে টাকা যা আছে তাতে অনায়াসে  দশ-বারোদিন চলা যাবে। ভেবেছিল চাঁদপুর নেমে যাবে, কিন্তু চাঁদপুর ঘাট ধরল না লঞ্চ। পরদিন সকালে পৌঁছল ভোলায়। ডেকে খাতির জমিয়ে তুলেছিল চর কুকরী মুকরীর এবাদুল নামের এক যাত্রীর সঙ্গে। তাবলিগ জামায়াতের টঙ্গির এজতেমা থেকে ফিরছিল এবাদুল। ঘাটে নামার পর এবাদুল বলল, চলেন আমাদের বাড়ি। নির্দ্বিধায় নেহাল বলল, আমার কোনো আপত্তি নাই।

মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় জেগে ওঠা নয়নাভিরাম দ্বীপ চর কুকরী মুকরীর হদিস তখনো পর্যটকরা পায়নি। পেলেও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কেউ যেত না। দ্বীপজুড়ে ছিল নারিকেল, বাঁশ, বেত, সুন্দরী, গেওয়া ও পশুরের বন। বনে ছিল বানর শেয়াল উদবিড়াল বনবিড়াল গুঁইসাপ বেজি ক”চ্ছপ আর সাপ। আর ছিল বক শঙ্খচিল মথুরা কাঠময়ূর কোয়েলসহ নানা প্রজাতির পাখি। চর কুকরী মুকরী তো নয়ই, চরফ্যাশনেও তখনো বিদ্যুৎ ছিল না। কোনো হোটেল-মোটেলও না। কখনো কোনো পর্যটক গেলে তাঁবু ফেলে থাকত। জনসংখ্যা তখন বড়জোর হাজারখানেক; মাছ ধরাই ছিল যাদের একমাত্র পেশা।

এবাদুলের বাড়িতেই উঠেছিল নেহাল। এখনো মনে আছে এবাদুলের আতিথ্যের কথা। দেশ-বিদেশের কত জায়গা ঘুরেছে নেহাল, কত মানুষ দেখেছে, কিন্তু এবাদুলের মতো এমন অতিথিপরায়ণ মানুষ দ্বিতীয়টি দেখেনি। শুধু এবাদুল কেন, চর কুকরী মুকরীর প্রতিটি মানুষের কাছে অতিথ-মেহমান ছিল সৌভাগ্যের প্রতীক। বাড়িতে অতিথি আসা মানে কোনো-না-কোনো সুসংবাদ আসা। তুলে রাখা শীতলপাটিটি বিছিয়ে দিত, কুঁড়ের সবচেয়ে বড় মোরগটি জবাই দিত, একটু সামর্থবান হলে খাসিটির মায়াও ছেড়ে দিত। মাছ তো তখন চরবাসীদের কাছে কচুপাতা। পুকুর খাল নদী সমুদ্রে কেবল মাছ আর মাছ। ইয়াবার তো তখনো জন্মই হয়নি, পেনসিডিল তো দূরের কথা, চরবাসীর কেউ কোনোদিন চোলাই মদের নাম শুনেছে কিনা সন্দেহ। খুনের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না। ছিনতাই চুরি ডাকাতি তো ছিলই না। এসবের কথা জিজ্ঞেস করলে বলত, কালাপীরের চরে কেউ চুরি-ডাকাতি করবে, তার কি প্রাণের মায়া নেই? দ্বীপজুড়ে দিন-রাত গরু-মোষ চরছে, কখনো চুরি হয়েছে এমন নজির নেই। কে করবে চুরি? করলেও চুরির মালটি নিয়ে তো তাকে নদী পাড়ি দিয়ে পালাতে হবে। তখন কি কালাপীর ছাড়বেন? ডুবিয়ে মারবেন না? কেউ মিথ্যা কথা বলবে? ঘুমের ঘোরে কালাপীর এসে তার জিবটা টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন না? ফাঁড়ির পুলিশদের কোনো কাজ ছিল না। কেউ কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে বলত, বসে বসে মশা মারাই আমাদের কাজ।

 নেহালের মনে আছে, যেদিন সে চর কুকরী মুকরী গিয়েছিল তার পরদিন সকালে এবাদুল চলে গিয়েছিল সাগরে। ঘরে মেহমান রেখে যেতে মন সাঁয় দিচ্ছিল না। কিন্তু না গিয়ে উপায় ছিল না। টানা সাতদিন সে দ্বীনের কাজে ঢাকায় ছিল। ঘরে নুন আছে তো মরিচ নেই হাল। যাওয়ার সময় নেহালকে বলেছিল, কোনো চিন্তা করবেন না, আমি সাঁঝের আগে ফিরা আসুম। আপনি যতটা পারেন চরটা ঘুইরা দেখেন।
আলুভর্তা দিয়ে এক বাসন পান্তাভাত খেয়ে এবাদুলের ছোট ভাই রফিকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল নেহাল। সমুদ্রে তখন ভাটা, ভাড়ানি খালে কাদা আর কাদা। সাঁকো পার হয়ে হরিণ দেখার আশায় দুজন ঢুকে পড়েছিল কালীর চরের জঙ্গলে। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর পেশাব করতে বসেছিল নেহাল। উঠে দেখে রফিক উধাও। নেহাল তাকে উত্তরে খোঁজে। নেই। দক্ষিণে খোঁজে। নেই। পুবে-পশ্চিমে খোঁজে। নেই। কোথায় গেল রফিক? তার নাম ধরে ডাকতে পারে। কিন্তু ডাক শুনে যদি দস্যু-ডাকাতেরা হাজির হয়! এবাদুল যতই বলুক, এই ঘোর জঙ্গলে দুস্য-ডাকাত না থেকে পারে না।

রফিককে খুঁজতে খুঁজতে নেহাল পৌঁছে গিয়েছিল জঙ্গলের পূর্ব সীমানায়, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল সৈকতে। জোয়ার শুরু হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। নোনা পানি ধুয়ে দিচ্ছিল গেওয়া-সুন্দরীর শ্বাসমুল। যতদূর চোখ যাচ্ছিল পানি আর পানি, ঢেউ আর ঢেউ। জেলেনৌকাগুলো ভাসছিল, গাংচিলেরা উড়ছিল। দুর্বায় ঢাকা মাঠে গেওয়ার একটা গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসেছিল নেহাল। শরীরে এমনই ক্লান্তি ছিল, খানিকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে রফিকের ডাকে তার ঘুম ভাঙে। চোখ খুলে দেখে, চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে রফিক তার দিকে তাকিয়ে। নেহাল ভাবে, তাকে খুঁজে পেয়ে বুঝি রফিক বিস্মিত। কিন্তু না, তার বিস্ময় কালাপীরের কেরামতি দেখে। কালাপীর এভাবেই বনে-জঙ্গলে মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন।
ঘুমানোর আগে নিশ্চয়ই ফুলের গন্ধ পেয়েছিলেন? জিজ্ঞেস করল রফিক।
বাগানে ফুলের গন্ধ পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। বলল নেহাল।
না না ভাইজান, মোটেই স্বাভাবিক নয়। ওই ঘ্রাণ কালাপীরের।

নাদান রফিকের নাদানি দেখে নেহালের হাসি পায়। তবে হাসির অন্তরালে খানিক ভয়ও জাগে। তার ধারণা কালাপীর বুঝি চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পীরের মতো বড় কোনো পীর, যার খানকা এ জঙ্গলেই। সে জানতে চাইল, কালাপীর কোথায় থাকেন?
দ্বিগুণ বিস্ময়ে রফিক বলল, আপনি দেখি কিচ্ছু জানেন না! আশেপাশে নিশ্চয়ই কোথাও কালাপীর আছেন। আপনার কথা তার কানে গেলে তিনি গোস্বা করবেন।
গোস্বা করার কী আছে! আমি তো খারাপ কিছু বলিনি।

নেহালের সামনে হাঁটুগেঁড়ে বসল রফিক। এক হাতে নেহালের মুখটা চেপে ধরে আরেক হাতের তর্জনীটা নিজের ঠোঁটের ওপর খাড়া করে ফিসফিসিয়ে বলল, চুপ! 
রফিকের কাণ্ড দেখে নেহালের ভয় গেল বেড়ে। কৌতূহলও। কালাপীর আসলে কে? থাকেন কোথায়? রফিককে নিয়ে সে তার খানকায় গিয়ে দেখা করতে চাইল।

খিলখিলিয়ে হেসে উঠল রফিক। হাসবে না? কালাপীরের সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার কথা শুনে চর কুকুরী মুকরীর নেংটা পিচ্চিটাও তো হাসবে। কালাপীরকে কেউ কোনোদিন দেখেছে? রফিক তো নয়ই, তার বাপ-দাদারও তো সেই কপাল হয়নি। তার বাপ-দাদা কেন, চর কুকরী মুকরীর কেউ কোনোদিন কালাপীরকে দেখেনি। কীভাবে দেখবে, তিনি তো গায়েবি পীর। পানি হয়ে পানির সঙ্গে, হাওয়া হয়ে হাওয়ার সঙ্গে আর গাছ হয়ে গাছের সঙ্গে মিশে থাকেন। পাখি হয়ে উড়ে বেড়ান, হরিণ হয়ে ঘুরে বেড়ান, গরু হয়ে দুধ দেন, সাপ হয়ে দংশন করেন। চর্মচক্ষে তাকে দেখার সাধ্য কী মাটির মানুষের! তার দাদা তো সেদিন পটুয়াখালির হরিপাড়া থেকে এখানে এসেছে। কালাপীর আসেন বহু বছর আগে, চর কুকরী মুকরী যখন ফিরিঙ্গিদের দখলে। ফিরিঙ্গিরা তো দস্যু-ডাকাত ছিল। তাদের শায়েস্তা করতে সমুদ্রের উপর দিয়ে হেঁটে এসেছিলেন দয়াল বাবা কালাপীর। তার পদচ্ছাপে তুফান উঠেছিল সমুদ্রে। সেই তুফানে তলিয়ে গিয়েছিল তামাম চর। ফিরিঙ্গিরা ভেসে গিয়েছিল উত্তাল স্রোতে।

কিন্তু কালাপীর তো দয়ার সাগর। তার রোষ তো ফিরিঙ্গিদের ওপর, চরের গাছবিরিক্ষি পশুপাখির ওপর তো নয়। তাই বহু বছর পর তিনি আবার এলেন। একইভাবে, সমুদ্রের উপর দিয়ে হেঁটে। তার আঙুলের ইশারায় আবার জেগে উঠল চর। তার হুকুমে মাটি থেকে উঠে এল এক জোড়া কুকুর আর এক জোড়া মেকুর। ধীরে ধীরে আসতে লাগল অন্য পশুপাখিরাও। এই যে এখন জঙ্গলে এত হরিণ, এত শেয়াল, এত সাপ...সবাই তার হুকুমের গোলাম। এ কারণেই হরিণ মেরে খাওয়ার সাহস করে না মানুষ, মানুষকে দংশনের সাহস করে না সাপ। এই যে সারা বেলা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াল নেহাল-রফিক, জঙ্গলে এত এত সাপের বসবাস, কই, একটা সাপ কি দেখা গেছে? 
নেহাল বলল, এসব কথা কি সত্যি?
চোখজোড়া ঠেলে উপরে তুলে রফিক বলল, আশ্চর্য মানুষ তো ভাই আপনি! আমি মিথ্যা বললে রাতে ঘুমের ঘোরে কালাপীর এসে এক টানে আমার জিবটা ছিঁড়ে সমুদ্রের মাছেদের খেতে দেবেন।

খিদায় পেট জ্বলছিল দুজনের। হরিণের আশা বাদ দিয়ে তারা বাড়ির পথ ধরল। হাঁটতে হাঁটতে নেহাল বলল, জোহরের অক্ত হয়েছে, আপনি নামাজ পড়বেন না? 
এক গাল হেসে রফিক বলল, আমরা ভাই গরিব মানুষ, সারাদিন পেটের ধান্দায় থাকি, নামাজ পড়ার সময় কই?
দ্বীপের কোথাও তো মসজিদ দেখলাম না।
না না, মসজিদ আছে দুটি। তবে পাঞ্জেগানায় মুসল্লি তেমন হয় না। বোঝেন না, সবাই তো কাজেকামে ব্যস্ত থাকে। তবে জুমার নামাজে কিন্তু দুই কাতার ভরে।
নামাজ না পড়লে আল্লাহ শাস্তি দেবেন না?
কী যে বলেন ভাই! কালাপীর আছেন কী জন্যে? হাশরের দিনে তিনি নবীপাকের অনুমতি নিয়ে গেওয়াগাছের তক্তা দিয়ে মস্ত একটা নৌকা বানাবেন। সেই নৌকা আকাশে উড়তে পারে, জলে ভাসতে পারে, মাটিতে চলতে পারে। সেই নৌকায় চড়ে তিনি তার ভক্তদের পুলসিরাত পার করে দেবেন।

বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল নেহাল। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সূর্য পাটে। দিনের ঘুমের কারণে রাতে আর ঘুম আসছিল না। বহু চেষ্টা করেও ঘুমাতে না পেরে সে বাইরে নামল। চাঁদ ধুয়ে দিচ্ছিল চরাচরের অন্ধকার। সে হাঁটতে থাকে। রফিক তাকে বলেছে, রাতে মানুষ আর পশুপাখিরা যখন ঘুমায়, তখন বন থেকে বেরিয়ে আসেন কালাপীর। রাতভর তিনি গ্রাম পাহারায় থাকেন। একবার ডাকাত ঢুকেছিল গ্রামে। কালাপীরের এমনই কেরামতি, পরদিন ভাড়ানি খালে পাওয়া যায় ডাকাতদের লাশ। সেই থেকে বাইরের চোর-ডাকাতরা এখানে আসার সাহস পায় না। 

কালাপীরকে এক নজর দেখার আশা জাগল নেহালের। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে গেল দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে চলে যায়। ঘুরে আবার এলো পূর্ব প্রান্তে। খানিক ভয় ভয় করে তার। সত্যি সত্যি কালাপীর যদি তার সামনে এসে দাঁড়ায়! ভয়টা চাড়া দিয়ে উঠলে এই বলে ভয় তাড়ায়, কালাপীর তো আর বাঘ-ভালুক নয় যে দেখা মাত্রই তাকে গিলে ফেলবে। রফিক তো বলেছে কালাপীর দয়ার সাগর।

নেহালের মনের কথা বুঝি টের পেলেন কালাপীর। নইলে হঠাৎ করে চাঁদটা কোথায় গেল? ধবধবে জ্যোৎস্নায় এমন অন্ধকার নামল কেন? অন্ধকারে পথ খুঁজে পায় না নেহাল। কোথায় নারিকেল বাগান, কোথায় চর কুকরী মুকরী বাজার, কোথায় প্রাইমারি স্কুল, কোথায় ভাড়ানি খাল, কোথায় লঞ্চঘাট, কোথায় এবাদুলদের বাড়ি...কিছুই ঠাওর করতে পারে না সে। অন্ধকারে হাঁতড়ে কাটা ধানের মাঠে নেমে খড়ের একটা গাদায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল। সকালে ঘটনা শুনে এবাদুলের ছোট বোন লিপি তো হাসতে হাসতে সারা। বলল, আপনি কি পাগল! রাতের বেলায় কেউ ঘর থেকে বের হয়? আহা, কী যে সুশ্রী ছিল লিপি! চৌদ্দ-পনেরোর শ্যামলা তরুণী। প্রথম দিন বেড়ার ফোঁকড়ে বারবার উঁকি দিয়ে নেহালকে দেখছিল। কতবার যে উঁকি দিয়েছে হিসাব নেই। রাতে ভাত-তরকারির বাটি নিয়ে তার সামনে এল পরনে পুরনো সেলোয়ার-কামিজ। বেগানা পুরুষের সামনে এসে কোনো দ্বিধা নেই, সংকোচ নেই। বাটিটা রেখেই নেহালের মুখের দিকে তাকাল। নেহাল তাকাতেই মুচকি হেসে ভেতরে চলে গেল। কী যে ছিল সেই হাসিতে, বহু বছর হাসিমাখা মুখখানা ভুলতে পারেনি নেহাল। মাস্টার্স শেষ করে রাশিদার প্রেমে না পড়লে হয়ত আরো বহু বছর মনে থাকত। 

সেদিন অফিসের মিটিংয়ে সম্পাদক ও চিফ রিপোর্টারের কথা শুনতে শুনতে খড়ের গাদায় কাটিয়ে দেওয়া রাতের কথা ভেবে নেহালের হাসি পেল। কত বোকাই না ছিল তখন! নিশ্চয়ই সে-রাতে মেঘে ঢাকা পড়েছিল চাঁদ। কিংবা সেদিন পূর্ণিমা ছিল না, নবমী বা দশমী ছিল। নবমী-দশমীতে তো চাঁদ সারা রাত থাকে না। চাঁদ না থাকলে অন্ধকার তো নামবেই। অথচ সেই অন্ধকারকে কালাপীরের কেরামতি ভেবে কী ভয়ই না পেয়েছিল।
নেহাল বলল, আমি সরেজমিনে যেতে চাই।
সম্পাদক বললেন, খারাপ হয় না। যাও, ঘুরে আস।

লঞ্চ ঘোষের হাট পৌঁছল পৌনে দশটায়। থামার সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠল নেহালের মোবাইল ফোন। অচেনা নম্বর। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল, আপনি কি নেমেছেন? আমি চরফ্যাশন থানা থেকে, এসপি স্যার পাঠিয়েছেন। 

সমর এতটা করবে আশা করেনি নেহাল। ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল, যাওয়ার পথে নয়, ফেরার পথে ভোলা হয়ে যাবে এবং তখন দেখা হবে। চর কুকরী মুকরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা জানিয়ে সাবধানে থাকতে বলেছিল সমর। আর বলেছিল, এলাকার মানুষ নতুন একটা পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি জানাচ্ছে। একটা ফাঁড়ি তো আছেই, আরেকটা ফাঁড়ির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা নেহাল যেন সার্বিক পরিস্থিত অবজার্ভ করে তাকে জানায়। দুষ্টুমি করে নেহাল বলেছিল, ধুর বেটা, আমি কি  পুলিশের লোক? ফাঁড়ির প্রয়োজন আছে কি নেই তার কী বুঝব আমি? সমরও কম যায় না। সে বলেছিল, তুমি তো খোকাবাবু, ফিডার খাও। সকালে তোমার জন্য ফিডার পাঠিয়ে দেব এক বোতল, কেমন?

একটা মাইক্রোবাস পাঠিয়েছে সমর। সঙ্গে ড্রাইভার ও দুই কনস্টেবল। নেহালকে নিরাপদে কচ্ছপিয়া ঘাটে পৌঁছে দেবে তারা। এক হোটেলে চা-পরোটা খেয়ে গাড়িতে উঠল নেহাল। সাড়ে এগারটার মধ্যে পৌঁছে গেল কচ্ছপিয়ায়। স্পিডবোট ঘাটেই ছিল, থানা থেকে ফোন করে আগেই ঠিক করে রাখা। নেহাল ভাড়ার কথা জানতে চাইলে এক কনস্টেবল বলল, ভাড়া লাগবে না স্যার।
কেন, লাগবে না কেন?
আপনি ওঠেন তো স্যার। আমি দিয়ে দিচ্ছি।
না, একদম না! ভাড়া আমি দেব। 
কনস্টেবল হেসে বলল, ওকে স্যার। আমার নম্বরটি রাখুন। কোনো প্রবলেম হলে রিং দেবেন। আমি চর কুকরীর ইনচার্জকে আপনার কথা বলে রেখেছি।
এই তো সর্বনাশটা করলেন।
কেন স্যার!
পুলিশ প্রটোকলে থাকলে তো দ্বীপের পরিস্থিতির কিছুই বুঝতে পারব না। আপনি এক্ষুণি ফোন করে বলে দিন আমি যাচ্ছি না, জরুরি কাজে প্রোগ্রাম বাতিল করেছি।

কনস্টেবল তাই করল। কেননা স্যারের বন্ধুর নির্দেশ মানে স্যারেরই নির্দেশ। এবং জানাল যে, ফেরার দিনও তারা ঘাটে অপেক্ষা করবে এবং এই গাড়িতে করেই নেহালকে ভোলায় পৌঁছে দেবে। আপত্তি করল না নেহাল। কচ্ছপিয়া থেকে ভোলার দূরত্ব কম নয়, প্রায় দেড় শ কিলোমিটার। তাও ডাইরেক্ট কোনো বাস নেই। কচ্ছপিয়া থেকে অটোরিকশায় চরফ্যাশন, তারপর বাস। এত ঝামেলার চেয়ে মাইক্রোবাসই ভালো।

মাত্র পঁচিশ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছে গেল স্পিডবোট। ভাড়ানি খালে তখন জোয়ার। ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘাটে নামল নেহাল। মনে পড়ে গেল পঁচিশ বছর আগে এবাদুলের সঙ্গে ঠিক এই ঘাটেই লঞ্চ থেকে নেমেছিল। ঘাটে তখন দোকান-পাট কিছুই ছিল না, এখন পাঁচ-সাতটা দোকান, পাকা মসজিদ, টিনশেড খারেজি মাদ্রাসা, মোবাইল কোম্পানির দুটি বিশাল টাওয়ার। রাস্তাগুলো তখন ছিল কাঁচা, এখন পিচঢালা। তখন যানবাহন বলতে ছিল শুধুই সাইকেল, এখন রাস্তা দখল করে আছে অটোরিকশার বহর। বুড়া গৌরাঙ্গ নদীর ওপর ব্রিজটা হবে হবে করেও হচ্ছে না। হলে তো আর কথা নেই, বাস-ট্রাক-লরি সব শাঁই শাঁই করে ঢুকে পড়বে।

হাঁটতে হাঁটতে রিসোর্টের গেটে গেল নেহাল। চার তলা বিশাল ভবন। স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন এমন একটা দ্বীপে এমন বিলাসবহুল রিসোর্ট থাকতে পারে, তার ধারনাতেই ছিল না। রিসোর্ট বুকিং দিয়েছে পত্রিকার চরফ্যাশন প্রতিনিধি। ভালোমন্দ কিছু জিজ্ঞেস করেনি নেহাল। ভ্রমণে গিয়ে থাকা-খাওয়া নিয়ে সে অত ভাবে না। রাত কাটানোর মতো একটা জায়গা আর বেঁচে থাকার মতো দুটো ডাল-ভাত হলেই হলো। 

তাকে রুমে নিয়ে গেল কেয়ারটেকার। বিশাল রুম। সেগুনের খাট, ড্রেসিং টেবিল, আলমিরা, টি-টেবিল, চেয়ার, সোফা, এসি...কী নেই? নেই-এর মধ্যে নেই শুধু বিদ্যুৎ। তার বদলে সোলার প্যানেল। কয়েক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎও এসে যাবে নিশ্চয়ই। নেহাল ভাবে, দেশটা আসলেই উন্নত হয়েছে। কোথায় কতদূরের বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট দ্বীপ চর কুকরী মুকরীতেও কিনা আছড়ে পড়ছে উন্নয়নের ঢেউ!

ডাইনিংয়ে খাবার প্রস্তুত ছিল। খেয়ে রুমে ফিরে শুয়ে শুয়ে খানিকক্ষণ পাওয়ার অব মিথের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে নেহাল বেরিয়ে পড়ল এবাদুলের খোঁজে। বাড়িটা চিনতে অসুবিধা হলো না। শনের বদলে ঘরের চালে এখন টিন, কুপির বদলে সোলার প্যানেল। উঠোনের কোনায় দাঁড়িয়ে এবাদুলের নাম ধরে ডাক দেয়। ভেতর থেকে কারো সাড়াশব্দ আসে না। রফিকের নাম ধরে ডাক দিতেই দরজার একটা কপাট খুলে গেল। আড়াল থেকে এক নারী জানাল যে, রফিক বাড়ি নেই, তাবলিগের চিল্লায় গেছে। নেহাল ভাবল, এই নারী নিশ্চয়ই এবাদুলের বউ। নাকি রফিকের?
আপনি কি ভাবী? মানে এবাদুল ভাইর ওয়াইফ?
জি। নারীটির ক্ষীণকণ্ঠের জবাব।
এবাদুল ভাই কোথায়?
বরিশাল গেছে, জালালপুরী মাওলানার ওয়াজ মাহফিলে।

নিজের পরিচয় দিল নেহাল। পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে আসার কথা জানায়। এবাদুলের বউ নিশ্চুপ। নেহাল ভাবে, নিশ্চয় তার কথা ভুলে গেছে এবাদুলের বউ। যাওয়ারই কথা। পঁচিশ বছর কি কম সময়? এবাদুলের বউকে একনজর দেখার খুব ইচ্ছে জাগল তার। কয়েক পা এগোতেই এবাদুলের বউ খানিকটা পিছিয়ে গেল। লিপি কেমন আছে, বিয়ে হয়েছে কোথায়, ছেলেমেয়ে কজন ইত্যাদি জানতে চাইল নেহাল। ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয় এবাদুলের বউ। নেহাল কিছু শোনে, কিছু কান এড়িয়ে যায়। এড়িয়ে যায়, কারণ তার অবাক লাগে, বাইরে সে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে, অথচ এবাদুলের বউ কিনা একটিবার তাকে ভেতরে বসার কথা বলছে না! বাড়িতে পুরুষ কেউ নেই বলেই কি অচেনা মানুষকে ঘরে বসতে বলার সাহস পাচ্ছে না? কিন্তু এমন তো ছিল না সে। নেহাল তো সে-বার পাঁচ দিন ছিল। এক রাতেও তো দরজার সিটকিনিটা লাগানো হয়নি। কী যে আন্তরিক ছিল এবাদুলের বউ! নিঃসঙ্কোচে তার সামনে এসেছে, ভাত-তরকারি বেড়ে দিয়েছে, বাপের বাড়ির গল্প করেছে।

সহসা উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে বেজে উঠল মাইক। শুরু হলো আসরের আজান। আজানের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আজান। এবাদুলের বউ জানাল যে সে এখন নামাজে যাবে। এবাদুল কবে ফিরবে জানতে চাইল নেহাল। জবাব না দিয়ে চট করে কপাটটা লাগিয়ে দিল এবাদুলের বউ। নেহাল আর দাঁড়ায় না, উঠোন পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠল। রাস্তাটা চলে গেছে পুবে বেড়িবাঁধের দিকে। হাঁটতে থাকে সেদিকে। একটা নৌকা ভাড়া করে কালীর চর যাবে, যে চরের জঙ্গলে একদিন রফিককে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলটা ওখানেই কাটাবে। রফিক বলেছিল কালীর চরের বিকেল নাকি খুব মনোরম।

বেড়িবাঁধে উঠতেই সামনে দাঁড়াল একটা লোক। হাতে দুই হালি জ্যান্ত বক। বগা কিনবেন? জানতে চাইল লোকটি। নেহাল মাথা নাড়াল। কিনবে না। লোকটা হাঁটা ধরল বাজারে দিকে। হাঁটতে হাঁটতে নেহালের মনে পড়ে পঁচিশ বছর আগের এমনই এক বিকেলের কথা। এক জেলে জঙ্গল থেকে একটা কোয়েল ধরে এনে বেড়িবাঁধে বসে একটা সুতলি বাঁধছিল পায়ে। পাখিটা ছিঁ-ছিঁ করে ডাকছিল আর মুক্তির আশায় ছটফট করছিল। নেহালের মায়া হয়েছিল খুব। বলেছিল, পাখিটা কষ্ট পাচ্ছে ভাই, ছেড়ে দিন। নইলে কালাপীর গোস্বা হবেন। লোকটা মুহূর্তও দেরি না করে ছেড়ে দিয়েছিল। নেহাল দেখেছিল চোখেমুখে অনাবিল প্রশান্তি নিয়ে উড়ন্ত পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটার হাসি। 

মাঝির সঙ্গে দরদাম ঠিক করে নৌকায় উঠে গলুইতে গামছাটা বিছিয়ে বসল নেহাল। প্রথমে নারিকেল বাগান যেতে বলল মাঝিকে। তারপর কালীর চর। মাঝি জানাল যে ঐ চরের নাম এখন চর জালাল। বছর পাঁচ আগে মাওলানা এনায়েত আলী জালালপুরী নিজের নামে এই চরের নাম রেখেছেন। নেহালের কৌতূহল জাগে। মাঝির কাছে সে জালালপুরীর কথা জানতে চায়। জালালপুরী কত বড় মাওলানা, কত মস্ত তার পাগড়ি, মিশরের কোন মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন, এ দ্বীপে তার কত শত মুরিদ, ফি বছর চর কুকরী মুকরী দারুল উলুম মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে এসে কতদিন থাকেন, কোথায় থাকেন, দলে দলে মানুষ তার হাতে হাত রেখে কীভাবে বয়েত নেয়...এসবের সংক্ষিপ্ত একটা বর্ণনা দেয় মাঝি।

নৌকা চলতে থাকে। নেহালের চোখ খালের দিকে। পানিতে ভাসছে ডাবের খোসা, মিনারেল ওয়াটারের বোতল আর চিপসের অসংখ্য প্যাকেট। হায় হায়! মাথা দোলায় আর আফসোস করে নেহাল। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অন করে ছবি তোলে। মাঝি তাকে হুঁশিয়ার করে, সাথে মোবাইল আনা ঠিক হয়নি স্যার। দেখে মনে হচ্ছে দামি সেট। আনছেন যখন পকেটেই রাখেন। দস্যু-ডাকাতদের তো বিশ্বাস নাই। 
মাঝির কথা গুরুত্ব দেয় না নেহাল। গলুইতে দাঁড়িয়ে সে ছবি তুলতেই থাকে।

সব ঘুরেটুরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেল। রাস্তা-ঘাট অন্ধকার। মোবাইলের টর্চই ভরসা। রিসোর্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারে একটা ঘুমটি দোকান দেখে থামল নেহাল। চায়ের তেষ্টা পেয়েছে খুব। ভেতরে সতের-আঠার বছরের তরুণ দোকানি। উচ্চস্বরে কথা বলছে মোবাইলে। বাইরে বাঁশের মাচায় বসল নেহাল। ছেলেটার কথা শেষ হলে এক কাপ চা দিতে বলল। পানি গরম ছিল, ঝটপট চা করে দিল ছেলেটা। কাপে চুমুক দিয়ে তার নাম জানতে চাইল নেহাল। ছেলেটা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। হয়ত কারো নম্বর খুঁজছে। খানিক পর মোবাইলটি ক্যাশবক্সে রেখে সে বাইরে তাকাল। 
তোমার বাড়ি কি এখানেই? 
তো উড়িচ্চর? কর্কশ গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল ছেলেটা। 
নেহাল ভাবল, ছেলেটা হয়ত কারো উপর রেগে আছে, ফোনে হয়ত এতক্ষণ তাকেই বকাঝকা করেছে। কাপ খালি করে মানিব্যাগ থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা, তুমি কি কালাপীরের নাম শুনেছ?
কালাপীর আবার কেডা? আগের মতোই ছেলেটার কর্কশ গলা।
কী বলো! কালাপীরের নাম শোনোনি?
না।
বাবা-মা কখনো বলেনি?
আমার বাপ ওসব পীর-দরবেশে বিশ্বাস করে না।

ছেলেটার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। নেহাল উঠে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। তারা ভরা আকাশ। একটু পর ষোড়শী চাঁদ উঠবে। 
ভাইসাব, ম্যাচ আছে?

ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকল নেহাল। গায়ে শার্ট, পরনে লুঙ্গি, মুখে কালো দাড়িঅলা মধ্যবয়সী একটা লোক। নেহাল ধন্দে পড়ে গেল। দোকানের সামনেই তো সুতায় ঝোলানো গ্যাসলাইট আছে, তার কাছে ম্যাচ চাইছে কেন লোকটা? নিশ্চয়ই কোনো মতলবে আছে। তবু পকেট থেকে লাইটার বের করে তার সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিল। টান দিয়ে লোকটা ধোঁয়া ছাড়ল। তার যাওয়ার অপেক্ষা করে নেহাল। কিন্তু লোকটি নড়ে না।
আপনার বাড়ি কি এখানে?
হ। লোকটির সংক্ষিপ্ত উত্তর।
আমি ঢাকা থেকে এসেছি। চার দিন থাকব। 

লোকটি যেন কিছুই শুনল না। ভাবটা এমন, নেহাল ঢাকা থেকে এসেছে, না দিল্লি থেকে, তাতে তার কী?
আপনার নামটা কি জানতে পারি?
ইলিয়াস। বলেই আবার সিগারেটে টান দিল লোকটি।
আচ্ছা ভাই, আপনি কি কালাপীরের নাম শুনেছেন?
বাপ-দাদার মুখে শুনেছি। বোগাস কথা।
বোগাস কথা!
তা ছাড়া কী? ওসব আগের দিনের গাঁজাখোরি গল্প।
আমি পঁচিশ ভছর আগে একবার এসেছিলাম। তখন তো এখানকার মানুষ কালাপীরের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা রাখত, তার নামে শিরনি দিত।

ইলিয়াস হেসে বলল, সেদিন কি আর আছে ভাইসাব? মানুষ এখন শিক্ষিত হয়েছে না? তখন তো চরে মাদ্রাসা ছিল মোটে একটি, মাশাল্লাহ এখন বারোটি মাদ্রাসা আর তিনটি স্কুল। ওসব কুসংস্কার এখন কেউ আর বিশ্বাস করে না। কেউ এখন কালাপীরের নামে শিরনি দিলে জালালপুরীর মুরিদেরা তাকে সমাজে রাখবে? ওসব বেশরা-বেদাতি কাজ কেউ করে না এখন।

নেহালের কানের কাছে মশারা ভন ভন করছে। আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না তার। ইলিয়াসকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি চর কুকরী বাজারে যাবেন? ইলিয়াস বলল, হ্যাঁ। দুজন হাঁটতে লাগল বাজারের দিকে। এশার আজান শুরু হলো মসজিদে মসজিদে। আজানের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আজান। ইলিয়াস বলল, কুকরী মুকরীতে এখন সতেরটি পাকা মসজিদ। বাকি পাঁচটি টিনের হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই পাকা হয়ে যাবে। সবই মাওলানা জালালপুরীর অবদান।

বাজারে পৌঁছে নেহালকে অপেক্ষা করতে বলে মসজিদের দিকে হাঁটা ধরল ইলিয়াস। দোকানগুলোর ঝাঁপ পড়তে থাকে, দোকানিরা ছুটতে থাকে মসজিদের দিকে। ইলিয়াস বলেছে, বাজারের এখন এই নিয়ম―আজান পড়লে দোকান বন্ধ করে সবাইকে মসজিদে যেতে হবে। নইলে জালালপুরীর মুরিদেরা এসে দোকান বন্ধ করে দেবে। নেহাল ভেবে পায় না, যে দ্বীপে বাইশটি জামে মসজিদ, বারোটি খারেজি মাদ্রাসা; যে দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মকর্মে সিরিয়াস, ঘরে ঘরে শরিয়তপন্থী মাওলানা এনায়েত আলী জালালপুরীর ভক্ত, সেই দ্বীপের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত অবনতি হয় কেমন করে।

ইলিয়াসের জন্য অপেক্ষা না করে রিসোর্টে ফিরে গেল নেহাল। কেয়ারটেকারকে ডেকে ন-টার মধ্যে খাবার রেডি করতে বলল। কেয়ারটেকার বলে যে, খাবার রেডি, চাইলে এখুনি ডাইনিংয়ে গিয়ে খেতে পারে। দেরি করল না নেহাল। ডাল, করলা ভাজি, কোরাল মাছ আর দেশি মোরগের মাংস দিয়ে পেট ভরে খেল। একটা নৌকা ঠিক করে রাখতে বলেছিল কেয়ারটেকারকে। কাল ভোরে ভোরে বেরোতে হবে। দ্বীপের চারপাশটা একবার ঘুরে দেখবে। আবার কবে আসবে তার তো ঠিক নেই। আশপাশে দেখার মতো যত জায়গা আছে সব দেখবে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আসল কারণটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। কেয়ারটেকার বলল যে মাঝির সঙ্গে সে পাকা কথা বলে রেখেছে। ভোর ঠিক পাঁচটায় ভাড়ানি খালের মুখে থাকবে মাঝি।

ছাদে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল নেহাল। বারোটার আগে এসি চালু হয় না। সারাদিনে এসি চলে মাত্র চার ঘন্টা―রাত বারোটা থেকে চারটা। সারারাত জেনারেটর চালাতে গেলে পোষায় না। ঠিক বারোটায় রুমে ফিরে এসিটা ছেড়ে পাওয়ার অব মিথ নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল নেহাল। ২২০ পাতা পড়া হয়ে গেছে, আর মাত্র ১০০ পাতা বাকি, রাতেই শেষ করার ইচ্ছে। পড়তে পড়তে, রাত প্রায় দেড়টার দিকে, ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙল সকাল সোয়া ছ-টায়। মোবাইলে অচেনা নম্বরের এগারোটি মিস্ডকল। নিশ্চয়ই মাঝির ফোন! খেয়ালই ছিল না মোবাইলটা যে সাইলেন্ট করা ছিল। উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে নেহাল বাইরে তাকাল। শান্ত-স্নিগ্ধ ভোর। মার্চের সূর্য ধীরে ধীরে তাতছে। শূন্য দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে। কে জানে কী ভাবে। হয়ত মাঝির কথা, কিংবা এবাদুল বা লিপির কথা। 

সহসা তার দৃষ্টি গেল দূর দক্ষিণে ভোরের রোদে চিকিয়ে ওঠা সমুদ্রের দিকে। স্পষ্ট দেখতে পায়, সাদা আলখাল্লা পরা একটা লোক হেঁটে চলেছে পানির ওপর। হাঁটছে তো হাঁটছেই, একটিবার পেছনে তাকাচ্ছে না। কে লোকটা? কালাপীর? নেহালের হাসি পেল। সব মনের ধন্দ। মন কত কী যে ভাবে! সেসব ভাবনা কিনা দৃশ্য হয়ে চোখেও ভাসে!

খাটের কম্বলটা সরিয়ে পাওয়ার অব মিথ বইটা হাতে নিল নেহাল। নেড়েচেড়ে দেখে। বইটা হাতে নিয়ে আবার জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। আবার দেখতে পেল একই দৃশ্য―আলখাল্লা পরা লোকটি পানির ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে দূর দক্ষিণে। একটিবার পেছনে তাকাচ্ছে না।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেহালের হঠাৎ কী যে খেয়াল হলো, মোবাইলটা নিয়ে চরফ্যাশন থানার সেই কনস্টেবলের নম্বরে ফোন দিল। ভেবেছিল এত তাড়াতাড়ি বুঝি জাগেনি কনস্টেবল। না, দু-বার রিং হতেই রিসিভ করল। নেহাল বলল, সাড়ে ন-টা নাগাদ আমি কচ্ছপিয়া ঘাটে থাকব, সম্ভব হলে মাইক্রোবাসটি পাঠিয়ে দেবেন। 

ব্যাগটা গুছিয়ে মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে নাস্তা করল নেহাল। বিলের কাগজ রেডি করতে বলল কেয়ারটেকারকে। কেয়ারটেকার ভেবে পায় না চার দিন থাকার কথা বলে দ্বিতীয় দিনেই কেন ফিরে যাচ্ছে নেহাল। মনের মতো কি সেবা পায়নি? সে খানিক ঘাবড়ে গেল। নেহাল সাংবাদিক। যদি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে নালিশ করে নেহাল! শঙ্কিত গলায় বলল, কিন্তু স্যার, মাঝি তো বসে আছে, ঘুরতে যাবেন না?
না। নেহালের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

সাড়ে আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ল নেহাল। কনস্টেবল মাইক্রোবাস নিয়ে যথাসময়েই হাজির। ভোলায় পৌঁছল প্রায় তিনটায়। বাসায় তার জন্য অপেক্ষা করছিল সমর। সেও খুঁজে পাচ্ছিল না এত তাড়াতাড়ি নেহালের ফিরে আসার কারণ। নেহাল বাসায় ঢুকতেই সে বলল, এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে? 
নেহাল বলল, খিদা পেয়েছে খুব, আগে খেয়ে নিই। 

বন্ধুকে নিয়ে সমর সোজা চলে গেল ডাইনিং টেবিলে। খাওয়া শেষে টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে নেহাল বলল, একটি নয় সমর, চর কুকরী মুকরীতে অন্তত আরো তিনটি পুলিশফাঁড়ির প্রয়োজন।

০৪.০৪.২০১৮

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ