সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

শামিম আহমেদের গল্প : কবর

ছবি মারা গেছে।

ছবিলার মৃত্যু হয়েছে ভোররাতের দিকে। শ্বাসরোধ করে তাকে খুন করা হয়েছে। সকালের দিকে অভ্যাসবশত তার এক বছরের ছেলে এতিম একটি স্তন থেকে প্রাণপণে দুধ পান করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ছবির খুনি কে, পাতুকি তা জানেনা। তবে ছবির মৃত্যু যে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, তাও তার অজ্ঞাত নয়। ভোরবেলা যাকে ছবির বাড়ির দিকে যেতে দেখেছে পাতুকি, সেই যে তার খুনি একথাও সে জানে না। বরং ছবিলার মৃত্যু হলে সেই লোকটার ক্ষতি বই লাভ নেই। তবে খুন কে করেছে, আগামী রাতে পাতুকি সেটা জেনে যাবে। যার কাছ থেকে জানবে, তার মতো বিশ্বাসী এ তল্লাটে কেউ নেই। ধনী-দরিদ্র, চোর-ডাকাত, খারাপ মানুষ, ভালো মানুষ সকলেই তেনাকে সালাম করে। একমাত্র পাতুকির সঙ্গেই তেনার কথা হয়। কিন্তু রাত হতে এখনও বহুত বাকি। ততক্ষণে এই পেটের গুড়গুড়ানি আর সারা দেহের শিরশিরানি পাতুকি সইবে কীভাবে?

ভোররাতে যে মানুষটি এসেছিল ছবির ঘরে, সেই মানুষটিকে রাত দুপুরেও তো ছবিলার বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেছে সে। তামাম রাত পাতুকি ছিপ হাতে বসে থাকে পুকুরপাড়ে, দক্ষিণ কোণে ঘন ঝোপের আড়ালে। বড়ো বড়ো বটের ঝুরি নেমে এসেছে ঝোপের চারপাশে। এখানে বসে থাকার অন্য এক মজা আছে। পাতুকি রাতের মতো আরামের সময় আর পায় না। এই বেলাটা কেন যে রাজ্যের মানুষ নেতিয়ে পড়ে, ঘুমিয়ে পড়ে, তা আল্লা মালিকই জানেন। পাতুকি ঘুমোয়না, ঘুমোতে পারেনা। যে বড় ছিপ হাতে সে সারারাত পুকুরপাড়ে বটতলার ঝোপে বসে থাকে তাতে বঁড়শি নেই, অতএব ফাতনাও না থাকারই কথা। বঁড়শির দড়ি বেয়ে কত মানুষকে ওই জল থেকে উঠতে দেখেছে পাতুকি। লোকের বিরাম নেই। সারা রাত ধরে তেনারা ওঠেন আর পাতুকিকে দোয়া করেন। তারপর সটান উঠে যান বটগাছের ঝুরি ধরে। অতঃপর জোনাকি হয়ে ঝিকমিক জ্বলতে জ্বলতে ঘুরপাক খান বট-পীরের চারপাশে। এই তামাম মুলুকের সবকিছু দেখভাল করে বট-পীর। রাতের নিকষ আঁধারে তার সাদা-দাড়ি স্পষ্ট দেখতে পায়, কিন্তু বট-পীর গত রাতে তো কিছুই বললেন না তাকে। অথচ ছবি, মানে ছবিলার মৃত্যু হল। পাতুকি জানে, বট-পীরের এইসব কথা বলতে গেলেই গাঁ-গেরামে কেন, এই তল্লাটে তার কথা কেউই কানে তুলবেনা। এমনিতে তার পাগল বলে যথেষ্ট দুর্নাম আছে। কিন্তু ছবিলার কথাটাও তো কাউকে না বললে নয়, পেটের গুড়গুড়ানি ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করে। পাতুকি ভাবে রহিম হাজির বাড়ি যাওয়া ভালো। লোকটা মন্দ নয়, তাকে গেল-বার ইদের সময় একটা নতুন লুঙ্গি দিয়েছিল। সে সটান হাঁটা দেয় রহিম হাজির বাড়ির দিকে।

রহিম হাজি এ তল্লাটের নামজাদা লোক। মহল্লার সব মানুষ তার নামে কাঁপে। পার্টিতে মোটা চাঁদা দেয় বলে প্রধান ও মেম্বাররা তাকে একটু বেশিই খাতির করে। উরসে বা জলসায়ও হাজি মেলা টাকা ঢালে। রহিম হাজি কোনও দিন মক্কায় গিয়ে হজ করেনি। তার বাপ রহমত সেই কোন কালে আরব যাবে বলে বোম্বাইয়ে গিয়েছিল জাহাজ ধরতে। তার কাগজপত্র বোধ হয় ঠিক ছিল না, নাকি অন্য কোনও কারণে রহমত হাজিকে জাহাজে উঠতে দেওয়া হয়নি। বেশ কিছুদিন পর রহমত হাজি গ্রামে ফিরলে লোকে তাকে ‘বোম্বাই হাজি’ বলে ডাকতে শুরু করে। তবে রহমতের ছেলেকে কেউ ‘বোম্বাই হাজি’ ডাকার সাহস পায়না। সে রহিম হাজির টাকার জোরেই হোক বা পার্টির প্রভাবে, অথবা নেক আমলের জোরে।

গ্রামে বিরাট মুদির দোকানের পাশাপাশি ধানের আড়ত, কয়লার গুদাম, কেরোসিনের কারবার আর তিন-তিনটে সাব মার্সিবল পাম্প আছে তার। সেখান থেকেও কম আয় হয় না রহিম হাজির। পাতুকি যখন ‘পাগল’ আখ্যা পায়নি, তখন সেই ছিল তার প্রধান শাগরেদ। সেইসব দিনের কথা স্মরণ করেই হোক, বা রহিম হাজির নেক আমলের গুণেই হোক, আজও পাতুকিকে সে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয় না। কাছে টেনে বসায়, বিড়ি দেয়, চাইলে পাঁচটা টাকা দিতেও কসুর করে না।

সেসব দিনের কথা পাতুকির মনে পড়ে না। যে দিনগুলোতে রহিম হাজি সন্ধ্যার সময় বসে থাকত গোপন চেলার হদিশ দিতে। এই তো, বেলু ময়রার মেয়ের একটা পা ছোটো বলে তার কিছুতেই বিয়ে হচ্ছিল না, নানা জায়গা থেকে প্রস্তাব আসে, একের পর এক ফেরত যায়। রহিম হাজি পঞ্চাশ টাকা নিয়ে বেলু ময়রাকে তাবিজ দিল। বেলু ময়রা ভয়ঙ্কর কৃপণ, সে দশ টাকার বেশি দেবেই না। কিন্তু রহিম হাজি কম সেয়ানা নয়। সে বলল,“দেখ বেলু, জাফরান কালি দিয়ে লিখে হুদ-হুদ পাখির চামড়ায় মুড়ে এই তাবিজ বানিয়েছি, নিয়ে গেলে তোর লাভ, মেয়েটারও গতি হবে। না চাস তো আমাকে জ্বালাস নে।” ময়রা পঞ্চাশ টাকা দিয়েই সেটা নিয়ে গেল। শুধু বেলু ময়রা?টনিসের তো রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তার বিবি। টনিসের মা নাকি তাকে বলেছে, “বাপ টনিস সম্বৎসর তো দক্ষিণেই কাটাস, তোর বিবি থাকে একা, সে তো পরপুরুষের নজরে পড়েছে, সে খবর রাখিস?”ব্যস, টনিসের তো মাথায় বাজ পড়েছে। সে সোজা চলে এসেছে রহিম হাজির কাছে। রহিম হাজি তাকে বলে, “যদি স্বামী তার স্ত্রীর গোপন কিছু জানতে ইচ্ছে করে বা স্বামীর কিছু মন্দ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, তা হলে আমলে ধরা পড়বে। কিন্তু এই ব্যাপারে একটা কথা আছে। এই গোপন বিষয় ফাঁস করলে চলবে না। ইহাই নির্দেশ। তুমি এই জিনিস হরিণের পাতলা চামড়ার উপর লিখে তোমার বিবির বুকের উপর রেখে দেবে। তাবিজ লিখতে হবে গোলাপ পানির মিশ্রণে জাফরান কালিদ্বারা। তোমার স্ত্রী তোমার অবর্তমানে যা করবে নিদ্রা অবস্থায় সব কিছু বলতে আরম্ভ করবে।” টনিস বলে ওঠে, জাফরান কালি আর গোলাপ পানি সে জোগাড় করতে পারবে, কিন্তু হরিণের চামড়া? রহিম হাজি তাকে বলে, “আমি তোমাকে জোগাড় করে দিতে পারি, কিন্তু খরচ অনেক বেশি পড়ে যাবে। প্রায় দশ হাজার টাকা।” এ কথা শুনে টনিস আর রহিম হাজি-মুখো হয়নি।

পাতুকি রহিম হাজির বাড়ির মুখোমুখি হল। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল, “রহিম চাচা বাড়ি আছ নাকি?”

“কে?”

“আমি পাতুকি। এট্টু দরকার ছিল।”

কোনও দিন রহিম হাজি নিজে দরজা খোলে না। কিন্তু আজ খুলল। বলল, “আয় ভিতরে আয়।”

পাতুকি নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল।

রহিম হাজি কি কিছু টের পেল? পাতুকি কী বলতে এসেছে তাকে? তবে খবরটা তো দেওয়া দরকার, লাশটার দাফন করতে হবে। সেও তো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। কাফনের কাপড় কিনে আনতে হবে। লাশের গোসল দেওয়া জরুরি। ছবিলার লাশের গোসল দেওয়ার লোক চট করে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যদি না রহিম হাজি উদ্যোগী হয়। তারপর কবর খোঁড়ার ব্যাপার আছে। লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার লোক চাই, চাই খাটুলি। এই সব ভাবতে ভাবতে পাতুকি বলে ফেলল,“চাচা, ছবিলা তো মরেই গেল। তা লাশের দাফন করতে হবে তো।”

রহিম হাজি যেন খবরটা জানত। সে বলল, “হ্যাঁ, কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কাফনের কাপড়ও আনতে হবে। তুই মসজিদের ইমামকে খবর দিয়ে আয়। বল, আমি তাকে ডাকছি।”

পাতুকি একটু চমকে গেল। এত সহজে এর সমাধান হয়ে যাবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। বরং তার আশঙ্কা ছিল হয়তো রহিম হাজি নানান ফ্যাকড়া তুলবে। বলবে, কোথাকার কোন মড়া, আমার কীসের দায়? গাঁয়ে কী আর মানুষ নেই? কিন্তু রহিম হাজি সে সব কিছুই বলল না। পাতুকি উঠে পড়ল, যাওয়ার পথেই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল, “ভোর রাতেও তো তুমি গেলে, তখন কি ছবিলা বেঁচে ছিল?”

এই বারে চমকে উঠল রহিম হাজি। কিন্তু সেই চমক দীর্ঘস্থায়ী হল না। সে পাতুকির হাত ধরে সোজা উঠে এল তার দোতলার ঘরে। বিছানায় পাতুকিকে বসাল তারপর বলল, “শোন পাতুকি, আমি ভোরবেলায় ছবিলার ঘরে যাইনি। গিয়েছিল মালেকুল মউত। সে কখন কোথায় কার বেশে যায়, তার উপরে মানুষের হাত নেই। তুই ভালো মানুষ, সাতে-পাঁচে থাকিস না বলে তুই এসব দেখতে পাস, তাছাড়া তোকে তো আমিও কিছু এলেম দিয়েছি।”

“চাচা, তুমি তো রাতদুপুরেও গিয়েছিলে। না সেও তুমি নও। ওই মউতের মালিক, না অন্য কেউ?”

“না রে ব্যাটা, সে হল শয়তানের রাজিম, সে যায় আগেআগে, আর তার পিছে পিছে হাঁটে মালেকুল মউত।”

“তার পিছে কেউ ছিল না।”

“ছিল, এ কি আর মনিষ্যি? সে গেল দুপুররাতে আর ভোরে গেল মউত। তবে কি পিছনে পিছনে হল না? দাঁড়া সবুরকে ডাকি, ইমাম সাহেবকে খবর দিতে হবে যে।”

রহিম হাজি বেরিয়ে গেল। পাতুকি প্রথমে পা ঝুলিয়ে বিছানার উপর বসে রইল। কিছুক্ষণ পর সে তার নোংরা পা দুটোও বিছানায় তুলে দিল। সাদা চাদরে পাতুকির পায়ের নোংরা নোংরা ছোপ লেগে গেল। ইতিমধ্যে বিছানার নীচে মাদুরের উপর দস্তরখানা বিছানো রয়েছে। সরপস দিয়ে ঢাকা নাস্তা। পাশেই হাত ধোওয়ার সিলেপচি। রহিম চাচার খাবার ঢাকা দেওয়া, এসে খাবে। কখন আসে! কত কাজের মানুষের সঙ্গে তার কারবার। বহুদিন এমন ভালো বিছানায় শোয়নি পাতুকি। গড়াতে গড়াতে তার ঘুম পেয়ে গেল। সেই ঘুম ভাঙল রহিম হাজির গলায়, “কী রে ভাতিজা, নাস্তা খেলি না? নাস্তা-মাস্তা খেয়েই বরং ঘুম পাড়। সারারাত জেগে থাকবি, ঘুমেরই বা কী দোষ? দুপুরে এখানেই খেয়ে যাস, তোর চাচি বারবার করে বলে দিয়েছে।”

পাতুকি স্বপ্ন দেখছে? বুঝতে পারে না। নিজের গালে আস্তে করে একটা থাপ্পড় মেরে সে বুঝল, না এ তো স্বপ্ন নয়। তাহলে নাস্তাটা খেয়ে ফেলাই ভালো।

জামাইকেও বোধ হয় এমন তরিবত করে খেতে দেওয়া হয় না। পরোটা, আলুভাজা, কষা গোস্ত আর ডিমের হালুয়া। ওহ, কি তার সোয়াদ। চেটেপুটে সবটাই খেয়ে নিল পাতুকি। তারপর সিলেপচিতে হাতমুখ ধুয়ে লুঙ্গিতে ভালো করে মুছে নিল। পুনরায় সটান শুয়ে পড়ল রহিম হাজির বিছানায়। একটা লম্বা ঘুম দিতে পারলেই বেলা-দুপুর হয়ে যাবে। রহিম হাজি যা কাজের মানুষ, ছবিলার দাফনের ব্যবস্থা সে নিজের হাতেই সামলে নেবে। হাত কি তার দুটো! শয়ে শয়ে তার হাত কিলবিল করে বেড়ায় সারা গ্রাম জুড়ে, এমনকী গ্রামের আশেপাশেও, এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আবারও ঘুমিয়ে পড়ে পাতুকি।

এ বারেও ঘুম ভাঙল রহিম চাচার ডাকে। রহিম চাচার পরনে সাদা টেরিকটের পাঞ্জাবি, ইসমাইল লুঙ্গি আর কিস্তি টুপি। হাসি-হাসি মুখে পাতুকির পাশে দাঁড়িয়ে সে বলে উঠল, “আল্লার দোয়ায় সব ভালোয়-ভালোয় মিটে গেল রে পাতুকি। তিনি রহমানের রহিম। ডাক্তার ব্যাটাও পাঁচশ টাকা নিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে চলে গেল। হার্ট অ্যাটাক। গরু জবাই করে খানা আর করিনি, কশাই গরিবের কাছে দশ কেজি গোস্ত নিয়েকবর-দোস্তদের খাইয়ে দিলাম। আর ওই গোটা-পাঁচেক মেয়েছেলে, পাশের গাঁ থেকে আনলাম। ওরাই গোসল দিল, যা কাঁদার তাও কেঁদে নিল ওরা। কিছু টাকা তো ওদের পিছনেও খসল। তবে আস্তানার কিরে পাতুকি, জানাজা নামাজের ইমাম কোনও টাকা চায়নি। বলল, যা মন চায় দিয়েন রহিম সাহেব।”

পাতুকি চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, “চাচা, আমি তাহলে যাই। সব যখন মিটে গেল, তখন তো আর আমারও থেকে কাজ নেই গো।”

“আরে ব্যাটা, দাঁড়া। চুপটি করে বস। দুপুরে খানা না গিলে গেলে তোর চাচি তো আমাকে গাল দিয়ে ভূত ভাগাবে রে হারামজাদা।” রহিম হাজি জামা ছাড়তে ছাড়তে বলে।

পাতুকি আড়মোড়া ভাঙে। খাবারের আগমন সংবাদে তার রসনেন্দ্রিয় দিয়ে লালার ক্ষরণ বইতে থাকে। অগত্যা সে বসে থাকে। খেলেই বড্ড ঘুম পায় তার। ঘটি গেঞ্জি পরিহিত রহিম হাজিকে সে বলে, “চাচা, দুপুরের খাওয়ার পর তো ঘুম পাবে, আমি বরং চলেই যাই, তুমি খাওয়া দাওয়া করে ঘুমোও। সারাদিন তো কম পরিশ্রম যায়নি তোমার।”

“চুপটি করে বসে থাক। এখানে খাবি, এখানেই ঘুমবি। যা গোসলখানা গিয়ে গা-পা ধুয়ে আয়। সারা দিন তো হাগা-মোতাও করিসনি ব্যাটা। যা, তাড়াতাড়ি যা। তুই এলে একসঙ্গে বসে খাব।”

রহিম হাজির এই কথা শুনে পাতুকি গোসলখানার দিকে এগিয়ে যায়। সাবানের খুশবুতে তার দু চোখে আবারও ঘুম নামে। কিন্তু ঘুম কাটাতে সে বালতি থেকে জল নিয়ে চোখেমুখে ছেটায়। হিসি-টিসি করে গায়ে জল ঢালে। গা মুছে গোসলখানায় রাখা একটা নতুন লুঙ্গি পরে। গায়ের জামাটা চড়িয়ে সে আবার উঠে আসে রহিম হাজির দোতলার শোবার ঘরে। শোবার ঘরের মেঝেতে তখন খাবারের আয়োজন। সেসব খাবার মুখে দেওয়ার আগেই সে গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যায়। কিচ্ছুটি না বলে সে বসে পড়ে খাবারের থালায়। গপগপ করে খেতে থাকে ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা, টিকিয়া, আলু গোস্ত। তখনও রহিম হাজি খেতে বসেনি। পাতুকিকে দেখে সে বলে, “কী রে ভাতিজা, চুলটাই আঁচড়ালি না, খেতে বসে গেলি?’ পাতুকি জানায়, “বড্ড ঘুম পেয়েছে তো চাচা, খেয়েনিই। তাড়াতাড়ি ঘুমোতে হবে তো। একদিনের বাদশা আমি।” কোনও ক্রমে সব ভাত তরকারি উদরস্থ করে পাতুকি সোজা শুয়ে পড়ে রহিম হাজির বিছানায়। এবং পুনরায় ঘুম। ঘুমের ভিতর সে স্পষ্ট দেখতে পায় তাকে ডাকছেন বটপীর। ধীরে ধীরে তেনার সাদা-দাড়ি স্পষ্ট হয়। কালো পিরহানে তিনি পাতুকির দিকে এগিয়ে আসছেন বহু দূর থেকে। আসছেন তো আসছেনই।

তারপর কখন পাতুকি পৌঁছে যায় পুকুরপাড়ে। সেই বটতলার ঝোপে। হাতে তার ছিপ, তাতে বঁড়শি নেই কোনও। ফাতনাও নেই। মাথার উপরে বটগাছ। বটগাছ থেকে নেমে আসেন পীর সাহেব। পাতুকির মুখোমুখি বসেন তিনি। পাতুকি তেনাকে বলে, “হুজুর ছবিলার মউতের ব্যাপারটা তো কিছুই বুঝলাম না, যদি খোলসা করে বলেন।”

বটপীর ফিসফিস করে বলেন, “রাতদুপুরে যে শয়তানের রাজিম হয়ে যায় ছবিলার ঘরে, সেই তার মালেকুল মউত—এই কথাটা তো তোর বোঝা উচিত রে পাতুকি।”

পাতুকি ঘাড় নাড়ে। ঘাড়ের উপর তার যে মাথা, সেই মাথার উপর খুব একটা ভরসা রাখতে সাহস পায় না সে। বরং দুটো কানকে সে মেলে ধরে বটের ঝুরির দুই পাশে। তখন ছিপের দড়ি বেয়ে পুকুর থেকে একে একে উঠে আসেন তেনারা, তারপর বটের ঝুরি বেয়ে উঠে যান মগডালে। পাতুকি তেনাদের সঙ্গে মগডালে গিয়ে বসে। বটপীর এবার গমগমে গলায় হুঙ্কার ছাড়েন। বলেন, “শোন রে বালখিল্য পাতুকির দল। ছবিলার ঘরে রোজই রাতদুপুরে যায় তোদের রহিমচাচা। কালও গিয়েছিল সে। বাড়ি ফেরার পথে তার পিছু নেয় একজন। রহিম টেরও পায়নি। নিজের বাড়িতে ঢোকার পর সে সোজা চলে যায় তার শোবার ঘরে। হঠাৎ একটা গোঙানি শুনে সে টর্চ মেরে দেখে, তার বাড়ির মাদি কুকুরটার সঙ্গে ছবিলার পোষা মদ্দা কুকুরটা মিলন খায়। দেখেই গা-পিত্তি জ্বলে যায় রহিমের, এতো বড় সাহস ওই কুত্তার বাচ্চার। বেশ্যা বাড়ির কুকুর হয়ে গেরস্ত-বাড়ির কুকুরের সঙ্গে আহনাই? সঙ্গে সঙ্গে সে বের করে তার ছ-ইঞ্চি গুলিভরা পিস্তল, কিন্তু পরক্ষণেই থেমে যায়। রাগে কাঁপতে কাঁপতেও তার মনে পড়ে ছেলেবেলায় পড়া নাকি শোনা একটা গল্প। কবে কোন রাজা এই রকম এক জোড়া হরিণ মেরে ফেলেছিল। আর সেই অভিশাপে সে তার বিবির সঙ্গে ওই অবস্থাতেই মারা যায়। রহিমের ভয় হয়। সে চুপ করে বসে থাকে, কিন্তু উত্তেজনায় সারারাত তার ঘুম হয় না। ভোরবেলার দিকে তার মাথায় একটা বুদ্ধি উঁকি দেয় আর তারপর সে ঢুকে পড়ে বাড়ির রান্নাঘরে। হাঁড়ি থেকে বের করে নুন-হলুদ মাখানো গোস্ত। একটা বাটিতে সেই গোস্ত নিয়ে তাতে ঢেলে দেয় ফসলের পোকা-মারা টাটকা বিষ। তারপর সেই বাটি নিয়ে সোজা হাঁটা দেয় ছবিলার বাড়ি। ছবিলা তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছে। রহিমের এই গোস্ত নিয়ে তার বাড়িতে ঢোকা ও কুকুরকে ‘তু তু’ করে ডাকা, তার চোখে ভালো ঠেকেনা। সে রহিম হাজির দিকে এগিয়ে যায়, তাকে বাধা দিতেচায়। চিৎকারও করে ওঠে। রহিম বাটির গোস্ত কুকুরের মুখের কাছে নামিয়ে ছবিলার দিকে এগিয়ে যায়, তারপর তার বিরাট পাঞ্জায় শক্ত করে টিপে ধরে ছবিলার মুখ। কুকুরটা তখন গোস্ত খেতে শুরু করেছে। রহিম ছবিলার নাক-মুখ টিপে ধরেই থাকে তার বিরাট পাঞ্জায়। কুকুরটা নেতিয়ে পড়ে, এ দিকে ছবিলাও। রহিম বাড়ি ফিরে যায়।”

পাতুকি ঘনঘন শ্বাস ফেলতে থাকে। আর তার শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্য থেকে অজান্তে একটি আওয়াজ বেরিয়ে আসে, “আচ্ছা পীরবাবা, ছবিলার ব্যাটার কী হল? সে তো দুধের বাচ্চা, সে কোথায় গেল?”

“তার ব্যবস্থাও রহিম করে দিয়েছে রে। হুব্বা রতনের কাছে তাকে চার হাজার টাকায় বেচে দিয়েছে হাজি, সেই টাকাতেই তো দাফন হল ছবিলার, খানাপিনাও।”

বট-পীরের কথা শুনে পাতুকি চুপ মেরে যায়। কেউ কোনও কথা বলে না বহুক্ষণ। নীরবতা ভেঙে হঠাৎই বটপীর বলেন, “ওই দেখ, ছবিলার কবর—দেখতে পাস? আর ওই যে তার পাশের কবরটা, চিনতে পারিস পাতুকি? আরও টাটকা। ওটা তোর।”

৪টি মন্তব্য:

  1. আমরা পাতুকির দল কবেই তো কবরে চলে গেছি, তবুওতো আমাদের কথা বলার জন্যে দু'চারজন মানুষ আজও বৃদ্ধ বটের ঝাপানো মাথায় বসে নানান ভাবনা আগামীর পাতুকিদের শুনিয়ে যাচ্ছে।
    এমন 'কবর' কথা নিয়ে আর সব পাতুকিদের কথা শুনতে ইচ্ছে হয়।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর হয়েছে স্যার।ধন্যবাদ ।

    উত্তরমুছুন