সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

আহমেদ খান হীরকের গল্প : দ্বিতীয় পুরুষ

আকাশের দিকে তাকিয়ে তেমন সুবিধার মনে হলো না তোমার। মনে হলো ঝড় হবে। ঝড়ের আগে আগে আকাশ যেমন পচা ফলের মতো ঘোলা রঙের হয়ে যায়, মনে হলো আকাশটা ঠিক তেমনই হয়ে গেছে। পচা—রুগ্ন—ভগ্ন!

তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলে কোনদিকে যাবে! বাসার দিকে যেতে যেতে দেরী হয়ে গেলে ঝড়ের মুখে পড়তে হবে! আর এখানে আশে-পাশে কোনো দোকানপাটও খোলা নেই যে উটকো ঝড়ে কোথাও গিয়ে তুমি আশ্রয় নেবে। তুমি জানো, কোনো দোকানই আজকাল আর খোলা হয় না। এমনকি খুব বিপদে না পড়লে মানুষ বেরও হয় না রাস্তায়। তোমার বিপদ ছিল, তাই বেরিয়েছিলে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার চেয়েও অধিক বিপদ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি বুঝতে পারছো, এই আকাশ, অথর্ব আকাশ, ঝড় ছাড়া আর কিছুই উৎপাদন করবে না!

পাবে না জেনেও এদিক ওদিক তাকিয়ে তুমি রিকশা বা অটো বা ট্যাক্সি কিছু একটা খুঁজলে। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে এসবের কিছুই নেই। খুব দুপুরে ইদানিং হঠাৎ হঠাৎ এসব দেখা যায়। এছাড়া সারাটা দিন এক রকম হাঁটার ওপরেই থাকতে হয় তোমার মতো বিপদগ্রস্ত মানুষদের। তুমিও তো হাঁটতে হাঁটতেই মাঝ রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছো। রাস্তা—অভাবনীয় ফাঁকা রাস্তা—মুখ থুবরে পড়া নদীর মতো, স্থবির। জনমানবশূন্য এই রাস্তা কি বিষন্ন করে তোলে তোমাকে? তোমার ভালো লাগে না। একটা হাহাকার কিংবা অসহায়ত্ব তোমার ভেতর জেগে উঠতে চায়। ‍তুমি সেটা বারবার দমাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ো।

বিবর্ণ আকাশ আর বিষণ্ন রাস্তা দেখতে দেখতে তুমি বুঝতে পারো না তোমার করণীয়। তুমি কি হাঁটতে হাঁটতে তোমার গন্তব্য চলে যাবে? কিন্তু কারওয়ান বাজার থেকে উত্তরা অনেকটা পথ… এতটা পথ তুমি কি আগে কখনো হেঁটেছো? তুমি মনে করতে পারো না। না পেরে, তোমার নিজেকে দুর্বল মনে হয়। তোমার মনে হতে থাকে হাঁটতে হাঁটতে উত্তরা কেন বনানী পর্যন্ত যেতে যেতেই ঝড় চলে আসবে! কালো ঝড়!

একটা বাতাস তোমার মুখে এসে লাগে। সেই বাতাসের আগের কোনো বাতাসে উড়তে থাকা শূন্য পলিব্যাগ তোমাকে ঘিরে কিছুক্ষণ ঘোরে। তোমার মনে হয় ব্যাগটা তোমাকে কিছু বলতে চায়—সাবধানই করতে চায় কিনা—তুমি বুঝতে পারো না। ব্যাগটা কি ফিসফাস করে উঠেছিল? গোপন হিতকারীর মতো বলছিল—পালাও পালাও! কিন্তু তুমি তো আজও, ঠিক কোথায় পালাতে হবে, ঠিক করে উঠতে পারো নি।

তুমি গ্রামের কথা ভেবেছিলে প্রথমে। যেখানে তোমার শৈশব হাফপ্যান্ট পরে একটা নদীর আঙুল ধরে আজো ঘুরে বেড়ায়। লাল ঘুড়ি আর সাদা নাটাই এখনো মেঘের দিকে নিজেকে ছুঁড়ে দেয়, তারপর লুফে নেয় স্মৃতির ভোকাট্টা। যেখানে কাঠি নারিকেল বরফ এখনো সুরেলা হাঁক ছাড়ে—এই বরেফ বরেফ… নারকোল বরেফ!
কিন্তু লম্বা সময়ের বিচ্ছেদে গ্রামকে এখন তোমার দুর্বোধ্য প্রেমিকার মতো লাগে। তার কাছে লেগে তুমি বিপন্ন হয়ে পড়ো এবং দূরে চলে এলে তাকে নিয়ে দারুণ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ো। মনে হয় নিজের ক্লেদ আর রক্তবিষাদ নিয়ে গ্রামের কাছে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই। পালিয়ে গ্রামের কাছে যাওয়ায় কোনো আশ্রয় নেই।

তুমি তাই খুব চট করে ভেবেছিলে বিদেশ চলে যাওয়ার কথা।
বিদেশ। আর বিদেশ বলতে তুমি মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকা ভাবো নি নিশ্চয়! তুমি পশ্চিমা কোনো দেশের কথাই ভেবেছিলে! পশ্চিম হলো স্বর্গ। পশ্চিম হলো স্বপ্ন। পশ্চিম হলো অপর বাস্তবতা। আর তাই পশ্চিম সহজলভ্য তো নয়! পশ্চিমের জন্য যেন তিতিক্ষা লাগে। তোমারই আশপাশ থেকে কত জন চলে যেতে চায়… মুখে না বললেও আসলে পালিয়েই যেতে চায়… কেউ চলে যায় গ্রাম আর মফস্বলের দিকে… আর কেউ কেউ অপেক্ষা করে পশ্চিমের একটা নিশ্চিত ফ্লাইটের জন্য!
ফ্লাইট আসে না। কিন্তু ঝড় আসতে থাকে। একের পর এক ঝড়, কালো ঝড়, আসতে থাকে। আর উজাড় হতে থাকে শহর।

বাতাসের আরেকটা ঝাপটা এসে মুখে লাগলে তুমি একমাত্র এত আন্ডারপাসের ভেতর ঢুকে যাও। অন্ধকার আছে জায়গাটা, তবু তোমার মনে হয়, জায়গাটা অনিরাপদ নয়। তোমার কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করলে তুমি কাল্পনিক ঝড়টার জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করো। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও ঝড়টা না এলে আন্ডারপাসের ভেতরটা তোমার হঠাৎই অনিরাপদ মনে হতে থাকে আর তখনই তোমার মোবাইল ফোনটা ক্যা ক্যা করে বেজে ওঠে। ‍তুমি মোবাইলটা বের করে দেখ অপরিচিত নাম্বার তোমাকে কল দিয়েছে। তোমার ভেতরটা শুকিয়ে আসে। তোমার সন্দেহ হতে থাকে—তুমি বুঝতে পারো না ফোনটা তোমার ধরা উচিত কিনা! অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফোনটা কেটে যায়। তখন খুব অল্প সময়ের জন্য স্বস্তি ফিরে আসে কিন্তু পরক্ষণেই ফোনটা আবার বেজে উঠলে তোমার ভেতর মৃত মুখের মতো শীতল এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

তবু তুমি দ্রুততার সাথে ফোনটা ধরো—আসলে ধরতে বাধ্য হও—কারণ ওপারের অজানাটা তোমাকে ঠেলে দিচ্ছে আতঙ্কের শেষ খাদের দিকে। তুমি ফোনটা ধরো; ধরো, কিন্তু ধরতে তোমার কোনো শক্তি থাকে না, যেন তুমি এই শেষবারের মতো ধরেছো ফোনটা, আর কোনো দিন এ সুযোগ তোমার আসবে না, তুমি চেষ্টা করো গলাটা সহজ রাখার কিন্তু তুমি তা রাখতে পারো না—স্বরটা কেঁপে যায়, পিছল এটেঁল ঘাটে তোমার শরীর যেমন কেঁপে যায় সেভাবে তোমার কণ্ঠ প্রশ্ন করে—কে?

ওপ্রান্ত নীরব।

আর নীরব হওয়ায় তোমার হৃদস্পন্দন খেই হারিয়ে ফেলে। তুমি একটা বড় শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করো কিন্তু পারো না। তোমার মনে হয় আর কখনো বোধহয় তুমি শ্বাস নিতে পারবে না। তখন তুমি একটা অসম্ভব কোনো স্লোমোশন কিছু কল্পনা করতে শুরু করো—যা আকাশকে সাথে নিয়ে গুলিয়ে গুলিয়ে নিচের দিকে, একেবারে তোমার দিকে নেমে আসছে, আর যে কোনো মুহূর্তে তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে সেটা। কোথায় নিয়ে যাবে তুমি কল্পনা করতে করতে আরেকবার ফোনে প্রশ্ন করো তুমি—প্রশ্ন করো তবে তোমার গলার স্বর বেরিয়ে আসতে চায় না—অল্প শব্দের মধ্যেই অধিকাংশ ধ্বণি লুকিয়ে পড়তে চায় তোমার গলার আড়ালে। তুমি বলো, বা বলতে চাও—কে বলছেন?

যদিও বেরিয়ে আসে আবারো শুধু—কে। আর ওপ্রান্ত থেকে শুধু একটা খসখস শব্দ শোনা যায়। তোমার মনে হয় তোমার কোনো একটা শমনের পাতা উড়ে যাচ্ছে সেই খসখসে শব্দে। তুমি আন্ডারপাসের অন্ধকার থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসো। আর বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় যে এখনো স্ট্রিট ল্যাম্প জ্বলে তা দেখে দারুণ বিস্ময় আর কৃতজ্ঞ অনুভব করো। রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা লালচে বা কমলালেবু আলোগুলোকে তোমার অনন্য মনে হতে থাকে। একটা বাতির নিচে দাঁড়িয়ে তুমি কিছুটা সাহস পাও। তোমার কণ্ঠে একটা জোর আসে। তুমি বলো, কে বলতেছেন, কথা বলেন না ক্যান?
ওপ্রান্ত থেকে এবার শব্দ শোনা যায়। একটা কণ্ঠ। পুরুষ কণ্ঠ। তবে বিপন্ন কণ্ঠ বলে মনে হয়। বলে, নিয়াজ? নিয়াজ না?

তোমার চেহারা রাস্তার আলোয় হোক বা রাগে কমলালেবুর খোসার মতো হয়ে যায়। লালচে হয়ে যায়। রক্তাভ হয়ে যায়। বা খুব পাতলা লালচে কন্ডোম পড়ে নিলে যেমন হয় তেমন হয়ে যায় চেহারাটা। তুমি প্রচণ্ড গালি দাও একটা। খুবই জোরে দাও। সম্ভবত শুয়োরের বাচ্চা বলো বা অন্য কোনো গালি… কিন্তু কী গালি দাও তাতে, এমনকি ওই সময়েও, নিশ্চিত হতে পারো না। কিন্তু গালি দাও। ওপ্রান্ত থেকে তখন কণ্ঠটা একটু চড়ে যায়। বলে, গাইল দিতাছেন ক্যান? নিয়াজের নাম্বার না এইটা? নিয়াজ নাই ওইখানে?

তুমি বলো, না। এইটা নিয়াজের নাম্বার না। ফোন রাখ শালা।

ওপ্রান্ত বলে, কিন্তু এইটা তো নিয়াজের নাম্বার। আমি জানি এইটা নিয়াজের নাম্বার… এইটা জিরোওয়াননাইননাইন…

ওপ্রান্ত নাম্বার বলতে থাকলে তুমি খেয়াল করো লোকটা তোমারই নাম্বার বলছে। ফলে পুরনো আতঙ্কটা আবার ফিরে আসে। তোমার নাম্বার নিয়াজের নাম্বার হয় কীভাবে? তোমার নাম্বার কি তাহলে অন্য কেউ রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছে? তুমি কি তাহলে অন্য কারো নাম্বার ব্যবহার করছো? কিন্তু না, অসম্ভব। তোমার খুব ভালো করে মনে আছে তুমি কিছু দিন আগেই আঙুলের ছাপ দিয়ে নাম্বারটা নিজের করে নিয়েছো। তাহলে নিয়াজ, এই নিয়াজটা কে?

ওপ্রান্ত বলতে থাকে—ভাই নিয়াজকে দ্যান ফোনটা… জরুরি খবর আছে... আইজ বিকালে এইদিকে একটা বেজায় খারাপ ঘটনা ঘটছে… ঢাকায় যেমন ঘটতেছে… তেমনই ঘটনা বোধহয়… ভাই দেন না নিয়াজকে দেন…
তুমি তাড়াতাড়ি বলো, কী ঘটতেছে ওইখানে?
কণ্ঠটা বলে, নিয়াজকে দ্যান। তার পোলাটার পা খাওয়া পড়ছে। দ্যান ভাই, নিয়াজকে দ্যান!
তুমি বিরক্ত হয়ে বলো, পা খাওয়া পড়লে ঘটনা ক্যামনে ঢাকার সাথে ঘটছে? তোমাদের মতন আজাইরা মানুষদের জন্যই দেশটা বাঁচব না… যত্তসব! নিয়াজ নাই এইখানে! এই নাম্বার আমার!
কণ্ঠটা বলে, আপনি কে?
তুমি বলো, আমি…
বলতে গিয়েই তুমি সাবধান হয়ে যাও। অপরিচিত কাউকে কীভাবে পরিচয় দিয়ে ফেলছিলে ভাবতে গিয়েই তোমার শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এই ভুল একদম করা যাবে না। তুমি তাড়াতাড়ি বলো, আমি কে সেইটা জাইনা তোমার লাভ কী মিয়া? রাখো, ফোন রাখো…


তুমি নিজেই ফোন কেটে দাও। দাওয়ার পর তোমার আফসোস হতে থাকে কে কোথা থেকে ফোন করেছিল ব্যাপারটা তোমার জানা তো উচিত ছিল। তুমি প্রশ্ন করলে নিশ্চয় বলতো। তুমি একবার ফোন করতে যাও… কিন্তু আবার তা কেটে দাও। করতে করতে ফোন করো না। কিন্তু মনের মধ্যে তোমার ঢংঢং করে একটা ঘণ্টা বেজেই যেতে থাকে। আর তোমার খেয়াল হয়, খেয়াল হয় মানে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আসলে দেখতে পাও সাতটা ছাপান্ন বাজছে। আর তখনই তিনটা পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে ছুটে যেতে থাকে। ফাঁকা রাস্তা পেয়েও তারা নিজেদের মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে এগুতে থাকে। পুলিশের গাড়িগুলো চলে গেলে তোমাকে একটা অসহনীয় নীরবতা আঁকড়ে ধরে। আর নীরবতার সাথে আতঙ্ক। তুমি মোবাইল তুলে ফোন দিতে চাও কাউকে। একের পর এক নাম্বার তোমার স্ক্রিনে উঠতে থাকে। কিন্তু কাউকেই তোমার কল দেয়ার মতো মনে হয় না। তোমার ফোন আবার বেজে ওঠে। এবং তুমি নাম্বারটিকে এবার চিনতে পারো। বুঝতে পারো কলটা রিসিভ করার সাথে সাথে ওপ্রান্ত থেকে কেউ একজন নিয়াজকে চাইবে। তুমি, তা জেনেও, কলটা রিসিভ করো।

ওপ্রান্ত থেকে একটা নারীকণ্ঠ বলে ওঠে, আপনি এই নাম্বারে কল দিয়েছিলেন একটু আগে?
তুমি বলো, না। এই নাম্বার থেকে আমাকে কল করা হয়েছিল। কোনো একটা নিয়াজকে খুঁজছিল।
নারীকণ্ঠ বলে, মিথ্যা কথা বলবেন না! আপনার নাম্বার আমার ডায়াল লিস্টে ইনকামিঙে… আপনি কে? আপনি কাকে চান?
তুমি এর কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ মেরে থাকো।
নারীকণ্ঠ বিচলিত হয়ে পড়ে। বলে, কথা বলছেন না কেন? আমি কিন্তু আপনারি নাম্বার র‌্যাবের কাছে পাঠিয়ে দিবো। কথা বলেন…
তুমি কী বলবে ভেবে পাও না এবং চুপ করে থাকো।
নারীকণ্ঠ এবার চিৎকার করে ওঠে। বলে, শুয়োরের বাচ্চা কথা বলিস না কেন? কে তুই? কাকে চাস? কথা বল…
তুমি হড়বড়িয়ে বলো, ‍আমি নিয়াজকে খুঁজছি। নিয়াজের বিরাট প্রবলেম… ঢাকার ঝড় নিয়াজের গ্রামেও হানা দিছে! নিয়াজ আছে কি আপনার ওখানে?
নারীকণ্ঠটা জানায় সে কোনো নিয়াজকে চেনে না। তবে না… একটা নিয়াজকে সে চিনত। অনেক দিন আগে। কিন্তু ওই নিয়াজকে গত বছর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এখন অনেক দিন হয়ে যাওয়ায় নিয়াজকে এখন কেউ আর খোঁজেও না। আপনি কি সেই নিখোঁজ নিয়াজকে খুঁজছেন?
তুমি বোধশূন্য হয়ে থাকা অবস্থাতেই বলে, আমি সবগুলো নিয়াজকেই খুঁজছি! ঢাকা শহর থেকে হাজার হাজার নিয়াজ বোধহয় নেই। আমি সবগুলো নিয়াজকে খুঁজছি!
নারীকণ্ঠটায় এবার সন্দেহের ঘোর—কে আপনি আসলে বলেন তো? সত্যি করে বলেন তো?
তুমি তোমার পরিচয় দিতে যাও, কিন্তু নিজেকে আবার সংবরণ করে নাও। অপরিচিত কারো কাছে নিজের পরিচয় এখন কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। তুমি তখন বলো, আমি নিয়াজ!
নারীকণ্ঠটা হঠাৎ রিনরিন করে ওঠে। বলে, সত্যিই তুমি নিয়াজ? এদ্দিন পর? তোমাকে আমি কদ্দিন ধরে মনে মনে খুঁজি! তোমার ছবি যখন প্রথম পত্রিকায় বের হয় তখন আমি বিশ্বাসই করি না যে তুমি নিখোঁজ হয়ে গেছ… কিন্তু পরে সবার বলায় বিশ্বাস করছি! তুমি এখন কই? তোমার কণ্ঠস্বর আমার আগে থেকেই পরিচিত ঠেকছিল… তুমি কোথায় আছো বলো… আমি তোমাকে পিক করব… তুমি জানো না তোমাকে বলার আমার অনেক কথা আছে! তুমি কবে আসছো?

নারীকণ্ঠটা অনবরত প্রশ্ন করতে থাকে। আর তুমি কারওয়ান বাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে উত্তরার পথ ধরে নাও। বনানী পেরিয়ে যাও তুমি। নারীকণ্ঠটা বলতে থাকে, তুমি জানো না তোমার জন্য আমি একটা চিঠি লিখেছিলাম এক বছর আগে… তুমি আসো… তোমাকে আমি চিঠিটা পড়ে শোনাবো।

কোনো এক নিয়াজের হয়ে নারীকণ্ঠের আবেগ শুনতে তোমার ভালো লাগে। তোমার মনে হতে থাকে নিয়াজ হওয়াটা তেমন মন্দ কিছু না। নারীকণ্ঠের কথা শুনতে শুনতে আরো একবার আকাশের দিকে তাকালে তুমি দেখতে পাও আকাশ অনেক অনকে অনেক নিচে নেমে এসেছে। আকাশের উচ্চতা কি এখন একটা হাতের পার্থক্য? তুমি নারীকণ্ঠকে বলো, আকাশ নেমে আসছে অনেকখানিক… মনে হয় এইবারের ঝড়ে পুরা ঢাকা খোলা কইরা দিবো!
এই কথা শুনে নারীকণ্ঠ খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, তুমি এখনো আগের মতোই মজারু আছো!
এসব শুনতে তোমার ভালো লাগে। নারীকণ্ঠ হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে। বলে, আমার বেলকনিতে অনেকগুলো সাপ। গোখরা সাপ। এক সাথে বিশটা… না পঁচাত্তরটা… না তেয়াত্তরটা… না সাতটা বোধহয়… সাপগুলো আমাকে কামড়ে খেয়ে ফেলবে… নিয়াজ, তুমি আসবে না আমাকে বাঁচাতে? তুমি চলে আসো…

তুমি অনুভব করো এক হাত ওপরের আকাশ গুলিয়ে উঠতে থাকে। তারপর হঠাৎই যেন আকাশটা ভেঙে যেতে থাকে। আর আকাশের ওপাড়ের আকাশ থেকে তেড়ে আসতে থাকে কালো ঝড়। সাপের মতো গর্জন তুলতে তুলতে ঝড়টা ধেয়ে আসছে দেখে তুমি তাড়াতাড়ি বলো, তাহলে তোমার বাড়ির ঠিকানা বলো… তোমাকে সাপের হাত থেকে আর নিজেকে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাই! বলো, ঠিকানা বলো…

ঠিকানা বলতে গিয়ে নারীকণ্ঠ থমকে যায়। কী এক অস্বস্তি যেন তার ভেতর। তারপর বলে, তুমি সত্যি নিয়াজ তো? তুমি সত্যি নিখোঁজ হয়েছিলে তো?

তুমি মাথায় ভেঙে পড়া আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে বলো, আমি সত্যি নিয়াজ। আমিই নিখোঁজ হয়েছিলাম…

আকাশের ওপারের আরেকটা আকাশ থেকে একটা বন্দুকের নল তখন তোমার বুকে এসে ঠেকে। প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। বাতাসে সাপেরা উড়তে থাকে। তোমার একটা আফসোস হয়—তোমার কোথাও পালানো হলো না!

নারীকণ্ঠটা ফোনের ওপার থেকে বলতে থাকে—নিয়াজ, হ্যালো নিয়াজ…
তোমার খুব উত্তর দিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু তোমার ফুসফুস ততক্ষণে নিয়াজের ফুসফুস হয়ে ব্যবচ্ছেদের জন্য চলে যাচ্ছে কোনো বিষণ্ণ টেবিলে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন