সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

সাধন দাসের গল্প : গুজব


(১)

তখনও সাইকেলের রডে বসার বয়স। সকাল বিকেল ফাঁক পেলেই মাঠে নেমে পড়ি। লড়াই লড়াই খেলি। ভিজে পুড়ে অবাধ্য জ্বরও হয়। সেরে ওঠার মুখে, বাবার সাইকেলে শহরে যাচ্ছি, ডাক্তারকাকুর কাছে। চ্যাপ্টাশিশিতে লাল কষাই মিক্সার, আর খলনুড়িতে মেড়ে সাদা পুরিয়া, মানে স্কুল যেতে হবে না।


বাংলাদেশ তখনও হয়নি। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্থান। ভারতবর্ষের দুই কানিন অঙ্গের মতো এক নামে দুটো দেশ দু’দিকে সেঁটে আছে। ভারতের সাথে পশ্চিম পাকিস্থানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বদমায়েস একটা পুচকে দেশ। খেলার মাঠে বিপক্ষ দলকে পশ্চিম পাকিস্থান সাজিয়ে রোজ গো-হারান হারাচ্ছি। পূর্ব-পাকিস্থান বাড়ির পাশে। ভাবি, ভারত আর পূর্বপাকিস্থান, বাবা কাকা যেনো ভাই ভাই ঠাঁইঠাঁই হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্থানের মতো শত্রু হয়ে যায়নি।

চারপাশে যুদ্ধ যুদ্ধ হাওয়া। সন্ধে হলেই ব্ল্যাক আউট। বড়োরা হেরিকেনের আলো কাগজের ঠোঙায় ঢেকে যুদ্ধের পরিস্থিতি আলোচনা করেন। গল্পের গম্ভীর যুদ্ধে হুমড়ি খেয়ে বাবা কাকাদের বোগল গলিয়ে ছোটোরা মাথা ঢুকিয়ে দিই। পরদিন বিকেলে খেলার মাঠে গল্প মিশিয়ে যুদ্ধের নক্সা তৈরি হয়। বোমা, বারুদ, প্যাটনট্যাঙ্ক, বোমারুবিমান নতুন নতুন শব্দ, মাল-মশলা আমাদের খেলায় ঢুকে পড়ে। প্রতিদিন নতুন নতুন খবর। মাল ট্রেনের মতো লাইন দিয়ে সবুজ সাঁজোয়া গাড়ি; যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। মেথর পাড়ার আমবাগানে মিলিটারিদের লুকিয়ে থাকা তাঁবু। মাথায় ঝোপ জঙ্গল বেঁধে লেফট রাইট লেফট রাইট.. আমাদের খেলায় উত্তেজনা তৈরি করে। অন্ধকার নেমে গেলেও পশ্চিম পাকিস্থানকে হারিয়ে মনের ঝাল মিটিয়ে তবে বীর বিক্রমে বাড়ি ফিরি। রেডিওর খবর, গুজবের জটলা, বড়োদের ফিসফিস, যুদ্ধের কথা শুনলেই কড়া কান পাতি।

সকালবেলা। কুয়াশা ভাঙা পরিস্কার আকাশ। বাতাস ভিজেভিজে। কামারদের মাঠে গাছেদের লম্বা লম্বা ছায়ায় ঘাস তখনও নরম আর ঠাণ্ডা। গায়ে ঘুসঘুসে জ্বর। বাবা সবে সাইকেলে চড়েছেন। শওকতদের বাড়ি পর্যন্তও যাইনি, বেজে উঠলো ঢেউ খেলানো সাইরেন। মানে বিপদ। সাইকেল থেকে বাবা তড়িঘড়ি নেমে পড়লেন। নামিয়ে দিলেন আমাকে। খুব নিচু দিয়ে তিনখানা বোমারু বিমান হন্তদন্ত হয়ে উড়ে গেলো। কান ফাটানো গাঁকগাঁক আওয়াজ।

বাবা বললেন–বিমান আক্রমন। শুয়ে পড়। শুয়ে পড়।

ভয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছি। বাবা ভাবলেন, শুয়ে পড়তে হয়, আমি জানি। বললেন- গুড।

শওকতদের বাড়ির উলটো দিকে পচাস্যাকরার বাচড়া। আমরা দু’জন বাচড়ার মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। বাবা বললেন –যতক্ষণ একটানা সাইরেন না বাজে, শুয়ে থাক। আর চারদিকে নজর রাখ।

মাথার উপর আসল এরোপ্লেন। মানে সত্যিসত্যি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। বুকের ঢিপ ঢিপ, মাটিতে চেপে ধরেছি। মাটি ফুঁড়ে দামামা বাজছে। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম –একটানা মানে?

বাবা চারিদিকে কড়া নজর ঘুরিয়ে বললেন –ঢেউ খেলানো সাইরেন মানে বিপদ। একটানা মানে বিপদ মুক্তি। শান্তি।

পথ চলতি খবর এলো পেট্রাপোল বেনাপোল বর্ডারে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্থানি খানসেনারা আক্রমন করেছে। ওষুধ আনা মাথায় উঠলো। হুড়মুড়িয়ে ফিরে এলাম। বাবা একাই বাজারে চলে গেলেন। হাল হকিকত জানতে, এখন আমাদের কী করণীয়। বলে গেলেন, মেজোকাকার কোলকাতায় মাল তুলতে যাওয়া বন্ধ। ছোটকাকার কলেজ, ছোটোদের স্কুল, সব বন্ধ। সত্যিকারের রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। রান্না চাপবে? না, হাঁড়িকুড়ি বোঁচকা বাঁধতে হবে, মা কাকিমারা মুখে আঁচল নিয়ে হাঁ। চোখ বড়ো বড়ো। কী হয় কী হয়!

স্কুল যাওয়ার সময় পার হয়ে গেলো। বাবা ফিরছেন না। আমরা দলবেঁধে বাড়ির সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছি। মা ঘুরছেন ফিরছেন, থেকে থেকে হাঁক দিচ্ছেন, ঘরে গিয়ে বসতে। হাঁকের আওয়াজে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের খবরে তার খুব জ্বালাতন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছেলেপুলেগুলো না খোয়া যায়। মা’র বকুনি খেয়ে কাইমা (মেজোকাকিমা) উনুনে ভাতে-ভাত চাপিয়ে দিয়েছে। ভাত ফুটছে টগবগ টগবগ..

খবর এলো, ইছামতিনদীর ওপারে, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে গেছে। পূর্বপাকিস্থানে মুসলমানরা হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বিষয় সম্পত্তি, মেয়েদের পর্যন্ত লুটপাট করছে। বেধড়ক হিন্দু জবাই চলছে। উলটো শুরু হয়েছে ইছামতির ওপারে। ইন্ডিয়াতে। মুসলমানদের মেরে-কেটে ফাট-লাশ করে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইছামতির জলে। দু’পাড়েই আগুন জ্বলছে। তখন ছোটোরা সবাই ফিসফিস, ফুসফুস, গুজগুজ স্বরে গম্ভীর আলোচনা করছি। ইছামতিতে ভাটি চলছে। লাশ ভেসে যাওয়া দেখতে যাবো কি যাবো না? পাড়াজুড়ে কোনো ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি নেই। সব যেনো কেমন ভ্যাবলা মেরে গেছে। থমথমে।

একমাত্র মা বাড়ির ভিতর ঘুরছেন ফিরছেন, আর মাঝে মাঝে হাঁক দিয়ে চলেছেন, ভয় যেনো অভ্যেস হয়ে তার গলায় বসে গেছে –কথা কানে ঢুকছে না? বলছিনা ঘরে এসে বসতে। কোনদিক দিয়ে খানসেনারা ঢুকে পড়ে তার কোনো ঠিকঠিকানা আছে? বাখারিখান নিয়ে যাবো না কি?

বকবক করেই চলেছেন।

স্কুলে এতক্ষণ নামডাক হয়ে গেছে। ফার্স্টপিরিয়ড চলছে। কালিবাবুর ক্লাশ। হয়তো লাইন দিয়ে স্যরের টেবিলে অঙ্কখাতা জমা দিচ্ছে আকবর, অসিত। মরেগেলেও ওরা স্কুল কামাই করে না। ভয় পাওয়া কেন্নোর মত আমরা পাড়ার মধ্যে গোল পাকাচ্ছি। ওদিকে হয়তো বহাল তবিয়তে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের ক্লাশ পার হয়ে যাচ্ছে। ট্রেনফেরা মানুষেরা খবর দিল, স্টেশন চত্বরে পা রাখার জায়গা নেই। মানুষ গিজগিজ করছে। কোথাকার মানুষ, কোথায় যাবে, অচেনা সব মুখ। পোঁটলা পুঁটলি বোগলে পুঁটলি হয়ে বসে আছে। ট্রেনফেরতারা শ’য়ে শ’য়ে বোঁচকা বুঁচকি ক্যাঁচোরম্যাঁচোর ডিঙিয়ে, পার হয়ে, অনেক কায়দা কানুন করে, তবে এসেছে। সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো আমাদের কপালের ভাঁজ ক্রমাগত মাথায় চড়ে বসছে।

ট্রেনফেরা মানুষদের পিছনদিক তখনো মিলিয়ে যায়নি। প্রথম অচেনা মানুষের দল পাড়ায় ঢুকে পড়লো। ওদের কোলে কাঁধে ছেলে পুলে। মাথায় বাক্স-পেঁটরা। আর এক দল ঠিক পিছনেই। হাতে লাঠি সোটা, গোরু ছাগল, আদুল গায়ে পুরুষ, ঘোমটা ঢাকা মহিলা তার পিছনে আবার এক দল। লাঠি হাতে বুড়ো, কুঁজো বুড়ি; বেলা বাড়তে না বাড়তে দলকে দল পিল পিল করে ঢুকে পড়লো। দেখতে দেখতে অষ্টম-প্রহরের চাতাল, কুঁচকেদের মন্দিরতলা। প্রভাবতী পাঠশালার স্কুলঘর, দুমদাম অচেনা মানুষে ভর্তি হয়ে গেল। ভয়ের দমবন্ধ বাতাসে ঠাসাঠাসি পাড়া।

আগন্তুকদের চাপে আমরা যেনো কোনঠাসা হয়ে পড়েছি। রাস্তায় পায়চারি বন্ধ করে বাড়ির দরোজায় জড়ো হয়েছি। বোবা দর্শক। গলার ভিতরে থুথু শুকিয়ে কথা আটকে গেছে। ভারি জিভ নড়ছে না, অজানা আশঙ্কায়।

খুব বেশি হলে বয়স কুড়ি বাইশ হবে, হাঁফাতে হাঁফাতে, ধুঁকতে ধুঁকতে, ছুটতে ছুটতে ছেলেটি আমাদের বাড়ির সামনে এসে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ভয়ে বিস্ফারিত চোখ, হুমড়ি খেয়ে পড়া ক্লান্তিতে দুলছে। ছেঁড়া পাজামায় হাঁটু পর্যন্ত কাদা, ছয়লাপ। গায়ে জামা, ছেঁড়া কুটিকুটি। উদভ্রান্ত। ঘিরে ধরলাম। দৃষ্টিশুন্য। পাগল পারা কথা –এটা ইন্ডিয়াতো?

আমরা পরষ্পর মুখ চাওয়াচায়ি করছি। আবার তীব্র স্বরে জিজ্ঞাসা করলো –আগে কও, ইন্ডিয়া কিনা?

ছোটোকাকা এগিয়ে এলো। –হ্যাঁ, ইন্ডিয়া।

যুবকটি নিশ্চিন্ত হতে চাইলো –ভারতবর্ষ?

ছোটোকাকা বললো – হ্যাঁ ভারতবর্ষ, কী হয়েছে বলো?

যুবকটির গলার আওয়াজ জড়িয়ে আসছিলো।
-ইন্ডিয়া ভারতবর্ষ ইন্ডিয়া ভারতবর্ষ…

ওর গলার আওয়াজ ঘেঙরে গেলো। শেষদিকে শুনতে পেলাম না। এককোপে কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেল মাটিতে। তাড়াতাড়ি মাথায় মুখে জলের ঝাপটা দেওয়া হলো। মেজোকাকা এসে বললেন, অজ্ঞান হয়ে গেছে। বাড়ির ভিতর নিয়ে যেতে। সবাই পাঁজাকোলা করে এনে বাড়ির ভিতর বারান্দায় শুইয়ে দেওয়া হলো। মা এসে ঝুঁকে পড়লেন। কাইমা ( মেজো কাকিমা ) মার পিছনে। মাকে জড়িয়ে মার বেঁটে কাঁধের উপর অর্ধেক মুখ রেখে দেখছিলো। পাজামা ফালাফালা, জামা টুকরো টুকরো। লজ্জা ঢাকা পড়ছে না। কাদা মাখামাখি, সারা গায়ে আঁচড় কাটা, রক্তের আঁকিবুঁকি। কাইমা আবিষ্কার করলো, আঁচড় কাটা রক্তের আঁকিবুঁকি ছাড়াও ছিটকে আসা রক্তের শুকিয়ে যাওয়া দাগ পায়ের পাতায়, হাঁটুতে। মাথায় চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দেওয়া হচ্ছে। বড়দি পাখার বাতাস করছে। জ্ঞান ফিরলে মা বাড়ির ভিতর ফিরে গেলেন। পিছন পিছন কাইমা। মার নির্দেশে মেজোকাকার লুঙ্গি, ছোটোকাকার হাওয়াইশার্ট দেওয়া হল। এলিয়ে পড়ে আছে। নিজে পরার ক্ষমতা নেই। আমি আর ছোটোকাকা পরিয়ে দিলাম। ছোটোকাকা জিজ্ঞেস করলো –বাড়ি কোথায়? কে তুমি?

মুখে গ্যাঁজলা লেগে আছে। কী বললো, কিছু বোঝা গেলো, কিছু বোঝা গেলো না। বুঝলাম, বাড়ি পূর্বপাকিস্থান, যশোরজেলা, বেনাপোল। কী একটা গ্রামের না পাড়ার নাম বলেছিলো, কেউই বুঝতে পারিনি। বোঝার জন্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক হলো। বোঝা গেলো না। একবার অকুল টকুল কিছু একটা বলেছিলো। বোঝা গেলো, ওর নাম, অকুল। অকুল ঘোষ। ‘বাবা মা’ শব্দ দুটি উচ্চারণ করেছিলো। কিছু বলতে চেয়েছিলো, পারেনি। তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো আবার।

নতুন শব্দ শিখে ফেললাম, উদ্বাস্তু। বেলা যতো বাড়ছে উদ্বাস্তুর স্রোত বেড়েই চলেছে। সদর রাস্তা ছেড়ে গলি পথ, ভাস্করদের মাঠ, হাবুদের রান্নাঘরের পিছন, নদীরপাড় সব দখল হয়ে গেলো। মানুষ, গোরু, ছাগল, কাঁথা-মাদুরে ছয়লাপ। ভয়ার্ত বাঙালভাষায় থিকথিক করতে লাগলো গোটা পাড়া। ওরা আমাদের ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছে, আমরাও উদ্বাস্তু। মলিন উদভ্রান্ত মানুষেরা এসেই যাচ্ছে। নাকি, ভয়ংকর যুদ্ধ হচ্ছে। আমরাও নিরাপদ নই। আমাদেরও কোথাও চলে যেতে হবে। বাবা এখনও আসছেন না। সারা শরীরের ভিতর অস্থির লাগছে। সবাই মিলে তাড়াতাড়ি কিছু করছে না, কেনো?

দোকান বন্ধ করে বাবা ফিরে এলেন। চমচম করছে দুপুর। সাইকেলের কেরিয়ারে দামি দামি কাপড়-চোপড়ের মস্ত গাঁট। এতো মস্ত, টলমল করছিলো সাইকেলখানা। বাবা খুব লম্বা মানুষ। নামতে গিয়ে তবু একবার টলে উঠলেন। পড়ে যেতে যেতে সামলে নিলেন। ধরার জন্য মেজকাকা ছোটোকাকা ছুটলো।

আমাদের কাপড়ের দোকান। বাবা বললেন- যে ক’টা পারলাম নিয়ে এলাম।

মদখোর কালু আর ভবেশ দুইভাই, মাস্তান, আমাদের পাড়ায় বাড়ি, দু’খানা খোলা তলোয়ার উঁচু করে, রাস্তা জুড়ে টলতে টলতে আসছে। বুঝলাম, বাবা ওদের দেখে ভয় পেয়েছেন। ওরা চেঁচাচ্ছে –আসুক খানসেনার বাচ্চারা, টুকরো করে কড়াই ফেলে চাট তৈরি করে খাবো। ভয় নেই কানুদা, বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো। আমাদের দিকে তাকিয়ে, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো - আছিতো বাছারা,আমরা জেগে আছি। যাও যাও সব, খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ো। রাস্তায় ঘোরাঘুরি করো না।

বাবা খুব শক্ত মানুষ। বাবার উপর আমাদের অগাধ আস্থা। সেই বাবার হাত থেকে সাইকেল পড়ে গেলো। আর একটু হলে নিজেও পড়ে যাচ্ছিলেন। আমরাও ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলাম!

পাশের বাড়ির বিশুদা ওর ছোট্ট ভাইঝি টুসিকে নিয়ে চলে এসেছে। জানালো, ওরা বর্ডার থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে। আমাদের পাড়া, আমরা কেউই নিরাপদ নই। বেরিয়ে পড়া দরকার। বিশুদা ছোটোকাকার জিগরি দোস্ত। ছোটোকাকা জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলো বাবার মুখে। বিশুদা বললো, যশোররোড দিয়ে সাঁজোয়া বাহিনি ঢুকছে। শক্তিমান, জিপ, ট্যাঙ্কের লম্বা সারি যুদ্ধে যাচ্ছে। সারির শেষ দেখা যাচ্ছে না। ভয়ংকর যুদ্ধ হবে। 

মেজোকাকা জিজ্ঞেস করলো – কি করবোরে দাদা?

একেবারে মনের কথা। বাবার উত্তরের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম আমরা সবাই। বাবা দৃঢ় গলায় বললেন –মরলে সবাই বাড়িতেই মরবো। অস্থির হয়ো না। সরকার থেকে কিছু বলুক।

বিশুদা উত্তেজিত হয়ে বললে –তখন দেরি হয়ে যাবে।

বিশুদাকে কখনও বাবার মুখের সামনে এতো উঁচু গলায় কথা বলতে শুনিনি। আশ্চর্য, বাবা বিশুদার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। বিশুদা ওর ভাইঝি টুসিকে খুব ভাললবাসে। ওদের বাড়ির লোকজন আর আমরা, দুই বাড়ির দরোজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম। টুসিকে কাঁধে চাপিয়ে, একা একাই, লম্বা লম্বা পা ফেলে বিশুদা স্টেশনের দিকে চলে গেলো।

ছোটোপিসির বাড়ি ইছামতির ওপারে, বর্ডারের কাছাকাছি। দেখতে দেখতে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ছোটোপিসি হাজির। পিসেমশায় আসেননি। যা আছে কপালে হবে, বলে ভিটেতে রয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে ছোটপিসির প্রতিবেশি তরুপিসি চারটে হাঁস, একপাল হাঁসের এণ্ডিগেণ্ডি, বকরি, দুটো ছাগলবাচ্চা নিজের দুটো পোলাপান নিয়ে ছোটোপিসির সঙ্গে হাজির। বাড়িতে হৈ চৈ মানুষে ভর্তি।

অকুলের কথা দেখেশুনে, বাবা মাকে ডাকলেন। বললেন, কিছু খাইয়ে দিতে। অকুলকে ভালো করে ঠান্ডা জলে ধুইয়ে দিলাম, আমি আর ছোটোকাকা। অকুল উঠে বসলো। মা গরম গরম ফ্যানাভাত আলুসিদ্ধ নিজে হাতে তুলে খাইয়ে দিলে। বেচারি, কিছুই খেলো না। দু’চার গ্রাস যা খেলো, উগলে দিলো তার চেয়ে বেশি। আধবোঁজা চোখ তুলে আমাদের চিনতে চেষ্টা করছিলো। বাবা জিজ্ঞেস করলেন –কী নাম?

ক্ষীণস্বরে অকুল যা বললে, মোল্লারা চোখের সামনে ওর বাবা-মাকে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটেছে। কাল রাত থেকে ছুটছে। নদী, নালা, ঝোপ-জঙ্গল পার হয়ে, জানেনা কোথায় ও এসে পৌঁছেছে। বাবা ওকে পাতালঘরে শুইয়ে দিতে বললেন।

আমাদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে খোলা বারান্দা, বারান্দা শেষ হয়েছে চারদিকের ছাদ আঁটা দালানে। দালানের ভিতর চারদিকে ঘর। ঘর দিয়ে ঘেরা, অন্ধকার সিঁড়ির ঘরের নীচে বেশ বড়ো একটা ঘুপচি ঘর। ফাঁকায় পড়ে থাকে। অন্য ঘর-দালান ছাড়া বেশ নিচু। সিঁড়ি দিয়ে অন্তত চার ধাপ নিচে নামতে হয়। ওর নাম পাতাল ঘর। ঘরখানার খবর বড়ো একটা কেউ রাখেনা। আমাদের কাছেও ঘরখানা ভুতুরে। ও ঘরে ঢুকলে হেরিকেন জ্বালিয়ে ঢুকতে হয়। আমরা ওদিকটা মাড়াই না। কিন্তু দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করে। পারমিশান নেই। ভূত প্রেত দত্যি দানো যতোকিছু রহস্যঠাসা ঘরখানায় এবার ঢুকতে পারবো। ছোটোকাকার পিছু নিলাম।

আমরা অবিভক্ত ভারতীয়। ছোটকাকার জন্মেরও আগে ঠাকুরদা ভিটে বিনিময় করে চলে এসেছিলেন। বাড়িখানা এক মুসলমান কাজিসাহেবের। পাতালঘর সেই সুত্রে পাওয়া। ঠাকুরঘরের ভিতর দিয়ে সিঁড়ির ঘরে যেতে হয়। সিঁড়ির ঘরের দেওয়ালে সিন্দুকের ডালার মতো দরোজা আছে। বাইরে থেকে দেখলে সিন্দুক মনে হবে। আসলে পাতালঘর।

অকুলকে ধরাধরি করে পাতালঘরে শুইয়ে দেওয়া হলো। ঘাড় কাত করে এলিয়ে পড়ার আগে অকুল আবার জিজ্ঞেস করলো –তুমরা ইণ্ডিয়া বাংলার লোক?

অকুলের অসংলগ্ন ভাবে মনে পড়ে গেছে।

আর্তনাদ করে উঠলো– আমার বুনডি?

বলেই ঠেলে উঠতে চাইছিলো। ছোটোকাকা বললে –আমরা পশ্চিমবাংলার লোক। তোমার বুনডি ঠিক আছে।

বুঝিয়ে সুঝিয়ে খানিক নিশ্চিন্ত করে, খানিক ঠেসেঠুসে শুইয়ে দেওয়া হলো। ঘাড় ভেঙে, অসাড় হয়ে পড়ে রইলো। ঘুমিয়ে গেলো? নাকি অজ্ঞান হয়ে গেলো, বুঝলাম না। হেরিকেন জ্বালিয়ে রেখে বেরিয়ে এলাম।

বেলা পড়ো পড়ো। এই সময়টুকু বাবা ঘুমান। আজ দালানে চেয়ার পেতে বসে আছেন। কখনও অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন। ইছামতির ওপারে মতিগঞ্জ। খবর

এসেছে, ওখানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়েছে। মতিগঞ্জের বাজারপাড়ায় ‘ইসলামিয়া বস্ত্রালয়’ বিশাল কাপড়ের দোকান। লুট চলছে। আমাদেরও কাপড়ের দোকান। দুঃশ্চিন্তা সবার মুখে থম মেরে বসে আছে। থানা থেকে কোনো খবর হুলিয়া হয়নি। মা কাইমা বাড়ির দামি দামি জিনিসপত্র গুছিয়ে এক জায়গায় জড় করছে। যদি বাড়ি ছাড়তে হয় তার প্রস্তুতি।

উঠোনে উনুন খুঁড়ে দশ নম্বর কড়াইয়ে খিচুড়ি চেপেছে। আমরা ছোটোরা খেয়ে নিলেও, বড়োদের খাওয়া হয়নি। হলুদ খিচুড়ি ফুটছে।

আমাদের বাড়ি হিন্দুপাড়ার শেষ সীমানায়। মুসলমান পাড়ার লাগোয়া। বাড়ির পিছনেই এবাদতকাকাদের বাড়ি। এবাদতকাকা ছোটকাকার আর এক প্রাণের বন্ধু। একপাতে খাওয়া, এক বিছানায় শোয়া, একসঙ্গে পড়তে না বসলে রাতে তাদের ঘুম আসে না। এবাদতকাকার দিনের বেশিরভাগ সময় আমাদের বাড়িতেই কাটে। মাহিদুলজ্যাঠা, এবাদতকাকার বড়োভাই হঠাৎ এসে হাজির। বাবার হাত জড়িয়ে ধরলেন।

-বড়ো বিপদ কানু, বাঁচাও। সোনাদানা, চাল ডাল সব তোমার ঘরে তুলে দিচ্ছি, বাড়ির মেয়েদের তোমার বাড়িতে ঠাঁই দাও। নইলে সব প্রাণে বাঁচাতে পারবো না।

এবাদতকাকার আব্বারা দুইভাই। বড়মোড়ল আর ছোটোমোড়ল। আমাদের বড়দাদু আর ছোটোদাদু। বড়দাদুর তিনবউ, আর ছোটোদাদুর এক, চার জন বুড়ি। পাঁচজন কাকিমা জেঠিমা। একজন ভাবি, নেহারবানু-এবাদতকাকার ভাইঝি, আরো চার পাঁচজন কিলবিল কচিকাঁচা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে আমাদের বাড়ি। সঙ্গে এবাদতকাকা। চেনাই যায় না। এ যেনো অন্য কাকা। এবাদতকাকা, আমাদের এবাকাকা, মিষ্টি কাকা। আমাদের গল্প বলা কাকা। কোলের মধ্যে লুটোপুটি খেয়ে আদর খাওয়ার কাকা। গায়ের রঙ কালো হলে কী হয়! খুব সুন্দর দেখতে। সব সময় হাসে। মুখখানা শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেছে। ভয়ে উদভ্রান্ত, উস্কোখুস্কো চেহারা। চোখদুটো ফ্যাকাসে, খোপের ভিতর ঢুকে গেছে। অবিকল আর একটা অকুল। এবাদতকাকাকে দেখে আমার বুকের ভিতর কষ্ট, ভয় জমাট বেঁধে গেলো। মুখতো বোবা ছিলোই, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে এলো। অকুলকে দেখে বুক এতো হাহাকার করেনি।

বাবা, মেজোকাকা, ছোটোকাকা মাকে ডাকলেন, জিজ্ঞেস করলেন -কী করি?

মেজোকাকা, ছোটোকাকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো। মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন –কী আবার করবে? এখন কি মিটিং ডাকার সময়! সবাইকে পাতালঘরে পাঠিয়ে দাও। মরি সব এক সাথে মরবো। এই দুর্যোগে কোথায় যাবে ওরা!

বাবা ইতস্তত করে বললেন –মাইদুলদা তোমরা পুরুষেরা কেউ ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না। আর মেয়েরা কেউ টুঁ শব্দ করবে না। পাতালঘরে মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে। জানাজানি হলে, তোমরাও মরবে, বাড়িশুদ্ধু সবাই মরবো।

কিলবিল কচিকাঁচারা তখনি মুখে তর্জণী তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নেহারবানু খুব ভয় পেয়ে গেছে। মাঝখান থেকে বলে উঠলো –আব্বু, চলো পাকিস্থান চলে যাই। আমাদের দেশ। খেতে না পাই, মেরেতো ফেলবে না।

নেহারবানু খুব সুন্দরী। সোমত্ত। ভয়ে নেহারবানুর মা, মেয়েকে তখুনি আঁচল দিয়ে ঢেকেঢুকে, বুকের মধ্যে চেপেচুপে সঙ বানিয়ে তুলেছে। মেয়েটা হাঁসফাঁস করছে। মেয়ে যেনো এখুনি লুটপাট হয়ে যাবে।

একহাত ঘোমটাটানা জেঠিমা, তার গালে ঠাস করে চড় কষিয়ে দিলেন। হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন -চুপ, একদম মুখ বাজাবি না। হারামজাদি।

নেহা দ্বিগুন জ্বলে উঠে বললো –আব্বু আর পারছি না। মেরে ফেলো, সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলো। ছেড়ে দাও, আমি একা পাকিস্থান চলে যাবো।

ঠাসঠাস করে আবার চড়। আঁচল চাপা ভিতর থেকে কোনো কান্নার আওয়াজ এলো না। এলো ফোঁস ফোঁস শব্দ, যেনো ফুঁড়ে বেরুচ্ছিলো।

বাবা বললেন –বৌঠান, ছেলেমানুষ, ওকে মারার দরকার নেই। কপালে যা আছে হবে।

মাইদুলজ্যাঠা বললেন –সোমত্ত মেয়ে, কানু একটু নজরে রেখো। আর এবাদত তোমার বাড়ির ছেলে, ওকেও রেখে গেলাম। বাড়ি ঘরগুলো দেখবে, এখেনে শোবে, দু’মুঠো খাবে।

বাবা দুই পিসিকে ডেকে ওদের পাতালঘরে নিয়ে যেতে বললেন। ওরা পাতাল ঘরে ঢুকে গেলো। যখন যাচ্ছিলো, মনে হলো, এক ঝাঁক বোবা, কালা, বন্দী, পিঁপড়ের সারির মতো গারদের দিকে এগিয়ে চলেছে। কাল সকালেই ওদের ফাঁসি হবে। ছোটপিসি, তরুপিসি পইপই করে বারণ করে দিলেন যেনো কারো নিশ্বাস ফেলার শব্দও না পাওয়া যায়। পাতালঘরের কপাটে তালা পড়ে গেলো। চাবি মার কাছে। বাইরে আসার দরকার হলে পাতাল ঘরের দড়ি টানলে আমাদের শোয়ার ঘরে ঘন্টা বেজে উঠবে। বেরুবার দরকার হতে পারে। মেয়েদের শিখিয়ে দেওয়া হলো।

পাড়ায় মানুষের ঢল নামার বিরাম নেই। বিকেলের দিকে সরকার বাহাদুরের টনক নড়লো। পুলিশের জিপ এসে সারাপাড়া মাইক ফুঁকে ঘুরে গেলো। ঘোষণা হলো –জেলাশাসকের নির্দেশ অনুসারে, বনগাঁ ও বাগদা মহকুমায় জরুরি ভিত্তিতে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করা হয়েছে এবং সন্ধে আটটা থেকে সকাল ছ’টা পর্যন্ত কার্ফু জারি থাকবে। যে যেখানে যে অবস্থায় আছেন, সেখানেই অবস্থানের জন্য জানানো যাইতেছে। আগামিকাল সকাল ছ’টারপর যারা যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। পাকিস্থান থেকে কোনো আক্রমন হয়নি। সীমান্ত এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। শান্তিপূর্ণ। কেউ গুজবে কান দেবেন না। গুজব ছড়াবেন না। গুজব ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মাইকে যখন ঘোষণা চলছে, পশ্চিমপাড়ার আকাশে দেখা গেলো আগুনের হলকা। কোথাও আগুন জ্বলছে। ছোটোকাকা বললো – আগুন লাগানো হয়েছে।

লকলক করছে শিখা। কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাক খাচ্ছে বাতাসে। পশ্চিমপাড়া আমাদের পূর্বপাড়া থেকে অনেক দূর। অনেক উঁচু গাছপালা ঘরবাড়ি পেরিয়ে বাদামি আকাশ দেখা যাচ্ছে। বাবা বললেন, বাড়ীতে নাদা, পাতনা, হাঁড়ি, কলসি যতো পাত্র আছে, জল ভরে রাখতে।

টিউবওয়েল চেপে জল টেনে টেনে আমরা ছোটোরা হাত পা ব্যথা করে ফেললাম। তখন আগুনের ভয় আমাদের গিলে নিচ্ছে। মা কাঁথা কম্বল হাতের কাছে রাখলো। ভাবলাম, বাড়িতে মানুষ অনেক, শুতে লাগবে। মা বললেন –না, ভিজিয়ে চাপা দিলে আগুন নিরস্ত হয়।

মা কতো জানে। এ সব দেখে শুনে বুকে সাহস জড়ো হচ্ছে।

আমি, ছোটোকাকা, এবাদতকাকা এখন ছাদে। চতুর্দিকে পরিস্থিতি নজরে রাখছি। বিকেল ফুরিয়ে এসেছে। বড়োদের পংক্তিতে এবাকাকা খিচুড়ি খেয়েছে, নামমাত্র। আতঙ্কে শীর্ণ মুখ। তিনজন ছাদে পাক খাচ্ছি। এবাকাকার পা চলছেই না। আমরা সবাই একসাথে আছি। আগুন দিলে সবাই পুড়ে মরবো। কাটলে সবাইকে কেটে ফেলবে। যা হবে একরকমই হবে। এবাদতকাকা অন্যরকম মরার মতো হয়ে আছে কেনো? মুসলমান বলে? পাকিস্থানে চলে যায়নি বলে? ওদের আলাদা শাস্তি কী হবে?

ভাবছি, আর চারদিকে পাহারাদারির কড়া নজর রাখছি। সন্ধে নামছে। থমথমে দিনগুলোতে অন্ধকার খুব তাড়াতাড়ি নামে। পুলিশ হেঁকে যাওয়ার পর মানুষের কোনো হেলদোল নেই। পুলিশের উপর কারো আস্থা নেই। কেউ একশো চুয়াল্লিশ মানছে না। কার্ফু ভেঙ্গে লম্ফ, হেরিকেন, মোমবাতির আলো হাতে ভুস ভাস রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। ছাদে কাকাদের পিছন পিছন হাঁটছি। দূরে স্টেশান যাওয়ার পথে হঠাৎ একঝাঁক মশাল নজরে এলো। শোনা গেলো, ওদের গোলমাল।

-হরহর মহাদেব

-জয় মা কালি পাঁঠা বলি।

দুইকাকা ঝটপট নীচে নেমে গেলো। পাতাল ঘরের সামনে গেলো।

বলে গেলো -লক্ষ্য রাখ, মশাল এদিকে আসছে দেখলেই খবর দিবি।

শরীর হাল্কা লাগছে। ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে আসছে। মা বাবা ছোটোকাকাদের সাহস দেখে সাহস তৈরি করছি। বুকের ভেতর ভয় আর সাহসের রীতিমত লড়াই শুরু হয়েছে। সাহসকে ছোঁয়ার জন্য হন্যের মতো সারা ছাদ বনবন করে ঘুরছি। বড়দের দেওয়া দায়িত্ব পালনে যেনো চুল ফাঁক না থাকে। আর ভয় পিছনে তাড়া করছে। গুজবের অন্ত নেই।

১৯৪৭সালে ১৪ আগষ্ট রাতে শোনা গিয়েছিলো, বনগাঁ মহকুমা পাকিস্থানের ভাগে পড়েছে। বড়দাদু, ছোটদাদু মানে বড়োমোড়ল ছোটোমোড়ল নাকি দলবল মিলে সেই রাতে পাকিস্থানের পতাকা হাতে বেড়িয়ে পড়েছিলেন। বড়ো বড়ো বাড়ির গায়ে বেঁধে দিয়েছিলেন পতাকা। চিৎকার করে কেউ বলেছিলেন,

-নিলু নন্দীর বাড়ি আমার। ওর বউকে নিকে করবো।

কেউ বলেছিলেন –সুবল নাথের বাড়ি নেবো। মতি দত্তর বউ আমার।

সেই সব কথা এখন উজান ঠেল নিচ্ছে।

এক ঝাঁক মশাল ঢুকে পড়লো আমাদের বাড়িতে।

-কোথায় সে বড়োমোড়ল, শাহাবুদ্দিন হারামি।

বাবা সামনে দাঁড়িয়ে বললেন – ওনাদের বাড়ি পিছনে। আমরা হিন্দু।

ওদের হাতে হাতে মশাল জ্বলছে। কারো কারো হাতে রামদা, সড়কি, বল্লম, লাঠি। মশালের আগুনে ধ্বকধ্বক করছে গোল্লা গোল্লা চোখ। মুখে ভকভক করছে মদের গন্ধ। কাউকে চিনিনা। ছোটোপিসিকে সামনে পেয়ে একজন বাঁজখাই গলায় জিজ্ঞেস করলে –তোর নাম কি?

-রেণু।

-বাড়ি কোথায়?

-জয়ন্তি, হরিদাসপুর।

ওরা কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। তরুপিসির দিকে কটমট করে তাকাতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। গড়্গড় করে বলতে আরম্ভ করলো – আ…আমার নাম ইয়ে..তরুলতা সরকার। স..সত্যি বলছি, বাড়ি মতিগঞ্জ। স্বামীর নাম কৃষ্ণ সরকার। নেই। বিধবা। আমার দুই ছেলে, রবি, শশী। কালি,পালি আমার দুটো বকরীছানা, এটা আমার দাদার বাড়ী….

পিসি থামছিলো না, বলেই যাচ্ছিলো। ওদের একজন বিশাল ওজনের তাড়া মেরে বললো – চোপ।

পিসি ঠোঁটের উপর সঙ্গে সঙ্গে তর্জণী তুলে বলতে আরম্ভ করলো –আমি চোপ, আমি চোপ, আমি চোপ….

মেজোকাকা এসে পিসিকে ওদের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। রবি শশী ওদের মাকে জড়িয়ে দুইহাঁটুর পাশ দিয়ে দেখছিলো। দু’জনেই প্যান্টে হিসু করে ফেলেছে। পিসির শরীরে মুখ গুঁজে রেখেই মাটিতে পা ঘেঁষরাতে ঘেঁষরাতে, দুই ভাই পিসির শরীরের অংশ যেনো, বাড়ির ভিতর চলে গেলো। ছোটোকাকা, এবাদতকাকা পাতালঘরের দরোজায় তখন শাবল, সড়কি হাতে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে। টুঁ শব্দ নেই। যাওয়ার সময় ওরা গরীব তরুপিসির কালিকে কাঁধে চাপিয়ে চলে গেলো। পাঁঠা না পাঁঠি হুঁশ করেনি। পেছনের ছোটদাদুর বাড়ি ধু ধু শ্মশান। কেউ নেই। কাঊকে না পেয়ে ধানের গোলায় আগুন লাগিয়ে চলে গেলো। ধানভর্তি গোলা ছিলো উঠোনের এক কোনায়। পাড়ার মানুষ যেনো জানতো আগুন জ্বলবে, রেডিই ছিলো। পাশেই মোড়লদাদুদের পুকুর। হিন্দু মুসলমান মিলে একপাড়া মানুষের নিভিয়ে ফেলতে অসুবিধে হয়নি। এ যাত্রায় মা লক্ষ্মীর ধানের উপর দিয়েই বিপদ পার হয়ে গেলো।

রাতেরবেলা ছোটোকাকা, এবাকাকা, আর আমি পাতালঘরে গিয়েছিলাম, খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট-তরকারি নিয়ে। রাতের খাবার। দেখি, অকুল ঘোষের জ্ঞান ফিরেছে। বুকে হাঁটু জড়িয়ে বসেছিলো ঘরের কোনে। ভয়ে জড়োসড়ো। হেরিকেনের আলোয় ওকে ছায়া মানুষ মনে হচ্ছিলো। হাতা, খুন্তি, বালতি, আমাদের তিনজনকে দেখে হঠাৎ আর্তনাদ করে নেহারবানুকে জড়িয়ে ধরলো। দশ বারোজন মহিলার মাঝে নেহাদি লুকিয়েই ছিলো। অকুল গাছ থেকে লাউডগা সাপের মতো ছিটকে পড়ে জড়িয়ে ধরেছে নেহারবানুকে। অতগুলো মহিলা হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না। আষ্টেপৃষ্ঠে দু’জনে এক হয়ে গেছে। হাতা, খুন্তি, বালতির ধাতব শব্দ, উদভ্রান্ত আমাদের তিনজনের চেহারা, বিশেষ করে কালো এবাদতকাকার মুসলমানি দাড়ি দেখে বোধ হয় ভীষণ ভয় পেয়েছে। এবাকাকার মনে হলো, নেহাদিদি অকুলের বুকে ইচ্ছে করে সেঁটে আছে। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে না।

কাকার মাথায় রাগ গেলো চড়ে। অকুল ঘোষকে কিছু না বলে, নেহাদিদিকেই টেনে হিঁচড়ে বের করতে শুরু করলো। এমনকি চড়-চাপড়ও চালাচ্ছে। ছোটোকাকা এবাকাকাকে থামাতে চেষ্টা করছে। অকুলকে যতো বলা হয় ছাড়, ও ততোবেশি জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে – ওকে মেরো না, তোমরা ওকে মেরো না। নেহা ছাড়া আমার কেউ নেই।

যতো ওকে বোঝানো হয়, নেহা ওর কেঊ নয়, ওর নাম নেহারবানু।

ও বলে –না, ও নেহা, ওর নাম নিহারিকা।

অনেক কথা বলাবলির পর বোঝা গেলো, মেয়েদের কেঊ নেহাদিকে নাম ধরে ডেকেছে। অকুল ভেবেছে ওর বোন কিংবা প্রিয়জন কেউ নিহারিকা, আমরা জানিনা। নেহাদিদিকে ছাড়িয়ে নিতেই অকুল অজ্ঞান হয়ে গেলো। দুপুরে অজ্ঞান ছিলো। কিছু খায়নি। রাতেও কিছু খেলো না। অজ্ঞান হওয়ার আগে প্রাণপনশক্তিতে চেষ্টা করেছিলো, নেহাদিদিকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে রাখার। আকুলি-বিকুলি করে হাহাকার করেছিলো –তোমরা ওকে মেরো না। ও মরে যাবে।

শেষ নিশুতরাতে আমি একা গিয়েছিলাম পাতালঘরে। শোয়ারঘরে ঘন্টা বেজে উঠেছিলো। মা হাতে চাবি ধরিয়ে বলেছিলো –যা, পাতালঘরের দরোজা খুলে দিগে। ওরা কেউ বাইরে যাবে। ফিরে এলে, তালা দিয়ে চাবি আমাকেই দিবি।

দরোজা খুলে দিলে বয়স্ক মহিলারা সব বাইরে গেলো। আমি পাতালঘরে নামার সিঁড়িতে ঘুম চোখে বসেছিলাম। বড়োরা নেই। ছোটোরা অসাড়ে ঘুমুচ্ছে। বুড়িদাদির কোলের ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো নেহাদিদি। অকুলের পাশে গিয়ে বসলো। ঘুম ঘুম চোখেও স্পষ্ট দেখলাম, নেহাদিদি এক পলকে তাকিয়ে আছে, অকুলদাদার দিকে। বোতাম ছেঁড়া হাওয়াই শার্টের নিচে বেরিয়ে থাকা রক্তের চিহ্নগুলোতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। গায়ে মাথায় আদর করছে। কিছু সময় পর অকুলদাদার জ্ঞান ফিরে এলো। সে উঠে বসলো। দু’জন দু’জনকে প্রাণ ভরে জড়িয়ে ধরলো। যেনো কতোকাল পরে ওদের দেখা হয়েছে। একে অপরকে ফিরে পেয়েছে। পাশে কলার পাতায় পড়েছিলো, কাল রাতে অকুলদাদাকে দেওয়া বাসি, আলগা খিচুড়ি, ঘ্যাঁট। নেহাদিদি আস্থে আস্থে খাইয়ে দিচ্ছিলো অকুলদাদাকে। ঘুম কানেও ভুল শুনিনি, জিজ্ঞেস করলো –তুমি পাকিস্থানি?

অকুলদাদা চোখ তুলে নেহাদিদির দিকে তাকালো। নেহাদিদি অবাক চোখে তার স্বপ্নের পাকিস্থানকে দেখছিলো। অকুলদাদা জিজ্ঞেস করলো –তুমি ইন্ডিয়ান?

অকুলদাদা দেখছিলো তার নিরাপদ আশ্রয় ইন্ডিয়াকে। নেহাদিদি ঘাড় ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলো –হ্যাঁ।

মুখে কিছু শব্দ করলো না।

একটু বাদেই মহিলারা ফিরে এলো। ওদের দেখেও দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ বসে থাকলো, দেওয়াল ধরে। যেনো দু’জন দু’জনকে পেয়ে গেছে। দুনিয়ার আর কাউকে গ্রাহ্য করে না। শেষ রাতে, কালিপড়া হেরিকেনের আলোয়, ওদের প্রায় দেখা যাচ্ছিলো না। দু’জন মানুষ, দু’টো ছায়া মিলে মিশে একাকার হয়ে ছিলো। সন্ধের ঘটনায় মেয়েরা ভয়ে শুকিয়ে আধখানা হয়ে ছিলো। গন্ডগোল-অশান্তির ভয়ে কেউ আর ওদের ছাড়াবার চেষ্টা করেনি।

দুয়োরে তালা এঁটে বেরিয়ে এলাম। তখনও ভোর হয়নি। নেওয়াপাতি ভোরে কুয়াশার সাঁজাল লেগেছে। হিন্দু-মুসলমান-ভারত-পাকিস্থান-অকুল-নেহা জট পাকিয়ে যাচ্ছে ঘুমঘুম মাথার ভিতর। ভোরের সাঁজাল উড়ছে। দিনের সাহস জেগে ওঠার আগেই ভোরের ভয় আমাকে কব্জা করে ফেললো। মনে হলো, কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। এতো ধোঁয়া কেনো? চারিদিক ধোঁয়ায় ভর্তি। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

রান্নাঘরের চাল দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। মাহিদুলজ্যাঠার ঘরের চাল ফুঁড়েও উড়ছে। সামনেই উঠোনে সার বাঁধা নাদা হাঁড়ি কড়াই ভর্তি জল, মনে পড়ে গেলো, কাল বিকেলের রক্তিম আকাশ। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম –আগুন আগুন।

প্রথমে বাবা, বোধ হয় জেগেই ছিলেন; মা কাকিমা, মেজোকাকা ছোটোকাকা এবাদতকাকা সবাই ধড়মড় করে উঠে উঠোনে হাজির। সবাইকে দেখাচ্ছি –দ্যাখো, ছোদ্দাদুর ঘরের চালে ধোঁয়া উড়ছে। দলুজঘরের চালে ধোঁয়া, ধানের গোলায় …

-কোথায় আগুন? ওতো কুয়াশা।

সারাদিনের খাটুনিতে দুঃশ্চিন্তায় বাবা আমার এ ভুল সহ্য করতে পারলেন না। ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দিলেন। বললেন- মজা হচ্ছে?

ছোটোকাকা এবাকাকা এসে আমাকে কোলে করে তুলে নিয়ে গেলো। মা বলে উঠলেন –মজা করবে কেনো? ওরওতো প্রাণের ভয় আছে। ছেলেমানুষ। ভয়ে কুয়াশা দেখে ভেবেছে আগুনের ধোঁয়া। ওমন করে মারে!

পরদিন সকালেও পুলিশের জিপ ঘুরে ঘুরে মাইকে একই বাণী চর্বিত চর্বন করে গেলো। একটু একটু করে ভীড় নড়ছে। দু’একদল করে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের ঘরে। আতঙ্ক তবু ছাড়ছে না। এবাকাকাদের পরিবার চারদিন পাতালঘরে ছিলো। মহামুশকিল ছিলো অকুল নেহাকে নিয়ে। বেশিরভাগ সময় দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে থাকতো। এবাকাকা কিংবা অচেনা কেউ পাতালঘরে ঢুকলেই অকুল নেহাকে জড়িয়ে ধরতো। ছাড়িয়ে নিলেই অকুল অজ্ঞান, আর রাগ ঝাল অশান্তি শুরু করে দিতো নেহাদিদি। ওরা দু’জন কেউ কাউকে ছেড়ে থাকছে না। নেহাদিদি কাছে থাকলেই ম্যাজিকের মতো অকুলদাদা সুস্থ। সে বুঝতে পেরেছে নেহা, নিহারিকা নয়, নেহারবানু, তবু তার নেহাকে চাই। কাকারা বলছে, বদমায়েসি। মেজোকাকিমা, দুইপিসি, এমনকি কাজের পিসিও পিছনে অকুলকে ইন্ডিয়া, নেহাকে পাকিস্থান বলে রসিকতা করছে। রান্নাঘরে, দালানে সুযোগ পেলেই মুখ টিপে হাসাহাসি করছে। অনাসৃষ্টি কান্ড! মা বাবাকে বললেন, ডাক্তার ডেকে আনতে।

ডাক্তারবাবু এলেন। ঘুমের ওষুধ দিলেন। বললেন, দিনে দু’তিনবার চান করাতে, পেট ভরে খেতে। আরও বলে গেলেন, পাগল হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হলে অকুলকে এখন নেহার কাছে রাখতে হবে। অবাক করা কথা। ডাক্তারবাবু বলে খালাশ। সোমত্ত ভিনজাতের মেয়ে, তাই রাখা যায়!

দু’তিন দিনের মধ্যে পাড়া অর্ধেক ফাঁকা। গুছিয়ে গাছিয়ে শনৈ শনৈ যে যার ঘরে ফিরে যাচ্ছে। তখন দুপুরবেলা। চারদিন পর মুসলমান পুরুষেরা ফিরে এসে মেয়েদের নিয়ে গেলো। মুশকিল বাঁধলো নেহাদিদিকে নিয়ে। সে কাছে থাকলেই অকুলদাদা সুস্থ। তাতে মাহিদুলজ্যাঠা, এবাকাকার কিছু এসে যায় না। নেহাকে ওরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবেই। গায়ে পর্যন্ত হাত তুলতে ছাড়ছে না। নেহাদিদি কান্নাকাটি, চেঁচামেচি, যাচ্ছেতাই কান্ড বাঁধালো। কিছুতেই যাবে না। মাহিদুলজ্যাঠা সম্পর্কে মার ভাসুর। ভুলে গিয়ে জ্যাঠাকে চিৎকার করে মা বকতে শুরু করলেন -আপনি কি মেয়েটাকে মেরে ফেলবেন নাকি? বাবা না কসাই? ছাড়ুন, ছেড়ে দিন আপনি।

মা গিয়ে নেহাদিদিকে কেড়ে বুকের মধ্যে পুরে নিলো। রেহাই পেলো নেহাদিদি। মা গলা নামিয়ে বললেন –দাদা, মাথা ঠান্ডা করুন। রান্না হয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে এখানেই দুটো খেয়ে নিন। এবাদত তুই খেয়ে নিগে যা।

মাহিদুলজ্যাঠা তখনও ফুঁসছিলেন। মা’র কথার মধ্যে এমন কিছু ছিলো যেনো সাপের ফনায় ফুঁ পড়েছে। মাহিদুলজ্যাঠার গোঁ যখন নিভে আসছে, বাবা এসে মাহিদুলজ্যাঠার হাত ধরে দালানের চেয়ারে নিয়ে বসালেন। বললেন- অকুলকে আমি কর্মচারি রেখেছি, মাহিদুলদা তুমি নেহাকে রেখে যাও। অকুলের জন্য মেয়েটাকে আমি নিলাম।

পাঁচমেয়ের হাঁসফাস বাবা মাহিদুলজ্যাঠা তখন খানিক ধাতস্থ হয়েছেন। ইন্ডিয়ার সাথে লেপ্টে থাকা পাকিস্থানকে নিয়ে কে আর ঘর করবে? এমন সমাধানে জ্যাঠা আর না করলেন না। প্রাণে বাঁচাতে নেহাদিদিকে ওরা রেখে যেতে বাধ্য হলেন। ওরা দু’জন রয়ে গেলো পাতালঘরে। ডাক্তারবাবুও কোনোরকম জোরজার করতে নিষেধ করে গেছেন। অগত্যা নেহাদিদির মা রইলেন ওদের সাথে।

পাঁচ সাতদিনের মধ্যে পাড়া যা কে তাই। ফাঁকা। যে যার ঘরে ফিরে গেছে। এখানে ওখানে পড়ে আছে খোঁড়া গর্ত, ভাঙা বাঁশ, পোড়া মাটিরহাঁড়ি, আর পোড়ামাটির খামচা খামচা ভারতবর্ষ। ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। দূরে ভারত-পাকিস্থান সীমান্ত। নিচে পাতালঘর। ওখানে অকুলদাদা নেহাদিদি একাকার। বাইরে থেকে কেউ ওদের দেখতে পাচ্ছে না। কেমন শুন্য শুন্য বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। মিথ্যে মিথ্যে একটা দাঙ্গার মহড়া হলো। ইন্ডিয়া পাকিস্থান কারো জেল ফাঁস কিছু হলো না। মধ্যে পড়ে শুধুমুধু মার খেলাম আমি আর আমার মতো গোবেচারা কিছু গেরস্থ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন